মাহফুজা শীলু >> কবিতাগুচ্ছ

0
846

কত দূর

তোমার না থাকাটাই কখন একটা কবিতা হয়ে গেছে
সত্যি, তোমার এই না থাকা
আমার কাছে এখন অক্ষরবৃত্তের একটি কবিতা
জমাট, দীর্ঘ, দমবন্ধ
কামগন্ধহীন তোমার এই না থাকায়
এখনও কেন আমার অভ্যেস হলো না!
আমি কি চেয়েছিলাম তোমাকে মাত্রাবৃত্তে বাঁধতে, আঁটসাঁট?
অথচ তুমি স্বরবৃত্তের মতো
দ্রুত, চটুল গতিতে কোথায় পালালে, কতদূর?

মা, আমি ও আমার মেয়ে

কবে আমি এতটা মা হলাম ঈশ্বর জানে!
মেয়ে হয়ে দিব্যি ছিলাম।
মায়ের সাথে হরহামেশা যুদ্ধ লেগেই থাকত।
তবু ছিল আমাদের দুজনের লুডুখেলা, একসাথে সিনেমা দেখা, গল্প করা
না, মা আমার কখনও বন্ধু ছিল না
ছিল কিছুটা বন্ধুর মতো।
আমি আমার মেয়ের বন্ধু হতে চেয়েছি।
চেয়েছি আরও অধিক নৈকট্য তৈরি করতে।
কিন্তু পারিনি।
আমার আর আমার মেয়ের বড় হওয়ার মধ্যে যোজন ব্যবধান ।
মেয়ের এখন তেইশ। পড়ছে মার্কিন মুল্লুকে।
ছুটিতে যাচ্ছে ইউরোপ ভ্রমণে প্রিয় বন্ধুর সাথে
আর আমার তেইশে!
মহিলা সমিতিতে নাটক দেখতে যেতে পারব না
সন্ধে হলে!
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে আবৃত্তির রিহারসেলে যেতে পারব না
সন্ধে হলে
ছেলেবন্ধুর সাথে রিকশায় ঘুরতে পারব না
সন্ধে হলে
বাড়ির ছাদে আড্ডা দিতে পারব না সন্ধে হলে!
আর কী কী পারব না-র তালিকা ছিল অনেক দীর্ঘ ।
আহা আমার মেয়ে,
বাবা-মাকে কাছে পায় না সত্যি,
তবে সন্ধের সর্বনাশ থেকে তো বের হতে পেরেছে।
যা মেয়ে তুই বেড়িয়ে পর
সমস্ত সন্ধেগুলোকে ইচ্ছে মতো ব্যবহার কর
এভাবেই ঘুরে ঘুরে তুই পৃথিবীর মেয়ে হয়ে ওঠ।

আড়াল

আমি কোনো আড়াল রাখতে শিখিনি
না-কবিতায়, না-সম্পর্কে
কবিতাগুলো হয়ে উঠতে উঠতে
মগডালে ওঠার আগেই মুখ থুবরে পড়ে।
সম্পর্কগুলি কখনও শুরুতে, কখনও মাঝপথে
সব ভেঙে পড়ে, সব।
সম্পর্কের দাড়ি, কমা, সব।
প্রত্যেকবার ভেঙে পড়ার শব্দে
চমকে উঠি। বেদনায় কুঁকড়ে যাই।
এতটা বয়স হলো, তবু আড়াল রাখতে শিখিনি
মিথ্যে করে বলতে শিখিনি ভালোবাসি!

হেঁটে হেঁটে

হেঁটে হেঁটে হেঁটে হেঁটে যাই যদ্দুর
আমার সাথে চলে একা রোদ্দুর
কদ্দুর যাবো আমি জানি না সেটাই
খুব কি খারাপ হবে যদি বা হারাই?

হারাতে হারাতে আমি পেয়ে যাবো পথ?
হাতে হাত রেখে আমি করব শপথ?
কোন পথ কোন দিকে রাখে কে খবর
সব পথ হয়ে ওঠে স্মৃতিগহ্বর।

জীবন এখন কেবল অনুযোগে ঠাসা?
জীবন মানেই শুধু অকারণে ভাসা?
ভাসতে ভাসতে আমি যাবো কদ্দুর?
যতদূর চলে গেছে সব রোদ্দুর?

কখন আমি জিতে গেলাম

তোমার কাছে হারতে হারতে কখন আমি জিতে গেলাম!
জিতেই দেখি আনমনা এক স্মৃতির পাহাড়
পাহাড় চূড়োই উঠব বলে যেই থেমেছি
কোত্থেকে এক দমকা হাওয়ায় খেই হারালাম।
স্মৃতিরা সব এমনি নাছোড়?
আগ বাড়িয়ে পথ করে রোধ?
এতই যদি কঠিন হবে
তবে কেন ইচ্ছেগুলো পাহাড় ছুঁলো?
আমায় কেন স্বপ্নগুলো খামচে দিল?
আমি তবে আমার হলাম
সত্যি বলছি, আমি এবার আমার হলাম!

ভাবি থাক

ভাঙতে ভাঙতে কত দূর!
অসীমেরও একটা সীমা আছে
তুমি ভেসেছ, তুমি ভেঙেছ
আমি শুধু দাঁড় বাই
অনেকটা পথ পাড়ি দিয়ে দেখি
ঠিক দাঁড়িয়ে নৌকো এক ঠাঁই !
তবে কী এখন সবকিছু ভাবনার জলছবি!
তুমি নিয়ে গেছ হাল
আমি একা বসে আছি পাড়ে
জীবন চলছে জীবনের মতো
স্মৃতিচিহ্নও ছিঁড়েছে তার সুতো।
কেবল ভাবি, ভাবনাই সার
সবকিছুতেই খুঁজি ছল-ছুঁতো।
কী হবে আর একহারা এই জীবন নিয়ে?
ভেঙেচুড়ে সেই সোজাসাপ্টা হয়ে গেছি কবে।
নেই গাছের গূঢ় বাঁক
আমি ভাবি থাক
সব থাক।

Share Now শেয়ার করুন