বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত >> কবিতাগুচ্ছ >> শ্রদ্ধাঞ্জলি

0
583

বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত >> কবিতাগুচ্ছ

প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক ও কবি বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত (জ.১৯৪৪) আজ ১০ই জুন (২০২১) মৃত্যুবরণ করেছেন। তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধার নিদর্শন হিসেবে তাঁর লেখা কয়েকটি কবিতা প্রকাশিত হলো।  

ছাতাকাহিনী

ছাতা বেরিয়ে পড়েছে রাস্তায়। একটা ছাতার পিঠে
ভর দিয়ে চলেছে আর-একটা ছাতা
একটা ছাতার কাঁধে
হাত রেখে চলেছে আর-একটা ছাতা। বাসস্ট্যান্ডে
অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে, অপেক্ষা করে, আজও যখন
এল না সেই ছাতা, ছোটো ছাতা রাগে হতাশায় অপমানে
মিলিয়ে গেল আরো অনেক ছাতার ভিড়ে। দূরে
মাথার ওপর আছে
অত্যদ্ভুত, বিশাল সাদা ছাতা। কোথাও কিছু নেই হঠাৎ
এল ঘুরঘুট্টি মেঘ, জুড়ে বসল
সেই সাদা ছাতার গায়ে। গিজগিজ করে ছাতারা
দাঁড়িয়ে পড়ল
এক-একটা জায়গায়, দাঁত কিড়মিড় করে একটা ছাতা
ছুটে এল
আর-একটা ছাতার দিকে, একটা ছাতা টুটি চেপে ধরল
অন্য-একটা ছাতার। সারাদিন ঘুরে, ঘুরে-ঘুরে, শেষ ছাতাও
বাড়ি ফিরেছে এখন। অন্ধকার একটা কোণায় চুপচাপ
দাঁড়িয়ে আছে সে, আর
তার সমস্ত শরীর থেকে জল ঝরছে, জল ঝরছে, জল ঝরছে।

দিনরাত্রি

সে টের পায় তার শরীর ক্রমশ আরো বেশি ভারি হয়ে উঠছে,
কিন্তু বাইরে সরু সুতোর এক বৃষ্টি
তাকে বসিয়ে রেখেছে অনেকক্ষণ রেস্তোরাঁর ভেতর!
সে নাড়তে পারছে একমাত্র তার মুখ ও মুখর চোখ
আর দূরের টেবিলে বসা স্কুলমাস্টারের প্রেমিকা
ম্লান হেসে লুকিয়ে রাখছে খোলা হাত টেবিলের নীচে,
স্কুলমাস্টার, রিংমাস্টার, মাস্টারের ভাই
ছাতা মাথায় হেঁটে যাচ্ছে ফুটপাথের ওপর, শুধু
ভারী হাওয়ায় ফিরে আসছে পুরোনো রক্তের গন্ধ
যা জমাট হয়ে ভরে রয়েছে টমেটো-সসের শিশি-র ভেতর।
চিরুনির বদলে ছুরি দিয়ে চুল আঁচড়ায় সে, ছুরি দিয়েই
সে এখন মাখন মাখাচ্ছে স্যাঁকা-রুটির ওপর,
ছোট্ট দুধের জাগ থেকে
দুধ ঢালছে কফির ভেতর, চামচ নাড়ার তালে তালে
নড়ে ওঠে সেই এক খাদ্যতালিকা, প্রাতঃকৃত্যের পর যা তার গলায়
ঝুলিয়ে দেওয়া হয় প্রত্যেকদিন এবং তারপরই নুয়ে থাকা মাথা
লাফিয়ে ওঠে কাঁধের দুপাশে, সে ডিগবাজি খেয়ে পৌছে যায়
সম্পাদকের ডেস্কে, লাথি মেরে জানায় সম্পাদক
মজাদার এক ফিচার লেখার কথা,
বাইরে বৃষ্টি, ভেতরে ভারী মূত্রাশয় নিয়ে সে ভাবে
পুরোনো সেই গল্প দিয়ে শুরু করবে ফিচার :
কুচিকুচি বরফের হাত থেকে
কিভাবে বাঁচাতে হয় দাঁত, কিভাবে
এই ভেজা আকাশের তলায় জমে উঠছে যে আগুন –
তাকে ছড়িয়ে দিতে হয় খরখরে ঠোটের ওপর;
আর লিখবে হাসপাতালে থাকা সেই দিনগুলির কথা
যা তাকে শিখিয়েছে
ফোঁটা-ফোঁটা হয়ে সমস্ত কিছু পড়ে
পড়ে জল, রক্ত, পচা মিল্ক-পাউডারের দুধ,
লিখবে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে কাগজের বস্তাপচা খবর
কিভাবে বাঁচিয়ে রেখেছে তাকে দিনের বেলা, রাত্রে
তার ভেতর থেকে
ক্রমাগত উড়ে এসেছে বিজ্ঞাপনের নারী,
ফোঁটা-ফোঁটা হয়ে মিশে গেছে তার স্বপ্নশরীরের ভেতর।

শুধু তুমি যদি আসো
এসে শোও আমার পাশে
হাত রাখো আমার মাথায়
হাত রাখো
আমার নাভির নীচে
তখন যেন উঠে দাঁড়াতে পারি
বলতে পারি –
বেঁচে থাকা জিন্দাবাদ।

মানুষের রহস্যের কথা

তাকে বোলো না
সেই
রহস্যময় মানুষটির
কথা।
সমস্ত দিনের পর
সে এখন
জামা-পাজামা খুলে
দাঁড়িয়ে আছে
শাওয়ারের তলায়।
তার এখন।
মনে পড়ছে না
ঘাম-চমচপে মানুষ
ভিড়ে ভাজাভাজা
রাস্তা
অফিস
নর্দমা
ফাইল
টেবিল
পাশের বাড়ির টিভি।
তার এখন
মনে পড়ছে না কোনো কিছু।
সে এখন
পৃথিবীর
সমস্ত রহস্যময়
মানুষের মতো
সিগারেট খাচ্ছে
আর
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে
উঠে পড়ছে বিছানায়।
বৌ-বাচ্চা রেখে
তার বিছানা
এখন তাকে নিয়ে
বেরিয়ে পড়েছে
দূরে –
বহু দূরে
ঘুরে ঘুরে
এখন চলেছে উড়ে
মেঘের ভেতর,
মেঘ ছেড়ে
গ্রহের পরের গ্রহ ছেড়ে
আরো আরো গ্রহে
উড়ে উড়ে
কোনো এক গ্রহে
এখন দেখেছে সে
চকিতেই
রোবট মানুষ –
বিষণ্ণ
গম্ভীর
গালে হাত
উদাস
উদাস চোখ —
তাকে দেখে
সরে গেছে চকিতেই।
কালকে সকালবেলা
আবার
আবার অফিস
কোর্ট ও কাছারি
ভয় ও
কাছাখোলা দৌড়।
কিংবা
ইঁদুরের মতো
ক্রমাগত
রাশি রাশি ফাইল
বা ফাইলের রাশি রাশি
শব্দের ভেতর
দাঁত গোঁজা
মুখ গোঁজা ও
গুঁজে গুঁজে
স্বপ্ন দেখা
স্বপ্নপারের।
কোনোদিন
কোনোদিন তাকে
বোলো না
সেই
রহস্যময় মানুষটির কথা।

মিথ্যার পাহাড়

এবার আবার সেই আশ্চর্য কবিতাগুলো লেখা হবে
আবার বেরিয়ে আসবে বেড়াল
ব্যাগ থেকে মিথ্যার পাহাড় নিয়ে পিঠে। পাহাড়ের
চূড়ায় দাঁড়িয়ে থাকব আমি, উড়িয়ে দেবো
গত বছরের হাড় হিম করা অপমান, উড়িয়ে দেবো
গত বছরের হতকুচ্ছিত চেহারাটা, উড়িয়ে দেবো
গত বছরের লেখা একশোর বেশি
মন খারাপ করা কবিতা।
কিন্তু তুমি যে সত্যিই আমার জন্য মরে যেতে পারো
বুঝব কী করে? তুমি যে সত্যি আমার জন্যই
বেঁচে থাকতে চেয়েছ এতদিন বুঝব কী করে?
তুমি যে সত্যিই ভালোবাসো কী করে বুঝব?
চারপাশে এত সুতো
হাজার সূক্ষ্ম ফুটোর ভেতর দিয়ে ঢুকছে বেরুচ্ছে,
কোনটা টানলে যে কোনটা খুলবে
সেইসব ভাবতেও ভয় করে, তার চেয়ে
ওরা ওদের মতো থাক।
লোকে তো কত কিছুই বলছে,
আমি কি জানতে চেয়েছি সেইসব?
কেউ বলছে মুখে কালি ছিটিয়ে দেবার জন্য,
কেউ বলছে খুশি রাখার জন্য, কেউ গুছিয়ে নেওয়ার জন্য,
কেউ বলছে রাগী, কেউ বলছে আত্মম্ভর, কেউ বলছে
বুড়োও, বুড়োও—নটে গাছটি মুড়োক তাড়াতাড়ি।
কেউ জানতেও চাইছে না কী করে এতদিন
লুকিয়েছিলাম একটা ব্যাগের মধ্যে, বাইরে শুধু
বেরিয়ে ছিল মুখোশ।
কিন্তু যে কাজগুলো আমি করতে চেয়েছিলাম
সেগুলো সত্যিই কি কিছু হয়েছে?
তার চেয়ে অদ্ভুত একটা খেলা দেখাই তোমাদের,
অত্যাশ্চর্য এই খেলাটা ওই বেড়ালটা
আমাকে শিখিয়েছে, ওয়ান টু থ্রি…
পাহাড় পেরিয়ে জঙ্গল পেরিয়ে আলো ক্যামেরা
পলকা রঙের বানানো বাড়ি পেরিয়ে বেড়াল আর আমি
পগার পার ছুটছি…

লতি বলছে – ওগো, একটা কথা হাজারবার
বলার দরকার নেই, হাজার কথা
একবারও বলার দরকার নেই, গন্ধ পাচ্ছো?
গন্ধ পাচ্ছো?
গন্ধ পাচ্ছো আমার বুকের,
আমার বুকের নিচের তিলের?

চাঁদের পাহাড় থেকে

বয়স ঘুমিয়ে আছে। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে কোথায় চলেছে বয়স এখন?
এই যে যেখানে চারদিকে সব কিছু জাগতিক,
যেখানে কেবলই দাড়ি বাড়ে,
বাড়ি করে দোতলা-তিনতলা ছোটো ভাই
গাড়ি করে আসে নারায়ণ…
সেখানে বয়স কেন ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে যায়
গোপন নদীর দিকে,
নিষিদ্ধ টিলার দিকে,
শ্লেটে ভাসা স্বপ্নের দিকে?
যতীন জোলাপ খায়, দাঁত তোলে বাদলের বউ,
আলমের টাক পড়ে,
আলমের টাকাও হয়েছে তবে খুব।
ওরা বয়েসের আগে আগে থাকে।
ওদের অশান্তি নেই কোনো পেনশন হাতে নিয়ে তাই
শালীর মিয়ানো মাই নাড়ে,
ভোর হলে গান গায়… এবার ভেড়াও তরী তীরে…।
শুধু বয়স তোমার কেন স্কুলের ঘণ্টার শব্দে
জেগে ওঠে মাঝরাতে, ধারাপাত পড়ে, ধরার ধুলোর মধ্যে
ডিগবাজি খেয়ে ফিরে যায় অবেলায়?
হলুদ, হলদে পাতা
ঝরে যায় শালের জঙ্গলে,
বৃষ্টিভেজা ঘাসের ওপর দিয়ে
চলে যেতে যেতে কেউটে ছোবল মারে সন্ধ্যার পায়ে,
চাঁদের পাহাড় থেকে গড়িয়ে গড়িয়ে
আশ্চর্য পাথর পুরুলিয়া ফিরে চলে যায়…।
তুমিও কি পুরুলিয়া যাবে?
বামন আর বামনির গ্রামে গিয়ে ভাত খাবে?
তোমাকে কি কুরে কুরে খায়? আক্কেল হবে না কোনোদিন?
ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে
কতকাল স্মৃতি-বিস্মৃতির গায়ে জড়াবে মায়ার রেশ, ছায়া ও ছলনা?

হাতেম তবু হাঁটে

‘সবটুকু চাই’, ‘সবটুকু চাই’ বলে
ছোট্ট পাখি
হাতেমতাই-এর কোলে
ছটফটিয়ে উঠল বারবার।
হাতেমতাই
হাঁটতে থাকে, হাঁটে…
সামনে রাস্তা, ভয় ও অন্ধকার।

‘সবটুকু চাই’, ‘সবটুকু চাই’ বলে
ছোট্ট পাখি
কানের কাছে বসে
নামতা পড়ে আবার।
প্রবাদপ্রতিম পাহাড়
খসে পড়ে,
পথ নেই যে যাবার।
হাতেম তবু হাঁটতে থাকে, হাঁটে…
সামনে রাস্তা কুটিল, হাহাকার।

‘সবটুকু চাই’, ‘সবটুকু চাই’ আমি
ছোট্ট পাখি
মাথার ওপর ওড়ে।
নীচে গভীর খাদে
মিলিয়ে যেতে যেতে
কোন রহস্যে হাতেম ভেসে ওঠে।
হাতেমতাই হাঁটতে থাকে,
হাঁটে…
সামনে রাস্তা স্পষ্ট হয় না আর।

‘সবটুকু চাই’, সবটুকু চাই’ বলে
ছোট্ট পাখি
ঝোড়ো হাওয়ায়
যত্রতত্র ওড়ে
অদ্ভুত এক ঘোরে
সূর্য ঢাকা ভোরে…
উড়তে উড়তে ক্লান্ত পাখি বলে,
‘হাতেমতাই বলো,
সবটুকুনি দেওয়ার কেন বাকি?

‘সবটুকুনি কী, ছোট্ট পাখি?

‘সবটুকুনি মানে তোমার
একলা একা হাঁটা,
সবটুকুনি মানে অন্তঃস্থল,
সবটুকুনি মানে, তোমার
স্বপ্নে ঢোকার চাবি,
সবটুকুনি মানে –
চোখের জল।’

আঁধারে, মাঝরাতে
ওই দেখা যায়।
হাতেমতাই হাঁটে…

খেলা চলে

পলায়ন মানেই যে হাঁটু গেড়ে বসে পড়া
সম্ভাব্য চেয়ারে, যখনই বাঁশি বাজে
দ্রুত দৌড় অথচ কোথায় থাকো তুমি
হারমনিয়াম বেজে বেজে ক্লান্ত একা একা খেলা যায় নাকি
তুমি বলো এই ভালো এই একা একা
অর্ধসচেতন চাঁদ ওড়ে আকাশে, নালায়
বাকি যা চেতনা তাতো পাশের বাড়ির
মেয়ে চেরা নখে যদি উলের বলটি
ক্ষিপ্র বেগে ঠেলে দেয় ছাদের ওপারে
সাময়িক বোঝা যায় তার কাছে আছে
আমি দেখি খড়খড়ি তুলে দই বেলা,
পাঠ-সংকলন থেকে তুমি আমাকেই বাদ দাও
ঘোড়ার জিনের পাশে মানুষের মুঠি কাৎ করা
চিরদিন এই এক বৈপ্লবিক দৃশ্য
শানায় সাবান, বঁটি, নিস্তব্ধ কপির ঝোল,
সৌরমণ্ডলের কথা ভাবি বোঁচা নীল মাছির সংগম
খেলা চলে তুমি বলো এই ভালো এই সব এই, এই, আর

গুটগুটিয়ে চলেছে নীল পোকা

একটা কথা হাজারবার বলার দরকার নেই।
হাজার কথা একবারও বলার দরকার নেই।
গন্ধ পাচ্ছো, বাতাসে উড়ে বেড়াচ্ছে মানুষ,
গন্ধ পাচ্ছো, সাদা মেঘের ওপর
নেমে এসেছে
কালো মেঘ, গন্ধ পাচ্ছা?
মোটা আঙুলের ভেতর
ঘুমিয়ে পড়েছে সরু আঙুল, গন্ধ পাচ্ছো
ঘাসের ওপর গুটগুটিয়ে চলেছে নীল পোকা?
গন্ধ পাচ্ছো গন্ধ পাচ্ছো গন্ধ পাচ্ছো?
শুনতে পাচ্ছো, পৃথিবী
আর একটা পৃথিবীর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে,
শুনতে পাচ্ছো এখনো একটা মানুষ
অন্য একটা মানুষের দিকে এগিয়ে চলেছে,
শুনতে পাচ্ছো জলের অনেক তলায়
একটা মাছের দিকে মুগ্ধ হয়ে
তাকিয়ে আছে আর একটা মাছ?
ওপর দিয়ে জাহাজ চলেছে মাদাগাসকার,
ওপর দিয়ে লতির বর সাইকেলে চাপিয়ে
লতিকে নিয়ে উড়ে চলেছে
আখখেতের ভেতর,
বাড়িতে এক কুড়ি লোক।
লতি বলছে – ওগো, একটা কথা হাজারবার
বলার দরকার নেই, হাজার কথা
একবারও বলার দরকার নেই, গন্ধ পাচ্ছো?
গন্ধ পাচ্ছো?
গন্ধ পাচ্ছো আমার বুকের,
আমার বুকের নিচের তিলের?

অন্ধকার ট্রেনে

একটা কিছুর দরকার হয়, হয় না?
যেমন তোমার বুক ঢাকার ওই আঁচল
যেমন তোমার ঠোঁটের লাল আভা।
যেমন তোমার স্তনবৃন্তের তিল, যেমন তোমার
কাজল ঘেরা জম্বু দ্বীপ ও জাভা।
একটা কিছুর দরকার তো হয়ই, হয় না? যেমন আমার অশান্ত সব পদ্য,
যেমন আমার সাপের ফণা তোলা, যেমন হঠাৎ দুরন্ত বৃষ্টিতে
তুমি আমার শরীর জুড়ে বাজো।
কিন্তু জীবন একটা নাকি দুটো?
ঝড়ের মতো আছড়ে চলছে যেটা, মুখ থুবড়ে পড়ছে মাঝে মাঝে
অন্য জীবন বলছে তাকে, ওঠো, বেরিয়ে পড়ো,
বেঁচে থাকাটা রহস্যময় আজো।
একটা কিছুর দরকার হয়, হয় না?
যেমন তোমার বুকের নীল আঁচল,
যেমন তোমার ঠোটের রক্ত আভা,
যেমন তোমার ঘুমের মাঝে মাঝে
স্বপ্ন এবং দুঃস্বপ্নের আসা।
একটা কিছুর মানে জানতে গিয়ে
খামােখা ওই অন্ধকারে ট্রেনে
একলা ও কে যাচ্ছে গোসাবা।

বৃষ্টি

কালো মেঘের পাশে সাদা মেঘ
সাদা মেঘের পাশে লাল মেঘ
লাল মেঘের পাশে হলুদ মেঘ
ব্লুদ মেঘের ভেতর
ঘুমিয়ে আছো তুমি
ঘুমিয়ে আছে তোমার বাবা
ঘুমিয়ে আছে গড়িয়াহাটের রাস্তা
ব্রিজ, ভিখিরি আর তার কুত্তার বাচ্চা
আর অনেক নিচে ছাতা মাথায়
দাঁড়িয়ে আছি আমি
ছাতার তলায় সেইসব মেঘেরা
এসে জমছে
বৃষ্টি হচ্ছে ছাতার তলায়
জাগিয়ে রেখেছে আমাকে

কালী কালী কালী

অনেক দূরে একটা কুত্তার বাচ্চা
সকাল থেকে মাইকে শ্যামাসঙ্গীত বাজাচ্ছে
কালী কালী কালী
শুনতে-শুনতে রক্ত উঠে যাচ্ছে মাথায়
রক্ত ছিটকে পড়ে ভিজিয়ে দিচ্ছে শহর
ভিজিয়ে দিচ্ছে রাস্তাঘাট, মনুমেন্টের চূড়ো
কালি কালি কালি
তুমি আমার মনখারাপ নিয়ে নাও
আমার বুকের অসুখ নিয়ে নাও
আমার একা-থাকা নিয়ে নাও
কালি কালি কালি
যে-লোকটা মাইক বাজাচ্ছে
তার মুণ্ডু কেটে গলায় পড়ে নাও

যেন

সামনের জন্মটা আমি শুধু
ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিতে চাই।
যত ঘুম
এই জন্যে আমাকে ছেড়ে গেছে
যত ঘুম
হাজার-হাজার জন্ম আমাকে
নাচিয়ে ছেড়েছে
সে-সমস্ত ঘুম
যেন এক হয়ে
নেমে আসে
সামনের জন্মের চোখের ভেতর
কেউ যেন
আমাকে জাগাতে না পারে।
কেউ যেন
আমাকে হাঁটাতে না পারে।
কেউ যেন
আমার জন্য চাল না-ফোটায়
আলু না-কাটে
ফুলকপির টুকরো-টুকরো…
শুধু তুমি যদি আসো
এসে শোও আমার পাশে
হাত রাখো আমার মাথায়
হাত রাখো
আমার নাভির নীচে
তখন যেন উঠে দাঁড়াতে পারি
বলতে পারি –
বেঁচে থাকা জিন্দাবাদ।
যেন বলতে পারি –
জল ফুটছে হাঁড়িতে
ছেড়ে দাও একমুঠো চাল
একটা ডিম
একটা আলু
যেন বলতে পারি
এই খিদেটা জিন্দাবাদ।

Share Now শেয়ার করুন