মতিন রায়হান | যাঁর প্রীতিপ্রেরণাসূত্রে হয়ে উঠি এক অভিধানকর্মী | স্মৃতিগদ্য-৫ | উৎসব সংখ্যা ১৪২৯

0
53

কর্মজীবনে অনেকেই নানান সূত্রে আমাদের প্রেরণা হয়ে ওঠেন। নির্মাণ করে দেন আমাদের ভবিষ্যৎ। এরকম একজন ছিলেন, কবি-লেখক মতিন রায়হানের কাছে, বাংলা একাডেমির প্রয়াত মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান। তাঁরই অনুপ্রেরণায় মতিন “অভিধানকর্মী” হয়ে উঠেছেন বলে মনে করেন। কিন্তু কীভাবে? এই লেখাটিতে পাওয়া যাবে তারই স্মৃতিচারণ। 

০১০ সালের নভেম্বর কিংবা ডিসেম্বরের কথা। বাংলা একাডেমির বার্ষিক সাধারণ সভায় অংশ নিতে গিয়েছি। প্রথম অধিবেশনের পর চা-বিরতি। বর্তমান রবীন্দ্রচত্বরে দাঁড়িয়ে চা-বিস্কিট খাচ্ছি। এমন সময় জামান ভাই (বাংলা একাডেমির তৎকালীন মহাপরিচালক প্রাবন্ধিক ও ফোকলোরবিদ শামসুজ্জামান খান) পাশে এসে দাঁড়ালেন। তাঁর হাতেও চায়ের কাপ। আমার কাঁধে বাঁ-হাত রেখে বললেন : কেমন আছো? আমি বললাম : জি, ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন? বললেন : ভালোই আছি। শোনো, মনে মনে তোমাকে খুঁজছিলাম। পেয়ে ভালোই হলো। তারপর আমাকে একপাশে একটু আলাদা করে নিয়ে বললেন : আমরা একটা বিশেষায়িত ডিকশনারি করবো। তুমি আমাদের সঙ্গে কাজ করবা। জবাবে আমি বললাম : কী বলেন! আমি ডিকশনারিতে কাজ করবো! ডিকশনারির কী বুঝি আমি? তিনি হেসে ফেললেন। বললেন : শোনো, তোমাকে তো আমি অনেকদিন ধরে চিনি। আমার বিশ্বাস, তুমি পারবা। আমিও হেসে ফেলি। তারপর সবিনয়ে বললাম : আপনি যদি মনে করেন যে আমি পারবো, তাহলে ডাকবেন। তারপর বললেন : অভিধানটি সম্পাদনা করবেন ড. গোলাম মুরশিদ। আমি সময়মতো তোমাকে জানাবো। খুব দ্রুতই আমরা কাজ শুরু করবো। অভিধানের কাজ শেষ হলে তোমাকে পার্মানেন্টলি একাডেমিতে নিয়ে নেবো।

সত্যি কথা বলতে কী, আমি তখন ড. গোলাম মুরশিদ সাহেবকে ব্যক্তিগতভাবে চিনি না। জানি, তিনি বিশিষ্ট গবেষক। জানি না, তিনি দেশে থাকেন না বিদেশে। জামান ভাইয়ের সঙ্গে বিশেষ পরিচয় দৈনিক জনকণ্ঠে কাজ করার সময় থেকেই। আমি তখন সপরিবার থাকি শ্যামলী ২ নম্বর সড়কের এক ভাড়া বাড়িতে। সেলিনা আপার (কথাশিল্পী সেলিনা হোসেন) বাড়ির মুখোমুখি উত্তর পাশের একটি বাড়ি। জামান ভাইয়ের বাড়ি শ্যামলী ১ নম্বর সড়কে। জামান ভাইয়ের বাড়ির দু-তিন বাড়ি আগে রাহমান ভাইয়ের (কবি শামসুর রাহমান) বাড়ি। সে-সময় এই তিনজনের বাড়িতেই আমার নিত্য যাতায়াত। তবে রাহমান ভাইয়ের বাড়িতেই বেশি যাই। জনকণ্ঠ থেকে রাহমান ভাই প্রতি মাসে পঁচিশ হাজার টাকা সম্মানি পান। চেক তৈরি হলে জনকণ্ঠের লোক সেটা পৌঁছে দেয়, কখনোবা রাহমান ভাই লোক পাঠিয়ে চেক সংগ্রহ করে নেন। বিশেষ দিবসে পত্রিকার বিশেষ সংখ্যা প্রকাশিত হবে। বিশেষ সংখ্যায় রাহমান ভাইয়ের কবিতা লাগবেই। একাধিক কবিতা লেখা হলেই অতি ভোরবেলা রাহমান ভাইয়ের ফোনে ঘুম ভাঙতো। বলতেন : আজ অফিসে যাওয়ার আগে আমার এখানে একটু চা খেয়ে যাবা। আমিও ঘুমজড়ানো কণ্ঠে সম্মতি জানাতাম। আমার অফিস বেলা এগারোটা থেকে পাঁচটা। আমি কাজ করি সম্পাদকীয় বিভাগে। উপসম্পাদকীয় পাতা চতুরঙ্গে অ্যাসিস্ট করি। সাংবাদিক আতাউর রহমান পাতাটির মূল দায়িত্বে। আতাভাই এক সময় দৈনিক সংবাদের নিউজ এডিটর ছিলেন। আমার পিতৃস্থানীয় হলেও ছোটো ভাইয়ের মতোই স্নেহ করেন। প্রতিদিন চতুরঙ্গে প্রকাশিতব্য লেখাগুলো পড়া, কোনো স্পর্শকাতর বিষয় থাকলে তা শনাক্ত করে আতাভাইয়ের সঙ্গে পরামর্শ করে তা এডিট করা, চূড়ান্ত প্রুফ সংশোধন ইত্যাদি কাজ শেষ করে পাতা মেকআপ করিয়ে উপদেষ্টা সম্পাদক তোয়াব ভাইকে (প্রথিতযশা সাংবাদিক তোয়াব খান) দেখানো পর্যন্ত আমাদের কাজ। তোয়াব ভাই ওকে করলেই সেদিনের মতো পাতার কাজ শেষ। তারপর পরের দিনের ম্যাটার কম্পোজে পাঠিয়ে আমরা বাসার পথ ধরি।

এবার আগের কথায় ফিরি। ফোন করার পর থেকেই রাহমান ভাই আমার অপেক্ষায় থাকতেন। আমি দশটা নাগাদ তাঁর বাসায় পৌঁছে যেতাম। কখনো তাঁকে পেতাম সকালের নাশতার টেবিলে, কখনোবা পড়ার টেবিলে। আমি ঘরে পা দিতেই পুত্রবধূ টিয়া রাহমানকে ডাকতেন। বলতেন : টিয়া, মতিন এসেছে, চা দাও। মনে হতো, টিয়া আন্টি যেন আগে থেকেই চা নিয়ে প্রস্তুত হয়ে আছেন। প্রায়ই রাহমান ভাই আমাকে তাঁর বিছানায় বসাতেন। বসার পর কিছুক্ষণ আমার মুখের দিকে নিশ্চুপ চেয়ে থাকতেন। আমি এর অর্থ বুঝতাম না। পরে তাঁর মুখেই শুনেছি ‘মতিন’ নামে তাঁর এক পুত্র শৈশবে পানিতে ডুবে মারা যায়। আমাকে দেখলেই নাকি পুত্র মতিনের ছবি তাঁর চোখে ভেসে ওঠে। এ জন্যে আমাকে দেখলেই তিনি কিছুটা আনমনা হয়ে পড়েন। তারপর কুশলাদি বিনিময় শেষে আমার হাতে তুলে দেন কবিতার খাতাটি। পাতা উল্টে দেখি তিন-চারটি কবিতা লেখা রয়েছে। কবিতাগুলো তাঁকে পড়ে শোনাতাম। তারপর বলতেন : সবচেয়ে ভালো কবিতাটি জনকণ্ঠের জন্যে বেছে নাও। তুমি নেওয়ার পর অন্য পত্রিকার লোকজনকে ডাকবো। কারণ জনকণ্ঠের কাছে আমি বিশেষভাবে ঋণী। আমি কবিতা বেছে নিয়ে চা খেয়ে তারপর অফিসের পথ ধরতাম।

পত্রিকার বিশেষ সংখ্যার সময় এলেই স্বেচ্ছায় দুয়েকজনের লেখা সংগ্রহের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতাম। যেহেতু আমি শ্যামলীতেই থাকি তাই শামসুজ্জামান খান ও সেলিনা হোসেনের লেখা সংগ্রহ করে দেওয়ার দায়িত্ব যেন আমারই। আমি সেটা সানন্দেই করতাম যতদিন পর্যন্ত জনকণ্ঠে কর্মরত ছিলাম। জামান ভাইও ঠিক রাহমান ভাইয়ের মতো রুলটানা কাগজে লিখতেন। তাঁর হস্তাক্ষর অনেকটা দুর্বোধ্য ঠেকতো। প্রায়ই অফিসের কম্পোজিটর কম্পোজ করতে গিয়ে বিভ্রান্ত হতেন। অনেক শব্দের পাঠোদ্ধার আমার পক্ষে সম্ভব হলেও কখনো কখনো আটকে যেতাম। তারপর ফোনের আশ্রয় নিতে হতো। ওপাশ থেকে রসিকতা করে জামান ভাই বলতেন : শোনো, সব যদি বুঝে ফেলো তাহলে তো আর আমার খোঁজ নিবা না। আমি ইচ্ছা করেই তোমাদের এমন ভোগান্তিতে ফেলি। আমার জনকণ্ঠ-যুগে এমনই ছিলেন জামান ভাই, রসিকতাপ্রবণ শামসুজ্জামান খান।

তত্ত্ববধায়ক সরকারের সময় জনকণ্ঠ সম্পাদক যখন কারাবন্দি তখন এগারো মাস বেতন না নিয়ে জনকণ্ঠকে বাঁচিয়ে রাখার যে লড়াই চলছিল, সেই দলে অনেকের মতো আমিও ছিলাম। দীর্ঘদিন পর সম্পাদক ছাড়া পেলে এক কুচক্রী সহকারী সম্পাদকের প্ররোচনায় প্রায় চল্লিশজন সাংবাদিককে চাকুরিচ্যুত করা হয়। অভিযোগ, তারা নাকি পত্রিকার টাকাপয়সা তছরুপ করেছে। কোনো প্রমাণ ছাড়া দক্ষ কর্মীদের এই অন্যায় চাকুরিচ্যুতির ফলে এক পর্যায়ে পত্রিকাটির ধস নামে। পরে সেই সহকারী সম্পাদক নানা কূটকৌশলে নির্বাহী সম্পাদক হন। ফলে পত্রিকাটি আর ঘাড় সোজা করে দাঁড়াতে পারেনি।

সম্পাদকের জীবদ্দশায়ই সেই নির্বাহী সম্পাদক পত্রিকাটি ছেড়ে আরেক পথ ধরে।
আমি যখন পারসোনার ফ্যাশন ও লাইফস্টাইল ম্যাগাজিন ক্যানভাস-এ কাজ করি, জামান ভাই তখন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক। একদিন তাঁকে ফোনে জানালাম যে, ক্যানভাসের ‘আলোকিত ব্যক্তিত্ব’ বিভাগে তাঁকে নিয়ে একটি লেখা লিখতে চাই। তিনি সম্মতি জানালেন। এটা ২০১০ সালের মার্চের ঘটনা। নির্দিষ্ট দিনে সহকর্মী আলোকচিত্রী রুমানা জাবীনকে (বর্তমানে নিউইয়র্কপ্রবাসী) নিয়ে বাংলা একাডেমির প্রেস ভবনের দোতলায় মহাপরিচালকের দপ্তরে হাজির হই। জামান ভাই আগে থেকেই প্রস্তুত ছিলেন। শুরু হলো ইন্টারভিউ। ক্যানভাস যেহেতু লাইফস্টাইল ম্যাগাজিন সেহেতু লাইফস্টাইল বিষয়ক নানা প্রশ্নও আমাকে করতে হলো। প্রশ্নে প্রশ্নে তাঁকে বিশেষভাবে জানবার যে সুযোগ ঘটেছিল, এর পুরোটাই সেদিন কাজে লাগিয়েছিলাম। তাঁর জীবনের প্রায় আদ্যন্ত সেদিন জানা হয়ে গিয়েছিল। তিনি সেদিন মেলে ধরেছিলেন তাঁর জীবনের আলোছায়াময় দিনগুলোর বৃত্তান্ত। জন্ম, বেড়ে ওঠা, পড়াশোনা, কর্মজীবন, লেখালেখিসহ জীবনভাবনার নানা দিক। কী করে তিনি অকস্মাৎ ফোকলোর চর্চায় যুক্ত হয়ে পড়লেন, সে-কথাও শোনালেন। ক্যানভাসের ‘কৃতী ফোকলোরিস্ট’ শিরোনামের সেই লেখা থেকে খানিকটা উদ্ধৃতি দিলেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠবে। “ব্যাপারটা শাপেবর হওয়ার মতোই। একাডেমির সংস্কৃতি বিভাগ থেকে সরিয়ে তাঁকে পাঠানো হলো ফোকলোর বিভাগে। কারণ সংস্কৃতি বিভাগে তিনি থাকলে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গির যথার্থ প্রতিফলন ঘটবে না। বদলি করা তো হলোই, এমনকি একজন বাঙালি জাতীয়তাবাদী হিসেবে চিহ্নিত করে এনএসআইয়ের মাধ্যমে ধরে নিয়ে ইন্টারোগেশনেও রাখা হলো। পঁচাত্তরের পরের ঘটনা এটি। ফোকলোর বিভাগে যোগ দেওয়ার পর সংস্কৃতির এক নতুন দিগন্ত খুলে যায় তাঁর সামনে। ফোকলোর চর্চার পাশাপাশি বিশ্বখ্যাত ফোকলোরিস্টদের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটে। ঘুরে বেড়ান দেশ-বিদেশের নানা জায়গায়। লোকসংস্কৃতির বিপুলা পৃথিবী দেখে অভিভূত হন। ফোকলোর নিয়ে শুরু হয় তাঁর ব্যাপক পঠন-পাঠন ও গবেষণা। আর এভাবেই ক্রমশ তিনি হয়ে ওঠেন আজকের যশস্বী ফোকলোরবিদ।

এবার শুরুর প্রসঙ্গে ফিরে যাই। কী করে আমি অভিধানকর্মী হয়ে উঠি? ২০১১ সালের জানুয়ারির প্রথম দিককার কথা। আগের দিন রাতে জামান ভাইয়ের ফোন। বললেন : কাল অফিসে যাওয়ার আগে সকাল দশটায় একাডেমিতে একটু আসো। গোলাম মুরশিদ সাহেবের সঙ্গে তোমাকে পরিচয় করিয়ে দেবো। আমিও সম্মতি জানালাম। পরদিন একাডেমির উদ্দেশে শেওড়াপাড়ার বাসা থেকে রওয়ানা দিলাম সকাল নটায়। ওয়ার্কিং ডে। রাস্তার জ্যাম ঠেলে শাহবাগ পৌঁছাতেই সকাল সোয়া দশটা। জামান ভাইয়ের ফোন। বললেন : কোথায়? মুরশিদ সাহেব তো বসে আছেন। আমি বললাম : এইমাত্র শাহবাগ পৌঁছেছি। তিনি বললেন : আসো, আসো। আমি বললাম : জি, মিনিট দশেকের মধ্যেই পৌঁছে যাবো। রিকশা নিয়ে আমি সাড়ে দশটার মধ্যেই একাডেমিতে পৌঁছে গেলাম।
প্রেস ভবনের দোতলায় মহাপরিচালকের দপ্তর। প্রথমেই জামান ভাইয়ের রুমে ঢুকি। তিনি আমাকে দেখেই বললেন : আসছো, আসো। চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে আমাকে তাঁর সভাকক্ষে নিয়ে গেলেন। সভাকক্ষে তখন একজন বয়স্ক ভদ্রলোক বসা। আরও কয়েকজন তরুণ রাউন্ড টেবিলের দুপাশে বসে আছেন। চকিতে বুঝে নিলাম হয়তো ইনিই হবেন ড. গোলাম মুরশিদ। তাঁকে লক্ষ করে আমি সালাম দিলাম। তিনি বসতে বললেন। জামান ভাই আমার সম্পর্কে গোলাম মুরশিদ সাহেবকে কিছু ব্রিফ করলেন। বললেন : আমরা যে ধরনের লোক খুঁজছি, মতিন ঠিক সেই রকমেরই। জামান ভাইয়ের এ কথায় আমি কিছুটা বিব্রত বোধ করি। কারণ মুরশিদ সাহেব যদি কাজে সেই প্রমাণ না পান! ওদের সঙ্গে আপনি কথা বলেন – এ কথা বলেই জামান ভাই তাঁর রুমে চলে গেলেন।

ড. গোলাম মুরশিদ সাহেব নিজের পরিচয় দিলেন। তিনি কোথায় থাকেন, কী করেন ইত্যাদি। আমাদের সম্পর্কেও সংক্ষেপে জানার চেষ্টা করলেন। তাঁর সমীহ জাগানিয়া আচরণে আমি খুব মুগ্ধ হলাম। বললাম : স্যার, কবে থেকে কাজটা শুরু হবে। তিনি বললেন : খুব শিগগিরই। তারপর মহাপরিচালকের এক অফিস সহকারীকে বললেন কিছু সাদা কাগজ দিতে। আমি অবশ্য একটি নোটবুক সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলাম। মুরশিদ স্যার বললেন : আমি তোমাদের কিছু শব্দ লিখতে দেবো, তোমরা নির্ভুল বানানে লেখার চেষ্টা করবে। আমরা তখন ৭/৮ জন ছিলাম। তিনি একেকটি শব্দ বলছেন, আর আমরা যার যার খাতা বা কাগছে লিখছি। সম্ভবত ১৩টি শব্দ লিখতে বলেছিলেন। লেখা শেষে একেকজনের বানান দেখছেন আর মন্তব্য করছেন। অধিকাংশই যুক্তাক্ষর রয়েছে এমন শব্দ। যেসব শব্দ লিখতে গিয়ে সচরাচর বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে, এমনসব শব্দই তিনি আমাদের লিখতে বললেন। আমি তেরোটি শব্দের মধ্যে বারোটিই নির্ভুল লিখেছি। একটি শব্দ ছিল ‘পরিবহণ’। আমি দন্ত ‘ন’ দিয়ে লিখেছিলাম। তিনি দন্ত ‘ন’ কেটে মূর্ধন্য ‘ণ’ লিখে দিলেন। অন্যদের কারও আট/নয়টি বানান সঠিক হয়েছে। কারও হয়েছে চার/পাঁচটি। উপস্থিত দুজনকে উদ্দেশ্য করে স্যার বললেন : তোমাদের অমুক (নাম উহ্য) পাঠিয়েছে, তোমরা তো বানান ঠিকঠাক জানোই না! অভিধানে কাজ করবে কীভাবে? যা-ই হোক, তারপর তিনি সবার নাম ও সেলফোন নম্বর একটি কাগজে লিখে নিলেন। বললেন : যথাসময়ে তোমাদের একাডেমি থেকে ফোন করে জানানো হবে। সবাই ভালো থেকো, বলেই তিনি উঠে দাঁড়ালেন এবং জামান ভাইয়ের রুমে ঢুকে পড়লেন। আমিও জামান ভাইয়ের রুমে ঢুকে তাঁর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাসার পথ ধরি।

মুরশিদ স্যারের তাৎক্ষণিক পরীক্ষায় মোটামুটি ভালো করে আমিও কেমন আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠি। মনে মনে ভাবি, হয়তো অভিধানের কাজে যোগ্য বিবেচিত হবো। সেদিন মুরশিদ স্যার কিছু পুরোনো অভিধানের নাম বলেছিলেন। সত্যি কথা বলতে কী, আমি সেসব অভিধানের নাম তখনও শুনিনি। কয়েকটা নাম টুকে রেখেছিলাম। আর মনে মনে ভেবে রেখেছিলাম দুয়েকটা অভিধান সংগ্রহ করে নেড়েচেড়ে দেখবো। সময় করে একদিন বাংলাবাজারে গেলাম। ভারতীয় বইয়ের জন্যে খ্যাত সেখানকার হাতেখড়ি থেকে জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের দুই খণ্ড ‘বাঙ্গালা ভাষার অভিধান’ কিনে নিয়ে এলাম। বাসায় এনে অভিধান নেড়েচেড়ে দেখি। শব্দ, অর্থ, প্রয়োগবাক্য ইত্যাদি দেখে দিনে দিনে কেমন যেন অভিধানমনস্ক হয়ে উঠি। বাংলা একাডেমির আহমদ শরীফ সম্পাদিত সংক্ষিপ্ত বাংলা অভিধানের সঙ্গে জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের অভিধানের শব্দ ও অর্থের পার্থক্য মিলিয়ে দেখি। আমার কাছে অভিধান বলতে এ দুটোই আছে। তবে কলকাতার সাহিত্য সংসদের সমার্থ শব্দকোষটিও রয়েছে আমার সংগ্রহে। সময় পেলেই জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের অভিধান খুলে দেখি। তখনও আমি হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের দুই খণ্ডের অভিধান ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’ দেখিনি। অভিধান সম্পর্কে আমার জ্ঞানগম্যি তখন এ পর্যন্তই।

মুরশিদ স্যার আমাদের পরীক্ষা নিলেন জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে। জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে বাংলা একাডেমি থেকে ফোন। সম্ভবত একাডেমির কর্মকর্তা খোরশেদ আলম ফোন করলেন। জানালেন, ১লা ফেব্রুয়ারি একাডেমিতে গিয়ে বিবর্তনমূলক অভিধান প্রকল্পে জয়েন করতে। আমি তাকে সম্মতি জানালাম।

১লা ফেব্রুয়ারি ২০১১। সকাল নটার মধ্যেই একাডেমিতে পৌঁছে যাই। প্রেস ভবনের দোতলার লোকশিল্প সংগ্রহশালাটির অধিকাংশ সংগ্রহ সরিয়ে প্রকল্পের কর্মীদের বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। অটবীর ইন্টেরিয়রে সজ্জিত রুমটিতে প্রত্যেকের জন্যে করা হয়েছে আলাদা ডেস্ক। আর শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাও রয়েছে। অনেকের মতো সেদিন আমিও যোগদান করলাম। মুরশিদ স্যার সবার সঙ্গে আবার পরিচিত হলেন। প্রকল্পের নানা নিয়মকানুন সম্পর্কে জানালেন। আমাদের এও জানালেন যে, প্রত্যেকের বেতন ধরা হয়েছে ত্রিশ হাজার টাকা। সকাল নয়টা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত অফিস সময়। লাঞ্চ বিরতি দুপুর একটা থেকে দুইটা। আমি বছরে দুবার লন্ডন থেকে দেশে আসবো। তোমাদের সঙ্গে আমার সার্বক্ষণিক যোগাযোগ থাকবে। মুরশিদ স্যার যখন নানা বিষয়ে ব্রিফ করছিলেন, তখন মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান আমাদের রুমে ঢুকলেন। আমরা সবাই দাঁড়িয়ে তাঁকে সম্মান জানালাম। তিনি সবাইকে একনজর দেখে বললেন : ‘জানো, অভিধান রচনা কিন্তু খুবই মজার কাজ! আমরা খুব মজা করে মনজুরে মওলার নেতৃত্বে ‘ছোটদের অভিধান’ রচনা করেছি। মুরশিদ সাহেবের সাথে কাজ করে তোমরা অনেক কিছু শিখতে পারবা। তিনি পণ্ডিত মানুষ। আর স্বরোচিষের তো অভিধান রচনার প্র্যাকটিক্যাল অভিজ্ঞতা আছেই। তোমরা মনোযোগী হলে একেকজন ভালো অভিধানকর্মী হতে পারবা।’ আরও কিছু সময় মুরশিদ স্যারের সঙ্গে কথা বলে জামান ভাই বেরিয়ে গেলেন। যেহেতু এখন আমি বাংলা একাডেমিতে কাজ করছি, সেহেতু এখন আর ‘জামান ভাই’ ঢাকা শোভন মনে হলো না। সবার মতো আমিও তাঁকে ‘স্যার’ ডাকতে মনস্থির করলাম।

বাংলা বিবর্তনমূলক অভিধান। বাংলাভাষায় এরকম অভিধান নেই। ইংরেজি ছাড়া অন্য কোনো ভাষায়ও তেমন অভিধান প্রণীত হয়নি। মুরশিদ স্যার বললেন : ‘শর্টার অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারি’ আমাদের মডেল। তবে কাজটি কীভাবে হবে তা নিয়ে আমি ভাবছি। এই ফাঁকে তোমরা হুবহু ব্যবহারিক অভিধানটি কম্পোজ করতে শুরু করো।

স্বরোচিষ স্যার প্রত্যেককে ব্যবহারিক অভিধানের আলাদা আলাদা অংশ কম্পোজ করতে দিলেন। আমরা প্রতিদিন একটু একটু করে অভিধান কম্পোজ রপ্ত করছি। এভাবে একেকটি দিন যায়। দিনে দিনে আমাদের কম্পোজের স্পিড বাড়ে। সপ্তাহ খানেক যেতেই মুরশিদ স্যার একদিন হঠাৎ প্রায় চিৎকার করে ওঠেন। স্যারের এই অতি উচ্ছ্বাসপূর্ণ আচরণে আমরা হতচকিত হয়ে পড়ি। কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকাতেই তিনি আমাদের সবাইকে হাত নেড়ে ডাকেন। আমরা একে একে নিজের ডেস্ক ছেড়ে তাঁর টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়াই। তিনি একটি পৃষ্ঠা প্রিন্ট দিয়ে আমাদের দেখান কীভাবে অভিধানের এন্ট্রি সাজাতে হবে। তাঁর চোখে-মুখে কী উজ্জ্বল আলো! যেন আবিষ্কারের উত্তেজনা তাঁর শরীরে ছড়িয়ে পড়েছে। আমাদেরকে যার যার ডেস্কে বসার কথা বলে রুম থেকে স্বরোচিষ স্যারকে নিয়ে তিনি ঝটিতি বেরিয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ পর ফিরে এলেন সঙ্গে জামান স্যারকে নিয়ে। তারপর আমাদের ইশারা করলেন তাঁর টেবিলের সামনে যেতে। জামান স্যারের হাতে তখন মুরশিদ স্যারের প্রিন্ট নেওয়া পৃষ্ঠাটি। জামান স্যার খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছেন। তারপর মৃদু হেসে বললেন : ‘যাক, তাহলে উপায় তো বেরিয়ে গেল। এখন উঠেপড়ে লেগে যান।’ আরও কিছুক্ষণ স্বভাবসুলভ রসিকতা করে জামান স্যার তাঁর রুমে ফিরে গেলেন।

তারপর গুরুগম্ভীর মেজাজে মুরশিদ স্যার বললেন : ‘কাল থেকে আমাদের আসল কাজ শুরু হবে। তোমরা এই নমুনা ফলো করে নির্দিষ্ট টেক্সট থেকে ভুক্তি শব্দ নির্বাচন করবে এবং এরপর শব্দটির পদ, অর্থ ও প্রয়োগ বাক্য লিখবে। তারপর উৎস ও সময়কাল লিখবে। আর শব্দটির ব্যুৎপত্তি স্বরোচিষ কিংবা আমি দেবো।’ স্যারের এসব কথায় আমরাও যেন একটা উপায় খুঁজে পেলাম। এতদিন ব্যবহারিক অভিধান কম্পোজ করতে করতে যে একঘেয়েমি পেয়ে বসেছিল, এবার যেন তা থেকে মুক্তিই পাওয়া গেল। আমরাও কাজের একটি দিকনির্দেশনা পেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম।

পরদিন থেকে মুরশিদ স্যারের নমুনা অনুসরণ করে শব্দ খোঁজা শুরু হয়ে গেল। প্রত্যেকের জন্যে নির্দিষ্ট টেক্সট দেওয়া হলো। শুরুতেই আমাদের ভাগ করে দেওয়া হলো মধ্যযুগের সাহিত্য। যেমন শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, চণ্ডীমঙ্গল, চৈতন্যচরিতামৃত প্রভৃতি। চর্যাপদের দায়িত্ব নিলেন স্বরোচিষ স্যার। আমরা অতি উৎসাহের সঙ্গে ভুক্তিশব্দ বাছাই করে এর পদ, অর্থ, প্রয়োগবাক্য, রচয়িতা ও শব্দটি ব্যবহারের সম্ভাব্য সাল লিখছি। এই কর্মযজ্ঞে সংকলক হিসেবে প্রাথমিক পর্যায়ে আমিসহ যোগ দেন মুহম্মদ সাইফুল ইসলাম, আসিফ আজিজ, জামাল উদ্দিন জাহেদি, মাহফুজা হিলালী, মোঃ আমিরুল ইসলাম, শামস্ নূর, আবু হেনা মোস্তফা এনাম ও অঞ্জন আচার্য। আর বাইরে থেকে কাজ করে এন্ট্রি জমা দেবেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরির কর্মকর্তা ড. কল্পনা ভৌমিক। অন্যান্য কাজের পাশাপাশি মুরশিদ স্যারও দুষ্প্রাপ্য টেক্সট থেকে এন্ট্রি করবেন। অর্থাৎ সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় তৈরি হবে বিবর্তনমূলক অভিধানের কাক্সিক্ষত পাণ্ডুলিপি। কিছুদিন যেতেই ব্যক্তিগত অপারগতা প্রকাশ করে আবু হেনা মোস্তফা এনাম তাঁর পূর্ব কর্মস্থলে ফিরে যান। বিবর্তনমূলক অভিধান কর্মসূচি সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের জন্যে এপ্রিল মাসে পত্রিকায় একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। তারপর মে মাসে একটি পরীক্ষার মধ্য দিয়ে চূড়ান্তভাবে সংকলক নির্বাচন করা হয়। জুন মাসে নতুন সদস্য হিসেবে যোগ দিলেন রাজীব কুমার সাহা ও মোঃ মাইনুল ইসলাম। ওরা দুজনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাবিজ্ঞান বিভাগ থেকে সম্মান ও স্নাতকোত্তর। তারপরই সংকলকদের একটি চূড়ান্ত টিম তৈরি হলো। বছরের শেষ দিকে সংকলকদের মধ্য থেকে আরও একজন বিদায় নেন। কাজের মাঝামাঝি পর্যায়ে যোগ দিলেন ফারহান ইশরাক।

দিনে দিনে জানা হয়ে যায় বাংলা ভাষার বিবর্তনমূলক অভিধান কর্মসূচি কীভাবে শুরু হলো এর প্রেক্ষাপট। গোলাম মুরশিদ স্যার যখন শামসুজ্জামান খান স্যারকে এমন একটি অভিধান তৈরির প্রস্তাব করেন বছর দুয়েক আগে তখন জামান স্যার সঙ্গে সঙ্গে এ প্রস্তাব গ্রহণ করেন। তিনি বলেন : ‘এটি তো বেশ বড়ো প্রজেক্ট হবে। অনেক টাকা-পয়সার দরকার হবে। এই নিয়ে প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর মধ্যে সঙ্গে কথা বলতে হবে। চলেন একদিন অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করি।’ ইতোমধ্যে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে মুরশিদ স্যারকে নিয়ে জামান স্যার দেখা করলেন। তাঁরা অভিধানটির রূপরেখা অর্থমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরলেন। মন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বিদগ্ধ, পণ্ডিত মানুষ। তিনি সহজেই বুঝে ফেললেন অভিধানটির স্বরূপ। বললেন : ‘আপনারা প্রজেক্ট উপস্থাপন করুন। টাকা যা লাগে আমি দেবো।’ মুরশিদ স্যার ও জামান স্যার সেদিন উৎফুল্ল মনে ফিরে এলেন। প্রস্তাবিত অভিধানটির কথা প্রধানমন্ত্রীর কাছেও পৌঁছে গেল জামান স্যারের সূত্রে। প্রধানমন্ত্রীও সানন্দে সম্মতি জানালেন। শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর একান্ত ইচ্ছায় ‘বাংলা ভাষার বিবর্তনমূলক অভিধান কর্মসূচি’ পাশ হয়ে গেল। সংস্কৃতিমন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ ও তাঁর মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে শুরু হয়ে গেল অভিধান কর্মসূচির কাজ।

এবার একটু পেছনে ফিরে যাই। মুরশিদ স্যার অভিধানের সার্বিক দিকনির্দেশনা দিয়ে সম্ভবত মার্চ মাসের শেষদিকে লন্ডন চলে গেলেন। তাঁর অবর্তমানে স্বরোচিষ স্যার আমাদের কর্মযজ্ঞ দেখাশোনা করবেন। তিনি তাঁর কর্মস্থল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছুটি নিয়ে এসেছেন। সর্বক্ষণ আমাদের দেখভাল করবেন। সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করবেন একাডেমির সহপরিচালক মুহম্মদ সাইফুল ইসলাম। বলে নেওয়া দরকার, মুরশিদ স্যার লন্ডনে অবস্থান করলেও আমাদের সঙ্গে তাঁর সার্বক্ষণিক যোগাযোগ থাকছে। কারণ অভিধান প্রণয়নের কক্ষটি প্রকল্পের শুরুর দিকেই ডিজিটালাইজড করা হয়েছে। আর সেটি সম্পন্ন করা হয়েছে হাসিব ইসতিয়াকুর রহমানের তত্ত্বাবধানে। আমরা কখন, কী করছি কিংবা কোনো নির্দেশনা দেওয়া প্রয়োজন হলে সবই সম্ভব হতো একটি ডিজিটালি সংযুক্ত সার্ভারের মাধ্যমে অর্থাৎ এই কক্ষে সংযুক্ত একটি বিশেষ ক্যামেরার মাধ্যমে লন্ডনে অবস্থানরত অভিধানের সম্পাদক গোলাম মুরশিদ স্যার ও রাজশাহীতে অবস্থানকালে সহযোগী সম্পাদক স্বরোচিষ সরকার স্যার আমাদের সার্বক্ষণিক দেখতে পেতেন। মুরশিদ স্যার বছরে দেশে দুবার এলেও পুরো কাজের তত্ত্বাবধান করতেন ডিজিটালি। এন্ট্রি করার পাশাপাশি চলতো তাঁর শ্রমলব্ধ সম্পাদনা কর্মও। যখন যাকে পরামর্শ দেওয়ার প্রয়োজন হতো, সঙ্গে সঙ্গে তিনি সেটা দিতেন।

জামান স্যারও প্রায়ই আমাদের অভিধান কক্ষে ঢুকে কাজের খোঁজখবর নিতেন। নতুন কোনো শব্দ মাথায় এলেই তিনি ছুটে আসতেন আমাদের রুমে। শব্দটি যেন অভিধানে গ্রন্থিত হয়, সে পরামর্শও দিতেন। এছাড়া আরও বলতেন পর্যায়ক্রমে ব্যবহারিক, বানান, ইংরেজিসহ সব ক’টি অভিধান সংস্কার করবো। তাঁর এরকম আচরণে স্পষ্ট হয়ে উঠতো অভিধানমনস্কতার প্রীতিসূত্র।

ইতোমধ্যে অভিধানের শব্দ সংগ্রহের কাজ এক বছর অতিক্রান্ত হলো। অভিধানটির মানোন্নয়নের লক্ষ্যে শামসুজ্জামান খানের বিশেষ উদ্যোগে ২০১২ সালের ৪ঠা জানুয়ারি এক আন্তর্জাতিক কর্মশালার আয়োজন করা হয়। এ কর্মশালায় যোগ দেন দেশ-বিদেশের বিদগ্ধ পণ্ডিতরা। সেদিন যাঁদের মূল্যবান মতামতে অভিধানটির ঋদ্ধি ঘটেছিল তাঁরা হলেন বিশিষ্ট আভিধানিক ও গবেষক মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান, ভাষাতাত্ত্বিক অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম, কবি-নাট্যকার ও ঔপন্যাসিক সৈয়দ শামসুল হক, পশ্চিমবঙ্গের ভাষাবিদ অধ্যাপক পবিত্র সরকার, ব্রিটেনের কবি ও গবেষক ড. কেতকী কুশারী ডাইসন, অভিধানপ্রণেতা জামিল চৌধুরী, বাংলাপিডিয়া সম্পাদক অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম, অধ্যাপক ড. হায়াৎ মামুদ, অধ্যাপক শফি আহমেদ, কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন, অধ্যাপক ড. আবুল আহসান চৌধুরী, অধ্যাপক ড. মাহবুবুল হক, ড. ফিরোজ মাহমুদ, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. জীনাত ইমতিয়াজ আলী প্রমুখ। সেদিনের কর্মশালায় অভিধান সম্পাদক ড. গোলাম মুরশিদ স্যার ও অভিধান বাস্তবায়ক শামসুজ্জামান খান স্যার তো ছিলেনই। এ কর্মশালার পর নতুন উদ্যমে শুরু হলো অভিধান প্রণয়নের কাজ। এই অভিধান প্রণয়নে মুরশিদ স্যারের যে আত্মনিবেদন ও শ্রমনিষ্ঠা এবং জামান স্যারের যে অতি আগ্রহ তা আমাদের কাছে চিরভাস্বর প্রেরণা হয়ে থাকবে।

প্রায় তিন বছরের কঠোর পরিশ্রমের ফসল তিন খণ্ডের তিন হাজার একশ পৃষ্ঠার এই ‘বিবর্তনমূলক বাংলা অভিধান’। এ অভিধানে ভুক্তি অর্থাৎ মূলশব্দ দাঁড়িয়েছে এক লাখ পঁচিশ হাজার। আর মূলশব্দের রূপান্তরগুলো হিসেব করলে এর সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় দেড় লাখ। অর্থান্তর বোঝানোর জন্যে প্রয়োগবাক্য আছে এক লাখ ষাট হাজারের বেশি। বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন চর্যাপদ অর্থাৎ আনুমানিক ১২০০ সাল থেকে শুরু করে মোটামুটি ১৯৭২ সাল পর্যন্ত রচিত নানা ধরনের পুথি, দলিল-দস্তাবেজ, বই, পত্রপত্রিকা, নথিপত্র ইত্যাদি থেকে শব্দ গৃহীত হয়েছে।

অভিধানটির প্রথম খণ্ড প্রকাশিত হয় ২০১৩ সালের জুনে। একই বছরের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত বার্ষিক সাধারণ সভার চা-বিরতিকালে অভিধানটির বাস্তবায়ক শামসুজ্জামান খান স্যার অভিধানটির প্রথম খণ্ড কী উচ্ছ্বাসের সঙ্গে একাডেমিতে উপস্থিত বিদগ্ধ সদস্যদের অনেককে দেখাচ্ছিলেন আর পাশে দাঁড়িয়ে সম্পাদক গোলাম মুরশিদ স্যার তৃপ্তির হাসি হাসছিলেন। সে দৃশ্যটি আজও চোখে ভাসে। জামান স্যারের এই আনন্দ-উচ্ছ্বাস পূর্ণমাত্রা পেয়েছিল পরের বছর অর্থাৎ ২০১৪ সালের পহেলা ফেব্রুয়ারি অর্থাৎ অমর একুশে গ্রন্থমেলা উদ্বোধনের দিন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন উদ্বোধন অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে তিনখণ্ডের ‘বিবর্তনমূলক বাংলা অভিধান’ দু’হাতে তুলে উপস্থিত দর্শকদের দেখাচ্ছিলেন তখন জামান স্যারের চোখ-মুখ কী এক আনন্দ-আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছিল। মনে হয়েছিল তিনি তাঁর কর্মকালে এক অনন্যসাধারণ কাজ সম্পাদন করলেন; যা তাঁকে দীর্ঘকাল বাঁচিয়ে রাখবে। পাশাপাশি গোলাম মুরশিদ স্যার ও স্বরোচিষ স্যারসহ আমরা যারা এই অভিধান প্রণয়নে প্রাণান্ত ভূমিকা রেখেছি, তারাও যেন আজ ইতিহাসের অংশ হয়ে গেলাম। কী আনন্দ! কী আনন্দ!

সবশেষে বলি, আজ আমার এই যে অভিধানপ্রীতি, হরহামেশা শব্দ নিয়ে শিশুর মতো এক্কাদোক্কা খেলা, এর নেপথ্যের প্রধান প্রেরণাশক্তি শ্রদ্ধাভাজন শামসুজ্জামান খান। আমার পক্ষে তাঁকে বিস্মৃত হওয়া কখনোই সম্ভব নয়।

১১.০৫.২০২১। ঢাকা

Share Now শেয়ার করুন