মাহবুব হাসান | শামসুর রাহমানের কবিতার নান্দনিকতা : হৃদয়পুরের সিঁড়ি | জন্মদিন | প্রবন্ধ

0
87

শামসুর রাহমানকে আমি সৌন্দর্যপিপাসু রাজনীতিশাসিত কবিপ্রাণ হিসেবে চিহিৃত ও চিত্রিত করতে চাই। কারণ তিনি একই সঙ্গে রাজনীতি ও সৌন্দর্যকে কবিতার প্রকরণকলায় ব্যবহার করেছেন।

ন্দনতত্ত্বের মাপকাঠি কী? কে বলতে পারে যে, এটাই সাহিত্যের বিভিন্ন শাখার সৌন্দর্য বিচারের অ্যাবসোলুট মাপযন্ত্র। না, এমনটা কেউ বলতে পারেন না, অতীতে কেউ বলেননি বা লেখেননি। এ-রকম কোনো মাপযন্ত্র আবিস্কৃত হয়নি আজও। এ-নিয়ে যাঁরা কাজ করেছেন, তাঁরা লিখেছেন সুন্দরের রূপোশ্বৈর্যের ধারণার কথা। যেমন ভারতীয় নন্দন-ভাবুকেরা সৌন্দর্য ও সুন্দরকে মনে করেন প্রায় সমার্থক। প্লেটো লিখেছেন, ‘সত্যের মতোই সৌন্দর্য একটা আইডিয়ামাত্র। সৌন্দর্যের কোনো অস্তিত্ব বস্তুজগতে নেই, সৌন্দর্যমাত্রই স্বর্গীয়।’

সৌন্দর্যের সঙ্গে ব্যক্তির কল্পনা আর সৃষ্টিচেতনার সহযোগ আছে। এ-কারণে ব্যক্তিচেতনার প্রকাশ সৌন্দর্যকে কেন্দ্র করে। কবি যখন কবিতা লেখেন, তখন তাঁর বক্তব্যকে পাঠকের হৃদয়ে ‘সহৃদয়হৃদয়সংবেদী’ করে তোলার জন্য কিছু চিত্র, চিত্রকল্প, উপমা, রূপকের [অ্যালেগরি ও মেটাফর] আশ্রয় নেন কবি। আর আমাদের সেই অভিজ্ঞতা থেকে জাত যে-সব বস্তু ও বস্তুগত বিষয় এবং সামাজিক বিষয় ও যাপিত জীবনাচারের সম্পদ [যাকে আমরা লোকজসম্পদ বা ঐতিহ্য বলি, বলি পরম্পরা] আর মিথ কবির মনের আকাঙ্ক্ষাকে রূপায়িত করে। যে কবি [কবি বলতে আমি শিল্পের সব শাখার সৃষ্টিশীলকেই বোঝাচ্ছি] যত ভালোভাবে সেই সব উপাদান ব্যবহার করতে পারবেন, তাঁর সৌন্দর্যবোধ ও প্রজ্ঞা ততটাই সুন্দর। ‘সুন্দর’ শব্দটিতে সাধারণ সৌন্দর্য আছে। কিন্তু সৌন্দর্য শব্দটিতে আছে সেই আভিজাত রূপ, যা আমাকে আমাদের সাধারণ মানুষের মনের গহনে একরকম পরশ দিয়ে যায়, যা দীর্ঘকাল স্মৃতিতে অম্লান থাকে।

এই যে কথাগুলো বললাম এর সত্যতা মাপার কোনো উপায় আছে? কোনো যন্ত্র কি আছে? না নেই। এগুলো উপলব্ধির এঞ্জিন হচ্ছে মানুষের বোধ। এই বোধ হচ্ছে অস্পর্শযোগ্য, কিন্তু অনুভবযোগ্য। সে-বোধ ভাষাকেন্দ্রিক বিধায়, ভাষা যে অর্থ দান করে সেই মতো বিবেচনা সৃষ্টি হয়।

আমরা জানি, পৃথিবীতে আছে হাজার হাজার ভাষা। অংক কি ভাষা? সাধারণ মানুষ বলবেন, অংক তো অংকই, সে আবার ভাষা কী? না, অংক চিহৃমাত্রিক ভাষা। সিম্বলিক। প্রত্যেক ভাষাই সিম্বলিক। কবিতারও নিজস্ব ভাষিক প্যাটার্ন আছে। সে-কারণে কবিতার ভাষাজাত সুন্দর ও সৌন্দর্য গাণিতিক সৌন্দর্যের থেকে আলাদা।

শামসুর রাহমানের কবিতায় সৌন্দর্যের রূপারূপ বোঝার আগে আমাদের উচিৎ হবে তাঁর সামাজিক, নৈতিক, ঐতিহ্যিক স্বরূপ জেনে নেয়া। সেই সঙ্গে পৃথিবীর জ্ঞান বলে চিহিৃত মিথলজিক্যাল পরম্পরার আগাপাশতলাও জেনে নেয়া জরুরি।
‘দেখবার চোখ’ নামে আমার একটি প্রবন্ধে শামসুর রাহমানের ‘দুঃখ’ কবিতা সম্পর্কে লিখেছিলাম – ‘কবির হাতে শব্দ তার আভিধানিক অর্থ ক্রমাগত হারায়, কিন্তু সে পায় নতুন অর্থ, যা সৌন্দর্যের রঙে রাঙানো এবং গূঢ়ার্থের পঙক্তিতে বা সরণিতে সজ্জিত। শব্দের এই যে নতুন মানে পাওয়া, এ-কাজ মূলত প্রকৃত কবির কাজ। এ-কবিতার অন্য একটি স্তবকে আছে –

হৃদয়ে লতিয়ে-ওঠা একটি নিভৃততম গানে
সুখের নিদ্রায় কিংবা জাগরণে, স্বপ্নের বাগানে,
অধরের অধীর চুম্বনে সান্নিধ্যের মধ্যদিনে
আমার নৈঃশব্দ্য আর মুখর আলাপে
স্বাস্থ্যের কৌলিন্যে ক্রূর যন্ত্রণার অসুস্থ প্রলাপে,
বিশ্বস্ত মাধুর্যে আর রুক্ষ্মতার সুতীক্ষ্ণ সঙ্গীনে
দুর্বিনীত হচ্ছের ডানায়
অস্বস্তির কানায় কানায়
বৈরাগ্যের গৈরিক কৌপীণে
দুঃখ তার লেখে নাম।

বস্তু-অতিক্রমী শব্দ এবং চিত্রে যখন দুঃখ তার নাম লেখে তখন বোঝা যায় শামসুর রাহমানের সামাজিক পারিবারিক সৌন্দর্যচেতনা ব্যক্তির অনুভবের মধ্যেও তার দুঃখের বেদনা ছড়িয়ে দিয়ে আমাদের হৃদয়পটে তার ঢেউ দিচ্ছেন। ‘হৃদয়ে লতিয়ে-ওঠা’ বললে আমাদের মানস নয়নে ভেসে ওঠে জাংলায় লাউ ডগা কিংবা সিম গাছের লতিয়ে ওঠার দৃশ্যটি যেন সেইরকম একটি হৃদয়-নির্ভর নিভৃততম একটি গান শামসুর রাহমানের দুঃখে সওয়ার হয়েছে। এই অ্যালিগরিক্যাল চিত্রভাষ্যটি আমাদের পৌছে দেয় স্বপ্নে, জাগরণে সুখের নিদ্রায়, যেখানে দুঃখই তার মিহিন নামটি খোদিত করেছে। এ-ভাবে ‘নৈঃশব্দ্য’, ‘মুখর আলাপে’সহ সর্বব্যাপ্ত জীবনে দুঃখের নাম লেখা থেকে জারিত হয় শামসুর রাহমানের মনন-সৃজনের প্রতিচ্ছবি, যা হতাশাক্রান্ত রাজনৈতিক-সামাজিক প্রতিবেশ-বিশ্বেরই শিল্পরূপ। ‘সুন্দর পাখির মতো আশা’য় যখন দুঃখ তার নামটি লেখে তখন আমরা ‘সুন্দর আর আশার নির্বস্তুক চিত্ররূপ খুঁজি। কিন্তু সুন্দরের যেমন, তেমনি আশারও কোনো রূপ বা ছবি পাই না। বরং আমরা বুঝি সুন্দর হচ্ছে সেই নিরাকার ছবি – যা মনোসত্তায় জাগ্রত আর আশা তো মানুষের সঞ্জীবনী শক্তিরই প্রতি-নাম। এর কোনো বস্তুনির্ভর ব্যবহারিক রূপ নেই। রূপকই তার আসল খোলস। শামসুর রাহমানের চিন্তার এই দানাদার ও অ-দানাদার রূপকল্প পাঠক চেতনায় যে সুন্দর বা সৌন্দর্য সৃষ্টি করে সেই সৌন্দর্যই আমাদের আরাদ্ধ ও আস্বাদ্য।’

প্লেটোর সৌন্দর্য সম্পর্কিত স্বর্গবাদিতার ধারণাকে নাকচ করেছেন তাঁর শিষ্য অ্যারিস্টটল। তিনি মেটাফিজিক্স বইয়ে লিখেছেন, ‘যে কোনো বস্তুই সুন্দর বলে বিবেচিত হতে পারে, যদি তার মধ্যে তিনটি উপাদানের সমন্বয় ঘটে। এই তিনটি উপাদান, তাঁর মতে, ‘সঠিক পারম্পর্য, সামঞ্জস্য এবং স্পষ্টতা।’
অ্যারিস্টটলের এই তিনটি উপাদান ছাড়াও পৃথিবীতে সুন্দর ও কদাকার উপকরণ-উপাদান আছে, যা মানুষকে প্ররোচিত করে কোনো না কোনো অর্থবোধে পৌঁছাতে। আর সেই অর্থের দ্যোতনা থেকে পাওয়া যেতে পারে আনন্দ, কিংবা বেদনা। আর কে না জানে আনন্দের যেমন সৌন্দর্য আছে, তেমনি বেদনারও সৌন্দর্য আছে। আনন্দ-বেদনার মিলিত সংরাগেও যে নতুন সৌন্দর্য সৃজিত হতে পারে, সেটাও আজ সবারই জানা হয়ে গেছে। ইম্প্রেশনিস্টদের সৌন্দর্য ধারণার সাথে ডাডাবাদিদের সৌন্দর্যচেতনায় আকাশ-পাতাল পার্থক্য। আবার আধুনিকদের সৌন্দর্যবোধের সঙ্গে মেলে না উত্তরাধুনিকদের সৌন্দর্যচেতনা। এই যে পার্থক্য, এটা বস্তুকে দেখার ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির জন্য হয়েছে। এ-কারণেই প্লেটোর সঙ্গে অ্যারিস্টটলের, তেমনি আবার অ্যারিস্টটলের সাথে আনন্দবর্ধনের সৌন্দর্যচেতনার মিল নেই। এটা বলতে দ্বিধা নেই যে এদের চিন্তাধারা, দৃষ্টিভঙ্গি ও চেতনার দড়িদড়ার সঙ্গে আমার ও আমাদের দেখার মিল-মহব্বত তেমন একটা নেই। যদিও আমি স্বীকার করছি, এদের সৌন্দর্য-জ্ঞান থেকেই প্রথম জেনেছি সৌন্দর্য জিনিসটা আসলে কি এবং কেমন?

আনন্দবর্ধন কাব্যের বহিরঙ্গের চেয়ে অন্তরঙ্গকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। আমি খানিকটা তাঁর সঙ্গে একমত। তবে, তাঁর সঙ্গে আমি যোগ করি আরও কিছু যা আমার নিজস্ব চিন্তাজাত। অন্তরঙ্গ চৈতন্যের ‘ধ্বনিই চারুত্বের মূল, বস্তু অলংকার ধ্বনিত হলেই সুন্দর হয়’ – আনন্দবর্ধনের এই বোধের বাইরে আমি মনে করি নির্বস্তুক উপাদান থেকেও সুন্দর ও সৌন্দর্য পেতে পারি আমরা। আর তার রূপ নিরাকারও হতে পারে।

শামসুর রাহমানের কবিতার অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য কেবল বস্তুনির্ভরতার মধ্যে নেই, নির্বস্তুক ও নিরাকার উপলব্ধির মধ্যেও আছে। আছে তাঁর লোকজ উপাদান ব্যবহৃত কবিতায় তাঁর নতুনতর সৌন্দর্য। আমি চেষ্টা করছি শামসুর রাহমানের কবিতা থেকে সেই বস্তুবাদি ও নির্বস্তুবাদী সৌন্দর্য উদাহরণ আহরণের।

‘শামসুর রাহমানের কবিতায় প্রবাদ-প্রবচনের ব্যবহার নতুন মাত্রা পেয়েছে। প্রচল প্রবাদের রূপ ভেঙে তাকে কথ্যভঙ্গিতে উপস্থাপন করে তিনি অর্থদ্যোতনায় এনেছেন নতুন ব্যঞ্জনা। যেমন ‘রাজা-উজির মারা’ ‘অন্ধের ষষ্ঠি’ ‘বারো ভূতে খাওয়া’ ‘সাপের পাঁচ পা দেখা’ ‘সাগর সেঁচে মুক্তো তোলা’ ‘রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়, উলুখড়ের প্রাণ যায়’ ‘সবুরে মেওয়া ফলে’ ইত্যাদির ব্যবহার কবিতায় হুবহু নয়।

শামসুর রাহমান রাজা-উজির মারার লোকগল্পের পরিপ্রেক্ষিতকে নির্মাণ করেছেন ‘রূপালি স্নান’ কবিতার একটি পঙক্তিতে। কিন্তু তিনি প্রচলিত ‘রাজা-উজির মারা’র প্রবাদকে কাব্যিক সৃজনে বিন্যাস করেছেন এ-ভাবে –“আকাশের নিচে তুড়ি দিয়ে ওরা মারে কতো রাজা,অলীক উজির/ হেসে খেলে রোজ”। এই সমাজে এমন অনেক মানুষ আছেন যারা নিষ্কর্মা সময় কাটান। তারা যেমন খোশ-গাল্পিক তেমনি আড্ডারুর অলীক কল্পনায় রাজা-উজির মারার প্রতীকী গল্প আজ প্রবহমান সমাজচৈতন্যে।
এটা বাংলাদেশের লোকমানসের প্যাটার্ন। এভাবে অন্ধের ষষ্ঠির ব্যবহারেও নতুনত্ব লক্ষ্য করা যায় – “ অন্ধের মতো তাদের ষষ্ঠি ধরে” তির্যকতাপূর্ণ কবিতাশরীরে জায়গা পেয়েছে “বারো ভূতে খায় বেশ্যার ধন”। আর অসম্ভব হচ্ছে “সাপের পাঁচ পা দেখা”, যা কখনোই চাক্ষুষ সম্ভব নয়। গ্রামবাংলায় প্রচলিত লোকবিশ্বাস হচ্ছে, যে-লোক সাপের পা দেখতে পাবে সে ধনবান হয়ে উঠবে। তির্যক শ্লেষ মেশানো এই ‘অসম্ভব’কে কী অপার মহিমা দান করেছে লোকজ্ঞানীরা এ থেকে তা সহজেই বোঝা যায়। তেমনি সাগর সেঁচে শেষ করা যায় না। এই সত্য ও বাস্তবতার নিরিখ সত্ত্বেও অসম্ভব কল্পচেতনা বাণীভঙ্গিতে নতুন রূপ লাভ করেছে। যেন কবি নিজের সঙ্গেই ‘কানামাছি’ খেলায় মেতে নিজেকেই প্রতারিত করে চলেছেন। কবির অভিজ্ঞান-যাত্রা যে লোকজ্ঞানস্নাত এবং সহস্র বছর চর্চিত সংস্কৃতিরই অন্তর্গত, তা উপলব্ধি করা যায়।’

লোকবিশ্বাস, লোকধর্ম-বিশ্বাস লোকসংস্কার প্রভৃতি ব্যবহারে শামসুর রাহমান কবিতার বিশিষ্ট সৌন্দর্য সৃষ্টি করেছে বলেই আমার ধারণা। আমি কিছু পঙক্তি তুলে দিচ্ছি –

ক. এখন এখান থেকে, আল্লা, যাবো কোন জাহান্নামে!
[খেলনার দোকানের সামনে ভিখিরি]
খ. অভিজ্ঞান অঙ্গুরীয় ফেলবে না হারিয়ে নৌকোয় কোনো শকুন্তলা
[নো এক্সিট]
গ. ঐ দূরায়নী আজানের ধ্বনি শুনে
আর সুবে-সাদেকের তীব্র শুভ্রতায় নির্মেঘ আনন্দে শোকে
আজীবন সমর্পিতা কোরানের শ্লোকে।
[আমার মাকে]
ঘ. কাউকে করি স্পর্শ, পাছে
সে নিমেষে পাথরের মূর্তি হয়ে যায়;
আমার নিজেরই প্রতি নেই আর পূর্ণিমা-বিশ্বাস ইদানীং।
[এই রক্ত ধারা যায়]
ঙ. যখন প্রভাত পুণ্য আয়াত,
কাজল মাটির দুর্বার টানে ঝরে শত ফুল,
[সুচেতা তখন]
চ. আমি ভস্মরাজি দেখলাম,অথচ
কোনো পাখির পুনরুত্থান আমার চোখে পড়লো না।
[দেখা হলো না]

সৌন্দর্য কবিতার কোথায় লুকিয়ে থাকে? এ-প্রশ্ন আমরা করতে পারি। সৌন্দর্য গাছে ধরা ফল নয় যে তা পেকে লাল হয়ে ডালে ডালে ঝুলবে। আসলে কিন্তু সৌন্দর্য ফলের মতোই তার গাছের সোনালি ফসলের মতোই কবিতার ডালপালায়, কিংবা পঙক্তির বাঁকে-ভাঁজে পেকে থাকে। যার দেখার চোখ আছে, অর্থাৎ চর্মচক্ষের বাইরের চোখ, মনো-নয়নে তারা দেখতে পান, উপলব্ধি করতে পারেন সেই ইমাজিনেশন।

শামসুর রাহমানের কবিতা থেকে আরও কিছু পঙক্তি উদ্ধার করা যাক, যেখানে আছে উপকথা, লোকধর্ম-বিশ্বাস, রূপকথা, লোকছড়া, লোক-অভ্যাস প্রভৃতি যা বৃহত্তর মানুষের যাপিত জীবনামৃত।

ক. তাহলেই আমি
দ্বিনের নামে দিনের পর দিন তেলা মাথায়
তেল ঢালতে পারবো অবিরল ;
[একটি মোনাজাতের খসড়া]
খ. মুখে চিড়ে ভেজানো মুখের বুলি
[কিচ্ছু বুঝি না কিচ্ছু বলি না]
গ. আমার সুন্দরী অপয়ার অপবাদ
নিয়ে অপমানে, ক্ষোভে প্রতিবাদহীন
একদিন গোধূলি বেলায়
পুনরায় রাজহংসী হয়ে উড়ে যায় লাল মেঘে
[আমার পিতার গ্রামে]
ঘ. তখন তোমাকে ব্যাবিলনের
উদ্যানের কোনো মনোরম, দুর্লভ, তন্বী গাছ ভেবে
তাকিয়ে থেকেছি তোমার দিকে।
[তোমার ঘুম]
ঙ. আর খসিয়ে নিজের
বুকের পাঁজর থেকে হাড় বানিয়েছি দেবতারও
ঈর্ষণীয় বাঁশি।
[টানেলে একাকী]
চ. এইমতো কাটে
দিন কায়ক্লেশে, থাকি প্রাতঃস্মরণীয় মহাপ্রাণ
নূহের বাড়ির পাশে সন্তান-সন্ততিসহ
[নূহের জনৈক প্রতিবেশী]
ছ. সবুরে মেওয়া ফলে,
এই সুবচন জানা আছে আমারও।
[একটি মোনাজাতের খসড়া]
জ. বারো মাসে তেরো পার্বণ-কাতর
লাজুক আত্মাকে বসতিতে যথাযথ
[সম্পাদক সমীপেষু]
ঝ. ঝাঁকের কৈ ঝাঁকে মিশে যাচ্ছি।
[দুঃস্বপ্নে একদিন]
ঞ. এমন কি দেয়ালবিহারী টিকটিকি
চকিতে উঠলে ডেকে, তাকেও থামিয়ে দিতে চাই,
[পথের কুকুর]

উল্লিখিত কবিতার পঙক্তিসমূহ আমাদের বৃহত্তর লোকজীবনের প্রেক্ষণকেই কেবল আমাদের স্মৃতিশাসিত মননের মাঠে নিয়ে আসেনি, সেই সাথে আমাদের হৃদয়াবেগকেও কি এক ভালো লাগায় আন্দোলিত করে, যা আনন্দ দেয় এবং যা দুঃখ দেয়, বেদনায় কাতর করে, তাতে আছে বিশেষ সৌন্দর্য। আর সেই সৌন্দর্যই আমরা পাচ্ছি শামসুর রাহমানের কবিতায়।

কবিতার বহিরঙ্গের সূত্রে অন্তরঙ্গে যে আনন্দ-বেদনার ঢেউ ওঠে, আর সেই দোলায় পাঠক-হৃদয় রোমাঞ্চিত হয়ে ওঠে, তাতেও আছে সুন্দরের সেই স্পর্শ, যা আমরা সৃষ্টি করি কবিতায়। শামসুর রাহমানের ‘হরতাল’ কবিতায় আছে এমন একটি সুন্দর তুলনার উৎস, যা আমাদের ধর্মচেতনার অভিজ্ঞানজাত এক মহাসাগর। কী অনন্যসাধারণ নৈপুণ্যের সাথে তিনি তা সৃষ্টি করে প্রমাণ করেছেন ঐতিহ্য-সংস্কৃতি আর সৃষ্টিশীলতার মধ্যে সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য।

কবির মানসে জমে যে স্তব্ধতা, অন্ধ ক্রুদ্ধ, ক্ষিপ্র
থাবা থেকে গা বাঁচিয়ে বুকে
আয়াতের নক্ষত্র জ্বালিয়ে
পাথুরে কণ্টকাবৃত পথ বেয়ে ঊর্ণাজাল-ছাওয়া
লুকোনো গুহার দিকে যাত্রাকালে মোহাম্মদ যে-স্তব্ধতা আস্তিনের ভাঁজে
একদা নিয়েছিলেন ভরে,
সে স্তব্ধতা বুঝি নেমেছে এখানে।

এই দৃশ্যকল্পের কোথায় লুকিয়ে আছে রূপোশ্বর্য? এখান থেকে কি আনন্দ আমরা ভোগ কিংবা উপভোগ করলাম, তার কি কোনো বর্ণনা দেয়ার প্রয়োজন আছে? উদ্ধৃত পঙক্তিগুলো আমাদের গত শতাব্দীর ষাটের দশকের পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অভীপ্সার অংশ, কিন্তু সেই রাজনৈতিক বিষয়টিকে তিনি এমন একটি ঐতিহাসিক ও ধর্মসত্তাজাত ঘটমানতার সঙ্গে উপমিত করেছেন, যা আমাদের সংস্কৃতি-চেতনার ফল্গুর সূচিমুখ। হরতালের যৌক্তিকতা আছে কি নেই, তা প্রমাণ করে জনশূন্য রাজপথের দৃশ্যটি। রাজনৈতিক অভীপ্সা হরতাল ধর্মপ্রবর্তকের কল্যাণ ও ন্যায়-কর্মের সঙ্গে তুলনা হওয়ায়, তা সর্বব্যাপ্ত গ্রহণযোগ্যতা যেমন লাভ করেছে তেমনি বেড়ে গেছে আনন্দধারা বহুগুণ।
এ-কবিতার আরও কিছু পঙক্তি আছে যা কবিতার সুন্দর ও সৌন্দর্যকে নতুন নান্দনিক মাত্রায় যোগ করেছে।

হরবোলা বাজারের গলা
পাষাণপুরীর রাজকন্যাটির মতো
নিরুপম সৌন্দর্যে নিথর।

কেমন সবুজ হয়ে ডুবে আছে ক্রিয়াপদগুলো
গভীর জলের নিচে কাছিমের মতো শৈবালের সাজঘরে।

আমরা যে হরতালের মতো প্রতিবাদের গণতান্ত্রিক রাজনীতির হাতিয়ারটি সুফল পেয়েছি পরবর্তীকালে দেশের স্বাধীনতা অর্জনের মাধ্যমে তা বাঙ্ময় হয়েছে। কিন্তু ক্রমশই আমরা লক্ষ করছি যে, এই হাতিয়ারটি ভোঁতা হয়ে যাচ্ছে অতিব্যবহারে।

শামসুর রাহমানকে আমি সৌন্দর্যপিপাসু রাজনীতিশাসিত কবিপ্রাণ হিসেবে চিহিৃত ও চিত্রিত করতে চাই। কারণ তিনি একই সঙ্গে রাজনীতি ও সৌন্দর্যকে কবিতার প্রকরণকলায় ব্যবহার করেছেন।

কবিতার সাফল্য সেখানেই, যখন পাঠক তা থেকে নিজের আনন্দবেদনাকে অনুভব করতে পারেন। কবিতার সাফল্য সেখানেই যখন তার ব্যবহৃত শব্দগুচ্ছ পাঠককে আলোড়িত, আন্দোলিত করতে পারে। কবিতার প্রথম ও প্রধান অবলম্বন শব্দ ও শব্দজাত অলংকার বা শব্দালঙ্কার। বাংলা কবিতার ঐশ্বর্যের এলাকা ঢুঁড়ে পাওয়া যাবে ‘সংস্কৃত’, আরবি-ফারশি’ শব্দের বিপুল সম্ভার। কেন পাওয়া যাচ্ছে এদের বিপুল পরিমাণে? কারণ এ-দেশটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে শাসিত হয়েছে মোঘল ও পাঠানদের হাতে, পরে ইংরেজদের হাতে। কিন্তু তারও আগে ভাষার আদিসত্তা দখল করে নিয়েছিলো হিন্দুধর্মাবলম্বী সংস্কৃতভাষী পণ্ডিতরা। তারাই বাংলার ব্যাকরণ নির্মাণ করেছেন সংস্কৃত ব্যাকরণের ছাঁচে ফেলে। এভাবে বাংলা ভাষা লাভ করেছে বহুবিচিত্র শব্দের সৌকর্য-সৌগন্ধ ও শোভা। তাই আমরা বলি বাংলা শঙ্করায়িত হয়েছে নানাভাষার সৌন্দর্য-বেদনার আরকে।

শামসুর রাহমানের কবিতা ভাবনায় আমরা লক্ষ করবো এই বিচিত্র শব্দালংকার শোভা। বিশেষ করে আরবি-ফারশি শব্দের নিপুণ ব্যবহারে, গণচেতনায় তার সহাবস্থানের লৌকিক পারম্পর্যে। আমাদের নিত্যবাস্তব সাধারণ জীবনযাত্রায় যে সৌন্দর্যবোধ ও সৃজনবেদনা প্রেক্ষণ-পরিসর আছে, তা ওই আরবি-ফারশি শব্দের সহযোগ। ফলে মানুষের জীবনীশক্তির অন্যতম উৎসও হলো ওই শব্দালঙ্কার। সৌন্দর্যসৃজনে শামসুর রাহমান এমন অনেক আরবি-ফারশি শব্দ প্রয়োগ করেছেন যার বিকল্প শব্দ মেলা ভার। আমি কয়েকটি পঙক্তি উদ্ধার করছি।

পোশাকের জেল্লা তবু পারে না লুকাতে কোনোমতে
বিকৃত দেহের ক্ষত
[প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে]
করো না বেয়াদবি বান্দা তুমি।
বাদশা নেই কেউ, গোলাম সব
বেগম পেতে চায় বাঁদির সুখ :
আউড়ে গেছে কতো সত্যপীর।
[ কবর খোঁড়ার গান]

নেমক হারাম নই, দেখেছি তো আর্জি পেশ করে
এ-জীবনের কাছে নিত্যদিন
[ শনাক্তপত্র]

ঘরে পুড়বে আগরবাতি আর
কোরাণের পুণ্য সব আয়াতে আয়াতে
হবে গুঞ্জরিত চতুষ্কোণ।
[বিবেচনা]

অকস্মাৎ পথে পথে মজলিশে হট্টরোলে শুনি
নূহের জাহাজ নাকি জোড়া জোড়া নানা পশুপাখি,
হরেকরকম শস্যবীজসমেত ভেসেছে আজ
[ নূহের জনৈক প্রতিবেশী]

সাজিয়ে নরক করি গুলজার আর
[ইদানীং বঙ্গীয় শব্দকোষ]

এ-রকম আরও বহু পঙক্তি উদ্ধৃত করা যায়, কিন্তু তার প্রয়োজন আপাতত আর নেই। বরং তাঁর কবিতার স্বরূপ প্রকাশের শব্দরাজি খুঁজে দেখা যেতে পারে। কারণ, তাতে আছে কবির মানসিকতার পরিচয় ও প্যাটার্ন।

‘ধর্মবিশ্বাসের ক্ষেত্রে মসজিদ, মন্দির, গির্জা, শুধু শব্দকেন্দ্রিক ব্যবহার নয়, এ-গুলোর স্থানিক, ব্যবহারিক উপযোগিতাও তিনি কবিতায় নির্মাণ করেছেন। বিশেষ করে মসজিদ এবং তার অনুষঙ্গ উপাদান। অর্থাৎ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ সময়- নির্দেশনা ইত্যাদি। এ-ক্ষেত্রে ভোরবেলাকার অর্থাৎ সুবে-সাদেকের ব্যবহার বেশি। ‘আজান’ শব্দটি কোনো কবিতায় সরাসরি এসেছে, কোনো কবিতায় পরোক্ষে। কখনো মেটাফর হিসেবে কখনো সিম্বল হিসেবে।

শামসুর রাহমানের কবিতায় লোকজ উপাদান-উপকরণ ব্যবহারের একটি চকিত শব্দ-নাম তালিকা তৈরি করা যাক :

পাল্কি, চেরাগ, বেনেবউ, মাস্তুল, ধুতুরা, কাঁথা, নকশিকাঁথা, ছাগল, জোনাকি, উনুন, হেঁসেল, তেলের শিশি, খসম, বেহুদা, কুলুজি, কামারশালা, কাফন, কানামাছি, আউলিয়া, মাজার , পীর-ফকির, ফেরেশতা, তুকতাক, মন্ত্র, জিকির, খোয়াব,আল্লার গজব, খেদমত, শরিফ, হর-হামেশা, ঘুঘুর ফাঁদ, গুলজার, তোষামোদ, শাকরেদ, চিড়ে , মুসুল্লি, দেউড়ি, কুয়োতলা, হরফ, ক্ষুর, নাইওর, গেরস্থলি, পাটখড়ি, গেরস্থ, ঠাওর, পালকি-বেহারা, গলুই , দড়ি, ছুতোর, দরবেশ, লাকড়ি, নুন, জিন-পরী, সোনালি রুলি, জরু, নাকছাবি, কাহন, পায়ের মল, সোনারুপা, ঝুমঝুমি, বেণু, ন্যাপথলিন, হাশরের ময়দান, ফরিয়াদ, মরহুম, মুণ্ডু-ধড়, খড়-বিচুলি, শতরঞ্জি, চাদর, কাকতাড়–য়া, খাজনা, পিনিস, আসমানি হুরী, গা-গতর, খসম, বেহুদা, বাবরি চুল, পৈখের আওয়াজ, কাঠের কাঁকুই, চাটাই, তোফা – এরকম শব্দ ও নামবাচক লোক-উপকরণে শামসুর রাহমানের মানসপটটি পূর্ণ হয়ে আছে।

‘তিনি গ্রামনগরের মিশেল শব্দভাণ্ডার ও উপকরণে গড়ে তুলেছেন তাঁর কবিতাভাণ্ডারের সম্পদসুষমা, যা তাঁর কবিতা নির্মাণের কৃৎকৌশলগুণে নতুনতর ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করেছে। শিল্পের সৌন্দর্য সৃষ্টিতে এ-দিকটি নতুন বীক্ষান্তর বলে বিবেচিত হতে পারে।’

শব্দের শুষমা আর সৌন্দর্য মিলেই কবির পৃথিবী। শামসুর রাহমানের কবিতার জগত।

Share Now শেয়ার করুন