মোস্তফা তারিকুল আহসান >> প্রজাপতি পাখা মেলো >> উপন্যাস (পর্ব ৭)

0
125

আগে (পর্ব ১-৬) যা ঘটেছিল

রোমেলা তার রক্ষণশীল ধর্মান্ধ বাবা তানভিরের অমতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। প্রথম দিন ক্লাসে ঢুকেই সামান্য কথা বলার কারণে শিক্ষকের কাছে তিরষ্কৃত হয়, খুব কষ্ট পায় সে। দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধা মামা হায়দারের আদর্শ মনেপ্রাণে ধারণ করে রোমেলা বড় হয়েছে। কিন্তু রক্ষণশীল ধর্মান্ধ বাবা মুক্তিযুদ্ধকে মানতে চান না। রোমেলা ও শিউলি দুই বন্ধু। একবছর আগে ভর্তি হওয়া শিউলির মৈত্রী হলের রুমেই রোমেলা থাকে। কিন্তু বড় ভাই রাসেল বাবার সঙ্গে বিবাদ করে বাড়ি ছেড়ে গেছে, তার আর কোনো খবর নেই। রোমেলা ক্লাস করছে। পত্রপত্রিকা পড়ার জন্যে সে লাইব্রেরিতে ঢোকে। মনে পড়ে যায় একই গ্রামের পরিচিত শুভর কথা। শুভ যে কোথায় রাহেলা এখন জানে না। লাইব্রেরিতে দেখা হয় সহপাঠী আসিফের সাথে। ওরা লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে ভাষা ইনস্টিটিউটের পাশের ফুটপাথে বলে চা খায়। একটা মিছিল সামনে গিয়ে গেলে তারুণ্যের প্রতিবাদের ভাষা যে মিছিল, এই নিয়ে কথা বলে। রোমেলা ও তার অন্য ভাই-বোন বাড়িতে কেমন দিন কাটাতো সেসব কথা উঠে আসে। মা ও বাবার কথাও কাহিনিতে ঢুকে পড়ে। বিশেষ করে রোমেলার মা জাহানারা বৌ হয়ে আসার পরের ঘটনার বর্ণনা আছে। বাবার সঙ্গে এটা-ওটা নিয়ে মতবিরোধ হয়। বাবা রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে মেয়ে রোমেলাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, কিন্তু চায় যুক্তিবাদী পথে চলতে। মৃত এক মেয়ের স্মৃতি রোমেলার মা ও বাবা দুজনতেই বিমর্ষ করে দেয়। বাবা ও মেয়ের দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য ক্রমশ স্পষ্ট হতে থাকে। পারিবারিক পরিসরেই এটা ঘটতে থাকে। বাবা তানভিরের ধর্মের প্রতি ঝোঁক, মেয়ের সংস্কৃতির প্রতি। এই নিয়েই বাবা-মেয়ের মৃদু তর্ক-বিতর্ক হয়। এই বিরোধ পুত্র রাহেলের সঙ্গেও ঘটে বাবা তানভিরের। এরপর …

পর্ব ৭

অধ্যায় ৫

বড় ভাইয়ের সাথে বেশি খাতির ছিল জাহানারার। বড় ভাইয়ের গলা ভালই ছিল। সে যখন খালি গলায় গান গাইত তখন জাহানারাও মাঝেমধ্যে গাইত ওর সাথে। রোমেলাও বাবাকে লুকিয়ে গান গায়। বাবা শুনেছে মাঝেমধ্যে। খালি গলায় গান গায় বলেই হয়তো আপত্তি করে নি কোনো দিন। এখন স্টেজে সবার সামনে গান গাইবে শুনলে কি বলবে আল্লাই জানে।

কালে সবাই এক সাথে ঘুম থেকে ওঠে না। সবার আগে ওঠে জাহানারা। প্রায় ওর সাথে সাথে ওঠে তানভির। খোকা আর রোমেলা ওঠে তারপরই। তবে আজ ওদের স্কুল ছুটি বলে এখনো ওঠেনি। ওরা আসলে নিজেরা ওঠে না। জাহানারাই ওদের ডেকে ডেকে তোলে। তানভির নামাজ পড়ে বাড়ির সামনে গাছপালার দিকে নজর দেয়। ফুল গাছে পানি দেয়। নানারকমের ফুল গাছে উঠোনের বাম দিকটা ভর্তি, রোমেলা খোকা সবাই মিলে লাগায়, তবে পানি দেয় তানভির। সে পুকুরের চারপাশটা একবার ঘুরে আসে। সবজি ক্ষেতে যায়। ক্ষেতে এখন প্রচুর সবজি। পুকুর থেকে পানি সেঁচে সে সবজি করে। একটা ছেলে আছে ছমির নামে। সেই সব করে। বেশ কাজের ছেলে। তানভির অবসরে ওকে নিয়ে পরামর্শ করে। কৃষক না হয়ে তানভির বেশ ভালো কৃষকের মতো ফসল সবজি ফলায়। সে হয়তো বাবাকে দেখে শিখেছিল। বোনেরা ছিল তানভিরের বড়। দুই বোনের বিয়ে হয়েছে যখন তানভির তখন স্কুলে পড়ত। তারা আসে মাঝেমধ্যে। ওদের ছেলেমেয়েদের সাথে জাহানারার ছেলেমেয়েদের বেশ মিল। ওরা এলে বাড়িতে হৈ চৈ পড়ে যায়। বিশেষ করে বড় বোন আঞ্জুমান এলে আরো বেশি হৈ চৈ হয়। সে নিজেই হৈ চৈ শুরু করে দেয়। ভাইয়ের বাসায় এলেই তার বয়স বিশ বছর কমে যায়, ফিরে যায় শৈশবে। শুরু করে রাজ্যের গল্প। বাবার সাথে সারা বাড়ি সে পুকুর মাঠ ঘুরে বেড়াত। আর রোমেলার মতো জাল দিয়ে ভেলায় করে পুকুরে মাছ ধরত। রোমেলার মাছ ধরা দেখে সে তো লাফালাফি শুরু করেছিল একবার। সেবার বলেই ফেলে, আমি তোর সাথে মাছ ধরব, চল। মন চাইলেও শরীর সায় দেয় না। পায়ে ব্যথা, হাতে ব্যথা, আরো কত অসুখ। অগত্যা রোমেলার সাথে পুকুরঘাটে গিয়ে বসে থাকে। আঞ্জুমানের ছেলে জামিলও বসে পড়ে মার কাছে। সে রোমেলার চেয়ে তিনচার বছরের বড়। খোকার চেয়ে একবছরের ছোট। সে মা ন্যাওটা। অন্য দুটো ছেলেমেয়ে মাকে রেখে কোথায় কোথায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু জামিল কোথাও যায় না। সে মার সাথে রোমেলার মাছ ধরা দেখে। পুকুরে কানায় কানায় পানি। কলার ভেলা আছে আগেভাগে তৈরি করা। রাহেল আর রোমেলা মিলে তিন চারদিন আগে বানিয়েছিল। বানালে বেশিদিন থাকে না। গোসলের সময় সবাই খেলতে খেলতে নষ্ট করে ফেলে।

রোমেলা বার বার জাল ফেলে। কোনো মাছ ওঠে না। আর রাসেল সাহেলি হি হি করে হাসে। রাহেল বাসায় নেই। সে থাকলে দুই ভাইবোন মিলে চেষ্টা করে দেখত। আঞ্জুমান শেষ পর্যন্ত বলে, আমি যখন মাছ মারতাম, বুঝলি, একটা খ্যাপও মিস যেত না। আর তখন পুকুরে মাছ কত। এখন তো তোরা মাছের যতœ নিস না। ভাল করে মাছ ছাড়িস না। তোর বাপ হয়েছে একটা হাঁদা। কোনো কাজ ভাল করে করতে পারে না। নাকি আমি আসব বলে সব মাছ আগেভাগে খেয়ে শেষ করে ফেলেছে, ও রোমেলা? বলে মুখ টিপে হাসে। আর মুখের মধ্যে শাড়ির আঁচলে বাঁধা কাগজের পুটলি থেকে সাজা পান মুখে গুঁজে দেয়। জামিল তাকায় মার দিকে। মুখে বলে, এইসব কথা বলতে হয় না মা, মামা-মামি শুনলে কি বলবে। আঞ্জুমান তো চেনে ছেলেকে, ওর বোধহয় লজ্জা লাগছে। সে বলে, তুই মেয়ে মানুষের মধ্যে কথা বলিস কেন রে। আর আমার ভাই-ভাবির বিষয় আমি বুঝবো, তোর ওতো বোঝা লাগবে না। কথা বলার ফাঁকে রোমেলার জালে বিশাল আকারের দুই-তিনটা কাতলা মাছ ওঠে। ও তাড়াতাড়ি জাল টেনে ওপরে তোলে। আঞ্জুমান ছেলেকে বলে, দেখ, রোমেলাকে দেখ, তুই পারবি মাছ ধরতে, অত পানিতে? পারবি না, জানি। তোকে রোমেলার মতো একটা মেয়ের সাথে বিয়ে দেব, যে তোকে দেখেশুনে রাখবে। ছেলে লজ্জা পায়, রোমেলাও লজ্জা পায়। কেউ কিচ্ছু বলে না। শুধু আঞ্জুমান মুখ টিপে হাসতে থাকে।

মায়ের ডাকে রোমেলা ওঠে। রাহেল ওঠে না। ছুটির দিনে রোমেলা খানিক সাহায্য করে মাকে। মার রান্নাঘরে থাকে কিছুক্ষণ। এটাওটা এগিয়ে দেয়, কিছু কেটে দেয়। তারপর ছোটে পাড়ার দিকে। সকালের নাস্তা খায় দেরিতে। তবে অন্যদিন সবার সাথে খায়। সে একবার রান্নাঘরে উঁকি দেয়। দেখে মা রান্নাঘরে কি যেন করছে। সে পিছন দিক দিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরে।
মা বলে, কি হলো, সকাল বেলা এত আদর কেন? কোনো আব্দার আছে নাকি?
রোমেলা বলে, কেন আব্দার ছাড়া মাকে আদর করা যাবে না?
না তা না, তবে মনে তো হচ্ছে কিছু বলতে চাও। বলে ফেল। রোমেলা বলে, আমাকে তো শহীদ দিবসের অনুষ্ঠানে গান গাইতে হবে। প্রথম শহিদ মিনার হচ্ছে স্কুলে, তার উদ্বোধন হবে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে। সকালে শহিদ মিনারে ফুল দিয়ে তারপর বোধহয় কিছু কথাবার্তা হবে। এর পর আবৃত্তি, গান। গানটা তো হারমোনিয়ামের সাথে গেয়ে ঠিকঠাক করতে হবে। অনুকুল দাদার কাছে যেতে বলেছিল হামিদ স্যার। তোমাকে বলছি, বাবাকে বলো না। শুনলে আবার তুলকালাম কাণ্ড করবে। সবসময় বাবার সাথে তর্ক করতে ভাল লাগে না। বাবা কষ্ট পেলে আমারও খারাপ লাগে। আবার নিজের ইচ্ছেমতো কিছু করতেও তো ইচ্ছে হয়। সেই প্রাণের আনন্দের জন্যই এসব করি।
জাহানারা বলে, কচিকাঁচায় তোর একটা কবিতা ছাপা হবার কথা ছিল না? সেটা বের হয়েছে?
রোমেলা বলে, হয়েছে তো, তোমাকে দেখানো হয়নি। বাবাকে দেখাতে চাই। বাবা খুব ভাল কবিতা বোঝে। এখন যেভাবে রেগে আছে, ভয়ে দেখাতে পারছি না।
জাহানারা তরকারিতে খুন্তি ঘোরাতে ঘোরাতে মেয়ের দিকে একপলক তাকায়। সে বুঝতে পারে, বাবাকে সে খুব ভালোবাসে, তবে বিরোধিতা না করে পারে না বলেই করে। এই সম্পর্কটা সে বোঝে না বললে ভুল হবে, তবে সে খানিকটা অসহায়। কিছু করতেও পারে না।
জাহানারা বলে, কবিতাটা আমাকে দিস, আমিই তোর বাবাকে দেব।
রোমেলার চোখেমুখে একটু অসহায়ত্বের ছবি ভেসে ওঠে। সে বলে, না, তা ঠিক নয়, আমিই দেখাতে চাই। তুমি যদি একটা পথ বাতলে দিতে পারতে।
জাহানারা বলে, আচ্ছা দেখি কি করতে পারি। তুই এখন অনুকুলদের বাড়িতে যাবি তো, যা, তবে মুখে কিছু দিয়ে যা।
রোমেলা বলে, না মা আমার সময় নেই, তাছাড়া দেরি হলে দাদা বের হয়ে যাবে।

দৌঁড়ে রোমেলা বের হয়ে গেলে জাহানারা ভাবে মেয়েটাকে নিয়ে। মেয়েটা কার মতো হল? তার বংশে কেউ গান গাইত না। ওর গানের গলাও খুব সুন্দর। শুধু শুনেই তো আর হয়নি। ওর বাড়তি একটা ক্ষমতা নিশ্চয়ই আছে। না হলে কীভাবে একটা গান শুনেই শিখে ফেলে। রবি ঠাকুরের গান সে যেভাবে গায়, তা শুনলে জাহানারার ছোটবেলার কথা মনে পড়ে। সে হায়দার ভাইয়ের কাছে শুনেছে রবি ঠাকুরের গান। হায়দার ভাই গান শুনত খুব। তবে শিখত না, গুনগুন করে গাইত। সেও গান শুনেছে হায়দার ভাই যখন বাজাত। কোলকাতা থেকে হায়দার ভাই কলের গানের একটা মেশিন আর রেকর্ড নিয়ে এসেছিল বাবাকে না জানিয়ে। চুপিচুপি শুনত বাবা বাড়ি না থাকলে। বড় ভাইয়ের সাথে বেশি খাতির ছিল জাহানারার। বড় ভাইয়ের গলা ভালই ছিল। সে যখন খালি গলায় গান গাইত তখন জাহানারাও মাঝেমধ্যে গাইত ওর সাথে। রোমেলাও বাবাকে লুকিয়ে গান গায়। বাবা শুনেছে মাঝেমধ্যে। খালি গলায় গান গায় বলেই হয়তো আপত্তি করে নি কোনো দিন। এখন স্টেজে সবার সামনে গান গাইবে শুনলে কি বলবে আল্লাই জানে। সারাদিন প্রায়ই সে গুনগুন করে গান গায়। যে-গানটা সে করতে চায়, সেটা জাহানারার জানা গান। বেশ ভালো গায় রোমেলা। অসাধারণ গলা ওর। অবশ্য ও গানের তো বেশিকিছু জানে না। তবে, ‘একি লাবণ্যে পূর্ণ প্রাণ, প্রাণেশ হে,আনন্দ বসন্ত সমাগমে’ বলে ও যখন গায়, সত্যি অপূর্ব লাগে। বিশেষ করে যখন ‘বিকশিত প্রীতিকুসুম হে, পুলকিত চিত কাননে’বলে শেষের দিকে লম্বা একটা টান দেয়, তখন তার গলাটা কত ভালো একটু-আধটু হলেও জাহানার বুঝতে পারে। সত্যি যদি রোমেলা গানটা ভাল করে তুলে গাইতে পারে, জাহানারার খুব আনন্দ হবে। তবে তানভিরকে কীভাবে সামলাবে তা নিয়েও খুব চিন্তা হয়।

বাঁশের একটা ছোট পাতলা ডালাতে করে তানভির অনেক তরকারি বাড়িতে আনে। এনেই জাহানারাকে ডাকে। সে তখন রান্নাঘরে। ওখান থেকেই আসছি বলে সাড়া দেয় জাহানারা। একটু পরে এসে দেখে তানভিরের সাথে হায়দার ভাই। বারান্দায় দুজন বসে। খেত থেকে বাঁধাকপি, মূলা, পালঙশাক, শালগম নিয়ে এসেছে তানভির। হায়দার ভাই অনেকদিন পরে এলো। হয়তো হাঁটতে হাঁটতে চলে এসেছে এদিকে; বেশি দূরে তো না বাড়ি, মাইল দুয়েক হবে। রোজ সকালে সে হাঁটে। সরাসরি তানভিরকে বলে, তোমার ওই শালগমের তরকারি খাওয়ার জন্য আমি কিন্তু আসি নি। আমি জাহানারার হাতের পিঠা খাব, মানে নারকেলের পিঠা। তানভির জানে এই পিঠা হায়দার ভাইয়ের খুব প্রিয়। যতবার আসবে ততবার এটা বানায় জাহানারা। এ জন্যেই বাড়িতে সবসময় চালের আটা মজুদ থাকে। এমনিতেও থাকে। তবে ফুরালে আবার বানিয়ে রাখে। এখনো এখানে ঢেঁকিতে পাড় দিয়ে চালের আটা তৈরি করা হয়। যখন তানভিরের মা ছিল, তখন ওদের বাড়িতে একটা ঢেঁকি ছিল। এখন নেই, তবে জাহানারা পাড়ার মেয়েদের দিয়ে তৈরি করিয়ে নেয়। নারকেল গাছ তো আছেই। আপাতত জাহানারা ভাইকে দুটো আটার রুটি, সবজি আর ডিম ভাজি দেয় খেতে। তানভির বলে, আমি হাত পা ধুয়ে আসি। ‘সে আসুক তারপর একসাথে খাব’, হায়দার জাহানারাকে উদ্দেশ্য করে বলে। আরও বলে, ও তুমি এই রুটি দিয়ে আমার পেট আগেই ভরিয়ে ফেলতে চাও, তা হবে না। জাহানারা বলে, কে বলেছে? ওটা তো হতে সময় লাগবে, ততক্ষণে পেটে তো ছুঁচোর কেত্তন শুরু হবে, আপাতত এসব দু-একটা খাও। জাহানারা চিন্তা করে, বাড়িতে তো নারকেল নেই। কে পাড়বে? দস্যি মেয়েটাও তো বাড়িতে নেই। সে থাকলে না হয় চুপিচুপি তুলে দেওয়া যেত গাছে। ততক্ষণে রাসেল আর সাহেলি উঠে গিয়ে মামার সাথে গল্প জুড়ে দিয়েছে। খোকাকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। মামা এসেছে শুনলে সে দৌড়াতে দৌড়াতে বাড়ি আসবে নিশ্চয়ই। রাসেল বলে, মামা তুমি কতদিন পরে এলে, আগে আগে আসতে পার না। আগে আসলে কি হত, হায়দার জিজ্ঞাসা করে। তখন রাসেল কিছু একটা বলতে গিয়ে কথা খুঁজে পায় না। সাহেলি বলে, খুব মজা হতো। তোমার সাথে গল্প করতাম। তোমার কাছে যুদ্ধের গল্প শুনতাম।

তানভির আর হায়দার খেতে বসে। রাসেল আর সাহেলি যায় মায়ের কাছে রান্নাঘরে। আর পশ্চিম দিক থেকে রোমেলা দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে বাড়ি ফেরে। সে হায়দার মামা হায়দার মামা বলে চিৎকার করতে করতে বারান্দায় ওঠে। মামা বলে, হয়েছে, এত চিৎকার করতে হবে না। আমি তো আছি, যাচ্ছি না। দেখি মামাকে কত আদর করিস, কী কী খেতে দিস। রোমেলা বলে, তুমি কী কী খেতে চাও তার একটা তালিকা দাও, আমি সব ম্যানেজ করব। হায়দার মিটিমিটি হাসে। হাসে তানভিরও। মা ডাকলে রোমেলা রান্নাঘরে চলে যায়। হায়দার বয়সে তানভিরের চেয়ে বড় হলেও বেশি বড় না, দুই-তিন বছরের বড় হবে। একই স্কুলে ও কলেজে পড়ত। আলাপ ছিল, তবে ঘনিষ্ঠতা ছিল না। তার সাথে হায়াদরের সম্পর্ক বেশ অম্লমধুর। হায়দার প্রায় নাস্তিক ধরনের মানুষ আর তানভির পুরামাত্রায় ধার্মিক আর বেশ গোঁড়া। তবু দুজনের কথা হয়, দীর্ঘক্ষণ কথা হয়। ঝগড়া হয় না, তর্ক হয়। হায়দার তাকে নানাভাবে শ্লেষমিশ্রিত কথা বলে, তবে তানভির ক্ষেপে যায় না। আলাপের বিষয়ের কোনো ঠিকঠিকানা নেই। হায়দার রসিকতা করেই কথা বলে সবসময়। হায়দার বলে, তোমার কলেজ কেমন চলছে, ছাত্রদের পড়িয়ে মজা পাও, নাকি রুটিন ওয়ার্ক চালিয়ে যাচ্ছ? জান তো, আমার একবার মাস্টারির চাকরি হয়েছিল, কয়েকমাস করার পরে দেখি বদহজম হচ্ছে। একই জিনিস প্রতিদিন পড়াতে হবে, ছেলেমেয়েরা পড়তে চায় না, তাদেরকে জোর করে কুইনাইন গেলাতে হবে। তো একদিন ইস্তফা দিলাম। তোমার বদহজম হয় না? হায়দারের কথার উত্তর দেবার সময় তানভির বেশ সাবধানে কথা বলে। প্রথমত, সে তো জাহানারার বড় ভাই, এই এলাকার খুব সম্মানীয় মানুষ। শুধু মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নয়, সব সামাজিক সাংস্কৃতিক কাজে সে সম্পৃক্ত। সবাই তাকে মানে। দ্বিতীয়ত, কোনো কথায় সামান্য ভুল হলে হায়দার রসিকতার চূড়ান্ত করে। তানভিরের লজ্জা লাগে। সেজন্য সে ধীরেসুস্থে বলে, আমি তো বদহজম কথাটাই বুঝতে পারছি না, প্রায় আঠারো বছর আছি কলেজে। আমি পড়াই, নিজে পড়ি, নতুন নতুন ছেলেমেয়েদের সাথে পরিচয় হয়। আমার তো ভালই লাগে। হায়দার বলে, ভাল লাগলেই ভাল, তবে শোন, বদহজম মানে আমার বিষয়টা গোলমেলে মনে হয়, আমাকে ঠিক স্বস্তি দেয় না। তাছাড়া তুমি তো জান, কোনো কাজই বেশিদিন আমার ভাল লাগে না। আর চাকরি করার জন্য আসলে আমি উপযুক্ত না। লেখাপড়া যা জানি তাতে একটা ভাল চাকরি তো করতে পারতাম। সংসার নেই, ঝামেলা নেই, ঝাড়া হাত-পা, ঘুরে বেড়াই স্বাধীনভাবে। এটাই আমার পছন্দ। হায়দার ভাইয়ের কথায় রস আছে, তবে খানিকটা খেদও আছে বোঝা যায়। কেন হায়দার ভাই সংসার করেনি তার কারণ সে জানে না; নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে। জাহানারাও বলেনি কোনোদিন। যুদ্ধের পরপরই তাকে বিয়ে দেবার চেষ্টা করেছিলেন শ্বশুর তার আর জাহানারার বিয়ের পর। হায়দার ভাইকে কেউ রাজি করাতে পারে নি। যুদ্ধের ভয়াবহতাই তাকে থামিয়ে দিয়েছে কিনা সে জানে না। তবে সারাদিন সামাজিক সাংস্কৃতিক কাজ নিয়ে থাকে। গ্রামে একটা বড় সাধারণ পাঠাগার তৈরি করেছে। আরো নানা সব কাজে ব্যস্ত থাকে। সবসময় তাকে হাসিখুশি মনে হয়, তবে তাকে এখন কেন যেন খানিকটা বিষণ্ণ মনে হচ্ছে তানভিরের।

এই লেখাটি সম্পর্কে মন্তব্য করতে চাইলে আমাদের ফেসবুক ভিজিট করুন :

তীরন্দাজ Teerandaz

Teerandaz Antorjal

পূর্ববর্তী পর্বের লিংকের জন্যে ক্লিক করুন >> পর্ব ৬

অন্য পর্বগুলির লিংক >> প্রজাপতি পাখা মেলো

Share Now শেয়ার করুন