মাহবুব ময়ূখ রিশাদ > মানুষ সবকিছুর সঙ্গে তর্ক করে >> নিজের বই নিয়ে

0
1328
Rassel Lekha

মাহবুব ময়ূখ রিশাদ > মানুষ সবকিছুর সঙ্গে তর্ক করে >> নিজের বই নিয়ে

নিজের বই প্রকাশিত হলে বইমেলাটা ঠিক উপভোগ করা যায় না। বই নিয়ে, নিজেকে নিয়েই আত্মপ্রচারমূলক অনেক কথাই বলতে হয়, যা ঠিক আমার ব্যক্তিত্বের সাথে সমসুর নয়। তাই হয়ত মেলায় পাখি হয়ে উড়ে বেড়ানোর ঐ নির্দোষ উচ্ছ্বাসটা আর থাকে না। বরং মেলায় ঢুকলে একটা দুরুদুরু অনুভূতি ভীরুভীরু পায়ের গতি কমিয়ে দেয়। নিজের স্টল অর্থাৎ অনিন্দ্য প্রকাশে যেন কোনোভাবেই যেতে না হয়, সেই ব্যাপারটি নিশ্চিত করতে চায়। একটা বিকেল তার আলো ছড়িয়ে শেষবেলায় চলে গেলে বোধহয় সংকোচটা একটু কাটে; অন্ধকার হয়ে উঠবে, এবার বুঝি মুখ লুকিয়ে হাঁটাচলা করা যাবে। সে আশায়ও গুড়েবালি হতে সময় লাগে না। একদিকে এত আলোর ঝলকানি, তরুণীদের হাসির মায়ামুখরতা, অন্যদিকে বইয়ের পাতা ওলটানোর আওয়াজ, মোবাইল ক্লিকের শব্দে মিলিয়ে গেলে, আড্ডা পিটিয়ে বাড়ি ফেরার পথে মনে হয় কিছু কি লিখতে পেরেছি?
তর্কশয্যায় মৃত্যু শিরোনামের গল্পগ্রন্থটিতে ছয়টি গল্প আছে। অনিন্দ্য প্রকাশ বইটি বের করেছে। গত দুই বছরে লেখা হয়েছে গল্পগুলো। কিছু গল্প ছাপাও হয়েছে বিভিন্ন পত্রিকায় এবং অনলাইন ম্যাগাজিনগুলোতে। তবে বই হিসেবে মলাটবদ্ধ হওয়ার আগে সেই ছাপা হওয়া গল্পগুলো বদলে গেছে অনেকটাই। গল্পের শব্দসংখ্যা যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে, তেমন বাক্য-ভাষা-শব্দেরও বদল ঘটেছে।
একটা সময়ে সপ্তাহে একটি গল্প লেখা হতো, আর সেই গল্পগুলো ব্লগে প্রকাশ করে ফেলতাম। সম্পাদনা করতে ইচ্ছে করত না, দ্বিতীয়বার লিখতে ইচ্ছে হতো না, এমনকি মনে হতো বিশ্বসাহিত্যের সেরা কাজটি বোধহয় করে ফেলেছি। ঐ সুপেরিয়টি কমপ্লেক্স এখনো পুরোপুরি কাটেনি তবে কয়েকবার না দেখে, কিছুদিন ফেলে না রেখে, বন্ধুদের না পড়িয়ে কোনো গল্প পাঠকের সামনে উন্মুক্ত করি না কিংবা বলা ভালো করতে চাইও না। এই ছয়টি গল্প এই ধাপগুলো পার হয়ে পাঠকের সামনে যাচ্ছে।
মৃত্যু প্রথম যখন দেখি তখন আমার বয়স কেবল নয়। আমার দাদিকে দাফন করার সময় আমিও গিয়েছিলাম সঙ্গে। পুরো স্মৃতি মনে নেই, তবে মনে আছে আমি বেশ বিরক্ত হচ্ছিলাম। কেন দাদিকে এভাবে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, কেন দাদি কথা বলছে না, কেন বাসায় এত মানুষ, কেন সবাই কাঁদছে, কেন আমার ঘর দখল হয়ে গেছে, এসব বিষয় নিয়ে আমি মায়ের সঙ্গে রাগারাগি করেছিলাম। ঐ পুরো আবহের কোনোটাই আমার কাছে অর্থ বহন করছিল না। সেই থেকে কিংবা তার আরও কয়েকবছর পর থেকে আমার মৃত্যু বিষয়ক চিন্তাভাবনা শুরু হয়। মৃত্যুর অনিবার্যতা এবং ভয়াবহতা আমাকে ভাবিয়ে তোলে। এত অনিবার্য সত্য যদি সামনে পথে বসে থাকে, তবে ঐ দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে যাওয়াটাকে অর্থহীন বলে মনে থাকে। আমি খেলাধূলা ছেড়ে দিই, স্কুলে যেতে অনীহা প্রকাশ করি, প্রায় সব সামাজিক বিষয় থেকে নিজেকে গুটিয়ে ফেলে নিজের একটা জগতে প্রবেশ করি। সেই নিজের জগত, নিজের সাথে নিজের তর্ক হয়ত তার আরও অনেকদিন পর লেখা তর্কশয্যায় মৃত্যুর গল্পগুলোর প্রাথমিক বীজ হিসেবে কাজ করেছে। তবে গল্পগুলো কেবল মৃত্যুচিন্তা নিয়ে নয়।
মানুষ নিজের বোধের সঙ্গে তর্ক করে, নিজের আত্মার সঙ্গে তর্ক করে, প্রেমের সঙ্গে সঙ্গে তর্ক করে, ঘৃণার সঙ্গে তর্ক করে এবং দিনশেষে সেটাই প্রকাশ করে যা হয়ত সমাজে থাকা কিছু অদৃশ্য প্যারামিটারে উৎরে যায়। আবার কখনো উৎরাতে না পারার বেদনা নিয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে নেয়।
আমার মাঝে মাঝে মনে হয় কৈশোরের শুরুতে নিজেকে প্রচলিত চিন্তা থেকে আলাদা করে ফেলার যে প্রক্রিয়া শুরু করেছিলাম নিজের অজান্তে, সেই প্রক্রিয়া, চিন্তা আমাকে কি নিঃসঙ্গ করে তুলেছে? আবার এটাও সত্যি হয়ত ভাবছি নিজেকে ব্যতিক্রম কিন্তু আসলে তা নই। সবাই তো এভাবেই ভাবে। এমন দ্বন্দ মনে এলে আমি উপভোগ করি। এটা এক ধরনের কষ্ট যা হয়ত আমাকে দিয়ে কিছু লিখিয়ে নিতে পারে, আনন্দ দিতে পারে। গল্পগুলো যারা পড়বে তারাও হয়ত ঐ আনন্দের কিছু অংশ ভাগীদার হবে।
লেখাটির শিরোনাম ছিল নিজের বই নিয়ে। সেই অর্থে নিজের বই নিয়ে কিছু বলতে চাইনি। যদি বলার মতো কিছু হয়ে থাকে, তবে সেটা মানুষের মুখ থেকেই উচ্চারিত হোক।
Share Now শেয়ার করুন