মোজাফ্‌ফর হোসেন > আপনার মৃত্যুর কারণ জানতে >> ছোটগল্প >>> করোনার দিনে

0
622

আপনার মৃত্যুর কারণ জানতে >> ছোটগল্প

আমার মৃত্যুর আগে পৃথিবীর শেষ কিটটার ব্যবহার হয়ে গেছে। আমি বলি। আমার কথা না শুনে কিংবা না শুনেই প্রশ্নকর্তা সরে গেলেন। তার অদৃশ্য চলন দেখে বোঝা যাচ্ছে তিনি চলে গেছেন আপনার কাছে। আপনি এতক্ষণ আমার ডানপাশে বসে ছিলেন। একটু দূরে, মাথাটা নিচু করে। এতক্ষণ প্রশ্নকর্তা এবং উত্তরদাতাদের কথাগুলো শুনছিলেন। এখন আর এই সম্মেলন এবং সওয়াল-জবাবের কোনো কিছুই আপনার অজানা নয়।

আমরা গোল হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসেছিলাম। ইহলোক এবং পরলোকের মাঝে, শূন্য এক স্থানে। এখানে কেউ বেশিক্ষণ থাকে না। আমাদের মৃত্যুর কারণ শেষবারের মতো মিলিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এরপর আমরা চলে যাবো মর্ত্যলোকের বাইরে, কালহীন এবং স্থানহীনতার মাঝে।
কিভাবে? সামনের জনকে জিজ্ঞাসা করল অদৃশ্য এক কণ্ঠস্বর।
ক্রসফায়ার। লোকটি একশব্দে উত্তর দেয়। মাথাটা উড়ে গেছে। তবু কথা বলতে অসুবিধা হয় না।
বিশেষ কারণ? প্রশ্নকর্তা জানতে চান।
মাদক। না, সম্ভবত চোরাচালান। একজন বলেছিল, দাড়ি আছে, জঙ্গি হিসেবেও চালিয়ে দেওয়া যায়। লোকটি জবাব দেয়।
কিন্তু এর কোনোটিই তো সত্য নয়! তুমি এমন কিছু লিখেছিলে যা ওদের পছন্দ হয়নি? প্রশ্নকর্তা বলেন।
আপনি নিশ্চয় ডেথ সার্টিফিকেটে বিশ্বাস করেন? দেশের নামকরা ডাক্তারের সিগনেচার আছে সেখানে। খবরের কাগজগুলোতেও লেখা আছে। ক্রসফায়ার। কারণ নিয়ে আজকাল আর কেউ কথা বলে না। আমি এই কারণে মনে রাখার প্রয়োজন মনে করিনি। লোকটি বলে অন্যদিকে মাথা ঘুরিয়ে নেয়। মাথা নেই বলেই সে ইচ্ছামতো ঘোরাতে পারে। তার মাথা ঘুরতেই থাকে। অথবা একচুলও নড়ে না। এখানে অনেক কিছু ঠিক মতো বোঝা যায় না। স্বপ্নের মতো অনেকগুলো দৃষ্টি তৈরি হয়। কিন্তু আমরা কেউই স্বপ্ন দেখছি না। আমরা জেগে আছি স্বপ্ন এবং বাস্তবতার মাঝের একটা স্তরে।
আপনার? আমার বাঁ-পাশে সামান্য দূরে এক লোকের কাছে জানতে চাওয়া হয়।
অনাহার। লোকটি বলে। শরীরের অর্ধেকটা কাটা। হাত দিয়ে ধরে আছে যাতে অন্য শরীরে মিশে না যায়। শরীরের মায়াটা এ পযন্তই। এরপর আমরা যেখানে যাবো সেখানে শরীরটা পোশাকের মতো খুলে রাখা হবে।
কিন্তু তোমার শরীর তো ট্রেনে কাটা? প্রশ্নকর্তা বলেন।
ট্রেনের কোনো দোষ ছিল না। আমরাই লাফ দিয়েছি — অনেক ভেবেচিন্তে, যদিও ওতো ভাবনার প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু আমাদের মৃত্যু হয়েছে ক্ষুধায়। অনাহারে। বলে লোকটি এবার তার পাশের কিশোরীকে দেখায়। কিশোরীর শরীরটাও মাঝামাঝি চিরে গেছে, তবে লোকটির মতো লম্বালম্বি না, আড়াআড়ি। দড়ি দিয়ে বাঁধা। যারা দাফন করেছে একক কিংবা গণকবরে তারাই যত্ন করে বেঁধে দিয়েছে।
অনাহারে কেন? পযাপ্ত ত্রাণ ছিল। সরকার দিয়েছে, সংগঠন দিয়েছে, স্বেচ্ছাসেবক দিয়েছে। আর কোনো কারণ ছিল? প্রশ্নকর্তা একটু আনমনা হয়ে জানতে চান। তার জিজ্ঞাসার ধরন দেখে বোঝা যাচ্ছে সবই ঠিকঠিক লেখা আছে তার অদৃশ্য ফাইলে। তবু তিনি দায়িত্বপালনে অবহেলা করেন না।
আমাদের নাম হয়ত কারো তালিকায় ছিল না। হতে পারে যার তালিকায় ছিল তার গোডাউনে এখনো বস্তাবন্দি আছে, কোনো একটা দিন অন্ধকারে সেই বস্তা খোলা হবে। হতে পারে আমরা পৃথিবীতে অদৃশ্য ছিলাম, আপনি যেমন এখানে অদৃশ্য। কিন্তু আপনি আছেন, এটা তো আপনি অস্বীকার করতে পারবেন না? লোকটির প্রশ্ন করে।
প্রশ্নকর্তা কোনো জবাব না দিয়ে পাশের মেয়েটিকে বাদ দিয়ে এপাশে আসেন।
কারণ? তিনি এবার প্রশ্ন করেন বৃদ্ধলোকটিকে।
করোনা। বৃদ্ধলোকটি জবাব দিলেন।
কিন্তু আপনার তো লো প্রেশার। কিডনির সমস্যা। বয়সের কারণে আরো অনেক জটিলতা আছে। তাছাড়া মৃত্যুর সময় করোনার কোনো উপসর্গ ছিল না আপনার শরীরে। প্রশ্নকর্তা ধরিয়ে দেন। আপনি কি ভুলে গেছেন?
না, আমি কিচ্ছু ভুলিনি। বরং এখন আমার স্মৃতিশক্তি আরো বেশি প্রখর। আমার মৃত্যু হয়েছে করোনার কারণেই। শহরের সাতটি হাসপাতালের কেউ ভর্তি করেনি। অ্যাম্বুলেন্সে সারাদিন কেটে গেছে এ-হাসপাতাল ও-হাসপাতাল করে। আপনি করোনা-ই লিখবেন। বৃদ্ধকে খুব জেদি বলে মনে হয়। প্রশ্নকর্তা আর কোনো প্রশ্ন না করে সরে আসেন আমার দিকে।
আপনি? প্রশ্ন করেন। সম্ভবত আমাকেই। আমি কিছু বলে ওঠার আগেই পেছনের অল্পবয়সী ছেলেটা উত্তর দিতে যায়। আমি তখনো আমার মৃত্যুর পেছনে বলার মতো উপযুক্ত কারণ খুঁজে পাইনি। তাই আরেকটু সময় পেয়ে খুশি হই।
করোনা। ছেলেটা আগের বৃ্দ্ধলোকটির মতো উত্তর দেয়।
কিন্তু তোমার মাথায় লাঠির বাড়ি। লাঠিটা ভেঙে গেলে পাশ থেকে একজন রড দিয়ে মেরেছে। প্রশ্নকর্তা বলেন।
আমাদের মধ্যে তর্ক বেঁধেছিল। আমি বলেছিলাম মসজিদের ভেতরেও করোনা ছড়াতে পারে। বাড়িতে নামাজ পড়তে। ওরা বলেছিল, না ওরা কিছু বলেনি, ওরা ছুটে এসেছিল রড কিংবা লাঠি নিয়ে। আমি আর কিছু বলতে পারিনি, ওরাও আর কিছু বলেনি। ছেলেটার কথা শুনতে শুনতে প্রশ্নকর্তা এগিয়ে আসেন।
আপনি? প্রশ্নটা এবার সরাসরি আমাকেই করেন।
আমি চুপ করে থাকি। আমার শরীরে কোনো ক্ষত নেই। আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু এরিমধ্যে বুঝতে পেরেছি প্রশ্নকর্তার কোনো কিছুই অজানা নয়। আমাকে তাই মৃত্যুর পরও নিজের মৃত্যুর সঠিক কারণ নিয়ে ভাবতে হয়। একবার ভাবি প্রশ্নকর্তার কাছেই আমি আমার মৃত্যুর কারণটা জানতে চাই। বেয়াদবি হতে পারে ভেবে সাহস করে উঠতে পারি না। তাছাড়া একজন মানুষ তার মৃত্যুর কারণ জানে না, এটা কী অন্যদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হবে!
তাড়াতাড়ি? পৃথিবীর লক্ষ লক্ষ মানুষ অপেক্ষা করছে এই শূন্য স্থানে। প্রতি মুহূর্তে হাজার হাজার যোগ হচ্ছে। এত সময় আমরা দিতে পারব না। প্রশ্নকর্তাকে বিরক্ত ও ক্ষিপ্ত বলে মনে হয়।
আমার মৃত্যুর আগে পৃথিবীর শেষ কিটটার ব্যবহার হয়ে গেছে। আমি বলি। আমার কথা না শুনে কিংবা না শুনেই প্রশ্নকর্তা সরে গেলেন। তার অদৃশ্য চলন দেখে বোঝা যাচ্ছে তিনি চলে গেছেন আপনার কাছে। আপনি এতক্ষণ আমার ডানপাশে বসে ছিলেন। একটু দূরে, মাথাটা নিচু করে। এতক্ষণ প্রশ্নকর্তা এবং উত্তরদাতাদের কথাগুলো শুনছিলেন। এখন আর এই সম্মেলন এবং সওয়াল-জবাবের কোনো কিছুই আপনার অজানা নয়। আপনি সম্ভবত অপেক্ষায়-ই করছিলেন। আপনি হয়ত আপনার মৃত্যুর কারণটা জানেন, কিংবা মনে করার চেষ্টা করছেন। আপনার মৃত্যুর কারণ জানার ব্যাপারে এখানে কারো ভেতর কোনো আগ্রহ নেই জেনেও আপনাকে এখন সেটা নিয়ে ভাবতে হচ্ছে।
আপনি কীভাবে? প্রশ্নকর্তা এবার আপনার কাছে জানতে চাইল।
আপনাকে এখন উত্তরটা দিতে হবে।

Share Now শেয়ার করুন