ফিউরি খোন্দকারের স্মরণে দুটি লেখা >> সুকান্ত চট্টোপাধ্যায়ের ‘ফিউরি খোন্দকারের গল্পপাঠের ভূমিকা’ এবং ফিউরি খোন্দকারের ছোটগল্প ‘নিখোঁজ’

0
309

ফিউরি খোন্দকারের স্মরণে দুটি লেখা

সম্পাদকীয় নোট : সত্তর দশকের অন্যতম শক্তিমান গল্পকার ফিউরি খোন্দকার গত ১৫ই মে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর গল্প লেখার শুরু ১৯৭৩ সালে। এরপর প্রায় একদশক ধরে লেখালেখি করেছেন। কিন্তু সাংবাদিকতার পেশায় প্রবেশের পর তিনি গল্প লেখা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন। তবে গত কিছুদিন থেকে আবার তিনি লেখালেখিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। সাম্প্রতিক সময়ে তাই তাঁর গল্প প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু শুরু থেকে গল্পরচনায় একেবারেই নিয়মিত ছিলেন না। আত্মপ্রচারেও কখনো তাঁকে এগিয়ে আসতে দেখা যায়নি। শিল্পসাহিত্যের অনুষ্ঠানেও যেতেন না। ফলে, সবসময়ই তিনি আড়ালেই থেকে গেছেন। জাতীয় প্রেসক্লাব আর সাংবাদিকতার পেশাগত পরিমণ্ডলেই বিচরণ ছিল তাঁর। ব্যক্তিগতভাবে আমার সঙ্গে ফিউরি খোন্দকারের পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা হয় ১৯৭৩ সালে, যখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ছাত্র। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে যে শরীফ মিয়ার ক্যান্টিনে লেখকেরা আড্ডা দিতেন, সেখানে নিয়মিত দেখেছি তাঁকে। আবুল হাসানসহ অনেকেরই ঘনিষ্ঠ ছিলেন তিনি। তাঁর সলিমুল্লাহ হলের রুমটাতে আবুল হাসান দীর্ঘদিন অতিথি হিসেবে থেকেছেন। ঘনিষ্ঠতা ছিল সমসাময়িক কথাসাহিত্যিক – তখন ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্র সুকান্ত চট্টোপাধ্যায় ও সহপাঠী গল্পকার সৈয়দ মনোয়ার হোসেনের সঙ্গে। আসলে সেই সময়টা ছিল অন্যরকম একটা সময়। কিছুদিন আগে ফিউরি খোন্দকার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ প্রকাশ করবার। সেই সূত্রে এর ভূমিকা লেখার জন্যে অনুরোধ করেছিলেন বন্ধু সুকান্ত চট্টোপাধ্যায়কে (এখন কলকাতা নিবাসী)। সুকান্ত চট্টোপাধ্যায় সেই ভূমিকাটা লিখে তাঁকে পাঠিয়েছিলেন, যা প্রকাশের অপেক্ষায় ছিল। কিন্তু তার আগেই চলে গেলেন এই প্রচারবিমুখ নিভৃতচারী স্বল্পভাষী গল্পকার-সাংবাদিক ফিউরি খোন্দকার। ‘তীরন্দাজ’ তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করছে। আমরা তাঁর স্মরণে সুকান্ত চট্টোপাধ্যায়ের ভূমিকাটি এখানে প্রকাশ করছি। সেই সঙ্গে প্রকাশ করছি ‘নিখোঁজ’ শীর্ষক তাঁর লেখা একটা ছোটগল্প। এটি সম্ভবত ফিউরি খোন্দকারের প্রকাশিত দ্বিতীয় গল্প। গল্পটি আমরা পেয়েছি সুকান্ত চট্টোপাধ্যায়ের সৌজন্যে। তাঁকে এটি পাঠিয়েছিলেন ফিউরি খোন্দকার নিজেই। সঙ্গে ছিল ছোট্ট একটা নোট। আমরা সেই নোটসহই গল্পটি প্রকাশ করলাম।

সুকান্ত চট্টোপাধ্যায় >> ফিউরি খোন্দকারের গল্পপাঠের ভূমিকা

স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২-৭৩ সালে ফিউরি খোন্দকারের রচনার সঙ্গে আমাদের প্রথম পরিচয় হয়েছিল । যতদূর মনে পড়ছে ফিউরি তার অনেক আগে থেকে, সম্ভবত স্কুলজীবন থেকেই গল্প লেখার প্রস্তুতি শুরু করেছিলেন। শুনেছি দৈনিক পত্রিকার ছোটদের পাতায় তাঁর লেখলেখির হাতেখড়ি। ১৯৭১-এর পর সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে যে কজন নবীন লেখক সকল শ্রেণির পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পেরেছিলেন ফিউরি তাঁদের অন্যতম। তখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, থাকেন সম্ভবত এস এম হলে, দুপুরে শরিফমিয়ার ক্যান্টিনে সেকালের লেখক-কবিদের বিখ্যাত আড্ডায় দেখা মেলে ফিউরির। ঢাকার তখনকার প্রধান সাপ্তাহিক পত্রিকা বিচিত্রা-সহ প্রায় সব দৈনিক পত্রিকার রবিবারের সাহিত্যপাতায় সেই সময় নিয়মিত প্রকাশিত হয়ে চলেছে তাঁর গল্প। মনে পড়ে, একটু লাজুক স্বভাবের প্রচারবিমুখ ফিউরি খুব অল্প সময়ের মধ্যেই লেখক-সম্পাদক-পাঠকদের আলোচনায় উঠে এসেছিলেন।

খুব দীর্ঘ গল্প লিখতেন না ফিউরি, সত্যি বলতে কী, আকারেও ছোটগল্পই লিখতেন বেশি । সম্ভবত আজ পর্যন্ত তিনি কোনও উপন্যাস লেখেননি। একটি গল্পকে গল্প করে তোলবার জন্যে যতটুকু দরকার তার বেশি একটিও শব্দ পাওয়া যাবে না তাঁর রচনায়। এই শব্দ-সংযম ফিউরির গল্পের একটি দিক মাত্র, এ তাঁর রচনার একমাত্র বৈশিষ্ট্য নয়। বাংলাদেশের মূলধারার গল্প-উপন্যাস দুএকটি ব্যতিক্রম বাদ দিলে চল্লিশের দশক থেকেই প্রধানত শহুরে প্রান্তিক জীবন এবং গ্রামীণ জীবনের সুখদুঃখকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে। ফিউরি কিন্তু বিষয় হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন প্রধানত ঢাকা শহরে গড়ে ওঠা মধ্যবিত্ত নাগরিক জীবনের চারদিক। প্রেমের গল্পই তিনি লিখেছেন বেশি, তবে সেসব গল্পে অনেক সময় প্রেমকে ছাপিয়ে উঠেছে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে মধ্যবিত্ত জীবনের সংকট, মানবমানবীর সম্পর্কের গভীর গোপন ছায়াময় তন্তুজাল। আর এই বিষয় নিয়ে লিখতে গিয়ে তিনি খুব অল্প বয়সেই আয়ত্ত করতে পেরেছিলেন নাগরিক জীবনের আখ্যান নির্মাণের উপযোগী চমৎকার এক ভাষা। আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকা এই সম্পূর্ণ নতুন ভাষা ও বিষয়ের নির্মাণশৈলীকেই ফিউরির গল্পের প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে।

প্রথম দিকে নিয়মিত লিখলেও, ফিউরির গল্পের সংখ্যা কিন্তু খুব বেশি নয় । কোনও এক অজ্ঞাত কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করে সাংবাদিকতার পেশায় প্রবেশ করার পর অনেক দিন তিনি লেখলেখির জগত থেকে দূরে থেকেছেন। সম্প্রতি তাঁর একটি-দুটি করে গল্প প্রকাশিত হতে দেখে মনে হচ্ছে দীর্ঘ বিরতির পর তিনি আবার প্রবলভাবে ফিরে আসছেন লেখালেখির জগতে। এই পরিণত বয়সে জীবনের নানা ঘাতপ্রতিঘাত এবং অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ তাঁর গল্পের ভাষা হয়েছে আরও সংহত, বিষয় আরও গভীর ব্যঞ্জনাময়।

প্রথম গল্প সংকলন উতল মেঘের কাল-এর জন্যে ফিউরিকে অভিনন্দন। তাঁর কাছে বাঙালি পাঠকের প্রত্যাশা শেষ হবার নয়।

ফিউরি খোন্দকার ছোটগল্প >> নিখোঁজ (নোটসহ)

কবি আহসান হাবীব সম্পাদিত দৈনিক বাংলার ‘রোববারের সাহিত্য’ পাতায় আমার প্রথম লেখা মুদ্রিত হয়েছিল ১৯৭৩ সনের দিকে। গল্পের নাম ‘যেখান থেকে শুরু’।
সেই সময়েই ‘নিখোঁজ’ গল্পটি ছাপা হয় দৈনিক বাংলায়। পত্রিকার পাতায় বাংলা সনের তারিখ লেখা আছে–মাঘ, ১৩৮০ (খ্রিস্টীয় ১৯৭৩ সাল)।

বলা হয়ে থাকে, কবি আহসান হাবীব ও সাহিত্য সম্পাদক আবুল হাসনাতের হাত দিয়ে যাদের লেখা ছাপা হয়, সেসব লেখকদের আর পেছন ফিরে তাকানোর দরকার পরেনা।

নিখোঁজ (ছোটগল্প)

কাল সারারাত বৃষ্টি হয়েছে। গতকাল পুরোটা দিন আকাশ মেঘলা ছিল। মাঝেমধ্যে ঠান্ডা বাতাস বইছিল। সূর্যের মুখ মাঝে মাঝে দেখা গেলেও বাতাসে শীতের যে তীব্রতা ছিল – সূর্যের সেখানে লজ্জা পাবার কথা। তাই শীত হঠাৎ বেড়ে গেছে এমন মনে হয়েছিল। প্রচুর বর্ষণ রাস্তা-ঘাট, ঘর-দালান সব যেন পরিচ্ছন্ন করে দিল। সকালের রোদে গাছের পাতা ঝিলমিল করছে। অপ্রশস্ত রাস্তা তকতকে ঝকঝকে। হু হু ঠান্ডা বাতাসে কিরকম একটা পবিত্রতা ফিরে এসেছে। সব কিছুই কেমন পবিত্র মনে হচ্ছে। যেন হলুদ দালানের লোনাধরা দেয়ালে কোন গ্লানি নেই!

আজকে সন্ধ্যাবেলা গুলিস্তানের কাছে চোলাইয়ের দোকানের আড্ডায় যারা ভিড় করবে – সেই খোঁচা খোঁচা দাঁড়িঅলা কতিপয় মুখ – অমল, ইলু, কায়েস – ওদের খুব উৎফুল্ল দেখাবে। যেন গত যুদ্ধে অমলের মা-বাবা মারা যায়নি। ওর নিখোঁজ বোনের সন্ধান সে পেয়েছে। ইলুর চাকরিটা হয়ে গেছে। আর ঝুমুর সাথে কায়েসের বিরোধ মিটে গেছে যেন।

অমলের মনে পাহাড় সমান কষ্ট। ওদের বাড়িতে এক পিসি আছে, অমল তার কাছেই থাকে। এখন আর বিশ্ববিদ্যালয়ে যায় না। তেমন কোন কাজকর্মও করেনা। মাঝেমধ্যে চোলাইয়ের দোকানে এসে আড্ডা দেয়। সে দিন দিন খারাপ হয়ে যাচ্ছে। কখনো পলাশ, ইলু – ওরাও আসে ওকে সঙ্গ দিতে। তাদের মনেও কষ্ট।

এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে কারা যেন খবরটা দিয়েছিল মিলিটারি ঢাকা থেকে টাঙ্গাইল আসবে। তারপর এক ভয়ানক ভোরে হানাদার বাহিনীর একটা বিশাল কনভয় গাজীপুর থেকে টাঙ্গাইল রওয়ানা দেয়। পথে মির্জাপুরের পরে কদিম ধল্লা গ্রামে তারা বাধার সম্মুখীন হয়। সেখানে সড়ক ঘেঁষে ট্রেঞ্চ খনন করে অবস্থান নিয়েছিল কিছু মুক্তিকামী মানুষ। তাদের মধ্যে কয়েকজন ছিল নিরাপত্তা বাহিনীর সাবেক সদস্য। তারা বন্দুক-রাইফেল এসব চালাতে জানে।

আগের দিন সন্ধ্যায় তারা বিভিন্ন জায়গা থেকে হালকা অস্ত্রসহ নিয়ে পলাশদের গ্রামে এসে হাজির হয়। এবং জানায় তারা পাকিস্তানি হানাদারদের প্রতিহত করতে চায়। গ্রামের তরুণ-যুবারা এতে খুব খুশি। তারা উদ্দীপ্ত হয়ে তাদেরকে নিয়ে এসে পলাশদের বাড়িতে জড় হয়। সিদ্ধান্ত হয় – আগন্তুকরা সড়কের দুইপাশে ট্রেঞ্চ খনন করে সেখানে অস্ত্র নিয়ে অপেক্ষা করবে।

তারপর সড়কের দুইপাশে বেশ কয়েকটা গভীর ট্রেঞ্চ খোঁড়া হয়। সন্ধ্যাবেলায় মাটি আর ঘাসের ভেজা গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। ট্রেঞ্চ থেকে ঢাকামুখী সড়কের দিকে মাটি উঁচু করে রাইফেল স্থাপনের ব্যবস্থা করা হলো। পলাশ আগ্নেয়াস্ত্র চালাতে জানে না। সে অন্যান্যদের মতো মহোৎসবে এই কাজে অংশগ্রহণ করে। তখন সেই অদম্য উৎসাহে তারা সকলেই বেমালুম ভুলে গেল এটা ভাবতে যে শত্রুরা কি একটা-দুটো সামরিক যানে আসবে নাকি গাড়ির বহর থাকবে! তাদের সাথে কি ধরণের অস্ত্রশস্ত্র থাকবে সেটাও তাদের ভাবনা এড়িয়ে গেল!

খুব ভোরবেলা অবিরাম গোলাগুলিতে গাছের পাতা ছিন্নভিন্ন হতে থাকলো। পাখিরা আর্তচিৎকার করে এলোমেলো ছুটে পালালো। ঘটনার আকস্মিকতায় পলাশরা সবাই ভীষণ ভয় পেয়ে যায়। হতবিহ্বল সবাই বাবার নির্দেশে নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে মাথা নীচু করে গ্রামের বড় পুকুরের ঢালুতে নেমে আশ্রয় নেয়। সেসময় মাথার ওপর দিয়ে অসংখ্য গুলি অনুচ্চ চিঁইই-চুঁউউ শব্দে ধাবিত হচ্ছে। হানাদাররা সড়কের দুপাশের বাড়িঘরগুলোতে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায় এবং আগুন ধরিয়ে দেয়। পলাশদের ভাগ্য ভাল তারা গ্রামের ভিতরে ঢোকে নাই!

একসময় মিলিটারিরা এখান থেকে সরে গিয়ে টাঙ্গাইলের দিকে অগ্রসর হয়। তখন পলাশরা ঢাকা থেকে আসা তার খালাম্মার পরিবারসহ এবং গ্রামের অন্যান্য লোকজন প্রায় সবাই প্রাণভয়ে বাড়ি ছেড়ে পালায়। শস্য ক্ষেতের আইল ধরে অপ্রচলিত ও অপরিচিত পথে ভেতরের দিকে অনেক দূরের এক গ্রামে চলে যায়।

বিকেলের দিকে পলাশরা সাইকেল নিয়ে তাদের গ্রামে এসে দেখতে পায় সেই মুক্তিযোদ্ধারা কেউ বেঁচে নাই। ট্রেঞ্চের মধ্যেই তাদের দেহগুলি এলোমেলো অবস্থায় বীভৎস ভঙ্গিতে লুটিয়ে আছে। এ দৃশ্য বেশিক্ষণ দেখা যায় না! পলাশের মনে হলো তারা সকলে মিলেই এদের এই ধরনের কবরের ব্যবস্থা করেছে! কষ্ট আর হতাশায় সে মিইয়ে যায়।

একইরকম ঘটনার আলামত চোখে পড়ল দুই মাইল দূরের সাঁটিয়াচুড়া গ্রামেও। হানাদাররা সড়ক থেকে একটু দূরে একটা পরিত্যক্ত বাড়িতে খননকৃত ট্রেঞ্চগুলো বুলেটে ঝাঁঝরা করে দুপাশের গ্রামগুলো জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিয়ে ব্যাপক নৃশংসতা চালিয়েছে।

পলাশরা যে বাড়িতে উঠেছিল সেটা ছিল বহু দূরসম্পর্কের এক আত্মীয়ের বাড়ি। বাড়ি বলতে মাঝারি আকারের দুটো টিনের ঘর। তার একটাতে তারা উঠেছে। তারা সব মিলিয়ে উনিশজন মানুষ। খাবারদাবারের সমস্যা প্রকট না হলেও শোবার সময় ভারি অসুবিধা হয়। নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ সবাই এক ঘরে। কেউ বিছানায়, কেউ মেঝেতে।

একদিন দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পর গরমে সবাই হাঁসফাঁস করছে। এর মধ্যে পলাশের তন্দ্রার মতো এসে গিয়েছিল। হঠাৎ শরীরে ঠান্ডা বাতাস অনুভব করতেই পাশ ফিরে তাকিয়ে দেখে হেনা – তার খালাতো বোন। সে খুব কাছেই বসে আছে একটা হাতপাখা নিয়ে। তার শরীরে দামী সেন্ট-শ্যাম্পুর সৌরভ। এই টিনের ঘরে এপ্রিলের প্রচণ্ড গরমে ঠান্ডা হওয়ার জন্য বাতাস করছে সে! চোখে চোখ পড়তেই লজ্জায় তার মুখের কালো রঙটা বেগুনি হয়ে ওঠে।

সেদিন সন্ধ্যার পর পুকুর ছুঁয়ে যে বাতাসটা আসছিল সেটা ছিল বেশ আরামদায়ক। পুকুরের দুইপাশে অজস্র ঝোপঝাড়, জঙ্গল। সেখানে জোনাকি পোকারা জ্বলছে আর নিভছে। কাছে কোথাও হাস্নাহেনার গাছ আছে। বাতাস সেই ঘ্রাণ উড়িয়ে নিয়ে যায়। তারপরও অস্পষ্টভাবে যেটুকু নাকে এসে লাগে, তাতেই অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে পলাশ। দুপুরের ঘটনাটা সে কিছুতেই সরাতে পারছে না মন থেকে।

ভবিষ্যত নিয়ে তীব্র অনিশ্চয়তার মধ্যে মানুষ ভেদাভেদ ভুলে যায়। তার পাশের মানুষটির জন্য তখন সহমর্মিতা তৈরি হয়। এখন স্বাভাবিক জীবন ধারণ নিয়ে প্রবল সংশয়, দুর্ভোগ আর হতাশার সৃষ্টি হয়েছে। এসবের মধ্যেও তার মনে হলো – জীবন এত মোহনীয়, সুন্দর! কিছুক্ষণ পর প্রকাণ্ড একটা চাঁদ দূরের গ্রামের অন্ধকারাচ্ছন্ন গাছপালার মাথার ওপর উঁকি দেবে আশা করা যায়।

পলাশ তার ছোট ফুপুর রেডিওটা নিয়ে একা একা পুকুরপাড়ে এসে বসেছিল যুদ্ধের খবরাখবর শুনবে বলে। হেনারা সবাই উঠোনে গোল হয়ে বসে কথাবার্তা বলছে। এখান থেকে তাদের ভাল মত দেখা যায় না। পলাশ হেনার জন্য তার নিজের বুকের তলায় গভীর একটা টান অনুভব করে। বাড়িভর্তি মানুষজন। হেনাকে একা পাওয়া যায় না। এরমধ্যেই একবার বাড়ির ভিতরে গিয়েছিল সে। তখন একটা আধা সুযোগ তৈরি হয়েছিল। সে তারই পূর্ণ সদ্ব্যবহার করলো। পলাশ তখন তার সবচেয়ে গভীর গোপন, দামী আর সত্য কথাটা হেনাকে বলে ফেলে। হেনা মাথা নীচু করে হাতের আঙুলে ওড়নার পাড় পেঁচানো শুরু করে। মুখে কিছুই বলেনি।

সীমাহীন ক্ষয়ক্ষতি আর ত্যাগ স্বীকারের পর যুদ্ধ থামলো। হিরণ্ময় স্বাধীনতা এলো। যুদ্ধবিধ্বস্ত নতুন দেশ। স্বাধীনতার পর পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে যেতে লাগল।
পলাশের বাবার ছাপাখানার ব্যবসা লাটে উঠলো। একটা মাত্র হাতে চালানো ট্রেডল মেশিন দিয়ে তাদের আয়-রোজগার কোনমতে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছিল। সেটাও এখন থেমে যাওয়ার পথে। নয় মাসে এটাকে শুধু উপড়ে নিয়ে যেতে পারেনি স্থানীয় অবাঙালিরা। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত করে দিয়ে গেছে। ছোট ছোট স্কুল-কলেজ পড়ুয়া ছেলেমেয়ে নিয়ে তিনি খাবি খেতে লাগলেন।

পলাশ সবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। ক্লাস শেষে বাসায় এসে সে আর সময়ের অপচয় করতে চাইতোনা। ঋষিকেশ দাশ রোড থেকে হেঁটে হেঁটে নারিন্দা হয়ে টিপু সুলতান রোড দিয়ে ওয়ারী পৌঁছে যেতো। যতই সে তার খালাম্মাদের বাসার কাছাকাছি হতে থাকতো ততই তার হৃৎপিণ্ডের ধুকপুকানি বেড়ে যেতো। আর বুকের ভেতর ঝড় হচ্ছে টের পেতো সে। গভীর সঙ্কোচ নিয়ে পলাশ হেনাদের দোতলা বাড়ির বারান্দার দিকে তাকাতো। তার গায়ের জামাকাপড় দামী নয়। তবে পরিস্কার। আর মনে মনে সে চাইতো হেনা যেন তার হেঁটে হেঁটে তাদের বাসায় আসার ব্যাপারটা না দেখে ফেলে! দেখলে কি ভাববে হেনা! সে তাদের মতো বড়লোক নয়। নিজের অর্থনৈতিক দারিদ্র্যকে খুব ভয় তার। হেনার কাছে কিছুতেই ছোট হওয়া যাবে না।

বিকেল বেলাটাই খুব আনন্দের ছিল। তখন হেনাদের বাসায় বলতে গেলে কেউ থাকতো না। হেনার বাবা, ভাই এনাম, নীলু – কেউ না। ওর বাবা অফিসে, ভাই এনাম বায়তুল মোকাররম আর নবাবপুরের দোকান সামলাতে ব্যস্ত। সে লেখাপড়া একপ্রকার ছেড়েই দিয়েছে। লেখাপড়া করে কি হয়? সেইতো টাকা রোজগার। লেখাপড়া না করে যদি বেশি টাকা আয় করা যায়, তাহলে পড়াশোনা করার দরকার কি! এনাম এরচেয়ে বেশি কিছু বুঝতে চায় না। আর ছোটবোন নীলু তখন থাকত তার বান্ধবীর বাসায়। শুধু খালাম্মা থাকতেন। ঘরটা কিরকম ছায়া ছায়া। বাইরে রোদের তেজ কম। এ সময়টাতে সবাই বেড়াতে যায়।

পলাশ হেনাকে বলতো – ‘ক্যারমের গুটি নিয়ে আসো’।
হেনা হতাশভাবে জানালার দিকে তাকিয়ে থাকতো। তার কি এখন বাইরে বেরুতে ইচ্ছা করছে? পলাশ জানে না। বাইরে সে কোথায় যাবে? সে নীলুর মতো ছোট নেই। স্কুলের উপরের ক্লাসের ছাত্রী। কিছুক্ষণ আগেই স্কুল থেকে ফিরেছে। পলাশের সাথে তো এই বয়সে একা কোথাও যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। তার মা-বাবা, ভাই – এরকম ঘটনা কল্পনাও করতে পারেন না।

হেনা কিছুটা ক্ষুণ্ণ হয়েই যেন বসতো পলাশের মুখোমুখি। খালাম্মা দূরে খাটে বসে তাদের খেলা দেখতেন। হেনা কথা বলে খুব কম। সে দেখতে কালো। এটা নিয়ে এনাম ঠাট্টা করে বলে – তোকে অন্ধকারে দেখা যায় না। পলাশ বুঝতে পারে এটা একটা বিশাল আঘাতের মতো হেনার বুকে গিয়ে লাগে। ওকে দুমড়েমুচড়ে দেয়। কিন্তু তাকেই পলাশের কাছে এই ভুবনের সর্বশ্রেষ্ঠ রূপবতী মনে হয়।

হেনার চোখে-মুখে শেষ বিকেলের অদ্ভুত একরকমের ছায়া লেগে আছে। পলাশ শুধু তাকিয়ে থাকতো। হেনা একসময় কি মনে করে ক্যারামের সাজানো গুটি লণ্ডভণ্ড করে দিয়ে খেলা ছেড়ে উঠে যায়। পলাশের তখন খুব কষ্ট হয়। যেন তার সময়ে অসময়ে এই খেলা, নীল প্যাডের কাগজে লেখা চিঠি অথবা তার যেকোনো ধরণের দৌরাত্ম্য সহ্য করার জন্যই হেনার জন্ম। ছোটখাটো একটা শরীর, কোঁকড়ানো চুল, গভীর আয়ত চোখ, শ্যামল রঙ – এই রকমের একটি মেয়ে যার নাম হেনা – সে পলাশের সমস্ত মনোযোগ আর অধ্যবসায়ের কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে আছে।

ক্লাসের বইগুলো টেবিলের একপাশে সরিয়ে রেখে পলাশ দুই হাতের তালুতে মাথা গুঁজে গভীর একটা ভাবনায় তলিয়ে যায়। সেইসব ভাবনার শরীর মস্ত বড় ছিলনা – ছোটখাটো, একচিলতে। কোঁকড়ানো চুল ছিল, শ্যামল রঙ – এইসব।

আসলে যে সময়টাতে অমল ফুটবলের মাঠে তুখোড় একটা কিক মেরে গোল করে বসতো, কায়েস সুমুকে নিয়ে স্যাঁতসেঁতে গলি থেকে বেরিয়ে ইভিনিং শোতে সিনেমা দেখতে যেতো আর ইলু বই নিয়ে বসতো – পলাশ তখন হেনাদের বাসায়। বন্ধুদের ওই সমস্ত কাজ তার জন্য উৎসাহব্যঞ্জক ছিল না, আনন্দের ছিল না। তাই হেনার সহজ প্রত্যাখ্যান তাকে নিদারুণ কষ্টের দিকে ঠেলে দিল। যদিও সে জানে মানুষের চাওয়ার সঠিক কোন প্রাপ্তি নেই, তবুও কেন যেন মনে হতো, হেনা ইচ্ছা করলেই তাকে এই সমস্ত জিনিস দিতে পারে, যা আর কেউ পারে না। আসলে অই বয়সেই সে তুখোড় একজন প্রেমিক হয়ে উঠেছিল। কিন্তু হেনা তার এই সমস্ত ভালবাসার কোন খোঁজখবরই রাখতো না।

পলাশ বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায়। চারপাশ থেকে অগোছালো বাতাস তার শার্টের ভিতরে ঢুকে যায়, বুকের কাছ দিয়ে নীচে নামে আর তার শরীর তখন যেন গাছের ডালপালার মতো মড়মড় করে ভেঙে যায়। হেনার নিষ্ঠুরতা তাকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। সে ক্রমশ অবলম্বনহীন হয়ে পড়ছে। এর জন্য হেনাকে কিছু বলার ছিল না। এসব কি বলা যায়?

খালাম্মা ডাইনিং রুম থেকে পলাশকে ডাকলেন বিকেলের নাশতা খাওয়ার জন্য। টেবিলের ওপর হরেক রকমের খাবার, ফলমূল। পলাশ খেতে চাইতো না। তার লজ্জা করতো। তাদের বাসায় বিকেলের নাশতা খাওয়ার প্রচলন নেই। সে প্রায়ান্ধকার বারান্দায় দাঁড়িয়ে হেনার পক্ষে-বিপক্ষে নানাবিধ অভিযোগ দাঁড় করিয়ে একধরনের যন্ত্রণায় ছটফট করে। তার চোখে আদ্রর্তা টের পায়। সে তখন কাউকে কিছু না জানিয়েই সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে পড়ে – আর কোনদিন আসবো না।

তারপর থেকে তার মাথাধরা অসুখ শুরু হলো। রাতে ঘুম হতো না। চোয়াল ভেঙে যেতে লাগল। চোখ গর্তের ভিতরে। এরমধ্যেই পলাশ খুব নিষ্ঠুর প্রকৃতির হয়ে উঠলো। কোন যুক্তিযুক্ত কারণ ছাড়াই সময়ে অসময়ে মাথা গরম করে ফেলে। মেজাজ খিটমিটে হয়ে যায়। সে প্রতিজ্ঞা করলো আর কোনদিন হেনাদের বাসায় যাবে না। হেনার সঙ্গে যেন তার আর কোনদিন দেখা না হয়।

উয়ারী বহুদিন যাওয়া হয় নাই পলাশের। মনেও নেই কতদিন। প্রথম প্রথম মনে থাকতো। সে হিসেব করতো একদিন, দুইদিন, এক সপ্তাহ, দুই সপ্তাহ, মাস। যেন তার জীবনের সমস্ত হিসাব-নিকাশ ওখানেই ঘুরপাক খায়।

ক্রমে হেনার পরিবর্তে দুপুর বেলায় খোলা বিস্তৃত মাঠ, সন্ধ্যাবেলায় গুলিস্তান-গেন্ডারিয়া রেললাইনের ব্রীজ, ব্রীজের একপাশে জলাশয়, কচুরিপানা, রাতের বেলা রেস্টুরেন্টের বাজে আড্ডা, চা – এসবের সাথে দেখা হতে লাগলো পলাশের। একদিন সে অনুভব করলো তার বুকের ভেতর দারুণ ক্রোধ জমা হয়ে আছে। এই কথাটা সে অমল, ইলু, কায়েস কাউকেই বলতো না। তারা তার ছোটবেলার বন্ধু। পুরনো ঢাকার এক মহল্লাতেই বড় হয়েছে, তার সবকিছুই ওরা জানে। কিন্তু ওদের কাউকেই পলাশ তার এই ভয়ানক অভিমানের কথা জানাতো না। এক বোতল চোলাই গিলে তার চোখ-মুখ-মাথা যখন শাঁ শাঁ করতো, সে আরো খেতে চাইতো – অমলরা না করতো। পলাশ তখন ওদের ওপর রেগে যেতো। পলাশের মনে হতো তার মতো কষ্ট অমল, ইলু, কায়েস – ওদের নেই।

রোদ চারপাশে ছড়ানো – সবকিছু কেমন উজ্জ্বল দেখাচ্ছে। পলাশের ভেতরেও সম্ভবত এরকম উজ্জ্বলতা ছড়িয়ে পড়েছে। বহুদিন পর আজ হেনার কথা বারবার মনে পড়ছে। একটা গভীর টান অনুভব করে সে। এই ক’বছরে তার প্রচুর সুখ-দুঃখের অভিজ্ঞতা হয়েছে। এখন সবকিছুই কেমন মুক্ত নির্ভার পরিচ্ছন্ন। যেন এই শহরের রাস্তাঘাটে কোনদিন কোন আবর্জনা ছিল না। ক্লেদ, গ্লানি – সবকিছুই অতিক্রম করতে শিখিয়ে দিয়েছে গতরাতের বৃষ্টি।

বিকেল বেলা অবাক হয়ে পলাশ দেখলো – সে খোলা বিস্তৃত মাঠের মধ্যে নেই। কোন রেস্টুরেন্টে নেই। রেলব্রীজ, চোলাইয়ের আড্ডা এমনকি হেনাদের বাসা – কোথাও নেই!

শব্দ করে ট্রেন প্ল্যাটফর্ম ছাড়লো। এই ট্রেন তাকে বহু দূরে নিয়ে যাবে। যেখানে সে কোনদিন যায়নি। অমল, ইলু, কায়েস – ওরা তাকে এখানে-ওখানে খুঁজবে। কোথাও পাবে না। থানা, হাসপাতাল, হেনাদের বাসা কোনটাই হয়তো বাদ রাখবে না।

প্ল্যাটফর্মের দিকে তাকিয়ে দেখে তার প্রত্যাখ্যান দীর্ঘতর হচ্ছে। অমলদের জন্য খারাপ লাগলো–ওরা খুঁজে খুঁজে হয়রান হচ্ছে এই পবিত্র বিকেলে।

পলাশ নিজের দিকে তাকায় – প্রাণ খুলে হাসতে চায় – বহুদিন পর প্রতিশোধ নেওয়া গেল! নিজেকে কেন যেন খুব অচেনা লাগছে তার। ট্রেনের যাত্রী এই নিজেকে সে যেন চেনে না! পলাশ মরিয়া হয়ে ট্রেনের কম্পার্টমেন্টে তন্নতন্ন করে নিজেকে খুঁজতে থাকে। অমল, ইলু, কায়েস – ওদের মতো সর্বত্র খোঁজে – কোথাও পাওয়া গেল না।

Share Now শেয়ার করুন