মেহেদী মাহমুদ চৌধুরী >> গণিত ও বাংলা কবিতা (তৃতীয় ও শেষ পর্ব) >> প্রবন্ধ

0
605

গণিত ও বাংলা কবিতা

(তৃতীয় ও শেষ পর্ব)

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে আধুনিক বাংলা সাহিত্য নানাভাবে ঋণী। মজার ব্যাপার হলো, আমি গণিতকে কবিতাতে প্রথম সিরিয়াসভাবে দেখার উদাহরণটাও রবীন্দ্রনাথ থেকেই পেয়েছি। যদিও সেগুলোকে তিনি শিশুতোষ ছড়া হিসাবে উপস্থাপন করেছেন, তবু গণিত নিয়ে তার কিছুটা ভাবনা টের পাওয়া যায় :

ভোলানাথ লিখেছিল,
তিন-চারে নব্বই –
গণিতের মার্কায়
কাটা গেল সর্বই।
তিন চারে বারো হয়,
মাস্টার তারে কয়;
‘লিখেছিনু ঢের বেশি’
এই তার গর্বই।
(খাপছাড়া, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

সাতাশ হলে না কেন একশো সাতাশ—
থলিটি ভরিত, হাড়ে লাগিত বাতাস।
সাতাশ কহিল, ‘তাহে টাকা হত মেলা—
কিন্তু কী করিতে বাপু, বয়সের বেলা।
(কণিকা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

যেটা যা হয়েই থাকে সেটা তো হবেই –
হয় না যা তাই হলো ম্যাজিক তবেই।
নিয়মের বেড়াটাতে ভেঙে গেলে খুঁটি,
জগতের ইস্কুলে তবে পাই ছুটি।
অঙ্কর কেলাসেতে অঙ্কই কষি –
সেথায় সংখ্যাগুলো যদি পড়ে খসি,
বোর্ডের ’পরে যদি হঠাৎ নাম্‌তা
বোকার মতন করে আম্‌তা-আম্‌তা,
দুইয়ে দুইয়ে চার যদি কোনো উচ্ছ্বাসে
একেবারে চ’ড়ে বসে ঊনপঞ্চাশে,
ভুল তবু নির্ভুল ম্যাজিক তো সেই;
পাঁচ-সাতে পঁয়ত্রিশে কোনো মজা নেই।
মিথ্যেটা সত্যই আছে কোনোখানে,
কবিরা শুনেছি তারি রাস্তাটা জানে –
তাদের ম্যাজিকওলা খ্যাপা পদ্যের
দোকানেতে তাই এত জোটে খদ্দের।
(গল্পসল্প, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

গণিতে রেলেটিভিটি প্রমাণের ভাবনায়
দিনরাত একা ব’সে কাটালো সে পাবনায় –
নাম তার চুনিলাল, ডাক নাম ঝোড়্‌কে।
১ গুলো সবই ১ সাদা আর কালো কি,
গণিতের গণনায় এ মতটা ভালো কি।
অবশেষে সাম্যের সামলাবে তোড় কে।
একের বহর কভু বেশি কভু কম হবে,
এক রীতি হিসাবের তবুও কি সম্ভবে।
৭ যদি বাঁশ হয়, ৩ হয় খড়কে,
তবু শুধু ১০ দিয়ে জুড়বে সে জোড়কে।

যোগ যদি করা যায় হিড়িম্বা কুন্তীতে,
সে কি ২ হতে পারে গণিতের গুন্‌তিতে।
যতই না কষে নাও মোচা আর থোড়কে
তার গুণফল নিয়ে আঁক যাবে ভড়কে।
(খাপছাড়া, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর )

বাংলা সাহিত্যের প্রধান কবিদের মধ্যে একমাত্র বিনয় মজুমদার বাদে সরাসরি গণিত নিয়ে এর চেয়ে বেশি পঙক্তি হয়তো আর কেউ লেখেন নি। রবীন্দ্রনাথের লেখার মধ্যে গণিতের একধরণের আলোচনা/ সমালোচনা করার প্রবণতাও আছে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের গণিত ভাবনাতে তার গণিত সম্পর্কিত দুর্বলতাও আমার নজরে পড়ছে, যা-কিছুটা গ্যেটে ও শোপেনহাওয়ার সম্পর্কে আরলন্ড এমশ যে পর্যবেক্ষণ দিয়েছিলেন তার সাথে তুলনীয়। রবীন্দ্রনাথের বড় দুর্বলতা যে তিনি গণিতের ম্যাজিককে বুঝে উঠতে পারেন নি। অথচ সে ম্যাজিক ধরতে পেরেছিলেন বলেই ভিসলাভা শিমব্রোস্কা নাম্বার পাই কবিতাটি লিখতে পেরেছিলেন। গণিতে রিলেটিভিটি কবিতাটাতে রবীন্দ্রনাথ পাবনার কথা উল্লেখ করেছেন, যা বর্তমান পাঠকের কাছে মানসিক রোগের সাথে তুলনীয়, যদিও পাবনার মানসিক হাসপাতাল সে-সময়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো কিনা সে তথ্য আমার জানা নেই।

জীবনানন্দ দাশের কবিতাতে গণিতের সরাসরি উচ্চারণ নেই, কিছুটা ব্যতিক্রম সপ্তক কবিতার ‘জ্যামিতির ভূত বলে আমি তো জানি না।’ কিন্তু জীবনানন্দের কবিতা গঠনগতভাবে অনেক বেশি গাণিতিক বা যাকে বলা যায় জ্যামিতির আকৃতির সঙ্গে তুলনীয়। ‘বনলতা সেন’ কবিতাতে তো অবরোহী প্রকার সুস্পষ্ট, যেখানে প্রতিটি অংশে সাধারণ থেকে বিশেষের দিকে যাত্রা ঘটেছে। অপরদিকে কুড়ি বছর পরে কবিতাতে একধরনের সমান্তরালতা লক্ষণীয় যা আমি পূর্বের আরেকটি প্রবন্ধে উল্লেখ করেছিলাম। সরাসরি গণিতের উচ্চারণ ছাড়াও অনেকেই গণিত দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন বলে জানা যায়, যেমন বলা হয় মার্কিন কবি এমিলি ডিকিনসন সম্পর্কে। সে রকমটা বলা যায় জীবনানন্দ সম্পর্কেও ।

ঠাকুর পরিবারেই জন্ম নিয়েছিলেন দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের বড় ভাই। স্বশিক্ষিত এই ব্যক্তিটি ছিলেন একাধারে কবি, দার্শনিক গণিতবিদ। বাংলাতে কবিতা ও গণিতের আলোচনা করতে গেলে প্রায়ই বিনয় মজুমদারের প্রসঙ্গ এসে যায়। বিনয়ের কবিতাতে গণিতের প্রচুর সরাসরি উল্লেখ আছে। তুলনায় দ্বিজেন্দ্রনাথ তা একেবারেই করেন নি। কিন্তু বিনয়ের গণিতে কোন মৌলিক কাজ আছে কিনা তাতে নিশ্চিত হওয়া যায়নি, সে-তুলনাতে দ্বিজেন্দ্রনাথ একজন পরিপূর্ণ গণিতবিদ। বাংলাতে গণিতের উপরে গ্রন্থ লিখেছেন। ইউক্লিডের জ্যামিতির প্রাথমিক কিছু অনুমানের সমস্যা নিয়ে তিনি লিখেছেন এবং সেগুলো সমাধানের চেষ্টা চালিয়েছেন। তাঁর কবিতাও প্রশংসা পেয়েছিলো। একইসাথে কবি ও গণিতবিদ হিসাবে তিনি ওমর খৈয়ামের সমগোত্রীয়। তবে তিনি গণিত প্রভাবিত কবিতা কেমন লিখেছেন তা নিয়ে আমি কিছুটা হলেও সন্দিহান। কেউ কেউ তার স্বপ্ন-প্রয়াণ গ্রন্থের সাথে গাণিতিক স্থাপত্যের মিল খুঁজে পেয়েছেন। বরং আমার কাছে তাঁর রেখাক্ষর বর্ণমালার কয়েকটা কবিতাতেই গণিতের প্রভাব বেশি লক্ষণীয় বলে মনে হয়েছে :

শবদের অন্তে মাঝে বসে যবে সুখে,
বেরোয় য়-ড়-ঢ় বুলি য-ড-ঢ’র মুখে।
জানো যদি, কেন তবে শূন্য দেও নিচে?
চেনা বামুণের গলে পৈতে কেন মিছে!
নিচের ছত্তর-চারি চেঁচাইয়া পঢ় –
যাবৎ না হয় তাহা কণ্ঠে সড়গড়।
(শূন্যের শূন্যত্ব, রেখাক্ষর বর্ণমালা, শ্রেষ্ঠকবিতা, দ্বিজেন্দ্রনাথ রায়)

অঙ্ক বা গণিত ফাকে ফাকে সুকুমার রায়ের ছড়াতেও উঁকি দিয়ে গেছে। আবোলতাবোলের কাঠবুড়ো কবিতায় দেখা যাচ্ছে উল্লেখ আছে হিজি বিজি অঙ্ক করার। বাংলা কবিতার আরো যাঁরা দিকপাল আছেন তাদের লেখাতেও নিশ্চয়ই ফাকে ফাকে গণিত বা সংখ্যা উঁকি দিয়ে গেছে। কিন্তু সেগুলোর সন্ধান পাইনি বলে উল্লেখ করতে পারছি না।
কিন্তু বাংলা সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ কবিদের মধ্যে যাঁর কবিতার গণিত নিঃসন্দেহে সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে তিনি হলেন বিনয় মজুমদার (১৯৩৪-২০০৬)। ‘বিনয় মজুমদার : জীবন ও সাহিত্য’ শিরোনামে স্নিগ্ধদীপ চক্রবর্তীর একটা পিএইচডি থিসিস আমি সংগ্রহ করতে পেরেছি যা থেকে কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। বিনয় প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি করেছিলেন, যা ঠিক গণিতের ডিগ্রি নয়। গণিতে তিনি কতদূর পর্যন্ত কাজ করেছিলেন, তা গবেষণাটাতে উল্লেখ করা হয়নি। কিন্তু জানা যাচ্ছে যে বিনয় রুশ ভাষা থেকে ‘মানুষ কী করে গুনতে শিখলো’ নামে একটা বই অনুবাদ করেছিলেন । তিনি গণিতের উপরে ‘Interpolation Series’, ‘Geometrical Analysis and Unital Analysis’, এবং ‘Roots of Calculus’ নামে ৩টি ইংরেজি গ্রন্থ লিখেছিলেন, যা এখনও প্রকাশিত হয়নি। গত শতকের সত্তর দশকের সময় থেকে অসুস্থতার জন্য বিনয়ের মানসিক হাসপাতালে যাওয়া আসা শুরু হয়। সে-সময়ে তিনি গণিতের উপরে প্রচুর কাজ করছিলেন ও নতুন কিছু করেছেন বলে দাবি করতেন বলে। তাই বিনয় মজুমদার গণিতের উপরে বেশ কিছু কাজ করলেও সে কাজগুলো দ্বিজেন্দ্রনাথ সমতুল্য মৌলিকত্ব অর্জন করতে পেরেছিলো কিনা তা নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না, যেহেতু সেগুলো নিয়ে এখনো কোন আলোচনার দেখা পাইনি। বিনয় নিজে তা প্রকাশ ও প্রচার করে যেতে পারেন নি, যেহেতু তার আগেই মানসিক রোগ তাকে জেঁকে বসেছিলো, যা তাকে মৃত্যু পর্যন্ত ভুগিয়েছিলো। তবে সে সম্ভাবনাও বাতিল করা যাচ্ছে না। সেদিক থেকে বিনয় দ্বিজেন্দ্রনাথের বা ওমর খৈয়ামের মতো বিরল প্রতিভার অধিকারী যাঁরা কবিতা ও গণিত দুক্ষেত্রেই মৌলিক অবদান রাখতে পেরেছিলেন। নিচে বিনয়ের কয়েকটি কবিতা উদ্ধৃত করছি :

সকল কবিতা আজ নিপুণিকা প্রেমিকার মতো
স্মিত হাসি হেসে আছে চতুরিকা তারকার মতো
এ-সব ভাবনা তবে ফুল নয়, বিকশত কুসুমের মতো নয় এসব ভাবনা,
কুসুমের কোরকের মতোন প্রকৃতপক্ষে কুসুমের কোরকের মতো
এ-সকল কোরকের প্রকৃত স্বরূপগুলি স্ফুট হয়ে পরিস্ফুট হয়ে
কখনো দ্বিতীয় স্তরে – উন্নত, সম্পূর্ণ স্তরে উপস্থিত হয়
তখন কুসুম ফোটে – দেখেছি গণিতশাস্ত্র এই।
গণিতে নির্দিষ্ট সে মাধ্যমিক পরবর্তী ব্যবহারকরণের একটি পদ্ধতি ভিন্ন
অন্য কোনো পদ্ধতিই নেই।
দেখেছি কবিতাগুলো বিকশিত হয়ে বিশুদ্ধ গণিত হয়ে গেছে।
(অধিকন্তু, কবিতা সংখ্যা ১২, বিনয় মজুমদার)

x=0
এবং y=0
বা x=0=y
বা x=y
শূন্য 0 থেকে প্রাণী x ও y সৃষ্টি হলো
এই ভাবে বিশ্ব সৃষ্টি শুরু হয়েছিলো।
(একটি গান, এখন দ্বিতীয় শৈশবে, বিনয় মজুমদার)

এখন এখানে ব’সে কেয়ারির পাশে উঁকি মেরে দেখি
স্থান-কাল অনুসারে এ-সকল পাত্র আসে—পাত্রেরা এসেছে
স্থান-কাল অনুসারে, যেন শব্দ নিয়ে এসে সাজানো হয়েছে
যার-যার জায়গায় ব’সে গেছে সুনিয়মে পঙ্‌ক্তিতে-পঙ্‌ক্তিতে
নিখুঁত জ্যামিতি থেকে উঠে এসে অবশেষে ফুল ফুটে গেছে,
পায়ের নিচের জমি থেকে উঠে, উঠে এসে চোখের নিকটে,
দাঁড়ালেই দেখা যায়, ফুলগুলি ফুটে আছে মুখের নিকটে,
জমি থেকে উঠে এসে ফুলগুলি ফোটে শুধু ঠোঁটের নিকটে।
ফুলের ভিতরে কোনো জ্যামিতি বা জ্যামিতির ইশারাও নেই,
সব ফুল মিলে মিশে একাকার, এলোমেলো হয়ে প’ড়ে আছে।
জ্যামিতি জমিতে ছিলো, পঙ্‌ক্তিতে-পঙ্‌ক্তিতে শুধু জ্যামিতিই ছিলো।
ফুলের ভিতরে ওই জ্যামিতি বা জ্যামিতির ইশারাও নেই,
সব ফুল মিলে মিশে একাকার, এলোমেলো হয়ে প’ড়ে আছে।
(অঘ্রাণের অনুভূতিমালা, বিনয় মজুমদার)

এছাড়া বিনয়ের একটি কাব্যগ্রন্থের নাম ‘আমিই গণিতের শূন্য’। বাংলা সাহিত্যের সেরা কবিদের মধ্যে বিনয়ের মতো গণিতের উল্লেখ আর কারো কবিতাতে ঘটেনি বলে নিশ্চিত হওয়া যায়। শুধুমাত্র উন্নত কবিতা যাঁরা লিখেছেন তাদের মধ্যেই গণিতের এতো উল্লেখ বিরল। কবিতা ও গণিতের মেলবন্ধনের দিক থেকে বিনয় বাংলা সাহিত্যের প্রধান ব্যক্তি ও বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম সেরাদের কাতারে পড়বেন বলে মনে করি। কবিতাতে গণিতের প্রয়োগের পাশে তাকে শিল্প-উত্তীর্ণ করে তোলা দুরূহ ব্যাপার। বিনয় তা যথেষ্ঠ পরিমাণে করতে পেরেছেন, যার কিছু উদাহরণ আমরা উপরে পেশ করেছি।
বাংলা সাহিত্যের প্রধান কবিদের অন্যদের মধ্যেও গণিতের প্রভাব নিশ্চয়ই আছে কিন্তু সে সমস্ত লেখা আমার পক্ষে দেখা সম্ভব হয়নি, যা আগেই উল্লেখ করেছি। মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকার বরাতে শামসুর রহমানের একটা কবিতা পাওয়া গেছে :

কৈশোরে লোকটা জেনেছিলো ক্রমে পাটীগণিতের
উজ্জ্বল যাদব চক্রবর্তী নন তত ভীতিপ্রদ,
যত তাঁর হাত ধ’রে ঘুর সিঁড়ি ভাঙার সময়
মনে হয়। শুধু অভিনিবেশের কেন্দ্রে ঈগলের
চোখ রাখলেই বেশ দীক্ষা মিলে যায়। লোকটার
হিসাবের খাতা তবু প্রমাদের কাঁটার মাদুর।
(সৃজনে উন্মুখর, মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকা, শামসুর রাহমান)

শামসুর রহমানের কবিতাটার মতো করেই পাঠশালাতে গণিত পড়ার অভিজ্ঞতা বাংলা কবিদের একটা প্রিয় বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে। যেমন জয় গোস্বামীর কবিতায় আছে :

বেণীমাধব, বেণীমাধব, তোমার বাড়ি যাবো
বেণীমাধব, তুমি কি আর আমার কথা ভাবো?
বেণীমাধব, মোহনবাঁশি তমাল তরুমূলে
বাজিয়েছিলে, আমি তখন মালতী ইস্কুলে
ডেস্কে বসে অঙ্ক করি, ছোট্ট ক্লাসঘর
বাইরে দিদিমণির পাশে দিদিমণির বর
আমি তখন নবম শ্রেণি, আমি তখন শাড়ি
আলাপ হলো, বেণীমাধব, সুলেখাদের বাড়ি
(মালতীবালা বালিকা বিদ্যালয়, আজ যদি আমাকে জিজ্ঞেস করো, জয় গোস্বামী)

শামসুর রাহমান ও জয় গোস্বামীর কবিতাতে যেমন আছে, তেমন পাঠশালাতে গণিত পড়ার অভিজ্ঞতা আরো কিছু কবিতায় দেখছি। ফেসবুক গ্রুপ ও ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যমে যে কবিতাগুলো সংগ্রহ করেছি তাতে স্কুলের গণিত পড়ার অভিজ্ঞতা বার বার এসেছে। সংগৃহীত কবিতাগুলোর অংশবিশেষ নিচে দেয়া হলো :

নামতা আমার ভাল্লাগে না
(ভাল্লাগে না, আমার নাম মুজিব ইরম আমি একটি কবিতা বলবো, মুজিব ইরম)

বিদ্যাপীঠে কি হলো শেখা?
সমাস, পাটিগণিত, জ্যামিতির ছক?
প্রশ্নবোধক চিহ্নের ভাজ?
মুখোশের আড়ালে থাকা মুখের কারুকাজ!!!
(স্কুল বলতে তোমাকেই বুঝি, জাহানারা পারভীন)

যোগ বিয়োগ গুণ ভাগ
আপাতত এই পর্যন্ত থাক। শোচনীয় তোমার অঙ্ক জ্ঞান
যদিও তোমাতেই শিখি ধারাপাত, করি পাললিক ধ্যান
কৃষ্ণপক্ষ রাতে ঠোঁটে ঝুলিয়ে রেখে পঞ্চমীর চাঁদ
বিভাজনের ঢঙে তুমি কর গুণিতক; সমুদয় প্রপাত
তোমার মুক্তবর্ণ স্তনে উঠে কবিতার ঝড়, অঙ্কে নয়
কলায় তুমি নিলাজ স্বয়ম্বর
(যোগফুল, নক্ষত্রের ঢের নিচে, কাজী দীন মুহম্মদ)

আজ বাবা অঙ্ক শেখাচ্ছিলেন।
বললেন ধরো, ডালে-বসা দুটি পাখি থেকে
শিকারির গুলিতে একটি পাখি মরে গেল,
তবে বেঁচে থাকল কয়টি পাখি?
অঙ্কের বদলে এই মন চলে গেল
বেঁচে থাকা নিঃসঙ্গ সে-পাখিটির দিকে
আর মনে এল তুমি আজ স্কুলেই আসোনি।
(চিঠি, উল্লেখ লিটল ম্যাগ, জাকির জাফরান)

তোমার শরীর জ্যামিতির বই,
নিত্য পড়ি যে আমি,
বিন্দু, বৃত্ত, ত্রিভুজ রয়েছে –
আঁকি তা দিনতামামি।
(তোমার শরীর জ্যামিতির বই, বাংলা কবিতা ওয়েবসাইট, কবীর হুমায়ূন)

ছেলেবেলায় কত অনায়াসেই না কষে ফেলতাম
বানরের তৈলাক্ত বাঁশে ওঠা,ফুটো চৌবাচ্চা
আর স্রোতের প্রতিকুলে মাঝির দাঁড় বাওয়ার অংকগুলো।
কিংবা সাপলুডু খেলায়
তর তর করে মই বেয়ে পৌঁছে যেতাম সাফল্যের ঘরে।
জীবনপথে চলতে গিয়ে দেখি
না হতে পারলাম দক্ষ গণিতবিদ না ঝানু খেলোয়াড়।
তৈলাক্ত বাঁশ বেয়ে বেয়ে
আজ আমি যে বড় ক্লান্ত, বড়ই পরিশ্রান্ত।
যতটুকু না উপরে ওঠি, নেমে যাই যেন তার চেয়েও ঢের বেশী।
(জটিল সমীকরণ, ফয়জুস সালেহীন)

মানুষও যেতে পারে হৃদয়মন্দিরে,
জেনেছি তোমার প্রেমের উপপাদ্যে।
এ মনে ও দেহে, নৈকট্যের দূরে –
রূপদরিয়া, তোমার রূপেই— নাম জপে।”
(প্রেমের উপপাদ্য, রফিক জিবরান)

স্কুল পর্যায়ের সঙ্গে আছে খানিকটা উচ্চতর পর্যায়ে গণিত করার অভিজ্ঞতাও :

তুমি জীবনের অংক মেলাতে চাও?
গণিতের তাবৎ সূত্র প্রয়োগ করে দেখতে পার,
তবে এ অংক মিলবে না
সেটা নিশ্চিত জেনো।
কারো কাছে জীবন ক্যালকুলাস,
গুটিকয় সহজ সূত্র মনে রাখা, ব্যস।
কারো কাছে স্টাটিক্স, কিংবা ডিনামিক্স
(জীবনের অংক, লুৎফুন্নাহার পিকি)

স্বপ্নের সুদে ভালোবাসা ধার নিলাম।
শব্দ, সুর আর ছন্দের বিকিকিনি শেষে
দেউলিয়া হলাম। দেখি
চক্রবৃদ্ধির হ্যান্ডকাফ পরিহিতা কবিতা আমার
দুঃস্বপ্নে বেসামাল। নীরা
সুনিলের ১০১টা নীলপদ্ম হারিয়ে
কায়ক্লেশে ২৯এ এসে গর্ভবতী হল।
এখনো সে যে কোন নারী।
লাভ ক্ষতির হিসাব কষে ভালোবাসা হয় না।
(ভালোবাসার পাটীগণিত, সালাহউদ্দিন আহমেদ)

উপরের নমুনা থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় যে ছাত্রজীবনে অঙ্ক করার প্রভাব বা বিবরণ আরো অনেক কবিতায় পাওয়া যাবে। এই কবিতাগুলোকে আমি গণিত কবিতার কাতারে রাখবো, কারণ গণিতের প্রভাব সুস্পষ্ট। তবে মনে রাখতে হবে যে এগুলোতে গণিতকে নিয়ে যাকে বলে সিরিয়াস কোন বিশ্লেষণ, তা ঘটেনি।

আরো একধরনের কবিতা পাচ্ছি যেখানে শূন্য সংখ্যাটিই প্রধান উপলক্ষ। শূন্য আবিষ্কার গণিতশাস্ত্রের একটা বিরাট ঘটনা, যাতে প্রাচীন ভারতীয় গণিতবিদদের অবদানের কথা সবাই জানেন। আমরা চর্যাপদেও দেখছি শূন্যের বার বার উল্লেখ। কামাল চৌধুরীর একটি কবিতায় দেখছি শূন্যের বন্দনা, যাতে শূন্য সংখ্যার আবিষ্কারকদের স্মরণ করা হয়েছে :

আর্যভট্ট না সুমেরিয় মানুষ – কে প্রথম
মার্বেল খেলতে গিয়ে তোমাকে খুঁজে পেয়েছিল
তা নিয়ে আমার মাথাব্যাথা নেই। আমি
ক্রমাগত বাম থেকে ডানে তোমাকে বসিয়ে
দিয়ে অতিক্রম করে যাচ্ছি শূন্যদশক।
(শূন্যদশক, উড়ে যাওয়া বাতাসের ভাষা, কামাল চৌধুরী)

ফেসবুক গ্রুপ ও ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যমে সংগৃহীত কবিতাগুলোতেও বারবার এসেছে শূন্য :

শূন্য আর এক, এক আর শূন্য—
অবিরাম এই একেশ্বর আর নিরীশ্বরে যেন পালাক্রমিক বিশ্বাস,
মাত্র দুই অঙ্কের এই মাধব-মাধবী জলকেলি, বোঝাপড়া, নর্মলীলা…
স্রেফ এই দ্বিবীজ বিশ্বাসে, এই দ্বিরাঙ্কিক বিন্যাসেই
দ্রুত গড়ে উঠেছে সংকেতবদ্ধ এক
পরাক্রমী ডিজিটাল সিস্টেম, প্রবুদ্ধ অঙ্কতন্ত্র।”
(প্রদক্ষিণ, ঊর্মিকুমার ঘাটে, মাসুদ খান)

একাকী এক শূন্য নিছক
উঠলো হয়ে দশ।
শূন্য যতই শূন্য নিজে হোক
এক এসে তার বসলে বামে
যুগল দুটি চোখ।
(রস, সকল নদীরই আমি কচুরিপানা, সোহাইল মুশফিক)

যতই সে জীবনের দিকে এগোতে থাকে
ততই সে একটু একটু করে শূন্য হয়ে যায়
(আবর্তন, মাসুদুজ্জামান)

শূন্য থেকেই ঘুরছি
পা থেকে খসে পড়ছে জিরো
দিনরাত সাত-পাঁচ ভাবতে গিয়ে
চারশো বিশ খুঁজি
রাত থেকে তেইশ কিলো ঘুম উড়ে যায়
আহা! মানব জন্ম!
(শূন্য, সেঁজুতি জাহান জিনাত)

‘পূর্ণ থেকে পূর্ণ নিলে পূর্ণ বাকি রয়’
উপনিষদ্ কয়,
বলো কী-কী বিধান আছে শূন্যেরো বিষয়?
শূন্য কত প্রকার?
তাদের কতগুলি বিকার?
কতগুলি সাকার আর কতেক নিরাকার?
(শূন্যপুরাণ, সুব্রত আগস্টিন গোমেজ)

এক শূন্য থেকে ঢুকে যাচ্ছি
অসংখ্য শূন্যের মধ্যে
আর, সরে যাচ্ছি ডান দিকে, ক্রমাগত
মানে, অন্ধকারে…
(শূন্য, ফরিদ কবির)

শূন্যতাকে বোঝানোর জন্য একটি গোল চিহ্নের
ব্যবহার হয়ে থাকে
০-এর দিকে দেখুন, মাঝে কী অসম্ভব ফাঁকা
বৃত্তাকার রেখা
এই শূন্যতাকে সীমাবদ্ধ করছে
এইভাবে অনন্তের সঙ্গে শূন্যের পৃথকীকরণ হল
(জিরোতন্ত্র, তিরিশে ফেব্রুয়ারি, অনিন্দ্য রায়)

ঠিক তেমনি এক ক্ষণে…
২টি সরল রেখা x ও y এর মিলন ক্ষণে
গুণাত্মক চিহ্ন নিয়ে
‘ডট’ এর আবির্ভাব
(আদম- হাওয়া, সরল পথের যাত্রী, আনিমদিম জাকারিয়া)

শব্দেই ত্রিকোণ ধরি
ইদানীং ঝিনুকও উপমা হয়ে উঠেছে আমার
স্থান আর কালহীন
কিছু কিছু অগোচর বৃক্ষ
শূন্যতা পান করে নিখুঁত
(অভেদ মৃত্তিকা, মাটিলগ্ন ঘুম, ইকতিজা আহসান)

ভেবেছিলাম, ভাসমান পাখির মতো দূরে সরে যেতে যেতে
জ্যামিতিক বিন্দুতে স্থির হবে আমাদের প্রণয়
(দূরত্ব, ঘুড়িদের পার্থিব আকাশ, আহমেদ বাসার)

জলে স্থলে ~ তন্ত্রে তন্ত্রে ~ পরমাণুর অভ্যন্তর ~ জগতে
ব দ্বীপ ভাসিয়ে
আকাশগঙ্গার জোয়ার ভাটা পৌঁছে দিচ্ছে ~ এই শূন্যতা ~ শূন্য ~ শূন্যে
(শূন্যতার সার্কেল, শূন্যতার সার্কেল, বাদল ধারা)

উপরের উদাহরণগুলো দেখাচ্ছে যে বাংলা কবিতাতে গাণিতিক শূন্য সংখ্যাটি বিপুল এবং বিচিত্রভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। আধুনিক কম্পিউটার, সময়ের বিবেচনা, দুটি জীবনের মিলন, বিশ্ব-ধর্ম-জীবনবোধ, মহাকাল, অসীমত্ব, সব প্রসঙ্গেই এসেছে শূন্য। শূন্যসহ গণিতের বিবিধ প্রসঙ্গ এসেছে আরো কিছু কবিতায় :

যেদিকে প্রশ্ন করি – দেখি, যৌথ খামারের পাশে অনিশ্চিত
ভবঘুরে অভিজ্ঞতা
শূন্যতার পাহারায়
যে প্রশ্ন মৃত্যুহীন – রাতজাগা অপ্রাপ্তির পাপে তাকে আজ
বাড়ি ফিরতে বলি
বাড়িটা কোথায়? বস্তুত, এ প্রশ্নও বাউলতত্ত্ব – কোনো সমাধান নেই,
তবুও ছেঁউড়িয়া থেকে ঝুঁটিবাঁধা নগরবাউলের আখড়ায়
ঘুরে ঘুরে সমীকরণের মাঠে
মহাবয়ানের জটিল গণিত এসে গেছে।”
(কারণ আমরা ফিরছি, পান্থশালার ঘোড়া, কামাল চৌধুরী)

জ্যা-মিতি বুঝিনি ঠাকুর
শাস্ত্রজ্ঞানে গণিত অন্বেষক নয়
ভূ-স্বামী অথচ জমিদারি হলো না
ভারের কারখানায় কলাবিদ্যার দৌরাত্নে
পরিবেশবাদী পাঠশালায় প্রকৃতির ভাঁজে ভাঁজে
শান্তির নিকেতন
‘যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন…’
(পাঠ-প্রতিপাদ্য উত্তরসময়, ডানার করাত, রুদ্র শায়ক)

গণিত বড়ই রহস্যময়
শেখায় দুয়ে দুয়ে চার…
কিন্তু বাস্তবে এ হিসাব কখনো মেলে না
দুয়ে দুয়ে ২, ৩ এমনকি
৫ কিংবা ৭ হয়
৪ কিছুতেই নয়
(গণিত, ফরিদ কবির)

মহাকাশে অভিকর্ষ গতি অভিজ্ঞানে
আর কোনো সত্য নেই আর কোনো বস্তু নেই
আমাদের হাতে, বস্তু শক্তি হবে গতি পেলে পূর্ণমাত্রা
তার আগে সময় আকণ্ঠ গিলে খাবে সব, ভালোবাসা
আপেক্ষিক হবে; সাদা কালো পরস্পর বদলাবে স্থান”
(সৃজন জঙ্গম জলে, নীলভবহ্রদ, তুষার গায়েন)

একখানা দেহ নিয়ে দিনশেষে ফিরে আসি ঘরে
একটা দেহের মাঝে ঘোরেফেরে আটটা মানুষ
একটা মানুষ জানে দশটা বিকল্প পথ আছে
দশটা বিকল্প নিয়ে ছুটে চলে একটা পৃথিবী
একটা পৃথিবী তার বুকে রাখে আটটা প্রহর।
(দেহের গণিত, কবির কল্লোল)

একটি একক রেখায় দুটো ট্রেন চলতে চলতে একসময় একটা বিন্দুতে এসে সংঘর্ষ
হয়, ধ্বংস হয়, এবং কিছু সৃষ্টিও হয়- এ সত্য আমি, এই গতকাল চেতনসত্তায়
দেখেছি প্রথমবারের মতো, অথচ এই আমি এখনো অচেতনে বিশ্বাস করি হিরোশিমা
রূপকে একটি অনর্থ কণা ভাঙচুর হয়ে তেপান্তরের মতো রূপকথা হয় এবং কমলা
যুবতীও তার প্রেমিকের সাথে তীর্থের জলে দ্যাখে X, Y, Z ….
(উপপাদ্য-১, প্লাবন ও অন্তঃবৃক্ষের গান, মঈন চৌধুরী)

বৃষ্টি থেকে এইমাত্র তোমাকে বাঁচালাম
কিন্তু মহাজাগতিক বিষ্ফোরণ থেকে তোমার (দৌহিত্রী)n-কে
বাঁচাবে কে?
তোমার জন্য গাঁথা এই গান তুলে রাখলাম
পাতায়, বনমর্মরের অবিনাশী অক্ষরে মুদ্রিত করে,
যা প্রাণসঞ্চালনের nth ধারা পর্যন্ত ধ্বনিত হবে।”
(মহাপ্রলয়ের আগে, ঘুমপ্রহরের মোমকুহক, কামরুল হাসান)

“স্থানাংক বিচার করতে গেলে মূলবিন্দু ধরে নিতে হয় বিজ্ঞানীরা তা ধরে থাকেন
কবিতার স্বার্থে ধরা যাক মূলবিন্দু নেওয়া হলো এত অক্ষাংশ ও এত দ্রাঘিমাংশের মিলনস্থল
এবং বিজ্ঞানে চতুর্থ যে মাত্রা, অর্থাৎ ‘সময়’কে আওতায় এনে
খ্রিষ্টপূর্ব অমুক অব্দের তত সাল

এক্স, ওয়াই আর জেড অক্ষ থেকে নির্দিষ্ট একক দূরে প্রবহমান ‘আলফা’ মুহূর্ত বরাবর
ধরা যাক একজন রমণী দৌড়ে যাচ্ছিল, পিছনে তার নির্বাচিত পুরুষ
এক ভ্রু উঁচু করে তারপর লাফিয়ে পেরোয় ছোট্ট খাল
(স্থানাংক বিচার, এক টেবিলের অধিবাসী, রাদ আহমেদ )

উপরের উদাহরণগুলো দেখাচ্ছে যে কবিতার মধ্যে গণিতকে নানাভাবে বিশ্লেষিত করার প্রচেষ্টা ও তার সাথে জীবন যাপনের অন্যান্য প্রসঙ্গের মিল ঘটানোর উদাহরণও যথেষ্ট আছে। কবিতার মধ্যে অন্য গণিতবিদ বা কবিদের স্মরণ ঘটেছে, যদিও তা টম পেটসিনিসের হাইপেশিয়া বা স্যামুয়েল কোলরিজের ইউক্লিডের মতো নয় :

গণিতের মধ্যেও কবিতা আছে, হাসপাতালে শুয়ে রামানুজান
যখন বললেন,
১৭২৯ = ১৩ + ১২৩ = ৯৩ + ১০৩
তখন ঐ সমীকরণের মধ্যে কবিতা ছিলো, এবং এখনো আছে।
কিন্তু ক’জন বুঝবে!
(কবিতার ভূগোল, তিস্তা পশর নাফ, ওমর শামস)

রুদ্র শায়কের ‘ফুটেজ প্রেম : বিনয় ও গণিত’ কবিতাতেও ঘটেছে ব্যক্তিকে স্মরণ করা। তাই কবিতার মধ্যে গণিতের মহানায়কদের স্মরণ করার যে উদাহরণ আছে, সেরকম কিছু উদাহরণ আছে বাংলা কবিতাতেও।
সৌম্য চট্টোপাধ্যায়ের একটি দীর্ঘ কবিতাতে অনেক প্রসঙ্গই ঘুরে ফিরে এসেছে, যার প্রথম কয়েকটি লাইন নিচে দেয়া হলো :

প্রবণতা এক্স-ওয়াই নয়, জেড নয় – কখনোই নয়।
সঞ্চারপথ এক্স ওয়াই জেড
এ বি সি অথবা এটু জেড
কিম্বা জেড টু এ
তাহলে,
প্রবণতা এক্সের জন্য সঞ্চারপথ এটুজেড
জ্যাম-জট খুলতে খুলতে আমার চিন্তা চিন্তা খুলতে খুলতে ফিতে বাস্তব।
(প্রবণতা এক্স : সঞ্চারপথ ছাব্বিশ এ্যালফবেট, মানুষের বাচ্চা, সৌম্য চট্টোপাধ্যায়)

সৌম্য চট্টোপাধ্যায়ের কবিতাটাতে গণিত ও বিজ্ঞানের অনেক প্রসঙ্গেই ঘুরে ফিরে এসেছে। সরাসরি প্রচুর সূত্র ব্যবহার করা হয়েছে। গণিতের সূত্র ব্যবহার করে এরকম দীর্ঘ কবিতা আর নজরে পড়েনি। ভিসলায়া শিমব্রোস্কার পাই কবিতার মতো করে বাংলা ভাষাতেও গণিতকে প্রশ্ন করে বা বন্দনা করে কবিতা লেখা হয়েছে :

ভাইসব,
স্বনির্ভর ঋণাত্মক সঙ্খ্যা কি সম্ভব?

ঝুড়িতে ছিল, ধরি, ৫টা কাঁচামিঠা আম
সবক’টাই আমি সাবাড় ক’রে ফেললাম :

৫ – ৫ = ০

ঝুড়িতে রইল না আম-ই,
এইটা তবু বুঝি আমি,
কিন্তু

৫ – ৬ = -১
বুঝি না এইটাই, স্বামিন্!
যে আম ছিলই না, কী ক’রে তারে আমি খাই?
অলীক আম কোথা পাই?
যদিবা সম্ভবে, বাবু মহাশয়,
(ঋণার্ণব, সুব্রত আগস্টিন গোমেজ)

তুমি যা আঠাশ ভাবো তাকে চোদ্দ দুগুনে ভেবেছি
অথবা চার-সাতে, শুনে হেসে ফেলো, “সে তো একই হল
ভেবো না ফলের কথা”, বলি, “গুননীয়কের দায়
থেকে কখনও কি মুক্তি পাব?”— “মনখারাপ কি করে! ছি!
এসব চিন্তায়, জানি, আঠাশ এক্কে ওই একই গুনফলও
ভাঙানির গূঢ়তত্ত্ব চাইলেই কি মুছে ফেলা যায়!
অথচ কী মজা, দেখো, চোদ্দ, সাত, চার, দুই, এক
যোগ করলে আঠাশই তো, মেনে নেবে পাগলছাগলও
আমাদের রিলেশন যেন, খুশি মতো ভাঙা যায়
আবার তা জোড়া লাগে, জোড়গুলি দৃশ্যত জিকজ্যাক
তবু মেলে গায়-গায়”
(তুমি যা আঠাশ ভাবো, কোয়ান পত্রিকাতে প্রকাশিত, অনিন্দ্য রায়)

না
হ্যাঁ
থেকে
বেরিয়ে
শূন্যের দিকে
এগিয়ে আসছে দেখি
আমার কাজ তো তাকে কনকগড়
পার করে আয়নার অপর পিঠে নির্বিঘ্নে নিয়ে যাওয়া
যেন যুক্তিবিম্ব দেখে চিনে নিতে পার প্রতি পদার্থের মতো আমার নেগেটিভ অনিন্দ্য রায়
(একটি ফিবোনাচ্চি কবিতা, অনিন্দ্য রায়)

উপরের কবিতাটির মর্ম বুঝতে হলে জানা দরকার যে ফিবোনাচ্চি সিরিজে দুটি সংখ্যার যোগফল হয় পরের সংখ্যাটি। শুরু হয় ০ এবং ১ দিয়ে। তাই সংখ্যাগুলো হলো :



০+১=১
১+১= ২
১+২=৩
২+৩=৫
৩+৫= ৮

উপরের মতো করে বাকি সংখ্যাগুলোও পাওয়া যাবে। তাই সিরিজটি প্রথম দিকের কয়েকটি সংখ্যা (০, ১,১,২,৩,৫,৮,১৩,২১,৩৪,৫৫,৮৯…)। উপরের ফিবোনাচ্চি কবিতার লাইনগুলির অক্ষরসংখ্যা ফিবোনাচ্চি সিরিজের ক্রম অনুযায়ী প্রথম দিকের কয়েকটি সংখ্যার সমান। আমরা পূর্বের আলোচনাতে দেখেছি গণিতের সমীকরণের মতো করেও কবিতা লেখার আন্দোলন আছে ও তা বেশ সক্রিয়। বাংলা কবিতাতেও তার উদাহরণ পাচ্ছি :

(নীলাব্জ চক্রবর্তী, ‘কোনও চরিত্রই কাল্পনিক নয়’ উপন্যাসের অংশ থেকে নেয়া)

সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে বাংলা কবিতায় গণিত নানাভাবে নানা প্রসঙ্গে এসেছে। উপরে যে কবিতাগুলো দেয়া হয়েছে তার বাইরেও নিশ্চয় অনেক কবিতা আছে। যদিও এ প্রবন্ধে পূর্বে উল্লেখিত কারণবশত তাদের উল্লেখ করা যায়নি, তবুও তাদের প্রতিও কবিতাগুলোর উল্লেখের মাধ্যমে সন্মাননা প্রকাশ করছি।

বাংলা কবিতাতে গণিত বিষয়ে কিছু পর্যবেক্ষণ

উপরের অংশে আমি বেশ কিছু বাংলা কবিতা বা অংশ বিশেষ উল্লেখ করেছি। এর পরিমাণ দেখে নিশ্চয় পাঠক অবাক হয়েছেন। সত্যি যে এই পরিমাণে উদাহরণ পাওয়া যাবে তা আমার কল্পনার বাইরে ছিলো। যখন এ প্রবন্ধ লেখা শুরু করি তখন ভেবেছিলাম যে বাংলা কবিতায় গণিতের প্রভাবের কিছু নমুনা পাওয়া যাবে কিন্তু তার পরিমাণ বেশি হবে না। সেই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। এখন নিশ্চিত হওয়া যায়, যে-উদাহরণগুলো দেয়া হয়েছে তার বাইরেও পাওয়া যাবে আরো অনেক উদাহরণ।
শুধু তাই নয়, যেভাবে গণিত এসেছে তার বৈচিত্র্যও অবাক করার মতো। স্কুলজীবনে অঙ্ক করার কথা আসবে তা তো স্বাভাবিক। কিন্তু তার বাইরেও গণিত এসেছে নানাভাবে। গণিতের সাথে জীবনের ও জীবনবোধের নানা মিলের প্রচেষ্টা লক্ষ করা গেছে কবিতাগুলোতে। জ্যামিতি, স্থানাংক, সমীকরণ, উপপাদ্য, ক্যালকুলাস কি নেই কবিতাগুলোতে? কবিতাতে গণিতের প্রসঙ্গ ছাড়াও বিশ্বসাহিত্যে গণিতকেই কবিতার বিষয়বস্তু করার উদাহরণও বেশ আছে। বাংলা কবিতাও তাতে পিছিয়ে নেই।
আরো লক্ষ করার মতো, বাংলার প্রাচীন ও পুঁথিসাহিত্যে সংখ্যা ব্যবহারের প্রবণতা। প্রাচীন বাংলার কবি – লেখকরা যে গণিত, সংখ্যা ইত্যাদি সম্পর্কে ভালোই জ্ঞান রাখতেন সে বিষয়ে সন্দেহের সুযোগ নেই। এই লেখাটা সেদিক থেকে বাংলা সাহিত্যের সুদীর্ঘ ঐতিহ্যকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে, যেদিকটা আগে সেভাবে আলোচনাতে আসেনি।
বিশ্বসাহিত্যের তুলনাতে বাংলা কবিতা কোনভাবেই গণিত ব্যবহারে পিছিয়ে নেই। আমি কবিতাগুলো উল্লেখের সময় সেগুলোর মান বিবেচনাতে আনিনি। কিন্তু কবিতাগুলো পাঠে আমি মুগ্ধ। এই কবিতাগুলোর মধ্যে কিছু বাছাই কবিতা নিয়ে একটি আলাদা সংকলন প্রকাশ করা যেতে পারে।
কবিতাতে গণিতের উল্লেখ না থাকলেও তাতে গণিতের প্রভাব থাকতে পারে। যেমন আগেই উল্লেখ করেছি যে জীবনানন্দের কবিতার সাথে জ্যামিতিক আকৃতির মিল পাওয়া যায়। এরকম বেশি কবিতা চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি যা করতে পারলে হতো উল্লেখযোগ্য সংযোজন ও এই আলোচনাকে আরো সমৃদ্ধ করতো।

উপসংহার

এ আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অবদান মনে করি যে বাংলা কবিতাতে গণিতের প্রভাবকে বিশ্লেষণের একটা প্রয়াস, যা আগে অনুমান করি ঘটেনি। আমার প্রত্যাশা যে এ আলোচনাটা বাংলা কবিতার উপরে গণিতের প্রভাবের উপেক্ষিত দিকের প্রতি যথাযথ আলোকপাত করতে সক্ষম হয়েছে। আরো প্রত্যাশা যে ভবিষ্যতে অন্য কেউ এ নিয়ে আরো সমৃদ্ধ আলোচনা করতে সক্ষম হবেন।
সে ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে কয়েকটি বিষয়ে সূত্র ধরিয়ে দেবার চেষ্টা করবো :
১. প্রাচীন বাংলা কবিতা ও পুঁথিতে সংখ্যার আধিক্য আমাকে বিস্মিত করেছে। এ বিষয়ে একটি একক প্রবন্ধ হতে পারে।
২. দ্বিজেন্দ্রনাথ রায় ও বিনয় মজুমদারের কবি ও গণিত পরিচিতি নিয়ে আলাদা আলোচনার প্রয়োজন, যে-আলোচনা তাঁদের কবিতা ও গণিত উভয়ের উপরেই আলোকপাত করবে।
৩. সাম্প্রতিক সময়ে লিখেছেন, এরকম অনেকের কবিতাতে স্কুলজীবনে অঙ্ক করার অভিজ্ঞতা এসেছে। এর সাথে বিশ্বসাহিত্যের একটা তুলনামূলক আলোচনা যেতে পারে।
৪. গণিত প্রভাবিত বাংলা কবিতা নিয়ে একটি কাব্য সংকলন হওয়া প্রয়োজন। এতে পাঠক গণিত প্রভাবিত বাংলা কবিতার সম্পর্কে যথাযথভাবে পরিচিত হতে পারবেন।

উপরে যে-বিষয়গুলো উল্লেখ করেছি তার বাইরেও নিশ্চয় পাঠক আরো কিছু প্রসঙ্গ খুঁজে পাবেন। আমি মনে করি, যে ধরনের লেখাগুলোকে গ্রহণযোগ্য করে তোলার জন্য একটু সময় নিয়ে একাডেমিক ধাঁচের কাজ করার চেষ্টা করাই যথাযথ হবে। আমি এ প্রবন্ধে তার একটি প্রচেষ্টা চালিয়েছি এবং কতটুকু সফল হয়েছি তা বিবেচনার ভার পাঠকেরই।

লেখাটা তৈরিতে যে তথ্যসুত্রগুলো ব্যবহার করা হয়েছে তার একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা নিচে দেয়া হলো :

1. Tianxin, C., 2011. Mathematicians and poets. Notices AMS, 58(4), pp.590-592. লিঙ্কঃhttps://www.ams.org/notices/201104/rtx110400590p.pdf
2. Tomalin, M., 2009. William Rowan Hamilton and the Poetry of Science, Romanticism and Victorianism on the Net. 54(9)।লিঙ্ক : https://www.erudit.org/en/journals/ravon/2009-n54-ravon3401/038763ar/
3. Loveday, K. and Donelan, P. 2016. Barbilian-Barbu—A Case Study in Mathematico-poetic Translation. Signata; Annals of Semiotics। লিঙ্ক : https://journals.openedition.org/signata/1238?lang=en
4. Taylor J., 2018. Vulnerable Paul Valéry Between Poetry and Mathematics. The Antioch Review76(4)।লিঙ্ক : https://www.jstor.org/stable/10.7723/antiochreview.76.4.0734?seq=1
5. Emch, A.,1914 “Goethe and Schopenhauer on Mathematics.,” The Open Court: Vol. 1914 :Iss. 9 , Article 2 । লিঙ্কঃ https://opensiuc.lib.siu.edu/ocj/vol1914/iss9/2
6. Glaz, S., 2011. Poetry inspired by mathematics: a brief journey through history. Journal of Mathematics and Arts . 5(4)।লিঙ্ক: https://www.tandfonline.com/doi/abs/10.1080/17513472.2011.599019?journalCode=tmaa20
7. ‘দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর : গণিতের উপেক্ষিত প্রতিভা’, দীপঙ্কর চট্টোপাধ্যায়, মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকা, গণিত সংখ্যা।
8. কামাল চৌধুরীর সাক্ষাৎকারটি পাওয়া যাবে : https://old.dhakatimes24.com/2016/02/03/100806
9. কবিতা ও গণিত, মেহেদী মাহমুদ চৌধুরী, সৃজন অনলাইন ম্যাগাজিন। প্রকাশনা ২০১৯, মূল রচনা অক্টোবর ২০১৮। লিঙ্ক : http://srijonbd.com/2019/09/13/%E0%A6%95%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%A4%E0%A6%BE-%E0%A6%93-%E0%A6%97%E0%A6%A3%E0%A6%BF%E0%A6%A4/
10. গণিত ভাবনা, মেহেদী মাহমুদ চৌধুরী, সমাবেশ প্রকাশনী, ২০২০। রচনা কাল জুন ২০১৮, জুলাই ২০১৯।
11. চর্যাগীতি পরিক্রমা, ড. নির্মল সেন, দেজ পাবলিশিং ১৯৯৭।
মহুয়ার পালা, মৈমনসিংহ-গীতিকা, প্রথম খণ্ড, দীনেশচন্দ্র সেন সম্পাদিত, কলকাতা ইউনিভার্সিটি প্রেস, ১৯৫৮।
12. বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্রের ইতিহাস, নাজমীন মর্তুজা ও সাইমন জাকারিয়া, বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন, ২০১৩।
13. অখণ্ড লালনসঙ্গীত, পৃষ্ঠা ৪৪৩, আবদেল মাননান সম্পাদিত, রোদেলা প্রকাশনী, ২০০৯।
14. এই লিঙ্কগুলোতে কিছু তথ্য ও গণিত প্রভাবিত কবিতার নমুনা পাওয়া যাবে
https://poets.org/text/brief-guide-oulipo
https://mathematicalpoetry.blogspot.com/?m=0

Euclid and Coleridge: A Poem


https://www.maa.org/sites/default/files/images/upload_library/4/vol6/Growney/MathPoetry.html#Structure

রচনাকাল : ফেব্রুয়ারি, এপ্রিল ২০২১

Share Now শেয়ার করুন