মোস্তফা তারিকুল আহসান >> প্রজাপতি পাখা মেলো >> উপন্যাস (পর্ব ২)

0
298

রাসেল বলে, হায়দার মামা যুদ্ধে গিয়েছিলেন না? তুমি যদি যেতে, তাহলে আমরা বলতে পারতাম, আমার বাবা মুক্তিযোদ্ধা। আমার খুব গর্ব হত, তাই না বাবা? তানভির বুঝতে পারে রাসেলের ভেতরে স্বাধীনতা যুদ্ধের বিষয়ে গভীর আগ্রহ তৈরি হচ্ছে এবং সে একে নিজের মধ্যে লালন করা শুরু করেছে। ওকে কোনো নেগেটিভ কথা বলা যাবে না। বললে রোমেলার মতো অবস্থা হবে। দূরত্ব বাড়বে। 

জাহানারা বারান্দায় ইজি চেয়ারে বসেছিলেন। গ্রীষ্মের বিকেলে আকাশে কিছুটা মেঘ। দুসপ্তাহ ধরে বৃষ্টি হয় না। এই এক সমস্যা, বৃষ্টির লক্ষণ দেখা যায়, তবু বৃষ্টি হয় না। কেন হয় না জাহানারা বলতে পারবেন না। অনেক ব্যাখ্যা দেয় লোকজন। একদল বলে, আল্লাহ যখন চাইবেন, তখন হবে। অন্যদল বলে, মানুষ পৃথিবীর ওপর অত্যাচার করেছে, তাই বৃষ্টি হয় না। রাহেলের বাবা বলেন, দেখছ না পদ্মা নদীটাকে শুকিয়ে দিয়েছে ভারত। শুধু বিস্তীর্ণ বালুরাশি। বালুই সব জলীয় বাষ্প খেয়ে নিচ্ছে, তাই বৃষ্টি হয় না। জাহানারা বৃষ্টি নিয়ে ভাবেন ঠিকই, তবে কারো কথায় বিচলিত হন না। তিনি আসলে চিন্তিত হন কিন্তু বিচলিত হন না। এই অভ্যেসটা পেয়েছেন তিনি তার মায়ের কাছ থেকে। খুব বেশি কিছু না হলে তিনি উত্তেজিত হন না। তাহলে রাগী রাহেলের বাপের সাথে তার রাতদিন লেগেই থাকতো। কিন্তু লাগে না। তবে বৃষ্টির জন্য তার উন্মুখতা সেই শৈশব থেকে। সেই যে আমকুড়ানোর দিনে বড় ভাই হামিমের সাথে সারা পাড়া ঘুরে বেড়াতেন বৃষ্টিমুখর দিনে। বৃষ্টি না থামলে তারা বাড়ি ফিরতেন না। কোনো কোনো দিন বাবা একটু চোখ রাঙিয়ে বলতেন, জ্বর বাধাবি তখন দেখিস কি হয়, সব বন্ধ হয়ে যাবে। দুই ভাইবোন ভিজে জবজবে হয়ে বাড়ি ফিরত আর তাদের গায়ে অনেকক্ষণ বৃষ্টির ধারাপাতে নতুন একটা গন্ধ তৈরি হতো। মুখ হাত পা কেমন হালকা সাদা সাদা হয়ে যেত আর কেমন আশটে গন্ধ। ভাইকে তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন, কেন হাত পায়ের এরকম অবস্থা হয়। কোনো উত্তর পাননি। তিনি তো মন উদাস করে ভিজতেন আর নিজের মনের মাধুরি মিশিয়ে গান গাইতেন। অনেক গান গাইতেন হামিম ভাইও। সব গানের কথা জাহানারার মনে পড়ে না। সব গানের সুর তিনি জানতেন না। তবে শুনতে খারাপ লাগত না। একটা গান ভাই গাইতেন। সেই গানটার কথা মনে আছে, আজি ঝরো ঝরো মুখর বাদর দিনে, জানিনে, কিছুতে কেন যে মন লাগে না। এই চঞ্চল সজল পবন বেগে, উদ্ভ্রান্ত মেঘে মন চায়; মন চায় ওই বলাকার পথখানি নিতে চিনে। গানটি ভাইয়া প্রায়ই গাইতেন। মন হারাবার আজি বেলা, পথ ভুলিবার খেলা বলে, তিনি জাহানারার দিকে হাসিমুখে তাকাতেন। আরো একটা গান প্রায়ই তিনি গাইতেন, আজ আর সেটার কথা মনে নেই। তবে ভাইয়ার গান তার ভালো লাগত। সেই গানটা বাবার সাথেও রেডিওতে শুনেছে অনেকবার। তবে সুরটা মনে নেই। বড় ভাইয়া ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হবার পর আর তার সাথে ঘনিষ্ট হবার সুযোগ হয়নি। জানিনে জানিনে বলে ভাই যে টান দিত, সেই সুর আজও তার কানে বাজে। মাঝখানে কত বছর পার হলো! ভাইয়া খুব ভালো নেই। একবার যেতে হবে দেখতে। বুকের ভেতরটা কেমন খা-খা করে ওঠে। খোকাকে দেখলে, বিশেষ করে সে বাইরে থেকে এলে তার মনে হয় নিজের ভাইয়াই যেন এসেছেন। রাহেলের চেহারার সাথে ভাইয়ার চেহারার খানিকটা মিল আছে, অনেকেই বলে। তবে জাহানারা মনে করেন মিলটা অনেক বেশি।

জাহানারা হঠাৎ কিসের শব্দে, হ্যাঁ পাখির শব্দ, তাকে ভাবনার জগৎ থেকে বাস্তবে ফিরিয়ে আনে। শুনতে পান এই ম্লান বিকেলে উঠোনের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে খোকার লাগানো মাধবীলতার ঝাড়ে ছোট ছোট কয়েকটা পাখি কিচিরমিচির করছে। এখন ফুলের কোনো গন্ধ নেই, তবে সন্ধে হলেই ভীষণ মিষ্টি গন্ধে সারা বাড়ি ভরে যাবে। আচ্ছা রাত হলেই সুগন্ধিটা আসে কোথা থেকে? রাতের কি আলাদা কোনো শক্তি আছে? কীভাবে রাত ফুলের গন্ধ নিয়ে আসে? এই গাছটির দিকে তাকালে, নাকে মাধবীলতার গন্ধ এলে, খোকার কথা মনে পড়ে জাহানারার। প্রায় পাঁচ মাস হলো সে বাড়িছাড়া। ঢাকা না কোথায় গেছে, বলে যায়নি। যাবার সময় ছেলের হাতে নিজের জমানো কয়েক হাজার টাকা দিয়েছিল জাহানারা। কিন্তু রাহেলের বাবা তাকে কোনো টাকা দেননি। বলেছিলেন, অনেক তো দিয়েছি, আর কত? ওর বাবা ছেলের জন্য কোনো একটা দলের ব্যাংকে চাকরির ব্যবস্থা করেছিলেন, ছেলে রাজি হয়নি। জাহানারা সবটা জানেন না। জানেন না মানে, তাকে সব বলেননি রাহেলের বাবা। খোকা শুধু তাকে বলেছিল, মা আমি মরে গেলেও এদের কোনো প্রতিষ্ঠানে চাকরি করব না। এরা আমাকে ব্যবহার করবে ওদের দলীয় কাজে। জাহানারা বিষয়টি পরিষ্কার বুঝতে পারেননি। এখন নতুন চিন্তা হয়েছে রোমেলাকে নিয়ে। সে তো বাবার অমতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হল। তাও রাজশাহীর বাইরে। একা একা থাকবে। কোথায় সে টাকাপয়সা পাবে। কিছু টাকা নিয়ে গেছে, তবে তা দিয়ে কদিন চলবে, তিনি জানেন না। রোমেলার বাবা তো বলেছেন একপয়সা দেবেন না মেয়েকে। সাহেলি-রাসেল খেলতে গেছে। রাহেলের বাবা এখনো ফিরে আসেননি। তাকে বদলি করেছে বগুড়ার একটা কলেজে। প্রায় প্রতিদিন যাওয়া আসা করেন। মাঝে মাঝে কাজের চাপ থাকলে থেকে যান। আজ আসবেন কিনা বোঝা যাচ্ছে না। এলে এইসময়েই সাধারণত আসেন। জাহানারা হাতে একটা বই নিয়ে পড়তে চেষ্টা করছিলেন। বইটি হাতে ধরাও ছিল, তবে নানান চিন্তা তাকে গ্রাস করার ফলে বইটা হাতেই রয়ে গেছে, তেমন পড়া হয়নি। হঠাৎ বইটা মুখের কাছে ধরার জন্য সোজা হতেই দেখতে পান রাহেলের বাবা উঠোনের ও-মাথায় চলে এসেছেন। বরাবরের মতো ডাক দেন, রাহেলের মা, কোথায় আছ? জাহানার জবাব দেন, এই যে, বারান্দায়। খুব বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে তাকে। সাদা হাফ শার্টটা ঘেমে ভিজে গায়ের সাথে লেপ্টে আছে। মুখের কাঁচাপাকা ছোট ছোট দাড়ির ভেতর থেকে জলবিন্দু উঁকি দিচ্ছে। জাহানারা বারান্দার এককোণে রাখা গামছাটা এনে দিলেন। ঘাম মুছতে মুছতে তানভির বলেন, তোমার মেয়ের কোনো খবর পেলে? কাউকে দিয়ে তো একটা খবর দিতে পারত। তিন-চার দিন হলো, কোনো খবর নেই। জাহানারা জানেন, যতই মেয়েকে বকাবকি করুক, মেয়ের প্রতি তার গোপন ভালোবাসা লুকাতে পারেন না রাহেলের বাবা। রাহেল হবার চার বছর পর রোমেলা হলে ওর বাপের সেকি আনন্দ! এত আনন্দিত হতে তিনি মানুষটাকে কখনো দেখেননি। তিরিশ বছরের সংসারে এত উত্তেজিত হতেও কখনো দেখেননি। সেই রোমেলা বাবার অনুমতি না পেয়ে একা একা ঢাকায় ভর্তি হলো। বাবা কোনো টাকাপয়সা দিলেন না, ভাবতেই পারে না জাহানারা। এ নিয়ে কোনো তর্কে যাননি ওর বাবার সাথে। ভেবেছেন তিনি নিজেই একদিন হয়তো বলবেন। আজ যেমন বললেন। বোঝা যাচ্ছে মেয়েকে নিয়ে তিনি টেনশনে আছেন। খুব জোর দিয়ে বলতে পারেন না কিছু। কোথায় যেন একটা বাধা পান। জাহানারা বলেন, মেয়ে কোনো খবর দেয়নি, আমার মনে হয় দিতে পারেনি। আমাদের তো উচিত ছিলো খোঁজ নেওয়া। বলে তিনি তানভিরের দিকে তাকান জবাব শোনার জন্য। তানভির বলেন, কীভাবে খবর নেব, আর কেনই বা নেব। আমার সাথে যে ব্যবহার ও করল। বাবার সাথে এরকম না করলেও তো পারত। ও তো এখানে ভালো সাবজেক্টে পড়ার সুযোগ পেয়েছিল, ফার্মেসি বাদ দিয়ে বাংলায় পড়বে। ইংরেজিও পড়তে পারতো। দেখবে ও বড় খোকার মতো বেকার হয়ে যাবে। আমি তো কিছু বুঝে পাই না সবাই আমার সাথে কেন খারাপ ব্যবহার করে।
জাহানারা তাকিয়ে থাকেন স্বামীর দিকে। লোকটা তো এভাবে কথা বলেন না কখনো। আজ কেন বলছেন। তিনি বলেন, আচ্ছা, তুমি কি জানো রোমেলা কোথায় আছে? ওর কাছে কত টাকা আছে? একটা মেয়ে একা একা বাড়ি থেকে ঢাকা চলে গেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে আর তুমি বাবা হয়ে তার সাথে গেলে না, এটা কেমন হলো?

শোন, আমি আমার মেয়ের মঙ্গল চাই, যেমন সব বাবা চায়। তবে কিছু এথিক্যাল বিষয় রয়েছে যা আমি মেনে নিতে পারি না। তোমরা চলো আবেগ দিয়ে, আমি চলি যুক্তি দিয়ে। মেয়েটা গোল্লায় যাবে, অধঃপাতে যাবে, বাবা হয়ে আমি তা দেখতে পারব না। তোমার ছেলেটাও ভালো বিষয়ে পড়ে চাকরি পায় না, আমি চাকরি একটা ঠিক করলাম, তার পছন্দ না। কেন, কি হয়েছে? ওই ব্যাংকে তো কত ছেলে চাকরি করে।

ঠিক আছে, কিন্তু খোকার আপত্তির সাথে আবেগের সম্পর্ক নেই। সম্পর্ক তোমার সেই যুক্তির। যাদের দর্শন সে মানে না, তাদের সাথে সে থাকতে পারে না।
তুমি কী জানো কত প্রগতিশীল লোকের ছেলে-মেয়েরা ওদের প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে? তাদের জাত যায় না?
কারা কীভাবে গোপনে আপোসরফা করে সুবিধা নিচ্ছে, সেটা কোনো ভালো উদাহরণ হতে পারে না। ও তো বলেছে, একটা ব্যবস্থা ওর হবে। স্বাধীনভাবে নিজের যোগ্যতায় একটা চাকরি পেলে ওর মর্যাদা বাড়বে।

তোমাদের সবার মাথা খেয়েছে ওই তোমার ভাই হায়দার। তার বামপন্থী চিন্তা ঢুকে গেছে সবার মগজে, সেখানে অন্য কিছু ঢুকতে পারে না। সত্যজিতের সেই মগজ ধোলাইয়ের মতো।
তাই নাকি? তা তোমার এতো ভালো বুদ্ধি, ছেলেময়েদের মাথায় ঢোকে না কেন, তুমি তো মগজ ধোলাই করতে পারো সহজে। তারা তোমার কাছে কাছে থাকে আর তুমি তো ওদের বাবা।
বাবা তো বটেই, তবে ওদের কাছে আমি মূল্যহীন রয়ে গেলাম। দেখি ছোট দুটোকে পারি কিনা।

পারবে বলে মনে হয় না। কারণ তুমি চলছ স্রোতের বিপরীতে। হিমালয় থেকে যে নদী যাচ্ছে বঙ্গপোসাগরে, তার গতি বরাবরই সাগরের দিকে হবে। তুমি তাকে উল্টো দিকে নিতে চাও। সেটা কি সম্ভব?

তোমাদের সবার মাথা খেয়েছে ওই তোমার ভাই হায়দার। তার বামপন্থী চিন্তা ঢুকে গেছে সবার মগজে, সেখানে অন্য কিছু ঢুকতে পারে না। সত্যজিতের সেই মগজ ধোলাইয়ের মতো।

তানভির রেগে যায়। কথা বলে না। ততক্ষণে ছোট মেয়ে আর ছেলেটা বাড়ি ফিরেছে। সাহেলি ঝাঁপ দিয়ে বাবার কোলে চড়ে বসে। তার সারা গায়ে ধুলোবালি ঘামভর্তি, তবু তানভির কিছু বলেন না। আগেও বলতেন না। ছেলেমেয়েদের আদরযত্ন তিনি কম করেননি কোনো দিন, আজো করেন না। তারা বড় হয়ে গেলেই যেন বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। ছোটদুটোও হয়ে উঠবে কিনা কিছু অনুমান করতে পারেন না। তার বুকের ভেতরে একটা স্থায়ী যন্ত্রণা বাসা বেঁধে আছে। বড় দুই ছেলেমেয়ের দূরত্বের কারণে। সেটা কাউকে বলতে পারেন না। সামনাসামনি জিদ চেপে থাকে আর ভেতরে জমা হতে থাকে কষ্ট।

ছেলেমেয়ে দুটো হাত পা ধুয়ে পড়তে বসলে জাহানারা সবার জন্যে চা-নাশতা নিয়ে আসেন। তানভির ওদের টেবিলের পাশে বসেন একটা বই নিয়ে। কলেজে ক্লাস নেবার জন্য তাকে মাঝে মাঝে বই পড়তে হয়। দীর্ঘদিন চাকরি করার পর এখন বিষয়টা সহজ হয়ে গেছে। তবু নতুন ক্লাসে গেলে তিনি একটু-আধটু পড়াশোনা করেই যান। ছোট ছেলেমেয়ে দুটো পড়তে থাকে, জাহানারা উঠে যান। তানভির বসে থাকেন, ওদের কোনো সমস্যা হলে সমাধান করে দেন। ইংরেজি আর অংকটাই ওদের মূল সমস্যা। রাসেল পড়ে ফোরে আর সাহেলি থ্রিতে। মা-ও ওদের পড়াশোনায় সাহায্য করেন।
রাসেল পড়তে পড়তে জিজ্ঞেস করে, বাবা, তোমাদের কি এতসব বইখাতা ছিল? এত ইতিহাস ইংরেজি অংক? এই ইতিহাসে আমার গোলমাল পাকিয়ে যায়। আচ্ছা বাবা, তুমি কি যুদ্ধে গিয়েছিলে? সে সময় তো সবাই যুদ্ধে গিয়েছিলেন?

তানভির কিছুক্ষণ চুপ থাকেন। ছোট মানুষ কৌতূহল থেকে জিজ্ঞেস করছে, তিনি বোঝেন। সাবধানে জবাব দেন। আগের মতো আর বিরোধে জড়াতে চান না, যেমনটা হতো রোমেলার সাথে। সে তো হাইস্কুলে পড়ার সময় থেকে প্রায়ই তর্ক করত। আশ্চর্য, তার সাথে তর্ক করে তানভিরও পারতেন না। এই পরাজয় তিনি মেনে নিতে পারতেন না। ছোট দুজন যাতে তার সাথে আবার বিরোধে না যায় সে ব্যাপারে তাকে সাবধান থাকতে হবে বলে মনে করেন। খুব সাবধানে বলেন, যুদ্ধে যেতে পারিনি, সবাই কি আর যুদ্ধে যেতে পারেন? জীবন বাজি রেখে যুদ্ধে যাওয়া খুব কঠিন কাজ। আর তোর দাদা ছিলেন খুব অসুস্থ, তাকে রেখে যাবার কোনো উপায় ছিল না। তখন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তাম। বাড়িতেই থাকতাম সেই সময়। যেতে পারিনি।

রাসেল বলে, হায়দার মামা যুদ্ধে গিয়েছিলেন না? তুমি যদি যেতে, তাহলে আমরা বলতে পারতাম, আমার বাবা মুক্তিযোদ্ধা। আমার খুব গর্ব হত, তাই না বাবা?
তানভির বুঝতে পারেন রাসেলের ভেতরে স্বাধীনতা যুদ্ধের বিষয়ে গভীর আগ্রহ তৈরি হচ্ছে এবং সে একে নিজের মধ্যে লালন করা শুরু করেছে। ওকে কোনো নেগেটিভ কথা বলা যাবে না। বললে রোমেলার মতো অবস্থা হবে। দূরত্ব বাড়বে। সেটা ঠিক হবে না। ছেলের কথা শুনে তার মনে হয়, দেশে মুক্তিযুদ্ধের সরকার যে প্রচার প্রসার শুরু করেছে, তার প্রভাব শিশুদের মধ্যে পড়ছে। তারা এগিয়ে যাচ্ছে দীপ্র এক চেতনায়। এই কথাই রোমেলা বলত – বাবা, সেদিন দূরে নয় যেদিন গোটা দেশের মানুষ এক চেতনায় সামনের দিকে এগিয়ে যাবে। দেশের স্বাধীনতা ও মুক্তির বিপক্ষে কথা বলার কেউ থাকবে না। তানভিরকে চুপ থাকতে দেখে রাসেল আবার বলে, বাবা, তুমি তো কিছু বললে না।

তানভির বলেন, তোমার কথা ঠিক। বাবা মুক্তিযোদ্ধা হলে তার সন্তানদের গর্বে বুক ভরে যাবার কথা। কারণ, তারাই তো সেই নায়ক, যারা আমাদেরকে একটা স্বাধীন দেশ উপহার দিয়েছেন। আমার ছোট চাচা মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। বাবা যেতে পারেননি। তবে এক হিসেবে এদেশে সেই সময় যারা দেশে ছিলেন, তারাও সবাই মুক্তিযোদ্ধাই ছিলেন। সবাই কোনো না কোনোভাবে কষ্ট শিকার করেছেন। রাইফেল কাঁধে যুদ্ধে না গেলেও সবাই তো এরকমভাবে যুদ্ধ করেছেন। শুধু যারা পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিল, তারা নয়।

জাহানারা চা হাতে ঘরে প্রবেশ করেন। তানভিরের শেষের দিকের কয়েকটি কথা তার কানে যায়। তিনি খানিকটা হতচকিত হয়ে পড়েন রাহেলের বাবার কথা শুনে। রাহেলের বাবা কি তার অবস্থান পাল্টে ফেলতে চাচ্ছেন? রোমেলার সাথে যখন বাকযুদ্ধ হতো, তখন দেখেছেন তানভির কেমন গোঁয়ারের মতো তর্ক করত মেয়ের সাথে। না পেরে রেগে যেত আর রাগে গরগর করে বলতেন, এরা সব নষ্ট হয়ে গেছে। কিচ্ছু জানে না, শুধু জানে বাবার সাথে অহেতুক তর্ক করতে। আরে তোরা কী জানিস? দেশটা কত ভালো ছিল। স্বাধীনতার নামে শেখ মুজিব পাকিস্তান ভাঙল। তোরা কী জানিস? মুসলমানের দেশটা হিন্দুর দেশে পরিণত করল আর তোমরা দেখ প্রগতির স্বপ্ন। জাহানারা মনে করতে পারেন, তানভিরের সেই অগ্নিমূর্তি। সেই মানুষটা আজ এমন নরম করে কথা বলছে কেন? কারণটা কী? তার সাথে যখন বিয়ে হয় তখন লোকটা এমন কথা বলতেন না। তানভির রাজাকার পরিবারের সন্তান হলে বাবা তার সাথে জাহানারার বিয়ে দিতেন না। তানভির পড়তেন ইংরেজি সাহিত্যে। সবাই ভেবেছিলেন তানভির অন্তত কুসংস্কারাচ্ছন্ন হবেন না। প্রথম দিকে তার মানসিকতা জাহানারা বুঝতে পারতেন না। সে-সময় তানভির এসব বিষযে তেমন কিছু বলতেন না। হায়দার ভাইয়ের সাথে একদিন মৃদু তর্ক করলে তার অবস্থান সম্পর্কে জাহানারা কিছুটা বুঝতে পারেন। মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সাথে সম্পর্কিত হয়েও সে কেন এরকম মানসিকতাসম্পন্ন হয়ে উঠল, তা জাহানারা বুঝতে পারেন না। অবশ্য ছাত্রজীবনে তানভির কোনো দলের সাথে ছিলেন কিনা, জাহানারা জানেন না। শহরে বা কর্মক্ষেত্রে কাদের সাথে মেশেন, তা-ও জাহানারা জানেন না। তবে আজ সত্যি জাহানারা আশ্চর্য হচ্ছেন। চা নামিয়ে রাখেন ছোট্ট টেবিলে। চানাচুর বিস্কুট রাখেন। মুখে বলেন, তুমি যা বলছ, সেটা বিশ্বাস কর? যারা স্বাধীনতার বিপক্ষে ছিল, তাদের সবাইকে তো রাজাকার বলে, তাই না? সেটা ছেলেকে বললে না যে! তুমি কি মনে করো দেশ এখন সঠিক পথে চলছে? নাকি এখনো দেশ অশুভ অনৈসলামিক শক্তির দখলে? তানভির খানিকটা যেন ধরা পড়ে যান। কিছুক্ষণ চুপ করে থাকেন। জাহানারা সাধারণত রাজনৈতিক বিষয়ে কথা বলেন না, রোমেলা বা খোকার সামনে তিনি কখনো তাদের বাবার পক্ষে বা বিপক্ষে কোনো কথা বলেন না। আজ কীভাবে যেন মনের কথা বের হয়ে এল। জাহানারার বাবা পরহেজগার লোক হলেও স্বাধীনতার পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়েছিলেন। হায়দার ভাই যুদ্ধে গেলে স্নেহবশত আপত্তি করেছেন, পরে মেনে নিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তো জাহানারাদের বাড়িটা মুক্তিযোদ্ধাদের আস্তানা ছিল। তারা রাতের আঁধারে আসতেন হায়দার ভাইয়ের সাথে। কিছুদিন বা কিছু সময় শেল্টার নিয়ে আবার চলে যেতেন। তখন বাবা তাদের সব বলতেন। পাকিস্তান সরকারের সব অপতৎপরতার কথা বাবা বুঝিয়ে বলতেন, এ দেশীয় দোসরদের কথাও বলতেন। সেই থেকে জাহানারা সব স্পষ্ট উপলব্ধি করতে পারেন। তবু তানভিরের সাথে কখনো তর্ক করেন না। তানভির বলেন, বাচ্চাদের সামনে এসব আলাপ থাক, জাহানারা। পরে কথা বলব। জাহানারাও আর কথা বাড়ান না। বুঝতে পারেন মানুষটা এখন এ নিয়ে কথা বলতে চান না।

[চলবে]

যারা পড়তে পারেননি তারা পড়বার জন্যে নিচের লাইনটিতে ক্লিক করুন

প্রজাপতি পাখা মেলো পর্ব ১

Share Now শেয়ার করুন