মতিন রায়হান >> একজন হাবীবুল্লাহ সিরাজী : সশ্রদ্ধ ভালোবাসার মানুষ! >> স্মৃতি

0
329

একজন হাবীবুল্লাহ সিরাজী : সশ্রদ্ধ ভালোবাসার মানুষ! 

দশ লাইন ফেলে দিয়ে মাত্র নতুন একটি লাইন যোগ করে কবিতাটি শেষ করেছেন। এই ব্যাপক বদলের প্রশ্ন নিয়ে তাঁর সামনে দাঁড়ালে তিনি মৃদু হেসে জবাব দিতেন। বলতেন, দেখো, আমি যদি কবিতায় আগের জায়গায়ই দাঁড়িয়ে থাকি তাহলে কি আমার অস্তিত্ব থাকে?

প্রয়োজনে প্রায়ই তাঁর দপ্তরে আমাকে ডেকে পাঠাতেন। অত্যন্ত স্নেহের স্বরে কুশল জিজ্ঞেস করতেন। বলতেন, বসো। তারপর অফিস সহায়ককে ডেকে কফি দিতে বলতেন। তিনিও তখন কফি খাচ্ছেন। খেতে খেতে জিজ্ঞেস করতেন, হাতে এখন কী কাজ? কাজের খবরাখবর দিতাম। তারপর বলতেন, তোমাকে একটু কষ্ট দেবো! বলেই একটা প্যাকেট হাতে তুলে দিতেন।
প্যাকেট খুলে দেখতাম স্যারের কবিতার পুরোনো কিংবা নতুন পাণ্ডুলিপির ফাইনাল প্রুফ। বলতেন, তুমি একটু চোখ বুলিয়ে দিয়ো। তুমি দেখে দিলে আমি স্বস্তি পাবো। বানান প্রমিতই করে দিয়ো। স্যারের সান্নিধ্যে কিছু সময় কাটিয়ে আমি সহাস্যে আমার রুমে ফিরে যেতাম। এই করে করে গত কয়েক মাসে (চলতি বছরের মার্চের মাঝামাঝি পর্যন্ত) নতুন/পুরোনো মিলিয়ে অন্তত ৭/৮টি কাব্যগ্রন্থের পাণ্ডুলিপির ফাইনাল প্রুফ দেখেছি। পুরোনো পাণ্ডুলিপির প্রুফ দেখতে গিয়ে দেখেছি কোনো কোনো কবিতা তিনি আমূল বদলে ফেলেছেন। আট-দশ লাইন ফেলে দিয়ে মাত্র নতুন একটি লাইন যোগ করে কবিতাটি শেষ করেছেন। এই ব্যাপক বদলের প্রশ্ন নিয়ে তাঁর সামনে দাঁড়ালে তিনি মৃদু হেসে জবাব দিতেন। বলতেন, দেখো, আমি যদি কবিতায় আগের জায়গায়ই দাঁড়িয়ে থাকি তাহলে কি আমার অস্তিত্ব থাকে? আমি তো ‘নাই’ হয়ে যাই! কবিতা লিখতে হলে আমাকে তো বেঁচে থাকতে হবে! তাই না?
তাঁর এই অদ্ভুত জবাবে আমি ভাবনার সমুদ্রে হাবুডুবু খেতাম। ভাবতাম, ঠিকই তো! পাঁচ-সাত-দশ বছর আগের ভাবনার মধ্যে যদি আমি আটকে থাকি, তাহলে আমার সক্রিয় অস্তিত্ব কোথায়!
তাঁর দু’তিনটি পাণ্ডুলিপি দেখে দেওয়ার পর তিনি একদিন আমার হাতে তুলে দিলেন তাঁর প্রকাশিত কাব্যসমগ্রের দুই খণ্ড। চমৎকার হস্তাক্ষরের অটোগ্রাফসহ আমার হাতে বই দুটি তুলে দিতে দিতে বললেন, শোনো, আপাতত আমার কবিতার এই হচ্ছে চূড়ান্ত ভার্শন। এখন থেকে এর সঙ্গে মিলিয়ে দেবে। আমি দুনিয়ায় থাকি বা না-থাকি, এই আমার কবিতার পুত্র-কন্যা। সেদিন স্যারের এই আচরণে আমি কেমন বিহ্বল হয়ে পড়ি! এর আগে বাংলা একাডেমি প্রকাশিত তাঁর ‘নির্বাচিত কবিতা’র প্রথম থেকে চূড়ান্ত প্রুফ দেখেছিলাম সহকর্মী রাজীব কুমার সাহাকে নিয়ে। বরাবরই দেখেছি, আমার প্রমিত বানানে তিনি সবসময় আস্থা রাখতেন। অতি করিৎকর্মা মানুষ ছিলেন কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী। তাঁর টেবিলে কখনো কোনো অফিস ফাইল পড়ে থাকতে দেখিনি। প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে তা সংশ্লিষ্ট বিভাগে পাঠিয়ে দিতেন। মুহূর্তের মধ্যেই আঁচ করতে পারতেন উপস্থিত ব্যক্তির আগমনের হেতু এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে বিদায় জানাতেন। নানা কাজে তাঁর মানবিক চরিত্রের প্রমাণ পেয়েছি। এমন সংবেদনশীল মানুষ সমাজে খুব একটা দেখা মেলে না। সৎ ও নীতিনিষ্ঠতা ছিল তাঁর চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য। তিনি একাডেমিতে এসে দর্শনীয় অনেক কাজ করেছেন। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ উপলক্ষ্যে তিন বছরে পরিকল্পিত ১০০ বইয়ের মধ্যে তাঁর জীবদ্দশায় ৩৩টি বই প্রকাশিত হয়েছে। এসব বইয়ের বেশকটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকতে পেরে বেশ ভালো লাগছে।

২.

আরও একটি ঘটনাস্মৃতির কথা এ মুহূর্তে বিশেষভাবে মনে পড়ছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৫২ সালে নয়াচীনে শান্তি সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন এবং চীন সফরের অভিজ্ঞতা নিয়ে ১৯৫৪ সালে জেলে বসে লিখেছিলেন ‘আমার দেখা নয়াচীন’। বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় গ্রন্থ ‘কারাগারের রোজনামচা’র মতো ‘আমার দেখা নয়াচীন’ও বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হবে। শামসুজ্জামান খান স্যার যখন মহাপরিচালক ছিলেন তখন থেকেই নয়াচীনের পাণ্ডুলিপিটির প্রকাশনা প্রস্তুতি চলছিল। অবশ্য তাঁর কর্মকালে সেটি তিনি প্রকাশ করে যেতে পারেননি। কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী স্যার যখন একাডেমিতে মহাপরিচালক হিসেবে যোগ দিলেন তখনই এ পাণ্ডুলিপিটি প্রকাশের জোর প্রস্তুতি শুরু হয়। এর প্রকাশনার সঙ্গে আমিও যুক্ত হয়ে পড়ি। একদিন আমাদের বিভাগীয় পরিচালক জনাব মোবারক হোসেন (কবি সাজজাদ আরেফিন) আমাকে নিয়ে ডিজি স্যারের কক্ষে গেলেন। আমরা রুমে ঢুকতেই স্যার বললেন, কী ব্যাপার?
মোবারক স্যার বললেন, ‘আমার দেখা নয়াচীন’ নিয়ে কিছু জরুরি কথা আছে।
ডিজি স্যার বললেন, বলেন।
মোবারক স্যার বললেন, ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ ও ‘কারাগারের রোজনামচা’য় টীকা আছে। ‘আমার দেখা নয়াচীন’-এও টীকা থাকা দরকার। এসব টীকা কে লিখবে?
ডিজি স্যার মুহূর্ত বিলম্ব না করে বললেন, মতিন রায়হান লিখবে।

একদিন ডিজি স্যার রসিকতা করে আমাকে বলেছিলেন, কী, টীকা লিখতে এক্সপার্ট লাগে! লিখতে লিখতেই এক্সপার্ট হয়! তোমাকেও এক্সপার্ট বানাইয়া দিলাম। বলেই হো হো হেসে উঠলেন।

আমি বললাম, স্যার, আমাকে দিয়ে লেখানো ঠিক হবে না।
তিনি বললেন, কেন?
আমি বললাম, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বই। কোনো একাডেমিক এক্সপার্ট দিয়ে লেখালে ভালো হয়।
স্যার বললেন, কোনো এক্সপার্ট লাগবে না! তুমিই লিখবে!
মোবারক স্যারও বললেন, মতিন যা বলেছে, আমিও তাই বলি। কোনো এক্সপার্ট দিয়ে লেখালেই ভালো হয়।
স্যার আবার বললেন, মতিনই লিখবে। আর কোনো কথা নেই।
আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, কী কী টীকা হতে পারে, এর তালিকা করে নিয়ে আসো।
আমি অনিচ্ছা সত্ত্বেও সম্মতি জানালাম। তারপর স্যারের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রুমে চলে এলাম।
রুমে ফিরে সহকর্মী গবেষক মামুন সিদ্দিকী ও রাজীব কুমার সাহাকে বিষয়টি জানালাম। ওরাও বললো, কোনো এক্সপার্ট লিখলেই ভালো হতো।
স্যারের নির্দেশ। কী আর করা! কাজে লেগে গেলাম।
মামুন ও রাজীবের সঙ্গে পরামর্শ করে টীকার একটা প্রাথমিক তালিকা তৈরি করলাম। পরদিন নিয়ে গেলাম ডিজি স্যারের কাছে। স্যার তালিকা দেখে কিছু শব্দ কেটে দুয়েকটি নতুন শব্দ যোগ করলেন। তারপর বললেন, লিখতে শুরু করো। বেশি বড়ো করার দরকার নেই। তুমি পারবা। যে কোনো প্রয়োজনে আমার সঙ্গে শেয়ার করবা।
তারপর রুমে ফিরে আসি। মামুনকে দায়িত্ব দেওয়া হলো বঙ্গবন্ধুর সংক্ষিপ্ত জীবনী তৈরি করার। রাজীবকে বলা হলো বইয়ের নির্ঘণ্ট করার জন্যে। আমরা তিনজনেই কাজে লেগে গেলাম। যদ্দুর মনে পড়ে, সপ্তাহ খানেকের মধ্যেই টীকা লেখা শেষ করে ফেললাম। মামুন ও রাজীব ১০/১২টি টীকা লেখায় আমাকে সাহায্য করলো। বইটির কম্পোজ ও চূড়ান্ত মেকআপ হয়েছিল কবি-প্রকাশক তারিক সুজাত ভাইয়ের জার্নিম্যান-এ। এর প্রচ্ছদ ও বুক ডিজাইন করেছেন কবি তারিক সুজাত নিজে। বইটি প্রকাশনার চূড়ান্ত পর্যায়ে তারিক সুজাত ভাইয়ের পরামর্শে আরও কয়েকটি টীকা লিখতে হয়েছিল। তাঁর বক্তব্য, যেহেতু বইটি দ্রুতই বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হবে সেহেতু আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্য রিলেটেড বিষয়েও টীকা থাকা দরকার। তাই লেখা হলো, ‘ভাষা আন্দোলন’, ‘১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষ’ ইত্যাদি। এছাড়া বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিসিক্ত ‘হ্যাংচো হ্রদ’ নিয়েও টীকা লিখলাম তারিক ভাইয়ের পরামর্শে। সবশেষে ৫৩টি টীকা চূড়ান্ত হলো। এই চূড়ান্তকরণে যুক্ত ছিলেন শামসুজ্জামান খান স্যার ও হাবীবুল্লাহ সিরাজী স্যার। এতগুলো টীকা লেখার নানা অভিজ্ঞতা সত্যিই আমার ক্ষুদ্র জীবনের আজ মহার্ঘ স্মৃতি।
একদিন ডিজি স্যার রসিকতা করে আমাকে বলেছিলেন, কী, টীকা লিখতে এক্সপার্ট লাগে! লিখতে লিখতেই এক্সপার্ট হয়! তোমাকেও এক্সপার্ট বানাইয়া দিলাম। বলেই হো হো হেসে উঠলেন।

৩.

সেই টি-শার্ট যা কখনো দেয়া হয়নি তাঁকে

অনেকদিন আগে অর্থাৎ নতুন শতকের প্রথম দশকে বন্ধুদম্পতি চিত্রশিল্পী নাজিব তারেক ও ফারহানা আফরোজ বাপ্পীর ফ্যাশন হাউস বাঙ্গাল থেকে বিশ্বের প্রথম টিশার্ট কবিতা পত্রিকা শ্লোক ও ছড়াপত্রিকা খাপছড়া (সম্পাদক : আশরাফুল আলম পিনটু) প্রকাশিত হতো। আমি ছিলাম শ্লোক সম্পাদক। আমরা ৩৯টি সংখ্যা প্রকাশ করেছিলাম। শ্লোক পাক্ষিক হিসেবেই প্রকাশিত হতো। ঢাকার শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটের ফ্যাশন হাউস বাঙ্গাল ছিল শ্লোক প্রকাশনা-আড্ডার কেন্দ্রস্থল। প্রতিটি টিশার্টে নাজিব তারেকের অলংকরণসহ তিন-চারটি কবিতা স্ত্রিনপ্রিন্টে তারিখ ও সংখ্যাসহ মুদ্রিত হতো। দুয়েকটি সংখ্যার ইলাস্ট্রেশন করেছিলেন শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী, শিশির ভট্টাচার্য ও ধ্রুব এষ। দেশের প্রথিতযশা কবি থেকে শুরু করে অতি তরুণ কবির কবিতাও আমরা প্রকাশ করেছি পাক্ষিক শ্লোকে। বাঙ্গালের এই কার্যক্রম সেইসময় সুধীজনের বেশ নজর কেড়েছিল। এসব কথার অবতারণা এজন্যে যে, একটি সংখ্যায় কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজীর কবিতাও প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু প্রকাশনা-আড্ডায় তিনি উপস্থিত না থাকায় তাঁকে টিশার্টটি পৌঁছে দেওয়া হয়নি। ফোন করলেই বলতেন, তোমার কাছে রেখে দাও, দেখা হলে নিয়ে নেবো। দেখা আর হয় না! অবশ্য পরে ভুলেই গিয়েছিলাম। হঠাৎ একদিন ওয়্যারড্রবে টিশার্টটি পেয়ে গেলাম। কিন্তু ততদিনে সেটি মলিন হয়ে পড়েছে। পরে তিনি বাংলা একাডেমিতে জয়েন করার পরও সেটি দেওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলি। কারণ দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার ফলে এর মালিন্য। তাঁর প্রয়াণের পর এটি এখন আমার কাছে স্মৃতি হিসেবেই আছে। কখনো-সখনো এটি নেড়েচেড়ে তাঁর উপস্থিতিকে অনুভব করবো পরম ভালোবাসায়।

৪.

স্যার, আপনি খুব ভালো মানুষ ছিলেন।
আপনার পরকাল চিরশান্তির হোক।

তীরন্দাজ-এ লেখা পাঠাবার ঠিকানা

masud11111@gmail.com অথবা  eteerandaz@gmail.com

Share Now শেয়ার করুন