বিশেষ কবিতা সংখ্যা | ১৫ কবির ১৫টি কবিতা

0
305

স্বপ্ন
আহমেদ স্বপন মাহমুদ

কিছুই পারি নি
না টিকিয়ে রাখতে জীবন ও সমাহার
না তোমাকে।
না বিদ্যুৎ ও পল্লবী। না প্রেম।
ডান তো কবেই গেছে কাটা
এক হাতে চলছিল বহুটা বছর
ডান-বাম দুই-ই গেল শেষে
তুমিও কিনা আজ হলে পর।
পারি নি কিছুই
তবুও এক লাল ঘোড়া লাফিয়ে লাফিয়ে চলে
মগজের ভিতর।

নাম
মুজিব ইরম

আমি তাঁর নাম নিয়া নিজনাম ধরি
কী যাতনা
কী বলিবো
নিজেরে পড়িতে গিয়া তাঁর নাম পড়ি।

সেই গান শুনি আমি
শুনি সেই গান
পিতার তরেতে শোক কাঁদে মনপ্রাণ।

কার কাছে করি দুঃখ
বুকে গীত বান্ধি
শোকের আগস্ট আসে
দিবানিশি আমি তাঁর নাম লৈয়া কান্দি!

ব্লু মুন
মজনু শাহ

সমস্ত অতীত জুড়ে নূহের কিস্তির একখণ্ড কাঠ ভেসে আছে।
এখন চেঙ্গিস খাঁর নাম শুনে হেসে ওঠে তোমার সন্তান,
হাম্বুরাবির নাম শুনে যথারীতি ভাবলেশহীন।
আজই ফিরে আসবে জিগোলো আর অন্ধদের রাজা,
তার খাঁচায় পৃথিবীর অন্তিম ডোডো পাখি, তার সম্মানে
খাদ থেকে ক্রেন দিয়ে তোলা হচ্ছে দুমড়ে মুচড়ে যাওয়া ব্লু মুন
যাকে দেখে তুমি মূর্ছা গিয়েছিলে নটকনের বনে।
কে তোমাকে জাগায় বারবার, একটি ঋজু পথ নির্দেশ করে
তোমার জীর্ণ কুটির, যেখানে রুটি, মদ আর গুপ্ত পুঁথি –
জ্ঞানডাকিনী তুমি? প্রেতলোকের হাওয়া বয় যখন
তোমার খয়েরি মখমলের মতো ত্বক ভয়ে ভয়ে ছুঁয়ে দেখি,
কেননা কবিতার শব্দমালা এই লাবণ্যগল্পের সাপেক্ষে
অনুভবক্ষম, তাদের এমন এক অধ্যায়ে ঢুকে পড়তে হয়
যেখানে সাধুকে খায় বাঘে আর মদিলিয়ানির নগ্ন নারীদের দেখে
লিবিডো-উপবাসী ভবঘুরে পলায়ন করে স্বপ্নে।

রাত্রিচর
আলতাফ শাহনেওয়াজ

না-জাগানো শরীরেরা তপ্ত অপচয়ে
বহুদিন ভয়ে ভয়ে
শুয়েছিল
একে অপরকে জড়িয়ে মুক্তার মালা যে রকম
আটকে তাই এসেছে নিঃসাড় দম
দেহ ছুঁয়ে রাতের ভেতর
যেসব অঙ্গার ভোর
খুলে মেলে রাখে বিবসনার জানালা
গাছের পাতার ফাঁকে ক্লান্ত ভোরবেলা
তালা খুলে
দ্বার ভুলে
সেখানে রক্তের মধ্যে ঢোকে দুই লাশ
এবং বাতাস
ফিরে আসে
শেষে আসে মিশুক যন্ত্রবাগান
পাশে পাশে শৃঙ্গার শৃঙ্গার—ভেঙে খানখান
কাঁদে…
.
চাঁদ তখন অচেনা দেহে
আলো ফেলেছিল চাঁদে!

সব পা একরকম নয়
রিঙকু অনিমিখ

পা দেখলেই মাথা পর্যন্ত অনুমান করা যায়

কিন্তু সব পা তো একরকম নয়! কিছু পা
মাথার ওপর ভর দিয়ে খাল পার হয়। কিছু পায়ে
লাবণ্য ধরে কিছু রিকশা চালায়…

কত রকম পা যে দেখা যায়! কিছু উষ্টা মারা পা
ওঁৎ পেতে থাকে, হোঁচট খাওয়া কিছু পা ঘুরেও দাঁড়ায়

পা দেখলেই মাথা পর্যন্ত অনুমান করা যায়

তোমার দুঃখের কাছে ঋণী আমার সকল সুখ
আনিফ রুবেদ

বিক্ষুব্ধ ক্ষুধার্ত সময় গোগ্রাসে গিলে গেল সবকিছু আর তোমার দুঃখের কাছে ঋণী থাকল আমার সকল সুখ।

যখন আমরা কমলালেবু চিনতাম না তখন বাতাবিলেবুর সাথে মেলাতাম পৃথিবীর আকার। কারণ, অসুস্থ না হওয়া পর্যন্ত কমলালেবুর দেখা আমরা পেতাম না। ভালো কমলালেবু নয়, অসুস্থ আমাদের কাছে হাজির হতো অসুস্থ কমলালেবু।

মানুষই কঠিনতম জীব যারা মৃত্যু অপছন্দ করে খুব, যারা মৃত্যু পছন্দ করে খুব।

তুমি একটা প্রদীপের মতো থাকো, আমি অন্ধকার, তোমার কাছাকাছি থাকতে পারি না দিনরাত।

ছোট এই জীবনের ভেতর কখন কখন আকাশ বুনে দিয়েছ, সমুদ্র বুনে দিয়েছ খুব গোপনে। আমি জানতে পারিনি।

কলম খেলার শিমুলফুল মগজের শান্তি খেয়ে, গেয়ে ক্লান্ত করে গেছে দিনরাত।

বয়সী মাছ
স্নিগ্ধা বাউল

আপাতত রঙিন প্রচ্ছদে ছোট্ট একটা ব্যালকনি আঁকছি মাছেদের কানকো ঝরে গেলে যে রঙ হয় বারান্দায় তারে ঝুলায়েছি শতাব্দীর মতো ভালোবাসতে ইচ্ছে করলে আয়নায় চুমু খাই রঙিন শাড়ির ভাঁজ খুলে আঁচল টানি পুরুষ পুরুষ গন্ধ ভেসে এলে জানালায় দেখি রোদের তাকে যক্ষা রোগীর হাঁপড়। আপাতত বেচে আছি। নিজের মূল্য মূলত নিজেকে দিতে হয় এরপর হাত বেহাতে তা রগরগে দাম কমে আসে পৃথিবীর বয়সে।

মিউট
সারাজাত সৌম

আমরা মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হই—
মৃত্যুর জন্য আরও সুন্দর
এবং শান্ত
তারপর সমস্ত বাতাস একই
দুলতে দুলতে দূরত্বহীন আলাপ
একচুলও ফাঁকা নই—
তুমি আমি!

অথচ মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হই—
হই আরও মসৃণ ও সুন্দর
শান্ত হাওয়া—
পাতার উপর পাতার কথা
সে ভাষা মরমী—
হাজার বর্ণের এক পাখি

তাকে রোজ দেখি—
রোজ ছুঁই—
পলকে, পালকের ঝাপটায়
কখনবা দম বন্ধ হয়ে আসে

ভাবি—

আমি কী তুমি!
তুমি কী আমি!

তুমিই কী আমি—
আমরা একেই গানে ভেতর
বাজতে বাজতে দূরে—

মিউট, অথৈ…

হত্যাদৃশ্যের আগের রাতে, চিঠি
কালপুরুষ

সত্যি কি হেরে গেছি, সমর?
কোথাও কি কোনো অর্জন পড়ে নেই— খুঁজলে পাওয়া যাবে এমন!

যদি সময় পাও একটু দেখো
আমার সময় নাই
কোথাও যাবার যদিও
নেই। কোথাও দাঁড়াবার জায়গাও
এত রক্তপাত এত ব্যর্থতা এত হাহাকার
সামান্য মানুষ এত পকেট তো নেই রাখবার

ঢের কাজ আছে তোমারও, জানি
প্রেম প্রেস স্ত্রী খ্যাতি মেয়ের আইস্ক্রিম
মিছিল থিয়েটার বিবিধ সংবর্ধনা
তবু যদি সন্ধ্যের পর চা খাবার অবসরে একটু সময় পাও— দেখো

চিঠি লিখতে হবে না
হাওয়াকে জানিও

আগুনের বিপরীতে এই ঋতু
জোবায়ের মিলন

তার নামে মোম জ্বালি
একার সন্নাস ভেতর, একা একা;
আগরবাতি জ্বেলে নিজের ভেতরে বসি-
মুরাকাবা মতো,
একদিন নিশ্চয় মিল হবে দুই বিচ্ছিন্ন অপেক্ষার
প্রতীক্ষারা গুটিয়ে নেবে বিষন্ন চোখ
অবাধ্য আষাঢ়ীয় ঢলের মতো ঝরবে মিলনের সুখ
পাহাড়িয়া পাথরগুলো হেসে উঠবে খিলখিল
নিরন্ন ঘরটায় ভরে উঠবে দু:খছেনা রঙধনু
বর্ষার আবির ছোঁয়া একান্ত-পৃথিবীতে নাচবে
প্রথম ছোঁয়ার অমিত আনন্দ-কুসুম।

এক বারিমুখো সন্ধ্যায় মৃত্যু নেমেছিলো
জীবন-মৃত্যু,
কবর লেখেনি কেউ
কবর লিখেছিলো কেউ
প্রাণবান ঘাসের চিবুকে জ্বলেছিলো মার্বেল আগুন
আগুনের বিপরীতে এই ঋতু,
ধ্যানের মজলিসে সেই থেকে এই আয়োজন।

হাইপার লুপ
বাদল ধারা

সহস্র ড্রোন পাঠালাম ~ ঐ দূরত্বে
তুমি লুকিয়ে আছ ~ কত দূর
আলোর ঝংকারে ~ চোখ নিভে আসে
তুমি উজ্জ্বল হয়ে ওঠো ~ অন্তঃস্থে,

আমি চাই ইক্ষুর কাগজে ~ ছাপা হোক মিষ্টি কবিতা
তোমার স্তনের তিলকে ঘিরে ~ অসংখ্য স্তুতি
জ্যোতিষ্কের মতো ঝরে পড়ছে ~ উর্বর কোনো গ্রহে

শব্দের সীমাবদ্ধতা আছে তাই নির্বাক ~ ফুটে আছি
টাইমলেন্স জুড়ে ~ প্রতীক্ষা ~ চোখলোচক, মেঘমল্লার

পাখিতে বিস্কুট ফেলে যায়
কবির কল্লোল

ইচ্ছে হয় ফিরে যাই লণ্ঠনের দিনে
পাখিতে বিস্কুট ফেলে যাক
একখানি তিনচালা ঘর, খড় থেকে কেন্নো পড়ুক
ঝিঁঝিঁপোকা দিক রেলডাক

মাড়ের গন্ধ নাকে লাগে
তুশ পোড়ে, পাতা পোড়ে, ধোঁয়া ধোঁয়া ঘ্রাণ
তালপাতা ছাউনির নিচে
আম্মা, আরেকবার উনুন জ্বালান

স্বরে অ-তে অভিনয় শুরু
স্বরে আ-তে আম্মা ও আমি
‘আশ্বিন গেল, কার্তিক গেল
মা লক্ষী ঘরে এল’, আম্মা, আপনি অন্তর্যামী

উশখুশ বালকের বুকে
ক্রিং ক্রিং সাইকেল থমকে দাঁড়াক
বৌ-চি’র আহবান রুখে দিক অদৃশ্য আঙুল
পাখিতে বিস্কুট ফেলে যাক।

সফলতা
খালিদ হাসান ঋভু

আমাদের নাই কোনো নিজস্ব গ্রহ
মানুষের হৃদয়ও নয় কোনো তীর্থস্থান
তাই এই ভুবন বিলাসী হাওয়ায়—
কবরের কৌতূহল জাগে
হলুদ রঙের ম্লান সন্ধ্যায়
মনে হয়— তোমাকে ডাকি

অবিরাম বিশ্রামে মন যার ক্লান্ত
দেহ যার কর্মের পুরোহিত
তাদেরকেও বলি, এসো ধ্যান করি
পরম ভক্তের কাছে নত হই

অগ্নিযুগের দিন ফুরিয়ে গেলে
যদি আত্মশুদ্ধি আসে—
প্রশ্নের পাখাগুলো ভেঙে যায়
নির্মল আলাপে

তখনো জীবন—
যদি মনে হয় হয় জীবিত আফিম
আমাদের পরাবাস্তব প্রেমের কফিন—
খুলে যাবে সফল সঙ্গমে।

মমিইরো সিরিজ
ইয়ার ইগনিয়াস

চুপিসারে খুঁজি কারে, মন থেকে দূরের মহেঞ্জোদারো!

কবন্ধ পাখির মতোই যে অবিদিতে উড়ে গেছে সুখ!
পন্থচিহ্নও নিয়েছে মুছে কম্প্রডানায়; কাঠপিপাসা
জেনেও-সে অদৃষ্টের মতো পরাঙ্মুখ! সমস্ত মূর্চ্ছনা
শরতে বর্ধিত বর্ষার মতন থেমে গেছে ক্ষনিকেই।
বন-বাদাড় সব সাবাড়, যেন অন্য সকল চিড়িয়া
এইভাবে হয়েছে বিলুপ। হায়! মম প্রাকৃত সারস!
সে-ও ডুবে গেছে নক্ষত্রের তলে! অনেক ভেবেছি আমি
কমিটমেন্ট কফিন ভিন্ন কিছু নয়; তাই চিরদিন
নজীরবিহীন হাটখোলা করে রাখি বুকের লাগাম
উড়াল স্বভাব যার, তারে-যে কখনওই বন্দি করিনি!

মন হইলো জংলাফুল,
চিনিচাঁপা গাছে ঝুলে আছে
নাদিয়া জান্নাত

বিষ্টি বাদলা, চুলায় রান্ধা কষা হাঁসের মাংস, পয়লা ফোটা গন্ধরাজের ঘ্রাণ ছেড়ে রোদ মরে যাওয়া পাহাড়ি উঠোনে মন পড়ে আছে।

ইকরি মিকরি খেলার ভেতর যা হারিয়ে ফেলেছি, তার দরদি গন্ধে তরতাজা হয় পা পিছলে যাবার ভ্রম। পুনর্জন্মে বিশ্বাস নেই। থাকলে, পারাপারহীন কলাপাতায় ভাপিয়ে নিতে পারতাম ফুলঝুরি পিঠা। সম্ভাবনা না থাকায়, কাদা ছড়ানো রসুই ঘরে মলিন মুখে বসে আছি।

খড়ের স্তূপে পাখি বাসা বাঁধে, এমন ভরা মাসে কৌটার ভেতর তরতরিয়ে ওঠে মাসকলাইয়ের ছলনা। ঘর সংসারময় দীর্ঘ দৌড়ের ঐপাশে আমার যাবতীয় মরণের সাধ। জাগতিক সুখের দিনে মোলায়েম বাতাস হরিতকির বনকে দরদ দিলে তুমি আমি পাহাড়ে-পাহাড়ে হাঁফ ছেড়ে বাঁচি যেন

++++
সম্পাদনায় : সুবর্ণ আদিত্য, কবিতা বিভাগ, তীরন্দাজ

 

 

Share Now শেয়ার করুন