মাহ্ফুজা শীলু >> ‘কী ফুল ঝরিল বিপুল অন্ধকারে’ >> স্মৃতি

0
782

‘কী ফুল ঝরিল বিপুল অন্ধকারে’

শঙ্খ ঘোষ ও মিতা হক দুজনেই করোনায় প্রয়াত

লিখতে বসে রবীন্দ্রনাথের এই গানটিই কেবল ঘুরে ফিরে মনে আসছে। ‘কী ফুল ঝরিল বিপুল অন্ধকারে।’ কোনো কোনো ফুল বড় অসময়ে ঝরে পড়ে!
‘মৃত্যুর চেয়ে জীবন ভালো’, মিতা বলেছিলো। কারণ হয়তো মৃত্যু অচেনা। মিতা আরও বলেছিলো, ‘জীবন দীর্ঘ হয় অভিজ্ঞতায়!’ অভিজ্ঞতা হয়েছিল বৈকি। কত গান, কত প্রাণ, কতজনের সঙ্গে ছিলো ওঠা-বসা। সেদিন টেলিভিশনে ওর একটি পুরনো সাক্ষাৎকার প্রচার হচ্ছিলো। এ কথাগুলোই বলছিল মিতা কী মিষ্টি হাসিমুখে! সেই ভালো রেখে, সেই আলো রেখে, কোন্ অজানা অন্ধকারে চলে গেল মিতা! যেখানে সবাই যাবে। কিন্তু কে, কখন যাবে, কেউ জানে না।
খুব ছোটোবেলাতেই গানে হাতেখড়ি হয়েছিলো মিতা হকের। গান শেখার জন্য পেয়েছিল বড় চাচা, গানের শিক্ষাগুরু ওয়াহিদুল হককে। ওয়াহিদ ভাই ঠিক চিনতে পেরেছিলেন মিতার ভেতরের গানের সুর ও শক্তিটাকে। আর মিতাও ওয়াহিদ ভাইয়ের যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে নিজেকে তৈরি করেছিলো।
মিতার এই অকস্মাৎ চলে যাওয়া, সংস্কৃতি অঙ্গনে শুধু নয়, সাধারণ মানুষের মধ্যেও এক তীব্র হাহাকারের জন্ম দিয়েছে। করোনা একটি শক্তিশালী প্রাণঘাতী ভাইরাস, সবার আশেপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কেবল কখন কে তার খপ্পরে পড়ে জীবনের সীমানা ছাড়িয়ে অনন্তলোকে পাড়ি দেবে, কেউ জানে না।
মাসখানেক আগে শেষ দেখা। একটু ক্লান্ত লাগছিলো যেন। চলে আসার সময় বলেছিলো, আর একটু ঘনঘন আসবে? আমিও হাসিমুখে জানতে চেয়েছিলাম, কত ঘন ঘন? বলেছিল, সপ্তাহে একবার। হায়! তারপর আর একদিনও যাওয়া হয়নি। চারপাশে শুনতে পাচ্ছিলাম করোনার বাড়াবাড়ির কথা। বাইরের কেউ যাওয়াও তেমন নিরাপদ ছিলো না। কে, কার শরীরে এই অদৃশ্য ভাইরাসটি বয়ে বেড়াচ্ছে জানার উপায় নেই। অনেকদিন ধরেই যেহেতু ওর শরীরটা ভালো যাচ্ছিলো না, আমরা সবাই তাই ওদের বাসায় একটু সাবধানে যাতায়াত করতাম।
সেদিন একবারও মনে হয়নি আর কোনোদিন দেখা হবে না। একজন প্রাণময় মানুষের এই হঠাৎ প্রস্থান মেনে নেওয়া যায় না। কিছুতেই মানতে পারছি না। করোনার পরে, কত চেনা মুখ আর দেখবো না ভাবলে ব্যাথাকাতর হই। সাবধানী হয়ে উঠি বাধ্য হয়ে। ত-বে কাছের মানুষ চলে গেলে কোনো সান্ত্বনাই কাজ করে না।
এই তো দেখতে পাচ্ছি- চটপটে মিতা, হাসিখুশি মিতা, রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মেলনে ব্যস্ত ভঙ্গিতে ঘুরে বেড়াচ্ছে। দেখতে পাচ্ছি ওয়াহিদ ভাইয়ের গানের স্কুল ‘আনন্দধ্বনি’তে এসেছে। নীলোৎপল সাধ্য,
বন্ধু খুরশীদ (বর্তমানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক), লোপা আহমেদ, বুলবুল ইসলামদের সাথে বসে গান করছে। ‘কণ্ঠশীলন’-এ কোর্স করার সুবাদে ওয়াহিদ ভাইয়ের সাথে আমারও সম্পর্ক ছিলো গুরু-শিষ্যের। আমিও তাই বন্ধুদের সাথে কখনওসখনও ‘আনন্দধ্বনি’তে যেতাম। মুগ্ধ শ্রোতা ছিলাম। কণ্ঠে সুর নেই, তাই চুপচাপ বসে থাকা ছাড়া কিছু করার থাকতো না। তার বেশ কিছুদিন পরে ‘ডেইলি স্টার’ পত্রিকায় বিজ্ঞাপন বিভাগে কাজ করার সুবাদে ওয়াহিদ ভাইয়ের সঙ্গে একটি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায়। সে-সময়টায় ওয়াহিদ ভাইও ডেইলি স্টারে ছিলেন। জয়েন্ট এডিটর হিসেবে। তখন গান নিয়ে নানা আলাপও হতো। ততদিনে আমার সাথে মিতা হকের সূত্রে ওয়াহিদ ভাইয়ের সঙ্গে একটি আত্মীয়তার সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেছে। তবে, আত্মীয়তা ঐ নামেই। ছিলাম গুরু-শিষ্য। গানের শিল্পী না হয়েও আমি আর মিতা দুজন দুজনের আশেপাশেই ছিলাম। আমাদের কয়েকজন কমন বন্ধু ছিলো। যারা মিতারও ছিলো খুব ঘনিষ্ঠ। আরও পরে একসময় বৈবাহিকসূত্রে আমরা দুজন পরস্পরের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় হয়ে উঠি। সে অন্য গল্প।
গানটা মিতা হকের রক্তে ছিলো। গানের চর্চাটাও ওর দাদার বাড়ি এবং মামার বাড়ি, দুই পরিবারেই ছিলো। বিয়ের পরে শ্বশুরবাড়িতেও পেয়েছে একটি সংস্কৃতিময় পরিবেশ। শুধু স্বামী খালেদ খান নন, মিতার শ্বশুরও গান করতেন । নাটক করতেন। নাটক এবং গানের সঙ্গে এই পরিবারের অনেকে সক্রিয়ভাবে যুক্ত । এ ক্ষেত্রে নাম করা যায় মিতার দেবর অভিনেতা শাহীন খান, কণ্ঠশিল্পী মামুন জাহিদ খান, ননদের মেয়ে সেমন্তী মঞ্জুরীর। বাড়ির পরিবেশ একসময় ছিলো সর্বদা উৎসবমুখর। বোঝা যেত না কে আত্মীয় আর কে বাইরের মানুষ। ওদের জীবনটা ছিলো বড় সহজ সুন্দর। যদিও মিতার স্বামী খালেদ খান দীর্ঘদিন এক দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত ছিলেন। সেই তীব্র মনোবেদনা নিয়ে সহজ হয়ে বাঁচার চেষ্টা করা খুব কঠিন। সেই কঠিনের সাধনাই করে গেছে মা-মেয়ে। মিতা-জয়িতা। মিতার ব্যক্তিজীবন এবং গানের জীবন এতটাই হাত ধরাধরি করে চলেছে যে, লিখতে গিয়ে আমিও দুটোকে আলাদা করতে পারছি না।
একসময় একটা প্রচলিত ধারণা ছিলো, রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতে গেলে খুব বেশি সুরেলা, তীক্ষ্ণ গলা না হলেও চলে। যেমন নজরুলের গানে প্রয়োজন। রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনলে মানুষের মন বিবশ হয় এ সমালোচনা তো ছিলই বরাবর। মিতা হকের গান যেন এ সবের মূর্তিমান প্রতিবাদ হয়ে এলো। আর গানে কতটা প্রাণ যোগ করলে গানটা মর্মে পৌঁছায়, মিতা তার উজ্জ্বল উদাহরণ।
মিতা যখন ওর গানের স্কুল ‘সুরতীর্থ’ খুলল, তখন আবার অন্য গল্প। ছাত্র-ছাত্রীরা ছিলো তার ঘরের ছেলেমেয়ের মতো। যতদূর জানি, কোনো অর্থ লাভের আশায় ও স্কুল খোলেনি। স্কুল খুলেছিল তাঁর জীবনভরের শিক্ষাকে অন্যের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে। স্পষ্টবাদী মিতা যে-কোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে ছিলো সোচ্চার। একজন সচেতন মানুষ হিসেবে মৌলবাদের বিরুদ্ধে ছিলো তার স্বচ্ছ অবস্থান। সারা বাংলাদেশ ঘুরে বেড়িয়েছে রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদের হয়ে। সঙ্গীত ছিল মিতা হকের কাছে সাধনার মতো, এটা সত্যি, তবে সংসারকেও এর সঙ্গে যুক্ত করতে পেরেছিলো সমান দক্ষতায়। সংসারের সব দিকে তার খুঁটিনাটি নজর ছিলো। চমৎকার রান্না করতো। ঈদে-পার্বণে ওর হাতের দইবড়া খাওয়ার জন্য আমি রীতিমতো অপেক্ষা করে থাকতাম। আর ভাবতাম, যে পারে সে সব পারে! এই, এখানেও তার গানের মতো, একাগ্রতাই মূল রহস্য। যে-কোনো কাজেই ভালোবাসা আর আগ্রহ থাকাটা জরুরি। আতিথেয়তায় ছিলো উদার-হৃদয় ।

লেখকের সঙ্গে মিতা হক

একমাত্র ভাই রাজনকে চোখে চোখে রাখার গুরু দায়িত্ব পালনে কখনই মিতাকে বিরক্ত হতে দেখা যায়নি। রাজন একজন বিশেষ মানুষ। ওদের বাবা-মা চলে যাওয়ার পরে মিতা রাজনের প্রতি দায়িত্ব পালন করেছে অনেকটা মায়ের মতোই। অবুঝ ভাইকে নিয়ে মিতার কর্তব্য ও মমতার যে গভীরতা দেখেছি, তা রীতিমতো শিক্ষণীয়।
পারিবারিক জীবনে ওকে অনেক বেশি দুঃখের ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে। বাবা-মা-স্বামী সকলের চির প্রস্থানে মিতা কেবল দিনের পর দিন নিঃশ্ব হয়েছে। তারপরও ছিলো সবার সঙ্গে মিলে। ছিলো তার প্রাণের ধন জয়িতার চোখের মনি হয়ে।

এই লেখাটি যখন লিখছি, খবর পেলাম শঙ্খ ঘোষ প্রয়াত হয়েছেন । শঙ্ঘ ঘোষের ‘এ আমির আবরণ’ কি মিতা পাঠ করেছিলো? শুনেছিলো শঙ্খ ঘোষের অসামান্য পাঠে বিদেশে বসে রচিত রবীন্দ্রনাথের গান কবিতা নিয়ে ‘বাসায় ফেরা ডানার শব্দ ‘ ক্যাসেটটি? জানা হয়নি কখনও। আর আজ শঙ্খ ঘোষের সঙ্গে মিতার চমৎকার ছবিটি দেখে কত প্রশ্ন মনে এলো। যার কোনো কিছুই আর জানা হবে না! শঙ্খ ঘোষ মিতা হকের গান পছন্দ করেছিলেন, একথা আমি না জেনেও বলে দিতে পারি!
সেদিন এক টেলিভিশন চ্যানেল মিতার পুরনো একটি অনুষ্ঠান সম্প্রচার করছিলো। কথা আর গানে অনুষ্ঠান জমে উঠেছিলো বেশ, যা চিরকালই হতো। কথাপ্রসঙ্গে যে গানের কথা আসছিলো, সেটাই গেয়ে যাচ্ছিল অবলীলায়। গীতবিতান না দেখে গান করার অভ্যাস এবং সাহস বহুজনেরই নেই। মিতার ছিলো।
তো সেদিন দেখলাম, গাইতে গাইতে গানের শেষ স্তবকে এসে হাতে খাতা তুলে নিলো মুহূর্তের জন্য। হাতে খাতা (নাকি গীতবিতান !) একঝলক দেখে, সাথে সাথেই আবার হারমোনিয়মের রিডে হাত দিলো। এত অনায়াস ছিলো পুরো বিষয়টি যে, মুগ্ধ হয়ে গেলাম। কী স্মার্ট, কী সহজাত ওর সবকিছু। আমি খুব বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করছিলাম, একেকটি গান শেষ করে উপস্থাপকের সঙ্গে কথা বলতে বলতে, কথা প্রসঙ্গে যে গান চলে আসছিলো, তাই গেয়ে উঠছিলো না দেখে, স্বতস্ফূর্তভাবে। ওয়াহিদুল হকের শিক্ষাও ছিলো তাই। গানের বাণী শিখে, ধাতস্থ করে তবেই জনসমক্ষে গাইতে হয়। যেন বারবার খাতা দেখতে গিয়ে গানের মূল আবেশটা নষ্ট না হয়।
মিতা তার আয়ত চোখ, লাবণ্যময় হাসি নিয়ে যে-কোনো শাড়িতেই উজ্জ্বল হয়ে উঠতো। দেখা হলে আমরা পরস্পরের শাড়ি লক্ষ করতাম। আর এই বিশেষ ক্ষেত্রটিতে আমাদের রুচির মিলও ছিলো খুব। মিল ছিলো সাজ-সজ্জাতেও। একটি সাধারণ শাড়িতেও, ওর কপালের টিপটি যোগ করতো বাড়তি সৌন্দর্য। মিতা তার গানের মতোই ছিলো ব্যবহারে প্রাণবন্ত এবং মনোযোগী। সকলের প্রতি সমান মনোযোগ দেওয়ার এই শিক্ষা খুব বেশি মানুষের মধ্যে দেখা যায় না।
মিতা সেই টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে আরও বলেছিলো, ‘আমি ভালোবাসা-মুখর এক পৃথিবীর স্বপ্ন দেখি, যেখানে মানুষ শুধু মানুষকে ভালোবাসবে। মানুষের দ্বারা অন্য কোনো মানুষের অনিষ্ট হবে না।’ এত শুদ্ধ স্বপ্ন কজন মানুষ দেখে! সবাই শুধু নিজেকে নিয়ে ভালো থাকতে চায়। অথচ একা একা কারও পক্ষেই ভালো থাকা সম্ভব নয়। সুস্থভাবে বাঁচতে গেলে পছন্দমতো সঙ্গ প্রয়োজন। প্রয়োজন অবারিত ভালবাসার, শর্তহীন ভালোবাসার। এ ক্ষেত্রে মিতা ছিলো ভাগ্যবান। কন্যা জয়িতাও বাবা-মায়ের মতো বন্ধুঅন্তপ্রাণ। এ বাড়িতে কেউ একবার এলে বারবার আসতে চায়। ব্যাপারটা অনেকটা এরকম – প্রথমে বাড়িটিতে অতিথি পরিচয়েই ঢোকে, কিন্তু যখন বের হয় তখন দেখা যায়, অচেনা মানুষটি আর অতিথি হয়ে নেই, কখন বন্ধু হয়ে গেছে। এই বাড়িরও কি কখনও মনখারাপ ছিলো না? ছিলো। যখন তার স্বামী প্রখ্যাত অভিনেতা খালেদ খান প্রয়াত হলেন, প্রয়াত হলেন মিতা হকের বাবা ও মা।
সংসারে থেকে, সংসারের কালিমা স্পর্শ না করেও যে একজন পরিপূর্ণ শিল্পীর জীবনযাপন করা যায়, মিতা হক তার উজ্জ্বল উদাহরণ। কর্মজীবনে ছায়ানটের রবীন্দ্রসঙ্গীত বিভাগের প্রধান ছিলো। ছিলো রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক।
একজন সচেতন মানুষ হিসেবে মৌলবাদের বিরুদ্ধে ছিলো বরাবর সোচ্চার। ছিলো মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী। কোনো সুবিধার কাছে নিজেকে বিকিয়ে দেয়নি। প্রেমের গানে তো অসামান্য ছিলোই, রবীন্দ্রনাথের দেশাত্মবোধক গানও ওর কণ্ঠে বিশেষ হয়ে উঠতো। মনে পড়ছে মিতার কণ্ঠে শোনা, ‘আমায় বলো না গাহিতে বলো না’, ‘আমরা মিলেছি আজ মায়ের ডাকে’, ‘ও আমার দেশের মাটি তোমার পরে ঠেকাই মাথা’, ‘আমি ভয় করবো না ভয় করবো না।’ আরও কত কত গান। কত অজস্র গান শ্রাবণের ধারার মতো আমাদের উপর ঝরে পড়েছে। আমরা স্নাত হয়েছি প্রেমে আর সংরাগে।
শুধু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানই নয়, অতুলপ্রসাদ, রজনীকান্ত, ডিএল রায়ের গানও সমান দক্ষতায় গেয়ে শ্রোতাদের কাছে বিশেষ প্রিয় হয়ে উঠেছিলো মিতা হক।
বলাই বাহুল্য, কথা বলতো চমৎকার শুদ্ধ উচ্চারণে। মিতার কণ্ঠস্বরের আরেকটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিলো, গান গাওয়ার এবং কথা বলার কণ্ঠস্বর ছিলো সম্পূর্ণ এক। অনেকের ক্ষেত্রে ভিন্ন হতে দেখি। ভিন্ন হয় বলেই তারা কখনও তারকা শিল্পী হয় না।
মানুষের সঙ্গ খুব পছন্দ করতো মিতা। বলতো, ‘একা বেঁচে সুখ নেই, বাঁচতে হয় সবাইকে নিয়ে।’
রাষ্ট্রীয় সম্মাননা হিসেবে পেয়েছে একুশে পদক, শিল্পকলা একাডেমির রবীন্দ্র পুরস্কার, চ্যানেল আই আজীবন সম্মাননা । ঢাকা এবং কলকাতা থেকে অনেকগুলি সিডি বের হয়েছে। আশ্চর্য এই যে, যতদূর জানি, ঢাকার চেয়ে ওর কলকাতায় প্রকাশিত সিডির সংখ্যা বেশি। কলকাতার ভক্ত সংখ্যাও বিপুল। শ্রীকান্ত আচার্যের মতো কলকাতার অনেক শিল্পীর সঙ্গে তার অন্তরঙ্গ বন্ধুত্ব ছিলো। একসঙ্গে সিডি প্রকাশিত হয়েছে। শ্রীকান্ত আচার্য কন্যা জয়িতার বিয়েতে তার স্ত্রীসহ উপস্থিত ছিলেন। মেয়ের বিয়েতে আনন্দের হাট বসেছিলো।
কেরানিগঞ্জের অসাধারণ বাড়িটিতে যখন চলে গেল, ধানমন্ডির ২৮ নম্বরের বাসা ছেড়ে, ভেবেছিলাম বুঝি একা বোধ করবে। কিন্তু সবাই খুব খুশি মনেই যেতো। খুব তো দূরে নয়! মোহাম্মদপুর থেকে একটু এগুলেই বাড়ি, মিনিট পনেরোর পথ। তবে থাকবার জন্য আদর্শ বাসস্থানই বলব, কেরাণিগঞ্জের বাসাটি। খোলা বিলের ধারে একতলা উঠানসহ অনেক বড় বাড়ি। ঘরের ভেতর দিয়ে দোতলায় উঠে গেলে ছাদের এক কিনারে একটিমাত্র ঘর। সেই ঘরের কাঁচের দীর্ঘ-চওড়া দরোজা দিয়ে চোখে পড়ে দিগন্তবিস্তৃত পানি আর প্রান্তর। এত অসহ্য সুন্দর সেই দৃশ্য যে একবার গেলে আর আসতে ইচ্ছে করে না। শীতের সন্ধ্যায় উঠোনে বসতো কখনও-সখনও ব্যাডমিন্টন খেলার আসর। ও খেলতো না তবে মানুষের হৈচৈয়ে খুশি হতো, বুঝতে পারতাম।
আজ মিতা নেই। আছে ওর গান। এখন থেকে সেই গানের ভিতর দিয়েই আমরা মিতাকে দেখবো। এভাবেই মিতা হক বেঁচে থাকবে আরও বহুদিন।
এই লেখার শিরোনাম দিয়েছি ‘কী ফুল ঝরিল বিপুল অন্ধকারে।’ না, এই গানটি কখনও মিতার কণ্ঠে শুনিনি। কখনও গেয়েছিলো কিনা, জানি না সেটাও। তবে ও বলেছিলো, ‘মৃত্যুর চেয়ে জীবন ভালো।’ জীবনকে ভালোবাসার হাজারটা কারণ থাকার পরেও কোনো কোনো ফুল বড় অসময়ে ঝরে পড়ে, ঝরে পড়ে বিপুল অন্ধকারে।
এই অল্পশ্রুত গানটি দিয়ে ওকে আমার ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা জানালাম :

কী ফুল ঝরিল বিপুল অন্ধকারে।
গন্ধ ছড়ালো ঘুমের প্রান্তপারে।
একা এসেছিল ভুলে অন্ধরাতের কূলে
অরুণ-আলোর বন্দনা করিবারে।
ক্ষীণ দেহে মরি মরি সে যে নিয়েছিল বরি
অসীম সাহসে নিস্ফল সাধনারে।
কী যে তার রূপ দেখা হলো না তো চোখে,
জানি না কী নামে স্মরণ করিব ওকে।
আঁধারে যাহারা চলে।
সেই তারাদের দলে
এসে ফিরে গেল বিরহের ধারে ধারে।
করুণ মাধুরীখানি কহিতে জানে না বাণী
কেন এসেছিলো রাতের বন্ধ দ্বারে।

Share Now শেয়ার করুন