মোজাফফর হোসেন > কেবল কথা বলতে চেয়েছিলাম >> ছোটগল্প >>> জন্মদিন

0
1104

কেবল কথা বলতে চেয়েছিলাম

আজ কথাসাহিত্যিক মোজাফফর হোসেনের জন্মদিন। এ উপলক্ষে তার একটি ছোটগল্প প্রকাশিত হলো তীরন্দাজে। তীরন্দাজের পক্ষ থেকে শুভকামনা মোজাফফরের জন্যে। সৃষ্টিশীলতায় সমৃদ্ধ হোক তার জীবন।

আমি স্কুলের সামনের, আর ঋতু পেছনের পথ ধরে আলাদা হই। পিঠাপিঠি আমাদের গাঁ, পিঠাপিঠি আমাদের বাড়ি ফেরা। আমি ঋতুর কথা ভাবতে ভাবতে আলাদা হওয়ার কথা ভুলে যাই। মনে হয় যেন, আমি যেদিকে যাই সেদিকেই ঋতু আছে–আমার প্রতিটা গন্তব্যে ওর বাস।

স্কুলে খুব সাদামাটা হয়ে গেলেই চলত। প্রায় সবাই আমার আগে থেকেই চেনা। তারাও আমাকে চেনে। তাই হঠাৎ করে তাদের কাছে আলাদা হওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। আলাদা হওয়ার কোনো কারণও ঘটত না যদি না ঋতুর সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ ঘটত। ঋতু আমার ক্লাসেই পড়ত। পাশের গাঁ থেকে আসত। আরও অনেকেই পাশের গ্রামগুলো থেকে আসত। তারপরও একমাত্র ঋতুই ছিল আমার কাছে অপরিচিত। তার কাছে প্রতিদিন নতুন নতুন করে পরিচিত হওয়ার জন্যই ছিল আমার যত আয়োজন। কে কী বলল সেদিকে তাকাবার মতো সময় তখন ছিল না। ভাবনাজুড়ে কেবলই ঋতু। সিক্সে পড়ি তখন। বয়স আর কত—এই তেরোর এদিক-সেদিক। সেই বয়সেই আমার প্রেমের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ। তখন না বুঝলেও এখন বুঝি সেটা।
সকাল দশটা থেকে আমাদের ক্লাস শুরু হতো। তারও পনেরো মিনিট আগে বসত অ্যাসেম্বলি। মিষ্টি কোনো স্বপ্ন দেখতে দেখতে খুব ভোরেই ঘুম ভেঙে যেত। স্বপ্নে যেখানে শেষ করেছিলাম, জেগে আবার ওখান থেকে ভাবতে শুরু করি। মা যতক্ষণ না ফজরের নামাজের জন্য ডাকেন ততক্ষণ চলে আমার ঋতুচিন্তা। কত কিসিমের গল্প বুনি ঋতুকে নিয়ে- আজ আর তার সবটা বলবার না! কোনো কোনো গল্পে- পাখা লাগিয়ে আমি আর ঋতু দিগন্তের ওপারে গিয়ে চুপটি মেরে কী যেন আলাপ জমাতাম। ফিসফিস করে আমরা যা বলি তার কিছুই বুঝি না। ঋতুর চোখে-মুখে গতি খেলা করে। আমি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকি। কোনো কোনো ভাবনায়–আগের দিনে দেখা ফিল্মের মতো আমি একদল গুণ্ডার কবল থেকে ঋতুকে ছাড়িয়ে আনি। ঋতু আমার আঘাত পাওয়া হাতে ব্যান্ডেজ বাঁধতে বাঁধতে বলে–ভুলে যাবে না তো? আমি কোনো কথা না বলে খালি তাকিয়ে থাকি। পরে ভাবনা থেকে বেরিয়ে এসে বিড়বিড় করে নিজেকে বলি- কখনও না!
অজু করতে করতে কখনো পাঁচ-ছয়বার কুলি করে ফেলি, হাতের গোড়ালি পর্যন্ত ধুতে ভুলে যাই। মা বুঝতে পারেন গণ্ডগোল কোথাও কিছু একটা হয়েছে! বাবার পিছন পিছন নামাজে দাঁড়াই, নামাজের নিয়ম-কানুন সব গুলিয়ে ফেলে ছায়ার মতো অনুসরণ করি তাঁকে। তালগোল যে কোথাও পেকেছে, সেটা হয়ত বাবা ধরতে পারেন, কিন্তু কিছু বলেন না। সন্তানদের সঙ্গে অনর্থক কথা বলার মানুষ তিনি কোনো দিনই ছিলেন না। নামাজ শেষ করে হুজুর মোনাজাত ধরেন। হাত উঠিয়ে কেবলই ঋতুকে না ভাববার চেষ্টা করি। আঁজল পাতা তালুতে আমি দেখতে পাই- ঋতু তার ববকাট চুল দুলিয়ে দুলিয়ে, গালে টোল পড়া হাসি হেসে প্রজাপতির মতো ডানা মেলে সবে ডবকা হয়ে ওঠা ধানক্ষেতের আইল ধরে হেঁটে-উড়ে চলেছে। ‘আহা! কী আনন্দ আজ আকাশে বাতাসে’- কানটা একটু খাড়া করতেই শুনতে পাই, ঋতু গাইছে। আমিও মনে মনে ঋতুর তালে তাল দিই। ইমাম মোনাজাত শেষ করেন কি করেন না, আমার জানা হয় না। বাবা ইশারা করেন, তসবির মতো আঙুলগুলো গুণতে। প্রতিদিনই আমি এটা ভুলে যাই, প্রতিদিনই স্মরণ করিয়ে দেন বাবা। আমি যন্ত্রের মতো বুড়ো আঙুলটাকে সর্দার বানিয়ে বাকি আঙুলের গেরোগুলো ছুঁয়ে দিই। বিড়বিড় করে কিছু একটা বলার চেষ্টা করি, ঋতুর নামটা চলে আসে। বাবা উঠে পড়লে আমিও উঠে পড়ি। ততক্ষণে খানিকটা আলো ফোটে। বাড়ি আসতে আসতে নতুন একটা গল্প ধরি : স্কুলে কেউ পড়া পারছে না। স্যার এমন একটা প্রশ্ন করেছেন কেউ বুঝতে পারছে না, আমিও না- ঋতুও না। নিজেকে প্রমাণ করার এই সময়। হাত উঠিয়ে ধরি। স্যার বলতে বলেন, যা ইচ্ছে বলে চলি। স্যার বাহবা দিতে থাকেন। ঋতু আমার দিকে একবার তাকিয়ে বাকিটা সময় দৃষ্টি বইয়ে রেখে গালে টোল পড়া হাসিটা ফিরিয়ে আনে। বাড়ির গেটে আলগা হওয়া এক ইটে গুঁতো খেয়ে গল্প থেকে ফিরে আসতে হয়। পড়তে বসে ঋতুকে সামনে রেখে ওইদিনকার পড়াগুলো আরও একবার ঝালিয়ে নিই। সব ঠিক আছে। পায়রাগুলো একটা একটা করে ছেড়ে দিই, ওরা ছাদের কার্নিশে গিয়ে বাকবাকুম ডাকতে থাকে। ওদের কেউ একজন ডাকটা আমাকে শিখতে বলে। আমি দাঁড়িয়ে থেকে শিখবার চেষ্টা করি। মা এসে তাড়া দেন গোসলের। গামছাটা কাঁধে নিয়ে হাঁটা দিই। সাবান-শ্যাম্পু নিই কি নিই না। পুকুরে আরও ক’জন আছে–দিনটি কেমন যাবে কিংবা গতকাল কেমন গেল তা নিয়ে নিজেদের ভেতর আলাপ করছে তারা। আমি শানের এক কোণে একটু জায়গা করে বসে পড়ি। পা ডুবিয়ে দিই জলে- একটা একটা করে অনেকগুলো মাছ আমার পা’টা নিয়ে ঠুকোঠুকি খেলা শুরু করে। যে যত ঠোকাবে তার তত পয়েন্ট! একজন একজন করে উঠে পড়ে, একজন একজন করে আসে। আমি সাঁতরাতে সাঁতরাতে পুকুরের মাঝ অবধি যাই। এই পুকুরের সাথে ঋতুর কোনো সম্পর্ক নেই। কোনো দিন সে এ জল ছুঁয়েও দেখেনি, জলে তার ছায়াটা কেঁপে কেঁপে ওঠেনি কখনো। তবুও জলের প্রতিটা কণা যেন ঋতুর ছোঁয়া নিয়ে ছুঁয়ে যায় আমাকে। আমি আনন্দে ডুব দিয়ে ঋতুকে ছুঁয়ে আসার চেষ্টা করি। ততক্ষণে একজন দু’জন করে স্কুলের পথ ধরেছে। আমি বাড়ি ফিরে ভাবি- রোজ রোজ একই স্কুল ড্রেস না পরতে পারলে বেশ হত- ভাবতে ভাবতে তৈরি হই। আয়নাতে চলে যায় আরও খানিকটা সময়। বড় বোনের ফেয়ার অ্যান্ড লাভলিটা কায়দা করে হাতিয়ে নিয়ে মাখতে হয়। ধরে ফেললে বকবে, তার চেয়ে বড় কথা ক্ষ্যাপাবে, ওটা আমার সহ্য হয় না। প্রতিদিনকার মতো ডাকতে আসে ময়েজ, আমার পাড়াতো বন্ধু। ওর মাথার ওপর দাঁড়িয়ে থাকায় বিরক্ত হয়ে ওকে হটানোর জন্যে নতুন কোনো বাহানা খুঁজি। পেলে বলি, না পেলে বিরক্তি নিয়েই ওর সঙ্গে হাঁটা ধরি। স্কুলের সামনের দিক থেকে যাই আমি, পেছন দিক থেকে আসে ঋতু। আমাদের মুখোমুখি গাঁ, আমাদের মুখোমুখি আসা। অ্যাসেম্বলিতে যে যার সারিতে দাঁড়িয়ে পড়ি। পিটি মাস্টার একবার সোজা হতে বলেন, একবার আরামে দাঁড়াতে বলেন। কেউ একজন সুরা ফাতিহা শেষ করে আরো দু’একজনকে সঙ্গে করে সোনার বাংলা শুরু করে। আমি আড়চোখে ঋতুর চুলের একটি পাশ অথবা হাতের একটি অংশের দিকে তাকিয়ে থেকে পুরো ঋতুকে ধরার চেষ্টা করি। অ্যাসেম্বলি শেষ করে যে যার ক্লাসে চলে যায়। ছেলেরা ডানে, মেয়েরা বামে। সংখ্যায় সমান না বলে ছেলেরা বসে দুই রোতে, মেয়েরা এক রোতে। আমি ডানের রোতে একেবারে দেয়াল ঘেঁষে বসি–ঋতুর থেকে যতটা সম্ভব দূরে। যত দূর থেকে নিবিড়ভাবে দেখা যায় তাকে, ততটা দূরে। একমিনিট দু’মিনিট করে ঘণ্টার কাঁটা ছুঁয়ে যায় ঘড়ির কাঁটাজোড়া। টিফিন হলে আমরা বের হই। ঋতুর আশপাশে থাকি- তবে এতটা দূর থেকে যে সে টের পায় না কিছুই! ও কখন চুলে হাত দেয়, ওর হাসির মাত্রা কেমন হলে কতখানি টোল পড়ে, সব আমার জানা, তবুও নতুন করে পরখ করে দেখি। স্কুল ছুটির সময় চলে আসে, অন্যরা খুশি হয়, মনটা আমার বিষিয়ে ওঠে। যদি ঘর বাইরে থাকে তাহলে কারই বা ঘরে ফিরতে মন চায়! আমার কেবলই মনে হয়, আজ শেষ ক্লাসটা দীর্ঘ হোক, যত মনে হয় সময় ততই ফুরিয়ে আসে যেন। নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ক্লাস নিয়েও গালি খান বেচারা ধর্ম মাস্টার। মাঝে মাঝে গালিটা মুখ ফসকে বের হয়ে আসলে বন্ধুরা বলে, ‘এতই যখুন ধর্মক্লাস ভালো লাগে, মাদ্রাসায় ভর্তি হলিই পারতিক!’ আমি মুখ এঁটে হাসি। মাঝে মধ্যে মাথা চুলকাই। ওরা বোঝে না কিছুই।
আমি স্কুলের সামনের, আর ঋতু পেছনের পথ ধরে আলাদা হই। পিঠাপিঠি আমাদের গাঁ, পিঠাপিঠি আমাদের বাড়ি ফেরা। আমি ঋতুর কথা ভাবতে ভাবতে আলাদা হওয়ার কথা ভুলে যাই। মনে হয় যেন, আমি যেদিকে যাই সেদিকেই ঋতু আছে–আমার প্রতিটা গন্তব্যে ওর বাস।

বাড়ি ফিরেই কিছু একটা পেটে সেঁধে চলে যাই খেলার মাঠে। ঋতু ততক্ষণে বাড়ি ফিরে কী করছে কে জানে! আমি খেলতে খেলতে ওকে আবার ডেকে আনি। আমরা খেলি, দর্শকসারিতে ঋতু বসা। একা। আমি আরো ভালো খেলবার চেষ্টা করি। ঋতু হাত তালি দেয় কেউ ভালো খেললেই। আমি খালি একা ভালো খেলতে চাই। ঋতু যখন সবার প্রতি সমান উদার হয়, আর যখন সবাইকে ছাপিয়ে একা ভালো খেলতে ব্যর্থ হই আমি তখন ঋতুকে অভিমান করে বাড়ি ফেরত পাঠাই। আস্তে আস্তে ঋতু নেই ভেবে আগের চেয়ে বিষণ্ন হয়ে উঠি। খেলাতে আর মন বসে না। বাসায় ফিরে যে পড়তে বসব– তাতেও না। যেন সত্যি সত্যি ঋতু এসেছিল এবং সত্যি সত্যি অন্য ছেলেদের নৈপুণ্যে তালি দিয়েছিল। মন কিছুতেই বসতে চায় না আর। কেবলই ইচ্ছে করে ঋতুকে ছুঁয়ে দেখতে–ওর সঙ্গে ভাব করতে–কথা বলতে। সবাই তো বলে, কেবল এক আমিই পারি না। এসব ভেবে না পারি পড়তে, না পারি কিছু করতে। ভাবনার খেই হারিয়ে ছাদে গিয়ে বসি। ততক্ষণে দিনের আলো রাতের অন্ধকারের ভেতর মিশে একটু একটু করে নেই হয়ে গেছে। আলোতে এসে অন্ধকারেরই উবে যাওয়ার কথা, অথচ অন্ধকার কেমন চোখের সামনে আস্ত আলোটাকে পেটের ভেতর ঢুকিয়ে নিল–ভাবতেই কেমন গা শিউরে ওঠে। মনে হয়, আমার সবটা অন্ধকারের ভেতর মিশে গেছে; আলো বলে কিচ্ছু নেই আর। ইচ্ছে হয় কিছু একটা লিখি, কিংবা কিছু একটা করি; কিন্তু ভাবনাটা ঠিক ভাষায় আনতে পারি না। কী করতে পারি সেটাও মেলাতে পারি না। তাই বসে থাকতে হয় অকারণ। ঋতু ততক্ষণে হয়ত পড়তে বসেছে! কী পড়ছে সেটি যদি জানতে পারতাম, তাহলে আমিও মিলিয়ে পড়তাম। দু’জন একসঙ্গে একজিনিস পড়লে একসঙ্গে কথা বলা হয়। আর একসঙ্গে কথা বলা মানেই একসঙ্গে থাকা। শুধু এইটুকু জানতে পারলেই আমরা কত দূরে থেকেও একসঙ্গে থাকতে পারতাম। ইশ! যদি জানতাম। আমাকে কেউ এসে এইটুকুন খবর দিতে পারলেই আমি তাকে আমার সমস্ত অর্জন দিয়ে দিতাম। আমি তাকে সব ছেড়েছুড়ে বোকা-নিঃস্ব বনে যেতাম, তবুও যদি বলত সে! এরপর আমি ছাদে হারিকেন তুলে খোরশেদ স্যারের পড়াটা একটানা পড়তে থাকি। খোরশেদ স্যার ভীষণ বদমেজাজী, পড়া না পারলে কি হতে পারে তা কারোরই অজানা নয়। ঋতু নিশ্চয়ই খোরশেদ স্যারের পড়াটাই মন লাগিয়ে পড়ছে! পড়তে পড়তে খসে পড়া তারার শব্দ শুনি। কে যেন ফিসফিস করে বলে যায়–এমন সময় চোখ বন্ধ করে চাইলেই পাওয়া যায়! আমি আকাশময় খসে পড়া তারার সন্ধান চালাই। আকাশের সব তারা খসে পড়ার প্রার্থনা চলে। চাওয়াটা তৈরিই থাকে, তারা দেখার সঙ্গে সঙ্গে চোখ খোলা রেখেই চেয়ে ফেলি একবার। পরেরবার চোখ বন্ধ করলেও চাইতে ভুলে যাই–ঋতুর টোলপড়া মুখখানা ভেসে ওঠে আকাশজুড়ে; আমি চোখ বুজলেই দেখতে পাই।

খ.

আজও কথা বলা হলো না। অনেকটা কাছ থেকে ঘুরে এসেছি। এতটা কাছে যাইনি আগে। একবার মুখ ফসকে কিছু একটা বললেই হতো। কিন্তু কে যেন এসে মুখে এমনভাবে হাত চেপে ধরল যে আর বলবার ক্ষমতা রইল না। দুটো বছর ধরে এই অদৃশ্য হাতটা আমাকে এমনভাবেই থামিয়ে দিচ্ছে।

আজ বিকালে ঋতু আমাদের বাড়ির পেছন দিয়ে যাবে। দুপুরে ও-পাড়ায় এক বান্ধবীর বাড়িতে গেছে। আমার আগে আগেই এসেছে। যখন আমাদের বাড়ির কাছে চলে এসেছিল, তখন আমি খানিকটা দৌড়ে ওর আগে আগে বাড়ির ভেতর ঢুকে পড়ি। ও যদি না জানত এটা আমাদের বাড়ি, আজ নিশ্চয়ই জেনে গেছে। ফিরবার পথে অবশ্যই ঘুরে ফিরে বাড়িটার দিকে তাকাবে সে। এই প্রথম মনে হল, বাড়িটা বয়সের ভারে বেশ ক্লান্ত। চুনকাম করিয়ে নিতে পারলে বেশ হতো। আমি ছাদের ওপর উঠে বসে রইলাম। দুপুরের রোদে পুড়ে পুড়ে তখনও ফুটন্ত তাওয়ার মতো গরম ছাদ। তবুও আজ সুযোগ হারাব না। আমাকে নিচ থেকে দেখে ও-ই যদি বলে ওঠে–ভালো আছ? এটা তোমাদের বাড়ি? কিংবা এই রকম কিছু একটা…! আমি কার্নিশে মাথা দিয়ে তাকিয়ে রইলাম নিচে। আজ বিকালে গুরুত্বপূর্ণ একটা ম্যাচ ছিল। ময়েজ ডেকে চলে গেছে, আমি কোনো উত্তর দিইনি। ভেবেছে আগেই মাঠে চলে গেছি। যা ভাবে ভাবুক, ওদের নিয়ে ভাববার মতো সময় তখন আমার হাতে নেই। একটা ম্যাচ হারলে কী এমন ক্ষতি! আস্তে আস্তে ছাদটা নরমাল হয়ে এল। অপেক্ষায় থেকে থেকে আমার ঘুম চলে এসেছিল। বিকালের স্নিগ্ধ বাতাসে মনকে বুঝ দিয়ে শরীরটা কিছুক্ষণের জন্য ছুটি নিয়েছিল। চোখের পলকে শরীর মনের এমন বোঝাপড়া হয়ে গেল যে আমি কিছুই করতে পারলাম না। ঝিমঝিম ভাবটা কেটেছে কেবল, আমি রাক্ষসের মতো চোখ বড় বড় করে চারিপাশটা কয়েক সেকেন্ডের ভেতর গিলে ফেললাম। না, ঋতুর চিহ্নমাত্র নেই। দৃষ্টি আরো ছড়িয়ে দিতেই চোখে পড়ল–অনেক দূরে চলে যাচ্ছে ববকাটা চুল দোলাতে দোলাতে একটা মেয়ে, স্কুল ড্রেস পরা। ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। এখন দৌড়ে গিয়েও আর ধরতে পারব না। পারলেই বা কী এমন জবাব দেব! হাত-পা ছড়িয়ে গড়াগড়ি দিলাম ছাদে। রাগে-ক্ষোভে লাফ দিতে ইচ্ছে করছিল। পরদিন শুক্রবার। আরও একটা দিন; ধ্যাৎ!

গ.

শুক্রবারের বিকালটা ছিল বেশ চনমনে। বাড়ির পাশেই পুকুরের ওপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা আমগাছটাতে উঠে গাছপাকা আম খাচ্ছিলাম। আর ঋতুর কথা ভাবছিলাম। আর মাত্র কটা দিন। মেহেরপুর সরকারি স্কুলে ভর্তি হব। এ কয়দিনের ভেতর যে করেই হোক, ঋতুর সঙ্গে কথা বলতেই হবে। তেমন দরকারি কিছু না, খালি একটা দুটো কথা বলতে পারলেই হবে। ঋতুও নিশ্চয়ই আমার জন্যে অপেক্ষা করছে! ক্লাসে ও একমাত্র আমি ছাড়া আর সবার সঙ্গেই তো কথা বলেছে। এসব ভাবতে ভাবতেই কী যেন হলো– ডালসমেত পড়ে গেলাম নিচে। কিছুক্ষণের ভেতর মেহেরপুর হাসপাতালে, সেখান থেকে নেয়া হলো কুষ্টিয়া, ডা. অপূর্ব কুমারের কাছে। হাতে প্লাস্টার নিয়ে ফিরে এলাম দিন পাঁচেক পরে। আপাতত স্কুল বন্ধ। হাত ভালো হলে সরাসরি মেহেরপুর সরকারি স্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে ক্লাস শুরু করব। কুষ্টিয়ার হাসপাতালে শুয়ে শুয়ে যে ভয় করছিলাম তাই হলো। তার মানে ঋতুর সঙ্গে আর কথা বলা হচ্ছে না। আমি প্রায় পাগল হয়ে যাচ্ছিলাম ভেতরে ভেতরে। এমন সময় আশার কথা শোনাল ময়েজ। বলল, এই বৃহস্পতিবার হাফ স্কুল শেষ করে ক্লাসের সবাই মিলে আমাকে দেখতে আসবে। আমি একবার বলতে যাচ্ছিলাম– ঋতু আসবে তো? পরে আবার মনে হলো– সবাই যখন আসবে, ঋতু নিশ্চয়ই বাদ যাবে না। ঋতুর এমন কিছু হলে আমি কী যেতাম না? একা হয়ত যাওয়ার সাহস পেতাম না, কিন্তু সবাই গেলে না-যাওয়ার কোনো কারণই ছিল না। ঋতু নিশ্চয়ই আসবে। এই ভেবে আমার তখন সময় গুণবার পালা। মাকে বলে বলে বাড়ি-ঘর সব কিছু গোছগাছ করালাম। নিজের একহাতও লাগালাম কোনো কোনো কাজে। বন্ধু-বান্ধবীরা আসছে–মা এটাই জানে। মিথ্যে তো জানেনি! শুনবার পর থেকেই ভাবছিলাম, বুধবার রাত থেকে ভাবনাটা চরমে উঠল–কী কথা বলব ওর সাথে? এতগুলো মানুষের সামনে ঋতুই বা কী এমন বলবে? একবার নিশ্চয়ই বলবে– কেমন আছ? তারপর আমার হাতভাঙার কারণটা নতুন করে জানতে চাইবে ও কিংবা অন্য কেউ। আমি শোনানো কথাটা আবারো বলব। কিন্তু আসল কারণটা ঋতু জানবে না। কোনোদিন কেউ জানবে না–কেবল এক আমি আর আমার অন্তরাত্মা ছাড়া। ঋতু আর কী কী বলতে পারে তাই ভেবে রাতটা পার হয়ে গেল। সকাল থেকে কেবলই রাস্তা আর ঘর করা। জানি দুপুর দুটোয় ছুটি হবে, আসতে আরও আধাঘণ্টা। তবুও কেন জানি মন চলে যাচ্ছিল জানালায়। মা বললেন–থির হ। সময় হতে দে, ওরা চলে আসবে। মা আর কী কী যেন বললেন, আমি শুনিনি। দুপুরে ওরা এখানেই খাবে। মা এতগুলো মানুষের রান্না করতে রাজি ছিল না, আমিই এটা-সেটা বলে রাজি করিয়েছি। এই প্রথম ঋতু আমাদের বাড়ি আসছে, আমি চাচ্ছিলাম না আয়োজনে কোনো কমতি থাকুক। দুটোর পর আমার হার্টবিট ডাকতে থাকা ব্যাঙের থলির মতো ফুলে ফেঁপে উঠছিল। ওরা এল তিনটের ঠিক চার মিনিট আগে। ওরা মানে সবাই। আমি গুনে গুনে মেলাচ্ছিলাম। এক ঋতু বাদে। আমি চুপ করে বসে থাকলাম। মা ওদের সঙ্গে কথা বলছিল। বাবা একে একে কার কোথায় বাড়ি, কে কোন বাড়ির ছেলে-মেয়ে এসব জিজ্ঞেস করছিলেন। ওরা ওই মুহূর্তেই চলে গেলে, পৃথিবীতে আমার চেয়ে বেশি খুশি আর কেউ হতো না। নিজের এমন স্বার্থপরের মতো মনোভাব দেখে আমার নিজেরই লজ্জা হচ্ছিল। কিন্তু এ ছাড়া আর কোনো নিয়ন্ত্রণ আমার নিজের ওপর ছিল না। কেবলই জানতে ইচ্ছে করছিল–ঋতু কেন এলো না? ও কী তবে আজ স্কুলে আসেনি? নাকি ওকে কেউ আসতে বলেনি? নাকি ও ইচ্ছে করেই আসেনি? প্রশ্নগুলো কাউকে করার সাহস হচ্ছিল না। সবাই এসেছে। একজন তো না-ই আসতে পারে, এতে এমন উতলা হবার কী আছে? আর তাছাড়া যে আসেনি সে তো আমার কাছের কেউ নয়, দু’বছর একসঙ্গে পড়লেও একদিনও কথা হয়নি তার সঙ্গে। কোন অধিকারে জানতে চাই তার কথা?

Share Now শেয়ার করুন