মেহেদী মাহমুদ চৌধুরী >> গণিত ও বাংলা কবিতা >> প্রবন্ধ

0
686

মেহেদী মাহমুদ চৌধুরী >> গণিত ও বাংলা কবিতা

ভূমিকা

বাংলা কবিতায় গণিত নিয়ে বিস্তৃতভাবে লেখা একটা দুরূহ কাজ। তবু নানা সীমাবদ্ধতা নিয়েই এই লেখাটার সূত্রপাত। প্রধান সীমাবদ্ধতা হলো প্রবাসে থাকার কারণে কবি-লেখকদের সাথে যোগাযোগের মাধ্যমে যথেষ্ট পরিমাণ তথ্য উপাত্ত সংগ্রহের সমস্যা। ইন্টারনেট থেকে কিছু পাওয়া গেলেও বেশ কিছু পুরানো কাজ অনলাইনে পাওয়া যায় না। তাই সেই কাজগুলোর হার্ডকপি সংগ্রহ করে সেখানে কী আছে তা জানা সম্ভব হয়নি। এই লেখাটার তাই অনেক সীমাবদ্ধতা আছে। মোটের উপরে বাংলা কবিতায় গণিত নিয়ে একটা পূর্ণদৈর্ঘ্যের গবেষণা হতে পারে, যা এই লেখাটা কোনভাবেই নয়। আশা করি অদূর ভবিষ্যতেই কেউ তা সম্পন্ন করবেন। সে-রকম একটা গবেষণার প্রত্যাশায় ও লেখকের অনেক সীমাবদ্ধতা মেনে নিয়েই এই প্রবন্ধের সূত্রপাত।
যদিও এটা ঠিক কোনো গবেষণা প্রবন্ধ নয়, তবু কিছুটা গবেষণার ফ্লেভার রাখা এ-ধরনের লেখার জন্য জরুরি মনে করি। এতে আলোচনার গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে এবং ভবিষ্যৎ কাজের পথ সুগম হয়। তাই গবেষণা প্রবন্ধের মতোই এই প্রবন্ধের আলোচনার গণ্ডিটাকে আগে ঠিক করবো। তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি সম্পর্কে যথাযথ আলোকপাত করা হবে। এ-নিয়ে পূর্বে কীরকম আলোচনা হয়েছে, তার একটা বিবরণ দেবার চেষ্টা করা হবে, যদিও প্রবাসে থাকা এবং অনলাইনে না পাওয়ার কারণে তাতে যথেষ্ট সীমাবদ্ধতা আছে, যা আগেই উল্লেখ করেছি।
প্রবন্ধের গণ্ডি সম্পর্কে কিছুটা আলোচনার মাধ্যমে লেখাটার সূচনা করছি। বাংলা কবিতা বলতে কী বোঝাচ্ছি? বোঝাচ্ছি সবটাই। বাংলা সাহিত্যের প্রথম লিখিত নিদর্শন চর্যাপদ। আজকাল শোনা যায় যে চর্যাপদের ভাষা উড়িষ্যারও হতে পারে। এই জটিল আলোচনা ভাষা-বিশারদদের জন্যই তুলে রাখবো। তাই চর্যাপদ থেকে এখন পর্যন্ত যা আছে, সবই এই লেখার গণ্ডিতে থাকবে। এর পাশাপাশি লোকগণিত, মানে মানুষের মুখে মুখে কৃষিকাজ ও ব্যবসা-বাণিজ্যে গণনা করার জন্য যে-গণিতের প্রচলন আছে, সে-সম্পর্কেও আলোচনা করার হবে।
লেখাটা যেহেতু গণিত নিয়ে, তাই গণিত বলতে কী বোঝায় বা গণিতের গণ্ডিও কিছুটা নির্ধারণ করে নেয়া দরকার। এই গণ্ডিতেও আসবে সবটুকুই। যাতে থাকবে শিশুকালের পাঠ্য নামতা, মুখে-মুখে হিসাব করা থেকে উচ্চতর গণিতের নানান বিষয়। প্রবন্ধটাতে কবিতার মান মুখ্য না হয়ে গণিতের কেমন প্রকাশ ঘটেছে, সে-বিষয়েই বেশি লক্ষ করা হবে।
লেখাটার বিষয় যেহেতু বাংলা কবিতাতে গণিত, তাই বাংলা ভাষায় যেখানে যারা আছেন তাদের সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে। তবু সাম্প্রতিক কবিতাতে এসে কিছুটা বিভক্তি ও সীমাবদ্ধতা আছে। প্রবাসী একজন বাংলাদেশীর পক্ষে সমকালের বাংলাদেশের কবিতা সম্পর্কে খোঁজ-খবর রাখাটাই দুরূহ, সেখানে ভারতীয় বাংলা কবিতা, যার অংশ হচ্ছে পশ্চিম বাংলা ও আসামের বাংলা কবিতা, সম্পর্কে অনুসন্ধান প্রায় অসম্ভব। তবু ফেসবুকের সুবাদে কয়েকজন ভারতীয় বাংলাভাষী কবির সাথে যোগাযোগ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছি। তাদের এই লেখাতে যুক্ত করা হয়েছে। যদিও এর বাইরে অনেকেই আছেন বলে নিশ্চিত। এছাড়া সম্প্রতি বাংলাভাষীরা সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছেন, যাদের অনেকেই বাদ পড়ে গেছেন বলে অনুমান। এদিক থেকে লেখাটা তৈরিতে ফেসবুকের গুরুত্ব উল্লেখ করা দরকার। ফেসবুকে ‘বাংলা কবিতায় গণিত’ শিরোনামে একটি গ্রুপ খুলে আমি বেশ কিছু কবিতা ও তথ্য সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছি। এছাড়া কয়েকজনের সাথে সরাসরি ফেসবুক মেসেঞ্জারে কথা বলার মাধ্যমে সংগ্রহ করেছি তাদের লেখা। ভেবে দেখুন যে বাংলাদেশী একজন যুক্তরাজ্য থেকে পশ্চিম বাংলায় অবস্থানরত সম্পূর্ণ অপরিচিত একজনের সাথে তার আশির দশকের কিছু লেখার বিষয়ে খোঁজ করছেন। এরকমটা দশ বছর আগেও অসম্ভব ছিলো। লেখাটাতে ব্যবহৃত সব তথ্য ও ইন্টারনেটের লিঙ্কগুলো জানুয়ারি ২০২১ থেকে সংগৃহীত হয়েছে যদিও কয়েকটি সূত্র সম্পর্কে আমার আগে থেকেই জানা ছিলো।
ফেসবুকের কল্যাণে এরকম আরো কয়েকজনের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করে তথ্য ও লেখা সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকজন আমার বন্ধু তালিকাতে আগে থেকেই ছিলেন। বাকিদেরকে যুক্ত করেছি ফেসবুক গ্রুপটা শুরু করার পরে। কেউ কেউ আমাকে প্রবন্ধ, গ্রন্থ, লিটল ম্যাগাজিনের কপি ছবি তুলে ফেসবুক মেসেঞ্জার ও ই-মেইলের মাধ্যমে পাঠিয়েছেন। তাদের মধ্যে আছেন সাইমন জাকারিয়া, চিরঞ্জয় চক্রবর্তী, সফিক ইসলাম, ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী, আইরিন জামান ও মতিন রায়হান। ফেসবুক গ্রুপে তথ্য শেয়ার করেছেন অনিন্দ্য রায়, নীলাব্জ চক্রবর্তী, রুদ্র শায়ক, সুশান্ত বর্মন, মাসুদ খান, কামরুল হাসান ও জুননু রাইন। এদের সহায়তা ছাড়া লেখাটাতে ব্যবহৃত অনেক তথ্য ও কবিতার সন্ধান অসম্ভব ছিলো। এছাড়া অন্য সদস্যরাও নানাভাবে আমাকে উৎসাহিত করেছেন এবং তাদের আমি কৃতজ্ঞতা জানাই।
তথ্য ও কবিতা সংগ্রহের জন্য আমি ব্যক্তিগতভাবে অনেকের সাথে যোগাযোগ করেছি। তাদেরকে ফেসবুক গ্রুপে যুক্ত হবার ইনভাইট করা হয়েছিলো এবং ব্যক্তিগতভাবে মেসেজ দিয়ে লেখা ও তথ্যের জন্য অনুরোধ করেছি। এক্ষেত্রে অনেকেই সাড়া দিয়েছিলেন আবার দুঃখজনকভাবে অনেকেই সাড়া দেননি। যারা তথ্য ও কবিতা শেয়ার করেননি, তাদের গণিত বিষয়ে কাজ ও কবিতা থাকতে পারে, কিন্তু এই প্রবন্ধে তাদের অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়নি।
আলোচনাটাকে কয়েকটা পর্বে ভাগ করছি। প্রথমেই আছে পূর্বে বাংলাতে কবিতা ও গণিত নিয়ে কেমন লেখালিখি হয়েছে তার একটা বিবরণ। পরের অংশে তার সঙ্গে তুলনা করবো বাংলা কবিতার বাইরে, যাকে বিশ্বসাহিত্য নামে অভিহিত করবো, সেখানে কবিতা ও গণিত নিয়ে কেমন লেখালিখি হয়েছে। সেখানে উদাহরণ স্বরূপ কিছু কবিতার বিশ্লেষণ করা হবে। পরের অংশে আলোচনা করা হবে বাংলা কবিতায় গণিত নিয়ে, আমার পর্যবেক্ষণ ও বাংলা কবিতায় গণিতের ব্যবহার নিয়ে কিছু মূল্যায়ন থাকবে, এবং সবশেষে উপসংহারে থাকবে এরকম আরো কিছু প্রবন্ধ রচনার প্রতি দিকনির্দেশনা।

বাংলাতে কবিতা ও গণিতের সম্পর্ক নিয়ে গদ্য
কবিতা ও গণিত নিয়ে পূর্বে বাংলাতে কেমন লেখা হয়েছে তার একটা বিবরণ এ-পর্বে দেবার চেষ্টা করবো। এ নিয়ে দুঃখজনকভাবে তথ্য সংগ্রহ করা অত্যন্ত কঠিন। ইন্টারনেট ও ফেসবুকের সুবাদে কিছু তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে যা পূর্বে উল্লেখ করেছি। এর মধ্যে প্রথমেই উল্লেখ করতে হবে কমলকুমার মজুমদারের একটি প্রকাশনার কথা। আনন্দময় ঘোষের সাথে যৌথ সম্পাদনায় তিনি বের করেছিলেন ‘অঙ্ক ভাবনা’ নামে একটি পত্রিকা। জানুয়ারি ১৯৬৫ ও এপ্রিল-জুন ১৯৬৫ – এ দুটি সংখ্যা বের হবার পরে পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়। অঙ্ক ভাবনা নিয়ে পরিচিত কয়েকজনের কাছে বেশ শুনেছিলাম তাই বেশ খানিকটা অনুসন্ধান করে অঙ্ক ভাবনার কপি দুটি সংগ্রহ করেছি। সংখ্যা দুটি পড়ে নিশ্চয়তার সঙ্গে বলতে পারি যে অঙ্ক ভাবনার বিষয় অঙ্ক। অঙ্কের সাথে সাহিত্যের সম্পর্কের কোনো আলোচনা হয়নি। তাই কমলকুমার মজুমদার গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যিক ও অঙ্ক ভাবনা লিটল ম্যাগাজিনের জগতে একটা ব্যতিক্রমী উদ্যোগ হলেও আমাদের প্রবন্ধের জন্য প্রাসঙ্গিক নয়।
ইন্টারনেটের কয়েকটি সূত্র থেকে জানা গিয়েছিলো যে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন ছাত্র মিলে আশির দশকে ‘ছয়’ নামের একটি সাহিত্য পত্রিকা বের করতেন। কয়েকটি সংখ্যা বের হবার পরে পত্রিকাটির প্রকাশ বন্ধ হয়ে যায়। এই পত্রিকাটি গাণিতিক সাহিত্য বা সাহিত্যে গণিত নামে একটা ধারা চালুর চেষ্টা করেছিল। গোষ্ঠীটির অন্যতম একজন চিরঞ্জয় চক্রবর্তী, যিনি এখন পশ্চিম বাংলাতে থাকেন, তার সাথে যোগাযোগ স্থাপন করে পত্রিকাটির চারটি সংখ্যা পর্যন্ত সংগ্রহ করেছি। পত্রিকাতে মূলত গল্প প্রকাশ করা হয়েছিল। কয়েকটি প্রবন্ধ ছিলো গণিত ও সাহিত্য বিষয়ে। এছাড়া আইন্সটাইনের তিনটি কবিতার অনুবাদও প্রকাশিত হয়েছিলো। তাই ‘ছয়’ সত্যিকার অর্থেই একটি গাণিতিক সাহিত্য বিষয়ক পত্রিকা। কিন্তু বর্তমান প্রবন্ধের তুলনীয় কোনো প্রবন্ধ সেখানে প্রকাশিত হয়নি।
নব্বইয়ের দশকের প্রকাশনা জগতের একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম ‘মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকা’। সম্পাদক মীজানুর রহমান নিজের নামেই এই পত্রিকাটি বের করতেন। পত্রিকাটার গণিত সংখ্যার ‘পূর্ব খণ্ড’ ও ‘উত্তর খণ্ড’ শিরোনামে দুইটি সংখ্যা বের হয়েছিলো। এর কিছু অংশ আমি সফিক রহমানের সৌজন্যে সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছি। এর ‘পূর্ব খণ্ড’তে ওমর খৈয়ামের উপরে এম আকবর আলীর একটা আলোচনা ছিলো। উল্লেখ্য যে ওমর খৈয়াম একাধারে একজন কবি ও গণিতবিদ ছিলেন এবং তার ওপর বাংলাতে আরো অনেকগুলো আলোচনা পাওয়া যায়। ‘পূর্ব খণ্ডে’ একটি সাহিত্যগুণ সম্পন্ন লেখা ছিলো ফরহাদ মজহারের ‘তিমির জন্য লজিক বিদ্যা’, যা পরবর্তীকালে একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ হিসাবে প্রকাশিত হয়। লেখাটি সাহিত্যগুণ সম্পন্ন হলেও তাতে গণিত ও সাহিত্য সম্পর্কে তুলনামূলক আলোচনা ঘটেনি। এরকম আরেকটি সাহিত্যগুণ সম্পন্ন গ্রন্থ হলো সাধন দাশগুপ্তের ‘ভাষাগণিত’, যা বিশ্বভারতী থেকে প্রকাশিত হয়েছিলো, যাতে গণিতের ভাষা তৈরিতে আলোকপাত করা হলেও গণিত ও সাহিত্যের মেলবন্ধনের প্রয়াস সেখানে নেয়া হয়নি।
মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকার গণিত সংখ্যার ‘উত্তর খণ্ড’ অনেক বেশি সাহিত্যকেন্দ্রিক। ‘উত্তর খণ্ডে’র একটি উল্লেখযোগ্য লেখা দীপঙ্কর চট্টোপাধ্যায়ের ‘দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর : গণিতের উপেক্ষিত প্রতিভা’ যা ব্যবহার করে আমি পরে খানিকটা আলোচনা করবো। দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর একাধারে ছিলেন একজন উচ্চমানের গণিতবিদ ও কবি, যা বাংলা কবিতার ইতিহাসে বিরল। প্রবন্ধটাতে তার কবিতা ও গণিত দুয়ের উপরেই আলোকপাত করা হয়েছিলো, যদিও গণিতই মূল উপজীব্য।
‘উত্তর খণ্ডে’র আরেকটি উল্লেখযোগ্য রচনা সুকুমার সেন ও আশরাফ সিদ্দিকীর ‘প্রাচীন ও লোকসাহিত্যে গণিত’। এছাড়া খণ্ডটিতে শামসুর রাহমানসহ অন্যদের কয়েকটি কবিতা প্রকাশিত হয়েছিলো। এ-দুটি বিষয় আমরা পরবর্তী সময়ে আবার উল্লেখ করবো।
১৯৯০-এর দশকে বাংলা একাডেমির তরুণ লেখক প্রকল্পের অধীনে বেশ কিছু নবীন লেখকের বই প্রকাশিত হয়েছিলো। সেই বইগুলোর মধ্যে কবিতা-গল্প প্রাধান্য পেলেও, আইরিন জামান ১৯৯৭ সালে প্রকাশিত ‘জীবনানন্দের কাব্যভাষা : কবিতার গদ্যভাষ্য ও অব্যয়ের ব্যবহার’ নামে একটি ব্যতিক্রমধর্মী বই লিখে সাড়া ফেলেছিলেন। বইটাতে জীবনানন্দ দাশের বনলতা সেন কাব্যগ্রন্থকে পরিসংখ্যানগতভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছিলো। গণিত বা পরিসংখ্যানের সাহায্যে কবিতাকে বিশ্লেষণের উদাহরণ বিশ্বসাহিত্যে থাকলেও বাংলাতে এরকম রচনা আর হয়েছে বলে দেখিনি।
কয়েকবছর আগে মাসুদ খান ‘কবিতা ও গণিতের মধ্যকার রংধনু সেতু’ শিরোনামে একটি ছোট্ট ফেসবুক পোস্ট দিয়েছিলেন। ইমানুয়েল কান্টের ধারণা ব্যবহার করে কবিতার গণিতে উত্তরণ সম্পর্কে সেখানে সংক্ষেপে কিছু আলোকপাত করা হয়েছিলো। আজফার হোসেনের ‘ম্যাথম্যাটিকস অ্যান্ড পোয়েট্রি : সাম ইম্প্রেশনস’ শিরোনামে একটা ইংরেজি প্রবন্ধ কিছুদিন আগে প্রকাশিত হয়ে সাড়া ফেলছিলো। উল্লেখ্য যে লেখাটাতে বাংলা কবিতা বিষয়ে আলোকপাত করা হয়নি। অনিন্দ্য রায়ের বেশ কিছু ফেসবুক পোস্টে কবিতা ও গণিত বিষয়ক আলোচনা এসেছে। এছাড়া তিনি গণিতিক কবিতার একটি অনুবাদ গ্রন্থও প্রকাশ করেছেন। কামাল চৌধুরীর একটি সাক্ষাৎকারেও গণিত ও কবিতার সম্পর্কের কথা এসেছিলো, যেখানে তিনি বিষয়ে কবিতাকে গাণিতিক ও অনুভবে মনোজাগতিক বলেছিলেন। কবিতা ও গণিত সম্পর্কে মলয় রায়চৌধুরী ও স্বপন বিশ্বাসের দুটি লেখা অনলাইনে পাওয়া গেছে। মলয় রায়চৌধুরী তার লেখাটাতে বিনয় মজুমদার ও তার কবিতায গণিত নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেছিলেন।
উপরে যে লেখাগুলোর উল্লেখ করলাম তার বাইরেও নিশ্চয়ই কিছু রচনা পাওয়া যাবে। তবু তা সংখ্যা বেশি নয় বলেই অনুমান। তাই এ-প্রসঙ্গে আমার নিজের কিছু লেখার উল্লেখ প্রয়োজন মনে করছি। ২০১৮ সালের অক্টোবরে ‘কবিতা ও গণিত’ শিরোনামে একটা প্রবন্ধ লিখেছিলাম, যাতে কবিতা ও গণিতের মিল ও সম্পর্ক নিয়ে মোটামুটি দীর্ঘ আলোচনা করা হয়েছিলো। লেখাটা পরবর্তীকালে ‘সৃজন’ নামক একটি অনলাইন প্লাটফর্মে প্রকাশিত হয়। লেখাটা কবিতা ও গণিত নিয়ে হলেও বাংলা কবিতার উপরে আলোচনা বেশি হয়নি। বিশ্বসাহিত্যেও কবিতা ও গণিত নিয়েও বেশী আলোচনা হয়নি। বর্তমান প্রবন্ধটা সে অর্থে পূর্বের সেই প্রবন্ধের পরিপূরক। অনিন্দ্য রায়ের ফেসবুকের লেখাগুলোতে অবশ্য বিশ্বসাহিত্যে কবিতা ও গণিত নিয়ে বেশ আলোচনা পাওয়া যাবে।
এ পর্যায়ে এসে আমার ‘গণিত ভাবনা’ গ্রন্থের নামোল্লেখও যথাযথ। গণিত ভাবনা শিরোনামে আমি ২০১৮ সালের জুন মাস থেকে ফেসবুকে পোস্ট দেয়া শুরু করি। সেখানে বেশ কিছু পোস্টের উপজীব্য ছিলো কবিতা ও গণিত নিয়ে আলোচনা, যার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য রবীন্দ্রনাথের ‘ভোলানাথ লিখেছিলো’ হিসাবে পরিচিত শিশুতোষ কবিতার নতুন গাণিতিক ব্যাখ্যা। একটি লেখাতে নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর কবিতা একটি মোমবাতির সাথে তুলনা সাপেক্ষে আলোচিত হয়েছিলো ওমর খৈয়ামের জীবন ও কর্ম। ছিলো জীবনানন্দের ‘সপ্তক’ কবিতাকে ইউক্লিডের জ্যামিতির সাথে মিলিয়ে নতুনতর পাঠ। ফেসবুকের লেখা ও আরো কিছু লেখা মিলিয়ে গণিত ভাবনা শিরোনামে পরে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে বইমেলাতে গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়।
এর বাইরে আর কোনো লেখার সন্ধান আমি পাইনি। বাংলা প্রবন্ধ-সাহিত্যে কবিতা ও গণিতের সম্পর্ক তাই আজ পর্যন্ত উপেক্ষিতই হয়েছে বলে মনে করি। তুলনায় বিশ্বসাহিত্যে কবিতা ও গণিত অনেক বেশি আলোচিত, যার প্রতি নিচে কিছুটা আলোকপাত করবো।

বিশ্বসাহিত্যে কবিতা ও গণিত

কবিতা ও গণিত নিয়ে বিশ্বসাহিত্যে অনেক লেখালিখি হয়েছে, যার কিছুটা আমি পূর্বে রচিত ‘কবিতা ও গণিত’ প্রবন্ধে তুলে ধরেছিলাম। আমার সেই লেখাটার অন্যতম অনুপ্রেরণা ছিলো কাই তিয়ানশিন (Cai Tianxin ) রচিত ‘ম্যাথম্যাটিশিয়ান অ্যান্ড পোয়েটস’ নামক একটি প্রবন্ধ। সেখানে কবি ও গণিতবিদদের নানা মিল ও অমিল সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছিলো।
এরকম কবিতা ও গণিতের মিল-অমিলের অনুসন্ধান অন্যান্য প্রবন্ধেও পাওয়া যায়। তাছাড়াও আছে বিশেষ ব্যক্তিকে অবলম্বন করে রচিত দীর্ঘ প্রবন্ধ। যেমন “ William Rowan Hamilton and the Poetry of Science” শিরোনামে একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ আছে যা প্রকাশিত হয়েছিলো “Romanticism and Victorianism on the Net” নামক একটি জার্নালে। প্রবন্ধটিতে ইংরেজ কবি ও গণিতবিদ উইলিয়াম রোয়ান হ্যামিল্টন সম্পর্কে আলোচনা হয়েছিলো। এরকম আরেকটি প্রবন্ধ আছে ইওন বারবু (Ion Barbu) কে নিয়ে যিনিও ছিলেন একাধারে একজন কবি ও গণিতবিদ। ওই প্রবন্ধে তার কয়েকটি কবিতার মূল রোমানিয়ান ও ইংরেজি অনুবাদ দেয়া আছে, যা থেকে আমি একটি কবিতার অনুবাদ করেছি। ফরাসী পল ভেলেরি (Paul Valéry) সম্পর্কেও দীর্ঘ লেখা পাওয়া যায়। তার কবি ও গণিত সত্তার টানাপড়েন নিয়ে একটি গবেষণা প্রবন্ধও নজরে এসেছে ।
কবিতা ও গণিত সম্পর্ক নিয়ে প্রবন্ধ লিখে গিয়েছেন আরো অনেকেই । জার্মান কবি গোয়েটে গণিত সম্পর্কে লিখেছিলেন। গোয়েটের গণিতের আলোচনাকে আবার বিশ্লেষণ করে প্রবন্ধ লিখেছিলেন আরনল্ড এমশ। ইন্টারনেটে জুড়ে এরকম প্রচুর লেখা পাওয়া যাবে। যারা গণিত ও কবিতার নানা নমুনা সম্পর্কে জানতে চান তাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হতে পারে স্যারা গ্লেজ (Sarah Glaz) এর “Poetry Inspired by Mathematics” নামে একটি প্রবন্ধ। প্রাচীন সুমেরিয় গণিত কবিতা থেকে বর্তমানের অনেক কবিতার নমুনা সেখানে পাওয়া যাবে। আগ্রহীদের প্রতি সে প্রবন্ধ পাঠের আহবান থাকলো।
মোটের উপরে বিশ্বসাহিত্যে কবিতা ও গণিতের সম্পর্কে নিয়ে আলোচনা কোন নতুন কিছু নয়। তুলনায় বাংলাতে বিস্তারিত আলোচনা হয়নি বলেই যতদূর দেখেছি। পরবর্তী অংশে আমরা বাংলা কবিতায় গণিতের প্রভাব নিয়ে আলোচনা করবো। সেই আলোচনাকে সহায়তার উদ্দেশে নিচে বিশ্বসাহিত্য থেকে কয়েকটি গণিত প্রভাবিত কবিতার উদাহরণ পেশ করছি।
প্রথম যে কবিতাটা আলোচনা করবো তা লিখেছেন ভিসলায়া শিমবোরস্কা (Wisława Szymborska)। জন্ম ১৯২৩ ও মৃত্যু ২০১২। পোলিশ ভাষার কবি ও কবিতার জন্য ১৯৯৬ সালে নোবেল পুরষ্কারে ভূষিত হয়েছিলেন। তার একটি অসামান্য কবিতা ‘Liczba Pi’ বা ‘নাম্বার পাই’। নিচে কবিতাটার অনুবাদ দেয়া হলো। অনুবাদটা করা হয়েছে মূল পোলিশ থেকে গুগল ট্রান্সলেট ও ইংরেজি অনুবাদের সাহায্য নিয়ে। মূল কবিতা ও ইংরেজি অনুবাদ সংগৃহীত হয়েছে ইন্টারনেট থেকে। নাম্বার পাই কবিতাটি সহ ভিসলায়া শিমবোরস্কার কবিতা আগেও বাংলাতে অনূদিত হয়েছে। অনুবাদকের মধ্যে আছেন অনিন্দ্য রায় ও আলম খোরশেদ।
অসামান্য এই কবিতাটা বোঝার জন্য পাই সংখ্যাটি সম্পর্কে আগে একটু জানা দরকার। পাই সংখ্যাটি যাকে π প্রতীকের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়, এসেছে বৃত্তের পরিধি ও ব্যাসের সম্পর্ক থেকে। যদি একটি বৃত্তের ব্যাস হয় ২ সেন্টিমিটার তবে পরিধি হবে ২xπ = ২π সেন্টিমিটার। এই পাই সংখ্যাটা একটি অমূলদ সংখ্যা, মানে এমন ধরণের সংখ্যা যাকে ভগ্নাংশ হিসাবে দেখানো যায় না। যেমন ১৫ কে লেখা যায় ৩০/২=১৫ হিসাবে। তার মানে ১৫ সংখ্যাটিকে দুইটি সংখ্যার ভাগ হিসাবে দেখানো যাবে। কিন্তু পাই এরকম সংখ্যা নয় যদিও স্কুল কলেজে অঙ্ক করার জন্য π =২২/৭ অনুমান করা হয়। পাইয়ের যে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট সবাইকে অবাক করে তা হলো এটি একটি অসীম দৈর্ঘ্যের সংখ্যা, যে বিষয়টা নাম্বার পাই কবিতাটার মূল প্রতিপাদ্য। পাইয়ের প্রথম দিকের কয়েকটি সংখ্যা হলো ৩.১৪১৫৯২৬৫৩৫৮৯৭৯৩২৩৮৪৬২৬৪৩…………। কিন্তু এই সংখ্যাগুলোর পরেও অসীম সংখ্যক সংখ্যা আছে। এই সংখ্যাগুলো ব্যবহার করে নাম্বার পাই কবিতাটি লেখা হয়েছে। কবিতার নাম পাইয়ের বন্দনা দিলেও ভুল হতো না। পাইয়ের নাম্বার গুলোকে একের পর এক উল্লেখ করা ছাড়াও দীর্ঘতম সাপ, ধূমকেতুর লেজের সাথে তুলনা, পাই সংখ্যাটার টেবিল ছাড়িয়ে দেয়াল, পাতা, পাখি, মেঘ পার হয়ে আকাশে উঠে যাবার কল্পনা কবিতাটাকে করেছে অসামান্য আবেদন সম্পন্ন। আসুন কবিতাটা নিচে পাঠ করা যাক।

নাম্বার পাই
ভিসলায়া শিমবোরস্কা

প্রশংসাযোগ্য নাম্বার পাই:
তিন দশমিক এক চার এক।
এর পরের সব সংখ্যাও প্রথমের
পাঁচ নয় দুই, কারণ কখনোই এর কোনো শেষ নেই।
না হবে তাকে অনুধাবন ছয় পাঁচ তিন পাঁচ এর অবয়বে,
আট নয়ের গণনায়,
সাত নয়ের কল্পনায়,
এমন কি তিন দুই তিন আট এর মশকরা বা তুলনায়
চার ছয় বা অন্য কিছুতে
এই পৃথিবীর দুই চার ছয় তিনে ।
দীর্ঘতম পার্থিব সাপও থামে মিটার কয়েকে।
সে রকম থামে, কল্পনার সাপগুলো, দীর্ঘতা যদিও হতে পারে খানিকটা বেশি।
পাই-এর সংখ্যার সমন্বিত প্রবাহ
থামে না পৃষ্ঠার প্রান্তে,
টেবিল পার হয়ে বাতাসের ওপরে,
দেয়ালের ওপরে, পাতা, পাখির বাসা, মেঘ, সোজা আকাশে,
স্ফীত ও সমগ্র অতল মহাকাশে।
ও, কত ছোট, ইঁদুরের মতো, ধূমকেতুর লেজ!
কত দুর্বল নক্ষত্রের আলো, বেঁকে যায় স্থানে স্থানে ধাক্কা খেয়ে!
আর এখানে দুই তিন পনের তিনশ উনিশ
আমার টেলিফোন নাম্বার আর তোমার শার্ট নাম্বার
এক হাজার নয়শত পঁচাত্তর সাল তৃতীয় ষষ্ঠ তলা
বাসিন্দার সংখ্যা পঁয়ষট্টি সেন্ট
নিতম্বপরিধি দুই আঙুল প্রহেলিকা ও সংকেত,
যেখানে নাইটিঙ্গেল আমি আর মাছি, ওহ ঘুমন্ত
এবং অনুরোধ করে প্রশান্ত থাকার,
এবং পৃথিবী ও আকাশ অতিক্রান্ত হবে,
কিন্তু নাম্বার পাই, সে না কক্ষনো,
তার তবুও আছে অনুপেক্ষণীয় পাঁচ,
যেমন তেমন না আট,
সর্বশেষ না এমন সাত,
অনুনয়, অনুরোধ অলস চিরন্তন
স্থায়ীত্বের।
(অনুবাদ : মেহেদী মাহমুদ চৌধুরী, মূল পোলিশ থেকে ইংরেজি অনুবাদ ও গুগল ট্রান্সলেটরের সাহায্যে)

দ্বিতীয় যে কবিতা আলোচিত হবে তার রচয়িতা রোমানিয়ান কবি ইওন বারবু (Ion Barbu)। জন্ম ১৮৯৫ ও মৃত্যু ১৯৬১। তিনি একাধারে প্রথম সারির কবি ও গণিতবিদ। বিশ্ব সাহিত্যের জগতে এরকম প্রতিভার সংখ্যা বেশ কম যারা গণিত ও কবিতা দুই ক্ষেত্রেই উন্নত মানের অবদান রাখতে পেরেছেন। এর সাথে তুলনীয় কবি ও গণিতবিদ ওমর খৈয়াম। তার কবিতা ও গণিত সম্পর্কে একটা গবেষণা পত্রিকা, যার কথা আগে উল্লেখ করেছি, থেকে জানা যাচ্ছে যে তিনি কিশোর বয়স থেকেই কবিতা ও গণিত দুইয়ের সাথেই যুক্ত ছিলেন। গণিতের জন্য এমনকি গোয়েটিঙ্গেনে পর্যন্ত যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন, সে সময়ে গণিতের জন্য বিশ্বের অন্যতম সেরা স্থান, যার বিশেষ সুখ্যাতি ছিলো গণিতের রাজপুত্র কার্ল ফ্রিড্রিশ গাউসের বিশ্ববিদ্যালয় হিসাবে। বারবু যখন গোয়েটিঙ্গেনে গিয়েছিলেন তখন সেখানে কর্মরত ছিলেন গণিতের আরেক দিকপাল ডাভিড হিলবের্ট সহ অনেকেই। কিন্তু বারবু গোয়েটিঙ্গেনে তার লেখাপড়া সমাপ্ত করতে পারেন নি, ড্রাগের নেশা ও সাহিত্য সমাজে জড়িয়ে পড়ার কারণে। পরে তিনি রোমানিয়াতে ফিরে আসেন ও সেখানেই গণিতে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন ১৯২৯ সালে। এর পরের বছর তিনি তার কবিতার বই প্রকাশ করেন। কবি হিসাবে সফলতা অর্জনের পরেও তিনি নিজেকে পুরোপুরি গণিতে নিয়োজিত করেন। পরবর্তীতে তিনি গণিতের উপরে ৬০ এর মতন গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। বলা যায় কবিতাকে তিনি গণিতের জন্য পরিত্যাগ করেন।
আমি নিচে ইওন বারবু একটা কবিতার অনুবাদ করেছি। তার কবিতা আগে বাংলাতে অনূদিত হয়েছে বলে শুনিনি। কবিতাটি পূর্বে উল্লেখিত গবেষণা প্রবন্ধ থেকে সংগৃহীত হয়েছে। অনুবাদটা করা হয়েছে প্রবন্ধ থেকে পাওয়া ইংরেজি অনুবাদ ও গুগল ট্রান্সলেটের সাহায্য নিয়ে। ইংরেজি অনুবাদ আমার দেখায় প্রায়ই মূল থেকে ব্যাপক বিচ্যুত হয়। ‘নাম্বার পাই’ কবিতার ইংরেজি অনুবাদেও তা আছে, কিন্তু বারবুর কবিতাতে বিচ্যুতি অনেক বেশি আছে মনে হয়েছে। তাই আমি চেষ্টা করেছি গুগল ট্রানসলেটরের সাহায্যে মূল শব্দগুলো কি ছিলো তা বের করতে ও অনুবাদটা সেভাবেই করা হয়েছে। কবিতার মূল নাম হলো “UT ALGEBRA POESIS [Ninei Cassian]”।
কবিতাটার বিষয় গোয়েটিঙ্গেনের স্মৃতি চারণ ও সেই হারানো সময়ের জন্য আক্ষেপ। কবিতাটাতে উল্লেখ আছে গাউসের। বারবু গাউসের উল্লেখের মাধ্যমে গোয়েটিঙ্গেনের কথা স্মরণ করছেন। বলছেন যে তিনি সে সময়ে যেভাবে বিদ্যাদেবীকে ভুলে ছিলেন তা আর হতে দিবেন না। এখন তার দ্বিতীয় জন্ম হয়েছে ও তিনি তার কোন এক প্রেয়সীর (যা গণিত হতে পারে) কথা উল্লেখ করে, তার সৌন্দর্যের বর্ণনা করছেন। নিজেকে সে প্রয়সীর জন্য উৎসর্গের কথা বলছেন।

বীজগণিতের মতো কবিতা

ইওন বারবু

(উৎসর্গ নিনেই কাসিয়ান)

সময় আমার যখন যৌবনের, গোয়েটিঙ্গেনের পথে পথে,
যেভাবে গাউস, কোনো এক কালে, বাঁকানো গলির নিচে
-উচ্চতর জ্যামিতিকে সযত্নে সংরক্ষণ করেছিলো-
এঁকেছিল কবিতার শেষ চতুষ্পদী।

ভুলেছিলাম আমি বিদ্বান দেবীকে, সহজ স্বর্গের জন্য
যখন, বিচ্ছিন্ন হলে সন্ধ্যায়, অনুশোচনা দেয়,
নিয়ে আসে, আঙটাতে, খালি পাতা
খুঁড়িয়ে আসে সে আমার দিকে বিভ্রান্তিতে।

আমি চিনিনি প্রতিভাকে, সে আমার ভুল…
কিন্তু দ্বিতীয় আগমনে আমি অনেক সচেতন ও জীবন্ত।
প্রত্যাবর্তিত স্বচ্ছ স্ফীতি যাদুকরী কম্পনে।

এবং অ্যালজেব্রাবিদ এমি, তুচ্ছ ও স্বর্গীয়
যার পতাকা ও পুরোহিত সব আমি হতে পারি,
নিনাকে ছাড়িয়ে – অতীন্দ্রিয় ও অপূর্ব সুন্দর।

(অনুবাদ : মেহেদী মাহমুদ চৌধুরী, মূল পোলিশ থেকে ইংরেজি অনুবাদ ও গুগল ট্রান্সলেটরের সাহায্যে)

[চলবে]

Share Now শেয়ার করুন