ফারহানা শিমু >> অতিমারি, মন ও ছবি >> চিত্রকলা

0
346

অতিমারি, মন ও ছবি

ছবিও মন ভালো করে দেয়। বিশেষ করে মানসিক কষ্টে বা বেদনায় যখন বিপন্ন হয়ে পড়ে মানুষ, যেমন অতিমারির সময়ে হচ্ছে, তখন কোনো চিত্রকর্মের সামনে দাঁড়ালে মানুষের মনে প্রশান্তি আসে। আর সেই ছবি যদি হয় ভ্যান গঘের আঁকা তাহলে তো কথাই নেই।

০২০ সালের মার্চে পৃথিবী জুড়ে যখন অতিমারি কোভিদের প্রাদুর্ভাব শুরু হয়, তখন ব্রিটিশ চিত্রশিল্পী ডেভিড হকনি উজ্জ্বল হলুদ ড্যাফোডিলের একটি ছবি প্রকাশ করেন। ছবিটির শিরোনাম ছিল ‘ডু রিমেম্বার দে কান্ট ক্যানসেল দ্য স্প্রিং’। অতিমারির অনিশ্চয়তার মধ্যে ছবিটি মানুষের মধ্যে যেন নতুন আশার সঞ্চার করলো। এই ছবি মানবকুলকে মনে করিয়ে দিল প্রকৃতির কথা, যা ফিরে ফিরে আসে নতুন আশার আলো নিয়ে। করোনা আর যাই করুক, বসন্তকে নষ্ট করতে পারেনি।

ফিল্ড উইথ আইরিসেস (১৮৮৮), ভ্যান গঘ

বহুদিন থেকেই হকনি প্রকৃতিকে কেন্দ্র করে ছবি আঁকছিলেন। কেননা তার মনে হয়েছে একমাত্র প্রকৃতিই পারে মানুষকে উজ্জীবিত রাখতে, অনুপ্রাণিত করতে, মন ভালো করে দিতে। আসলেই তাই, প্রকৃতির বাহ্যিক গুণ প্রভাবিত করে মানুষের মনকে। তিনি নিজে একবার এ প্রসঙ্গে বলেছেন, প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে আমার মনকে আমি সতেজ করে তুলি। প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে অস্থির মনকে শান্ত করা যায়। মাত্র ২০ মিনিট প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে থাকলে মানবমনের অস্থিরতা অনেক কমে যায়। এমনকি প্রকৃতি নিয়ে আঁকা একটি ছবির দিকে তাকালেও তেমনটাই ঘটে। হকনি প্রকৃতির এই অমোঘ অভিঘাতের কথা বলতে গিয়ে ভ্যান গঘের ছবির উল্লেখ করেছেন। বলেছেন এ হচ্ছে ‘দ্য জয় অব নেচার’ বা প্রকৃতি থেকে আনন্দ আহরণ। এরকম ছবি দেখলে মানুষ যেন প্রকৃতির মধ্যে হারিয়ে যায়। অনুভূতিটা এমনই হয়।

এই ভিডিওতে দেখুন হকনি বলছেন ভ্যান গঘের ছবি নিয়ে

https://www.youtube.com/watch?v=a3L5IU_HQtA

শুধু হকনি নন, হিউস্টনে ছবির প্রতিযোগিতার আয়োজন করেন এমন একজন আয়োজক অ্যান ডুমাস তাঁর অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে বলেছেন, কোভিড ১৯-এর কারণে এখন খুবই খারাপ সময় যাচ্ছে আমাদের। তাছাড়া প্রচণ্ড ঠান্ডায় সবকিছু জমে যাচ্ছে। টেক্সাসেও একই অবস্থা শুরু হয়েছে। এরকম দুঃসময়ে ছবি দেখার মধ্য দিয়েই মনে প্রশান্তি আসতে পারে।

২০১৯ সালে আমস্টারডামে দ্য ভ্যান গঘ মিউজিয়ামে একটি চিত্রপ্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। সেই প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছিল ভ্যান গঘ ও হকনির প্রকৃতি বিষয়ক ছবি। হকনির ছবিতে ভ্যান গঘের প্রভাব যে স্পষ্ট, সেটা বোঝা গেছে ওই প্রদর্শনীতে তার ছবি দেখে। তবে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, দুই শিল্পীর প্রকৃতিকেন্দ্রিক চিত্রকর্মর মাধ্যমেই যে মানুষের মন প্রভাবিত হতে পারে, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ভ্যান গঘ দক্ষিণ ফ্রান্সে চলে গিয়ে এই ধরনের ছবি এঁকেছিলেন। এসব ছবিতে দেখা যায় রঙের ব্যবহারের বৈচিত্র্য ও বৈভব। তিনি সেখানে বসে সূর্যালোক ও দিগন্তজোড়া মাঠের ছবি এঁকেছেন। অন্য দিকে, হকনি যখন লসঅ্যাঞ্জেলেসে আসেন এবং এখানে থাকতে যে ছবি আঁকেন, তাতেও সেখানকার প্রকৃতি চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে।
হকনি তাঁর এই ছবিগুলো প্রসঙ্গে বলেছেন, সবসময়ই প্রকৃতিতে এমন সুন্দর কিছু দেখতে যে-দেখাটা আমার কখনও ফুরায় না। আমি দেখতেই থাকি। সবচেয়ে মজার বিষয় হচ্ছে, এ নিয়ে ভ্যান গঘের সাথে আলোচনাও করেন তিনি। কীভাবে? না, ভ্যান গঘ তো বেঁচে নেই। বাস্তবে তো সম্ভব নয়, মনে মনে আত্মগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে তিনি ভ্যান গঘের সঙ্গে কথা বলেন।
আসলে এই দুই শিল্পী প্রকৃতিকে গভীরভাবে অনুভব করেছেন। ভ্যান গঘের অসংখ্য ছবি আছে যে ছবিগুলো প্রকৃতির দৃশ্যপট হিসেবেই বিখ্যাত হয়ে আছে। হকনিও ২০১১ সালে পূর্ব ইয়োর্কশায়ারে থাকতে ‘দ্য অ্যারাইভাল অব স্প্রিং ইন উল্ডগেট’নামে একটি ছবি এঁকেছিলেন। সেটাও ভ্যান গঘের দ্বারা অনুপ্রাণিত একটা ছবি বলে অনেকে মনে করেন। আসলে হকনি ভ্যান গঘের দ্বারা প্রভাবিত একজন শিল্পী বলেই মনে করা হয়। তার এরকম বেশ কিছু ছবি ওই প্রদর্শনীতে ছিল। ছবিগুলোর প্রতি দর্শকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। এছাড়া হকনি ‘দ্য ফোর সিজনস : উল্ডগেট উডস (স্প্রিং ২০১১, সামার ২০১০, অটামন্ ২০১০, উইন্টার ২০১০) শিরোনামে যে সিরিজ ছবি এঁকেছেন তাও ওই প্রকৃতিকেন্দ্রিক মন-ভালো-করা ছবি বলা যায়। এগুলো দর্শকদের মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছে বলে প্রদর্শনীর আয়োজকরা বলেছেন।

ট্রীজ ওল্ডগেট (১৯৯৮), ডেভিড হকনি

এই চিত্রকর্মগুলোর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এসব ছবিতে ধরা আছে বিভিন্ন ঋতুর নানান পরিবর্তনের রূপবৈচিত্র্য। ছবিগুলো তাই মানুষের মনে রেখাপাত করতে সক্ষম হয়েছে। ছবিগুলো মানুষের মনে ইতিবাচক অনুভবের জন্ম দিয়েছে।
২০২০ সালে ব্রিটেনে যখন বারবার লকডাউন দেয়া হচ্ছিল, তখন এই ধরনের ছবিই মানুষের মনে ইতিবাচক প্রভাব সঞ্চারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করা হয়। এরকমটাই লক্ষ করেছেন রয়্যাল একাডেমির কিউরেটর এডিথ ডেভেনি। তিনি দেখেছেন, হকনির প্রদর্শিত ছবিগুলো দেখতে একই মানুষ একবার নয় দুবার বা তিনবারও এসেছেন। একসময় হকনি ফ্রান্সের নরম্যান্ডিতে বাস করতেন। তিনি সেখানে থাকতে বসন্তকালের ছবি এঁকেছেন। সেই ছবি সেখানকার স্থানীয় বাসিন্দাদের খুবই অনুপ্রাণিত করতো। তারাই আসলে ভাগ্যবান যারা হকনির ছবিগুলো দেখেছেন। শিল্পবোদ্ধারা মনে করেন এই ধরনের ছবি মানুষের মনকে অনেকখানি বদলে দেয়। মনকে চাঙ্গা করে তোলে।
ছবি, বিশেষ করে প্রকৃতি নিয়ে আঁকা ছবি মানুষকে প্রবলভাবে প্রভাবিত করে। এসব ছবি নিয়ে যে প্রদর্শনী হয়, তা মানুষকে বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা জোগায়। এই ধরনের ছবি অতিমারির দিনে শিল্পীদের আরো আঁকা উচিত। সেই ছবি নিয়ে বিশ্বজুড়ে আয়োজন করা দরকার প্রদর্শনীর।
জীবন চক্রাকারে চলে। সেটা এমন : জীবনধারণ, বেঁচে থাকা তারপর আবার নতুন জীবন। এটাই জীবনচক্র বা জীবন।
শিল্পী হিসেবে ভ্যান গঘ ও হকনির জীবন সম্পর্কে এরকমই অভিজ্ঞান। তাঁদের পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা বেশ তীক্ষ্ণ। যেমন হকনি তার ছবিতে ঋতু পরিবর্তনকে বোঝানোর জন্যে ঘাসের রঙও বদলে ফেলেছেন। তার আঁকা চিত্রকর্মে চেরি বা নাসপতি গাছের রঙ বদলে যাওয়া, ছোট চারা থেকে গাছে পরিণত হওয়ার যে পালাবদল ঘটে, তাও তিনি ধরে রেখেছেন রঙ আর তুলিতে।
হকনির চিত্রকলায় অনুপ্রাণিত হয়ে ইংল্যান্ডের অনেকে এখন আইপ্যাডে ছবি আঁকা শুরু করেছেন। উত্তর ইংল্যান্ডের একজন গণিতবিদ এই নিয়ে একটা অ্যাপ তৈরি করেছেন, যা অনেকেই ব্যবহার করছেন। এই অ্যাপটির দ্বারা চমৎকার সব ছবি আঁকা সম্ভব হচ্ছে। শিল্পরসিকদের মতে, এরকম ছবি আঁকার মাধ্যমে মানুষ প্রকৃতিকে আরো ভালভাবে বুঝতে পারছে। অনুভব করতে শিখছে জীবনের ইতিবাচক দিকগুলোকে।

ভ্যান গঘের ল্যান্ডস্কেপ তো তুলনাহীন শিল্পকর্ম। বিশ্বখ্যাতি আছে এসব ছবির। কিন্তু এখনকার শিল্প-শিক্ষকরা হকনির আঁকা ছবিগুলোও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে উপলদ্ধি করার কথা বলছেন। প্রতিদিনই কিছু না কিছু পর্যবেক্ষণ করি আমরা। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে, যখন মানুষ প্রকৃতির মাঝে বিচরণ করে কেবল তখনই প্রকৃতিকে সে ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারে। শিল্পীদের এই উপলব্ধিটাই দরকার।

শুধু শিল্পী নন, দর্শকদেরও এই ধরনের ছবি দেখে মন ভালো হয়ে যায়। কোনো মানুষ যদি প্রকৃতির কোনো ছবি দেখে বা প্রকৃতির মধ্যে ১৫ থেকে ২০ মিনিট হাঁটে, তাহলে তার শরীরের কর্টিসল হরমোন উল্লেখভাবে কমে যায়, যা মানুষকে উদ্দীপ্ত করার জন্যে যথেষ্ঠ।

শিল্পসমালোচক এমা মিশেল এ প্রসঙ্গে প্রকৃতিকে কীভাবে গভীরভাবে উপলব্ধ করে তা নিজের কাজের মাঝে ফুটিয়ে তুলতে হবে, তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বছরের পর বছর এই ধরনের ছবি দেখছেন, ছবিগুলো নিয়ে কাজ করছেন। বোঝার চেষ্টা করছেন এইসব ছবির মর্মার্থ। তাঁর কথা হচ্ছে, এই কাজগুলো মানুষের মনস্তাত্ত্বিক বিকাশে সহায়তা করে। এই ধরনের ছবি মানুষের মনের জড়তাকে দূর করে। বিবিসিকে দেয়া একটা সাক্ষাৎকারে এমা মিশেল বলেছেন, শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানীর দৃষ্টি নিয়ে এই ধরনের ছবির জন্য কাজ করতে হবে। আর সেজন্যে তাদের প্রতিদিন কমপক্ষে ১০ মিনিট গাছপালার মাঝে হাঁটতে হবে। এটা একজন শিল্পীকে প্রকৃতিকে বুঝতে সহায়তা করবে। তাঁর মনকে তৈরি করে দেবে। সে বুঝতে পারবে, প্রকৃতির বিষয়টি কত গভীর। কী ধরনের ছবি তাহলে তাকে আঁকতে হবে।
শুধু শিল্পী নন, দর্শকদেরও এই ধরনের ছবি দেখে মন ভালো হয়ে যায়। কোনো মানুষ যদি প্রকৃতির কোনো ছবি দেখে বা প্রকৃতির মধ্যে ১৫ থেকে ২০ মিনিট হাঁটে, তাহলে তার শরীরের কর্টিসল হরমোন উল্লেখভাবে কমে যায়, যা মানুষকে উদ্দীপ্ত করার জন্যে যথেষ্ঠ। গাছপালা বা প্রাকৃতিক পরিবেশ ও সবুজের সমারোহ মানব মস্কিষ্কে ইতিবাচক সাড়া জাগায়।
মিশেলের কথাই বলি। তিনি বলেছেন, তিনি যখন হাঁটতে বের হন তখন নানারকম প্রাকৃতিক বস্তু সংগ্রহ করে সঙ্গে নিয়ে আসেন। পরে এগুলো তিনি তার সংগ্রহের বইতে সংরক্ষণ করেন। কখনো কখনো সেসবের ছবি তিনি টুইটার ও ইনস্টাগ্রামে তার অনুসারীদের জন্য পোস্ট করেন। অনুসারীরা এগুলো খুব উপভোগ করেন। মিশেল লক্ষ করেছেন, এর মাধ্যমে তাদের মাঝে ইতিবাচক মনোভাবের সৃষ্টি হয়। আইপ্যাডের তোলা ছবি কিন্তু বাস্তবের বস্তুরগুলোর রঙের মতো হয় না। প্রকৃত রংটা ঠিকমতো আসে না। তবু এই ছবিগুলোর প্রাকৃতিক আবেদন মানুষের মনকে প্রভাবিত করে।
কিন্তু এমা যেমনটা করেন, আমরা কি তেমনটা করি? বিষয়টা কিন্তু খুব সহজ আর সহজে করাও যায়। প্রকৃতিতে ঘুরে বেড়ানোর সময় সেখান থেকে আমরা একটি পাতা বা ফুল কুঁড়িয়ে ছবি তুলে রাখতে পারি। এভাবেই একদিন আমাদের মনে, অর্থাৎ মানবমনে প্রকৃতি হয়তো দারুণভাবে সঞ্চারিত হবে। আর এরই প্রভাবে একসময় মানসিক স্বাস্থ্যেরও চমৎকার বিকাশ ঘটবে। আসলে প্রকৃতিই দিতে পারে সুস্থিতি ও সুস্থতা। সেটা আমরা পেতে পারি হয় শিল্পীদের চিত্রকর্মে অথবা নিয়মিত প্রকৃতির মধ্যে পরিভ্রমণের সূত্রে।
তাহলে আসুন, যদি সুযোগ মেলে এইধরনের ছবি আমরা দেখি। প্রকৃতির মাঝে পরিভ্রমণের সুবাদে নিজেদের উজ্জীবিত করি।