আবদুল্লাহ আল দুররানী >> বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত : একজন শুদ্ধতম চলচ্চিত্র নির্মাতার প্রতিকৃতি >> চলচ্চিত্র

0
500

বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত : একজন শুদ্ধতম চলচ্চিত্র নির্মাতার প্রতিকৃতি

বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত নামটা শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে একের পর এক নান্দনিক ল্যান্ডস্কেপ, তার সিনেমা যেন কবিতার মতো, প্রতিটি ফ্রেমই মনে হয় কোন শিল্পীর হাতে আঁকা ছবি।

ত্যজিৎ-ঋত্বিক-মৃণাল উত্তরকালে বুদ্ধদেব দাশগুপ্তই সবচেয়ে সৃষ্টিশীল নির্মাতা ছিলেন। তিনি তার চলচ্চিত্রে সার্কুলার ট্রলি, লং ট্র্যাক শট, ট্র্যাক ইন-আউট, টিল্ট আপ-ডাউন, ধীর লয়ের প্যান, স্ট্যাটিক শট ব্যবহার করে আলাদা একটি ভাষা তৈরি করতে পেরেছিলেন । তার আখ্যান নির্বাচন, নির্মাণ আঙ্গিক সবই ছিল দেশীয়। তিনি তার চলচ্চিত্রে বিভিন্ন সময় স্ক্রিপ্টের প্যাটার্ন অর্থাৎ তার ন্যারেটিভ বা নন-ন্যারেটিভ বা দুইয়ে মিলেমিশে ছবি হবে কিনা পরীক্ষা চালিয়েছেন। আবার বিভিন্ন দৃশ্যে প্রতীকী দৃশ্যের ব্যবহার করে তার আবহই বদলে দিয়েছেন। স্বল্প সংলাপ ব্যবহার করে দৃশ্যের মাধ্যমে চরিত্রর মনস্তত্ত্ব ও ঘটনাপ্রবাহ ফুটিয়ে তুলেছেন। তার চলচ্চিত্রে তিনি আমাদের কথাই বলে গেছেন বারংবার।

‘উত্তরা’ ও ‘স্বপ্নের দিন’ চলচ্চিত্রের জন্য পেয়েছেন শ্রেষ্ঠ পরিচালকের শিরোপা। এছাড়া ২০০৮ সালে স্প্যানিশ ফিল্ম ফেস্টিভালে তাঁকে লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড দেওয়া হয়েছিল।

বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের চলচ্চিত্রের ভাষা ও চলচ্চিত্র নির্মাণরীতির নান্দনিকতা ছিল একেবারেই নিজস্ব। ১৯৬৮ সালে শর্টফিল্ম ‘সময়ের কাছে’ দিয়ে শুরু হয় তার চলচ্চিত্র যাত্রা, শেষ হয় ২০১৮ সালের ‘উড়োজাহাজ’ চলচ্চিত্রটির মধ্য দিয়ে। এই সময়ের মধ্যে তিনি প্রায় তিরিশটি চলচ্চিত্র (দূরত্ব, নিম অন্নপূর্ণা, শীত গ্রীষ্মের স্মৃতি, অন্ধগলি, ফেরা, বাঘ বাহাদুর, তাহাদের কথা, চরাচর, লাল দরজা, উত্তরা, মন্দ মেয়ের উপাখ্যান, স্বপ্নের দিন, কালপুরুষ, আমি ইয়াসিন আর মধুবালা, জানালা) ও বিশটির মতো প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেছেন। প্রচলিত চলচ্চিত্র কাঠামোর বাইরে গিয়ে তিনি বানিয়েছেন ভিন্নধারার চলচ্চিত্র, যা তাকে দেশবিদেশ সম্মান ও সম্মাননা দিয়েছে। বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত তার পাঁচটি চলচ্চিত্রের জন্য জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন। ‘উত্তরা’ ও ‘স্বপ্নের দিন’ চলচ্চিত্রের জন্য পেয়েছেন শ্রেষ্ঠ পরিচালকের শিরোপা। এছাড়া ২০০৮ সালে স্প্যানিশ ফিল্ম ফেস্টিভালে তাঁকে লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড দেওয়া হয়েছিল।
সমরেশ বসুর গল্প অবলম্বনে ২০০০ সালে মুক্তি পায় বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের পরিচালিত চলচ্চিত্র ‘উত্তরা’। এতে অভিনয় করেন জয়া শীল, তাপস পাল, শঙ্কর চক্রবর্তী, রাইসুল ইসলাম আসাদসহ আরো অনেকে। সুরকার হিসেবে ছিলেন বিশ্বদেব দাশগুপ্ত, চিত্রগ্রাহক ছিলেন অসীম বসু, সম্পাদনা করেছেন রবিরঞ্জন মৈত্র।

জয়া শীল ও বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত

‘উত্তরা’ চলচ্চিত্রের পটভূমি বাংলা-বিহার অঞ্চল। গ্রামের নির্জন রেলস্টেশন আর গির্জাকে ঘিরে ঘটে চলে গল্পের রেলগাড়ি। মূল প্লটের পাশাপাশি চলতে থাকে একাধিক সাবপ্লট। তৈরি হয় নানা ধরনের সংকট। বাস্তবতার মধ্যেই প্রতীকী দৃশ্য ব্যবহার করে তা নিয়ে যাওয়া হয়েছে অধিবাস্তবতায়। তাইতো বামনদের মুখোশ-নৃত্য, উপস্থিতি বাস্তব অবাস্তবের ধাঁধা তৈরি করে। তিনি এই সিনেমায় নান্দনিক ল্যান্ডস্কেপ শর্ট নিয়েছেন, নিয়েছেন বিস্তীর্ণ প্রান্তর, আকাশে লং শট। এক ফ্রেমের ভিতর দিয়ে তৈরি করেছেন আরেক ফ্রেম। তাঁর চলচ্চিত্রের ভাষা কাব্যময়। তিনি কিছুটা অঁদ্রে তারকোভস্কির দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন।

সহজ ও সরল ন্যারেটিভ ধারার গল্প বলার ধারা থেকে বেরিয়ে বিমূর্ত ও আধা-বিমূর্ত ধারার চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন তিনি।

বলরাম আর নিমাই দুজন সিগন্যালম্যান আর গেটকিপার হিসেবে রেলস্টেশনে চাকরি করে। অবিবাহিত এই দু’যুবক তাদের অবসরে কুস্তি লড়ে। নিজেদের পাওয়া না পাওয়ার সব আক্ষেপ ঝেড়ে ফেলে কুস্তির ময়দানে। তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয় যখন বলরাম উওরাকে বিয়ে করে। এই দ্বন্দ্বের কারণেই উত্তরা ঘর ছাড়ে, ধর্ষণের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করে। অন্যদিকে চার্চের পাদ্রি হত্যার শিকার হয় ধর্মান্ধদের দ্বারা। এই ছবিতে প্রাধান্য পেয়েছে নারী-পুরুষের ব্যক্তিগত সংকট তথা সামাজিক সংকট, রাজনৈতিক সংকট, সর্বোপরি মানবিক সংকট।
বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত একবার বলেছিলেন, উত্তরা ভীষণ একটি প্রতিবাদী চরিত্র, ছবিটা তাকে নিয়েই করা। ফলে আমি নারীর মধ্যে সবসময় একটা প্রতিবাদের স্বর খুঁজে পেয়েছি। আমার জীবনে আমার মাকে আমি দেখেছি, একজন অসম্ভব প্রতিবাদী মানুষ। এই ছবির মধ্যে আমি মনে করি না খুব অস্বাভাবিক কিছু আছে। নারী যেমন মাতৃত্বে ভরা, তেমনি নারীর মধ্যে প্রতিবাদও কাজ করে। হয়তো সবসময় সে-প্রতিবাদ পরিস্ফুটিত হয় না, তবে সে প্রতিবাদ ভেতরে ভেতরে জারিত হতেই থাকে।
‘উত্তরা’ চলচ্চিত্রে চমৎকার শব্দের ব্যবহার করা হয়েছে, পাতাঝরার দৃশ্যের সঙ্গে পাখির ডাক, লোকগান, মুখোশনৃত্যের বাদ্য, শব্দহীন ফ্রেম সবকিছু দৃশ্যগুলোকে আরো অর্থবহ করে তুলেছে। তাছাড়া লোকগানের ভেতর দিয়ে রাঢ় অঞ্চলের সমাজ-সংসার ধর্ম-সংস্কার ফুটে উঠেছে। সংলাপে স্থানীয় কথ্যভাষা ব্যবহার করায় তা আরো বেশি বাস্তবতাকে ছুঁয়েছে। তাছাড়া প্রকৃতি নিজেও এই চলচ্চিত্রের প্রধান একটি চরিত্র তাই তাকেও সংকটে পড়তে হয়।

বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত বলেছেন, আমি তো একটা ফ্রেমের মধ্যে অনেক কথা বলতে চাই। একটা শটে একটা লোক হেঁটে যায়। শুধুই লোকটা হেঁটে যায় এটা আমি কখনোই দেখাতে চাই না। আমি বোঝাতে চাই লোকটা হেঁটে যায়। অনেক শীত-গ্রীষ্ম হেঁটে যায়। ভালো-মন্দ হেঁটে যায়। যেন একটা জীবন হেঁটে যায়।

ধর্মীয় গোঁড়ামি, আগুনে মানুষ পুড়িয়ে মারা, হত্যা ও ধর্ষণ, যান্ত্রিকতা, বহিরাগতের আগমনের বিরুদ্ধে পরিচালক দাঁড় করিয়েছেন স্থানীয় লোকসংস্কৃতিকে তাদের দুঃখ, কষ্ট, সংকট দূর করার জন্য, নতুন দিনের জন্য । ব্যক্তিগত সংকটকে বৃহত্তর রাজনৈতিক সংকটের সংলগ্ন করে তা থেকে উত্তরণের পথ খুঁজেছেন তিনি।
বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত : ন্যারেশন একধরনের স্টাইল। গল্প যে সবসময় বর্ণনাত্মক হবে তা নয়। গল্পের ভেতর অনেক অতিগল্প থাকে। সব মিলিয়ে গল্পটাকে কিভাবে চিত্রায়িত করলাম! বিমূর্ত কীভাবে মূর্ত হয়ে উঠল কিংবা মূর্ততা কিভাবে বিমূর্ত হয়ে উঠল সেটাই বিচেনার সময়।
বামন গার্ড : লম্বা মানুষ তো দেখলে এতকাল। কিছু করতে পারল তারা? পৃথিবীটা বদলাল? খালি যুদ্ধ, যুদ্ধ আর যুদ্ধ। জানো, আমাদের গ্রামে আমরা একটা স্বপ্ন দেখি।
উত্তরা : কী স্বপ্ন?
বামন গার্ড : দেখি আশপাশে সব আমাদের মতো বামনে ভরে গেছে। তারাই চালাচ্ছে সব। মানুষ ভালো আছে।
আবার গার্ড যখন বলে, ‘যারা স্বপ্ন দেখে না, তারা স্বপ্ন দেখার লোকগুলোকে সরিয়ে দিতে চায়।’ তখন আসলে পরিচালক নিজে বামনদের কাতারে দাঁড়িয়ে এ কথাগুলো বলছেন।
বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত : সিনেমা যে সবসময় নিজের জীবনকে তুলে ধরে তা কিন্তু নয়। নিজের জীবনের ভেতরে তো আরেকটা জীবন লুকিয়ে থাকে, আরেকটা জীবন বেঁচে থাকে। আমরা তো একটা জীবনই বাঁচি না। একই সময়ে বেঁচে থাকতে থাকতে বিভিন্ন জীবনে বাঁচি।
এই হচ্ছে বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের চলচ্চিত্র। তার ছবিতে একটা গল্পের নেপথ্যে আছে অনেক গল্প। সিনেমার বহুমাত্রিক ন্যারেশনে ভরা। একটা দৃশ্যে অনেক দৃশ্য। একটা চরিত্রে মিলে-মিশে থাকে অনেক চরিত্র। সব মিলেয়ে হয়তো বলা যায়, একটা সিনেমায় অনেক সিনেমা। কবিতায় যেমন নানা অর্থ পাওয়া যায়, এক-একজন পাঠক এক-একরকম অর্থ পায়, তিনি কবি বলেই হয়তো তার সিনেমাও এমন। এরকম মেলবন্ধন বুদ্ধদেব দাশগুপ্তকে তাই বিশিষ্ট পরিচালক করে তুলেছে।
তার প্রয়াণে আমাদের গভীর শ্রদ্ধা।

Share Now শেয়ার করুন