মাসুদুজ্জামান >> শুভ জন্মদিন, ভূমিকন্যা

0
103

তাঁর রাজনৈতিক জীবন ব্যক্তিজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। একসূত্রে গাঁথা। ব্যক্তিক উচ্চাভিলাষ বা জাঁকজমকপূর্ণ নাগরিক বিলাসী জীবনের প্রতি তাঁর কোনো আকর্ষণ নেই। তাঁর জীবন, জীবনানন্দের ভাষায় বললে, দোয়েলের শালিকের। তিনি যেন এই মাটির সাধারণ সন্তান। সাধারণ মানুষ। ভূমিকন্যা কিংবা মাতা।

শেখ হাসিনা। একজন রাজনীতিবিদ – মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি একজন লেখক। সৌখিন লেখক নন, রীতিমতো লেখক। সিরিয়াস লেখক। তাঁর জনক আমাদেরও জনক – বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি তিনি। তাঁরই সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা। সম্ভবত বঙ্গবন্ধু পরিবারের যেসব সদস্য এখনও বেঁচে আছেন তাদের মধ্যে তিনি এবং বঙ্গবন্ধুর আরেক কন্যা শেখ রেহানাই বঙ্গবন্ধুকে সবচেয়ে কাছে থেকে দেখেছেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে কেমন দেখেছেন শেখ হাসিনা? কেমন ছিল তাঁর রাজনৈতিক মতাদর্শ, দৃষ্টিভঙ্গি, দীর্ঘ সংগ্রাম আর জীবন – এসব নিয়েই অসাধরণ একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন শেখ হাসিনা : “বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জনক আমার নেতা আমার”। এই বইটির বিষয়আশয় অবশ্য শুধু বঙ্গবন্ধু নন। এর একটা বড় অংশ জুড়ে আছে শেখ হাসিনার স্মৃতিকথা। সংক্ষেপে যদি বলি, এই বইটি নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ। শেখ হাসিনাকে শুধু একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে নয়, ব্যক্তিমানুষ হিসেবেও আমাদের বুঝতে সাহায্য করে। একজন পাঠক হিসেবে ব্যক্তিগতভাবে বইটির যেসব বৈশিষ্ট্য আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়েছে তা নিম্নরূপ :

(১) বইটি পড়ে বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে পরিপূর্ণ ধারণা পাওয়া যায়;
(২) পরিচয় মেলে শক্তিশালী লেখক শেখ হাসিনার;
(৩) পরিচয় পাই প্রজ্ঞাবান রাজনীতিক শেখ হাসিনার;
(৪) শেখ হাসিনার জীবন প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংগ্রামেরই প্রতিচ্ছবি;
(৫) শেখ হাসিনা মানবিক গুণসম্পন্ন একজন রাজনীতিক;
(৬) শেখ হাসিনা একজন নিষ্ঠাবান গবেষক;
(৭) সবশেষে যে দিকটি সবচেয়ে গুরত্বপূর্ণ মনে হয়েছে সেটা হলো তিনি একজন স্বাপ্নিক রাষ্ট্রনেতা, বাংলাদেশকে যিনি বিশ্বের মর্যাদাপূর্ণ একটা স্থানে অধিষ্ঠিত দেখতে চান।

এই বিষয়গুলি, যেসব বৈশিষ্ট্যের কথা উল্রেখ করলাম, এবার তাঁর কিছু পরিচয় তুলে ধরছি।

আগেই বলেছি, বঙ্গবন্ধুকে নিয়েই এই বইটি। বইটির নাম থেকেই সেটা বোঝা যায়। কিন্তু পিতা হিসেবে শুধু নয়, বঙ্গবন্ধুকে শেখ হাসিনা অভিহিত করেছেন “আমার নেতা” বলে। এই অভিধা ধারণ করবার মধ্য দিয়েই বোঝা যায়, আমাদের মহান নেতা জাতির জনকের রাজনৈতিক স্বপ্ন, মতাদর্শ ও আদর্শকে বাস্তবায়িত করার জন্যেই শেখ হাসিনা রাজনীতিতে এসেছেন, এখনও সেই লক্ষ্যেই দেশ শাসন করছেন। কিন্তু কী চোখে রাজনৈতিক নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধুকে দেখেন শেখ হাসিনা? এখানে দুটি উদ্ধৃতি দিচ্ছি :

(ক) “জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমার পিতা ছিলেন বিশ্বের শোষিত ও বঞ্চিত মানুষের নেতা। বিশ্ব মানবতার নেতা। তাঁর জীবন ও কর্মের প্রতিটি পাতায় পাতায় রয়েছে সংগ্রামের ইতিহাস। সত্য, ন্যায় ও শান্তি প্রতিষ্ঠার ইতিহাস। বাংলা মাটি ও মানুষের জন্য পিতার তাঁর নিজের জীবনের ভয়-ভীতি উপেক্ষা করে দীর্ঘ ২৩ বছর সংগ্রাম করেছেন। ১৩ বছরের বেশি সময় জেল খেটেছেন।”

(খ) “আমার পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জীবনের সব থেকে মূল্যবান সময় কারাবন্দি হিসেবেই কাটাতে হয়েছে। জনগণের অধিকার আদায়ের আন্দোলন করতে গিয়েই তাঁর জীবনে বারবার এই দুঃসহ নিঃসঙ্গ কারাজীবন নেমে আসে। তবে তিনি কখনও আপোস করেন নাই। ফাঁসির দড়িকেও ভয় করেন নাই। তাঁর জীবনে জনগণই ছিল অন্তঃপ্রাণ। মানুষের দুঃখে তাঁর মন কাঁদত। বাংলার দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফুটাবেন, সোনার বাংলা গড়বেন – এটাই ছিল তাঁর জীবনের একমাত্র ব্রত। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য – এই মৌলিক অধিকারগুলো পূরণের মাধ্যমে মানুষ উন্নত জীবন পাবে, দারিদ্র্যের কশাঘাত থেকে মুক্তি পাবে, সেই চিন্তাই ছিল প্রতিনিয়ত তার মনে। যে কারণে তিনি নিজের জীবনের সব সুখ আরাম আয়েশ ত্যাগ করে জনগণের দাবি আদায়ের জন্য এক আদর্শবাদী ও আত্মত্যাগী রাজনৈতিক নেতা হিসেবে আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন, বাঙালি জাতিকে দিয়েছেন স্বাধীনতা। বাঙালি জাতিকে বীর হিসেবে বিশ্বে দিয়েছেন অনন্য মর্যাদা, স্বাধীন সার্বভৈৗম বাংলাদেশ নামে বিশ্বে এক রাষ্ট্র সৃষ্টি করেছেন। বাঙালির হাজার বছরের স্বপ্ন সফল করেছেন।”

তিনি এখন অব্দি ৪০টি গ্রন্থ রচনা করেছেন। এ-ও এক বিস্ময়। এই মুহূর্তে, আমার অন্তত জানা নেই, বিশ্বের কোনো শীর্ষস্থানীয় নেতা এতগুলো গ্রন্থ লিখেছেন কিনা। অর্থাৎ আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী লেখক হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত। খ্যাতিমান বললেও ভুল বলা হবে না।

একেবারেই যথার্থ মূল্যায়ন। পিতা হিসেবে নয়, নেতা হিসেবে এভাবেই বঙ্গবন্ধুর মূল্যায়ন করেছেন শেখ হাসিনা। শুধু এসব কথাতে নয়, এই বইয়ের পাতায় পাতায় শেখ হাসিনার অসামান্য বিবরণে উৎকীর্ণ হয়ে আছে মহান নেতা বঙ্গবন্ধুর উজ্জ্বল পরিচয়। রাজনীতিক পিতা বঙ্গবন্ধুকে খুব কাছে থেকে দেখেছিলেন বলে শেখ হাসিনার দেখাটা খুবই গভীর, কখনও কখনও আবেগে কম্পমান, কখনও স্মৃতিবিধুর, প্রামাণ্য আর অন্তরঙ্গ সম্পর্কের পটভূমিতে অবিস্মরণীয় বর্ণনায় আকর্ষক।

এরকম বর্ণনার গুণেই শেখ হাসিনার যে-পরিচয়টি মূর্ত হয়ে উঠেছে সেটা হলো তাঁর লেখক পরিচয়। তিনি এখন অব্দি ৪০টি গ্রন্থ রচনা করেছেন। এ-ও এক বিস্ময়। এই মুহূর্তে, আমার অন্তত জানা নেই, বিশ্বের কোনো শীর্ষস্থানীয় নেতা এতগুলো গ্রন্থ লিখেছেন কিনা। অর্থাৎ আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী লেখক হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত। খ্যাতিমান বললেও ভুল বলা হবে না। আমার এই ছোট্ট লেখায় তাঁর এই লেখকসত্তার সামগ্রিক পরিচয় তুলে ধরা সম্ভব নয়। আমি শুধু এই বইয়ে সংকলিত লেখাগুলোর মধ্য দিয়ে তাঁর লেখক সত্তাটি কীভাবে উপস্থিত, তার সামান্য পরিচয় তুলে ধরবো।

পাঠক, লক্ষ্য করলে দেখতে পাবেন, মাত্র দুশো পৃষ্ঠার বই এটি। কিন্তু কী বৈচিত্র্য। প্রধান প্রসঙ্গ বন্ধবন্ধু, কিন্তু এর বাইরেও তিনি আরও নানা প্রসঙ্গে লিখেছেন। অধ্যায় বিভাজনটি লক্ষ করলেই সেটা বোঝা যাবে :
জনক আমার নেতা আমার; বায়ান্ন একাত্তর আওয়ামী লীগ; ৬-দফা আগরতলা মামলা ও রিপোর্ট; লেখক বঙ্গবন্ধু : তিনটি বইয়ের ভূমিকা; বঙ্গবন্ধুর ভাষণ সাক্ষাৎকার ও অন্যান্য রচনা; আমার কথা এবং মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু পরিবার। এই যে বিষয়বৈচিত্র্য তা থেকেই বোঝা যায়, বহুমুখী ভাবনার অধিকারী একজন প্রকৃত লেখক হচ্ছেন শেখ হাসিনা। তাঁর বলবার ভঙ্গিটি যেমন সহজ সরল অন্তরঙ্গ, তেমনি ভাষিক সৌন্দর্যে উজ্জ্বল। একটি উদ্ধৃতি দিচ্ছি। তার আগে এই বর্ণনার পটভূমিটা বলে নিই। প্রচণ্ড ঘুর্ণিঝড়ে চট্টগ্রাম বিধ্বস্ত। শেখ হাসিনা বিধ্বস্ত এলাকা সফরে এসেছেন। তাঁর মনে পড়ছে নানান কথা। শেখ হাসিনা লিখছেন :

“সাগর! সীমাহীন উত্তাল ব্যাপ্তিতে ফেনায়িত তরঙ্গের বিহঙ্গ নাচন তুলে যে আছড়ে পড়ে। কণ্ঠ বেষ্টন করে ধরে বিরাট উপকূলীয় সীমানার। সে গম্ভীর সৌম্য-স্থিতধী অনিবার, কেবল প্রশান্তিরই জন্ম দেয় মানুষের অন্তরে। সে সাগর আমার বড়ো প্রিয়। এই সাগরপাড়ে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্তের দর্শন সবসময়ই আমাকে বড়ো ব্যাকুল করে তোলে। নির্মল প্রশান্তিতে ভরে যায় আমার সমস্ত অন্তর। … সাগরকে আমি বিভিন্নরূপে দেখেছি। দেখছি সকালের মৃদু আলোতে যখন দূর পাহাড়ের চূড়া দিয়ে সূর্য ধীরে ধীরে তার দিনের আলো বিকিরণ করতে করতে উঠে আসে; অন্ধকার রাত্রির অবসান ঘটিয়ে। এ যেন আলো হাত উঠে আসছে জীবনের স্পন্দন জাগাতে। অন্ধকারের বুক চিরে বালুকাবেলায় আলোর আগমন জীবনকে দেয় জাগিয়ে।

দেখেছি পূর্ণিমা রাত। বালুকা বেলায় জ্যোৎস্নাভরা রাতে শুনেছি পূর্ণ জোয়ারে সাগরের দুরন্ত গর্জন। পূর্ণিমা রাতে যখন ভরা জোয়ার, সাগর তখন কানায় কানায় ভরা। সাগরপাড়ে বসে দেখেছি সে অপরূপ রূপ। দু’চোখ ভরে দেখেছি আর মুগ্ধ হয়েছি। এত সুন্দর। সেই জ্যোৎস্নায় বালুকাবেলায় সাগরের অপরূপ রূপে হয়েছি অভিভূত, হয়েছি মুগ্ধ।

এই যে অপরূপ রূপের লীলাভূমি। এই যে উপকূলীয় বিস্তীর্ণ অঞ্চল। সেখানে আজ গলিত মনুষ্য আর পশুদেহের বীভৎস দুর্গন্ধ। স্বজনহারার কাতর আহাজারি আর আহতের আর্তনাদে আজ সেই বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে চলেছে এক মূর্তিমান বিভীষিকা।”

এই বর্ণনা, ভাষিক সৌন্দর্যে যেমন উজ্জ্বল তেমনি পর্যবেক্ষণের দিক থেকে গভীর। যখন তিনি রাজনৈতিক প্রসঙ্গ নিয়ে লিখেছেন তখন তাঁর বর্ণনা প্রত্যক্ষ আর তথ্যসঞ্চারী, কিন্তু যখন তিনি প্রকৃতির বর্ণনা দেন, সেই বর্ণনা মনোলোকের ভাবনা, আবেগ আর অনুভবে দ্যুতিময়। একজন প্রকৃত লেখকের পক্ষেই এরকম গদ্যরচনা করা সম্ভব। সেই সঙ্গে তাঁর লেখালেখির আরেকটি দিক লক্ষ করবার মতো। তিনি যেভাবে বঙ্গবন্ধুর তিনটি পাণ্ডুলি উদ্ধার করে প্রকাশ করেছেন, যেভাবে গোয়েন্দাদের রিপোর্টের ভিত্তিতে বিভিন্ন প্রামাণ্য গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন, সেই ইতিহাসটি মূলত একজন গবেষকেরই। তাঁকে তাই শুধু লেখক নয়, আমি গবেষকের অভিধায়ও অভিষিক্ত করতে চাই।

নিজের রাজনৈতিক ভাবনা আর স্বপ্নের কথা এভাবেই ব্যক্ত করেছেন শেখ হাসিনা। এই কথাগুলি যখন তিনি লেখেন, তখন একজন প্রজ্ঞাবান সহৃদয়বাদী শাসক হিসেবেই তাঁকে দেখতে পাই আমরা। তাঁর জীবন এভাবেই হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংগ্রাম ও স্বপ্নের প্রতিচ্ছবি। তিনি তাঁর ভাবনায় ও মননে বাংলাদেশের কল্যাণচিন্তাকেই ধারণ করে আছেন।

শুধু একজন গবেষক হিসেবে নয়, প্রজ্ঞাবান রাজনীতিক হিসেবেও এখানে, এই বইতে শেখ হাসিনার উপস্থিতি লক্ষ করা যাবে। সম্পূর্ণ বইটি রাজনৈতিক আর এতে সংকলিত প্রতিটি প্রবন্ধে তাঁর রাজনৈতিক ভাবনা, কর্ম আর স্বপ্নের কথা ছড়িয়ে আছে। এ প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন, “আমি এখন নিজেকে রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে নিয়েছি। দেশ ও জনগণের কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করতে পেরে আমি গর্বিত। এই রাজনীতির কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেছেন, “গ্রামই আমাদের জীবন। আলাকোজ্জ্বল আধুনিকা রাজধানী ও শহরকে বাঁচিয়ে রাখছে গ্রামীণ অর্থনীতি আর মানুষ। ছোটো-বড়ো সব গ্রামকেই আমাদের ঐতিহ্য অনুসারী আধুনিক ও আদর্শ গ্রাম হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। গ্রামোন্নয়নের কথা বলতে গিয়েই তিনি বলেছেন গ্রামের নারীদের কথা, “আমাদের গ্রামের মেয়েরা সবচেয়ে বেশি পশ্চাৎপদ। যুগ যুগ ধরে চলে আসা সামাজিক বিধিনিষেধ, ধর্মীয় গোঁড়ামি ও কুসংস্কারাচ্ছন্নতার বেড়াজাল ভেঙে তাদের মেধা বিকাশের পথ করে দিতে হবে। তাদের শ্রমশক্তিকেও সমমর্যাদায় উৎপাদন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে নিয়োজিত করতে হবে।” আরেক জায়গায় তিনি লিখছেন, “গ্রামের উন্নতিকল্পে আরও একটি বিষয় আমাকে ভীষণরকম আতঙ্কিত করে তোলে। সেটি হলো, আমাদের সবচেয়ে অবহেলিত অসহায় অংশ পুষ্টিহীন কঙ্কালসার শিশুর সংখ্যাধিক্য।”

নিজের রাজনৈতিক ভাবনা আর স্বপ্নের কথা এভাবেই ব্যক্ত করেছেন শেখ হাসিনা। এই কথাগুলি যখন তিনি লেখেন, তখন একজন প্রজ্ঞাবান সহৃদয়বাদী শাসক হিসেবেই তাঁকে দেখতে পাই আমরা। তাঁর জীবন এভাবেই হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংগ্রাম ও স্বপ্নের প্রতিচ্ছবি। তিনি তাঁর ভাবনায় ও মননে বাংলাদেশের কল্যাণচিন্তাকেই ধারণ করে আছেন। তাঁর জীবনও যে রাজনৈতিক চড়াই-উৎরাই আর সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে, সুখী সমৃদ্ধ বাংলাদেশের আলোকবর্তিকা যেন তারই হাতে শোভা পাচ্ছে, বইটির নানান প্রবন্ধে সেসব কথার উল্লেখ পাচ্ছি। পিতার সংগ্রামী রাজনৈতিক জীবন, যে-জীবনের অভিঘাতে পারিবারিক জীবনে কত যে দুঃখকষ্ট সহ্য করতে হয়েছে, কত ত্যাগতিতিক্ষা, কত অনিশ্চয়তা, উৎকণ্ঠা; নিজের জীবনকেও তিনি সেই পথেই উৎসর্গ করেছেন। একটা সময়ে দেশে ফিরে আসতে না পারা, নির্যাতনের শিকার হওয়া, জেলে যাওয়া, গৃহবন্দিত্ব, ঠিক পিতার রাজনৈতিক জীবনই যেন প্রতিবিম্বিত হয়েছে তাঁর জীবনে। যোগ্য পিতার উত্তরসুরি তিনি। এই সূত্রে তাঁর চরিত্রের মানবিক দিকগুলিও আমরা লক্ষ করি। যে গ্রামের মানুষের উন্নতি সাধনের কথা বলেছেন, সেই গ্রামকেই তিনি ভালোবাসেন সবচেয়ে বেশি।

এই গ্রন্থের একটি লেখাতেও রাজনীতির যুক্তিবাদী ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও বর্ণনা ছাড়া প্রতিপক্ষকে লক্ষ করে কোনো অযৌক্তিক বিদ্বেষপূর্ণ কথা বলেননি। খুব সহজ সরল জীবনই তাঁর আরাধ্য : “খুব ইচ্ছে আছে নদীর ধারে একটি ঘর তৈরি করার।” শহরে হাঁপিয়ে উঠলেই সুযোগ পেলে গ্রামে চলে যান। লিখছেন, “রাতের তারাভরা খোলা আকাশ অনেক বড়ো সেখানে। নিম, কদম, তাল-নারিকেল গাছের পাতা ছুঁয়ে ছন্দময় শব্দ তুলে ছুটে আসে মুক্ত বাতাস। জীবনানন্দের ‘রূপসী বাংলা’ যেন আমার গ্রাম – ঘন সবুজ প্রকৃতি ও ফসলের প্রান্তর দেখে, দুচোখ জুড়িয়ে যায়। নির্জন দুপুরে ভেসে আসে ঘুঘু আর ডাহুকের ডাক, মাছরাঙাটি টুপ করে ডুব দিয়ে নদী থেকে ঠিকই তুলে আনতে পারে মাছ। এর চেয়ে আর কোনো আকর্ষণ, মোহ, তৃপ্তি আর কোনো কিছুতেই নেই আমার। ধূলিধূসরিত গ্রামের জীবন আমার আজন্মের ভালোবাসা। আমার হৃদয়ের গভীরতম অনুভূতি।”

শাসক হিসেবে, রাজনীতিবিদ হিসেবে শেখ হাসিনার অবস্থান যে গজদন্ত মিনারে নয়, জনগণের ধরাছোঁয়ার বাইরে যে তিনি অবস্থান করেন না, করতে চান না, বিশেষ করে তাঁর মানসভূমি যে বাংলাদেশের গ্রামজীবনের সঙ্গে শিকড়িত হয়ে আছে, তাঁর নিজের জবানিতেই সেসব কথা অবিস্মরণীয়ভাবে মূর্ত হয়ে আছে এই গ্রন্থের নানান লেখায়। আসলে তাঁর রাজনৈতিক জীবন ব্যক্তিজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। একসূত্রে গাঁথা। ব্যক্তিক উচ্চাভিলাষ বা জাঁকজমকপূর্ণ নাগরিক বিলাসী জীবনের প্রতি তাঁর কোনো আকর্ষণ নেই। তাঁর জীবন, জীবনানন্দের ভাষায় বললে, দোয়েলের শালিকের। তিনি যেন এই মাটির সাধারণ সন্তান। সাধারণ মানুষ। ভূমিকন্যা কিংবা মাতা।
++
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আজ ২৮ সেপ্টেম্বর, আপনার জন্মদিন। আপনাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করছি।

Share Now শেয়ার করুন