মেহেদী মাহমুদ চৌধুরী >> গণিত ও বাংলা কবিতা (পর্ব ২) >> প্রবন্ধ

0
647

গণিত ও বাংলা কবিতা

দ্বিতীয় পর্ব

তার আগে প্রথম পর্ব পড়া না থাকলে প্রথম পর্বটি পড়ে নিন

পরবর্তী কবিতার রচয়িতা টম পেটসিনিস (Tom Petsinis)। জন্ম ১৯৫৩ সালে গ্রিসে। ছোটকালে অস্ট্রেলিয়াতে চলে যান। সেখান থেকেই গণিতে পিএইচডি করেছেন ও এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতের শিক্ষক হিসাবে কর্মরত আছেন। টম পেটসিনিস এ পর্যন্ত ছয়টি কবিতার বই প্রকাশ করেছেন। এছাড়া লিখেছেন উপন্যাস, নাটক ও ছোটগল্প। তার বেশ কিছু কবিতায় গণিত ও কবিতার সম্মিলন ঘটেছে। আমি আলোচনার জন্য তার হাইপেশিয়া কবিতাটা বেছে নিয়েছি। মূল ইংরেজি নাম Hypatia ও কবিতাটি Naming the Number গ্রন্থভুক্ত। টম পেটসিনিসের কয়েকটি কবিতা পূর্বে কামাল চৌধুরী অনুবাদ করেছিলেন।

হাইপেশিয়া
টম পেটসিনিস

যৌবন – ঝলমলে সতেরোর যুবা
তুমি দেহের ব্যয়াম সেরে এখানে এসেছ
মনের অনুশীলনে।
কিন্তু তুমি কি সত্যের বিষয়ে সম্পূর্ণ নিরাবেগ?
তুমি কি বীর্যরঙা সূর্যকে প্রদক্ষিণ করতে পারবে
কিংবা অস্বস্তিকর ফুসকুঁড়িকে শিকড়েই চাপা দিতে?
(তার জামা পিছলে যায়: সে আইনের মতো টানটান দাঁড়িয়ে
পা ফাঁক করা আর বাহুদ্বয় ভূমির সমান্তরাল।)
একমাত্র বিশুদ্ধরাই জ্যামিতির সেবা করতে পারে:
প্রেমাস্পদ ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বস্ত তপস্বিনীর মতো
আমিও আমার দেবতার জন্য কুমারী রয়ে যাই।
তুমি কি মেধার শক্তিতে তোমার মাংসকে দমিয়ে রাখতে পারবে?
আমার স্তনজোড়া যখন কৌণিক কাঠামোর চূড়া স্পর্শ করে তুমি কি তার অর্থ বোঝো?
কিংবা সেই ত্রিভুজখানির, যা আমার যৌনতাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করে?
(অনুবাদ : আলম খোরশেদ, মূল ইংরেজি থেকে)

কবিতাটা লেখা হয়েছে হাইপেশিয়াকে নিয়ে যাকে অনেক সময় হিপেশিয়া নামেও লেখা হয়। জন্ম আনুমানিক ৩৭০ খ্রিস্টাব্দে ও মৃত্যু ৪১৫। একজন মহিলা গণিতবিদ হিসাবে তিনি গণিতের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নাম। প্রাচীন মিশরের আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরিকে ঘিরে জ্ঞান বিজ্ঞানের যে প্রসার ঘটেছিলো সেখানে তিনি বিশেষ অবদান রেখেছিলেন। কিন্তু গণিতের ইতিহাসে তিনি আরো স্মরণীয় হয়ে আছেন তার দুঃখজনক মৃত্যুর জন্য। মিশরের খ্রিস্টধর্ম প্রসারের এক পর্যায়ে ৪১৫ সালে একদল ধর্মোন্মাদ খ্রিস্টান জনতার হাতে তিনি নিহত হন। জানা যায় সে উন্মত্ত জনতা তার উপর হামলা করে এবং হত্যার পর তার লাশ কেটে টুকরো টুকরো করে রাস্তায় ছড়িয়ে দেয়া হয়। আন্তর্জাতিক শিক্ষাকেন্দ্র হিসাবে আলেক্সান্দ্রিয়ার পতন তখন থেকেই শুরু হয় বলে অনেকে মনে করেন (সত্র : বাংলা ইউকিপিডিয়া)।
হাইপেশিয়ার করুন মৃত্যু অনেক কবিতা, উপন্যাস ও চলচ্চিত্রের বিষয় হয়েছে। টম পেটসিনিসের হাইপেশিয়া কবিতার বিষয় ভিন্ন। হাইপেশিয়া কবিতাতে তার ছাত্রদের জ্যামিতির শিক্ষা দিচ্ছেন, যে-ছাত্ররা মাত্র যৌবনে পদার্পণ করেছে। হাইপেশিয়া শরীরের বিভিন্ন অংশের সাথে তুলনা করছেন জ্যামিতির নানা আকৃতির গুলোর। তিনি ছাত্রদের কাছে জানতে চাইছে যে তারা কি তাদের শরীরকে বুদ্ধিবৃত্তি দিয়ে অতিক্রম করতে পারবে কিনা, যেমনটা হাইপেশিয়া নিজে করেছেন। তাই তার হাত থাকে সমান্তরাল, তিনি ভূমিতে স্থির দণ্ডায়মান থাকেন, হাইপেশিয়ার যৌনতা তাই তুলনীয় হয়ে ওঠে ত্রিভুজের সাথে।
পরবর্তী কবিতা ইংরেজ কবি স্যামুয়েল টেইলর কোলরিজের ( Samuel Taylor Coleridge)। জন্ম ১৭৭২, মৃত্যু ১৮৩৪। বাংলাভাষীদের তিনি পরিচিত অ্যানসিয়েন্ট ম্যারিনার কবিতার জন্য যা এক সময় আমাদের পাঠ্যপুস্তকে ছিলো। কোলরিজ ইউক্লিডের একটি জ্যামিতিক সিদ্ধান্ত বিষয়ে কবিতা লিখেছিলেন। সিদ্ধান্তটি বলে যে একটি রুলার ও কম্পাসের সাহায্যে একটি লাইন AB থেকে একটি সমবাহু ত্রিভুজ আঁকা যাবে। কবিতাটি খানিকটা দীর্ঘ হওয়ায় শুধু প্রথম অংশ নিচে শেয়ার করছি মূল ইংরেজিতে (সম্পূর্ণ কবিতাটা পাওয়া যাবে অ্যামেরিকান ম্যাথেম্যাটিক্যাল সোসাইটির একটি ব্লগে ও স্যারা গ্লেজের পূর্বে উল্লিখিত প্রবন্ধে । কবিতাটার নাম ‘এ ম্যাথেম্যাটিক্যাল প্রব্লেম’।

This is now–this was erst,
Proposition the first–and Problem the first.
I.
On a given finite Line
Which must no way incline;
To describe an equi–
–lateral Tri–
–A, N, G, L, E.
Now let A. B.
Be the given line
Which must no way incline;
The great Mathematician
Makes this Requisition,
That we describe an Equi–
–lateral Tri–
–angle on it:
Aid us, Reason–aid us, Wit!”
(A Mathematical Problem, Samuel Taylor Coleridge)

উপরে আমরা কয়েকটি গাণিতিক কবিতার উদাহরণ দেখেছি। এর বাইরেও আরো অনেক উদাহরণ পাওয়া যাবে। কিন্তু সেগুলো নিয়ে আমরা আর আলোচনা করবো না। ইন্টারনেট ঘাঁটলেই এরকম অনেক কবিতার উদাহরণ পাওয়া যাবে। বেশ কিছু কবিতা পাওয়া যাবে ম্যাথেম্যাটিক্যাল আসোসিয়েশন অফ আমেরিকার একটি ওয়েবসাইটে।
আমরা উপরে যে অনুবাদ পেশ করেছি তার বাইরেও বাংলাতে কিছু গণিত কবিতার অনুবাদ হয়েছে। অনিন্দ্য রায় প্রায় ১৭০টি কবিতার অনুবাদ করেছেন যাতে পাবলো নেরুদা, নিকানোর পাররা, রিটা ডাভসহ অনেকের কবিতা সংকলিত আছে। আলোচনা কিছুটা সংক্ষিপ্ত করার জন্য আমরা বাংলাতে গণিত কবিতার আর কোন অনুবাদ পেশ বা তা নিয়ে আলোচনা করবো না, যা নিয়ে আরেকটি আলাদা প্রবন্ধ হতে পারে। বরং এই অংশের আলোচনার সমাপনীর লক্ষে কবিতার উপরে আরো দু’ধরনের গাণিতিক প্রভাব বিষয়ে দৃষ্টিপাত করবো।
এর প্রথমটি হলো কবিতাতে গণিতের সরাসরি উল্লেখ না থাকলেও গণিত কবিতাকে কাঠামোগতভাবেও প্রভাবিত করতে পারেন। এরকম একটি কবিতার আন্দোলন ফরাসি ভাষার ১৯৬০ সালের দিকে শুরু ওগ্লিপো (Oglipo) আন্দোলন। এই আন্দোলনে জড়িত ছিলেন বেশ কয়েকজন প্রথম সারির কবি ও গণিতবিদ । তারা মনে করতেন গণিতে যেমন কিছু সীমাবদ্ধতা মেনে নিয়ে সমস্যার সমাধান করা হয় তেমনি কবিতাতে সীমাবদ্ধতা আরোপ করা যেতে পারে ও তা কবিতার শক্তিমত্তা বৃদ্ধি করতে পারে। এর মধ্যে একটি জনপ্রিয় ধারা হলো N+৭, সেখানে একটি আগের কবিতাকে ব্যবহার করে, কবিতাটার বিশেষ্যকে এক বিশেষ পদ্ধতি বদলপূর্বক একটি নতুন কবিতা লেখা হয়।
ম্যাথেম্যাটিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন অফ আমেরিকার যে ওয়েবসাইটের কথা পূর্বে উল্লেখ করেছি, সেখানে গণিতের মতো গঠনের আরো কিছু কবিতার উদাহরণ আছে। যেমন লুইস ক্যারোলের বিখ্যাত উপন্যাস “অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড”-এ “ইঁদুরের লেজ” নামের একটা কবিতার কথা বলা হয়েছে, যার পঙক্তির বিন্যাস কিছুটা গণিতের লিমিটের ধারণার সাথে তুলনীয়। উল্লেখ যে লুইস ক্যারোল একজন গণিতবিদ ছিলেন ও তাঁর উপন্যাসে গণিতের প্রভাবের কথা অনেকেই উল্লেখ করেছেন।
ওয়েবসাইটটি জাপানি হাইকুর কথাও উল্লেখ করেছে। হাইকুও একধরণের সীমাবদ্ধ কবিতা, যেখানে শব্দ সংখ্যা গুনে সংক্ষিপ্ত আকারের কবিতা লেখা হয়। কিন্তু হাইকুর আরেকটি বৈশিষ্ট আছে যার উল্লেখ হয়তো এখানে করা দরকার, যা আমার জাপানে বসবাসের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি। তা হলো জাপানিতে যেমন বর্ণমালা আছে তেমনি আছে বর্ণচিত্রের ব্যবহার, যাকে বলা হয় কানজি। যেমন জাপানিতে আগুন লেখা হয় ‘火’ কানজিটি ব্যবহার করে যার উচ্চারণ হবে ‘হি’। আবার ‘日’ কানজিটির উচ্চারণও হলো ‘হি’ কিন্তু অর্থ হলো দিন। তার মানে জাপানিতে শুধু উচ্চারণের দিকে দেখলে হবে না, এর পাশাপাশি কোন কানজিটি ও তার উচ্চারণ ও চিত্রগত অর্থ দুটোই দেখতে হবে। হাইকু সংক্ষিপ্ত আকারের হলেও তাই অর্থ প্রকাশের সক্ষমতা অনেক বেশি, যা জাপানি না জানলে অনুধাবন সম্ভব না। তাই হাইকুকে গাণিতিক কবিতার সাথে তুলনা যথাযথ নাও হতে পারে।
এবার দ্বিতীয় প্রসঙ্গটি টানবো, যার মাধ্যমে বিশ্বকবিতায় গণিতের আলোচনা শেষ করছি। তা হলো একটি শেষ ধরনের গণিত প্রভাবিত কবিতার সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া। এগুলোকে অনেকে কবিতা মনে নাও করতে পারেন। এই কবিতাগুলো লেখা হয় গাণিতিক সূত্রের আকারে যার একটি উদাহরণ নিচে দেয়া হলো :

আগ্রহীরা ম্যাথম্যাটিক্যাল পোয়েট্রি নামক একটি ওয়েবসাইটে গিয়ে আরো অনেক উদাহরণ দেখতে পাবেন। উপরের এই কবিতার রচয়িতা কার্ল ক্যাম্পটন (Karl Kampton) এবং কবিতাটির নাম “সিক্স আলোন ইন”। আমি এই বিশেষ ধরণের গণিত কবিতা সম্পর্কে জানতে পেরেছি অনিন্দ্য রায়ের সৌজন্যে।
বিশ্ব সাহিত্যে কবিতা ও গণিতের সম্পর্ক বিষয়ক আলোচনা এখানেই শেষ করছি। আলোচনা সংক্ষিপ্ত করার জন্য আরো উদাহরণ দেয়ার প্রলোভন এড়াতে হয়েছে, যদিও তা ইতিমধ্যেই বেশ দীর্ঘ। অনুমান করছি, বাংলা কবিতাতে গণিত নিয়ে যে আলোচনা হবে তাতে উপরের আলোচনা যথেষ্ট বলে অনুভূত হবে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে যদি প্রয়োজন হয়, তবে বিশ্ব কবিতা থেকে আরো উদাহরণ প্রদান করা হবে।

বাংলা কবিতায় গণিত

বাংলা কবিতায় গণিতের আলোচনা কোথা থেকে শুরু করা যায়? চর্যাপদ থেকেই শুরু করা যথাযথ হতে পারতো, কিন্তু আমি শুরু করবো লোকগণিতের আলোচনা থেকে। তার আগে গণিত বলতে কি বোঝাবো তাও একটু উল্লেখ করা জরুরি।
কবিতা গানে নানা ভাবে সংখ্যার প্রসঙ্গ আসতে পারে। যেমন লালনের একটা গান ‘তিন পাগলের হলো মেলা নদেয় এসে’। তিন সংখ্যাটির উল্লেখের কারণে কি গানটিকে গণিত প্রভাবিত বলে যাবে? এই ধরনের উল্লেখকে আমরা গণিতের প্রভাব বলে মনে করবো না, যদিও এখানে কেউ কেউ আপত্তি করতে পারেন এবং তা যে অযৌক্তিক হবে তা পূর্ব অনুমান করাও সঠিক নয়। কারণ গণিত শাস্ত্রের, এমনকি মানব ইতিহাসেই এক, দুই, তিন, ইত্যাদি সংখ্যার ধারণার আবিষ্কার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। কিন্তু সংখ্যার আবিষ্কারের পরে তাকে গাণিতিক ভাবে ব্যবহার শুরু করা যেমন যোগ বিয়োগ ও সংখ্যার সাথে সংখ্যার তুলনা ইত্যাদি মানব ইতিহাসের আরেক গুরুত্বপূর্ণ উল্লম্ফন। আরো আছে বিভিন্ন গাণিতিক আকৃতির যেমন ত্রিভুজ, বৃত্ত ইত্যাদি ধারণার আবিষ্কার। এই উল্লম্ফনের প্রভাবে যে কবিতাতে পড়েছে তার সবটুকুকেই আলোচনাতে আমরা গণিত প্রভাবিত কবিতা বলে মনে করবো। কিন্তু যে কবিতাগুলো সংখ্যার উল্লেখের বাইরে তেমন যায়নি তাদের বিষয়ে খানিকটা ভিন্নতর বিবেচনা প্রয়োজন। এই প্রসঙ্গে আমার পিতা মরহুম আহমেদ হোসেন চৌধুরীর কাছ থেকে শোনা একটা কবিতার কথা উল্লেখ করবো। কবিতাটা হলো :

শাল সত্তর
গজার আশি
হনালু (সোনালু) বলে
আমি যুগ যুগ আছি।

কবিতাটার আদি উৎস খনার বচন হতে পারে। কিন্তু উৎস অনুসন্ধানের চেয়ে আমার কাছে বড় প্রশ্ন হলো হলো যে কবিতাটাকে গণিত প্রভাবিত বলা যাবে কিনা। বিশেষ করে যদি ‘তিন পাগলের হলো মেলা’কে গণিত প্রভাবিত না বলি তবে কোন যুক্তিতে ‘শাল সত্তর, গজার আশি’কে গণিত প্রভাবিত বলা যাবে? আমার যুক্তি হলো যে ‘শাল সত্তর, গজার আশি’তে সংখ্যা ব্যবহারের একটা মাত্রাগত পার্থক্য আছে। ‘তিন পাগলের হলো মেলা’তে গণনা মুখ্য নয়। কিন্তু ‘শাল সত্তর, গজার আশিতে’ গণনাই মুখ্য। এই কবিতাটার উদ্দেশ্য হলো কয়েক প্রকারের কাঠের স্থায়িত্বকাল মুখে মুখে মুখস্থ রাখার ও তুলনার ব্যবস্থা করা। তাই কবিতাটাতে সংখ্যাগুলো পাশাপাশি উল্লেখের মাধ্যমে শাস্ত্র হিসাবে গণিতের ব্যবহার ঘটেছে।
বাংলা কবিতার সাথে গণিতের সম্পর্ক অনুসন্ধানের জন্য আমি তাই মনে করছি যে লোকগণিত থেকেই শুরু করতে হবে। লোকগণিত সম্পর্কে একটা ভুক্তি আছে বাংলাপিডিয়াতে যা থেকে জানা যাচ্ছে যে, প্রাচীন ভারতে লোকগণিত বিষয়ক বেশ কিছু পাণ্ডুলিপি ছিলো যার ব্যবহার বাংলা অঞ্চলেও নিশ্চয়ই ঘটেছিলো বলে মনে করা যায়, ও বাংলা অঞ্চলের অধিবাসীদের চর্চাকৃত শুভঙ্করীতে ৩০০ খ্রিস্টপূর্ব থেকেই তার সমন্বয় ঘটেছিলো। শুভঙ্কর নামে কোন গণিতবিদ বাংলাতে ছিলেন কিনা সে বিষয়ে গবেষণাতে নিশ্চিত না হতে পারলেও শুভঙ্কর শব্দটি এখন বাংলা প্রবাদের অংশ হয়ে গেছে। শুভঙ্করের পাটিগণিতের একটি উদাহরণ :

ত্রিশ হাত উচ্চ বৃক্ষ ছিল এক স্থানে
চূড়ায় উঠিবে এক কীট করে মনে।
দিবাভাগে দশ হাত উঠিতে লাগিলো
নিশাযোগে অষ্ট হাত নীচেতে নামিলো
না পায় যাবৎ চূড়া করে সে অটন
কতদিনে উঠেছিলো কর নিরূপণ

কবিতার মাধ্যমে পাটীগণিত করার এই প্রক্রিয়া কমে গেলেও শুভঙ্করের প্রভাব এখনো গণিত শিক্ষায় পাওয়া যায়। যেমন উপরের যে গাণিতিক সমস্যা তার সাথে বর্তমান প্রজন্মের অতি পরিচিত বানরের তৈলাক্ত বাঁশ বেয়ে ওঠার সমস্যার মিল খুব সহজেই টের পাওয়া যায়। আরেকটি এরকম কবিতা, যেগুলোকে আর্যাও বলা হয়, তার উল্লেখ আছে বাংলাপিডিয়ার পূর্বে উল্লিখিত ভুক্তিতে

কুড়বা কুড়বা কুড়বা লিহ্যে
কাঠায় কুড়বা কাঠায় লিহ্যে
কাঠায় কাঠায় ধূল পরিমাণ
বিশ গণ্ডা হয় কাঠার প্রমাণ
গন্ডা বাকি থাকে যদি কাঠা নিলে পর
ষোল দিয়ে পুরি তারে সারা গণ্ডা ধর

এই আর্যাতে জমির পরিমাপের সূত্র দেয়া হয়েছে। এরকম অঙ্ক করার পদ্ধতি পৃথিবীর অন্য প্রাচীন সভ্যতাগুলোতেও যে প্রচলিত ছিলো তা অনুমান করা যায়। একটি প্রাচীন সুমেরীয় কবিতা ‘The Herd of Nanna’ বা ‘নান্নার পশুদল’,

The cows are driven together in herds for him.
His various types of cow number 39600.
His fattened cows number 108000.
His young bulls number 126000.
The sparkling-eyed cows number 50400.
The white cows number 126000.
The cows for the evening meal are in four groups of five each.
Such are the various types of cow of father Nanna.”

কবিতাটাতে নান্না নামক এক পশুর মালিকের কথা বলা হচ্ছে। তার মালিকানায় কিরকম কয়টি গরু আছে তার বিবরণ কবিতাটাতে দেয়া হচ্ছে। বলা হচ্ছে তাদের কীভাবে খাবার দেয়া হয়। পাঠে মনে হয় যে নান্না নামক এক ব্যক্তির সম্পদের বড়াই করা লেখাটার লক্ষ্য। তাই কবিতাটা ঠিক লোকগণিতের পর্যায়ে না পড়লেও লোকগণিতে যেভাবে গণনা করা হয়, সেরকম যে অন্যান্য প্রাচীন সভ্যতায় প্রচলিত ছিলো তার প্রমাণ মেলে।
লোকগণিত সবসময়ই প্রচলিত ছিলো ও এখনো আছে। বাংলা ভাষার গণিতের আদি প্রয়োগের উদাহরণ খোঁজার জন্য এর পরেই অনুসন্ধান করবো চর্যাপদের ভাষায়। বিস্ময়করভাবে চর্যাপদের কবিতাগুলোতে সংখ্যার ছড়াছড়ি। কিন্তু তা আসলেই কতটুকু পদ রচয়িতাদের গণিত শাস্ত্র সম্পর্কিত পাঠ ও চিন্তার ফসল তা নিয়ে কিছুটা সংশয় করাই যেতে পারে। বিশেষ করে আমরা আগে সংখ্যার একটি বিচ্ছিন্ন উল্লেখকে গণিত প্রভাবিতের কাতারে রাখা হবে না বলে সিদ্ধান্ত প্রকাশ করেছি। লুই পাদানাম রচিত চর্যাপদের প্রথম পদের প্রথম পঙক্তিই হলো “কাআ তরুবর পঞ্চ বি ডাল” অর্থাৎ “কায়া তরুর মতো, পাঁচ শাখা তার।” এই পাঁচ শব্দের ব্যবহারে গণিতের কোন প্রভাব নেই, এমনটা সহজেই বলা যেত। কিন্তু বিরুবাপাদনাম রচিত তৃতীয় চর্যাতেই আছে :
এক সে সুন্ডিনী দুই ঘরে সান্ধঅ।
চীঅণ বাকলঅ বারুণি বান্ধঅ।।
সহজে থির করি বারুণী সান্ধে ।
জেঁ অজরামর হোই দিঢ় কান্ধে ।।
দশমি দুআরত চিহ্ন দেখইআ।
আইল গরাহক অপণে বহিআ।।
চউশঠী ঘড়িয়ে দেঢ় পসারা।
পইঠেল গরাহক নাহি নিসারা।।
এক ঘডুলী সরুই নাল।
ভণস্তি বিরুআ থির করি চাল।।
(চর্যা ৩, বিরুবাপাদনাম)
উপরের চর্যার সরল বাংলা না জানলেও সংখ্যার ব্যবহার অর্থাৎ এক, দুই, দশ ও চৌষট্টি সহজেই লক্ষণীয়। এরকম সংখ্যার আরো ব্যবহার বা উল্লেখ অন্যান্য চর্যাপদগুলোতে পাওয়া যাবে। এমনকি আছে শূন্যের সাথে শূন্যের যোগের কথা। কিন্তু চর্যাপদের রচয়িতাদের সংখ্যার সঙ্গে পরিচয় ও লেখাগুলোতে তার সচেতন ব্যবহার যে ঘটেছে তা নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে এই দুইটি পদে :

তিঅড্ডা চাপী জোইণি দে অঙ্কবালী।
কমলকুলিশা ঘাণ্টে করহূঁ বিআলী।।
(চর্যা ৪, গুন্ডরীপাদনাম)

উপরের তিঅড্ডা শব্দের একটি বাংলা হতে পারে ত্রিকোণ, যা এখানে বোঝাচ্ছে জঘনকে। উপরের পদের সরল বাংলা দাঁড়ায়, “জঘন চেপে যোগিনী আলিঙ্গন করে। পদ্ম ও বজ্রের সংঘর্ষে কাল কাটিয়ে দাও।” নারীর যোনিদেশকে ত্রিভুজ বা ত্রিকোণের সাথে তুলনা করার বিষয়টি চর্যাপদেই প্রথম নয়, অসংখ্য বার অন্যত্রও করা হয়েছে। এমনকি তা আমাদের পূর্বের আলোচ্য হাইপেশিয়া কবিতাতেও আছে। কিন্তু ত্রিভুজের বা ত্রিকোণের ধারণার উৎপত্তির আগে এরকম তুলনা কি কোনভাবে সম্ভব ছিলো? আর যার ত্রিভুজ/ ত্রিকোণের সাথে পরিচয় নেই সে কীভাবে নারীর যোনিদেশকে তার সাথে তুলনা করবে? আরেকটি পদে আছে দাবা খেলার বিবরণ :

করুণা পিহাড়ি খেলহুঁ নয়বল
সদগুরু বোহেঁ জিতেল ভববল।।
(চর্যা ১২, কৃষ্ণপাদনাম)

নয়বল অর্থ দাবা। উপরের পদ দুটির সরল বাংলা অর্থ হলো করুণাকে ছক করে দাবা খেলছি। সদগুরুর উপদেশে সংসার ঘুটি জেতা হলো। চর্যাপদের রচয়িতারা যে দাবা খেলার সাথে ভালোই পরিচিত ছিলেন তা এই চর্যা প্রকাশ করছে। আর কে না জানা দাবা খেলার সাথে গণিতের সম্পর্ক আছে তার কথা?
চর্যাপদের রচয়িতাদের যে গণিত সম্পর্কে কিছু ধারণা ছিলো তাতে চর্যাগুলো থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়। কিন্তু গণিতের প্রকাশ তাদের জন্য মুখ্য ছিল না, তাই সরাসরি গণিতের উল্লেখের প্রয়োজন তারা হয়তো অনুভব করেনি নি। চর্যাপদ পরবর্তী যে বাংলা রচনাগুলোতেও সংখ্যার উল্লেখ আছে, যেমন মৈমনসিংহ-গীতিকার দ্বীজ কানাই প্রণীত মহুয়ার পালাতে, যা সংকলিত করেছিলেন দীনেশচন্দ্র সেন :

ছয় মাসের শিশু কন্যা বচ্ছরের হৈল।
পিঞ্জরে রাখিয়া পঙ্খী পালিতে লাগিল।।
এক দুই তিন করি শুল বছর যায়।
খেলার কছরত তারে যতনে শিখায়।।
(মহুয়ার পালা, মৈমনসিংহ-গীতিকা, দ্বীজ কানাই)

এই সংখ্যার উল্লেখ তেমন বিশেষ কিছু নয় কারণ, বাংলাতে আগেই উল্লেখ করেছি যে গণিত শিক্ষার প্রচলন ছিলো, আর বয়স গোণার প্রচলন থাকাটা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু সংখ্যার উল্লেখ বার বার ঘটেছে ও আরো লক্ষ্য করার মতো যে অনেক বোঝাতে লাখ শব্দটার বেশ কয়েকবার ব্যবহার ঘটেছে। সাধু সওদাগর মহুয়ার রূপে মুগ্ধ হয়ে তাকে পাওয়ার জন্য ধনসম্পদের লোভ দেখানোর জন্য বলছে :

হীরামণি যথায় পাইবাম ভালা বান্যা দিয়া।
লক্ষ টাকার হার তোমায় দিবাম গড়াইয়া।।
আর যে কত দিবাম কন্যা নাহি লেখাযোখা
সোনাতে বান্ধাইয়া দিবাম কামরাঙ্গা শাখা।।
উদয়তারা সাড়ী দিবাম লক্ষ টাকা মুল ।
হীরামণি দিয়া তোমার জুইরা দিবাম চুল।।
চন্দ্রহার গড়াইয়া দিবাম নাকে দিবাম নথ।
নুপুরে ঝুনঝুনি দিবান কন্যা শত শত।।
(মহুয়ার পালা, দ্বীজ কানাই)

উপরের পঙক্তিগুলো উল্লেখের মাধ্যমে আমরা দেখছি কীভাবে বহু বা অনেক প্রকাশ করা হয়েছে। যে সংখ্যাগুলো বহুকে প্রকাশ করছে তারা হলো লক্ষ, নাহি লেখাযোখা, শত শত। পালার রচয়িতা আসলে এই সংখ্যাগুলোর পার্থক্য সম্পর্কে কতটুকু অবহিত ছিলেন বা তাদের কি সমার্থক মনে করেছিলেন কি না তা আজ জানার উপায় নেই। কিন্তু মহুয়ার পালার মতো একটি অসামান্য পালা যিনি রচনা করতে পারবেন, ও প্রতিশব্দ ব্যবহারের যে অনুপম দক্ষতা উপরের পঙক্তিগুলোতে দেখা যায়, সে রকম সচেতন একজন রচয়িতা লক্ষ, নাহি লেখাযোখা ও শত শতের পার্থক্য সম্পর্কে অবহিত থাকবেন না, এমনটা ভাবা আমি যৌক্তিক মনে করতে পারি না।
তবু এ প্রসঙ্গে আরেকটি পদের উল্লেখ করবো। পুঁথিটি সোনাভানের ও সত্যপীরের পুঁথি ও রচয়িতা ফকির গরীবুল্লাহ :

লাখে লাখে সৈন্য চলে কাতারে কাতার,
গনিয়া দেখিল মর্দ চল্লিশ হাজার।
(সোনাভান ও সত্যপীরের পুঁথি, ফকির গরীবুল্লাহ)

পঙক্তিটি এখন প্রায়ই কৌতুক হিসাবে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু ফকির গরীবুল্লাহ কি আদৌ লাখ যে হাজারের চেয়ে বেশি তা জানতেন না? এই বিষয়টা যাচাই করার জন্য পুরো পুঁথিটা পড়ার প্রয়োজন ছিলো। উল্লেখ্য যে এরকম আপাত গোঁজামিলের জন্য আরো একটা পঙক্তি অত্যন্ত বিখ্যাত – “ঘোড়ায় চড়িয়া মর্দ হাঁটিয়া চলিল, কিছু দূর গিয়া মর্দ রওনা হইলো।”

লাখ সংখ্যার ব্যবহার লক্ষণীয় উপরের পঙক্তিগুলোতে। কোথাও কোটি শব্দটি ব্যবহার করা হয়নি, যদিও তাও পাওয়া যায় :

ঢাক ঢোল বাজিতেছে ডম্ফ কোটি কোটি।
চারিদিকে উঠিল বীণার ছটফটি।।
++
কটকের পদভারে কাঁপিছে মেদিনী।
রাবণের বাদ্যভাণ্ড সাত অক্ষৌহিণী।।
(কৃত্তিবাসের রামায়ণ)

এক অক্ষৌহিণী বলতে বোঝায় ২ লাখ ১৮ হাজার ৭০০। কিন্তু যে লাখ সংখ্যার ব্যবহার আমাকে বিস্মিত, বিমুগ্ধ করে তা এসেছে লালন ফকিরের কাছ থেকে। লালনের শব্দ নির্বাচন অবাক করার মতোই। “জাত গেলো জাত গেলো বলে এ কী আজব কারখানা” পঙক্তিতে “কারখানা”র মতো অপ্রচলিত শব্দকে অনিবার্য করে তোলা লালনের পক্ষেই যেন সম্ভব। লালন প্রতিটা গানে এরকম বিস্ময়কর শব্দ নির্বাচনের প্রতিভা একের পর এক প্রকাশ করে গেছেন। সেই লালন তার বাড়ি কাছে আরশি নগরের শেষে বলেন “সে আর লালন একখানে রয়, লক্ষ যোজন ফাঁক রে।” লালন যে লাখ সংখ্যার মানে জানতেন তাতে আমার কোন সংশয় নেই ও এ নিয়েও নিশ্চিত যে তিনি সচেতনভাবেই শব্দটা ব্যবহার করেছিলেন। তবু এই লাখ শব্দের ব্যবহার পূর্বে লাখ শব্দের যে ব্যবহারের ধারা, মানে অগণন কোন সংখ্যাকে প্রকাশের যে ধারা, তাকেই হয়তো অনুসরণ করেছে।
লালনের গানে আছে তিন পাগলের মেলার কথা যা আগে উল্লেখ করা হয়েছে। শুধু একটা গান যদি লালন সংখ্যার উল্লেখ করতেন তবে তা উপেক্ষা করা যেত। কিন্তু লালনে সংখ্যা এসেছে বার বার। তিনি অন্য গানে লিখছেন, “আট কুঠুরি নয় দরজা আঁটা।” লক্ষ যোজন ফাঁকের কথা যা আমরা আগে উল্লেখ করেছি তা তো আছেই। আরো আছে :

আঠারো মোকামে একটি রূপের বাতি জ্বলছে সদাই ।
নাহি তেল তার নাহি সলতে আজগুবি হয়েছে উদয়।।

মোকামের মধ্যে মোকাম স্বর্ণশিখর বলি যার নাম।
বাতির লণ্ঠন সেথায় সদাই ত্রিভূবনে কিরণ ধায়।।

দিবানিশি আট প্রহরে এক রূপে চার রূপ ধরে।
বর্ত থাকলে দেখলি না রে ঘুরে ম’লি বেদের বিধায়।।

যে জানে সে বাতির খবর ঘুঁচেছে তার নয়নের ঘোর।
সিরাজ শাঁই কয় লালনরে তোর দৃষ্ট হয় না মনের দ্বিধায়।।
(লালন )

লালন একের পরে এক সংখ্যার উল্লেখ করে গেছেন। চর্যাপদের সংখ্যা উল্লেখের প্রবণতার সাথে মিল সহজেই লক্ষণীয়। লালন কতটুকু লেখাপড়া করেছিলেন, তা জানা না গেলেও, সংখ্যার ব্যবহার থেকে আমি নিশ্চিত যে অঙ্ক শাস্ত্রের পাঠ তার ছিলো ও সংখ্যা নিয়ে তিনি কিছুটা হলেও ভেবেছিলেন। চর্যাপদ থেকে লালন পর্যন্ত বাংলার কবিতার লেখকরা যে গণিত দ্বারা কিছু মাত্রায় প্রভাবিত ছিলেন, তাতে সংশয় এই নমুনাগুলো দেখার পরে আমার নেই।
এই প্রভাবিত হওয়াটাই কিন্তু স্বাভাবিক। বাংলাতে শুভঙ্করী নামে অঙ্ক শিক্ষার প্রচলন তো ছিলোই। গণিতে অত্যন্ত প্রভাবশালী অনেক কাজই হয়েছে মধ্যযুগে। কেরালার বিখ্যাত গণিতবিদ মাধব ১৪ শতকের দিকে কাজ করেছিলেন অসীম ধারা নিয়ে। তাই ইংরেজপূর্ব ভারতবর্ষে আগেই উন্নত গণিতের চর্চা হয়েছিলো। বাংলার কবিদের উপরে তার প্রভাব এসে পড়াটাই স্বাভাবিক ও সে রকমটাই আমরা দেখতে পাচ্ছি মধ্যযুগের লেখাগুলোতে, যা লালন পর্যন্ত প্রসারিত দেখেছি ।

(চলবে)

Share Now শেয়ার করুন