বন্যা লোহার >> শান্তিনিকেতনের চিঠি

0
846

ধারাবাহিক – ১ 

 

“সাড়ে তেরো বছর এবং প্লাস (১৩+) এই জায়গাতে থাকার সুবাদে আমার বলার মতো গল্পের অভাব নেই। নাই বা হল সেসব সাদা কালো বা সেপিয়া টোনের সিনেমার মতো। ঘটমান গল্পও তো বলাই যায়। সেসবই যেমন যেমন মনে পড়বে তেমনই বলব, কোনো রকম পরিবর্তন ছাড়া।”

[শান্তিনিকেতন- রবিতীর্থস্থান বলে খ্যাত। রবীন্দ্রনাথের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানটি বাঙালির শিল্প-সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। শান্তিনিকেতন নিয়ে আমাদের আবেগ ও কৌতূহলও কম নয়। তীরন্দাজ-এ এই শান্তিনিকেতন নিয়ে নিময়তিভাবে লিখবেন বন্যা লোহার। বন্যা একজন প্রতিভাবান কবি। কবিতা লেখার সূত্রে তিনি ইতিমধ্যে পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পেরেছেন। শান্তিনিকেতন নিয়ে প্রথম হাত দিলেন গদ্য লেখায়। পাঠক, এই আয়োজনটি কেমন লাগলো, আমাদের জানাবেন।]
স্মৃতি মদের মতো। যত গেঁজবে তত ভালো। যত সময়ের ফেনা জমবে তত স্বাদ। বয়সের মাধুর্য বলতে যা কিছু তার মধ্যে এটি একটি অন্যতম। ফলে বয়স্ক মুখ থেকে স্মৃতিকথা শোনার যে আনন্দ তা আমার থেকে পাওয়া যাবে না।
আমার বয়স কম, চঞ্চল মন, চোখে এখনো অভিজ্ঞতার আগুন লাগেনি। শান্তিনিকেতন এখনও আমার অতীত নয়। আমার বর্তমান। তাই দূর থেকে তারিয়ে তারিয়ে স্মৃতি উপভোগ করার সৌভাগ্যের ঘরে আমি আগেই একটি শূন্য বসিয়েছি।
তবু সাড়ে তেরো বছর এবং প্লাস (১৩+) এই জায়গাতে থাকার সুবাদে আমার বলার মতো গল্পের অভাব নেই।
নাই বা হল সেসব সাদা কালো বা সেপিয়া টোনের সিনেমার মতো। ঘটমান গল্পও তো বলাই যায়।
সেসবই যেমন যেমন মনে পড়বে তেমনই বলব, কোনো রকম পরিবর্তন ছাড়া।
শান্তিনিকেতনের গল্প শুরু করার আগে যে গল্পটা বলে নেওয়া জরুরি তা হল শান্তিনিকেতনে এসে পড়ার গল্প।
সেই গল্প শুরু হচ্ছে গত শতকের আটের দশকে বাঁকুড়া জেলার চুয়ামসিনা নামের এক গ্রামে। এই গ্রাম বিখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। এই গ্রাম বিখ্যাত চিত্রশিল্পী সত্যেন বন্দ্যোপাধ্যায়ের। আবার এই গ্রাম আমার বাবা পবন লোহারেরও।

 

আমার বাবা
আমার বাবার তখন ইস্কুল-জীবন। এই একুশ শতকে দাঁড়িয়ে আমরা জাতপাত, উঁচু-নিচু নিয়ে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ করে মরছি, সেই সময়ে কী পরিস্থিতি ছিল তা আমাদের কল্পনার বাইরে। আমার দাদু গুইরাম লোহার তথাকথিত অন্তজ শ্রেণির অশিক্ষিত দিনমজুর। অমানুষিক পরিশ্রম করেও দুবেলার খাবার জোটাতে পারেন না তবু ছেলেকে ইস্কুলে পাঠাচ্ছেন নিয়মিত। আমার বাবার আঁকার নেশা; তখনও তিনি কাটুমকুটুম নিয়ে কাজ করা শুরু করেননি।
আঁকা শেখার সখ দামি সখ, সেসব তাঁর সাধ্যের বাইরে। কিন্তু ভালো ছবি দেখা তাঁর আয়ত্বের মধ্যেই ছিল। সত্যেন বন্দোপাধ্যায়ের নাতনি আল্পনা বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন বাবার সহপাঠী। বাবা যাঁদের কাছে আজীবন কৃতজ্ঞ আল্পনা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁদের একজন। কারণ যেসব মানুষেরা বই দিয়ে সাহায্য না করলে বাবার লেখাপড়া হত না আল্পনা বন্দোপাধ্যায় তাঁদেরই অন্যতম। বই দেওয়া-নেওয়া করতে গিয়ে বাবা পরিচিত হলেন সত্যেন বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবির সাথে। তাঁদের বাড়িতে টাঙানো ছবি মুগ্ধ করত বাবাকে।
সত্যেন বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর শেষজীবন কাটালেন গ্রামের বাড়িতে। মুমূর্ষু শিল্পীর কাছে আঁকা শেখা হল না বাবার। কিন্তু শিল্পীর সান্নিধ্য তাঁকে প্রেরণা জোগাল।
গ্রামজীবনে ফটোশপ তখনও আসেনি, ছোট ছবি বড় করা, এডিট করা সেসব অনেক পরের ঘটনা।
বাড়িতে সত্যেন্দ্রনাথের মৃত্যু-পরবর্তী শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানের জন্য কোনো বড় ছবি পাওয়া যাচ্ছিল না। একটি ছোট ছবি দেখে বাবা বড় করে একটি পেন্সিল স্কেচ করেছিলেন, যা ব্যবহৃত হয় সেই অনুষ্ঠানে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন শিল্পীর ছাত্র এবং তৎকালীন কলকাতা আর্ট কলেজের অধ্যক্ষ ধীরেন ব্রহ্মসহ আরো কিছু শিল্পী। এরপর এক সন্ধেয় শিল্পীপুত্র সোমেন্দ্রনাথ এবং ধীরেন ব্রহ্ম বাবাকে ডেকে পাঠান। সামনে বসিয়ে প্রশংসা করে বলেন মাধ্যমিক পাশ করার পর বাবা যেন অবশ্যই সোমেন্দ্রনাথের সাথে দেখা করেন। তিনি বাবার কলাভবনে ভর্তির বন্দোবস্ত করে দেবেন।

“বাবা ফিরে এলেন গ্রামে। এরপর আর আমার বাবার আঁকা শেখা হল না। কলাভবনে ভর্তি হওয়াও হল না। কিন্তু আমার শান্তিনিকেতনে ভর্তি হবার মাঠ তৈরি হয়ে রইল আমার জন্মের ২০ বছর আগে।”

পরের বছর ১৯৭৮ সালে বাবা মাধ্যমিক পাশ করলেন। রেজাল্ট বেরোনোর দুতিন দিন পরেই আশায় বুক বেঁধে বাবা একাই বেরিয়ে পড়লেন শান্তিনিকেতনের উদ্দেশ্যে। দেখা করলেন সোমেন্দ্রনাথের সাথে। সোমেন্দ্রনাথ তখন বিশ্বভারতীর বাংলা বিভাগের হেড অব দা ডিপার্টমেন্ট। তাঁর বাড়িতেই উঠলেন বাবা। সেখানে আতিথেয়তার কোনো ত্রুটি হয়নি। সোমেন্দ্রনাথের তখন নিয়মিত যাতায়াত ছিল রামকিঙ্কর বেইজের কাছে। বাবাকেও সাথে নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। বাবার মাথায় সেদিন হাত পড়েছিল সেই আলোকিত মানবের। বাবার আঁকার খাতা দেখে তার মাথায় হাত বুলিয়ে পিঠ চাপড়ে রামকিঙ্কর বলেছিলেন কোনোদিনও আঁকা না ছাড়তে, এই আঁকাই একদিন বড় করবে বাবাকে।

পরদিন সোমেন্দ্রনাথ বাবাকে একটি পাজামা ও পাঞ্জাবি উপহার দিয়ে বলেন- পবন, এখনই তোমার ভর্তির কোনো ব্যবস্থা করা যাচ্ছে না, তুমি এখন এসো।
বাবা বুঝেছিলেন কোনো ব্যবস্থা এরপরও হবে না, ফিরতে ফিরতে ঠিক করেছিলেন, শান্তিনিকেতনে তাঁর ভর্তি হওয়া হোক বা না হোক তাঁর সন্তান শান্তিনিকেতনেই পড়বে।
বাবা ফিরে এলেন গ্রামে। এরপর আর আমার বাবার আঁকা শেখা হল না। কলাভবনে ভর্তি হওয়াও হল না।
কিন্তু আমার শান্তিনিকেতনে ভর্তি হবার মাঠ তৈরি হয়ে রইল আমার জন্মের ২০ বছর আগে।
এরপর ১৯৯৮-এ আমার জন্ম। তার পাঁচ ছ বছর পর, আমার বাবা আমাদেরই গ্রামের প্রাইমারি ইস্কুলের হেড টিচার এবং আমার মা গঙ্গা সাহা পাত্রসায়ের ব্লকের এক্সটেশন অফিসার। দুজনেই ব্যস্ত মানুষ, বাড়িতে থাকেন না। ফলে, আমি দাদু ঠাকুমার সাথেই থাকতাম। কিন্তু মুশকিল হল তাঁরাও বাড়ির কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লে আমি পাড়া বেড়াতে বেরিয়ে পড়তাম, আমি তখন গ্রামের ইস্কুলে পড়ি, আমার এক ইস্কুল বন্ধু বান্ধবী! এর বাড়ি তার বাড়ি করতে করতে বেলা পেরিয়ে যায়। একদিন ব্যাপারটা মায়ের চোখে পড়ে। বুঝতে পারেন এমন চলতে থাকলে আমার একদম হাতের বাইরে বেরিয়ে যেতে বেশি দিন দেরি নেই। ফলে, তিনিই এবার আমাকে বাইরে পাঠানোর জন্য উঠে পড়ে লাগলেন। খবর নেওয়া শুরু করলেন এখানে সেখানে। এক অধস্তন কর্মচারীর কাছে শান্তিনিকেতনের খবর পান, সেইমত ফর্ম তোলা এবং আমাকে পড়ানো শুরু হল। আমার বিকেল বেলা ঘুরতে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। এরপর ভর্তির পরীক্ষায় আমি পাশ করি। এবং উত্তীর্ণ সাত জনের মধ্যে সর্বপ্রথম নামটি ছিল আমার।
[চলবে]
Share Now শেয়ার করুন