মোস্তফা তারিকুল আহসান >> প্রজাপতি পাখা মেলো >> উপন্যাস (পর্ব ৩)

0
283

পূর্ববর্তী পর্বটি (পর্ব ২) পড়া না থাকলে এই বাক্যটাতে ক্লিক করে পড়ুন

শিউলি হঠাৎ বলে, রোমেলা দেখ, কবি হুমায়ুন আজাদ হেঁটে যাচ্ছেন। রোমেলা একবার বামে ঘুরে তাকায়, দেখে পাঞ্জাবি পরা একটা মানুষ কাঁধে ঝোলানো একটা ব্যাগ নিয়ে একটু দ্রুত হেঁটে যাচ্ছেন। সামনের দিকে ঝুঁকে ঝুঁকে। মনে হয় নিজের শরীরটাকে ছাড়িয়েও সবসময় এগিয়ে থাকতে চান।

শিউলি বের হবার আগে রোমেলাকে বলে, তুই যে ভর্তি হলি, ঢাকায় এলি, সে-খবর বাড়িতে দিয়েছিস? তোদের বাড়িতে টেলিফোন আছে না? চল আমরা কার্ড ফোন থেকে তোর বাসায় ফোন করি। সবাই নিশ্চয়ই খুব দুশ্চিন্তায় আছে। রোমেলা তখন চুল আচড়াচ্ছিল। একসাথে বের হবে দু’জনে রিকশা করে। ঢাকায় দু’দিন পার করল, আজ তৃতীয় দিন। বাবা-মাকে একটা খবর দিতে হতো। কিন্তু আবার মনে হয়, ফোনটা যদি বাবা ধরে, তাহলে রোমেলা কী বলবে। ভালো আছে বলেই তো খবর দেয়নি, বাবা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন। এটাই তো স্বাভাবিক। সে শিউলিকে বলে, কি বলব, কাকে বলব, ভেবে পাচ্ছি না। জানি, একটা খবর দেয়া দরকার। শিউলি বলে, এটা আবার কেমন কথা। বাবা-মাকে বলতে হবে না? রোমেলা শিউলিকে বলতে পারে না, বাড়িতে কী হয়েছিল আসার আগে। একসময় হয়তো বলতে হবে ওকে। তবে এখন বলতে ইচ্ছে করছে না। যদিও শিউলি তার ঘনিষ্ট বান্ধবী। এক জায়গায় বাড়ি হওয়ার জন্য সে অবশ্য বাড়ি গেলে সব জেনে যাবে। নিজের বাবার সাথে রোমেলার দূরত্ব, এই বিভাজনের কথা সে কাউকে বলতে চায় না। রোমেলা বলে, তুই চিন্তা করিস না। আমি ক্লাসের ফাঁকে আজ একসময় বাড়িতে ফোন করব। চল বের হই। তারা বের হতেই দেখে হলের সামনে কোনো রিকশা নেই। সকাল বেলা অনেক সময় রিকশা থাকে না। শিউলি বলে, চিন্তা করিস না, সামনে মোড়ের কাছে গেলে পাবো। আজ রোমেলার তিনটা ক্লাশ। নয়টায় শুরু, শেষ দুটোর দিকে। মাঝে বিরতি আছে। শিউলির ক’টা ক্লাস জানা থাকলে একসাথে আসা যেত। শিউলিও অনেকটা কাকতালভাবে বলে, তোর কখন শেষ হবে ক্লাস? আমার আড়াইটা বাজবে। তোর?

রোমেলা বলে, দুটো বাজবে।
তাহলে মধুর ক্যান্টিনে গিয়ে কিছু খেয়ে অপেক্ষা করিস, আমি এলে দু’জনে একসাথে ভাত খাব।
আচ্ছা। আমি তোর জন্য অপেক্ষা করব।

নিউমার্কেটের পাশ দিয়ে দিয়ে তারা হাঁটতে থাকে। হাঁটতে রোমেলার ভালেই লাগে। এখনো ঢাকা পুরোপুরি জেগে ওঠেনি, তাই কোলাহল বা জটলা নেই বললেই চলে। তবে খোলা ডাস্টবিন থেকে দুর্গন্ধ নাকে এলে রোমেলা নাকে রুমাল চেপে ধরে। ওকে দেখে শিউলি বলে, দোস্ত, এই হলো ঢাকা, দুর্গন্ধে নাক বন্ধ হবে, জ্যামে শরীর নাকাল হবে, তবু ঢাকা ছাড়বে না কেউ। দিন দিন লোকে ছুটে আসছে ঢাকার দিকে, এই স্রোত বন্ধ করতে না পারলে এই শহরের একদিন জানাযা পড়তে হবে। রোমেলা হাসতে হাসতে বলে, শহরের জানাযা হয় না কি, সে তো হয় মানুষের। বাবা শুনলে বলত, তোরা ইসলাম ধর্মকে অপমান করছ, এটা রীতিমত অন্যায়। শিউলি বেশ সচকিত হয়ে বলে, চাচাকে তো আমি চিনি, এরকম তিনি বলতেই পারেন না। তাছাড়া আমরা কী মিন করছি, সেটা তো বুঝতে হবে। আমরা কি সিম্পলি মজা করতে পারবো না, তাহলে মানসিক দিক দিয়ে, চিন্তার দিক দিয়ে, খুব সংকীর্ণ হয়ে পড়বো? এই জাতি তো খুব সৃজনশীল, সাধারণ গরিব গ্রামের মানুষও খুব সৃজনশীল। তাদের রসবোধ আরো বেশি। আমরা তো কোনোভাবে ধর্মকে অশ্রদ্ধা করি না। শিউলির কথা শুনে রোমেলা খানিকটা বিচলিত হয়। বাবা সম্পর্কে তার এভাবে ধারণা দেওয়া ঠিক হয়নি। এতে তো তারও অপমান। রোমেলা বলে, তুই তো দার্শনিক ব্যাখ্যা দিয়ে দিলি, অবশ্য যুক্তিও আছে তোর কথায়। আমার এমনি মনে হলো তাই বললাম। বাবা বলতো কিনা জানি না। ওরা নীলক্ষেতের মোড়ে চলে আসে। আর রিকশায় উঠতে ইচ্ছে করে না কারো। এখান থেকে খুব বেশি হলে মিনিট দশেক হাঁটলেই কলাভবনে পৌঁছুনো

ওরা বাম দিকে ছোট ছোট বইয়ের দোকানের পাশ দিয়ে একটু দ্রুত হাঁটতে থাকে। এফ রহমান হলের কাছে যেতে পারলে ঝামেলা শেষ। শিউলি হঠাৎ বলে, রোমেলা দেখ, কবি হুমায়ুন আজাদ হেঁটে যাচ্ছেন। রোমেলা একবার বামে ঘুরে তাকায়, দেখে পাঞ্জাবি পরা একটা মানুষ কাঁধে ঝোলানো একটা ব্যাগ নিয়ে একটু দ্রুত হেঁটে যাচ্ছেন। সামনের দিকে ঝুঁকে ঝুঁকে। মনে হয় নিজের শরীরটাকে ছাড়িয়েও সবসময় এগিয়ে থাকতে চান। রোমেলা চিনতে পারে না। শিউলি বলে, আমি চিনি, স্যার প্রায়ই এখানে আসেন। তোর সাথে একদিন আলাপ করিয়ে দেব। তোর নিশ্চয়ই ওর লেখা অনেক পছন্দ? আমিও পছন্দ করি, তবে সবটা নয়। ছোটদের লেখাগুলো আমার বেশি প্রিয়। রোমেলা বলে, আমি ওঁর উপন্যাস পছন্দ করি না। আমার পছন্দ ওঁর কবিতা। সব কিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে নামে তাঁর একটা কবিতা আছে, পড়েছিস? খুব ভালো কবিতা। কবিরা যে ভবিষ্যৎদ্রষ্টা হয় তা এটা পড়লে বোঝা যায়। শিউলি বলে, তোর চুরি করে কবিতা লেখার রোগ আছে নাকি? রোমেলা বলে, রোগ কি আর যায়। মাঝে মাঝে ভালো হয়, আবার রাজত্ব করতে আসে। শোন, ওঁর আরেকটা কবিতা আছে, সেটা আমাকে খুব স্পর্শ করে। আমার কন্যার জন্য প্রার্থনা সম্ভবত কবিতাটার নাম। অনেক আগে পড়া তো। সবটা মনে নেই। মেয়েটা বড় হচ্ছে, তার মধ্যে দেখা দিচ্ছে কত পরিবর্তন – নিজের গোপন পোশাক কিনছে, ছেলেবন্ধু জুটছে, প্রেম-দেহ সংসর্গ ঘটছে, আরো কত ব্যাপারস্যাপার মেয়েটার জীবনে আসবে, ষোল বছরের জীবনে। এর মধ্যে বাবা ক্রমশ মেয়ের কাছ থেকে দূরে সরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। বাবার কষ্টের কথা তিনি বলেছেন তবে মেয়েরও কম কষ্ট হয় না। আমি তো দেখেছি, আমার বাবার বেলায়। বাবার ঘাড়ে করে ঘুম পাড়ানোর স্মৃতি আমার জীবনের সেরা স্মৃতি। রোমেলা এক নিঃশ্বাসে বলে থামে।
শিউলি বলে, এটা তো সব বাবা-মেয়ের বেলায় হয়।
না, সবার হয় না।
কেন হবে না? আমারও তো ওরকম গভীর স্মৃতি আছে।
সবার বাবা একরকম না। অনেক বাবা আছে যারা জীবনে মেয়েকে কোলেও তোলেনি, ঘাড়ে করে ঘুম পাড়ানো তো দূরের কথা।
আমার বাবা প্রায়ই আমাকে মাইলের পর মাইল ঘাড়ে করে নিয়ে আসত বাসায়। আমি ইচ্ছে করে বলতাম হাঁটতে পারছি না।
ওরকম আমার বেলায়ও ঘটেছে।
ওরা কলাভবনের দোতলায় উঠেই দুজন দু’দিকে চলে যায় হাই দিয়ে।

তার মনে হয়, কবি নজরুল যখন রুটির দোকানে কাজ করত, তার বয়স কি এর চেয়ে কম ছিল না বেশি! ছেলেটার চোখেমুখে অস্পষ্ট বোবা ভাষা। এই ভাষা নীরব, কোমল। এরকম পরিস্থিনি নিয়ে কোন কবি যেন লিখেছিলেন, রবীন্দ্রনাথ বোধ হয়। সে ছেলেটার পথের দিকে তাকিয়ে থাকে। মনে করে এরকম কত ছেলে আছে বাংলাদেশে।

ডান দিকের পূর্ব কোণায় একটা টেবিল খালি পায় রোমেলা। বেলাকে বলেছিল আসতে। সে বলেছে রুমে তার হবু ভাবি তার জন্যে ইলিশ মাছের ঝোল করেছে। সে না হয় ইলিশের ঝোল খাচ্ছে। কিন্তু রোমেলার উপায় কী হবে? লোকজন গিজগিজ করছে ক্যান্টিনে। সবাই প্রায় ভাত খাচ্ছে। এখন এখানে ভাত না খেয়ে অন্য কিছু অর্ডার দেওয়াই মুশকিল। এদিকে পেটে খিদে চোঁ চোঁ করছে। মনে মনে ভাবে বসে থাকি, দেখি কোনো বয়-ছোকরা আসে কি না। ডাকাডাকির দরকার কি। একা বসে থাকতেই ওকে একাকিত্বে পায়। বাবা মা রাসেল সাহেলির কথা খুব মনে পড়ে। ওদের ছেড়ে তো কখনো বাইরে থাকেনি। আজকেই বাবা-মাকে ফোন করবে অথবা চিঠি লিখবে। বাবার জন্য বেশি মন খারাপ হয়। কী মনে করছে, কী জানি। বাবা কি সহজ হবে নাকি তাকে টিউশনি করে লেখাপড়া করতে হবে! টিউশনি করলে নিজে পড়বে কখন? শিউলিকে অবশ্য বলতে হবে টিউশনির কথা। অনেক মেয়ে আজিমপুরের দিকে টিউশনি করে। একটা টিউশনি হলে চলে যাবে। আবার ভাবে, শিউলি কীভাবে নেবে ব্যাপারটা। সে যদি জিজ্ঞেস করে তোর টিউশনির কী দরকার? ভাবতে ভাবতে দেখে একটা ছেলে এসে বলছে, আপা কী লাগব? রোমেলা হুট করে বলে, একটা সিঙ্গাড়া নিয়ে আস। ছেলেটা বলে, বাত খাইবেন না? সে বলে, খাবো, একটু পরে। আরেকজন আসবে, একসাথে খাব।
ম্রিয়মান ভঙ্গিতে ছেলেটা চলে যায়। রোমেলা গভীরভাবে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে থাকে। ছেলেটা রাসেলের বয়সী হবে। ঝাঁকড়া ময়লা চুল মাথায়। ছেঁড়া একাট স্যান্ডো গেঞ্জি গায়। কবে চুল আঁচড়িয়েছে বোঝার উপায় নেই। তার মনে হয়, কবি নজরুল যখন রুটির দোকানে কাজ করত, তার বয়স কি এর চেয়ে কম ছিল না বেশি! ছেলেটার চোখেমুখে অস্পষ্ট বোবা ভাষা। এই ভাষা নীরব, কোমল। এরকম পরিস্থিনি নিয়ে কোন কবি যেন লিখেছিলেন, রবীন্দ্রনাথ বোধ হয়। সে ছেলেটার পথের দিকে তাকিয়ে থাকে। মনে করে এরকম কত ছেলে আছে বাংলাদেশে। লেখাপড়া বাদ দিয়ে, খেলাধুলো বাদ দিয়ে, আধপেটা খেয়ে না-ঘুমিয়ে কাটছে তাদের দিন। সে শুনেছে হোটেলের মালিকেরা এদের ঠিকমতো খেতে দেয় না। আবার এদের শ্রমের চাহিদাও বেশি। কারণ, এদের কম টাকা দিয়ে রাখা যায়। বাংলাদেশে এদের সংখ্যা কত হবে? সরকারের কাছে কোনো তথ্য আছে বলে মনে হয় না। বাবার কথা মনে হয়। বাবা প্রায়ই বলত, স্বাধীনতা মানে অর্থনৈতিক মুক্তি। তো দেশ স্বাধীন হয়ে কী লাভ হয়েছে? সেই যদি দেশটা ধনীদের দখলে থাকে, গরিবরা থাকে নিরন্ন, তাহলে এই স্বাধীনতার মূল্য কী? বাবা অবশ্য ঘুরিয়ে তার জায়গায় চলে যান – আইয়ুব খান ভালো ছিল বাঙালির জন্য। ডাণ্ডা মেরে সব ঠাণ্ডা করে দিত। এতো চুরি ঘুষ রাহাজানি হতে পারত না। স্বাধীন হয়ে এই হয়েছে লাভ। মা মাঝে মাঝে ক্ষেপে যেত বাবার ওপর। একদিন বলেছিল, স্বাধীনতা এসেছিল বলে তুমি আজ সরকারি কলেজে চাকরি করো। দেশের সব বড় বড় প্রশাসনিক পদে বাঙালিরা। আর্মির শাসনে ডাণ্ডা মারা ছাড়া আর কী আছে? আজো পর্যন্ত তোমার সাধের পাকিস্তান সামরিক শাসনের যাঁতাকলে নিষ্পেষিত। আর আমেরিকার পদলেহন করে দেশটাকে জঙ্গি রাষ্ট্র করে ফেলেছে। প্রতিদিন মসজিদে বোমা মারছে। নিজেরা নিজেদের মারছে। মসজিদে কারা যায়? নিশ্চয়ই মুসলমান, তো তাদের মেরে কি ইসলাম রক্ষা হচ্ছে? বাবা সেদিন অনেক কথাই তাকে শুনিয়েছিল। তার সব মনে আছে। একদিন সে উপযুক্ত জবাব দেবে। বাবাকে সে ঠিক বোঝাবে, রোমেলা ঠিক পথে আছে। বাবা বরং ভুল পথে চলছেন। ভুল ধারণা আঁকড়ে আছেন।

ছেলেটো প্লাস্টিকের একটা চওড়া বাটিতে একটা সিঙ্গাড়া আর একগ্লাস পানি আনে। প্লেটে একটু সালাদও আছে। তার ইচ্ছে হয় ছেলেটাকে সব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিজ্ঞেস করে। আবার মনে করে, এতো ব্যস্ত সময়ে তাকে আটকে রাখা ঠিক হবে না। কেমন মায়াবি মায়াবি চেহারা। বেচারা দুপুরে খেতে পেয়েছে কিনা, কে জানে। রোমেলা তবু তাকে হঠাৎ করে বলে ফেলে, এই, তুমি দুপুরে খেয়েছ? ছেলেটা ওর দিকে তাকায় বিস্ময়ভরা চোখে। যেন আজব প্রশ্ন করে ফেলেছে। খানিক পরে অনিচ্ছা সত্ত্বেও বলে, হ খাইচি। বলেই সে চলে যায়। রোমেলা আবার ওর দিকে তাকায় আর ওই দিকে তাকাতেই দেখতে পায় শিউলি আসছে একটা ছেলেকে সাথে করে। মনে হয় ওর সাথে পড়ে।

রোমেলা বলে, সবাইকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে হবে কেন? এত হট্টগোলের মধ্যে কীভাবে জ্ঞানচর্চা হবে। শিউলি বলে, তোর মতো পড়ুয়ারা থাকলে ঠিকই হবে। রকিব বলে, আসলে রোমেলার কথায় যুক্তি আছে। উন্নত দেশে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার সুযোগ থাকে বেশি। এতো অনার্স মাস্টার্স পৃথিবীর কোনো দেশে পড়ে না।

শিউলি দাঁড়িয়েই বলে, ও রকিব, আমার ক্লাসমেট। আর রকিব, ও হচ্ছে রোমেলা, আমার বাল্যবন্ধু। দু’জন দু’জনকে হাই বলে। সবার বসা হলে শিউলি বলে, তো কি খাবি বল? রকিব বলে, তুই কি হোস্ট? তাহলে ভালো কিছু খাব। শিউলি বলে, এটা কেমন কথা। তোকে নতুন একজনের সাখে পরিচয় করিয়ে দিলাম। কোথায় তুই অফার দিবি, না, তুই নিজেই খেতে চাচ্ছিস। রকিব বলে, এই কথা, তুই ডেকে নিয়ে এসে আমাকে হোস্ট হতে বলিস কোন আক্কেলে? এতক্ষণ রোমেলা ওদের কথা শুনছিল। এবার সে বলে, ঠিক আছে, আজ আমি খাওয়াব। আমিই তো টেবিল নিয়ে বসে আছি তোদের জন্যে। শিউলি বলে, আরে রাখ, আমরা তো মজা করছি। তুই আজ প্রথম এলি এখানে খেতে। আমরা তোকে খাওয়াব। ওদের দেখে সেই ছেলেটা আবার ওদের টেবিলের কাছে এলো ততক্ষণে। শিউলি বলে, গরম খাবার কী হবে, আলিফ? ছেলেটা বলে, আপা, খিচড়ি ডিমভাজি ভালো গরম গরম হইবো, দিমু? রকিব বলে, লাগাও। সে রোমেলাকে উদ্দেশ করে বলে, কেমন লাগছে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়? রোমেলা বলে, ভালো, তবে ছাত্রসংখ্যা অর্ধেক হলে ভালো হতো। রকিব বলে, সেটা আর কি সম্ভব? পনের কোটি মানুষের দেশে সেটা সম্ভব না। রোমেলা বলে, সবাইকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে হবে কেন? এত হট্টগোলের মধ্যে কীভাবে জ্ঞানচর্চা হবে। শিউলি বলে, তোর মতো পড়ুয়ারা থাকলে ঠিকই হবে। রকিব বলে, আসলে রোমেলার কথায় যুক্তি আছে। উন্নত দেশে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার সুযোগ থাকে বেশি। এতো অনার্স মাস্টার্স পৃথিবীর কোনো দেশে পড়ে না। আর হয়েছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, তারা রাজনৈতিক নেতাদের চাহিদা মাফিক টাকা খেয়ে পাড়ায় পাড়ায় অনার্স এমএ চালু করে দিয়েছে। না আছে ক্লাসরুম, না আছে শিক্ষক, না আছে লাইব্রেরি, না আছে ল্যাব। যে-মানুষ অনার্স কী জিনিস জানে না, সেও অনার্স ক্লাসে পড়ে। এই কি উচ্চশিক্ষা?

হায়দার মামা প্রায় বলত, এই হচ্ছে তোদের পুঁজিবাদের সমস্যা, সবাই রাতারাতি ফাঁকিফুকি দিয়ে বড়লোক হতে চায়। তার জন্য যত অন্যায় করা দরকার, করবে। মানুষের অধিকার কেড়ে নেবে। খাবারে ভেজাল দেবে, ওজনে কম দেবে, ফাটকাবাজি করবে। তারপর বড়লোক হবার পর ব্যবহার করবে ধর্মকে।

রোমেলা ওদের কথায় খুব মনোযোগ দিতে পারে না, কেমন যেন বিষণ্ণ হয়ে বসে থাকে। ততক্ষণে তাদের খিঁচুড়ি ডিম চলে এসেছে। রকিব বলে, পেটের মধ্যে ইঁদুর দৌড় শুরু হয়ে গেছে। আসো শুরু করি। রোমেলা বলে, হ্যাঁ, শুরু করো। রোমেলা শুরু করে। তবে মনটা হঠাৎ করে যেন চুপসে যায়। শিউলি বুঝতে পারে। সে বলে, তোর কোনো সমস্যা হচ্ছে? শরীর ঠিক আছে তো? রোমেলা বলে, ঠিক আছে। তোমরা খাও। আমিও খাচ্ছি। বেশি ঝাল দিয়ে আর কীভাবে যেন মাংসের ফ্লেবার নিয়ে এসেছে খিঁচুড়িতে। সবাই খাচ্ছে। আশেপাশে অনেকে খাচ্ছে। এখন মনে হয় ভাত শেষ। রোমেলা বুঝতে পারে, পুরনো মাংসের তরকারির ঝোল দিয়েছে খিচুড়ির মধ্যে ঢেলে। সে মা-র রান্নার সময় দেখেছে। তবে মা তো নষ্ট তরকারি দিত না। এরা ব্যবসায় লাভের জন্যে নষ্ট তরকারি দিতে পারে। হায়দার মামা প্রায় বলত, এই হচ্ছে তোদের পুঁজিবাদের সমস্যা, সবাই রাতারাতি ফাঁকিফুকি দিয়ে বড়লোক হতে চায়। তার জন্য যত অন্যায় করা দরকার, করবে। মানুষের অধিকার কেড়ে নেবে। খাবারে ভেজাল দেবে, ওজনে কম দেবে, ফাটকাবাজি করবে। তারপর বড়লোক হবার পর ব্যবহার করবে ধর্মকে। হজ্ব করবে, মসজিদে টাকা দেবে অনেক। সমাজে মাথা তুলে দাঁড়াবে বড় ভালো ধনী মানুষ হিসেবে। শেখ সাহেব বলেছিলেন, তিনি চোরের খনি পেয়েছেন। আসলে একটা ক্লাসিক আদর্শ সামনে না থাকলে এরকম অপরাধের জোয়ার থামানো যায় না। নতুন স্বাধীন দেশে এগুলো একটা কমন সিনড্রম। মামার কথাগুলো তার মগজে আজো গেঁথে আছে। বহুদিন মামার সাথে দেখা নেই। শুনেছে মামা শহরে থাকে। বিয়ে করেনি। কি যেন একটা করে। তবে দল আর করে না। রাগে নাকি ক্ষোভে তা সে জানে না।

(চলবে)

++++

আপনি যদি এই লেখাটি সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করতে চান তাহলে আমাদের ফেসবুক ভিজিট করুন।