ফিয়োদর দস্তয়েভস্কি >> ক্রিসমাস ট্রি আর একটি বিশেষ বিয়ের গল্প >> তর্জমা : আসিফ সৈকত

0
716

ক্রিসমাস ট্রি আর একটি বিশেষ বিয়ের গল্প

সেদিন আমি একটা বিয়ের অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। সেখানে হলো কি, মানে…।
ও আচ্ছা না। আমি আসলে এই গল্পটা বলতে চাচ্ছি না । ভালো হয় আমি ঐ দিনের, অনেক দিন আগের, ক্রিসমাস ট্রি আছে, এই রকম একটা গল্প নিয়ে আজকে কথা বলি। বিয়েতে সব ঠিকঠাকই ছিলো। আমার ভালোও লেগেছিলো। কিন্তু সেইদিনটা আরো অনেক ভালো ছিলো কিন্তু আমি জানিনা কেনো এটা হলো, বিয়ের অনুষ্ঠানে আসার পর থেকে আমার শুধু ক্রিসমাস ট্রিটের কথাই মনে পড়ে যাচ্ছিল। সেই দিনটার কথা।
জানিনা কি বিশেষ কারণে!
ব্যপারটা আসলে কি ঘটেছিলো বলছি সবাইকে।
ঠিক এক বছর আগে, নিউ ইয়ারের উৎসবে, বাচ্চাদের একটা পার্টিতে আমাকে নিমন্ত্রণ করা হলো। যিনি আমাকে নিমন্ত্রণ করেছিলেন তিনি একজন নামকরা ব্যবসায়ী, প্রচুর ক্ষমতাবান, চারিদিকে সব বন্ধুবান্ধবের কানেকশন , প্রভাবশালী লোক, আমলা, নেতা , পুলিশ , আর্মি সবার সাথে তার ওঠাবসা আছে। অনুষ্ঠানে এরকম অনেকেই এসেছিলেন ,সেদিন। বাইরে গাড়ির মডেল আর পোশাক দেখে সেটা বুঝে নিতে অসুবিধা হয় না। যারা সেখানে উপস্থিত ছিলো সবাই খুব ভালো করেই জানে কখন কোন জায়গাটাতে থাকতে হবে, কার সাথে কতোটুকু হেসে কথা বলতে হবে, কার সাথে হাত মেলাতে হবে, কার সাথে কোন বিষয় নিয়ে আলাপ করতে হবে, তাতে কার কোন ধান্ধাবাজিটা আলোর মুখ দেখবে ইত্যাদি ইত্যাদি।
শুধু নামেই আসলে বাচ্চাদের ক্রিসমাস পার্টি, আসলে এটা হলো বাচ্চাদের কথা বলে সেটাকে কেন্দ্র করে , এই প্রভাবশালীদের নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের একটা সুযোগ। ধরেন, সাংবাদিক যদি বলেন, কি করছিলেন আপনি ওখানে, নিজেকে বাঁচানোর জন্য আপনি তখন বলবেন, ”আরে ওটা তো আসলে একটা বাচ্চাদের পার্টি ছিলো। আমাদের কি আপনাদের মতো সংসার নেই, বাচ্চাদেরও তো সময় দেয়া দরকার। আমাদের ব্যস্ততার জন্য তাদের শৈশব তো নষ্ট হতে পারে না।” এইরকম বুদ্ধিজীবীতে ঠাসা ছিলো হল ঘরটা।
পুলিশকে যদি বলে আপনি সেখানে অমুক ব্যবসায়ীর সাথে কি করছিলেন, উনি তো ঋণখেলাপি মামলায় আছেন, তখন পুলিশও বলতে পারবে , ভাই আমি তো জানতাম না, আমার বাচ্চা আর ঐলোকের বাচ্চা একই স্কুলে পড়ে, বাচ্চাদের পার্টিতে গিয়েছিলাম। উনার সাথে তো আমার কোনো কাজ নাই। বাচ্চার পার্টিতে গেলাম আর দেখা হয়ে গেলো। খোঁজ নিলেই জানা যাবে আসলে, পার্টিতে উনার সাথে দেখা করে একটা বিশেষ আলাপ শেষ করে সিদ্ধান্ত নেবার জন্যই উনি গিয়েছিলেন।
বাচ্চাদের পার্টির আড়ালে বড়োলোকদের একটু হালকা কথা বলার সুযোগ হিসাবেই এটা করা। কতোক্ষণ আর টাকা পয়সা, ব্যবসা , লাভ, পাওয়ার-পজিশনের আলাপ চালানো যায়, সবকিছুই তো একসময় একঘেয়ে লাগে। এই বাচ্চাদের পার্টি হলো সেটা কাটানোর একটা এক-নাম্বারির আড়ালে দুই-নাম্বারি চেষ্টা। আমার অতো পরিচিত কেউ ছিলো না। আমি আমার মতো আরাম করে সময় কাটাচ্ছিলাম। তাতে ভালোও লাগছিলো। ফ্রি খাবার-দাবার, ভালো মদ, বাচ্চাদের খেলাধুলা, সবার মধ্যে আনন্দ দেখে আমার কেটে যাচ্ছিলো ভালোই। সবাইকে দেখছিলাম। সেই দেখাতেও একধরনের আনন্দ আছে। আমি কাউকে তেমন চিনি না, কেউ আমাকেও চেনে না।
এটা আরেক ধরনের সেরা সুযোগ, মানুষ দেখার।
সেদিন সন্ধ্যায় আরো একজন ছিলো, ঐ একই পার্টিতে। অনেকেই হয়তো খেয়াল করে নাই, ঠিকমতো। আমার যেহেতু তেমন কাজ ছিলো না, কারো সাথে আলাপেও ছিলাম না, তাই একা বসে সবাইকে দেখছিলাম। তাই হয়তো আমার চোখে লোকটা, সেভাবে ধরা পড়েছে। বোঝাই যাচ্ছিল এই পার্টিতে তার কোনো দোস্তও নাই, ফেসবুকের ফ্রেন্ড থাকতে পারে , ফেসবুকের ফ্রেন্ড যে কি ফ্রেন্ড এইটা এখন সবাই বুঝে, কিন্তু তার তাও নাই, আত্মীয়-স্বজনও নাই। কোনো না কোনো ভাবে এসে পড়েছে এখানে আর আমার মতো একা একা উপভোগ করছে সময়। তবে চোখে পড়ার মতো স্মার্ট লোক। লম্বা, খুব সিরিয়াস টাইপ মনে হলো, সাহেবদের পোশাক পড়া , টাকা-পয়সাওআলা মানুষ মনে হলো , হাতে দামি মোবাইল, আইফোন-টেন-ই হবে, লাখ দেড়েক টাকার নিচে দাম হবে না সেটার। কিন্তু দেখে, ভালোই বোঝা যাচ্ছিলো পারিবারিক অনুষ্ঠানে আনন্দ করার কোনো লক্ষ্য নিয়ে সে আসেনি এখানে। তারপরেও কারো সাথে চোখাচোখি হলে বা মুখোমুখি হলে স্মিত হাসি দিয়ে সে আরেক জায়গাতে সরে যাচ্ছিলো। আর এই যুগের আমিত্বের যে চাক্ষুষ রোগ ‘সেলফি’ , সেটা সে প্রতি ৫ মিনিটে একটা করে তুলছিলো।
আমাদের হোস্ট ছাড়া, আর একজনকেও সে চেনে না, আর হোস্টও কিছুক্ষণ পরপরই , কি লাগবে, এটা লাগবে, সেটা লাগবে বলে তার কাছে আসছিলো, অতিথি হিসাবে যে সে খুব গুরুত্বপূর্ণ কেউ বা কিছু একটা, সেটা ভালোই বোঝা যাচ্ছিলো। যে কেউ তাকে দেখলেই বুঝবে, সে খুবই বিরক্ত হচ্ছিলো এই পরিবেশে, কিন্তু অভিনয় করছিলো খুশি থাকার, ভাব দেখাচ্ছিলো, যেনো দারুণ সময় কাটাচ্ছে। আমি অনেকক্ষণ ধরে তাকে লক্ষ্য করছি দেখেই, এই ব্যপারগুলো বেশ ভালোভাবেই ধরতে পেরেছি। নইলে সেভাবে হয়তো কেউই খেয়াল করছে না। যে-পার্টিতে ফ্রি খাওয়া দাওয়া, আমোদ-ফুর্তি, সেইখানে, এতো কিছু দেখার সময় কোথায়, কারো? পরে অবশ্য জেনেছি, লোকটা খুবই জরুরি এবং জটিল একটা ব্যবসার কাজে এই প্রদেশে এসেছিলো বা আসতে হয়েছিলো এখানে, সে এই এলাকার লোকই না। নিজের পরিচয় সম্বলিত একটা চিঠি তিনি নিয়ে এসেছিলেন, সেই সুবাদে উনাকে , অতিথি হিসাবে এখানে সময় কাটানোর আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। অনেকটা ভদ্রতার খাতিরেই বলা যায়। এই প্রদেশে সেইভাবে তার পরিচিত কেউ নেই । অথবা সময় কাটানোর জন্য হয়তো কোথায় যাবার সুযোগ বা সময়, কোনোটাই আপাতত নেই তার।
কেউ তাকে তাস খেলায় ডাকেনি, কেউ তাকে সিগার সাধে নি, কথাবার্তাতেও ডাকে নি, অনেকটা অস্বস্তির মধ্যে শুধুই অতিথি হিসাবেই থেকে গেছেন তিনি, এই অস্বস্তি থেকে বাঁচতে, পুরো সন্ধ্যাই নিজের দাড়ি নিজের গোফে, নিজের চুলে হাত বুলিয়েই কাটিয়ে দিলেন। সেলফি তুললেন একটার পর একটা, আর চ্যাটের টুংটাং আওয়াজ তো আছেই। আমি টানা দেখে যাচ্ছি বলে আরো ভালোভাবে ধরা দিচ্ছে আমার কাছে। আমারই অস্বস্তি লাগতে লাগলো। কিন্তু সে তার দাড়ি, গোফে এমনভাবে তা দিতে থাকলো, আর এতো সেলফি তুললো, দেখে মনে হলো এই পৃথিবীতে দাড়ি, গোফকে আজকের অবস্থানে আনার জন্য তার বিশেষ অবদান আছে এবং তাকেই স্রষ্টা বিশেষভাবে দায়িত্ব দিয়েছেন, সেটাকে নিয়ে খেলা করার। আর সেটাকে ধরে রাখার জন্য আছে আইফোনে তোলা সেলফি, মনে হচ্ছে, এটা তার সব থেকে প্রিয় একটা কাজ। অতি জরুরি কাজ।
এই বিশেষ চরিত্রটি ছাড়াও ঐ রুমে আরেকজন লোক ছিলো, যারে দেইখা আমার আগ্রহ লাগসে। লোকটা একটু আলাদা সবার থেকে, প্রভাবশালীও , হাবভাব দেখেই বোঝা যাচ্ছে। লোকটার নাম জুলিয়ান মাস্তাকোভিচ। এনার ভাবসাব দেখেও মনে হচ্ছে, একটু আগে যে লোকটার কথা কইতেছিলাম, এওও সেই একই ক্যটাগরীতে এই অনুষ্ঠানে চান্স পাইসে। ঐ লোকটা , মনে আছে তো আপনাদের, দাড়ি-গোফ-সেলফি নিয়া ব্যস্ত যিনি। তবে এ হয় বিখ্যাত কেউ বা বিরাট ক্ষমতাবান কেউ। কারণ হোস্ট তার বউরে নিয়ে তার সামনে অনেক কথা বলছিলো, তারা যে তার আসার কারণে খুব খুশি সেটা বার বার বলছিলো , তার সম্মানে একটা নাচ-গানও হয়ে গেলো, অন্যান্য অতিথিদের সাথেও তাকে পরিচয় করিয়ে দেয়া হচ্ছিলো। তবে অতিথিরা তার কাছে পরিচিত হতে আসলো আগ্রহ ভরে, সে জায়গায় দাড়িয়েই ছিলো, পরিচিত হচ্ছিলো,দেখে মনে বুঝা যাচ্ছিলো যে তার এতো তাড়া বা আগ্রহ কোনোটাই নাই, এইসব আনন্দ-ফুর্তির কোনো কিছুতেই। জুলিয়ান যখন ভদ্রতার খাতির বললেন যে এইরকম আনন্দদায়ক এবং সুন্দর পার্টিতে তার অনেকদিন আসাই হয় নাই, তখন , হোস্ট এর চোখে অশেষ কৃতজ্ঞতায় প্রায় পানি চলে আসলো। আমি জানি না কেনো, এতো এতো গুরুত্বপূর্ণ মানুষের মধ্যে , এইরকম একটা অনুষ্ঠানে , এই ব্যপারটা আমার কাছে একটু অন্যরকম লাগছিলো, বাচ্চাদের সাথে টুকটাক দুষ্টামি করতে করতে , আস্তে করে একটা ছোট ড্রইং রুমে এ চলে গেলাম, যেটাতে একদমই কেউ ছিলো না । অতিথিদের সাথে করে আনা ফুলে পুরো রুমের অর্ধেকটাই প্রায় ভরা ছিলো । সেগুলোর কাছে গিয়ে একটু বসলাম একটা জায়গাতে।কোলাহল থেকে দূরে এসে ভালোই লাগছিলো। একটু আরাম পেলাম । অবসরের আনন্দ হলো।
বাচ্চাগুলো অবিশ্বাস্যরকম মিষ্টি এবং হাসিখুশি। তাদের সাথে কেউ না কেউ আছে সর্বক্ষণ , এবং আদবকায়দার ব্যপারেও তারা খুবই সতর্ক । বড়োদের সাথে যাতে কোনো বেয়াদবি না হয়, কোনো অনাকাংখিত কোনো আচরণ না করে বসে , সে জন্য সার্বক্ষনিকভাবে তাদের মায়েরা আর কাজের মেয়েদের সতর্ক দৃষ্টি ছিলো তাদের উপর । ক্রিসমাস ট্রি থেকে প্রায় সব গুলো মিষ্টি আর খেলনা যেগুলো তারার মতো জ্বলছিলো, টেনে নামিয়ে ফেলেছে তারা সবগুলো, আর অর্ধেকের বেশি খেলনা , যার কিছু প্যকেট খোলার আগেই ভেঙ্গে ফেলেছে , আর কিছু ভেঙ্গেছে প্যকেট খোলার পর। খেলনাটা কি আর কিভাবে সেটা দিয়ে খেলে এই গবেষণা করতে করতেই , সেটা বুঝতে বুঝতেই অধিকাংশ খেলনা তারা ভেঙ্গেই ফেলছে। দেখতে মজাই লাগছে। দারুণ একটা দৃশ্য!
একটা সুন্দর ফুটফুটে বাচ্চা , কালো চোখের, কোকড়ানো চুল , একটা কাঠের বন্দুক নিয়ে আমাকে অনেকক্ষণ ধরে গুলি করলো, অতি মনোযোগ দিয়ে, যেনো আমাকেই সে খুজছিলো অনেক বছর ধরে, হা হা, খুব আনন্দ পেলাম । মজা লাগছিলো সেটা দেখতে। কিন্তু তার বোনটাকে সবাই বার বার দেখছিলো, তার দিকেই সবার নজর ছিলো, অন্য যেকোন বাচ্চার থেকে আলাদা করে। ছবির মতো সুন্দর একটা বাচ্চা মেয়ে, বয়স ১১ কি ১২ হবে , ছবির মতো সুন্দর, চুপচাপ, ফ্যকাসে, স্বপ্নিল, গভীর আর বড়ো বড়ো দুটো চোখ। বাচ্চাদের মধ্যে কেউ নিশ্চয় তাকে কষ্ট দিয়েছে, তাই আমার মতো সে ও এই রুমে এসে বসে আছে, সবার থেকে আলাদা হয়ে । একটা পুতুল নিয়ে খুব মনোযোগ দিয়ে নাড়াচাড়া করছে। খেলছে কিনা বুঝা যাচ্ছে না, মনোযোগ হয়তো অন্য জায়গাতে। খেলনার দিকে না।
অতিথিদের অনেকেই দেখি বলাবলি করছে ,খুব গুরুত্বের সাথে যে ছোট মেয়েটার বাবা একজন ধনী সরকারি ঠিকাদার , আর তার মেয়ের বিয়ের জন্য নাকি ১ কোটি টাকা যৌতুক উল্টো তিনি পাচ্ছেন ।এটা সবাইকে জানিয়েও রেখেছেন । আমি এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখলাম, এই রকম লেনদেনে কার এতো আগ্রহ, জুলিয়ান মাস্তাকোভিচের দিকে চোখ পড়লো। দেখলাম, পেছনে হাত দিয়ে দাড়িয়ে আছেন আর একদিকে মাথা কাত করে সবার কথা শুনছেন, মনোযোগ দিয়ে। কিছু একটা হিসাব কষছেন, মনে মনে।
এখন আমার আসলে সবকিছু উল্টাপাল্টা মনে হচ্ছে।
এখন আমার কাছে সবকিছু একটু এলোমেলো মনে হলো, খটকা লাগলো, এই পার্টির উদ্দেশ্যটা নিয়ে। হঠাত সবকিছু এলোমেলো মনে হতে লাগলো। এটা আসলে কিসের পার্টি হচ্ছে? এই পার্টিটার আসল উদ্দেশ্য আসলে কি?
অনুষ্ঠানটাকে আর সেইভাবে নিষ্পাপ, অনাবীল আনন্দের কোনো অনুষ্ঠান মনে হচ্ছে না। হঠাত করেই মনে হলো , এটা একটা অন্ধকারের আয়োজন, নোংরা কিছু একটা হচ্ছে এখানে। একটা নোংরা খেলার , সাজানো আয়োজন। ১১-১২ বছরের ঐ ছোট মেয়েটা , যে ইতিমোধ্যে ১ কোটী টাকার কিছু অংশ পেয়ে গেছে, যেটা তার হাতের সেই দামী পুতুলটাই। বাকি খেলনা গুলোও আসলে, কে কিনে দিয়েছে এই অনুষ্ঠানে আসা বাচ্চাদের জন্য সেইটাও এখন পরিষ্কার বুঝতে পারছি ।এখন আবার ভালো করে খেয়াল করে দেখলাম, এই সমাজে যার যার বাবা মা এর যে রকম স্ট্যাটাস, অবস্থান, প্রতিপত্তি , সেই হিসাবে সবাইকে খেলনা দেয়া হয়েছে। এতোক্ষণ এটা চোখে পড়েনি কেনো ? পুরো অনুষ্ঠানের আয়োজন, তার লক্ষ্য , সব কিছুর মান্, হঠাত করে পরিবর্তন হয়ে গেলো।
হিসাব মিলে যাচ্ছে সব। এখন পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি।
ক্রিস্মাসের খেলনা দেয়া হচ্ছিলো বাচ্চাদের বাবা মা দের অর্থনৈতিক অবস্থার ভিত্তিতে। সব শেষে যে বাচ্চাটি আসলো , তার বয়স ১০ , শুকনা, লালচে চুল , সে পেলো একটা গল্পের বই , যেখানে প্রকৃতির কথা, সুন্দর দুনিয়ার কথা, ভালোবাসার কথা বলা আছে, কারো কষ্টে চোখের পানি ফেলার গল্প বলা আছে, কারো কষ্টে কষ্ট পাবার কথা আছে, ইত্যাদি ইত্যাদি। বাচ্চাটার মা হলো এই বাসার কাজ করার লোক, যাকে তারা বলে কাজের বুয়া ,যার আয়োজনে আমরা এখানে এসেছি, সেই লোকের বাচ্চাদের দেখাশোনা করেন উনি। উনি গরিব বিধবা মহিলা, বাচ্চাটাও কেমন জানি ভীতু ভীতু। কমদামী একটা জ্যাকেট পরে ছিলো। বইটা হাতে পাবার পর, সে অন্য বাচ্চাদের খেলনার সামনে গিয়ে পায়চারি করছিলো।বইটা আসলে তার আরাধ্য খেলনা নয়। সে অন্য বাচ্চাদের সাথে খেলতে চাচ্ছিলো, কিন্তু সাহস করতে পারছিলো না।
যে কেউ দেখলেই বুঝতে পারবে , এই ১০ বছর বয়সেই সে সমাজে তার নীচু অবস্থান , তার আলাদা অবস্থা খুব ভালো ভাবেই বুঝতে পারছে। বাচ্চাদের দেখতে আমার খুব ভালো লাগে। তারা কি করছে , কি ভাবছে সেটা আমাকে ভাবায়, আনন্দ দেয়। বাচ্চাদের স্বাধীনভাবে খেলার ব্যপারটা , তাদের ভাবনার বিষয়টা খুবই আকর্ষণীয়। তারা বাকি সবার মতো না। তারা তাদের মতো তাদের দুনিয়া তৈরি করে। তাদের মধ্যে আগে থেকে কোনো কিছু বাসা বেধে থাকে না। তারা কাউকে তাদের আগের ভাবনার ভিত্তিতে ছোট বড়ো হিসাবে দেখে না। সবাইকে সমান ভাবে। দুনিয়ার এই ছোট বড়োর হিসাবে তারা তখনো প্রবেশ করে না।
গরীব বাচ্চাটা দামী খেলনা দিয়ে খেলার জন্য অন্ধের মতো ধনীর বাচ্চাগুলোর পিছে পিছে ঘুরতে লাগলো। বিশেষ করে তারা সবাই মিলে একটা মঞ্চে উঠে, অভিনয় করছিলো, গান গাইছিলো, নেচে যাচ্ছিলো, সেটাতে অংশ নেবার জন্য সে উদগ্রীব হয়ে ছিলো। কোনো না কোনো ভাবে অংশ নেবার জন্য সে নিজে নিজেই হাততালি দিচ্ছিলো , নেচে যাচ্ছিলো , মিথ্যা খুশি হবার ভান করছিলো, কেউ তাকে ব্যাথা দিলেও কান্না চেপে , হেসে যাচ্ছিলো, সেটা কান্নার থেকেও আমার কাছে ভয়ংকর মনে হলো, আমার বুকে সেটা একটা ধাক্কা দিচ্ছিলো, সে প্রাণপনে বুঝাতে চাইলো যেনো সেও তাদের একটা অংশ , ধনী বাচ্চাদের সেও একটা বাচ্চা বন্ধু হতে পারে। সেও তাদের সাথে একই মঞ্চে নাচতে-গাইতে পারে । একটা বাচ্চার মুখে পেস্ট্রি কেক লেগেছিলো, এতোগুলো খেয়েছে যে হাতে-পায়ে লেগেছিলো, অনেকগুলো কেক সে একাই নষ্ট করেছে , খাবার নষ্ট করাই তার অভ্যাস, সেটাও বুঝা যাচ্ছিলো, সেই ছেলেকে , লালচে চুলের গরীব বাচ্চাটা তার আপেলটাও দিয়ে দিলো। ধনী বাচ্চাটার কাছে অনেকগুলো খেলনা ছিলো। লালচে চুলের গরীব ছেলেটা সেই লোভ সামলাতে পারেনি। আরেকটা ধনীর বাচ্চাকে তার পিঠে ঘোড়ার মতো চলার জন্য উঠালো সে , যাতে সে মজা পায় , তারপরেও তাকে মঞ্চ থেকে যাতে তারা সরিয়ে না দেয়।যেভাবেই হোক, যতো কষ্টই ঐ বাচ্চাগুলো দিক, সে মঞ্চে থাকতে চায়। কিন্তু এক মিনিট পর কয়েকটা বাচ্চা মিলে তাকে ইচ্ছে মতো, লাথি-ঘুষি মারলো। ছোট লাল চুলের বাচ্চাটা তারপরেও কান্না করার সাহস করলো না। তার মা হঠাত করে কোথা থেকে জানি, চলে আসলো , তাকে বকাঝকা করলো, অন্য বাচ্চাদের খেলাতে নাক গলাতে মানা করে দিলো। গরীবের বাচ্চা, কি আর করবে, মন খারাপ করে সেও আমাদের এই ড্রইং রুমে চলে এলো যেখানে আমি আছি ,আর সেই পরীর মতো ১১ বছরের মেয়ে বাচ্চাটাও আছে, যে আনমনে দামী একটা পুতুল নিয়ে খেলছে , চুপচাপ কি যেনো ভাবছে। ছেলেটার সাথে বন্ধুত্ব হয়ে গেলো মেয়েটার কিছুক্ষণের মধ্যেই। তারপর দুজনে মিলে দামী পুতুলটাকে পোষাক পরিয়ে দিচ্ছিলো। দুজনেই আনমনে খেলাতে ডুবে গেলো, আবার। আমি আধঘন্টারও বেশি সময় ধরে বসে ছিলাম সেখানে, ঝিমুচ্ছিলাম , আধো ঘুমেই শুনছিলাম বাচ্চা দুটোর কথোপকথন, একজন বিধবা মায়ের লাল চুলের গরীবের ছেলের সাথে আরেকজন ১ কোটি টাকা দামের উপহার পাওয়া মেয়ে, যৌতুক হিসাবে যে বা যার বাবা পেতে যাচ্ছে সেই টাকাটা , তারা দুজনেই পুতুলটা নিয়ে খুবই ব্যস্ত হয়ে খেলছিলো। এর মধ্যে হঠাত জুলিয়ান সাহেব ঘরটাতে ঢুকলো। বড়ো বলরুমে বাচ্চাদের মধ্যে একটা ঝগড়াঝাটি বাধার সুযোগে সে আমাদের ড্রইংরুমটাতে চলে আসলো, যাতে কেউ খেয়াল না করে , সে কোথায় গেলো।
আমি খেয়াল করেছি এক মিনিট আগেও লোকটা ,তথাকথিত ভবিষ্যত সম্রাজ্ঞীর বাবার সাথে খুব হাত-পা নেড়ে কথা বলছিলেন , যার সাথে একটু আগেই তার পরিচয় হয়েছিলো , আলাপ করছিলেন সরকারি চাকরির কোন পদগুলো অন্য কোন পদথেকে বেশি মর্যাদার।
খেয়াল করলাম , এই ড্রইং রুমে প্রবেশ করার সাথে সাথেই, হঠাত করে খুব মনোযোগের সাথে ধ্যান এ চলে গেলো মনে হচ্ছে , দেখে মনে হচ্ছে আঙ্গুলে কিছু একটা হিসাব কষছেন।
“ ১ কোটি… ১ কোটি …” ফিসফিস করে বলছিলো ,” এগারো, বারো তেরো বছর…।।“ এভাবে ষোল পর্যন্ত হিসাব করলো। ষোল বছর! চার শতাংশ সুদে ১ কোটি কতো হবে, চার লাখ নাকি!! এটা ৬ বছরে কতো হবে। ……হুম।না খারাপ না। ।নাহ, ঠিক আছে। …খুব বেশি লস হবে না, লাভই হবে…।কিন্তু , ও খোদা, সে তো এটা চার শতাংশে খাটাবে না। সম্ভাবনা আছে আট থেকে দশ পার্সেন্টে খাটাবে। লোকটা তো আমার ১ কোটি টাকা নিয়ে আরো বেশি আয় করবে। থাক অসুবিধা নাই, আমিও একেবারে খারাপ কিছু পাচ্ছি না। মূল টাকাটা তো ফেরত পাচ্ছিই একসময় সাথে আরো ভালো কিছু পাচ্ছি। সেটা তো নিশ্চিত হলো , ব্যাস। আসুবিধা নাই। মেয়েটার সাজসজ্জার জন্য তো কিছু পাবো পরে লোকটা থেকে। যাচ্ছে কোনো একটা বিশাল লেনদেন নিয়ে তার হিসাব। যার জন্য এই পুরো অনুষ্ঠানটাই আসলে সাজানো।
ভাবনাগুলো থেকে বের হয়ে, সে রুমে থেকে বের হয়ে যাবে , এমন সময় চোখে পড়লো ছোট মেয়েটার দিকে , তার সম্রাজ্ঞী , তার হৃতপিন্ড যেনো বন্ধ হয়ে গেলো। আমাকে অবশ্য দেখতে পায়নি,ড্রইং রুমে এই মনুষ্যসৃষ্ট মূল থেকে উপড়ে ফেলা এই সবুজ বাগানের কারণে। হঠাত করে তাকে অনেক উত্তেজিত মনে হলো। অস্থির এবং শয়তানের মতো। হিসাবে কোনো গন্ডগোল হলো নাকি অন্য কিছু , বুঝতে পারলাম না , কিন্তু অস্থিরতায় লোকটা হাত দুটো ঘষতে লাগলো , অস্থিরভাবে পায়চারি করতে থাকলো। যখন উত্তেজনার চূড়ান্ত হলো, সে নিজেকে সামলালো , তার ভবিষ্যত সম্রাজ্ঞীর দিকে আবার দৃষ্টি দিলো। মেয়েটার দিকে যাবার জন্য পদক্ষেপ দেবার আগেই চারিদিকে দেখে নিলো , রুমটাতে আর কেউ আছে কিনা।
তারপর পা টীপেটিপে আস্তে করে বাচ্চাটার কাছে গেলো , যেনো কোনোকিছু নিয়ে একটা অস্বস্তিবোধ কাজ করছে তার মধ্যে। মেয়েটার কাছে গেলো, একটা অশুভ হাসির সাথে , তার মাথায় চুমু খেলো। ছোটো মেয়েটি, এই আক্রমণের জন্য প্রস্তুত ছিলো না, ভয়ে প্রায় কান্না করে দিলো মেয়েটা।
“ আরে, কি করছো তুমি , আমার প্রিয় বাচ্চাটা?” ফিস ফিস করে বললো সে, একটা হিংস্র, লোভাতুর দৃষ্টি দিয়ে , গাল রুমাল দিয়ে মুছতে মুছতে বলতে থাকলো সে।
আমরা খেলছি , মেয়েটি বললো। ভয়ে সে , কুকড়ে গেছে।
ওহ, তাই? কার সাথে , এই ছেলের সাথে ? , জুলিয়ান কৈফিয়ত চাইবার দৃষ্টিতে ছেলেটার দিকে তাকালো, লালচে চুলের ছেলেটা। “ ভাগ এখান থেকে , যা বলরুমে যা, অন্য ছেলেদের সাথে খেলা কর , এখানে কি, নোংরা , গরীবের বাচ্চা !?”
ছেলেটা তাকিয়ে থাকলো লোকটার দিকে, কিন্তু কোনো উত্তর দিলো না। জুলিয়ান আবার চারিদিক দেখে নিলো, আরেকটু কাছে ঝুকে আসলো মেয়েটার দিকে।
ও , বাহ, কি নিয়ে খেলছো তুমি , পুতুল?
হুম, পুতুল , “ একটু ভয়ের সাথে , সন্দেহের চোখে বললো মেয়েটা।
“ একটা দামী পুতুল……জানো তুমি ,এটা কি দিয়ে তৈরি?”
“ না , আঙ্কেল “ , মেয়েটা ফিসফিস করে , মাথা ঝাকিয়ে বললো
“একদম জীবন্ত পশুর চামড়া দিয়ে তৈরি , ডার্লিং, অনেক টাকা লাগে এটা কিনতে।”, কড়া চোখে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে বললো , “ঐ পোলা , কি রে , তুই এখনো এখান থেকে যাস নাই, মাইর খাবি তুই!”
ছেলে আর মেয়ে , দুজনেই ভয়ে কুকড়ে একে অপরকে ধরে রাখলো । তারা একে অপরকে ছেড়ে যেতে চাইলো না। তারা আসলে কিছুই বুঝতে পারলো না।
হঠাত কি হলো! বুঝার আগেই ভয়ের মধ্যে ঢুকে গেলো তারা।
মেয়েটার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো , “ আর এই পুতুল তোমাকে কেনো দেয়া হয়েছে, জানো তুমি ?” , নিচুস্বরে , বার বার বলতে থাকলো।
– না , আঙ্কেল
– কারণ ,পুরো সপ্তাহ , তুমি একটা মিষ্টী এবং ভালো মেয়ে হয়ে যাতে তুমি থাকো

জুলিয়ান, একটু মোহগ্রস্তের মতো উত্তেজিত, সতর্কভাবে রুমের চারিদিকে তাকালো, চোর যেরকম চুরি করার আগে চারিদিকে দেখে নেয়, সেরকম এবং স্বর নীচে থেকে আরো নীচে নামিয়ে এনে কথা বলতে লাগলো মেয়েটার সাথে, প্রায় শোনাই যায় না এমন জায়গায়, আবেগ আর অধৈর্য্যের অস্থিরতার ভাব মিশে তার কথা গুলো কেপে কেপে আসছিলো।
“ তুমি কি আমাকে কথা দিবে যে আমাকে ভালোবাসবে , আমার প্রিয় ছোট্ট রাণী হয়ে , যখন আমি তোমার মা-বাবার সাথে দেখা করতে আসবো?”
এ কথা বলতে বলতে জুলিয়ান আবার তাকে চুমু খেতে চাইলো, কিন্তু ছোট ছেলেটা যখন মেয়েটাকে দেখলো যে সে প্রায় কেদে ফেলবে তখন তাকে ধরে স্বান্তনা দেবার চেষ্টা করলো । জুলিয়ান এর প্রচন্ড রাগ হলো।
“এই ছেলে, কি করস এখানে, যা ভাগ এখান থেকে !” চোখ রাঙ্গিয়ে বললো ছেলেটাকে , ছেলেটার জন্য জুলিয়ানের ভালোই সমস্যা হচ্ছে , কিছুই করা হচ্ছে না ঠিকমতো ,” যা , তুই, বলরুমে গিয়ে অন্যদের সাথে খেলতে যা , এখানে কি?”
“না , না”, মেয়েটা চিতকার করে উঠলো , “ আপনি চলে যান এখান থেকে। ওকে ছেড়ে দিন , ওকে ছেড়ে দিন, ওকে বকবেন না। “ , কথাটা বলে , কান্নাই করে দিচ্ছিলো মেয়েটা।
দরজায় একটা আওয়াজ পেলো। জুলিয়ান সতর্ক হয়ে গেলো। আবার সমাজের ভদ্রলোকের মতো নিজেকে সামনে নিলো , আগের জুলিয়ানে ফিরে গেলো, যাতে কেউ না বুঝে ,তার ভেতরের হিসাব-নিকাশ আর লোভ-লালসার গল্প। ছোট ছেলেটা যে জুলিয়ানের থেকে আরো বেশী ভীত ছিলো, সে মেয়েটাকে ফেলে দেয়ালের দিকে চলে গেলো, ড্রইং রুমে থেকে ডাইনিং রুমে যাবার জায়গাটাতে , দেয়াল ঘেষে দাড়িয়ে থাকলো সে। কেউ যাতে সন্দেহ করতে না পারে, সেজন্য জুলিয়ানও ড্রইং রুম ছেড়ে ডাইনিং রুম এ চলে গেলো। তার চেহারা লাল হয়ে ছিলো, একদম লবস্টার এর মতো, আয়নাতে একটু দেখে নিলো সে নিজেকে , মনে হলো কিছুটা লজ্জিত নিজের ব্যপারে। হতে পারে , একটু আগের কোটি টাকার হিসাব নিকাশে সে এতো উত্তেজিত আর ডুবে ছিলো যে , লাভের উত্তেজনায় , কিছুক্ষণের জন্য নিজের অবস্থান এবং ব্যক্তিত্বের কথা হয়তো ভুলে গিয়েছিলো। মাথা গরম যুবকের মতো উত্তেজিত হয়ে গিয়ে , লোভ লালসার স্রোত তাকে ভুলিয়ে দিয়েছিলো। যে ক্রয়করা পণ্যের লোভ সে করেছিলো , সেটা সত্যিকারের পণ্য হতে আরো পাচ বছর কমপক্ষে লাগবে। টাকা দিয়ে সব কিছু কিনতে কিনতে, সব কিছু কে পণ্য ভাবতে ভাবতে , হিতাহিত জ্ঞ্যানই হারিয়ে ফেলেছিলো প্রায়। সেটার-ই নমুনা দেখলাম।
আমি তাকে ফলো করে ডাইনিং রুমে গেলাম , যা দেখলাম তাতে আরো হতভম্ব হলাম। লাল চুলের , বিধবার ছোট বাচ্চা ছেলেটাকে সে ইচ্ছে মতো বকাঝকা , অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করছে। ছেলেটা লোকটা থেকে বাচার জন্য দূরে যাচ্ছিলো কিন্তু লাভ হচ্ছিলো না, বাচ্চা ছেলেটা বুঝে উঠতে পারছিলো না সে বাচার জন্য কোনদিকে দৌড় দিবে, কোথায় দৌড়ে পালাবে। ভয়ে একে বারে কুকড়ে গিয়েছিলো বাচ্চাটা। বুঝলাম, জুলিয়ান আসলে সব কিছু ভেবে চিন্তে ঠান্ডা মাথায়ই করেছিলো।তাই তার রাগ এখনো কমেনি। ছেলেটা না থাকলে না জানি কি করতো বাচ্চা মেয়েটার সাথে! আমি যেটাকে ভেবেছিলাম সাময়িক উত্তেজনা , আসলে সেটা তার একেবারের ঠান্ডা মাথার কাজ ছিলো।ভেবে আতংকিত হলাম!
“ সরে যা এখান থেকে হারামজাদা, ফকিরের বাচ্চা । কি কাজ তোর এখানে? ফল চুরি করেছিস, না ? ফল চুরি, ডাইনিং এ ঢুকে? নোংরা , খারাপ ছেলে। যা , বের হয়ে যা এখান থেকে, নোংরা, হারামজাদা, কুত্তার বাচ্চা, যা এখান থেকে , এখুনি!”। বাচ্চাটা ভয়ে টেবিলের নিচে চলে গেলো। জুলিয়ান এর ক্ষোভ সব তার উপর গিয়ে পড়লো। হাত দিয়ে থাপ্পড়ও দিলো কয়েকটা , অন্য কোথাও হলে , বেতের বাড়ি দিয়ে মারতো সে।
এতো রাগ! অবাকই হলাম।
ডাইনিং এ বসে দেখলাম, আর ভাবতে থাকলাম পুরো ঘটনাটা। লোকটা আসলেই আবেগে কাজটা করে নাই। আর তার সব রাগ এখন এই বাচ্চা ছেলেটার উপর এসে পড়েছে। যেনো এই বাচ্চা ছেলেটাই সব সমস্যার মূল , তার জীবনের সব থেকে বড়ো বাধা।তার জীবন উপভোগের পথের কাটা।
এখন এটা বলতেই হচ্ছে যে , জুলিয়ান মাস্তাকভিচ লোকটা কলুষিত, নোংরা মানসিকতার লোক। লোকটা পিচ্ছিল, ধান্দাবাজ, অশোভনীয়, দেখতে হলিউডের সিনেমার নায়কদের মতো, লম্বা-চওড়া , ভাবের উপর থাকে, সবাই যেমন বলে যে ঘোড়ার মতো শক্তিশালী আর বাদামের মতো গোলাকার।
জুলিয়ান ঘামছে , হাপাচ্ছে , মুখটাও একদম লাল হয়ে ছিলো। শেষ পর্যন্ত রাগে একদম পাগল হয়ে গেলো সে, ক্রোধে সে কাপছিলো, কে জানে , এই বাচ্চা ছেলেকে কি সে হিংসা করছিলো? আমি শব্দ না করে জোরে অনেকক্ষণ হাসলাম। জুলিয়ানের মতো একজন ধনী , শক্তিশালী লোক কি নিয়ে পড়ে আছে! একটা ছোট নিষ্পাপ বাচ্চা ছেলেকেও বিশাল শত্রু ভেবে বসে আছে।
জুলিয়ানের মুখটা গোল হয়ে গেলো, নিজেকে গুরুত্ব দেবার কথা ভাবা বাদ দিয়ে , একটা দ্বিধার মধ্যে পড়ে গেলো। এই সময় আমাদের নিমন্ত্রণকারী অন্য দিকের দরজা দিয়ে ঐ রুমে ঢুকলেন। ছোট বাচ্চা ছেলেটা টেবিলের নীচ থেকে হামাগুড়ি দিয়ে বের হয়ে তার কনুই আর হাটুর ময়লা ঝাড়তে থাকলো। জুলিয়ান তার রুমাল দিয়ে নাক ঢাকলো। ধুলার ভয়ে। তিনজনে হঠাত কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকলো।কিভাবে এই তিন জন এই রুমে ,একই মঞ্চে চলে এলো বুঝার চেষ্টা করলো। কিছু বুঝে উঠতে পারলো না, কি করবে। কিন্তু লোকটা যেহেতু অভিজ্ঞ, জীবনের অন্য ধরনের অভিজ্ঞতা আর অর্থ তার কাছে আছে, তাই সে সুযোগটা জুলিয়ান এর সাথে কথা বলার ভালো সুযোগ হিসাবে সে নিলো। আগ বাড়িয়ে সে নিজেই , পরিবেশটা সহজ করে দিতে চাইলো ।
“ জনাব, এই টাই সেই ছেলে। “ হোস্ট নিজেই বলে উঠলো, লাল চুলের ছেলেটাকে দেখিয়ে “ যার কথা আমি আপনাকে বলেছিলাম…।”
“ জ্বি , কিছু মনে করবেন না, খেয়াল করিনি, কি বললেন?” , জুলিয়ান তখনো আগের ঘটনাগুলো থেকে পুরোপুরি বের করে আনতে পারেনি, নিজেকে।
“ আমার বাচ্চাদের দেখাশুনা করে যে মহিলাটা , তার ছেলে এটা, স্যার”, বসের কাছে তেল মারা আবেদনের যে সুর , সেই সুরে কথাটা বললো হোস্ট। “ খুবই কষ্টে আছে মহিলা। স্যার। খুবই ভালো, সৎ একজন সরকারি চাকুরের বিধবা সে, তাই ভাবছিলাম আপনি যদি একটা ব্যবস্থা করে দিতেন…”
হঠাৎ প্রায় চিৎকার করে উত্তেজিত ভাবেই জুলিয়ান বললো, “ আরে না , না , না, আমি দুঃখিত জনাব, এখানে প্রশ্নের কোনো সুযোগই নাই। আমি নিজে খোজ নিয়েছি, কোনো রকম কোনো চাকরি নাই, যদি ১ টা চাকরি থাকেও , সেখানে শত শত প্রার্থী হা করে বসে আছে , এস এস সি পাশের যোগ্যতা চাওয়া চাকুরিতে সব মাস্টার্স পাশ করা ছেলেমেয়ে আবেদন করে বসে আছে। আমি দুঃখিত। খুবই দুঃখিত । এটা সম্ভব না। এদের বাদ দিয়ে একজন সরকারি কর্মচারির বয়স্ক বিধবাকে কেউ চাকরি দিবে না, সে যতোই সরকারি কর্মকর্তার বউ হোক না কেনো, আর যতোই ভালো হোক না কেনো, তাও আবার যখন সেই লোক ইতিমধ্যে মরে ভূত হয়ে গেছে।“
নিমন্ত্রণ কর্তা ব্যক্তিটি হতাশ হয়ে বললো , “ কি দুঃখের কথা। কি শান্ত, নিষ্পাপ একটা ছেলে। তার ভবিষ্যত এখনো পুরাই অনিশ্চিত।“
“ কি বলেন , জনাব, খুবই বদমায়েশ টাইপের ছেলে এটা,আমি অনেকক্ষণ ধরে দেখছি এটাকে”, একদম ঠোট উল্টিয়ে জুলিয়ান বললো , “ এই ছেলে , যাও , অন্য জায়গাতে যাও। এখানে কি করছো? যাও , অন্যদের সাথে খেলো গিয়ে!” , ছেলেটার দিকে লক্ষ্য করে , বিরক্তির সাথে বললো জুলিয়ান।
বুঝা গেলো ,জুলিয়ান লোকটা আর নিতে পারছে না, ধৈর্য্যের বাধ ভেঙ্গে যাচ্ছে তার , এর মধ্যে আবার একচোখে আমাকে দেখে নিলো, রুমের কোণায়। আমিও আর আটকে রাখতে পারলাম না, তার অবস্থা দেখে সরাসরি তার মুখের উপর হেসেই দিলাম। জুলিয়ান রাগে , আমাদের নিমন্ত্রণকারীর দিকে তাকিয়ে অনেকটা আমাকে শোনানোর জন্যই , জোরে জোরে বলতে লাগলো,
“কে ঐ লোকটা? অদ্ভূত ভাবে হাসছে”।
তারা নিজেদের মধ্যে ফিস ফিস করে কথা বললো কিছুক্ষণ; তারপর রুম থেকে চলে গেলো। একটূ পরে দেখলাম অবিশ্বাস্যভাবে মাথা নেড়ে জুলিয়ান আমাদের হোস্ট এর সব কথাই মেনে নিচ্ছে, চুপচাপ।মাথা নিচু করে।
প্রাণভরে হাসার পর , বলরুমে ফিরে গেলাম। আবার দেখলাম তাকে, সেই মহান ব্যক্তিটা ( জুলিয়ান) , পার্টিতে আসা বাবা-মা রা তাকে ঘিরে ছিলো, যাদের আমন্ত্রণে সবাই এসেছে তারা তো ছিলেনই। হাতে মদের গ্লাস নিয়ে একজন সুন্দরী মহিলার সাথে কথা বলছিলেন , যার সাথে মাত্রই পরিচয় হলো। মহিলাটি হাত ধরে ছিলো সেই ছোট পরীর মতো মেয়েটার যার সাথে ১০ মিনিট আগে , একটা অভাবনীয় কান্ড ঘটিয়েছিলেন , জুলিয়ান। বাচ্চা মেয়েটার অনেক প্রশংসা করলেন, তাকে যে সুন্দর করে বড়ো করা হচ্ছে তার প্রশংসা করলেন, মিষ্টি বাচ্চা বলে তাকে আদরও করে দিলেন। আমি ভ্রু কুচকে তার মাকে দেখলাম, নিজের মেয়ের প্রশংসা শুনে , তাও জুলিয়ানের মতো ধনী কারো থেকে , আনন্দের অতিশায্যে প্রায় কেদেই দিচ্ছিলেন। যেনো জুলিয়ানের অনুগ্রহ হলো জীবনের সব থেকে আরাধ্য বিষয়।তার বাবার মুখেও হাসি। হোস্টরাও তো আনন্দের আতিসাজ্যে দিশেহারা প্রায়। অতিথিরাও সবাই খুবই আপ্লুত হয়ে দেখছিলেন এই দৃশ্য। বাচ্চাদের সবাইকে খেলা বন্ধ করে চুপ থাকতে বলা হয়েছে, যাতে এই কথাবার্তাতে কোনো ব্যঘাত না ঘটে। পুরো পরিবেশটাই যেনো গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনছিল কথাগুলো, দৃশ্যগুলোকে গুরুত্ব দিচ্ছিলো।
আমি শুনলাম পরে, কিভাবে সেই ছোট মেয়েটির মা , তার হৃদয়ের অন্তস্থল থেকে জুলিয়ানকে ধন্যবাদ জানিয়েছিলো, তাদের পরিবারকে সম্মানিত করার জন্য , জুলিয়ানের নিজে উপস্থিত থেকে সবাইকে আনন্দিত করেছিলো এই কথা বলে, সম্ভ্রান্ত পরিবারের একজন লোক হিসাবে তার থাকাটা কিভাবে তাদেরকে আরো বেশি সম্মানিত আর আনন্দিত করেছিলো। জুলিয়ান প্রবল আগ্রহ আর উতসাহের সাথে তাদের আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছিলেন। পরে অন্যান্য অতিথিরাও অনুষ্ঠানের আয়োজন , সাজসজ্জা নিয়ে সরকারি ঠিকাদার এবং তার বউকে অনেক প্রশংসা করলো, অনেক ধন্যবাদ জানালো আর জুলিয়ানের মতো লোকের সাথে তাদের সম্পর্ক হচ্ছে জেনে তাদের অভিনন্দন জানালো। ছোট মেয়েটাকেও তারা অভিনন্দন জানালো, যদিও মেয়েটা হয়তো জানে না আসলে কি হচ্ছে, কি নিয়ে আলাপ হচ্ছে। এবং সবশেষে, সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ অতিথি হিসাবে, জুলিয়ান মাস্টাকভিচ কে অনেক প্রশংসা আর অভিনন্দনে ভরিয়ে দিলো সবাই মিলে।
আমি এইসব দেখছিলাম। আমার মাথায় তো ড্রইংরুমের , ডাইনিং রুমের, বলরুমের, সব রুমেরই , সব দৃশ্যই তাজাভাবেই আছে। আমার কাছে এগুলো আরো বিরক্ত লাগছে। জুলিয়ান আমার কাছে টাকার জোরে সবকিছু কিনে ফেলার চিন্তায় থাকা একটা রোগী, মস্তিষ্ক বিকৃত, স্রেফ শয়তান ছাড়া আর কিছুই না।
“লোকটা কি বিবাহিত?” , একটু জোরেই জিজ্ঞাসা করলাম , আমার পাশে দাঁড়ানো এক লোককে, যে জুলিয়ানের একদম পাশে দাড়িয়েছিলো।
জুলিয়ান কথাটা শুনেছে। আমার দিকে ক্ষোভের দৃষ্টিতে খুব ভাব নিয়ে চোখ রাঙ্গানো ভঙ্গিতে তাকালো, বুঝার চেষ্টা করলো , কে বলছে, কি বলছে, কেনো বলছে।
“না , সে তো বিয়ে করেনি এখনো” , আমার পরিচিত লোকটা বললো, আমার ভালো ব্যবহার, ভালো সমাজের রীতিনীতির মধ্যে এইভাবে অভদ্র একটা প্রশ্নে তাদের ভালোই ধাক্কা লাগলো , এভাবে কেউ তাদের কখনো প্রশ্ন করে না। আমি অবশ্যই বলবো, আমি ইচ্ছা করেই এটা করেছিলাম। এদেরকে ধাক্কা দেয়া জরুরী।
++++
(কয়েক বছর পর)

কিছুদিন আগে একটা চার্চের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম, অনেক মানুষ আর অনেক গুলো গাড়িতে এলাকায় একেবারে যানজট লেগে গেলো। আশেপাশের সবাই একটা বিয়ে নিয়ে আলাপ করছিলো। মেঘলা দিন ; যেকোন সময় বৃষ্টি হতে পারে। ভীড়ের মধ্যে আমি চার্চের মধ্যে ঢুকলাম , দেখলাম একজনকে। ছোটখাটো মানুষ, খুব ফিটফাট , চার্চের এদিক ওদিক দৌড়াদৌড়ি করছেন , সব কিছুতে থাকছেন, সবাইকে আদেশ নির্দেশ দিচ্ছেন। তোরজোড় করছেন যাতে কোনো কিছুতে কোনো ঝামেলা না হয়। হঠাত শুনলাম বর চলে এসেছে। আমি ভীড় ঠেলে দেখলাম অনিন্দ্য সুন্দরী একটা মেয়েকে , যাকে দেখলে মনে হয় জীবনের-বসন্তকাল তাকে দিয়েই শুরু হয়েছে। তার অবশ্য নিজের দিকে তেমন খেয়াল নেই বলে মনে হলো।অবাক হলাম তার চোখ দেখে, অনেকক্ষণ কান্নার কারণে লাল হয়ে আছে সেই দুটো চোখ। তার চেহারার প্রতিটা ইঞ্চি সৌন্দর্য্যের সাথে একটা আত্মমর্যাদার আভা ছড়াচ্ছে। এর মধ্যেও, তার মধ্যে এখনো শৈশবকে দেখা যায়, শৈশব শেষ হয় নি তার। নিষ্পাপ শিশুর চেহারা ফুটে আছে সেখানে। এখনো যার মধ্যে একটা শিশু আছে, শৈশব চোখে পড়ে তার চলার মধ্যেও , তার চোখে-মুখে। এমন কিছু বুঝা যায়, যার এখনো সময় হয়নি কোনো কিছুর জন্য তৈরি হবার, বা কোনো কাজের জন্য তৈরি হবার , এখনো অল্পবয়স এবং জীবনের সকাল বেলায় যার অবস্থান। দেখে মনে হচ্ছে, নিঃশব্দে করুণার জন্য প্রার্থনা করছে সে। লোকজন বলাবলি করতে লাগলো, যে মেয়েটার বয়স মাত্র ষোল। ভালো করে তাকিয়ে দেখলাম, বরটা কে। আরে এটা তো সেই লম্বা লোকটা , সেই হারামজাদা, জুলিয়ান মাস্কভিচ। আমি আবার বিমর্ষ চোখে মেয়েটার দিকে থাকালাম, হায় খোদা! এখানে কি হচ্ছে…। আমি তাড়াতাড়ি দরজার কাছে গেলাম। ভীড়ের মধ্যেই শুনতে পেলাম, মেয়েটা একটা বড়ো ঘরে যাচ্ছে, বিশাল এক ধনীর বউ হয়ে, কোটি টাকার যৌতুক ছিলো এই বিয়েতে। মেয়েটার বিয়ের পোশাকেও লাখ টাকার উপর খরচ করা হয়েছে।
“ লোকটা ঠিকঠাক হিসাব করেই কয়েকবছর আগে মাঠে নেমেছিলো। হায়রে , টাকা”, ভীড় ঠেলে রাস্তার দিকে আগাতে আগাতে ভাবলাম আমি।

ফিয়োদর মিখাইলোভিচ দস্তয়েভস্কি (১৮২১-১৮৮১) রুশ শীর্ষ কথাসাহিত্যিক। জন্ম মস্কোতে। পূর্বপুরষেরা ছিলেন বেলারুশের। শৈশব কেটেছে অবর্ণনীয় দারিদ্র্যে।  ছোটগল্প ও উপন্যাস রচনার সূত্রে চব্বিশ বছর বয়সেই খ্যাতিমান হয়ে উঠেছেন। আঠারো শতকের মাঝামাঝি সময়ে রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে জারের আমলে সাইবেরিয়াতে নির্বাসিত হন। সেই সময় শাস্তি হিসেবে সেনাবাহিনিতেও কাজ করতে হয়। ‍ মুক্তি পেলে লেখালেখিতে ফেরেন। একের পর এক উপন্যাস ও ছোটগল্প লিখতে থাকেন। ১৮৬৬ সালে লিখলেন কালজয়ী উপন্যাস ‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট’। ১৮৭৯ সালে প্রকাশিত হলো ‘ব্রাদার্স কারামাজোভ’। এটি তাঁর শেষ উপন্যাস। এই উপন্যাসে উপজীব্য হয়েছে দর্শনের কিছু গূঢ় তত্ত্ব। রুশ জনজীবনের মহান রূপকার হিসেবে বিশ্বসাহিত্যে স্থান করে নিয়েছেন তিনি।

অনুবাদক আসিফ সৈকত চলচ্চিত্রকর্মী, অনুবাদক ও লেখক।