মোস্তফা তারিকুল আহসান >> প্রজাপতি পাখা মেলো >> উপন্যাস (পর্ব ৫)

1
278

আগে (পর্ব ১-৪) যা ঘটেছিল

রোমেলা তার রক্ষণশীল ধর্মান্ধ বাবা তানভিরের অমতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। প্রথম দিন ক্লাসে ঢুকেই সামান্য কথা বলার কারণে শিক্ষকের কাছে তিরষ্কৃত হয়, খুব কষ্ট পায় সে। দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধা মামা হায়দারের আদর্শ মনেপ্রাণে ধারণ করে রোমেলা বড় হয়েছে। কিন্তু রক্ষণশীল ধর্মান্ধ বাবা মুক্তিযুদ্ধকে মানতে চান না।  রোমেলা ও শিউলি দুই বন্ধু। একবছর আগে ভর্তি হওয়া শিউলির মৈত্রী হলের রুমেই রোমেলা থাকে। কিন্তু বড় ভাই রাসেল বাবার সঙ্গে বিবাদ করে বাড়ি ছেড়ে গেছে, তার আর কোনো খবর নেই। রোমেলা ক্লাস করছে। পত্রপত্রিকা পড়ার জন্যে সে লাইব্রেরিতে ঢোকে। মনে পড়ে যায় একই গ্রামের পরিচিত শুভর কথা। শুভ যে কোথায় রাহেলা এখন জানে না। লাইব্রেরিতে দেখা হয় সহপাঠী আসিফের সাথে। ওরা লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে ভাষা ইনস্টিটিউটের পাশের ফুটপাথে বলে চা খায়। একটা মিছিল সামনে গিয়ে গেলে তারুণ্যের প্রতিবাদের ভাষা যে মিছিল, এই নিয়ে কথা বলে।

পর্ব ৫

অধ্যায় ৪

মধ্যপ্রাচ্যের দিকে তাকাও, দেখ, কীভাবে তারা মেয়েদের ব্যবহার করছে। তারা মেয়েদের শ্রেফ ভোগের বস্তু বানিয়ে ফেলেছে। তাদেরকে মানুষ হিসেবে ন্যূনতম মূল্য দেয় না। মানুষ হিসেবে মেয়েদের অধিকারই নেই। না হলে কোনো এক যুবরাজ এসে বলবে কেন মেয়েদেরও গাড়ি চালাবার অধিকার আছে।

স্কুলে যাওয়ার সময় প্রায়ই ভাইয়ার দেরি হয়। রোমেলা জামাকাপড় পরে বইখাতা নিয়ে ছাতা নিয়ে উঠানে দাঁড়িয়ে ভাইয়াকে ডাকে। ভাইয়া আসে না। রোমেলা পড়ে সিক্সে আর ভাইয়া টেনে। একই স্কুলে। যায়ও একসাথে। রোমেলার প্রাইমারি স্কুলটাও হাইস্কুলের সাথে ছিল। ফলে ভাইবোন একসাথে স্কুলে যেত অনেক বছর। তবে রাহেল বরাবর দেরি করে ফেলত। সে বাবার জোরাজুরিতে নাস্তা ঠিকই একসাথে করে, তবে জামাকাপড় পরে আর অন্য জিনিসপত্র খুঁজে পায় না। ব্যাগের মধ্যে বইখাতা ঠিকমতো পায় না। বই পেলে কলম পায় না। আগে বললে রোমেলা খুঁজে দিতে পারত, আগেভাগে বলত না। রোমেলা ডাকে, ভাইয়া, আসো, দেরি হয়ে যাবে তো। রাহেল ঘরের ভেতর থেকে বলে, দাঁড়া আর একটু। মা গিয়ে দেখে, ছেলে জ্যামিতি বক্স খুঁজে খুঁজে হয়রান। জাহানারা বলে, তোর ব্যাগ আগে দেখ। দেখেছি তো, রাহেল বলে। মা বলে, দে আমাকে। জাহানারা সমস্ত ব্যাগটা ওর খাটের ওপর উপুড় করে ফেলে। দেখে ঠিকই জ্যামিতি বক্স ওখানে। ‘কি হলো, হাঁদারাম, তখন থেকে চিল্লাচিল্লি করে বাড়ি মাথায় করে দিচ্ছিস।’ জাহানারা বেশ জোর দিয়ে বলে। সে তো জানে সে হারানোর ওস্তাদ। সবকিছু হারায়। কোন জিনিস কোথায় রাখবে জানে না। কিচ্ছু মনে করতে পারে না। তবে পড়া সব মনে থাকে। স্কুলে ওর রেজাল্ট ভালো। সায়েন্সে পড়ে। বেশ কয়েকটা সাবজেক্টে লেটার মার্ক পেয়েছে টেস্ট পরীক্ষায়। সামনে এসএসসি। বাবা তো প্রতিদিন বলে, এই ছেলে শেষ পর্যন্ত যে কী করবে, আল্লাই জানে। রাহেল যায় বোনের সাথে, দুজন গল্প করতে করতে প্রায় মাইলখানেক পথ হেঁটেই যায়। মফস্বল শহরের স্কুল হলেও বেশ বড় আর পুরনো স্কুল।

তানভির এখনো বের হয়নি। তানভির প্রায় তৈরি হয়েই আছে। ছেলেমেয়েরা যাবার পর সে রওনা দেয়। যাওয়ার আগে প্রতিদিন কিছু কথা বলে জাহানারাকে। বারান্দা থেকে নামার সময় বারান্দার সিঁড়িতে বসে জুতো পরে, মোজা পরে। নিজেদের এই বাড়িটাকে জাহানারা চকচকে করে রাখে বলে কেউ নোংরা করে না। উঠানটাও বেশ বড়, সেটাও পরিষ্কার রাখতে হয়। উঠানের শেষে একটা বড় আম গাছ। তার ওপারে পুকুর। শ্বশুর থাকতেই পুকুর একবার সংস্কার করা হয়েছিল। এখনো বেশ গর্ত আছে। সারা বছর পানি থাকে। পুকুরের চারপাশে নানা জাতের গাছ। অনেকগুলো গাছ জাহানারার হাতে লাগানো। শ্বশুর তার সাথে করে সারা বাড়ি ঘুরত। আর এটা-ওটা লাগাত। নতুন বউকে নিয়ে বুড়োর এক নতুন জগৎ তৈরি হলো যেন। পুকুরের বাম পাশের ছোট্ট ক্ষেতে নানা জাতের সবজি লাগাত শ্বশুর। আশ্চর্য ব্যাপার, তিনি কখনো ছেলেকে ডাকতেন না, নিজে করতেন, কামলা রাখতেন আর সঙ্গে জাহানারা। বাবাকে রেখে এসে জাহানারার নতুন বাবা হলো। জাহানারা সত্যি শ্বশুরকে বাবা মনে করত। সাহেলি হওয়ার পর শ্বশুর মারা গেলেন। সেই থেকে জাহানারা আর ক্ষেতে যায় না, আসলে যেতে পারে না। যে-গাছগুলো সে আর শ্বশুর মিলে লাগাত, সেই গাছগুলোর সামনে যেতে তার খুব খারাপ লাগত। দু-একবার গিয়েছে, পরে আর যায় নি। গাছপালাগুলো যেন তাকে জিজ্ঞেস করে, বুড়োটাকে কোথায় রেখে এলে, তাদের বোবা ম্লান মুখ জাহানারাকে কষ্ট দিত, সে যেতে পারত না। পুকুরের চারপাশটা কখনো কখনো তানভিরের সাথে দু-একবার ঘুরে এসেছে। কোথাও জঙ্গল হলে তানভিরকে বলে। আর মাছ ধরার সময় সে পুকুরের ধারে গিয়ে বসে থাকে। তানভিরও মাছ ধরে না। মাছ ধরে খোকা আর রোমেলা। রোমেলা ছেলেদের মতো সব করতে পারে। এ নিয়ে ওর বাবার সাথে বাধে। নারকেল গাছে চড়া থেকে শুরু করে পুকুরে জাল দিয়ে মাছ ধরা সব সে করে নিঁখুতভাবে। ছেলের মতো স্বভাব ওর, বাবা একদম পছন্দ করে না। সে বাবার সামনে একদিন নারকেল গাছে চড়ে নারকেল পাড়লে বাবা ভীষণ রাগ করেছিল। বকাবকিও করেছিল। বাবার সামনে এসে সে দুটো ডাব ফেলে দিয়ে বলেছিল, দেখ বাবা, তোমার জন্য ডাব পেড়েছি। রোমেলা প্রায়ই আব্বা না বলে বাবা বলে, জানে, এটাও বাবার পছন্দ না, তবু বলে। বাবাকে ক্ষেপাবার জন্য বলে না, বরং শুনতে শুনতে যেন বাবা কথাটাতে অভ্যস্ত হয়ে যায় সেজন্য বলে। ডাব সে ধরে রেখেছে দাঁত দিয়ে। বাবা বলে, এটা কি হচ্ছে খুকি, এটা কি তোমার কাজ? এসব হলো ছেলেদের কাজ। ছেলেমেয়ে যে আলাদা, তাদের কাজের ধরন যে আলাদা, সেটা জান না? আমাদের ধর্মে এসব বিষয়ে স্পষ্ট করে বলা আছে। তাছাড়া মেয়েদের যা শারীরিক গড়ন সেদিকেও লক্ষ রাখতে হবে তো। এটা আর কক্ষনো করবে না। রোমেলা খুব নরম সুরে বাবাকে বলেছে, শোনো বাবা, আমার ভাল লাগে তাই আমি করি, আর মেয়েরা শুধু পুতুল খেলবে সেটাও আমি মনে করি না। দেখ, ভাইয়া ছেলে হয়েও গাছে চড়তে পারে না। আমি পারি, তাই করছি। ধর্মের কথা এখানে কেন আসবে। ধর্মে কি ডাব পাড়ার কথা আছে? তানভির মেয়ের সাথে পারে না। তবে বলে, দেখ, তোমার সাথে আমি তর্কে যাব না আর, তবে আমার পছন্দ না বলে রাখলাম, একদিন দেখব একটা হাত ভেঙে বসে পড়ে আছ। তখন কী হবে শুনি? রোমেলা বলে, সেটা তো দুর্ঘটনা, সেটা যে কারো হতে পারে। তুমি যে মাঝে মাঝে সাইকেল চালাও, তোমারও হতে পারে। আমিও তো তোমার সাইকেল চালাই, জানো না তো। তানভির মেয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। এ মেয়ে তো দেখি তার সব অপছন্দের কাজ করে। তানভির বলে, আর সাইকেল চালাবে না, আর বড় রাস্তায় তো চালাবেই না। ততক্ষণে রোমেলা বাবার জন্যে ডাব কেটে একগ্লাস পানি হাতে দেওয়ার জন্য দাঁড়িয়েছে। তানভির বলে, খাব না। তোমরা খাও। মেয়ের পীড়াপিড়ি থামে না। অগত্যা তাকে খেতে হয়। রাগ যে পরিমাণ করেছিল তা দেখাতে পারে না, মনে মনে পুষে রাখে।

বাড়িটা শহরের কাছাকাছি। তবে গ্রামের মতো। এমনিতে শহরের সব সুযোগ সুবিধা আছে আবার গ্রামের ছায়া সুনিবিড় পরিবেশও আছে। আগে চারটে টিনের ঘর ছিল জাহানারার যখন বিয়ে হয়। তখনও শাশুড়ি ছিলেন। তানভির তার বাবার সাথে মিলে একতলা পাকা ঘর করে। সে বোধ হয় কিছু টাকা আগেভাগে জমিয়ে রেখেছিল। একটু একটু করে পাকা বাড়িটা হলো। সবাই মিলে বাড়িটা পরিপাটি করে রাখার চেষ্টা করে। রোমেলা অগোছালো না। খোকাও মোটামুটি গোছালো। কেবল ছোট দুই ভাইবোন কিছুই মানে না। ওরা অবশ্য এখনো বুঝতে শেখেনি। বারান্দা থেকে নেমে দাঁড়ানোর সময় জাহানারা কাছে এসে দাঁড়ায়, এটাই নিয়ম হয়ে গেছে গত কুড়ি বছরে। তানভির মুখে কিছু বলে না, তবে একটা অদৃশ্য বোঝাপড়া চলছে যেন। উত্তরদিকে মুখ করে ছেলেমেয়েদের পথের দিকে তাকিয়ে থাকে তানভির আর সেই তাকানোর সাথে যেন যোগ দেয় জাহানারা। তানভির বলে, দেখেছ, তোমার মেয়ে কেমন বড় হয়ে গেছে। ওর ছাতার মধ্যে মাথা গলিয়ে রাহেল যাচ্ছে, তবু রোমেলাকে ছোট মনে হচ্ছে না। অথচ তোমার মনে আছে নিশ্চয়ই রাহেলই বোনের নাম রাখল। চার বছরের ছোট, তাই না? জাহানারা বলে, চার বছর দুই মাস। রাহেল হয়েছিল, কার্তিক মাসে আর জাহানারা মাঘ মাসে। তোমার তো মনে আছে নিশ্চয়ই, সেদিন ছিল হাটবার, মানে শুক্রবার। আর খোকা হয়েছিল সোমবারে। আমি তা বলছি নে, বলছি মেয়ে তোমার কত তাড়াতাড়ি বড় হচ্ছে দেখতে পাচ্ছ। স্কুল পাশ করবে, কলেজে যাবে। কতদিন আর ঘরে রাখতে পারবে। তবে শোন, বড় মেয়েদের বোরখা পরা উচিত। পর্দা ইসলামের শিক্ষা, মেনে চলা উচিত। আমি তো মেয়েকে বলেছি, সে শোনে না আমার কথা। যদিও-বা শুনত, তোমার ছেলে এমন সব কথা বলল যে সে আরও লাফিয়ে উঠল। দেখ জাহানারা, নারীদের শরীর হেফাজত করা ফরজ, তোমার মেয়ে ফরজ মানবে না?

জাহানারা জানে তানভিরের কথায় যুক্তি আছে, যুক্তি আছে ধর্মের দিক দিয়েও। কিন্তু প্রচলিত জীবনধারার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে না পারলে ছেলেমেয়েরা তো হীনন্মন্যতায় ভুগবে। তাছাড়া নবীর দেশের নিয়ম এদেশের জন্য, আমাদের জীবন-সংস্কৃতির সাথে মানানসই করে নেবারও তো দরকার আছে। সেও তো নবীর শিক্ষা। কিন্তু সে তর্কে যায় না। জানে তর্ক করলে তানভির আরো অনেক কথা শোনাবে, হাদিস কোরান থেকে উদাহরণ দেবে। জাহানারা শুধু বলে, তুমি মেয়েকে বলো, বুঝিয়ে দেখো, পারো কি-না। আমাকে তো ওরা পাত্তাই দেয় না। আমি তো তোমাদের মতো লেখাপড়া জানি না, যা শিখেছিলাম সব তোমার সংসারে এসে ধুয়েমুছে গেছে। তানভির কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে জাহানারার দিকে। সে তো জানে মেয়েকে বুঝিয়ে পারবে না। যেদিন প্রথম সে কথা তুলেছিল, সেদিন রোমেলা ভীষণ রেগে বলেছিল, বাবা, এসব তুমি কি বলো! তুমি তো জানো, আমি তো খুব ভাল পোশাকআশাক পরি, বোরখা কেন পরতে হবে? তুমি তো আমাকে মাদ্রাসায় দিতে চেয়েছিলে, সেটা পারনি বলে আমাকে এখন মাদ্রাসার মতোন পোশাক পরে স্কুলে যেতে হবে? ভাই ওকে সাপোর্ট করে বলে, শোন বাবা, আমরা তো আরবে বাস করি না। ওদের দেশে বোরখার দরকার ছিল, সেটা ওদের আবহাওয়ার জন্যে। আর বোরখা পরলেই মেয়েদের ওপর অত্যাচার কমবে এই ধারণাও ঠিক নয়। এটা একটা সামাজিক ব্যাধির মতো। আমরা আমাদের মনুষত্বকে জাগাতে না পারলে কোনো লাভ নেই। পশুত্বের জয় হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের দিকে তাকাও, দেখ, কীভাবে তারা মেয়েদের ব্যবহার করছে। তারা মেয়েদের শ্রেফ ভোগের বস্তু বানিয়ে ফেলেছে। তাদেরকে মানুষ হিসেবে ন্যূনতম মূল্য দেয় না। মানুষ হিসেবে মেয়েদের অধিকারই নেই। না হলে কোনো এক যুবরাজ এসে বলবে কেন মেয়েদেরও গাড়ি চালাবার অধিকার আছে। আর বোরখা তো নির্দিষ্ট করা হয়নি কোথাও। ভালো পোশাক পরতে বলা হয়েছে যাতে মেয়েদের শরীর ভালোভাবে ঢাকা থাকে। সেটা তো ও করে। তাছাড়া বাবা, ওর তো এখন খেলাধুলার বয়স। ওর শৈশব কৈশোর কেড়ে নিয়ে ওকে বয়স্কা মহিলা বানিয়ে ফেললে ওর তো মৃত্যু হবে। বাবা ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। ওর মনে হয় ছেলে ওর মামা হায়দারের মতো কথা বলছে। এই কথা রাহেল আগেও বলেছে। এ কথা শুনলে রাহেল আরও ক্ষেপে যায়। জাহানারা খুব চাপা স্বভাবের হলেও ভাইয়ের নিন্দা শুনতে পারে না। তাই খোকাকে উত্তেজিত হবার সুযোগ দেয় না। বাবা বলে, তোমরা বড় হচ্ছ. তোমাদের মধ্যে নানা যুক্তিবুদ্ধি তৈরি হচ্ছে, ভাল কথা। তবে মনে রেখো, ইউরোপের নারী স্বাধীনতার ফল ভাল হয়নি। তখন রাহেল বাবাকে বলেছিল, শোন বাবা, ইউরোপ সম্পর্কে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা আমাদের নেই। তাই তারা কী করছে সেটা বলার অধিকার বা ধারণা আমাদের কোনোটাই নাই। কেউ-ই আমাদের আদর্শ নয়। তবে আমি মনে করি মানবমুক্তির যে আলো তারা দেখিয়েছে সারা দুনিয়াকে, তার তুলনা নেই। আমাদের একজন কবি বলেছিলেন না, সবার ওপরে মানুষ সত্য তাহার ওপরে নাই। সেকথা তারাই প্রমাণ করেছে। আমরা রোকেয়াকে নারীর আদর্শ মানি। দেখ, আজ যে মেয়েরা ছেলেদের কাঁধে কাঁধ রেখে লেখাপড়া করছে, রাষ্ট্রের সব গুরুত্বপূর্ণ কাজে অংশ্রগ্রহণ করছে, সেটার জন্য আমরা রোকেয়ার কাছে ঋণী। তিনিই আমাদের পথ দেখিয়েছেন। নারীরা শুধু স্বাধীনতা পায়নি। দেশগঠনে বড় ভূমিকা রাখছে। ভেবে দেখেছ, এই নারীসমাজকে অন্ধকারে রেখে দেশের উন্নতি করা যায়? আমরাও তাদের আলোর পথের যাত্রী করতে চাই। রোমেলার হয়ে ভাই সব বলে দিয়েছিল, ওকে কিছু বলতে হয়নি। জাহানারা শুধু শুনেছিল, কোনো কথা বলেনি।

তানভির হাঁটতে শুরু করলে জাহানারা বারান্দায় উঠে একটু বসে। ছোট দুজনকে খেতে দিতে হবে। ঘর-দোর পরিষ্কার করে রান্না চড়াতে হবে। সে ভাবে, মানুষটা নিজেকে পরাজিত ভাবতে শুরু করেছে। ছেলেমেয়েরা তার বিরুদ্ধে যেভাবে দাঁড়াচ্ছে, তাতে সে না বিদ্রোহ করে বসে। এমনিতে ছেলেমেয়েদের প্রতি তার স্নেহ ভালবাসার কমতি নেই, বরং বাবা হিসেবে সে খুব খেয়াল করে সবকিছু। তবে তার ভয় হতে থাকে প্রতিদিন ছেলেমেয়েরা তার কথার যে তীব্র প্রতিবাদ করছে তাই দেখে। নানা যুক্তিতর্কে তারা বাবাকে নাজেহাল করে তুলছে। এটা তার কাছে খুব শোভন মনে হয় না। বই পড়ে পড়ে তারা যুক্তিবাদী হয়েছে বলে তার ধারণা, হায়দার ভাইও ওদের চিন্তা চেতনায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে, এটা সত্য। তানভির তো বলে, হায়দার ওদের মেন্টর। মেন্টর কি-না সে জানে না। তবে হায়দার ভাইয়ের সব কথা তারও পছন্দ না। সে যা বলে তা হয়তো ঠিক, কিন্তু সেটা মানা তো সম্ভব না এদেশে।

রাসেল আর সাহেলি ঘুম থেকে উঠেছে; তবে এখনো তাদের জ্বালাতন পর্ব শুরু করেনি। বড় ভাইবোন স্কুলে যাচ্ছে। ওরাও স্কুলে যায়। সবে শুরু করেছে। প্লেতে পড়ে দুজন। বয়সের ব্যবধান দেড় বছরের। তবু ওদের বাবা বলেছিল, একসাথে স্কুলে যাক, তাতে অনেক সুবিধে। সুবিধে আছে সেটা জাহানারাও জানে। একসাথে দুজন মানুষ হয়ে যাবে। বইখাতা, স্কুল, খাওয়া-দাওয়া- সব একসাথে চললে তার সুবিধে হয়। এই প্রথম তার সন্তানেরা খুব কাছাকাছি হলো। খোকা আর রোমেলার বয়সের ব্যবধান ছিল চার বছরের বেশি। এরা দুজন পর পর এল। মাঝে একটা মেয়ে হওয়ার সময় মারা যায়। মেয়েটার নামও রেখেছিল তানভির। রাহেলা। রাহেলের বোন রাহেলা। সেই মেয়েটার জন্য জাহানারার খুব কষ্ট হয়। ওকে কোলে তুলতে পারেনি। তবু কোথায় যেন একটা সুতো বাধা ছিল। একেই কি বলে নাড়ির টান? হবে হয়তো। যেদিন রাহেলাকে কবর দিয়ে তানভির বারান্দাতে এসে বসলো, তার মুখের দিকে তাকাবার সাহস হয়নি জাহানারার। সে তখন ঘরের দরোজা আগলে দাঁড়িয়ে ছিল। কত আগের কথা। সব স্পষ্ট যেন দেখতে পায়। খোকা আছে, রোমেলা আছে। ওর বাবা ঝপাৎ করে বসে পড়ল মেঝেতে। জাহানারার মনে হল মেয়ের মুত্যুর জন্য সে দায়ী। কেন মনে হল, বলতে পারবে না। তার তো কোনো অবহেলা ছিল না। ডাক্তার যা বলেছে সেভাবে সে সব করেছে। কোনোদিন ডাক্তার বলেনি যে তার কোনো জটিলতা আছে। অথচ মেয়েটা মারা গেল। তানভির থুতনির নিচে হাত দিয়ে বসেছিল অনেকক্ষণ। জাহানারার চলাচলের তেমন শক্তি না থাকলেও তানভিরের কাছে গিয়ে বসে। সে অনেকটা মিনতির সুরে বলে, তোমার খুব কষ্ট হচ্ছে আমি জানি। জাহানারার দিকে সে ঘাড় ঘুরিয়ে কিছু একটা বলবে বলে মনে করলেও বলে না। তার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। জাহানারা জানে তার কষ্ট নিশ্চয়ই বেশি, তার তো সবদিক দিয়ে কষ্ট। শারীরিক মানসিক উভয় দিকের কষ্ট আর প্রায় দশ মাস ধরে যে সন্তানকে তিলে তিলে বড় হয়েছে, তাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখে দেখে আজ চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে তাকে হারানো – এর চেয়ে কষ্ট বেশি কারো তো হতে পারে না। তার হাত পা শিথিল হয়ে আছে, চোখের অশ্রু শুকিয়ে চোখে জমা হয়ে আছে, নির্ঘুম রাতের কষ্টতে শরীর আড়ষ্ট হয়ে যাচ্ছে; তার ওপর যে ভয়ঙ্কর কষ্ট হলো মেয়েটা পৃথিবীতে আসার সময়। সেটা তো কারো পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়। তবু সে জানে তানভির কষ্ট পাচ্ছে, তাকে প্রবোধ দেওয়া উচিত। বাবা হিসেবে তার কষ্টকে সে ঠিক বুঝবে না। তবে সে যে কষ্ট পাচ্ছে তার জন্য তাকে সহানুভূতি দেখানো তার উচিত বলে মনে করে। বড় বোন জাহানারাকে বলত, বাবাদের সন্তানের প্রতি স্নেহ মমতা লোকদেখানো ব্যাপার। বুবু কেন বলতো সে জানে না। কোনো ব্যাখ্যা সে শুনতে চায়নি। তবে তার সন্তানের সাথে তানভিরের যে সম্পর্ক, তাকে কৃত্রিম বলার কোনো চিহ্ন সে দেখতে পায়নি। বরং তার মনে হয়েছে মায়ের মতোই বাবা তাদের আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে। সে-সম্পর্কের মধ্যে কোনো কৃত্রিমতা নেই।

সে তার ময়লা শুকনো আর জীর্ণ হাত দিয়ে তানভিরের মাথায় হাত বোলায়। মুখে কিছু বলতে পারে না সহজে। তানভির তাকিয়ে ছিল পুকুরের পশ্চিম দিকে, যেখানে মেয়েটাকে শুইয়ে রেখে এসেছে। সে কেমন বিধ্বস্ত মুখ নিয়ে জাহানারার দিকে তাকায়। তখন জাহানারা বলতে পারে, সব ঠিক হয়ে যাবে। আল্লার ওপর ভরসা রাখ। আমাদের আবার মেয়ে হবে, দেখবে, আরো সুন্দর মেয়ে। তানভির কিছু বলতে গিয়ে থেমে যায়, ওর কথা আটকে যায়, সে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে : আমাদের কী সর্বনাশ হলো, জাহানারা। কেন হলো? এটা তো হওয়ার কথা ছিল না। এই প্রথম জাহানারা মানুষটাকে কাঁদতে দেখল। তাকে রাগতে দেখেছে, প্রচুর হাসতে দেখেছে, গম্ভীর হয়ে বোবা হতে দেখেছে, কাঁদতে দেখেনি কখনো। আজ দেখল। তাকে শিশুর মতো মনে হচ্ছে। খোকা কোথা থেকে মা মা করে ডাক দিলে তানভির খানিকটা সচকিত হয়ে ওঠে। সে তাড়াহুড়ো করে উঠে নিজের ঘরের দিকে যায়।

(চলবে)

এই লেখাটি সম্পর্কে মন্তব্য করতে চাইলে আমাদের ফেসবুক ভিজিট করুন।

তীরন্দাজ Teerandaz

Teerandaz Antorjal

পূর্ববর্তী পর্বের লিংকের জন্যে ক্লিক করুন >> পর্ব ৪

অন্য পর্বগুলির লিংক >> প্রজাপতি পাখা মেলো

Share Now শেয়ার করুন

1 COMMENT