বুলবুল চৌধুরী বিশেষ সংখ্যা | লিখেছেন সৈয়দ কামরুল হাসান | হামিদ কায়সার | পুলক হাসান

0
208

সৈয়দ কামরুল হাসান | বুলবুল চৌধুরীর গল্প : দ্বিতীয় পাঠ | প্রবন্ধ

এ-কথাও ঠিক যে, সমসাময়িক বাংলা কথাসাহিত্যে পল্লিবাংলার ছবি দুর্লক্ষ্য নয় – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় কিংবা অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখায় এসেছে সে-ছবি কমবেশি। কিন্তু চরিত্রগুলির মুখে বসানো তাদেরই ভাষায় নিখুঁত সংলাপ ও আটপৌরে জীবনে ব্যবহৃত শব্দমালা তাদেরকে পৃথিবীর যে-কোন জনপদ থেকে আলাদা করে – আমাদের বুঝতে অসুবিধা হয় না তারা কেবলমাত্র আমাদেরই লোক।

 

ক্তিমান কথাসাহিত্যিক কায়েস আহমেদ ছিলেন বন্ধু, ঢাকার কে এল জুবিলী হাইস্কুলে তাঁরা একই ক্লাশে পড়তেন। সহপাঠী কায়েস আহমেদের বদৌলতে তাঁর সংগ্রহশালা থেকে তিনি পড়ে ফেলেন কল্লোলের লেখকদের সাহিত্যকর্ম। এইভাবে কথাসাহিত্যের প্রতি বুলবুল চৌধুরীর আগ্রহ তৈরি হয়। কায়েস আহমেদ তাঁকে হাতে ধরে অচেনা পথে পা বাড়ানোর সাহসও যোগান – দুবন্ধু মিলে চষে ফেলতেন সেকালের বায়ান্নো বাজার তেপ্পান্ন গলির ঢাকা শহর; বিউটি বোর্ডিংয়ের সাহিত্য আড্ডায়ও প্রথম পা রাখেন কায়েস আহমেদের হাত ধরেই। এখানেই পরিচয় ও বন্ধুত্ব হয় কবি আবুল হাসান, নির্মলেন্দু গুণ, মাকিদ হায়দারসহ সেকালের নামী দামী ও যশোপ্রার্থী আরো অনেক কবি-সাহিত্যিকের সাথে। কলেজ জীবনে এসে বন্ধু কায়েস আহমেদের প্রণোদনায় লিখে ফেলেন গল্প : ‘জোনাকী ও সন্নিকট কেন্দ্র’। গল্পটি জগন্নাথ কলেজ আয়োজিত গল্প প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় পুরস্কার লাভ করলে তিনি এই কলেজের শিক্ষক, বিশিষ্ট লোকসাহিত্য গবেষক প্রয়াত শামসুজ্জামান খানের স্নেnদৃষ্টি লাভ করেন। ১৯৬৭ সালে রচিত এই গল্পটি সেকালের ছোটগল্প বিষয়ক বিখ্যাত পত্রিকা কামাল বিন মাহতাব সম্পাদিত ‘ছোটগল্পে’ প্রকাশিত হয়, যে-পত্রিকার সম্পাদনায় ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন কায়েস আহমেদও। কায়েস আহমেদের সাথে এই নিবিড় সখ্যতা জীবনের পরবর্তী পর্বে আর বজায় রাখা সম্ভব হয়নি। ইতোমধ্যে পরিবর্তিত হয়েছে উভয়ের পেশা, আবাসস্থল, লেখক হিসেবেও ততদিনে উভয়ে পরিচিত হয়ে উঠছেন পাঠকমহলে। এমনকি কায়েস আহমেদের আত্মহননের সংবাদও বুলবুল চৌধুরী পান ভিন্ন সূত্রে, গণমাধ্যমে। উভয়ের অনিচ্ছায় তৈরি হয়েছে যে-দূরত্ব, তা ঘুচিয়ে আনার তাগিদ কেউই আর বোধ করেননি। তবে, আমার ধারণা দূরত্বই ছিল ওই বন্ধুত্বের পরিণতি! কেননা উভয়ের মূল দূরত্বটুকু বস্তুতপক্ষে তাদের সাহিত্যভাবনা, দর্শন ও দৃষ্টিভঙ্গীর – অনেক ক্ষেত্রে এমনকি তা ছিল একেবারে পরস্পরের বিপরীত। একটু তলিয়ে দেখলে আমরা বুঝতে পারি কায়েস আহমেদ ও বুলবুল চৌধুরী উভয়ের রচনাসমগ্র বিত্তহীন ও নিম্নœবিত্তের জীবনকে ঘিরে আবর্তিত হলেও  পর্যবেক্ষণ ও লক্ষ অনুসন্ধানে উভয়ের অভিমুখ ও অগ্রাধিকার পৃথক। এই ভিন্নতা কিংবা তফাৎ আসলে আমাদের কথাসাহিত্যের দুই ধারার, যার একটিকে বাঁচিয়ে রাখা ও পুষ্ট করার কাজে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন বুলবুল চৌধুরী। এই উভয় ধারার তুলনামূলক আলোচনা নিঃসন্দেহে একটি আকর্ষণীয় গবেষণার বিষয় হতে পারে। তবে বর্তমান নিবন্ধে আমি শুধু বুলবুল চৌধুরীর গল্পপাঠের অভিজ্ঞতাসূত্রে লব্ধ আমার কিছু ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ ও প্রতিক্রিয়া পাঠকের সামনে তুলে ধরবো। প্রসঙ্গত, সম্প্রতি আমি বুলবুল চৌধুরীর নির্বাচিত গল্প দ্বিতীয় বার পাঠ করেছি।

‘টুকা কাহিনী’ বুলবুল চৌধুরীর প্রথম গল্প – যা প্রকাশ পাবার পর তিনি বিপুল পাঠক ও সমালোচকদের আলোচনায় উঠে আসেন। এই গল্পে বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে একটি নতুন ও আলাদা স্বাদের মেজাজ পরিস্ফুট হয়ে ওঠে। বোঝা গিয়েছিলো আমাদের সাহিত্যে এক স্বতন্ত্র প্রতিভার আগমন ঘটেছে। স্বাধীনতা-উত্তর কালে বাংলাদেশের গল্পের নায়ক টুকা, আসলে নিম্নবর্গের মানুষের প্রতিনিধি। লেখক বুলবুল চৌধুরী তাকে পাঠকদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন : “খাটো মানুষ, মাথার চুল যথাসম্ভব ছোট করে ছাঁটা। গোলগাল মুখ তেল চকচক করে,ফোলা ফাঁপা পেট – টুকার পেট এরকমেরই থাকে, সেরেক চালের ভাত খেলেও, দু’দিন অভুক্ত থাকলেও। যদি আলো-আঁধারিতে সে কোথাও গাঁট মেরে বসে থাকে, তাহলে মানুষ বলে ঠাউর করা যায় না। ঠাউর হয়, কেউ গোবর-পচা বা কোন আবর্জনা কোদালে কুপিয়ে, পাতিতে বয়ে এনে দু’এক পাতি ফেলে রেখেছে।” বাংলাদেশের সাহিত্যে এই সময়টায় আবির্ভ~ত একঝাঁক নতুন লেখকের বড় একটা অংশ যখন কিনা ব্যস্ত রমনা পার্কে জিনস-পরা টিনএজ নায়ক তার নায়িকার আগমনে দেরি হওয়ায় কি গভীর বিষণ্ণতায় ভুগছে সে-ছবি আঁকায়, সেখানে দূর পাড়াগাঁয়ের এক অনাথ টুকা বুলবুল চৌধুরীর গল্পে তার প্রকৃতি ও প্রতিবেশ নিয়ে অনন্য স্বাতন্ত্র্যে উঠে দাঁড়ায়। প্রকৃতির মধ্যে জীবনের সপ্রাণতা এঁকে লেখক বুলবুল চৌধুরী আমাদের নিয়ে যান এক অন্য ভুবনে। “বর্ষা সেই যে তিরতির করে বাড়তে থাকে আষাঢ় থেকে, ভাদ্রে এসে ফণা দিয়ে দাঁড়ায়। অনেক সময় পানি বাড়ের সাথে আমন ফসল পেরে ওঠে না। কোন রকমে হাইফাই করে একটু যদি তুলতে পারে মাথা তাহলে দাবায় কে? সবুজ, পাতলা ধার ধার ধাঁচের সেই ধানপাতা নতুন ধারের কাঁচির মতো উঠতেই থাকে ওপর দিকে।” পরম মমতায় আপন ঘোরে ছবি আঁকেন শিল্পী, পাঠকও নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ঢুকে পড়ে বুলবুলের চিত্রশালায়, কখন যে তার সংবিৎ হারায় তা আর মালুম হয়না পাঠকের! “আইনুল বোধ হয় ঘুরে ঘুরে ছিপ থেকে মাছ খুলছে। চারিদিকে মাছের কাড়ি কাড়ি টাবুস-টুবুস শব্দ – উয়াস দিচ্ছে মাছ, পানির তলা ছেড়ে একদম কিনারে-কানারে চলে এসেছে, পোকা-মাকড়, পচা-ময়লা আর নানা বর্ণের আদারের খোঁজ করতে।” তুলির ছোট ছোট স্ট্রোকে আঁকা বুলবুলের আর একটা ছবি : “সূর্য নামে নিচের দিকে। কোন লোক চলাচল নেই এখন। গরু-ছাগল ঘরে ফিরছে। গামলায় গরম পানি করে তাতে খুদকুঁড়ো ছেড়ে গরু-ছাগলকে পানি দেখান হবে। গোয়ালে যাবে গরু-ছাগল। সন্ধ্যার সাথে সাথেই মানুষজন এসব সেরে ফেলে মশার ধোঁয়া দিতে বসে। টুকার সন্ধ্যাবেলাটা দারুণ দুর্বিষহ। ঘরে টিকটিকি আছে। যতক্ষণ কুপি জ্বালান থাকে, ততক্ষণ দেখা যায় টিকটিকি পোকা মাকড়ের দিকে তাক হয়ে আছে। দেখে কুণো ব্যাঙটা লাফ দেয়। কোথায় উঠতে চায় ব্যাঙ? টুকিনি থাকতে এগুলো দেখতে পেতনা সে। এই যে হিম হিম করে নীরবতা আস্তে আস্তে জাঁকিয়ে বসে, তাও হত না। একটু একটু আচ্ছন্ন হয়ে শুয়ে থাকে টুকা। ঘুম না, জাগরণ না। তখনই মনে হয় কে যেন ডাকে, বলে, উঁককা খাইবেন?” (টুকা কাহিনী)

গল্পের প্লট ও চরিত্রকে তিনি তাদের স্বভূমিতে রেখে, সংশ্লিষ্টদের ভাষা, মুখের সংলাপ ও অনুষঙ্গে তুলে এনেছেন বলে সেগুলি জীবন্ত অবস্থায় পাঠকের মনোজগতে ছাপ ফেলে। এইভাবে সমকালীন সাহিত্য-ধারার প্রেক্ষাপটে সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে বুলবুল চৌধুরীর কণ্ঠস্বর ও মেজাজের নিজস্বতা, ভিন্নতা।

এই গল্পের টুকা, মায়মুনা এবং আরো দুএকটি চরিত্র যারা নিম্নবর্গের প্রতিনিধিত্ব করে – যে-গল্পের পটভূমি বৃহত্তর গ্রামবাংলার কাদামাটি ও জলজ জীবন – তাকে তুলে আনতে গিয়ে লেখক নিজেই যেন নেমে যান সেই পটভূমিতে – সেই সঙ্গে পাঠকও যায়। আর তারপর লেখক ও পাঠক মিলে তুলে আনেন সেই জনপদের ভাষা, প্রকাশভঙ্গী ও চিত্রকল্প। গল্পের প্লট ও চরিত্রকে তিনি তাদের স্বভূমিতে রেখে, সংশ্লিষ্টদের ভাষা, মুখের সংলাপ ও অনুষঙ্গে তুলে এনেছেন বলে সেগুলি জীবন্ত অবস্থায় পাঠকের মনোজগতে ছাপ ফেলে। এইভাবে সমকালীন সাহিত্য-ধারার প্রেক্ষাপটে সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে বুলবুল চৌধুরীর কণ্ঠস্বর ও মেজাজের নিজস্বতা, ভিন্নতা।

শুধু কি নিন্মবর্গের মানুষের বিচিত্র সমাবেশ ঘটেছে বলেই তাঁর রচনাসমূহ বিশিষ্টতা দাবি করবে? এর জবাব খুঁজে দেখার আগে এখানকার সাহিত্যের গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে সামান্য কিছু আলোচনা করা বোধ করি অপ্রাসঙ্গিক হবে না। আমাদের এখানে, এমনকি স্বাধীনতার আগেও কথাসাহিত্যে আমরা ব্যাপকভাবে দরিদ্র, প্রান্তিক ও নিম্নবিত্ত মানুষের সমাগম দেখেছি, স্বাধীনতার পরে যুদ্ধের অভিজ্ঞতায় কথাসাহিত্যে তাদের উপস্থিতি আরো স্পষ্ট ও জোরালো হয়েছে। অনেকের সাহিত্যে দেখেছি অধিকার আদায়ের পক্ষে মানুষ জোরালো অবস্থান নিয়েছে, শোষিত বঞ্চিত মানুষের কণ্ঠস্বর উচ্চ থেকে উচ্চগ্রামে পৌঁছেছে, কি গল্পে, কি কবিতায়। এর অনুষঙ্গ হিসেবে মানুষের দৈনন্দিন জীবন-সংগ্রামের ছবিও উঠে এসেছে – গ্রামীণ ও শহুরে উভয় পটভূমিকায়। আমাদের স্বীকৃত ও প্রশংসিত লেখকদের আর একটি বড় অংশ স্বাধীনতাত্তোরকালের পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে ক্রমবিকাশমান/ অবিকশিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর স্বপ্নভঙ্গ, হতাশা, অনিশ্চয়তা, নৈরাজ্য, একাকীত্ব, নিঃসঙ্গতা ইত্যাদি নিয়ে নাগরিক বলয়ে আবর্তিত গল্প ও কাহিনী তাদের লেখার উপজীব্য করেছেন। সন্দেহ নেই, এই দুই তরফের অনেক শক্তিশালী লেখকের কলমে আমরা ভালো ভালো লেখা পেয়েছি। ফলে সমৃদ্ধ হয়েছে/ হয়ে চলেছে আমাদের সাহিত্য। কিন্তু বুলবুল চৌধুরীর কলম তুলে এনেছে আরেক বাংলাদেশ – ‘অপরূপ বিল-ঝিল-নদী’ ঘেরা চিরন্তন ও আবহমান বাংলাদেশের নিটোল ছবি। গ্রামবাংলার জলজ জীবনকে ইমপ্রেশনিস্ট শিল্পীদের মতো নতুনভাবে এঁকেছেন তিনি। নতুনভাবে এঁকে তিনি নতুন করে আমাদের কাছে ফিরিয়ে দেন আমাদেরই হারিয়ে ফেলা জনপদ। ‘পরমানুষ’ গল্পে দেখুন তাঁর আঁকা সেই ছবি : “ঘন বর্ষায় ডুবে আছে পথঘাট। জলায় এখন হাওয়ায় হাওয়ায় ঢেউয়ের কলকল, ছলছল শব্দ জাগরুক। মেঘের ফাঁকে ক্ষীণ চাঁদ জেগে উঠে দেয় উঁকি। ওটুকুতে কি আর জোছনা প্লাবিত হয় চরাচর? অনুভব জানায়, মাটির নিচে চলছে বর্ষার ঝরঝর স্রোতে। অন্যদিকে বৃষ্টি এসেও সেই তলানির নাগাল ছুঁয়ে যায়। গাছপালা, লতাপাতা, ঘাস ভিজে ভিজে পরস্পরে বড় জড়াজড়ি। চারদিকে প্রকৃতির নিবিড় বন্ধন। আর ওইটুকু চাঁদও উপর থেকে বিলায় রহস্য নিঝুম। আর যে তাকে আগল আগল ধরে রাখে, সেই শক্তি নিশ্চয় ঈশ্বর স্বয়ং।” অথবা ‘নদী জানে’ গল্পের এই ছবিটা : “ডালপালার আড়াল ভেদ করে কয়েক ফোঁটা বৃষ্টির পানি জ্বরতপ্ত আর শীতে কাঁটা দেয়া শরীরে এসে থামে। সঘন বিদ্যুৎ চমকায়। সেই আলোয় আলোয় ঢেউ জাগে। তাতে স্পষ্ট হয় অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা মাংস-লোভি শিয়াল। দুটো সাপ ছিল দেবদারুর খোড়লে। জোড় বেরিয়ে আসে। হয়ত বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে প্রণয় খোঁজা। আবার সেই সাথে এই অবাধ জঙ্গলে মানুষের বাস সাপ দুটোকে খানিক বিস্মিতও করতে পারে।”

এইসব ছবি গা-হাত-পা বাঁচিয়ে, তীরে দাঁড়িয়ে পুরো বোঝা সম্ভব নয়, পাঠককেও তাই নেমে পড়তে হয় সেই অপরূপ বিল-ঝিলে ঘেরা একদা ফেলে আসা জনপদে। সে-ছবি আঁকায় শিল্পী যেন কৃত্রিম রাসায়নিক রংয়ের ব্যবহার বর্জন করেন, প্রয়োজনমত প্রাকৃতিক রং ব্যবহার করতে গিয়ে অনেক আঞ্চলিক শব্দ ব্যবহার করেন তিনি অবলীলায় – “টাবুস-টুবুস, উয়াস, আদার, উঁককা”। এ-কথাও ঠিক যে, সমসাময়িক বাংলা কথাসাহিত্যে পল্লিবাংলার ছবি দুর্লক্ষ্য নয় – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় কিংবা অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখায় এসেছে সে-ছবি কমবেশি। কিন্তু চরিত্রগুলির মুখে বসানো তাদেরই ভাষায় নিখুঁত সংলাপ ও আটপৌরে জীবনে ব্যবহৃত শব্দমালা তাদেরকে পৃথিবীর যে-কোন জনপদ থেকে আলাদা করে – আমাদের বুঝতে অসুবিধা হয় না তারা কেবলমাত্র আমাদেরই লোক। এইভাবে বুলবুল চৌধুরী নিজেকে যেমন, তেমনি তাঁর পাঠককওে আপন শেকড়ে সম্পৃক্ত করেন। তাঁর গল্পগ্রন্থ – টুকাকাহিনী, পরমানুষ, মাছের রাত, চৈতার বউ গো-র প্রতিটি গল্পের সর্বত্র ছড়িয়ে আছে এর সাক্ষ্য। আরো ২/৪টি নমুনা :

১. ইদ্রিস বলে, খালুইডা লইয়া ল। এক চককর দিয়া দেহি। গেলে মাছ কিছু পামু। কেমুন বাও দেখছস? (মাছ)

২. আয়েশা জানতে চাইল। সই লো, তর জামাই বাড়ি কত্তো দূর? যাইতে যাইতে বেইল কাবাইরা যায়, না?

হ, গো, গাঙে গাঙেই বেইল যায়। গাঙ যেনে গো ফুরায় না। নাও চলতে থাহে তো চলতেই থাহে। হেই কহন রওনা দিছি, আইতে আইতে দিন কাবাইরা যায়। তয় ক’দেহি, কেমুন দূরডায় আমার জামাইর ঘর। (নিরবধিকাল)

৩. তোমার দুইডা পায়ে ধরি, ছাইড়া দেও। মাগো, তুমি বুঝ না কেরে? সই কইছিল, সই না – হের পেডে আট মাসের পোলা। জব্বর লাথি গুতা খেলে। কেমুন জানি লাগে তহন। আল্লাগো।  (নিরবধিকাল)

৪. বুড়ি লাঠি বুকের সাথে আঁকড়ে ধরে জবাব দেয়, কিছু যেমুন জানে না। অই, আমি না গেলে ওমরদ্দির বউ কারে ডাকে ?

কি অইছে আবার ?

কই নাই, বউডার পেডে পোলা?

ওহ, হুনছিলাম যেমুন। কয় মাস?

দশ মাস যায় কি না যায়! নয় মাসেই ছডি নামতে পারে। (জীবে দয়া করে যে জন)।

আঞ্চলিক শব্দের সার্থক প্রয়োগে গল্পের উপযোগী আবহ সৃষ্টি করা ছাড়াও ভাষার নির্মিতেও তিনি নিজস্বতার পরিচয় দেন। দেখা যায়, আমাদের লেখকরা যখন গল্পে ভাষার পরীক্ষা-নিরীক্ষায় বিভোর – কেউ কেউ যখন দুই-একটি অনুচ্ছেদেও বাক্যে যতিচিহ্ণ টানছেন না, তখন বুলবুল চৌধুরী আরো হ্রস্ব করে আনেন তাঁর বাক্যের দৈর্ঘ্য। এমনকি একটি মাত্র শব্দেও তিনি বাক্য সীমিত রাখেন। নিরাভরণ, বিশেষণমুক্ত এক নিশ্চিত সরলতায় তিনি কী নিপুণভাবে আঁকেন ল্যাংটার মেলার ছবি দেখুন : “উঠি। পায়ে পায়ে ভীড়। নাচ, গান আর গাঁজা চলে পাশাপাশি। সামনের আমগাছতলায় সামিয়ানা উঠেছে নতুন। মাঝখানে চাদর বিছিয়ে বসেছে গানের দল। তারা এক পরিবারেরই হবে। কর্তা বয়স্ক মানুষ। মাথার চুল চাছা। পরনে গেরুয়া কাপড়। পাশে স্ত্রী। চেহারার মিল খুঁজে হিসেব মেলাই। দুজন বোধ হয় ছেলে হবে তার। স্বপরিবারে সবাই। আছে ছেলে বউরা। বাচ্চাকাচ্চা। একদিকে চুলোয় উঠেছে রান্না। অন্যদিকে দলটা গানের জন্য প্রস্তুত হয়। আছে বাঁশী, হারমোনিয়াম, ঢোল, একতারা। বাজতে শুরু করে। গৃহকর্তী বেশ বৃদ্ধা। এক কোণে খঞ্জনি হাতে বসা। মুদ্রিত চোখে বাজনার সাথে সাথে গুণগুণ ঠোঁটও নড়ছিল। এই দলের কনিষ্ঠ পুত্রটি এতক্ষণ মায়ের কোলে শুয়েছিল। গানের পরশ পেয়ে জাগে সে। এগিয়ে গিয়ে বৃদ্ধার হাত থেকে ছিনিয়ে নেয় খঞ্জনি। অতটুকু বাচ্চা – গান আর বাদ্যযন্ত্রের সাথে নিজেকেও মিশিয়ে ফেলল মুহূর্তেই।” (সংসার)

কেবলমাত্র ভাষারীতি, প্রকাশভঙ্গী তথা বহিরঙ্গের স্বাতন্ত্র্য নয়, বুলবুল চৌধুরীর প্রতিটি রচনায় রয়েছে শক্তিশালী গল্প (প্লট) – যাতে নিন্মবর্গের মানুষের বিপুল জীবনের চিত্র প্রতিফলিত হয়েছে। গল্পের বয়ানে তাঁর মূল দক্ষতা প্রতিভাত হয় মানব-মানবীর সম্পর্কের টানাপোড়েন ও তাদের অতল মনোজগতে সদা-সঞ্চরমান অসংখ্য অচেনা ছবি তুলে আনার ক্ষেত্রে।

কিন্তু শুধু প্রকৃতির ছবি এঁকে, কল্পনার রং চড়িয়ে, ভাষারীতি ও স্টাইল সম্বল করে তো কোনভাবেই একজন লেখক দাঁড়াতে পারেন না। বস্তুত তিনি কি বলতে চান এবং কাদের কথা বলতে চান তা তাঁকে যুগপৎ খুঁজতে হয় এবং ক্রমান্বয়ে লেখায় স্পষ্ট করে তুলতে হয়। অন্তহীন এই অনুসন্ধান। কেবলমাত্র ভাষারীতি, প্রকাশভঙ্গী তথা বহিরঙ্গের স্বাতন্ত্র্য নয়, বুলবুল চৌধুরীর প্রতিটি রচনায় রয়েছে শক্তিশালী গল্প (প্লট) – যাতে নিন্মবর্গের মানুষের বিপুল জীবনের চিত্র প্রতিফলিত হয়েছে। গল্পের বয়ানে তাঁর মূল দক্ষতা প্রতিভাত হয় মানব-মানবীর সম্পর্কের টানাপোড়েন ও তাদের অতল মনোজগতে সদা-সঞ্চরমান অসংখ্য অচেনা ছবি তুলে আনার ক্ষেত্রে। প্রায় প্রতিটি গল্পে জনপদের দৃশ্য ও প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য এক থাকলেও মানুষগুলির জীবনের সংকট ভিন্ন ভিন্ন রকম বলে গল্প পড়তে গিয়ে কখনো তা একঘেঁয়ে মনে হয় না। টুকা কাহিনীর টুকাই যেন লেখকের একমাত্র প্রতিবাদী চরিত্র, কিন্তু তার প্রতিবাদ স্থায়ী হয় না, আত্মপীড়নের কাছে তা পরাভূত হয়। ‘পরমানুষ’ গল্পে বেশ্যা কইতরীর প্রেম শেষ পর্যন্ত হত্যার মধ্য দিয়ে পরিণতি পায়। ‘থু’ গল্পে শহুরে গাঁজার আসরে শ্রমজীবীদের নেশার মত্ততা আর যৌনতার অনুষঙ্গ জড়াজড়ি করে আসে। ‘নিরবধিকাল’ মন দেয়া নেয়া ও প্রথম মাতৃত্বের চিরায়ত বিস্ময়ের গল্প। ‘জীবে দয়া করে যে জন’ পশুপ্রেমের সমান্তরালে মাতৃত্বের মমতা, ‘সংসার’ গল্পে ঘর ভাঙা-গড়ার চিরায়ত খেলা ল্যাংটার মেলার প্রেক্ষাপটে যেন প্রতীকায়িত। ‘ডিম’ পতিতাপল্লীর এক বেশ্যার প্রথম মা হওয়ার অভিজ্ঞতার আখ্যান। ‘শাপলা আপু’ গল্পে এক মধ্যবয়সী ঢাকাইয়াকে নারী ও সুরার নেশায় পটিয়ে প্রতিবেশী একদল মাতাল তরুণ এক জোছনাপ্লাবিত রাতে শহরের বাইরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে। ‘নদী জানে’ গল্পে আহত হয়ে নিঝুম বনে পলাতক, একদার মুক্তিযোদ্ধা (পরে ডাকাত) কবিরাজ ফালুর ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর গল্প মনে করিয়ে দিতে পারে মানিকের ‘প্রাগৈতিহাসিকে’র ভিখুর কথা। দারিদ্রের পীড়নে বন্ধুর কাছে স্ত্রীর দেহকে জিম্মা করার বেদনা মূর্ত হয় ‘দ্বিতীয় উদ্ধারে’, এখানেও আছে মাতৃত্বের পিপাসা। খরা কবলিত এক বুড়ির জীবন-সংগ্রাম ফুটে উঠেছে ‘খরা’য়। বনিবনা না হয়ে আলাদা হয়ে গেলেও শহুরে এক দম্পতির প্রেম যে প্রায় এক যুগ পরেও খানিক অবশিষ্ট ছিল – সে-ছবি ফুটে উঠেছে ‘ঘর’ গল্পে। আবার ভাসমান এক পতিতার অন্যের ঘরণী হয়ে (রূপমুগ্ধ স্বামী জানে না সে-খবর) সংসার জীবনে আসার টানা পোড়েনের গল্প ’পঙ্খীরাজ’।

প্রকৃতি ও জীবনের টানাপোড়েনে অব্যাখ্যাত রহস্যের সৃষ্টি হতে পারে বলে লেখকের নিশ্চিত বিশ্বাস থেকে জন্ম নিয়েছে আরো কয়েকটি গল্প। এমনি এক গল্প ‘মাছ’। এক বরষা-বিহ্বল রাতে দুই বন্ধু টেঁটা হাতে বিলে মাছ ধরতে গিয়ে মাছের প্রাচুর্যে তাদের যেন নিশিতে পায়। অগ্রবর্তী বন্ধু মাছের পেছন পেছন বিলের গভীর থেকে গভীরে এগিয়ে যায়, তাকে যেন গ্রাস করে গহন নিশিথিনী। এমনি রহস্য ও রূপকথার আমেজে মোড়া গল্প আরো আছে, যেমন ‘এক্কা গাড়ি ও লক্ষীছায়া’। দুই সিঁধেল চোর নিয়ে লেখা রহস্যমোড়ানো ঘোরের আরও একটি অসাধারণ গল্প ‘কালাকান্দুর ভোর’।

এইসব গল্পের চরিত্র/কুশীলব যারা, তারা সবাই নিন্মবর্গের, সমাজের নিচুতলার মানুষ। লেখক নিজের জীবন চেঁছে-ছেনে তাদের এনে জড়ো করেছেন – আঁকতে চেয়েছেন প্রকৃতি থেকে নেয়া রংয়ে তাদের জীবনের জলছবি, তুলে ধরতে চেয়েছেন দারিদ্রের আড়ালে তাদের হৃদয়ে নিরন্তর দুলছে যে সুর। যে মানুষগুলির জীবনে  শত দারিদ্রেও আসে প্রেম, তাদের জীবনেও থাকে বিরহ, যৌনতা, একান্তভাবে পাওয়া-না-পাওয়ার দোলাচল, যেখানে ঘৃণা-ক্রোধ-খুনোখুনির ঠিক পাশেই থাকে অভিমান-পরস্পরকে কাছে পাবার অব্যক্ত টান – হারানোর ভয়-মিলনের পিপাসা। দরিদ্রের বিবর্ণ জীবনেও যে দেখা দিতে পারে কখনো অকাল ফাগুন – আমাদের এখানকার ‘জীবনবাদী’ শিল্পীরা মানুষের সেই মনোজগতের খোঁজ কতখানি নিতে পেরেছেন? বুলবুল চৌধুরী আঁকতে চেয়েছেন অন্তর্লোকের সেই অব্যাখ্যাত রহস্যের ছবি – মানুষ, হোক-সে প্রান্তিক কিংবা অন্ত্যজ শ্রেণীর তারও মনোজগতের ভাঁজে ভাঁজে দুলছে রঙিন রহস্য, তাতেও থাকতে পারে কিছু রহস্যের মায়া – শল্য চিকিৎসকের মতো ছুরি হাতে নয় – দরদী কলমের আঁচড়ে তিনি এর সুলুকসন্ধান করতে চেয়েছেন। জলজ ও মৃত্তিকাসংলগ্ন তাঁর রচনা, তাতে মিশেছে রূপকথা ও কাব্যিকতার একটা পেলব আমেজ। তার অন্তর্লীন সুর বড্ড মায়াবী। বুলবুল চৌধুরী সাক্ষাৎকারে স্বীকারও করেছেন সে-কথা : “অর্থকষ্ট তাদের নিত্যসঙ্গী। কিন্তু কেবল ভাত কাপড়ের কষ্ট নয়, ওদেরও হৃদয়ের কষ্ট আছে। এখন গরীব মানুষ বলে তার প্রকাশও আলাদা। এটাই ধরতে চেয়েছি আমি।” বুঝতে আমাদের অসুবিধা হয় না যে কেবল নিম্নবর্গের মানুষের জীবনযাপনের আওয়াজ নয়, কথাসাহিত্যে তিনি ধরতে চেয়েছেন ওই জীবনের সুর। স্বর নয়, সুর তাঁর অন্বিষ্ট। যৌনতা, মাতৃত্বের পিপাসা, ঘরের টান, মন দেয়া নেয়া, প্রেম ও প্রেমের পাওয়া না পাওয়ার দ্বন্দ্বের মধ্যে তিনি সূকক্ষ্ণ জীবনানুভূতি ও চিরায়ত জীবন রহস্যের সন্ধান করেছেন। সেখানে মানুষ দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়েছে মূলত নিজের প্রবৃত্তি, প্রকৃতি ও নিয়তির সাথে। এই  দ্বন্দ্বের চরিত্র বহুলাংশে ‘চিরায়ত’ ধরে নিলে এটা ধারণা করা চলে সমসাময়িক কালের কব্জা থেকে মুক্ত করে এনে বুলবুল চৌধুরী সচেতনভাবে নিজেকে যুক্ত করতে চেয়েছেন বাংলা সাহিত্যের চিরায়ত কাঠামো ও ধারার সাথে এবং তিনি তা করতে চেয়েছেন সমকালীন কাঠামোতে থেকেই।

প্রশ্ন করা যায় : এখানেই কি বাল্যবন্ধু, কৃতি কথাশিল্পী কায়েস আহমেদের সাহিত্যদর্শন ও লক্ষ্যের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব রচিত হয়েছে; এমনকি উভয়ের রচনার উপজীব্য নিম্নবর্গের মানুষ হলেও?

 

২.

কথা বোধ করি অস্বীকার করা চলে না যে বুলবুল চৌধুরীর ‘অপরূপ বিল-ঝিল-নদী’ ঘেরা বাংলাদেশ আসলে দারিদ্রস্পৃষ্ট শ্রেণীবিভক্ত পশ্চাৎপদ বাংলাদেশ। এই পশ্চাৎপদ জনপদ ও তার  নিম্নবর্গের মানুষ বুলবুল চৌধুরীর গল্পের প্রধান উপজীব্য হলেও বিদ্যমান সমাজকাঠামো ও সমসাময়িক ইতিহাসের সাথে শ্রেণী অবস্থানের নিরিখে এদের সম্পর্ক (সমঝোতা কিংবা বিরোধ) গল্পসমূহের কোথাও স্পষ্ট করা হয় না। কেন তা তিনি করেননি – এ-ব্যাপারে স্পষ্ট করে তাঁর সাক্ষাৎকার বা আত্মজৈবনিক রচনায়ও কোন ভাষ্য খুঁজে পাওয়া যায় না। উনসত্তরের উত্তাল ঢাকায় তাঁর প্রথম যৌবন অতিক্রান্ত হয়েছে, তিনি পেরিয়ে এসেছেন জাতীয় ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায় মুক্তিযুদ্ধ – যা শ্রেণী ও অঞ্চল নির্বিশেষে  সকলকে কোন না কোনভাবে যুক্ত করেছে এবং জন্ম দিয়েছে স্বাধীনতা-পরবর্তীকালের পরিবর্তনশীল, দ্রুত বিকাশমান একটা সমাজ। কিন্তু বিস্ময়ের সাথে আমরা লক্ষ করি, এইসব আন্দোলন-আলোড়নের সিকি পরিমাণও তাঁর লেখায় প্রতিফলিত হয় নি, তাঁর গল্পের কোন চরিত্র সমূলে ধারণ করে নি সে-অভিজ্ঞতা ও স্মৃতি। অথচ ইতিহাসের মহাকাব্যিক পটপরিবর্তনকে বিষয়বস্তু করে আমাদের সাহিত্যও সমৃদ্ধ হয়ে উঠছিলো। সমসাময়িক সেরা কবি, কথাশিল্পী, চলচ্চিত্রকাররা তাঁদের অনন্য রচনাসম্ভারে ভরিয়ে তুলছিলেন আমাদের সাহিত্যভূবন। এর ফলে আরো স্পষ্ট ও দৃঢ় হয়ে উঠছিলো দেশভাগ-পরবর্তী আমাদের এখানকার সাহিত্যের সমৃদ্ধি ও স্বাতন্ত্র্য। উনসত্তরের পটভূমিকায় আমরা পেলাম ‘চিলেকোঠার সেপাই’, মুক্তিযুদ্ধের উপর রচিত হলো ‘রাইফেল, রোটি আওরত’, ‘জীবন আমার বোন’ এবং ‘যাত্রা’র মতো উপন্যাস। স্বাধীনতা-উত্তরকালের পটভূমিতে আমাদের প্রধান লেখক আখতারুজ্জামান ইলিয়াস লিখলেন ‘খোঁয়ারী’ ও ‘মিলির হাতে স্টেনগান’-এর মতো অসামান্য গল্প। সমাজে অশনী সংকেতের মতো ক্রম-দৃশ্যমান মৌলবাদ নিয়ে তিনি লিখলেন ‘জাল স্বপ্ন, স্বপ্নের জাল’, গ্রামীণ শোষণের চিত্র উঠে এলো তাঁর ‘দুধেভাতে উৎপাত’ কিংবা ‘পায়ের নিচে জল’ গল্পে। মুক্তিযুদ্ধকে উপজীব্য করে আলাদা গল্প-সংকলন আমাদের উপহার দিয়েছেন হাসান আজিজুল হক (‘নামহীন গোত্রহীন’), স্বাধীনতা-পরবর্তীকালের নতুন ও পরিবর্তিত সমাজে শোষণের নয়া স্বরূপ উদঘাটন করে তাঁর হাতে রচিত হয়েছে অসামান্য গল্প – ‘খনন’ ও ‘পাতালে হাসপাতালে’। মুক্তিযুদ্ধে হানাদার কর্তৃক অবরুদ্ধ সমাজকে নিজের রচনার প্রায় সিংহভাগ উপজীব্য করেছেন মাহমুদুল হক। লিখেছেন জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত, সৈয়দ শামসুল হক এবং হুমায়ুন আহমেদ। এমনকি প্রবীণ হয়েও বাংলদেশের সমাজের ক্রম-পরিবর্তনকে সাহিত্যের বিষয়বস্তু করায় নিরন্তর কলম সক্রিয় রেখেছেন বয়োজ্যেষ্ঠ শওকত ওসমান। কিন্তু খুবই বিস্ময়কর যে, এই সৃষ্টি সম্ভারে আলোচিত গল্পকার বুলবুল চৌধুরীর অবদান প্রায় নেই বললেই চলে।

তাঁর গল্পপাঠে আমরা দেখি চরিত্রগুলোর জীবনচক্রে তারা যতখানি প্রকৃতি ও প্রাকৃতিকতায় সংলগ্ন, ততখানি যেন সমাজসংলগ্ন নয়। তাদের জীবনের উথ্থান-পতনের কার্যকারণ  তাঁর গল্পে যতটা নিয়তির নাটকীয়তায় নির্ধারিত হয়, ঠিক ততটা যেন সামাজিক সম্পর্ক বা শ্রেণীবৈষম্যের ভিত্তিতে হয় না। শ্রেণী ও সামাজিক সম্পর্কের ব্যবচ্ছেদ সেখানে পাওয়া যায় না বলে অনেক সময় গল্পের চরিত্রসমূহকে বাস্তবতাবিবর্জিত ও নিরালম্ব মনে হয়।

এ-প্রশ্ন উঠতে পারে, তাঁর গল্পের বাংলাদেশ ইতিহাসের কোন সময়ের বাংলাদেশ, কি তার ভূগোল? তিনি তাঁর স্মৃতিকথায় (অতলের কথকতা) সাক্ষ্য দিয়েছেন প্রতিটি গল্পেই তিনি তুলে ধরেছেন তাঁর চারপাশের চেনা-জানা পরিচিত মানুষ,  তারা যে-ভাষা ব্যবহার করে তা ঢাকার অদূরবর্তী গাজীপুরের (লেখকের পিতৃভূমি দক্ষিণবাগের)। কিন্তু তাঁর গল্পপাঠে আমরা দেখি চরিত্রগুলোর জীবনচক্রে তারা যতখানি প্রকৃতি ও প্রাকৃতিকতায় সংলগ্ন, ততখানি যেন সমাজসংলগ্ন নয়। তাদের জীবনের উথ্থান-পতনের কার্যকারণ  তাঁর গল্পে যতটা নিয়তির নাটকীয়তায় নির্ধারিত হয়, ঠিক ততটা যেন সামাজিক সম্পর্ক বা শ্রেণীবৈষম্যের ভিত্তিতে হয় না। শ্রেণী ও সামাজিক সম্পর্কের ব্যবচ্ছেদ সেখানে পাওয়া যায় না বলে অনেক সময় গল্পের চরিত্রসমূহকে বাস্তবতাবিবর্জিত ও নিরালম্ব মনে হয়। যে-অপরূপ বিলঝিলের সন্ধান তিনি আমাদের দিয়েছেন, শ্বাশ্বত সবুজ বাংলাদেশের সে-ছবি যেন ইমপ্রেশনিস্ট শিল্পীর ক্যানভাসে আঁকা। কেননা, সেই বাংলাদেশ কি ইতোমধ্যে অনেকখানি লুপ্ত হয়ে যায়নি? যে-সময়ে এইসব গল্প তিনি লিখছেন, ঠিক সেই সময়ের প্রায় গোটা ইতিহাস জুড়ে আমরা দেখি নব্যধনিক শ্রেণীর হাতে গ্রামীণ ক্ষমতা কাঠামোর হস্তান্তর ঘটছে, মানুষের পেশার বদল হয়েছে, পেশীশক্তি প্রাধান্য বিস্তার করেছে – ভূমি-মালিকানায় পরিবর্তন এসেছে, ভেঙে গেছে পরিবার-প্রথা, দখলে দূষণে দস্যুতায় পরিবেশ বিপর্যয়ের শিকার হয়েছে বিল-ঝিল, জলবায়ু পরিবর্তনের করাল থাবায় রূপ হারিয়েছে অপরূপ প্রকৃতি, গ্রামীণ সমাজে মৌলবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, হুমকির মুখে পড়েছে পরিবর্তন-উন্মুখ নারী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। বুলবুল চৌধুরীর গ্রামীণ চিত্রায়নে এর বলিষ্ঠ রূপায়ন আমরা পাই না বলে হতাশা জাগে। তাঁর লেখা পড়তে গিয়ে পল্লীকবি জসীম উদদিনের আঁকা সরল ছবির কথা মনে আসে আমাদের, পড়তে পড়তে রূপকথার আবেশ আসে কিংবা সরল-প্রাণ বাউলের গীতিকার প্রতিধ্বনি হয়ে ধরা দেয় সে-ছবি – কিন্তু কিছুতেই যেন তাকে বিশশতকের গ্রামবাংলার পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটের সাথে খাপ খাওয়ানো যায় না। ফলে, মনে হতে পারে মাঝেমধ্যে বের করে দেখার জন্য যত্নে রেখে দেওয়া উপভোগ্য মায়াবী সেই ছবি, কিন্তু কিছুতেই তা আমাদের জীবনভাষ্য নয়। তাতে জীবনের কোনো বিশেষ মূহূর্ত কখনো আশ্চর্য মানবিক সৌন্দর্যে ধরা দিয়েছে বটে, কিন্তু সেই মানুষগুলোর অতীত কিংবা ভবিষ্যতের উপর আলো পড়ে না বলে শুধু উপভোগের স্তরে থেকে যায় এর প্রভাব। তা জীবনশিক্ষার অংশ হয়ে উঠতে পারে না। অথচ যুগে যুগে বড় শিল্পীরা সমাজ ও ইতিহাসসচেতন বলে পরিবর্তনকে আগে দেখেন এবং আমাদের দেখান। রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশের কবিতায় কি ব্যাপকভাবে ছায়া ফেলেনি দ্বিতীয় মহাযুদ্ধোত্তর কালের তিমির ও নৈরাশ্য? অথচ তাঁর চেয়ে ভালো আর কে এঁকেছে বাংলার মুখ? ‘পথের পাঁচালী’র রূপকার কি ‘অশনী সংকেত’ লিখে আমাদের জানান দেননি দুর্ভিক্ষের কথা? আমরা কি দেখিনি তারাশঙ্করের হাতে কীভাবে সৃষ্টি হয়েছে – ‘হাঁসুলী বাঁকের উপকথা’, যাতে বিবৃত হয়েছে কোপাই নদীর বাঁকের এক অন্ত্যজ জাতিগোষ্ঠীর জীবনসংগ্রাম, যুগ পরিবর্তনের সাথে তাদের অর্থনীতি, আচার অনুষ্ঠান ও বিশ্বাস বাঁচিয়ে রাখার সংগ্রাম এবং পরিশেষে পরিস্থিতির কাছে তাদের অসহায় আত্মসমর্পণ ও সেই জনপদের বিলুপ্তির অনন্য উপাখ্যান! দেখিনি কি পরিবর্তনকে কেন্দ্রে রেখে রচিত অদ্বৈত মল্লবর্মনের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাসে মৎস্যজীবী মালোদের উচ্ছেদের গল্প, নদীর মৃত্যুর সাথে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে গেছে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর ‘কাঁদো নদী কাঁদো’ উপন্যাসের কুমুরডাঙা জনপদ কিংবা ইলিয়াসের ‘খোয়াবনামা’য় কাৎলাহার বিলের তীরবর্তী অঞ্চলের উজাড় হওয়ার কাহিনি? ইতিহাসের যে সন্ধিক্ষণে বুলবুল চৌধুরীর জন্ম ও বেড়ে ওঠা, তাঁর মতো কথাশিল্পী এর সদ্ব্যবহার না করতে পারলে তা নিয়ে কিছুটা আক্ষেপ যেন থেকেই যায়। অথচ কী বিপুল শক্তি ছিলো তাঁর কলমে! তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন মানুষের মনোজগতে দ্রুত প্রবেশের সিঁড়ি আর তাকে পরিস্ফুট করার সহজাত ঢং ও নিজস্ব এক ভাষাশৈলী! অবশ্য, জীবনের একেবারে শেষদিকে এসে তিনি যেন নিজেও সেকথা আঁচ করতে পেরেছিলেন বলে লিখেছিলেন ‘ঘাটের বাঁও’ নামে একখানি ভালো উপন্যাস – যাতে বলিষ্ঠ আঁচড়ে তিনি তুলে এনেছিলেন পাটকলের শ্রমিক আন্দোলনের সন্ত্রাসনির্ভর রাজনীতি ও মানবিক সম্পর্কের টানাপোড়েনের আদ্যপান্ত। কিন্তু ততদিনে বড্ড দেরি হয়ে গেছে! মরণব্যাধি কেড়ে নিয়েছে এই দরদী কথাশিল্পীর কলম।

 

৩.

রিশেষে তাঁর গল্পের পাঠক হিসাবে এ-প্রশ্ন জাগে, দেশ ও মানুষের প্রতি অকৃত্রিম দরদ না থাকলে এত নিবিড়ভাবে মানুষের মুখ ও দেশমাতৃকার ছবি আঁকা কি করে সম্ভব হতে পারে? উচ্চকিত নয়, কিন্তু নীরব সাধনায় যেন সে-কাজটিই করে গেছেন বুলবুল চৌধুরী। নিখাদ ভালোবাসা ছাড়া তো তা কিছুতেই সম্ভব হতো না। এ-নিরিখে দেখলে দুই অভিন্ন-হৃদয় বন্ধু কায়েস আহমেদ ও বুলবুল চৌধুরীর সৃষ্টিকর্মে আমরা খুব বেশি ফারাক দেখি না। দুজনের দূরত্ব যেন আমরা কমে আসতে দেখি। কেননা চূড়ান্ত বিচারে উভয়ের সাহিত্য সাধনার মূল উৎস মানুষের প্রতি ভালোবাসা। মানুষের অসহায়তার স্বরূপ সন্ধান করেছেন দুজন দুইভাবে, দুই ধারায়।

মানুষের প্রতি ভালোবাসা বুলবুল চৌধুরীকে আজীবন তাড়িয়ে নিয়ে গেছে, এক অস্থির উন্মাদনায় মানুষের মধ্যে তিনি খুঁজে ফিরেছেন ভালোবাসা, ভালোবাসার মানুষ – ‘সোনার গৌর’! পরিবার-পুরস্কার-পাঠকপ্রিয়তা কিছুই তাঁকে দমাতে পারে নি। কী যেন এক ‘তিয়াসে’ তিনি ছুটে বেড়িয়েছেন পথ থেকে পথে। যেন তিনি ‘জীবনপুরের পথিক’, যেন তারাশঙ্করের সেই কবি পিপাসার্ত প্রাণে যার বেজে চলেছে এক অন্তহীন অনুরণন : “ভালবেসে মিটল না আশ –  কুলাল না এ জীবনে/ হায়! জীবন এত ছোট ক্যানে!”

ঢাকা ১০-০৯-২০২১

 

হামিদ কায়সার | গাঁও গেরামের কথাকার বুলবুল চৌধুরী | প্রবন্ধ

বিজ্ঞানের ক্রমশ উন্নতি এবং এক-একটি নতুন আবিষ্কারের প্রভাব য আধুনিক মানুষের ওপর প্রবলভাবে পড়বে, এটাই স্বাভাবিক। একটি ঢাউস বা পাতলা সাইজের গভীর জীবনবোধ-সম্পন্ন উপন্যাসের ভেতর নিমগ্ন হওয়ার চেয়ে, ফেসবুকের মধ্যে ডুবে থাকায় মেলে যাবতীয় বৈচিত্র্যময় সুখ বা অসুখের সন্ধান। এই যদি হঠাৎ লাইভ নিয়ে পরীমনি তো, মেসি পিএসজিতে কেমন করছে, রোনালডো ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডেই বা ফিরবে কেন – এসবের ভেতর থাকতে-থাকতে প্রিয় কারো সঙ্গে চ্যাটও সেরে নেওয়া, সঙ্গে অমুকের বেশ সাফল্য দেখে পোয়াখানেক হতাশায় মুহ্যমান আর সে কালদর্পণে লক্ষ্যগোচর তমুক তো আদর্শ নিয়ে বড় বড় কথা বলে ঠিকই, অথচ যাদেরকে স্বার্থে দরকার তাদের ছাড়া আর কাউকেই লাইক দেয় না – এই যে একশটা অহৈতুকীর ভিতরে প্রবেশ, তারপর মাথা নষ্ট, অস্থিরতা, নিঃসঙ্গতার চারাগাছে পানি ঢালা – সব মিলিয়ে মানুষের বোধের জগতটাও যে খালি হয়ে যাচ্ছে, সেও অস্বীকার করার উপায় নেই।

সময়ের এমন ত্যাঁদড়-ফ্যাঁদড় এফোঁড়ে-ওফোঁড়ে একজন ঔপন্যাসিকের তাহলে কী করণীয়। তিনি কী লেখালেখি থুয়ে নাক ডাকিয়ে ঘুমাবেন, নাকি তার অন্তর্গত তাড়নায় বোধিসত্তার ক্রোড়ে মাথা রেখে নিজের মতো সৃজনশীলতায় অবগাহন করবেন? বোধ হয়, বোধ হয় কী, নিশ্চিতভাবেই একজন প্রকৃত ঔপন্যাসিক নিজের বোধি সত্তা ও খামখেয়ালিপনার কাছে নিজেকে সমর্পণ করে রাখেন সব সময়। এবং আত্মগূঢ় চেতনার এমনই মগ্নতায় পৌঁছেন যে, কে তার উপন্যাস পড়ল কী না পড়ল কিংবা উপন্যাসের ধরন নিয়ে দেবেশ রায় নতুন কী বললেন, বা মার্কেসের আলোকপাত কী কিংবা মিলান কুন্ডেরার উপন্যাসে শিল্পের রূপান্তর – এসব নিয়ে এতটুকু মাথা ব্যথা থাকে না, কোন ঘোরের ভিতর নিমগ্ন হয়ে বা কথিত ভর পেয়ে লিখে ফেলেন এক একটি উপন্যাস। কীভাবে লিখলেন নিজেরই কোনো দিশা নেই। আমি একথাটি বিশেষ করে বলছি বুলবুল চৌধুরীকে সামনে রেখে। আরেকজনের কথাও মনে পড়ছে এ মুহূর্তে। মাহমুদুল হক। জীবন আমার বোন, নিরাপদ তন্দ্রা, কালোবরফ, অনুর পাঠশালা, খেলাঘর, মাটির জাহাজ এসব উপন্যাস সেই ঘোর থেকে লেখা। এতটুকুও চেষ্টাচরিত্র নেই। অথচ দুজনেই লিখেছেন কম, প্রবলভাবে কম। একজন ভোগের নেশায়, আরেকজন ভোগ ছাড়নে!

হ্, জানেন তো! মাহমুদুল হক আর বুলবুল চৌধুরীর শেষ দেখা হয়েছিল নরসিংদী থেকে ঢাকাগামী বাসে! বুলবুল চৌধুরী শ্বশুরবাড়ি থেকে বেরিয়ে খুব সকালের বাস ধরেছিলেন, ঢাকায় ফিরে অফিস করবেন। বটু ভাইকে দেখে থমকে যান। দুজন দু-জায়গায় বসলেও বাবুরহাট স্টেশনে সুযোগ হয় একসঙ্গে বসার। তখনই জানতে পারেন, বটু ভাই নরসিংদী গিয়েছিলেন বাবা শানাল ফকিরের কাছে। সারারাত তার দরবারে অবস্থান করে এখন ফিরছেন ঢাকা। সে-প্রসঙ্গ ধরে কথা বলতে বলতে বুলবুল চৌধুরীও জানালেন, ক-দিন আগে ঘুরে এলাম বেলতলীর লেংটা বাবা সোলেমান শাহের মাজার থেকে। তাকে নিয়ে ভক্তদের গাওয়া গানও শুনিয়ে দিলেন বটু ভাইকে, ‘আইছি লেংটা, যামু লেংটা, মাঝখানে ক্যান গণ্ডগোল।’

বটু ভাই জানালেন যে, গতবার সামসুদ্দিন এমপির ভাড়া করা লঞ্চে সেও গিয়েছিল লেংটা বাবার মেলায়!

শুধু বটু ভাই কেন! একটা সময় ঢাকার কবিসাহিত্যিকদের মধ্যে লেংটা বাবার মেলা ভালোই আছর করেছিল। অনেকেই ছুটে গিয়েছিলেন সে-মেলায়। লিখেছেন গল্প-উপন্যাস। এই মুহূর্তে তাপস মজুমদারের গল্প চাঁদজ্যোৎস্নার রহস্যচাঁদ-এর কথা মনে পড়ছে। বুলবুল চৌধুরীর ‘পাপপুণ্যি’ উপন্যাসও সেই  লেংটা বাবার মেলা নিয়ে লেখা।

লেংটা বাবার মেলায় মানুষ কেন যায় বা যেত! তার কি কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ আছে? একেকজনের রীতি-নীতি-ব্যাপার-আচার ভিন্ন, একেক রকমের। কেউ যায় হয়তো বেহুদাই, শুধুই দেখতে! কেউ যায় কেন যায় কারণটা হয়তো নিজের কাছেই অজানা। আবার কেউ যায় শান্তির খোঁজে, পথের সন্ধানে! সে একটা সাকার খোঁজে অবচেতন মনে। কেউ আবার যায় চরম অসহায় হয়ে – মানুষের কি দুঃখ হতাশার কোনো শেষ আছে! কত রকম না পাওয়ার যন্ত্রণা, কত রকম পেয়েও তার পীড়া-ভার! যান অসুস্থতা থেকে সন্তানের পরিত্রাণ পেতে! কত জনের কত রকম মানত থাকে! হয়তো এদেশের একটা বৃহৎ শ্রেণি মাজার সংস্কৃতির ঘোর বিরোধী কিন্তু আরেকটি বৃহৎ শ্রেণির রক্তের শিরায় শিরায় মজ্জায় মজ্জায় যে পীরফকিরের মাজারে যাওয়ার রীতি গড়ে উঠেছে। লেংটা বাবার মেলায়ও মানুষ যায়, লক্ষ লক্ষ মানুষ। চোর যায় সাধু যায়, পর্যটক যায় ভিখারি যায়। গেরস্ত যায় কবি যায়। গায়েন যায় খুনি যায়। নট যায় নটী যায়। বেশ্যা যায় হিঁজড়া যায়। বুলবুল চৌধুরীর পাপপূণ্যির নায়ক-নায়িকা সাধু আর রমাও ছুটে গিয়েছিল সেখানে। তবে একসঙ্গে নয়। আলাদাভাবে। অবশ্য মেলা থেকে ফিরে এসেছে একসঙ্গে। কীভাবে সম্ভব হলো সেটা? যেতে হবে উপন্যাস পাঠে।

`পাপপুণ্যি’ উপন্যাসে তিনটি পর্ব। সাধু পর্বে আমরা জানব সাধুর কথা, রমা পর্বে রমার আর ইতি পর্বে সন্ধান মিলবে দুজনারই। তবে আরো কিছু চরিত্রের সংশ্লিষ্টতা তো থাকবেই! জীবনের তরী কি কেউ একলা বাইতে পারে? কত মাঝি আর কত চড়নদার। অধিকারীর সঙ্গে যেমন সাধুর জীবন বাঁধা, বেহালাদার মোহসেন আলীর সঙ্গে যেমন সুগভীর বন্ধুত্ব, মেলায় ক্ষণিকের দেখা রোকেয়া বা সিরু গায়েনেরও কিছুটা ভূমিকা থাকে, অপলাদিও প্রাসঙ্গিক। তেমনি রমার জীবনটা রায়হানদের কবলিত গ্রাস থেকে মুক্তি খোঁজে, কৈশোর-উত্তীর্ণ প্রথম যৌবনের সেই আর্টিস্ট স্মৃতির খোঁড়লে কেবল কাঠঠোকরার মতো ঠোকরাতেই থাকে।

এই পর্ব বিন্যাসের কথাটা যখন উঠলই, প্রথমেই বলা নেওয়া যাক বুলবুল চৌধুরীর শিল্প-কুশলতার কথা। আমাদের ঔপন্যাসিকগণ যেখানে অধ্যায়ের পর অধ্যায় ঘটনাগুলো সাজান, চরিত্রগুলোকে ক্রমঃপরিণতির দিকে এগিয়ে নিয়ে যান, বুলবুল চৌধুরী সে-পথে হাঁটেননি। যারা আকিরা কুরোসাওয়ার রশোমন দেখেছেন, তারা ভালোভাবেই বুঝবেন, একটি ঘটনাকে কীভাবে একাধিক মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকে বিন্যস্ত করে শেষাবধি একটি নির্দিষ্ট গন্তব্যে নিয়ে যাওয়া হয়। পাপপুণ্যির বিন্যাস অনেকটা সে ধাঁচেই সাজানো, তবে হুবহু না। একই স্রোতধারায় যেতে যেতে দুটো নদী এসে এক স্রোতে মিলে গেছে। নিজের অজান্তেই বুলবুল চৌধুরী আশ্চর্য এক সরল বিন্যাসে সাধু পর্ব ও রমা পর্বকে মিলিয়ে দিয়েছেন এক মোহনায়, তারপর কাহিনি আর সামনের দিকে এগোতে বাঁধাগ্রস্ত হয়নি, জীবন যেমন আপন নিয়মে প্রবাহিত হয়, সেভাবেই চলেছে গতিধারা।

সাধু পর্বে প্রবেশ করতেই আমরা দেখা পাই নব অপেরা যাত্রাদলের অধিকারীর। নয় বছর ধরে একটা পালা লিখে চলেছেন। কিছুতেই আর শেষ হচ্ছে না। ঢাকার শাখারীবাজারের পৈতৃক বাড়িতে থাকেন। নিচতলায় ছোট ভাইয়ের পরিবার। অধিকারীর পাশের রুমে জায়গা পেয়েছে যাত্রা দলের প্রধান অভিনেতা সাধু। সাধুর বয়স বা শরীরস্বাস্থ্যের কথা ঔপন্যাসিক আমাদের জানাননি, বোধ হয় আস্তে আস্তে সব সত্যের উন্মোচন ঘটাবেন তিনি। অধিকারী সাধুকে ডেকে এনেছে বেহালাদারের চিঠি পড়াতে। মানিকগঞ্জের তেওতা থেকে চিঠিতে জানিয়েছে বেহালাদার মোহসেন আলী, সে খুব অসুস্থ। সে সংবাদ জেনে সাধু ছুটে যায় তেওতায়। বয়সের ব্যবধান সত্ত্বেও বেহালাদার যে তার এ বন্ধুহীন পৃথিবীতে একমাত্র বন্ধু, যার সঙ্গে সুখদুখের সব কথা সেরে নেওয়া যায়।

কিন্তু, আমার আশ্চর্য লাগছে বেহালাদার চরিত্রের স্রষ্টা বুলবুল চৌধুরীর শেষ জীবনের সঙ্গে বেহালাদারের শেষ জীবনের অদ্ভুত মিল দেখে। আমি অসুস্থ বুলবুল ভাইয়ের বাসায় শেষ গিয়েছিলাম ১৭ জুন, তারপর হঠাৎ নিজেই গুরুতর অসুস্থ হয়ে যাওয়ার কারণে যেতে পারিনি। তো, সেই শেষ দেখার দিনও দেখেছি, গাছগাছালির ধোঁয়ায় আকণ্ঠ ডুবে আছেন বুলবুলভাই। একটু পর পরই চেয়ে নিচ্ছেন সিগারেটের স্টিকার। ধ্রুব এষের ভাষায় সেই ধোঁয়ার অন্তর্গত মানুষটার মৃত্যুর কাছে নতজানু হতে যেন তাবৎ অনীহা।

বেহালাদার মোহসেন আলীও অসুস্থ, গুরুতরই। কিন্তু যখনই ঘর খালি হয়ে গেল, সাধুকে ডাকলো, সাজাও দেখি এক ছিলিম সিদ্ধি। হেই কবে তোমার লগে শেষ খাওনডা খাইলাম। ওহো, তুমি তো আবার সিদ্ধির নাম থুইছ গাছগাছালি। যবর নাম কও।

সাধু বাধা তোলে, না, না বেহালাদার। তা হওয়ার নয়। কিছুক্ষণের মধ্যে আমি চলে যাব। এখানে থাকলে গাছগাছালি তুমি চাইবে। জেনে-শুনে তো বন্ধুর ক্ষতি আমি করতে পারি না।

ধোঁয়া গেলা থেকে বন্ধুকে বাঁচাতেই সাধু চলে যেতে চায়। বেহালাদার ওকে ধরে রাখার জন্য অনেক বুঝিয়েসুঝিয়ে শেষে হাল ছেড়ে দিয়ে বলে, যাইবা তো, কই যাইবা?

তা তো ঠিক জানি না বেহালাদার। তবে রাজপুত্র যেমন গভীর বনে পথ হারিয়ে খুঁজতে নেমেছিল, আমিও তেমনি পথ খুঁজে খুঁজে চলব।

যাইবা তো যাও, লেংটার মেলায়। তখনই কথায় কথায় বেহালাদার ওকে প্রলুদ্ধ করে, শরীর ভালো থাকলে তোমার সঙ্গী অইয়া যাইতাম। আমিও। কাইল চৈত্র্যের সতেরো না? কাইল থেইকাই মেলা।

লেংটার মেলায় যেতে সাধুও রাজি হয়ে যায়। মন ছুটে ওর কোন শূন্যলোকে। বেহালাদার জানতে চায়, কী মানত তোমার?

সাধু বলে, জোড় তো পাই না। প্রেম মেলেনি। এবারে পেয়ে গেলে ওর সাথে তোমার কাছে আসব মোহসেন। আশীর্বাদ নিও।

পরদিন নারায়ণগঞ্জ থেকে ভোরের প্রথম লঞ্চে উঠে বসলো সাধু। বুলবুল চৌধুরী এই বাংলাদেশটাকে হাড়ে হাড়ে চেনেন। বাংলার মাটি বাংলার জলহাওয়া তিনি গভীরভাবে ধারণ করেছেন নিজের মধ্যে। নারায়ণগঞ্জ থেকে বেলতলী লঞ্চে যাওয়ার মুহূর্তে অপূর্ব এক বাংলাদেশের ছবি এঁকেছেন শব্দের ক্যানভাসে। নদী, নদীতীর, লোকজনের বর্ণনায়। তখন টেপরেকর্ডারের যুগ। ইঞ্জিনঘরের কাছ থেকে গান ভেসে আসছিল, পাগল মন, মন রে, মন কেন এত কথা বলে! এই গানটিও তখন বেশ হিট!

সেই লঞ্চেই হঠাৎ সাধু দেখে, এক কোণে বসে আছে দু-বুড়ি। ফোকলা দাঁতে গল্প জুড়েছে। হাত নাড়াটাই বেশি। ঠিক পাশেই রয়েছে তাদের বউ। সিঁথিতে অপরিসীম সিঁদুর। সাধারণত কোনো রমণী অত সিঁদুর তোলে এমনটি খেয়াল হয় না। মাথার সাদা ঘোমটা প্রান্তে সেই রংয়ের অনেক কণা লেগে আছে নিশ্চয়ই। তার চাইতে অবাক, পরনে যে ব্লাউজ তা যেন একটু আগে দেখা মেঘখণ্ডে প্রতিবিম্বত সূর্য-আভার কাপড় কেটে তৈরি। নিশ্চয় মেলায় যাচ্ছে?

সাধু লঞ্চ থেকে নামার সময় আর এ-সিঁদুররাঙা বউটিকে দেখতে পেল না। সারা মেলায়ও পায় না দেখা, হাজার মানুষের ভিড়েও। রোকেয়া নামের এক মেয়ের সঙ্গে দেখা হয়। সে সাধুকে ঘরের খোঁজ দেয়। ঘরের খোঁজ পেলেও মনের মানুষের দেখা মেলে না। মনের ভেতর তীব্র এক হাহাকার খেলা করে। কপালে সিঁদুররাঙা সেই বউটা কি মেলায় আসেনি? সে বেহালাদারের কাছে চিঠি লেখে, পাঠানো হয় না। নিঃসঙ্গতার গভীর বিহগ সুরর বেজে ওঠে হৃদয়ের তন্ত্রীতে তন্ত্রীতে। এ পৃথিবীতে সবচেয়ে বুঝি ভালোবাসার মানুষই দুর্লভ। মনের মানুষ সহজে মেলে না।

পুকুরের ঢালু পাড় ঘেঁষা আসরের ভেতর বসে থাকতে থাকতে সূর্য ডোবে। সাধুর চেহারা এবং ভাবভঙ্গি দেখে অনেকেই ওর কাছে এটা ওটা চায়। এক অসহায় মা কোলের সন্তানকে সাধুর কোলে ধরিয়ে দিয়ে আকুতি জানায়, বাবা, ফুঁ দিয়া দেন আপনে। দুধ লয় না মুখে। জ্বর তিনদিন।

রমা পর্বে দেখব, রমা কীভাবে গুলশানের এক হেরেমখানা থেকে লেংটা বাবার মেলায় পৌঁছেছিল। সাধুর যেমন ঢাকার ভিত্তি অধিকারী, রমার দেহের মালিক রায়হান। সে গুলশানের এক ফ্ল্যাটে রেখে রমাকে ভোগ করে। সর্বস্ব হারানো মেয়ে রমা। অবৈধ সন্তানকে পেটখালি করতে গিয়ে হারিয়েছে সন্তান ধারণ ক্ষমতা। এই হেরেমখানার জীবন ওর ভালো লাগে না। ওর শরীর ভোগ করেছে আরো কত পুরুষ! মদ খেয়ে খেয়ে ও নিজের বেদনা ভোলে। তাই মনশান্তির আশায় তার লেংটা বাবার মাজারে যাওয়ার বাসনা। রায়হানকে সে রাতেই আসতে বলেছিল, গাড়ি দিয়ে যেন ওকে সাতসকালে পৌঁছে দেয় নারায়ণগঞ্জে। প্রত্যুষে নিজেকে সাজায় রমা। শাখার দু-গাছি চুড়ি পরে হাতে। সিঁদুর তোলে। রায়হান ওকে দেখে চিৎকার করে ওঠে, তুমি সিঁথিতে সিঁদুর দিয়েছ? বাঃ খুব বউ বউ লাগছে তো?

তারপর সাতসকালে নারায়ণগঞ্জ থেকে সঠিক সময়েই বেলতলীর প্রথম লঞ্চে উঠে বসে রমা। লঞ্চ চলতে শুরু করলে ফোঁকলা দাঁতের দু-বুড়ি রমাকে কাছে ডাকে হাত ইশারায়। ওর পোশাকআশাক আর সম্ভ্রান্তির কথা ভেবে একটু স্থানও দেয় বসার। কথাবার্তা বলে বেশ ভালোই এগোতে থাকে সময়। ইঞ্জিন ঘরের দিক থেকে গান ভেসে আসে, পাগল মন মনরে মন কেন এত কথা বলে… গানে যখন মগ্ন রমা, “ঠিক সেই সময়ে খেয়াল হয় এক পরপুরুষ ওর দিকে নজর করেছে বারবার করে। বেহায়া লোক তো! কিন্তু সেই দৃষ্টিতে ঠিক লোভ খুঁজে পায় না রমা। তখন মনে মনে বলে, পুরুষের চোখ আমি চিনি। সত্যি। সেখানে কার কি অভিসন্ধি সেই পাঠ অনায়াসেই উদ্ধার করতে পারি।

বেলতলীতে লঞ্চ থেকে সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় মানুষটাকে দেখতে পেয়েছে ও। কিন্তু পরে যে কোথায় গেল? আর খুঁজে পায় না রমা। মেলায় নিজের মতো ঘুরে বেড়ায়। কত লোক কত চোখে তাকায়। শুধু সেই চোখটিকেই দেখে না, যে লঞ্চে বারবার ওকে দেখছিল। রমা মুখটিকে মনে করতে পারে। বিশেষ দৃষ্টিতেই যে ওকে দেখছিল। কেন? কারণ তো একটা আছে।

মেলায় ঘুরতে ঘুরতে পুকুরের ঢালু পাড় ঘেঁষা আসরের কাছে উপস্থিত হয় রমা। ভিড়ের ফাঁক গলিয়ে মেয়েদের দিকে এগিয়ে যেতেই আচমকা থেমে যায় ও। লঞ্চের সেই মানুষ বসে আছে বারান্দায়। সামনে কয়েকটা মোম। আগরবাতি গন্ধ বিলাচ্ছে। কোলে দুর্বল শিশু। দৃষ্টির মিলন হয় ফের।

এভাবেই মেলায় সাধু আর রমার মিলন ঘটে। ইতি পর্বে দেখি সাধুর হাত ধরে মেলা থেকে ফিরতি লঞ্চে ওরা ফিরে যাওয়ার চক্করে। দুজন উপস্থিত হয় সোজা তেওতায় বেহালাদারের বাড়ি। বেহালাদারকে কথা দিয়েছিল সাধু, জোড় পেলে যাবে। বেহালাদার দুজনকে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে বরণ করে নেয় সত্য, কিন্তু দু-দিন পর রোগক্লান্ত দেহে আর কিছুতেই নিঃশ্বাস নিতে পারে না।

সাধু রমাকে নিয়ে ফিরে আসে শাখারী বাজার। অধিকারী আর নিচতলার সবাই ওদেরকে বরণ করে নেয়, বাসরশয্যারও ব্যবস্থা করে। এরপরই শুরু হয় পাপপুণ্যি উপন্যাসের আসল খেলা।

বিছানায় শুয়ে শুয়ে সাধু ভাবে, এ কোন সজ্জা পাতা হয়েছে আজ? সাত পাঁকে বাধা নয় সম্পর্ক। কোর্টে গিয়েও বিয়ে সেরে আসেনি তারা। মনের লেনা-দেনাও নেই। পারস্পারিক কোন বোঝাপড়া না হলেও না হয় কথা ছিল। এমন নারীকে স্ত্রীর মর্যাদা দিয়ে বিছানায় যাওয়ার প্রশ্নই আসে না। শোয়ই বা সে কি করে পাশাপাশি।’

কিন্তু পাশাপাশিই শোয় দুজন রাতের পর রাত। সাধু যেমন মন চাইলেও অধিকারীর কাছে আসল সত্যটা খুলে বলতে পারে না। তেমনি রমাও সাধুকে ছেড়ে অন্য কোথাও যাবার চিন্তা মাথায় আনে না। কী করে আনবে, পুরুষরা পেলেই তো ওর শরীরটা খুবলে খুবলে খাবে! বাবা-মায়ের কাছে ফেরারও পথ নেই। সন্তান হবে না বলে জীবনে সব স্বপ্নও স্থবির। কিন্তু কামনা-বাসনা তো মরেনি ওর? কী করে মরে? দিনের পর দিন যে মেয়েটি প্রতিদিনই বহু পুরুষের ভোগের সামগ্রী হয়েছে, তার কি একদিনও পুরুষ-স্পর্শ ছাড়া চলে? সেওতো চায়, সাধু তাকে নিক। কিন্তু সাধু নেয় না ওর শরীর, যেভাবে যাত্রার মেয়েদের কাছ থেকে নিজেকে সরিয়ে রেখেছে, সেই মানসশক্তিতেই রমার শরীর পরম আকর্ষণীয় সত্ত্বেও সংযমের পরাকাষ্ঠা দেখায়। একই বিছানায় শুয়ে নিজেকে আগলে রাখে। এই দিনযাপনের ভেতর দিয়েই উঠে আসে দুজনের অতীতকাল। কীভাবে বাড়ি থেকে পালাতে হলো রমাকে, হাতের পর হাত বদলে পরিণত হলো বাজারী নারীতে! সাধুও কীভাবে জড়িয়ে পড়লো অধিকারীর সাথে যাত্রাপালায়। বুলবুল চৌধুরী সূক্ষ্ণভাবে উপন্যাসের চরিত্র দুটোর পূর্ণতা দেন। সেই সঙ্গে পাপপুণ্যির আঁধার খোঁজেন! রমার জীবনের সব পাপ যেন সাধু সঙ্গের অসাধ্য সংযমে ধুয়েমুছে সাফ হতে থাকে।

অনেক প্রশ্নের উত্তর খুঁজে, অনেক হিসেবনিকেশের দ্বন্দ্বের ঘোর কাটাতে কাটাতে দুজনের মধ্যে যখন সামান্য বোঝাপড়া তৈরি হয়, দুজন পহেলা বৈশাখের মেলা দেখতে প্রথমবারের মতো একসঙ্গে ঘর থেকে বেরোতে যাবে, তখনই অধিকারী ঠেকায় ওদের। জোর করে ঘরে বসিয়ে জানায়, কথা আছে। এমনভাবে অধিকারী আটকায়নি আর কখনো সাধুকে। জানায় মন্দিরা পালা লেখা শেষ হয়েছে। কে এই মন্দিরা? যাকে নিয়ে নয় বছরেও পালা লেখা হয়ে উঠছিল না মহাজনের, সেই পালা এ কদিনের মধ্যেই কীভাবে শেষ হতে পারলো? উপন্যাসের ভেতরর থেকে বেরিয়ে আসে জীবনের আরো অনেক গহন গভীর দিক। সেই সঙ্গে স্পষ্ট হতে বাকি থাকে না, রমার মাঝেই খুঁজে পেয়েছে অধিকারী মন্দিরার ছায়া। অধিকারী আর্জি জানিয়ে বসে যে, সাধুর বউ রমাকে করতে হবে মন্দিরা চরিত্রে অভিনয়। সে ছাড়া আর কাউকে ওই চরিত্রে আনা যাবে না।

জীবনের এই আশ্রয়টুকু বুঝি প্রয়োজন ছিল রমার। সাধুর পাশে শুধু শোয়ই, সাধু যেমন তাকে স্ত্রীর মর্যাদা দিচ্ছে না, শরীরের চাহিদাও মেটায় না। ওদিকে সাধুকে ছেড়ে যে অন্য কোথাও যাবে, কুকুরের মতো যে ওকে কামড়ে খাবে পুরুষগুলো। যাত্রাপালায় অভিনয়ের মধ্যে ডুবে থাকতে পারলে হয়তো নিজেকে ভুলে থাকার জীবন পাবে। অভিনয় করতে রাজী হয়ে যায় রমা।

কিন্তু একদিন রিহার্সেলে অধিকারীর চোখ দেখে চমকে ওঠে রমা। পুরুষের চোখ ও ভালোভাবেই পড়তে পারে। রমার প্রতি প্রবল তৃষ্ণার কথা বলে ওঠে অধিকারী। বলে, যে মাটি থেইকা পুতুল আমি গড়ি, সেই পুতুল কি আমার না, কও?

দৌড়ে পালায় রমা। সাধুর রুমে গিয়ে ওর পায়ের কাছে মেঝেতে মাথা ঠেকিয়ে দিয়ে প্রার্থনার মতো করে বলল, তোমার দু-হাত আমাকে দাও। নইলে যে অন্যের তৃষ্ণার হাত থেকে আমাকে আমি রক্ষা করতে পারছি না। নটী হয়ে বাঁচতে চাই না আমি। আমাকে তোমার হাত দাও সাধু। রক্ষা কর।

স্তম্ভিত হয়ে যাই রমার এ শুচি-শুভ্রতার টানে সাধুর কাছে ফিরে আসায় – এ কারণেই কি, ধ্রুব এষ বলেছিল, এমন মেয়ের কাছেই চাঁদ আসে বুলবুল ভাই!

কীভাবে বলেছিল কথাটা, কোন পরিপ্রেক্ষিতে, মনে হয় সে প্রসঙ্গটি তোলা এখানে অপ্রাসঙ্গিক মনে হবে না। এই পাপপুণ্যি উপন্যাসটিকে ঘিরেই বুলবুল চৌধুরীর সঙ্গে ধ্রুব এষের প্রথম দেখা হয়েছিল। সেটা ১৯৯১ সাল। বিদ্যাপ্রকাশ থেকে টুকাকাহিনিসহ বুলবুল চৌধুরীর বই বের হবে চারটি। টুকাকাহিনি একটু আগেই বেরিয়ে গেছে। সেটার প্রচ্ছদ করেছিলেন ধ্রুব এষ। প্রচ্ছদ দেখে বুলবুল চৌধুরীর মনে শিল্পীর সাক্ষাৎকার পাবার আশা জাগল। এ-সময় তৈরি ছিল বিদ্যাপ্রকাশ থেকে তার প্রকাশিতব্য উপন্যাস ‘পাপপূণ্যি’-র পান্ডুলিপি। প্রকাশকের দায়িত্ব সত্ত্বেও বইটির প্রচ্ছদ করাতে লেখক ছুটে গিয়েছিলেন ধ্রুব এষের আবাসস্থল চারুকলার শাহনেওয়াজ হলে। ধ্রুব এষ তখনও ছাত্র। শাহনেওয়াজ হল নিউ মার্কেটের পাশে। যা হোক, এই প্রথম দুজনের সাক্ষাৎ। লেখক শিল্পীকে শোনাল তার উপন্যাসের নাম এবং বিষয়বস্তুর সার-সংক্ষেপ।

তারপর?

তারপর ক-দিন বাদে বুলবুল চৌধুরী আবারও এলেন ধ্রুব এষের কাছে। প্রচ্ছদ হস্তগত হলো। শোনা যাক ধ্রুব এষের জবানিতেই, ‘প্রচ্ছদ হস্তগত হতে হতভম্ব লেখক বাটার পেপার উঠিয়ে দেখলেন। চশমার ভারি কাচের নিচে তার চোখের মণি কি আরো বড় হলো? কতক্ষণ ধরে দেখলেন! হাবভাব কিছু ধরতে পারলাম না। পছন্দ হয়েছে নাকি হয়নি?

ডায়লগ দিলেন, টাইপ কি রঙে থাকব মিয়া?

বইয়ের নাম ইয়েলো, হলুদ রঙে, আপনার নাম শাদা।

ফুটব। ভারি সুন্দর প্রচ্ছদ হয়েছে ভাই, ভারি সুন্দর। মেলার মানুষ আঁকছেন ধরতে পারতেছি, সব মানুষ লইয়া দেখি আবার একটা মেয়েমানুষের আকার পাইছে। ক্যান রে মিয়া? এইরমটা কোন তাড়নায় করলেন?

কোন তাড়নায়? কী বলব? একটা প্রচ্ছদ আমি ভাবি কীভাবে? বইয়ের কনটেন্ট শোনা বা পড়ার পর? পানির কুরুল্লার মতো বলেছি। এটা হয়ে যায়, অত ভাবি না। বানিয়ে বলে দিলাম, আপনি যে মেলার কথা লিখছেন সবটা মিলিয়ে সেই মেলা কি একটা মেয়েমানুষ না বলেন?

মেলা! মেয়েমানুষ! কী কইলেন মিয়া! এইটা কী কইলেন! এইরম ভাবি নাই তো! ভাবি নাই তো! ভাবি নাই তো! আইচ্ছা রে মিয়া আমি উঠি। উঠি। যাইগা।

আরে! কী হইছে?

বাসায় যাইগা মিয়া। কী কথা কইলেন! যা লিখছি সব বাদ, মিয়া। আবার লেখন লাগব। হ। মেলা। মেয়েমানুষ। ম্যালা মেয়েমানুষ। ভারি একটা চিন্তার খোরাক দিলেন মিয়া!’

হ্যাঁ, নতুন করেই আবার পাপপুণ্যি লিখেছিলেন বুলবুল চৌধুরী! কিন্তু ঠিক কী কারণে আউলাইয়া গেছিলেন বাংলা হৃদয়ের রূপকার, কারণটা কি আরেকটু সবিস্তারে জানতে ইচ্ছে করছে? তাহলে আবারো দ্বারস্থ হতে হবে মিঠা বুলির মানুষটার কাছে, “প্রচ্ছদ এঁকে আমার হাতে তুলে দেবার পর লক্ষ্য করলাম তিনি লাইন ড্রয়িংয়ে টেনেছেন কালো এক মেয়ের ন্যুড ছবি। ওর দুপা পেছনের প্রচ্ছদ অবধি গিয়ে ঠেকেছে। আবার পায়ের কাছটায় পূর্ণিমার চাঁদ আঁকা পেলাম। এতে এসে প্রশ্ন করেছিলাম, ধ্রুব, চাঁদ তো আয় আয় চাঁদ মামা কপালে টিপ দিয়ে যা – এখানে চাঁদ যে পায়ের কাছে?

তাঁর উত্তর ছিল, এমন মেয়ের পায়ের কাছেই চাঁদ আসে বুলবুল ভাই।

সঙ্গে সঙ্গেই চুপ হয়ে গেছি। তবে ভেবেছি, হা ঈশ্বর! চাঁদেও কি চোখ আছে যে সুন্দর পা বোঝে! পাপপূণ্যির নায়িকা নটি রমাকে অত সুন্দর সাজাতে পারিনি আমি। তাই বসে গেলাম কাটাকাটি দিয়ে মেয়েটিকে আরো অধরা করে তুলবার প্রচেষ্টায়।

বুলবুল চৌধুরী তার নিজের মতো একটা ফর্ম সাজিয়েছেন। চরিত্র ও ঘটনা প্রবাহকে নিয়ে গেছেন যখন যে ভাষারীতি প্রয়োজন হয়, সেদিকে। যেমন সাধু-পর্বের ভাষা আর রমা-পর্বের ভাষার বৈশিষ্ট্যর আলাদা ভিন্ন স্বাদ যে কেউ টের পাবে।

হ্যাঁ, বুলবুল চৌধুরীর সে প্রচেষ্টা অবশ্যই সফল হয়েছে। এই বস্তুবাদী ভোগবাদী সময়কে তিনি ঠিকই প্রতীকায়িত করতে পেরেছেন! তবে যৌবন নষ্ট জীবন নষ্টের পরও যে আশার তরী বাঁধা থাকে ঘাটে সাধু চরিত্রের বিন্যাসের ভিতর দিয়ে তা পরিস্ফুট করেছেন। একটা মেয়ে আর কোনোদিন মা হবে না, একটা মেয়ে বহু পুরুষে ভোগ্য হয়েছে জেনেও সাধু রমাকে ঠাঁই দেয় শুধু ভালোবাসার জোরে। যা সে নিজেও পেয়েছে রমার কাছ থেকে। উপন্যাসটি শৈল্পিক দিকের কথা মাঝে মধ্যে বলা হয়েছে। তারপরও আবার কিছু কথা বলতে হয়। বুলবুল চৌধুরী তার নিজের মতো একটা ফর্ম সাজিয়েছেন। চরিত্র ও ঘটনা প্রবাহকে নিয়ে গেছেন যখন যে ভাষারীতি প্রয়োজন হয়, সেদিকে। যেমন সাধু-পর্বের ভাষা আর রমা-পর্বের ভাষার বৈশিষ্ট্যর আলাদা ভিন্ন স্বাদ যে কেউ টের পাবে।

ঘাটের বাঁও- ঘূর্ণিস্রোতে চোরা জীবন

মানুষের জীবনকে যে কত শোকতাপ বইতে হয়! কত বিপন্নতা ঝড়ক্ষুদ্ধতার ভেতর দিয়ে অতিক্রম করতে হয় মরণসরণি, আমরা তার খোঁজ কজন রাখি! হয়তো বা একটি মহৎ উপন্যাস বা সমাজবাস্তবতা-সম্পন্ন ছোটগল্পে তার কিছুটা আঁচ অনুভব করা যায়, শোনা যায় পাতায় পাতায় সকরুণ নীরব দীর্ঘশ্বাস। মানুষের জীবনের এসব হাহাকার বা আর্তির উৎস কখনো যেমন উদ্ভূত হতে পারে ব্যক্তির নিজস্ব জীবন-সংকট থেকে, কখনো বা তার ঝাপটা এসে লাগে সমাজ বা রাষ্ট্রের ঘটে যাওয়া কোনো দুর্যোগগ্রস্ত ঘটনা থেকে। সেই মর্মপীড়া দাহন যেমন একজন মানুষের ভাব-অনুভাবকে সাময়িক পীড়া দেয়, তেমনি সুদীর্ঘকালের জন্যও তৈরি করতে পারে মনোবিকারের। গাঁও-গেরামের অনন্য রূপকার কথাশিল্পী বুলবুল চৌধুরীর উপন্যাস ঘাটের বাঁওয়ের চরিত্ররাও যেন তেমন মনোবিকারে ভুগছেন।

//তার মিঠা ভাষাটা বড় ভালো লাগে। বাংলাদেশের গ্রামগঞ্জের ছবি যেন তার শব্দে-শব্দে জীবন্ত হয়ে চোখের সামনে দুলে ওঠে। যেমন এই ঘাটের বাঁও নামটার কথাই ধরা যাক। আমরা কি এ শব্দ শোনামাত্রই ক্রমশ ঢালু হয়ে নেমে যাওয়া নদীর তীরে পৌঁছাই না?//

এ-বছর ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম দিকে হঠাৎই কাঁটাবনে ষড়শৈর্যর উজানে আড্ডা দেওয়ার মুহূর্তে ঘাটের বাঁও উপন্যাসটা নজরে পড়তেই সঙ্গে সঙ্গে কিনে ফেললাম। বেশ কয়েক বছর যাবৎ বুলবুল চৌধুরীর কোনো ছোটগল্প, উপন্যাস বা গদ্য পেলেই গোগ্রাসে পড়ি। তার মিঠা ভাষাটা বড় ভালো লাগে। বাংলাদেশের গ্রামগঞ্জের ছবি যেন তার শব্দে-শব্দে জীবন্ত হয়ে চোখের সামনে দুলে ওঠে। যেমন এই ঘাটের বাঁও নামটার কথাই ধরা যাক। আমরা কি এ শব্দ শোনামাত্রই ক্রমশ ঢালু হয়ে নেমে যাওয়া নদীর তীরে পৌঁছাই না?

ঘাটের বাঁও পড়তে পড়তেই ৭৩ নাম্বার পৃষ্ঠায় এসে এই বর্ণনাটুকু পড়েই থমকে যাই, “দৌড়ায় মানুষ মিলপাড়ের পথে। গিয়ে দেখে সনাতন সাহার টেকে খুন হয়েছেন লীডার। ঘন-ঝোপঝাড়ের বাঁকে পড়ে আছে তাঁর রক্তাক্ত দেহ। কোরবানীর সময়ে যেমন পশু জবাই দেওয়া হয়, তেমনি কোনো অস্ত্রের ধারে তাঁর ধড় আলাদা। লোকে লোকারণ্য হয়ে যায় অঞ্চল। অথচ কারো মুখে টু শব্দটি নেই। এ যেন কবরে দেহ নামানোর চাইতেও কঠিন নীরবতা।… সেই ঘটনায় ছায়ানগর জুটমিল একদিনের বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।”

আমি জানি না, আমার শৈশবের সেই বাইমাইলের মানুষটি খুন হওয়াতে কাসেম কটন মিলস লিমিটেডও একদিনের জন্য বন্ধ হয়েছিল কিনা। পরে শুনেছি, সেই মানুষটি নাকি ছিলেন কাসেম কটন মিলস লিমিটেড-এর একজন শ্রমিক এবং তিনিও খুন হন ঘাটের বাঁও উপন্যাসের লীডার আলফা ফকির যে-কারণে খুন হয়েছে সেই একই কারণে, শ্রমিক রাজনীতি। মিলে শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে আলফা ফকিরকে খুন করেছে ক্ষমতাসীন দলের ছত্রছায়ায় লালিত তার বিরুদ্ধ পক্ষ, সন্ত্রাসই যাদের হাতিয়ার।

বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চল, গ্রাম থেকে হয়ে ওঠা শিল্পাঞ্চল – এসব এলাকার বসবাসরত মানুষগুলো যে বুলবুল চৌধুরীর কী তীব্র চেনা, তার পরিচয় পাওয়া যায় উপন্যাসের সূচনা পর্বেই। তিনি সেই গ্রাম বা আধা-আরবান এলাকা থেকেই বের করে নিয়ে আসেন অসাধারণ প্রতীকীচিত্র, যা উপন্যাসের গঠনকে দেয় শক্ত বাঁধুনি আর শিল্প পায় অভিনব মাত্রা।

ঘাটের বাঁও উপন্যাসের মূল আখ্যান কিন্তু শ্রমিক রাজনীতি নয়। রাজনৈতিক উপন্যাস বুলবুল চৌধুরী কখনো লিখতে চেয়েছেন বলেও মনে পড়ছে না। তিনি সমকালীন নরনারীর হৃদয় নিয়ে খেলা করতে ভালোবাসেন। কিন্তু সেখানে সমাজ-বাস্তবতা চলে আসে, সময় আঁচড় কাটে। ঘাটের বাঁও উপন্যাসের মূল আখ্যানটি গড়ে উঠেছে ছায়ানগর জুট মিলের শ্রমিক তোরাব শেখ, আকবর আলী পাঠান এবং আকবর আলী পাঠানের যৌবন মদমত্ত স্ত্রী গালিবার মনোদৈহিক সম্পর্ককে ঘিরে। এবং এ-আখ্যানের ভেতর দিয়েও আমি আশ্চর্যভাবে আবিষ্কার করি যে, বর্তমানে জুট মিল কিংবা গার্মেন্টস শিল্পকে কেন্দ্র করে শ্রমিক-কর্মচারীদের কলোনিকেন্দ্রিক যে জীবনব্যবস্থা, বেঁচে থাকার যাপনপদ্ধতি, সে-চিত্রটি কী বিশ্বস্তভাবেই না উঠে এসেছে।

বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চল, গ্রাম থেকে হয়ে ওঠা শিল্পাঞ্চল – এসব এলাকার বসবাসরত মানুষগুলো যে বুলবুল চৌধুরীর কী তীব্র চেনা, তার পরিচয় পাওয়া যায় উপন্যাসের সূচনা পর্বেই। তিনি সেই গ্রাম বা আধা-আরবান এলাকা থেকেই বের করে নিয়ে আসেন অসাধারণ প্রতীকীচিত্র, যা উপন্যাসের গঠনকে দেয় শক্ত বাঁধুনি আর শিল্প পায় অভিনব মাত্রা। সকালবেলায় গ্রাম বাংলায় মুরগির কুঠি থেকে মুরগি বের করার কী তাজা বর্ণনা, মুরগিকে খুঁদ খাওয়ানোর প্রসঙ্গ ধরেই আসে তোরাব শেখের মা ছফুরা বানুর ‘মুরগির ওমে হাঁসের আণ্ডা বসিয়ে তোলা নয়-নয়টি ছাওয়ের কথা; এ বর্ণনা যেমন গ্রামবাংলার চেনা সংস্কৃতিকে তুলে ধরেছে, তেমনি এই চিন্তার সূত্র ধরে আমরা তোরাব শেখের মনের অতলান্ত জগতেও খুব সহজেই পৌঁছাতে পারি। মায়ের সঙ্গে কথা বললেও ওর মন পড়ে থাকে ফনির সঙ্গে কখন দোস্তের বাড়ি জেফত খেতে যাবে। আকবর পাঠানের স্ত্রী ‘গালিবাভাবীকে দেখতে পাওয়ার গোপন অভিলাষ। বউটির চোখের মণিতে কী এক ইঙ্গিত ওঠবস করে।’ উপন্যাসটি পুরো শেষ হলেই বোঝা যাবে মুরগির ওমে হাঁসের আণ্ডা বসানোর ব্যাপারটা।

হ্যাঁ, ফনির সঙ্গে আকবর পাঠানের বাড়ি সপ্তাহে একদিন লুডু খেলতে যায় তোরাব। দুজনের কারো উদ্দেশ্যই যে ভালো নয়, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে ক্রমশ। শেষ পর্যন্ত ফনি নয়, গালিবাভাবীকে কাঙ্খিত কামনাযাত্রায় পেয়ে যায় তোরাব। এর মধ্যেই এগিয়ে আসে শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচন। সবাই জানে লিডার হিসেবে জয়ী হবে আলফা ফকির। কিন্তু কোথা থেকে অসুরের মতো আবির্ভাব ঘটে ফালু মাঝির। ময়মনসিংহ পাড়ার দোকানে দোকানে আগুন লাগে, খুন হয়ে যায় একদিন বীভৎসভাবে আলফা ফকির। ময়মনসিংহ পাড়ায় আকবর পাঠানের থাকাটাও চরম ভীতিকর হয়ে ওঠে। কেননা, সবাই জানে সে আলফা ফকিরের ডান হাত হয়ে কাজ করতো। সে মিল ছেড়ে যেতে না পারলেও স্ত্রী গালিবাকে বাপের বাড়ি রেখে আসার সিদ্ধান্ত নেয়। কেননা, ফালু মাঝির লোভাতুর চোখ থেকে কোনো যৌবনবতী নারী রক্ষা পায় না।

নদীর ঘাটে লঞ্চে ওঠার আগে স্বামীর অনুপস্থিতির সুযোগে গালিবাভাবী তোরাবকে নির্দ্বিধায় জানায়, জানবেন আমার পেটে আপনার সন্তান!

নির্বাক তোরাব শেখ। কোনোদিকেই সে চোখ ফেরায় না। ওদিকে পৃথিবী ক্রমে ক্রমে ঢেকে যাচ্ছে সন্ধ্যার চাদরে। কোনো কিছুই আর দৃষ্টিগোচর নয়। ওদিকে ভেঁপু দিতে দিতে লঞ্চ মিশে যায় স্রোতের অন্ধকারে। তবে সব চলে যাবার পরও অন্তরের স্রোতে আবারো অন্তরে ঢেলেই তৈরি হয় জীবনের এক একটি ঘূর্ণন।

সেই ঘুর্ণন পাঠকের চেতনাকেও ঘিরে থাকে অনেকক্ষণ। বলার অপেক্ষা রাখে না, আমিও ক্ষণকাল সেই চক্করে পাক খেতে থাকি। আসলে আমাদের জীবনের পরতে পরতে গোপন গলিঘুপচিতে কতকিছু যে ঘটে, ঘটতে থাকে – সেই গোপন অলি-গলিতে আলো ফেলে দেখানোটাই তো কথাশিল্পীর কাজ। বুলবুল চৌধুরী সেখানে দারুণ সার্থক।

তবে উপন্যাসটি পাঠের পর আমি যখন বুলবুল চৌধুরীকে ফোন করি, বড় আক্ষেপ ঝরে পড়ে তার কণ্ঠে, হামিদ! উপন্যাসটা নিয়ে আরো কিছু কাজ করার ছিল। আরো খানিকটা ডিটেইলে যেতে পারতাম। চরিত্রগুলোকে আরো একটু ঝালাইমালাই করা যাইত। জানি না পারব কিনা। উপন্যাসটা আরেকবার লিখতে পারলে একটা ভালো জিনিস দাঁড়াইত। আমি তাঁকে আশ্বস্ত করি, নিশ্চয়ই বুলবুল ভাই, সে সুযোগ আপনি অবশ্যই পাবেন, শুধু ঘাটের বাঁও কেন, আরো কত নতুন লেখা লিখতে হবে আপনাকে, আপননামা, তারপর টুকা কাহিনির মতো আরো কটা গল্প…

পুলক হাসান | প্রেমিক ও স্বপ্নবাজ বুলবুল চৌধুরী | স্মৃতি

বুলবুল চৌধুরী ছিলেন থৈ-হারা এক স্বপ্নবাজ পুরুষ। জীবনতৃষ্ণায় আকণ্ঠ নিমজ্জিত এক প্রেমিক। তাঁর ভেতর ছিলো প্রেমের অবতার এক শ্রীকৃষ্ণের বাস। সে-প্রেমাভিযানে তাঁর গোটা জীবনটাই ছিলো ব্যতিক্রমী এক বাঙালি-বিলাস। ফলে, তাঁর উদ্দেশ্যে এই চারটি চরণ উৎসর্গ করতে পারি :

তাঁর কাছে জীবন ছিলো এক লীলা

সে লীলা দর্শনে পার করে দেন বেলা।

নিজে হয়ে উঠবেন সূর্য

তার জন্য ঢেলে দিলেন সকল শৌর্যবীর্য।

তাঁর আন্তরিক সম্ভাষণে মুগ্ধ নয় এমন কাউকে পাওয়া যাবে না। যারা পেয়েছেন তাঁর উদার সাহচর্য আজ তাদের সেই স্মৃতির ভেতর ঢুকে তাঁকে মেলে ধরার পালা। অনেকেই তা করছেন। এটাই তো স্বাভাবিক। বুলবুল চৌধুরীর মূল ঠিকানা সাহিত্য।

কিন্তু জানতেন না কোন দিকে আলো ছড়াবে তাঁর জীবনসূর্য। হতে চেয়েছিলেন সিনেমার পরিচালক। সে-সূত্রে যুক্ত ছিলেন বিনোদন সাংবাদিকতায়। অন্যের পত্রিকায় কাজ নয় শুধু, নিজেও বের করেছিলেন ‘রণরঙ্গিনী’ নামে একটি বিনোদন মাসিক। তৈরি করেন নাটকও। সে নাটকে আমি এবং প্রয়াত কবি ও চিত্রী মাহবুব কামরান অভিনয়ও করেছি। ঘোড়াশালে তার শুটিংও হয়েছে। কামরান ভাইয়ের চরিত্রটি ছিলো প্রেমিক ‘আক্কু’ আর আমি ছিলাম তার বন্ধু। যদিও অজ্ঞাত কারণে তা শেষ হয়নি। এ ছাড়া শিশুতোষ একটি বইয়ের চিত্রের প্রয়োজনে ‘অবাক জলপান’ নামে একটি নাটিকায় অভিনয় করেছি। শুটিং হয়েছে ডেমরার মাতুয়াইল ও ঢাকা থিয়েটার-কর্মী হুমায়ুন কবীর হিমু ভাইয়ের পুরানা পল্টনের টিনশেডের বাড়িতে। এছাড়া যুক্ত ছিলেন তিনি মুদ্রণ ব্যবসায়। সাহিত্য উন্মাদনায় ভিড়েছিলাম তাঁর ঘাটে। আজ সামান্য কৃতকর্মের জন্য সাহিত্য পত্রিকা ‘খেয়া’ নিয়ে যে স্বস্তিবোধ করি। ১৯৮৩ সালে এর উদ্বোধনী সংখ্যাটি বের হয় বুলবুল ভাইয়ের টিকাটুলির অভয় দাস লেনের ‘কথারূপ’ প্রেস থেকে। সংখ্যাটি ছিলো সম্পূর্ণ কবিতার। সেই যে তাঁর সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধা, তাঁর মৃত্যু অবধি ছিলো সেই সাহিত্যবন্ধন অবিচ্ছিন্ন। আজ কেন জানি বলতে ইচ্ছে করে, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রতীকী প্রেমিকা নীরার অসুখে যদি সারা কোলকাতা অসুখে ভোগে তবে বরেণ্য কথাসাহিত্যিক বুলবুল চৌধুরীর বিদায়ে গোটা বাংলা বাজার আজ বিষণ্ণতায় মোড়ানো। কারণ, তার এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত পর্যন্ত বুলবুল চৌধুরীর দ্যুতি ছড়ানো। সামনে দাঁড়ালে মনে হতো দ্যুতিময় এক দেবদূত। তাঁর আন্তরিক সম্ভাষণে মুগ্ধ নয় এমন কাউকে পাওয়া যাবে না। যারা পেয়েছেন তাঁর উদার সাহচর্য আজ তাদের সেই স্মৃতির ভেতর ঢুকে তাঁকে মেলে ধরার পালা। অনেকেই তা করছেন। এটাই তো স্বাভাবিক। বুলবুল চৌধুরীর মূল ঠিকানা সাহিত্য। এর বাইরে সবই তাঁর ভুল জ্যোৎস্নায় অবগাহন। সেই সংবিৎ ফিরে পেতে তাঁর বিলম্ব হয়েছিলো বৈকি। সাহিত্যে প্রবেশ তাঁর ষাট দশকের শেষভাগে। তিনি তখন জগন্নাথ কলেজের ছাত্র। সাহিত্য-জ্বরে তিনিও ছিলেন লিটলম্যাগ নিয়ে মত্ত। বের করতেন ‘সবাক’ নামে একটি ছোটকাগজ। সেটা ১৯৬৭-৬৮ সালের কথা। ওই লিটলম্যাগে ১. জোনাকী ও সন্নিকট কেন্দ্র, ২. বেড়া, ৩. মেঘ নামে তিনটি গল্প বের হয়। এর মধ্যে প্রথম গল্পটি জগন্নাথ কলেজ গল্পপ্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় পুরস্কারে ভূষিত হয়। এই তিনটি গল্পই এনে দেয় তাঁর খ্যাতি। তিনি হয়ে ওঠেন দেশের অন্যতম সেরা তরুণ গল্পকার। যদিও স্বাধীনতা-উত্তর ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘টুকা কাহিনী’র মধ্য দিয়েই তিনি চূড়ান্ত খ্যাতি অর্জন করেন, যে-অর্জন আজও অম্লান। আজও অনেকে তাই মনে করেন বুলবুল চৌধুরী মানেই ‘টুকা কাহিনী’। এর পরেই তাঁর সাহিত্যে দীর্ঘ বিরতি। ভেতরে ভেতরে ফিরে আাসার তাড়নাবোধ করলেও নানা টানাপোড়েনে পথ হারিয়েছেন, খেই হারিয়েছেন। ততক্ষণে তিনি নিজের মুদ্রণ ব্যবসা থেকে ছিটকে অন্যকে মুদ্রণ ব্যবসায় উৎসাহিত করে চলেছেন। এম এ সালেহ ভাইয়ের নারিন্দার বাসায় প্রেস বসানোর নেপথ্য অনুপ্রেরণা তাঁরই। সর্বশেষ ছিলো নয়া বাজারের সালমানী প্রেস। এখানে কাজের সূত্রে হাতে নিয়মিত টাকা আসায় বেসামাল হয়ে পড়েন। ছুটে যান লেংটার মেলায়। কতো কি করেন! মন বসাতে পারেন না লেখায়। এখানে প্রতিষ্ঠান থেকে অনেকগুলি টাকা নিয়ে উধাও হয়ে যায় তাঁর বিশ্বস্ত পেস্টার সুভাষ সাহা। বিপত্তিতে পড়েন তিনি। চলে যায় চাকুরি। দেখা হলে বলি বুলবুল ভাই আপনার একমাত্র ঠিকানা লেখালেখি। লেখক পরিচয় ছাড়া আপনার অন্য কোনো পরিচয় থাকতে পারে না। আর এই যে টানাপোড়েন তার দরকার ছিলো আপনার। কারণ, টানাপোড়েন ছাড়া জীবনে গতি আসে না। তারপরেই একদিন হাতে তুলে দিলেন ‘যাই’ নামের ছোট একটি উপন্যাস, যা ছিলো তাঁর গল্প থেকে উপন্যাস যাত্রার এসিড টেস্ট। সেটা তাঁর মতো হয়নি। ছিলো শক্তির অপচয়। সাহিত্য থেকে ইস্তফা দেয়ার আগাম নোটিশ। এটাই মনে করতেন তাঁর তাসের আড্ডার বন্ধু অলক বারী। একদিন রাস্তায় দেখা হলে অলক বারী ডেকে বলেন, এই পুলক, বুলবুল চৌধুরী নাকি সাহিত্য থেকে ইস্তফা দিলেন? আমি অবাক হয়ে বলি, তাই নাকি? তিনি বলেন বিশ্বাস না হয় তাঁর ‘যাই’ উপন্যাসটি পড়ে দেখেন ঠিক পেয়ে যাবেন। এই অলক বারী হচ্ছে বাংলাদেশের প্রথম চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’-এর চরিত্রাভিনেত্রী বিলকিস বারীর বড় ছেলে। তাঁর ছিলো সাপ্তাহিক ‘হ্যানিম্যান’ ও মাসিক ‘জলসা’ নামের দু’টি চটুল পত্রিকা। এর সর্বশেষ অফিস ছিলো নবাবপুরের ৪৪ নাম্বার ‘শিউলিবাড়ি’। মালিক ছিলেন ‘বঙ্গবন্ধু শিল্পী গোষ্ঠি’র প্রয়াত সভাপতি আলী আহমেদ। এ বাড়িতে তাসের আড্ডা বসতো। তাতে আলী আহমেদ ছাড়াও অংশ নিতেন শেখ আবদুল হাকিম, বুলবুল চৌধুরীসহ আরো অনেকে। আমার মূল আকর্ষণ ছিলো বুলবুল চৌধুরী। সেইসঙ্গে অলক বারীর পত্রিকার জন্য ফরমায়েসী লেখা দিয়ে নগদ অর্থগ্রহণও। এই অলক বারীকে হাকিম ভাই খুব অন্য চোখে দেখতেন। তিনি বলতেন, পুলক এই যে অলক বারী, ওর কোন পড়াশোনা নেই। কিন্তু ফুটপাত থেকে পুরোনো বই ঘেঁটে অসাধারণ একটি বই নিয়ে আসতো। আমি অবাক হয়ে যেতাম। একি তার দিব্যশক্তির জন্য? আমার কিন্তু তাই মনে হয়। এই হাকিম ভাই ও বুলবুল চৌধুরী দু’জনেই যে অভিন্ন হৃদয় সেটা সবারই জানা। কথাসাহিত্যের বাইরেও তাঁদের নির্ভেজাল সম্পর্ক। আরও আশ্চর্য দু’জনেই একই দিনে সকালে ও সন্ধ্যায় ইহলোক ত্যাগ করেন। বুলবুল চৌধুরী শেষ পর্যন্ত সাহিত্যে হাল ছেড়ে দেননি। ‘যাই’ উপন্যাসে ব্যর্থ হলেও পরে মিষ্টি প্রেমের উপন্যাস ‘কহ কামিনী’ দিয়ে তাঁর উপন্যাসের যাত্রাপথ উন্মুক্ত করেন। এরপর থেকে শুধুই উত্তরণের পালা। একে একে ‘পর মানুষ’, জলটুঙ্গি, ‘মানুষের মুখ’, ‘গাঁও গেরামের কথা‘, ‘শ্রেষ্ঠগল্প’, ‘অতলের কথকতা’, ‘এই ঘরে লক্ষ্মী থাকে’ ইত্যাদি সৃজনের মধ্য দিয়ে তাঁর সৃষ্টির বন্যা বইতে থাকে। বিলম্বে হলেও ভূষিত হন বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারে, যা তাঁর সাড়াজাগানো গল্পগ্রন্থ ‘টুকা কাহিনী’র জন্য অনেক আগেই পাওয়ার কথা ছিলো। যেহেতু একমাত্র গল্পগ্রন্থ ‘বুধবার রাতে’র জন্য একাডেমি পুরস্কার পেয়েছিলেন কবি সাইয়িদ আতীকুল্লাহ। এরপর ‘এ ঘরে লক্ষ্মী থাকে’ উপন্যাসের জন্য ব্র্যাক-সমকাল পুরস্কার এবং সামগ্রিক সাহিত্যের জন্য রাষ্ট্রীয় সম্মাননা একুশে পদক লাভ করেন তিনি। এর চেয়েও তাঁর বড় পুরস্কার হচ্ছে অগণিত মানুষের হৃদয় জয়। সেজন্য জীবনের নানা হাতছানিতে তিনি অসফল হলেও একজন সফল মানুষ। তিনি স্মৃতিতাড়িত। ফলে তাঁর সকল লেখাই আত্মজৈবনিক। তাই খুব টান থাকে জীবনের দিকে। তাঁর লেখায় কোনো অতিপ্রাকৃত বিষয়আশয় নেই, ঈশ্বর নেই, দর্শন নেই, দায় নেই, এমনি কি সামাজিক দায়ও নেই। মাঠ, ঘাট, প্রান্তর, আকাশ, নদী, সাপ, মাছ ও পাখির মতো সব মুক্ত। সবকিছুর মধ্যেই আছে এক গভীর আত্মীয়তা। ভালোবাসা ও যৌনতার সহজ প্রকাশ। তাঁর মধ্যেই রঙ, রূপ ও অবিমিশ্র এক সুন্দরের সন্ধান করেছেন তিনি। গ্রামবাংলার মানুষের জীবন সংগ্রামের ঘরোয়া ছবি তাঁর সাহিত্যের উপজীব্য। নরম কাঁদামাটির মতোই দরদী ও সংবেদনশীল এক টান দেখি তাঁর গল্পের গাঁথুনিতে, উপন্যাসের চরিত্র বিন্যাসে। যে-কারণে তিনি সর্বশেষ অভিষিক্ত হলেন ‘জল কাদার প্রতিপালক’ অভিধায়। এই অভিধায়ই সর্বশেষ গত ১৬ আগস্ট বাংলা বাজারের প্যারিদাস রোডের বাসায় পালিত হয় বুলবুল চৌধুরীর ৭৪তম জন্মদিন। কিন্তু কে জানতো এই মাসেই ফুরিয়ে যাবে তাঁর জীবন অধ্যায়?

Share Now শেয়ার করুন