মোস্তফা তারিকুল আহসান >> প্রজাপতি পাখা মেলো (পর্ব ৬)

0
83

আগে (পর্ব ১-৫) যা ঘটেছিল

রোমেলা তার রক্ষণশীল ধর্মান্ধ বাবা তানভিরের অমতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। প্রথম দিন ক্লাসে ঢুকেই সামান্য কথা বলার কারণে শিক্ষকের কাছে তিরষ্কৃত হয়, খুব কষ্ট পায় সে। দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধা মামা হায়দারের আদর্শ মনেপ্রাণে ধারণ করে রোমেলা বড় হয়েছে। কিন্তু রক্ষণশীল ধর্মান্ধ বাবা মুক্তিযুদ্ধকে মানতে চান না।  রোমেলা ও শিউলি দুই বন্ধু। একবছর আগে ভর্তি হওয়া শিউলির মৈত্রী হলের রুমেই রোমেলা থাকে। কিন্তু বড় ভাই রাসেল বাবার সঙ্গে বিবাদ করে বাড়ি ছেড়ে গেছে, তার আর কোনো খবর নেই। রোমেলা ক্লাস করছে। পত্রপত্রিকা পড়ার জন্যে সে লাইব্রেরিতে ঢোকে। মনে পড়ে যায় একই গ্রামের পরিচিত শুভর কথা। শুভ যে কোথায় রাহেলা এখন জানে না। লাইব্রেরিতে দেখা হয় সহপাঠী আসিফের সাথে। ওরা লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে ভাষা ইনস্টিটিউটের পাশের ফুটপাথে বলে চা খায়। একটা মিছিল সামনে গিয়ে গেলে তারুণ্যের প্রতিবাদের ভাষা যে মিছিল, এই নিয়ে কথা বলে। রোমেলা ও তার অন্য ভাই-বোন বাড়িতে কেমন দিন কাটাতো সেসব কথা উঠে আসে। মা ও বাবার কথাও কাহিনিতে ঢুকে পড়ে। বিশেষ করে রোমেলার মা জাহানারা বৌ হয়ে আসার পরের ঘটনার বর্ণনা আছে। বাবার সঙ্গে এটা-ওটা নিয়ে মতবিরোধ হয়। বাবা রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে মেয়ে রোমেলাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, কিন্তু চায় যুক্তিবাদী পথে চলতে। মৃত এক মেয়ের স্মৃতি রোমেলার মা ও বাবা দুজনতেই বিমর্ষ করে দেয়। বাবা ও মেয়ের দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য স্পষ্ট হতে থাকে।

পর্ব ৬

মেয়ের সাথে প্রতিদিন তর্ক করছে তানভির। কাছে থাকলে তাতে খোকাও যোগ দেয়। জাহানারার সমস্যা অন্যরকম। সে তো মেয়ের পক্ষে থাকে, তবে তানভিরের কথার যুক্তিতে কখনো কখনো দুর্বল হয়ে পড়ে। ধর্মের প্রতি তার টান সেই ছোটকাল থেকে। বাবা তাকে নামাজ রোজা শিখিয়েছিল, সে কোরান পড়ত সুর করে বাবার সাথে। তবে বাবার সাথে তার কোনো তর্ক হয়নি। হায়দার ভাইকে নিয়ে বাবার বেশ ঝামেলা হত, তবে হায়দার ভাই কখনো জোরে জোরে বা বেশিক্ষণ তর্ক করত না। সে হয়তো বুঝত, পুরনো দিনের মানুষের সাথে তর্ক করে তাদের কষ্ট দিয়ে লাভ নেই। তবে যা ভাল মনে করত সেটা করত। হায়দার মামা যুদ্ধে গিয়েছিল বাবার অমতে, পরে বাবা তাকে খুব বাহবা দিয়েছিল ফেরার পর।

রোমেলা গান গাইতে গাইতে বাড়ি ফেরে। পিছনে খোকা। সে গায় না। রোমেলা ব্যাগ রাখতে রাখতে জামাকাপড় ছাড়তে ছাড়তে গান গায় : আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি, ছেলেহারা শত মায়ের অশ্রু ভরা এ ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি। জাহানারা বারান্দার কাছেই ছিল। তাকে জিজ্ঞেস করে, হঠাৎ আজ এ গান কেন রে রোমেলা? রোমেলা চেঁচিয়ে বলে, জান মা, স্কুলে ফাংশন হবে। একুশে ফেব্রুয়ারি পালন করা হবে। আমাদের স্কুলে তো শহিদ মিনার নেই, স্কুলে শহিদ মিনার হবে। এতদিন কেন ছিল না নিয়ে তো মহা হৈ চৈ। মামা আজ স্কুলে এসেছিল, মামা বলেছে, ২১ তারিখের আগেই শহিদ মিনার তৈরি করা হবে। হেড স্যার রাজি। আমরা খালি পায়ে হাঁটতে হাঁটতে ঢাকার মতো ফুল দিতে যাব। রাসেল, সাহেলিকে নিয়ে যাব।

ওরা দুজন ঘরেই ছিল। রোমেলার কথা শুনে হৈ চৈ করে উঠল। আমরা যাব তোমাদের স্কুলে? কবে আপু? রোমেলা বলে, সময় হলেই জানতে পারবি। আগে সব ঠিকঠাক হোক তো। মাঠের দক্ষিণপূর্ব কোণে শহিদ মিনার হবে। ফুটবল মাঠের ওপারে। মামা আর হেডস্যার মিলে জায়গা ঠিক করেছে। আরো অনেকে ছিল। আমাদের ফুল গাছগুলোর ভাল করে যত্ন নিতে হবে। ফুলের মালা বানাতে হবে না, রাহেল বলে। তোদের দেখি আনন্দ আর ধরে না। আগে সব কিছু ঠিক মতো হোক, তারপর দেখা যাবে। তবে আমরা সবাই মিলে যাব। মা যাবে কিনা জানি না। আব্বা মনে হয় যাবে না। আমরা প্রথম শহিদ মিনারে ফুল দেব। আমি শিহরিত হয়ে উঠছি। রাসেল বলে, শিহরিত কি ভাইয়া? কি হয় এতে? রাহেল বলে, তোর মাথা, চুপ থাক।

বারান্দায় চওড়া একটা চৌকিতে সবাই খেতে বসে। বাবা একটা চেয়ার নিয়ে বাইরে বসে চৌকিতে প্লেট রাখে। চার ভাইবোন বসে চার কোণায়। জাহানারা সবাইকে খেতে দেয়। আলু-বেগুনের সাথে বড় কাতলা মাছের তরকারি, করলা ভাজি আর মসুর ডাল। সাহেলি ঘোষণা করে, আমি আজ মাছ খাব না। জাহানারা বলে, কোনো কথা হবে না। মা কষ্ট করে রান্না করেছে, আনন্দ করে খেতে হবে। রাসেল বলে, জানো বাবা, আমরা এবার একুশে ফেব্রুয়ারিতে ফুল দিতে যাব শহীদ মিনারে। তুমি কখনো ফুল দিয়েছ?  দিলেও আমাদের সাথে তুমি যাবে, খুব মজা হবে। আপু বলেছে, ভাইয়া বলেছে। তানভির ঘাড় কাত করে রাসেলের দিকে তাকায়। রোমেলা বাবার দিকে তাকায়। রোমেলার দিকে এবার তানভির তাকায়, তবে কিছু বলে না। রাসেল আবার বলে, জানো বাবা, আপুদের স্কুলে শহিদ মিনার হবে। আমি তো শহিদ মিনার দেখিনি। বইয়ে একটা ছবি ছিল, তবে আমি তো সামনাসামনি দেখিনি। তুমি কি যাবে আমাদের সাথে ফুল দিতে? আজ মাছের মাথা দেওয়া হয়েছে তানভিরকে। এক একদিন একেক জনকে দেয় জাহানারা। ছোট দুজনকে দিতে হয় না। ওরা খেতে পারে না। ওদের মাঝে মাঝে জাহানারা বেছে বেছে খাওয়ায়। তানভির মাছের কাঁটা ধীরেসুস্থে বেছে খায়, তবে রাসেল বার বার জিজ্ঞেস করাতে তাকে উত্তর দেবার প্রস্তুতি নিতে হয় খাওয়া রেখে। সে জানে স্বাধীনতার পক্ষের সরকার ক্ষমতায় আসার পর আবার নতুন করে শহিদ মিনার তৈরি হচ্ছে। এতদিনে অনেক জায়গায় শহিদ মিনার ছিল না। স্কুল কলেজে মোটামুটি থাকলেও মাদ্রাসায় ছিল না। আগের সরকার এ বিষয়ে নিষ্ক্রিয় ছিল। তাদের সাথে ইসলামি দলের সংশ্রব থাকায় তারাও এটা পছন্দ করত না। এমনও বলা হয়েছে, এটা কবরপুজা। তানভিরও তাই মনে করে। সে যদিও কোনো দলের সদস্য না, তবে ভাবনাটা তাদের মতোই। ভাষা-সংগ্রামের সাথে, এর সংস্কৃতির সাথে বাঙালির প্রগতিশীল সংস্কৃতির গভীর যোগ রয়েছে। সে কারণে বর্তমান সরকার এই জাতীয় কাজকে তাদের গুরুত্বপূর্ণ কাজ বলে মনে করছে হয়ত। তানভিরের বেশ অস্বস্তি হয়। সে মনে করে, বাঙালি সত্তার বিকাশ মানে ইসলামি সংস্কৃতির পরাজয়। এটা ইসলামপন্থী এক নেতা এক আলোচনা সভায় বলেছিল, সেখানে সে উপস্থিত ছিল। জাতীয়তাবাদী দলের ওই সভায় ইসলামি ওই নেতার কথায় সবাই বাহবা দিয়েছিলেন। তানভিরের কথাগুলোকে খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছিল। সেই নেতার ইসলামি জ্ঞান ভাল ছিল আবার প্রচলিত শিক্ষায়ও তার বিশেষ অধিকার আছে বলে মনে হয়েছিল। সেটা তার কথাবার্তায় বোঝা যাচ্ছিল। তিনি ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলাম ধর্মের বিস্তার এবং ভারতে মুসলিমদের অবদান সম্পর্কে বিস্তারিত বলতে গিয়ে যে ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন, তা তার কাছে তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয়েছিল। খাইবার গিরিখাত দিয়ে সুলতান মাহমুদ এদেশে প্রথম এসেছিলেন, এসেছিলেন অনেক ধর্মপ্রচারক। এসেছিলেন হুমায়ূন, আকবর। এই পৌত্তলিক ধর্মের দেশে তারা ইসলামের মহান বাণী প্রচার করেছিলেন। এদেশের মানুষ ইসলামকে গ্রহণ করেছিলেন। এর মহানুভবতা আর জাতপাতহীন সামাজিক ব্যবস্থার জন্য। প্রায় পাঁচশ বছর ধরে যে রাজত্ব তারা করে গেছে তার প্রতিক্রিয়া বা প্রভাব একজন মুসলিম হিসেবে সে কীভাবে ভুলবে? ভারতীয় চিন্তারাজ্যে ইসলামি চিন্তাধারার যে বীজ সুপ্ত হয়েছিল, তা রক্ষা করাই তো সব মুসলমানের কর্তব্য। মনে রাখা দরকার, ইসলামি তমুদ্দুনই আমাদেরকে একত্রিত রাখবে, শক্তিশালী করবে। পাকিস্তান রাষ্ট্র আমাদের সেই সুযোগ দিয়েছিল। কিন্তু আমরা তা হাতছাড়া করেছি। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের দেশে আমরা সেই সুযোগ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চাই। তার জন্য দরকার তথাকথিত বাঙালি সংস্কৃতির পরিবর্তে ইসলামি সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠা। বক্তার এই কথার পর একজন শ্রোতা প্রশ্ন করেন, তাহলে আমরা সরকার প্রবর্তিত প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আচার মানব না? তিনি বললেন, না, মানবেন না। আপনি মুসলমান হলে মানবেন না। আপনি যদি মঙ্গল শোভাযাত্রা করেন, খালি পায়ে হেঁটে গিয়ে বেদীতে ফুল দেন, তাহলে তা স্পষ্টতই ধর্মীয় নীতির পরিপন্থী হবে। সামরিক সরকার তো দেশকে ইসলামি রাষ্ট্র ঘোষণা করেছিলেন। সেটা তো এখনো সংবিধানে সংযুক্ত আছে। আমাদের তো সুযোগ রয়েছে। আমাদের ইসলামি সাংস্কৃতিক বিপ্লব আনতে হবে। এদেশে এখন তাগুদি সরকার দেশ চালাচ্ছে। তারা অন্যায় প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছে। আমরা তা মানতে পারি না। একজন বললেন, অনেক ধার্মিক মুসলমানকে তো দেখছি বাঙালি সংস্কৃতির সব কর্মকাণ্ড করেন, তাদের কোনো সমস্যা হয় না। তারা কি জানে না, নাকি ভুল জানেন? মাওলানা বলেন, দেখেন, সুবিধা পাবার জন্য অনেকে এ-কাজ করতে পারে। তারা যদি জেনেশুনে বেশরিয়তি কাজ করেন তা হলে তারা মুসলমান নয়, মুনাফিক। আপনাকে যে কোনো একদিকে থাকতে হবে। ইসলাম মানলে পুরোপুরি মানতে হবে, খানিকটা মানবেন, খানিকটা মানবেন না, সেটা তো হতে পারে না।

তানভিরের মাথার ভেতরে মাওলানার কথাগুলো বাজে। রাসেলের প্রশ্ন শুনে তার মাওলানার কথাগুলো মনে পড়ে। সে বলে, শোনো, মুসলমানদের পক্ষে শহিদ মিনারে যাওয়া ঠিক নয়, ফুল দেওয়া তো নাজায়েজ। যারা ভাষার জন্য মারা গেছে তারা হুজুগে মারা গেছে, তারা রাষ্ট্রীয় নিয়মনীতি না মেনে এগুলো করেছে, তাই মারা গেছে। উর্দু রাষ্ট্রীয় ভাষা থাকলে আমাদের লাভ হতো। রোমেলার দিকে তাকিয়ে বলে, একটা ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ তৈরি হতো, যেমন ভারতে হয়েছে হিন্দি ভাষাকে কেন্দ্র করে। উর্দু  থাকলে পাকিস্তান ভাঙত না। রোমেলা বাবার কথার তীব্র প্রতিবাদ করে, বাবা, তোমার কথা মোটেও ঠিক না। বাঙালি মুসলমানদের কোনঠাসা করার জন্য, তাদের সমস্ত অধিকার ভূলুণ্ঠিত করার জন্য উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ষড়যন্ত্র করা হয়। উর্দুতে পাকিস্তানে কতজন কথা বলত? পশ্চিম পাকিস্তানের বেশিরভাগ মানুষের ভাষা উর্দু নয়। পশ্চিম পাকিস্তানেও এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করা হয়েছিল। শাসকদের হঠকারিতার জন্য এটা করা হয়। আর শোনো, সারা পৃথিবীর মানুষ তাদের বীর সন্তানদের কবরে বা সমাধিতে ফুল দেয়। যারা আমাদের মায়ের ভাষার জন্য জীবন দিয়েছেন, তারা আমাদের শ্রেষ্ঠ সন্তান, তারা একাত্তরের বীর সন্তানদের মতো বীর, জাতীয় বীর। তারা যদি সেদিন ভাষার জন্য জীবন না দিতেন, আর বাংলা যদি রাষ্ট্রভাষা না হত, তাহলে আমাদের মায়ের ভাষার কী হত? এ ভাষার সব গৌরব, ঐশ্বর্যের ধারা বন্ধ হয়ে যেত। স্যার সেদিন ক্লাসে বলছিলেন, আমাদের মহাকবি মাইকেল মায়ের ভাষাকে মাতৃদুগ্ধের সঙ্গে তুলনা করেছেন। মাতৃভাষা না থাকলে মানুষ বাঁচে কী করে? আমরা তো স্বপ্নও দেখি বাংলা ভাষায়। মা আর মাতৃভাষা তো একই রকম গুরুত্বপূর্ণ। একটা জাতির নিঃশ্বাস বন্ধ করে তারা উর্দুকে চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল আমাদের ঘাড়ে। ভাষা আমাদের জাতীয়তা, ভাষা আমাদের পরিচয়। সেই ভাষাসৈনিকদের যদি মন-প্রাণ দিয়ে শ্রদ্ধা করতে না পারি, তাহলে আমরা জাতি হিসেবে অভাগা। আমাদের স্যার বলেছেন, এটা একটি প্রতীকী শ্রদ্ধা। মুসলমানরা যখন ফুল দেবে সেটাও প্রতীকী ব্যাপার, এর সাথে ধর্মের কোনো বিরোধ নেই।

তানভির বলে, তাহলে যে মূর্তি তৈরি করা হলো, তাকে তো ইসলাম সমর্থন করে না। এটা তো শির্ক। তানভির আরো কিছু বলতে যাচ্ছিল, রাহেল বাবাকে থামিয়ে দিয়ে বলে, আব্বা, তুমি তো ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র। তোমার মুখে এসব কথা কীভাবে আসে? শহিদ মিনার তো একটা স্থাপত্য, আর্ট পিস। তাকে তুমি মূর্তি হিসেবে দেখছ কেন? নন্দনতাত্ত্বিক দৃষ্টি দিয়ে দেখ, পৃথিবীর শিল্পসভ্যতার বিস্তার সম্পর্কে ভেবে দেখ, কোথায় গেছে পৃথিবী! আর তুমি আছ সেই সনাতন চিন্তা নিয়ে। ভাল কথা, তুমি কি জান গোটা ইসলামি দুনিয়ায় কত স্থাপত্য আছে? তারা কি ইসলাম থেকে বিচ্যুত হয়েছে? তোমাকে কেউ ভুল ধারণা দিয়েছে। বাঙালি হিসেবে বাংলাদেশি হিসেবে আমাদের যা গৌরবের, তাকে তুমি ছোট করে দেখতে পারো না। বরং প্রাচীন সভ্যতার অংশীদার হিসেবে আমাদের জাতি হিসেবে গর্ব করা উচিত। কিন্তু তুমি সেটা না করে হীনমন্যতায় ভুগছ, বেপথু হয়ে গেছ।

জাহানারা বলে, তোমরা খেতে বসে এত আলোচনা কর কেন? খাওয়ার সময় এত কথা কেন? সে আসলে উত্তপ্ত পরিস্থিতিকে শান্ত করার চেষ্টা করছিল, তবে পেরে উঠল না। রোমেলা বলল, বাবা, তুমি কখনো এই গান গেয়েছ? আমাদের মাতৃভাষার যে-সংগ্রাম, সে-সংগ্রাম তো আসলে মাতৃভূমির জন্য সংগ্রাম। আমাদের মাওলানা স্যার বলেছেন, আমাদের নবী করিম মাতৃভূমি বা জন্মভূমির জন্য সবাইকে লড়াই করতে বলেছেন। তিনি তাঁর মাতৃভূমি মক্কাকে কী পরিমাণ ভালোবাসতেন, সেকথা তো সবার জানা। আর তোমরা আছ পাকিস্তান নিয়ে। পাকিস্তান কোনোদিন আমাদের মাতৃভূমি ছিল না। হাজার মাইল দূরের কোনো দেশ আমার দেশ হতে পারে? আমাদের ইতিহাসের স্যার বলেছেন, পাকিস্তান আমাদের কাছে ছিল একটা কাল্পনিক রাষ্ট্র। জোর করে তার সাথে আমাদের জুড়ে দিয়েছিল নেতারা, তাদের স্বার্থের কারণে। কিন্তু একটা স্বাধীন দেশের মানুষ হিসেবে আমাদের চেতনাকে শক্তিশালী করতে হবে। দেশের মানুষকে সম্মিলিতভাবে জাগিয়ে তুলতে হবে, যাতে আমাদের জাতীয় সংস্কৃতিকে আমরা লালন করতে পারি। আর এটা আমরা মনপ্রাণ দিয়ে উপলব্ধি করি। কাউকে কি এটা জোর করে বলতে হয়? সবাই যেমন বঙ্গবন্ধুর ডাকে প্রাণ বাজি রেখে যুদ্ধে গিয়েছিলেন, তেমনি সবাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে বাঙালি সংস্কৃতিকে অনুভব করে। তানভির মেয়েকে থামিয়ে দেয় ইশারা করে। বলে, শোন, তোমরা যা বলছ সেটা তোমাদের যুক্তি। কিন্তু পাল্টা যুক্তিও আছে। হাজার বছর ধরে ভারতবর্ষে মুসলমানরা যে-জীবনধারা তৈরি করেছে, তারও মূল্য আছে। রাতারাতি সব বাতিল করা যায় না। তোমরা করছ, কর, আমি এটা মানি না। জাহানারা সবার পাতে ডাল দিতে শুরু করে, ততক্ষণে মাছ দিয়ে ভাত খাওয়া শেষ। রাহেল মুখ গম্ভীর হয়ে বসে থাকে। রাসেল বাবার দিকে তাকিয়ে থাকে। সে ঠিক বুঝতে পারে না কী বলবে। সাহেলি কিছু বলে না। সে খাওয়া শেষ করে মায়ের কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। রোমেলা প্লেট হাতে করে উঠে দাঁড়ায়, ধুতে যাবার জন্য। সে বাবাকে বলে, শোন বাবা, তোমার একটা বড় ভুল হচ্ছে। আমাদের মাওলানা স্যার বলেছিলেন একদিন, আমার স্পষ্ট মনে আছে, ধর্ম আর সংস্কৃতি আলাদা জিনিস। অনেকে ধর্মকে সংস্কৃতির সাথে গুলিয়ে ফেলে। আরবের ধর্ম ইসলাম, তবে তাদের সংস্কৃতি আরবীয়। সেটা ইসলাম ধর্ম প্রবর্তিত হবার আগেও ছিল, এখনো আছে। আমাদের এখানে ইসলাম আসার আগেও আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ছিল। একজন মানুষ ধর্ম পাল্টাতে পারে, তবে সে তার সংস্কৃতিকে পাল্টাতে পারে না। সংস্কৃতির শক্তি অনেক গভীরে থাকে। সেটা যেন রক্তের সাথে মিশে থাকে। তাকে বাদ দেওয়া যায় না। বাংলার আপা তাই বলেন বাঙালির সংস্কৃতি হাজার বছরের সংস্কৃতি। আমি আপার কথা খুব যে ভাল বুঝেছি সেটা বলব না। তাছাড়া তুমি তো মাওলানা স্যারকে জানো, তিনিও শহিদ মিনার তৈরিতে বাধা দিচ্ছেন না বরং আগ্রহ দেখাচ্ছেন। আর তুমি যে বলো, পাকিস্তান থাকলে ইসলাম থাকত সেটা ভুল। মামাই তো বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের সামরিক জান্তা বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ মুসলমানকে হত্যা করেছে। এটা তারা করেছিল কোন যুক্তিতে? আর ধর্মই যদি দেশকে রক্ষা করতে পারবে তাহলে এদেশের মুসলমানদেরকে তারা কখনো ভাই বলে মানতে পারেনি কেন? ধর্মই যদি রাষ্ট্র চালায় তাহলে অন্য ধর্মের মানুষেরা কী মর্যাদা নিয়ে বাস করবে? সেদিন রেডিওতে এরকম একটা বিতর্ক শুনলাম। জাহানারা বলে, হয়েছে, অনেক হয়েছে। বিরাট পণ্ডিত সব। এবার সব ওঠো। এ নিয়ে আর তর্ক করতে হবে না। যার যা ভাল লাগে কর। আর তোর বাবা তো স্কুলে যায় না, তাকে শহিদ মিনারে নিয়ে যাওয়ার কী দরকার? রাসেল বলে, তাহলে আমি যে বললাম, বাবা যাবে। জাহানারা বলে, চুপ থাক। পরে কথা হবে।

তানভির রেগে আছে সেটা তার চোখের দিকে তাকালে বোঝা যায়। সে হয়তো আরও কিছু বলত। তবে জাহানারা যে উপসংহার টেনে দিল, তার পরে আর কথা বলা ঠিক হবে না বলে মনে করল। সে জানে রাহেল নিশ্চয় তাকে আরো অনেক কথা শোনাবে সুযোগমতো। এবং তারা ঠিকই শহিদ মিনারে যাবে এবং ছোট ভাইবোনদের নিয়ে যাবে। তার কী করা উচিত, সে ভেবে পায় না। একবার মনে করে জোর প্রতিবাদ করা উচিত, আরেক বার ভাবে ছেলেমেয়েদের সাথে অহেতুক ঝামেলা করে লাভ নেই। তবে সে তার নিজের মনকে বোঝাতে পারে না। সে ভাবতেই পারে না সব ছেলেমেয়ে তার বিরুদ্ধে, তার মতের বিরুদ্ধে কথা বলে। এই সংসারে তার কোন মূল্য নেই? পরক্ষণে ভাবে, যুগের হাওয়া যেদিকে ছেলেমেয়েরা তো সেদিকে যাবেই। সে তবু স্থির সিদ্ধান্তে আসে, সবাইকে নিয়ে একদিন বসতে হবে। ইসলামি জাতীয়বাদের যে স্বপ্ন তার কলেজ জীবনে সে দেখেছিল, সেটা সে মন থেকে সরিয়ে দিতে পারে না। কত হাজার বছর ধরে তার পূর্বপুরুষেরা এই ভারতবর্ষে ধীরে ধীরে যে জীবনধারা গড়ে তুলেছে তা নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে না। তাকে ভাবতে হবে। অন্তত তার সন্তানেরা বিপথগামী হতে পারে না। দরকার হলে জাহানারাকে ভালো করে বোঝাতে হবে। তবে সে ধরা দেয় না সহজে। তার কথাবার্তা শুনে মনে হয় সে কিছু বোঝে না, তবে তার যে জ্ঞানবুদ্ধি বিবেচনা আছে, সেটা সে জানে, তাহলে জাহানারা অংশগ্রহণ করে না কেন? কোনো পক্ষে যায় না কেন? তার শ্বশুর তো খুব ধার্মিক ছিলেন, জাহানারার তো তাই তার পক্ষ নেওয়ার কথা। সে আসলে বুঝতে পারে না জাহানারা কী চায়। বারান্দায় পাতা একটি বিছানায় তানভির নামাজের জন্য দাঁড়ায়।

(চলবে)

এই লেখাটি সম্পর্কে মন্তব্য করতে চাইলে আমাদের ফেসবুক ভিজিট করুন।

তীরন্দাজ Teerandaz

Teerandaz Antorjal

পূর্ববর্তী পর্বের লিংকের জন্যে ক্লিক করুন >> পর্ব ৫

অন্য পর্বগুলির লিংক >> প্রজাপতি পাখা মেলো

 

Share Now শেয়ার করুন