মনোয়ার মোকাররম >> নীরব মহাসমুদ্রের কল্লোলে >> গদ্য

0
262

 নীরব মহাসমুদ্রের কল্লোলে

সাম্প্রতিক এক জরিপ অনুযায়ী, গড়ে প্রতিদিন ৫০,০০০ লোক টরন্টো পাবলিক লাইব্রেরির ১০০টি শাখায় ঢুঁ মারে। ৮৫,০০০ জন অনলাইনে ভিজিট করে। এই সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। কানাডিয়ান প্রাপ্তবয়স্ক পাঠকরা প্রতিসপ্তাহে মোটামুটি ছয় ঘণ্টা ব্যয় করে। সহজেই অনুমেয় একজীবনে তাদের পঠিত বইয়ের সংখ্যা কত হতে পারে।

এইখানে এই তরুর তলে
তোমার আমার কৌতুহলে,
যে ক’টি দিন কাটিয়ে যাবো প্রিয়ে –
সঙ্গে রবে সুরার পাত্র
অল্প কিছু আহার মাত্র
আরেকখানি ছন্দ মধুর কাব্য হাতে নিয়ে!
[ওমর খৈয়াম, অনুবাদঃ সৈয়দ মুজতবা আলী]

যে সময়ের কথা বলছি তখন কানাডাতে মার্চের প্রথম সপ্তাহ, ২০২০ সাল। বছরের এই সময়টাতে শূন্যের কাছাকাছি তাপমাত্রা আর শরীর বিদীর্ণকারী কনকনে বাতাসে তরুর তলে ছন্দমধুর কাব্য হাতে নিয়ে অবকাশ যাপন করার সুযোগ নেই। তার উপর এই শীতে এখানকার তরুদের খুবই হতশ্রী অবস্থা, অধিকাংশই আছে শীতনিদ্রায়, পাতাবিহীন কংকালসার শরীরে শ্রীহীন। তবে, তরুতলে না হোক, বইয়ের সান্নিধ্য পেতে যদি একান্তই ইচ্ছে হয় আর আপনি যদি টরন্টোতে থাকেন, আপনি চলে যেতে পারেন টরন্টো পাবলিক লাইব্রেরির কাছাকাছি কোন একটি শাখায় আর ডুব দিতে পারেন বইয়ের রাজ্যে।

বেশ কয়েকদিন ধরেই ভাবছিলাম একবার ঢুঁ মারব টরন্টোর পাবলিক লাইব্রেরিতে। তখনো করোনার প্রাদুর্ভাব শুরু হয় নি এখানে। পৃথিবীর অনেক জায়গায় যদিও শুরু হয়ে গেছে ভীতি-জাগানিয়া এই জীবাণুর সংক্রমণ এবং ক্রমশ বিস্তৃত হচ্ছে। যাই হোক, টরন্টো পাবলিক লাইব্রেরির কথা আগেই শুনেছি। একশটি শাখা নিয়ে টরন্টোর এই লাইব্রেরি-ব্যবস্থা শুধু কানাডাতেই নয়, সমগ্র উত্তর আমেরিকারই সবচেয়ে বড় লাইব্রেরি সিস্টেম হয়ে দাঁড়িয়েছে। ডাউনটাউনে টরন্টো রেফেরেন্স লাইব্রেরি সম্ভবত সবচেয়ে সমৃদ্ধ ও বড়। নর্থ ইয়র্কের ইয়ং স্ট্রিটের নর্থ ইয়র্ক সেন্ট্রাল লাইব্রেরিও বেশ প্রসিদ্ধ। অন্যগুলোও কম সমৃদ্ধ নয়, তবে আকারে এবং পরিসরে হয়তো কিছুটা ছোট হতে পারে। আপনি আপনার বাসার কাছাকাছি যে-কোন শাখায় গিয়ে মনের মতো বই খুঁজে নিয়ে পড়তে পারেন।

কানাডার ব্যাপারে একটা কথা বেশ প্রচলিত। থ্রি ডব্লিউকে বিশ্বাস করতে নেই – উইমেন, ওয়েদার আর ওয়ার্ক। সেবার যেন একথা আরো বেশি করে প্রমাণ করে চলছিল টরন্টো। যেখানে ডিসেম্বর থেকেই জেঁকে শীত নামার কথা, সেখানে মার্চ পর্যন্ত অনেকদিনই তাপমাত্রা ৪/৫/৬ ডিগ্রি মতো ছিল। কখনো কখনো তাপমাত্রা ০’র নিচে নেমেছে বৈকি, তবে তা টরন্টো বা কানাডার শীতের তুলনায় কিছুই নয়। এখানে তাপমাত্রা শূন্যের নিচে ৩৫/৪০ ডিগ্রি পর্যন্ত নামে শীতের সময়ে। সেখানে ডিসেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত দুই বা তিনদিন তাপমাত্রা (-) ১৭ বা (-) ২১ ছিল। স্যাতঁসেঁতে বৃষ্টি বলতে যা বোঝায় তা একেবারেই ছিল না। তুষারপাত উপভোগ্য মাত্রায় ছিল। অনাসৃষ্টির মতো মাত্রায় পৌছেনি। মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহেই যেন বসন্তের আগমনীবার্তা শোনা যাচ্ছে। পথের ধারে অল্প অল্প সবুজ ঘাসও উঁকি-ঝুঁকি মারতে শুরু করেছে। সকাল থেকেই আবহাওয়া বেশ চমৎকার অনুভূত হচ্ছে। ঝঁকঝঁকে রোদ। আকাশে যেন কে ছড়িয়ে দিয়েছে বালতি বালতি নীল। তাপমাত্রা ১, সবচেয়ে বড় কথা কনকনে বাতাস নেই। বাতাস না থাকলে শূন্যের নিচের তাপমাত্রায়ও যে আপনি অতটা শীত অনুভব করবেন না তা সহজেই বোধগম্য। সুতরাং মার্চের প্রথম সপ্তাহের শনিবারে হঠাৎ মনে হলো আজকেই উপযুক্ত সময় পাঠাগার ভ্রমণের।
রওয়ানা দিলাম নর্থইয়র্ক সেন্ট্রাল লাইব্রেরির দিকে। যেহেতু আবহাওয়া বেশ চমৎকার, হেঁটেই রওয়ানা দিলাম। কফি খেতে খুব একটা ভাল লাগে না আমার, তেমন অভ্যাসও নেই। মাঝে মাঝে খাই। এখনো ভালবাসার বস্তু হয়ে ওঠেনি। রাস্তায় থেমে নিলাম এক মগ ফ্রেঞ্চ ভ্যানিলা। টল সাইজ। এখানে টল সাইজ মানে সবচে ছোটটা। জিপিএস-এ দেখলাম আমার বাসা থেকে ৯০০ মিটার দূরত্ব। ডিরেকশন দেখে দেখে হাঁটতে শুরু করলাম। মিনিট পনেরর মধ্যে পৌছে গেলাম।

টরন্টো লাইব্রেরির একাংশ

ইন্টারনেট ঘেঁটে পেলাম, টরন্টো গ্রন্থাগারের ইতিহাস বেশ পুরনো। একটি ব্যক্তিগত সাবস্ক্রিপশন লাইব্রেরি হিসেবে ৯ ডিসেম্বর ১৮১০ সালে প্রতিষ্ঠিত। ১৮৩০ সালে ইয়র্ক মেকানিক্স ইনস্টিটিউটের গ্রন্থাগার হিসাবে প্রতিষ্ঠিত লাইব্রেরিটি পরে টরন্টো পাবলিক লাইব্রেরি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৯৮ সালে সমস্ত মেট্রো পৌরসভা এবং মেট্রোর নিজস্ব লাইব্রেরি সিস্টেম একীভূত করে বর্তমান টরন্টো পাবলিক লাইব্রেরির কাঠামো রূপ নেয়। এখন এটি ১০০টি শাখা নিয়ে বিস্তৃত এবং এর সংগ্রহে ১২ মিলিয়নেরও বেশি আইটেম রয়েছে। আইটেমের মধ্যে রয়েছে বই, ম্যাগাজিন, মুভি ডিভিডি, বইয়ের অডিও সিডি ইত্যাদি। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, “মহাসমুদ্রের শত বৎসরের কল্লোল কেহ যদি এমন করিয়া বাঁধিয়া রাখিত যে, সে ঘুমাইয়া পড়া শিশুটির মতো চুপ করিয়া থাকিত, তবে সেই নীরব মহাসমুদ্রের সহিত এই লাইব্রেরীর তুলনা হইত।” টরন্টো পাবলিক লাইব্রেরিতে আপনি তেমনি নীরব মহাসমুদ্রের কল্লোল শুনতে পাবেন। শুধু সময় করে একটু ঢুঁ মারতে হবে, আর কান পাততে হবে।


লাইব্রেরি নামক মহাসমুদ্রে বইয়ের কল্লোল শুনতে যে কানাডিয়ানদের যথেষ্ট আগ্রহ আছে সে বিষয়ে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। সাম্প্রতিক এক জরিপ অনুযায়ী, গড়ে প্রতিদিন ৫০,০০০ লোক টরন্টো পাবলিক লাইব্রেরির ১০০টি শাখায় ঢুঁ মারে। ৮৫,০০০ জন অনলাইনে ভিজিট করে। এই সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। কানাডিয়ান প্রাপ্তবয়স্ক পাঠকরা প্রতিসপ্তাহে মোটামুটি ছয় ঘণ্টা ব্যয় করে। সহজেই অনুমেয় একজীবনে তাদের পঠিত বইয়ের সংখ্যা কত হতে পারে। এদের এক-তৃতীয়াংশ আবার একইসাথে একের অধিক বই পড়ায় এই সময় কাজ লাগান। নন-ফিকশান বইয়ের পাঠকের তুলনায় ফিকশান বইয়ের পাঠকেরা বেশি সময় দেন পড়ায়। কানাডিয়ান মা-বাবারা আশাবাদী যে তাদের বাচ্চারা গ্রীষ্মে ৪০টি পর্যন্ত বই পড়বে।

আগেই বলেছি, টরন্টো শহরে রয়েছে ১০০টি শাখা, যার সবগুলিরই নিজস্ব স্টাইল, এবং আকার রয়েছে। রয়েছে সেই এলাকার কমিউনিটির সাথে মিথস্ক্রিয়ার এক উদ্ভাবনী পন্থা। আগের বছর, টরন্টো লাইব্রেরিতে এক মিলিয়নেরও বেশি লোক ৪৬,০০০-এরও বেশি প্রোগ্রামে অংশ নিয়েছিল। টরন্টনিয়ানরা ৩০ কোটি আইটেম লাইব্রেরি থেকে ধার নিয়েছিল। প্রতি পাঁচ জনে একজন সপ্তাহে অন্তত একবার লাইব্রেরি শাখায় গিয়েছিলেন। লাইব্রেরি-ব্যবস্থা কানাডিয়ানদের বই পড়ার আগ্রহের ব্যাপারে যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে তাঁর প্রমাণ মেলে সাম্প্রতিক এই সব তথ্য অনুসারে।
সুতরাং দেখা যাচ্ছে, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের কারণে যেখানে আশংকা করা হচ্ছে যে লোকজন বইবিমুখ হচ্ছে, টরন্টো পাবলিক লাইব্রেরির ক্ষেত্রে কিন্তু তা ফলছে না। বরং প্রযুক্তিগত অগ্রগতির দ্বারা ব্যাহত এমন অনেক শিল্পের বিপরীতে, উত্তর আমেরিকা জুড়ে লাইব্রেরিগুলি মানিয়ে নেওয়ার এক অস্বাভাবিক সক্ষমতা দেখিয়েছে। কী হতে পারে এর কারণ? প্রযুক্তির সাথে মানিয়ে নেবার অসাধারণ ক্ষমতাই এর কারণ। এই লাইব্রেরিতে ঢুকে আপনি যেমন আপনার মোবাইল চার্জ দিতে পারবেন, পারবেন বিনামূল্যে আপনার মোবাইল থেকে লাইব্রেরির থ্রি-ডি প্রিন্টার থেকে ডকুমেন্ট প্রিন্ট করতে। এখানকার কম্পিউটার কিংবা ল্যাপটপগুলো আপনাকে দেবে বিনাখরচে সাইবার ক্যাফের সুবিধা। এই লাইব্রেরির উদ্দেশ্য শুধু জ্ঞান অর্জন বা বিতরণ নয়, সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে তাদের স্লোগান এখন ‘প্রযুক্তি আর জ্ঞান’। মোবাইলের এক ক্লিকে তাদের ওয়েবসাইটে গিয়ে আপনার কার্ড নাম্বার এবং পাসওয়ার্ড দিয়ে আপনি নামিয়ে ফেলতে পারবেন মার্গারেট অ্যাটউডের The Testaments; The Handmaid’s Tale কিংবা The Blind Assassin. তাদের পাবলিক ট্রান্সপোর্ট টিটিসি (টরন্টো ট্রানজিট কমিশন)-এর অংশীদারিত্বে সেপ্টেম্বরের গোড়ার দিকে শুরু হওয়া একটি নতুন উদ্যোগ ট্রানজিট নেওয়ার সময় যাত্রীদের আরও বই পড়তে উৎসাহিত করছে। যাত্রীরা তাদের ভ্রমণের জন্য বই এবং অন্যান্য পাঠ্যসামগ্রীর কপি বিনামূল্যে ডাউনলোড করতে পারেন। বিলুপ্ত হওয়া বহু দূরের কথা, আজকের পাবলিক লাইব্রেরিটি প্রযুক্তির মাধ্যমে যতটা সম্ভব জ্ঞানের অ্যাক্সেস দেয়া যায় সেই চেষ্টায় পুরোপুরি সফল।

ছয় মাস বয়সের বাচ্চা থেকে শুরু করে ৮০ বছরের বৃদ্ধা এবং এর মাঝামাঝি অন্য সকল বয়সের লোকজনকেই খুঁজে পাবেন। জ্ঞানের কী এক তীব্র স্পৃহা, এক অশীতিপর বৃদ্ধাকে দেখলাম গভীর মনোযোগে সেলফের এক মাথা থেকে আরেক মাথা ঘুরে ঘুরে কী বই যেন খুঁজে চলেছেন!

লাইব্রেরির ভিতরে ঢুকলেই পরিস্কার, ঝকঝকে পরিবেশ আপনার চোখে দেবে প্রশান্তির স্পর্শ। ছয় তলা ভবনের প্রতিটি তলায় থরে থরে সাজানো বিভিন্ন বিষয়ের বই। চোখে পড়বে কেউ প্রশস্ত সিঁড়িতে বসে পড়ছে একমনে। কেউ কম্পিউটারে বসে বই সার্চ করছে, ছাত্র-ছাত্রীরা তাদের হোমওয়ার্ক তৈরি করছে। কেউ কেউ সাথে করে নিয়ে এসেছে কফি এবং তাদের মধ্যাহ্নভোজের খাবার। শুধু যে সবাই পড়াশোনার জন্যই আসে তাও নয়। কেউ কেউ সময় কাটানোর জন্যে আসে, তরুণ-তরুণীরা আসে জোড়া বেঁধে একে অন্যের সঙ্গ উপভোগ করার জন্য। বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা আসেন – কেউ কেউ জোড়া বেঁধে, কেউ কেউ একা একা নিসঃঙ্গতা উপভোগ করতে। অনেকেই আসেন সপরিবারে তাদের বাচ্চাদের নিয়ে সময় কাটানোর জন্য। এ যেন সকল বয়সের মানুষের এক মিলনমেলা। ছয় মাস বয়সের বাচ্চা থেকে শুরু করে ৮০ বছরের বৃদ্ধা এবং এর মাঝামাঝি অন্য সকল বয়সের লোকজনকেই খুঁজে পাবেন। জ্ঞানের কী এক তীব্র স্পৃহা, এক অশীতিপর বৃদ্ধাকে দেখলাম গভীর মনোযোগ সহকারে সেলফের এক মাথা থেকে আরেক মাথা ঘুরে ঘুরে কী বই যেন খুঁজে চলেছেন! ৯/১০ বছরের বাচ্চাকে দেখলাম মায়ের হাত ধরে কিডস-জোনে গিয়ে হ্যারি পটার সিরিজের বই সংগ্রহ করছে। ৬/৭ মাসের বয়সের এক বাচ্চাকে দেখলাম হাঁটিহাঁটি পায়ে বইয়ের সারির মাঝে হেঁটে বেড়াচ্ছে, উদ্দেশ্যহীনভাবে বই ছুঁয়ে ছুঁয়ে। এ যেন এক মজার খেলাঘর। কারোর চোখে কোন বিরক্তি নেই। বাচ্চাদের জন্য বিশেষ খেলার জায়গা আছে, তার চারপাশে সাজানো আছে তাদের জন্যেও বিভিন্ন বয়সের উপযোগী বই, ভিডিও, অডিও। কোথাও লেখা নেই নীরবতা পালন করতে হবে। বাচ্চারা তাদের বাবা-মায়েদের সাথে হৈচৈ করছে। এভাবেই অবচেতন মনে তাদের কোমল মনের পরিচয় হচ্ছে বইয়ের বিশাল জগতের সাথে। নিরাপত্তার কড়াকড়ি নেই। ভিতরে ঢুকতে দেখাবার প্রয়োজন হয় না কিছুই। প্রতিটি ফ্লোরে আছে তথ্য-ডেস্ক এবং সহায়তাকর্মী। হাসিমুখে তারা আপনার যে-কোন প্রশ্নের উত্তর দিতে প্রস্তুত। যত প্রশ্নই করুন, হাসিমুখে উত্তর দিয়েই যাচ্ছে ক্লান্তিহীন।

এসব দেখতে দেখতে মনে পড়ে গেলো, প্রমথ চৌধুরী তাঁর বইপড়া প্রবন্ধে লিখেছিলেন, “আমাদের বই পড়তে হবে, কেননা বই পড়া ছাড়া সাহিত্যচর্চার উপায়ান্তর নেই। ধর্মের চর্চা চাই কি মন্দিরের বাইরেও করা চলে, দর্শনের চর্চা গুহায়, নীতির চর্চা ঘরে এবং বিজ্ঞানের চর্চা জাদুঘরে; কিন্তু সাহিত্যের চর্চার জন্য চাই লাইব্রেরি; ও-চর্চা মানুষ কারখানাতেও করতে পারে না; চিড়িয়াখানাতেও নয়। এইসব কথা যদি সত্য হয়,তাহলে আমাদের মানতেই হবে যে, সাহিত্যের মধ্যে আমাদের জাত মানুষ হবে। সেইজন্য আমরা যত বেশি লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করব, দেশের তত বেশি উপকার হবে।”
অবশ্য তিনি আক্ষেপ করে এও বলেছিলেন, “আমাদের দৃষ্টি আজ অর্থের ওপরই পড়ে রয়েছে। সুতরাং সাহিত্যচর্চার সুফল সম্বন্ধে আমরা অনেকেই সন্দিহান। একখানা কাব্যগ্রন্থও কিনতে আমরা প্রস্তুত নই, কেননা, তাতে ব্যবসার কোনো সুসার নেই… ।”
তবে আপনি যদি বইপিপাসু হন, আবার অর্থের ব্যাপারেও সচেতন থাকেন, তবে এই লাইব্রেরিতে চলে এলে আপনাকে অর্থ নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। বিনামূল্যে পেয়ে যাবেন কার্ড, যাতে করে আপনি একসাথে ৫০টি ম্যাটেরিয়াল নিয়ে যেতে পারবেন – বই, অডিও, ভিডিও, মুভির সিডি/ডিভিডি। বই রাখতে পারবেন ২১ দিন, ডিভিডি এবং ম্যাগাজিন ৭ দিন, টিভি সিরিজের ডিভিডি ১৪ দিন। চাইলে আপনি ঘরে বসে অনলাইনে সময় বাড়িয়ে নিতে পারবেন। তবে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বই ফেরত না দিলে নামমাত্র জরিমানা দিতে হবে। যদি কোন বইয়ের হার্ডকপি কোন নির্দিষ্ট শাখায় না থাকে, তবে তা অন্য কোন শাখা থেকে তারা আনার ব্যবস্থা করে দেবে। পাঠকের কাছে বইকে পৌঁছে দিতে তাদের চেষ্টার কোন কমতি নেই।
আমাদের পুরো পরিবারের তিন জনের জন্যে কার্ড করতে সময় লাগলো ১৫ মিনিটেরও কম। শুধু একটা আইডি কার্ড আর বাসার ঠিকানার জন্য বিদ্যুৎ বিলের কপি দেখিয়েই পাঁচ মিনিটের মধ্যে হয়ে গেল আমাদের মেম্বারশীপ কার্ড। খুলে গেল যেন অবারিত জ্ঞানরাজ্যের এক দুয়ার। সদস্য কার্ডের নাম্বার এবং পাসওয়ার্ড দিয়ে ঢোকা যাবে লাইব্রেরির সুবৃহৎ ওয়েবসাইটে। বিনামুল্যে অনলাইনে বই পড়তে পারবেন, পারবেন সবধরনের লেখকের বই ডাউনলোড করতে। পরীক্ষামূলকভাবে সেদিনই বাসায় এসে কার্ড নাম্বার দিয়ে ডাউনলোড করলাম মার্গারেট অ্যাটওড-এর দ্যা ব্লাইন্ড অ্যাসাসিন। এই বইয়ের জন্যে তিনি ২০০০ সালে তাঁর প্রথম ম্যান বুকার পুরস্কার জিতেছিলেন। বইয়ের শুরুটা বেশ রোমাঞ্চকর। লরা চেইজের বোন এই মাত্র একটা টেলিফোন কল পেয়েছে তাঁর বোন গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা গেছে। তাকে এখন মর্গে যেতে হবে মরদেহ সনাক্ত করার জন্যে।
তবে টরন্টো পাবলিক লাইব্রেরির উদ্দেশ্য কিন্তু শুধু জ্ঞান বিতরণ নয়। আপনার দৈনন্দিন জীবনযাপনের অনেক কিছুই আপনি এখানে পেতে পারেন। আপনি কানাডাতে নতুন, আপনার জন্যে আছে সাপ্তাহিক ওয়ার্কশপ, কীভাবে এখানে আপনি নিজেকে খাপ খাওয়াবেন, তারা আপনাকে শেখাবে সেসব কিছু। আপনার চাকরির দরকার, তার জন্যেও আছে ওয়ার্কশপ। আপনার বাচ্চার সামাজিক বিকাশের জন্য তারা আয়োজন করে নিয়মিত বিভিন্ন বয়সের উপযোগী গল্পবলার ওয়ার্কশপ, সামাজিক আচার-আচরণ, নিয়ম কানুন শেখানোর ওয়ার্কশপ। যারা বয়স্ক আত্মীয়দের দেখাশোনা করছেন তাদের জন্য আছে পরামর্শ; ওয়েবসাইট ডিজাইন থেকে শুরু করে ছোট ব্যবসায় পরিচালনা পর্যন্ত সমস্ত কিছুতে আপনার জন্য রয়েছে সহায়তা কার্যক্রম। একইসাথে তাদের কার্ড ব্যবহার করে শহরের আর্ট গ্যালারি এবং যাদুঘরগুলি ঘুরে আসতে পারেন, ওয়াইফাই হটস্পট ব্যবহার করতে পারেন।
শিল্পসাহিত্য নিয়ে সভা সেমিনার তো লেগেই আছে। প্রথিতযশা কানাডিয়ান ও আন্তর্জাতিক মানের কবি-লেখকেরা এসে লেকচার দেন নিয়মিত, তাদের চিন্তাভাবনা বিনিময় করেন। মার্চের তৃতীয় সপ্তাহে বৃটিশ লেখিকা ও দু বারের ম্যান বুকার বিজয়ী Hilary Mantel-এর একটি লেকচার ছিল তাঁর The Mirror and the Light গ্রন্থের উপর। অবশ্য তিনি এই বইয়ের জন্য বুকার পাননি। বুকার পেয়েছিলেন ২০০৯ সালে তাঁর উপন্যাস Wolf Hall এবং ২০১২ সালে Bring up the Bodies-এর জন্যে। তিনিই প্রথম লেখিকা এবং বৃটিশ লেখক যে দুবার বুকার পুরস্কার পেয়েছেন। টিকেটের মূল্য ২৫ ডলার, এর মধ্যে থাকছে লেখিকার সাক্ষরসহ আলোচ্য বইয়ের একটি কপি। নিশ্চিতভাবেই এসব সভা সেমিনারে কানাডিয়ান ও আন্তর্জাতিক মানের অনেক লেখক-পাঠকের সান্নিধ্য পাবেন। ইচ্ছে ছিল লেকচারটি শোনার, সে অনুযায়ী টিকেটও কেটেছিলাম। ২৫ ডলারের টিকেট, এর মধ্যে আছে লেখিকার সাক্ষরসহ বই। অর্থাৎ মূলত বইয়ের মূল্যই টিকেটের মূল্য, ৩/৪ ডলার সার্ভিস চার্জ বাদ দিলে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত করোনা ভাইরাসের উপদ্রবে তা বাতিল হয়ে যায়। আরেকটি লেকচার ছিল সর্বশেষ বুকার পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখিকা Bernardine Evaristo-এর Girl, Woman, Other-এর উপর লেখিকার আলোচনা। এটাতেও যাবার ইচ্ছে ছিল, কিন্তু এক মাস আগেই এর টিকেট বিক্রি শেষ, যদিও করোনা ভাইরাসের উপদ্রবে এই আলোচনাও বাতিল হয়ে যায়। শিল্পসাহিত্য নিয়ে এখানকার মানুষের আগ্রহ এ থেকেই বুঝে নিতে পারবেন। অথচ এ-ধরনের লেকচার প্রতিমাসেই দু-চারটা করে থাকছে, কিন্তু আগ্রহের কোন কমতি নেই। আমি অবশ্য মুখিয়ে আছি কানাডার অন্যতম কবি, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, সাহিত্য সমালোচক, শিক্ষিকা, পরিবেশকর্মী Margaret Eleanor Atwood-এর কোন একটা লেকচারে অংশগ্রহণ করার। তিনিও গতবছর Bernardine Evaristo-এর সাথে যৌথভাবে বুকার পুরস্কার পেয়েছেন তাঁর The Testaments উপন্যাসের জন্য। এটি অবশ্য তাঁর দ্বিতীয় বুকার পুরস্কার। ২০১৭ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের দাবিদার হিসেবে তাঁর নাম বেশ জোরেসোরেই উচ্চারিত হয়েছিল।
টরন্টো পাবলিক লাইব্রেরির কয়েকটি শাখায় লাইব্রেরির ভবনের বাইরে বাগানে প্রকৃতির সান্নিধ্যে প্রিয় বই উপভোগ করার সুযোগ রয়েছে। এবার বসন্তেই টরন্টোতে তাপমাত্রা (+)১৬ ডিগ্রিতে পৌঁছেছে। প্রায়সময়ই টরন্টোর আকাশ রোদে ঝলমল করছে। চাইলে আপনি এখন বাগানের তরুতলে বসে একটু বই পড়ার স্বাদ নিতে পারতেন। তবে এই মুহূর্তে তা সম্ভব হবে না। সেও প্রকৃতির খেয়াল। প্রাচ্য, ইউরোপের পর করোনা ভাইরাস তাঁর সাম্রাজ্য উত্তর আমেরিকাতেও বিস্তৃত করতে শুরু করেছে। অন্টারিওতে স্টেট অফ ইমারজেন্সি ঘোষণা করা হয়েছে। চারিদিকে কেমন থমথমে অবস্থা। রাস্তায় পারতপক্ষে লোকজন দেখা যায় না। নেই বাস-গাড়ির ভীড়। লোকজন যথাসম্ভব ঘরে অবস্থান করছে, জনসমাগম এড়িয়ে চলছে। যাদের পক্ষে সম্ভব ঘরে বসে অফিস করছে। টরন্টোর পাবলিক লাইব্রেরিগুলিও বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। লাইব্রেরিতে হয়তো জ্ঞানসমুদ্রের কল্লোল আপাতত কিছুটা স্তিমিত; তবে আপনি নিশ্চিত থাকতে পারেন এই সময়টাতে তারা ঘরে বসে আরো বেশি বেশি বই পড়ে কাজে লাগাচ্ছে। এ সময়টা অতিক্রান্ত হলে আবার টরন্টোর লাইব্রেরিগুলি আবালবৃদ্ধবণিতার পদচারণায় হবে দ্বিগুণ মুখরিত, একথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।

শীত-বসন্ত শেষে গ্রীষ্মের অপেক্ষা। তখন চাইলে ওমর খৈয়ামের মতো তরুতলে কৌতুহলে বই পড়তেও কোন বাধা থাকবে না। জ্ঞানের অপার ভাণ্ডার বিতরণের জন্য যেমন টরন্টো পাবলিক লাইব্রেরির প্রতিটি বই পাতা মেলে বসে আছে, তেমনি দু-হাত পেতে তা কুড়িয়ে নেবার লোকেরও এখানে অভাব নেই।
I opened a book and in I strode
Now nobody can find me
I’ve left my chair, my house, my road
My town and my world behind me
Julia Donaldson

 

Share Now শেয়ার করুন