মাসুদুজ্জামান >> কোথায় লোরকার সমাধি? >> জন্মবার্ষিকী

0
548

কোথায় লোরকার সমাধি?

আজ ৫ জুন। বিশ্বখ্যাত হিস্পানি কবি ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকার ১২৩তম জন্মবার্ষিকী। তাঁকে স্মরণ করেই এই লেখা।

‘দু’জন খসখসে সবুজ উর্দিপরা সিপাহী / কবিকে নিয়ে গেল টানতে টানতে / কবি প্রশ্ন করলেন : আমার হাতে শিকল বেঁধেছ কেন? সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের একটা কবিতা শুরু হয়েছে এইভাবে আর যে-কবির কথা তিনি লিখেছেন সেই কবির নাম ফ্রেডেরিকো গার্সিয়া লোরকা। স্পেনের ফ্রাঙ্কোর ফ্যাসিস্টবাহিনী এভাবেই ধরে নিয়ে গিয়ে লোরকাকে গুলি করে খুন করে। এরকম ট্রাজিক ঘটনা সাহিত্যের ইতিহাসে তুলনাহীন বলা যায়। লেখক সে-তো এক স্বাধীনসত্তা, মানুষের জন্যেই তার শব্দাবলি সবসময় নিবেদিত থাকবে। তার হাতে কেন থাকবে শেকল? লোরকার মৃত্যু তাই এখনও আমাদের ব্যথিত করে। মনে করতে পারি সেই মর্মন্তুদ ঘটনার কথা।একটা ছোট্ট পথ। গ্রানাদার আন্দালুসীয় শহর থেকে উঠে গেছে উঁচু একটা পাহাড়ের দিকে। পথের দুই পাশে ঘন বন। পথটা শেষ হয়েছে একটা সমাধিক্ষেত্রে গিয়ে। পৃথিবী এখানে নিশ্চুপ, নিথর, স্তব্ধ। চারদিকে প্রকৃতির লালিমা। অলিভ বৃক্ষের পাতাগুলি ঘন সবুজ, অথবা বুড়িয়ে গেলে যেমন হয়- ধুসর, বিবর্ণ। সমাধিক্ষেত্রের দেয়ালগুলি অনেক উঁচু, মাটির রঙে দেয়ালের রঙ। মাটির চৌকো খণ্ড খণ্ড টাইল দিয়ে গাঁথা। দক্ষিণ-পূর্ব কোণ থেকে দেয়ালটা প্রায় ২০ ফুট লম্বা হয়ে সরে গেছে উত্তরে। ওই দেয়ালের গায়েই বুলেটের চিহ্ন। চিহ্ন হত্যার, খুনের, রক্তঝরানোর।
১৯৩৬ সাল। আগস্টের ১৬ তারিখ। কবি ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকাকে আটক করে ঢোকানো হলে জেলে। লোরকা ছিলেন সুদর্শন সুপুরুষ। মাথায় তার কালো চুল। লম্বা লম্বা পা ফেলে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিপাত করে পথ হাঁটেন। স্থানীয় এক অভিজাত পিতার সন্তান তিনি। বাবা গ্রানাডার ধনী ভূস্বামী। গ্রানাডাতেই তার বেড়ে ওঠা। পুরো পরিবারটাই আবার স্প্যানিশ রিপাবলিক দলের উদারনৈতিক রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।
১৯২৮ সালে প্রকাশিত কবিতার বই ‘জিপসি গাথা’ আর ১৯৩২ সালে লেখা ও মঞ্চায়িত ‘রক্ত-বিবাহ’ নাটকের জন্যে কবি ও নাট্যকার হিসেবে লোরকার খ্যাতি তখন তুঙ্গে। প্রিয়বন্ধু প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী সালভাদর দালি এবং চলচ্চিত্র পরিচালক লুই বুনুয়েল। ১৯৩১ সালের পর লোরকা তাঁর নিজের থিয়েটার গ্রুপ ‘লা বারাকা’কে নিয়ে স্পেন ঘুরে বেড়িয়েছেন। তার বয়স যখন ৩৮ বছর, তখনই বহুল আলোচিত কবি তিনি। আর এই পরিচিতিই কাল হয়ে ওঠে। ফ্যাসিস্ট শাসক ফ্রাঙ্কোর কুনজরে পড়েন তিনি।

চারিদিকটা কী সুনশান। কিন্তু চোখে পড়ল শুকনো হয়ে যাওয়া গোলাপগুচ্ছের একটা তোড়া। বোঝাই যায়, পরম শ্রদ্ধায় কেউ হয়তো বুলেটে ক্ষতবিক্ষত দেয়ালের পাশে মাটিতে তোড়াটা বিছিয়ে রেখে গেছেন।

নিউ ইয়র্কার পত্রিকায় কাজ করেন এমন একজন সাংবাদিক জো লুই অ্যান্ডারসন কয়েক বছর আগে যে সমাধিক্ষেত্রে লোরকাকে খুন করা হয়েছিল, সেখানে গিয়েছিলেন। তিনি লিখছেন, কোনো এক বিকেলে সমাধিক্ষেত্রে এসে পৌঁছুলাম। চারিদিকটা কী সুনশান। কিন্তু চোখে পড়ল শুকনো হয়ে যাওয়া গোলাপগুচ্ছের একটা তোড়া। বোঝাই যায়, পরম শ্রদ্ধায় কেউ হয়তো বুলেটে ক্ষতবিক্ষত দেয়ালের পাশে মাটিতে তোড়াটা বিছিয়ে রেখে গেছেন। একটু পরেই আমি আবিষ্কার করলাম, দেয়ালের গায়ে একটা ফলক। তাতে লেখা : ‘ফ্রাঙ্কো-বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে খুন হওয়া মানুষদের স্মৃতির উদ্দেশে আমাদের শ্রদ্ধার্ঘ্য।’ এই একটিমাত্র ফলক ছাড়া ওখানে এমন আর কিছু নেই যা দেখে মনে হবে বহুবছর আগে এখানে কিছু মানুষকে খুন করা হয়েছিল, যাদের একজন ছিলেন বিশশতকের প্রতিভাবান হিস্পানি কবি-নাট্যকার লোরকা। লোরকার কবরটা অবশ্য এখানে নয়, পাশের গ্রামে। অত্যন্ত গোপনে আর তড়িঘড়ি করে তাকে কবর দেওয়া হয়। বহুকাল ধরে জায়গাটি ছিল অচিহ্নিত। ১৯৯৬ সালে লোরকার জীবনীকার ইয়ান গিবসন, কোথায় লোরকাকে ঠিক কবর দেওয়া হয়েছিল, সেটা প্রথম চিহ্নিত করেন। কিন্তু কখনও তার দেহাবশেষ খুঁজে দেখা হয়নি। ২০০৮ সালে স্পেনের একজন বিচারপতি বালতাজার গারজোঁ প্রথম মাটি খুঁড়ে সেটা খুঁজে দেখার নির্দেশ দেন। তারই নির্দেশে ফ্রাঙ্কোর আমলে যে অত্যাচার নির্যাতন হয়েছিল, সে সম্পর্কে প্রথমবারের মতো সরকারিভাবে তদন্ত শুরু হয়। স্পেনের একজন ঐতিহাসিক – মেরিবেল ব্রেনেস – তিনি শুধুমাত্র গ্রানাডাতেই ১২৫টি গণকবর খুঁজে পান।
এরপরই এক আবেদনের প্রেক্ষাপটে বিচারক গারজোঁ এই রায় দেন যে, ফ্রাঙ্কো এবং তার চৌত্রিশ জন সহযোগী ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের জন্য দায়ী।’ তারা রাজনৈতিক কারণে মানুষের উপর নির্যাতন চালিয়েছে, হত্যা করেছে। আইন করে ওই হত্যাকারীদের যে অবমুক্তি দেওয়া হয়েছিল, সেটা তিনি রদ করেন এবং উনিশটি গণকবর খননের নির্দেশ দেন, যার একটি ছিল লোরকার। স্পেনের লেখক, সাংস্কৃতিক ও মানবাধিকার কর্মীরা তখনই মাদ্রিদে আয়োজন করেন একটা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের। লোরকার হত্যা নিয়ে কথা বলেন তার জীবনীকার ইয়ান গিবসন। তবে ওই অনুষ্ঠানের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল লোকগায়ক পেকো ইবানেজের গাওয়া গান। লোরকার কবিতাকে গানে রূপান্তরিত করে যখন তিনি গাইছিলেন, তখন উপস্থিত সবার চোখ অশ্রুসজল হয়ে ওঠে।
লোরকাকে যেখানে পুঁতে রাখা হয়, সেই জায়গাটি গ্রানাডা থেকে পাঁচ মাইল দূরত্বে অবস্থিত। সেটি একটা গ্রাম। গ্রামটির নাম আলফাসার। এখানেই ১৯৩৬ সালে সেনাছাউনি স্থাপন করে ফ্রাঙ্কো বাহিনী। কাছেই একটা সিমেটারি বা গোরস্থান। লোরকার জীবনীকার ইয়ান গিবসন জানাচ্ছেন, ১৯৩৬ সালের ১৮ আগস্ট খুব ভোরে লোরকা, দু’জন বুলফাইটার আর একজন স্কুলশিক্ষককে বন্দি করে সেনাছাউনিতে আনা হয়। তারপর ফ্রাঙ্কোর খুনি-বাহিনী কাছের একটা পায়ে-হাঁটা পথ দিয়ে তাদের ওই গোরস্থানে নিয়ে যায়। ওই একই পথ দিয়ে হেঁটে গেলে চারদিকে দেখা যাবে বিস্তৃত সবুজ ভূমি ও জলাশয়। লোরকা ১৯২১ সালে এই জায়গাটি নিয়েই লিখেছিলেন : ‘শুকনো রুক্ষ একটা জায়গা থেকে আমি ফিরছি। কিন্তু নিচেই দেখছি জলাশয়। তার ঝলমলে নীল পানি। গ্রীষ্মের তপ্ত বাতাসে রাত্রি যেন ভাসছে আর উড়ছে ঝিঁঝিপোকারা।’ এলাকায় ছড়িয়ে আছে পপলার গাছ। কিছু বসতবাড়ি আর শিল্পভবন। এসব পেরিয়ে গেলেই পৌঁছুনো যাবে লোরকার জন্মস্থানে – ফুয়েন্তে ভেক্যুরসে। লোরকা মৃত্যুর আগে শিল্পভবনগুলি ছাড়া শেষবারের মতো এইসব দৃশ্যই দেখেছিলেন।

একটা ট্রেঞ্চে নিয়ে লোরকা এবং অন্য তিনজনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ট্রেঞ্চটির অবস্থান ছিল বাঁক-নেয়া রাস্তার পাশের একটা জলপাই গাছের নিচে।

লোরকাকে যেখানে ধরে আনা হয়েছিল, সেখানে একটা অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের পেছনে উঁচুমতো একটা জায়গায় আছে একটা পার্ক। এই পার্কটির লোরকার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে নামকরণ করা হয়েছে : ‘লোরকা এবং গৃহযুদ্ধে যারা মৃত্যুবরণ করেছেন তাদের স্মৃতির উদ্দেশে স্থাপন করা হল এই পার্ক।’ জীবনীলেখক ইয়ান গিবসন প্রত্যক্ষদর্শী গোরখোদকের জবানিতে লিখেছেন, একটা ট্রেঞ্চে নিয়ে লোরকা এবং অন্য তিনজনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ট্রেঞ্চটির অবস্থান ছিল বাঁক-নেয়া রাস্তার পাশের একটা জলপাই গাছের নিচে। সাংবাদিক লী অ্যান্ডারসন লিখেছেন, চারদিকটায় দেখছি কী নিঝুম, নিস্তব্ধ। পার্কের ভেতরে একটা আন্দালুসীয় নীলাভ সবুজ পাথরফলক। পাথরের গায়ে লোরকার ‘শরতের গান’ শীর্ষক কবিতা খচিত : ‘মৃত্যু যদি মৃত্যুই হয়, কবিদের তাতে কীই-বা আসে-যায়, আর এই যে ঘুম, ঘুমই যদি হবে, কেউ কি মনে রাখবে তাকে?’ কবি রয় ক্যাম্বেল লিখেছেন, তাঁকে শুধু গুলি করা হয়েছিল তাই নয়, গুলি করার পর হাতুড়ি দিয়ে মাথায় আঘাত করা হয়, ছুরি মারা হয়।
প্রত্মতাত্ত্বিকেরা লোরকার কবর ভেবে সেসব গর্ত খুঁড়ে দেখেছিলেন আর যেসব হাড়গোড় খুঁজে পেয়েছিলেন, তার সঙ্গে পরিবারের ডিএনএ-র কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যায়নি। ফলে, লোরকার দেহাবশেষের কী পরিণাম ঘটেছিল, আজও সেটা জানা সম্ভব হয়নি। ২০১৬ সালে নটিংহাম বিশ্ববিদ্যায়ের হিস্পানি সাহিত্যের অধ্যাপক স্টিফেন রবার্টস দাবি করেন, লোরকাকে যে গর্ত করে পুঁতে ফেলা হয়েছিল, তার কোনো প্রমাণ নেই। লোরকা, যার জীবন ছিল বহুবর্ণিল, কিছুটা রহস্যময়; কোথায় রয়েছে তার দেহাবশেষ, কোথায় সমাধি, আজও খুঁজে পাওয়া না গেলেও তাঁর অসাধারণ সৃষ্টি এখনও রয়ে গেছেন সংবেদী পাঠকের হৃদয়ে।

Share Now শেয়ার করুন