মোস্তফা তারিকুল আহসান >> প্রজাপতি পাখা মেলো >> উপন্যাস (পর্ব ১)

0
381

প্রজাপতি পাখা মেলো [পর্ব ১]

পর্ব ১

বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া এক ছাত্রী। বাঙালি সংস্কৃতি আর অসাম্প্রদায়িক ভাবনার প্রেক্ষাপটে জীবনকে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার ‍দৃষ্টি অর্জন করেছে। কিন্তু সংঘাত বাধলো পরিবারের সঙ্গে। এবার সে কি করবে? কোথায় তার গন্তব্য? এই কাহিনি নিয়েই এই উপন্যাস। পড়ুন উপন্যাসটির প্রথম পর্ব।

রিকশা থেকে নেমে রোমেলা বিশাল কলাভবনের দিকে তাকাতেই লাইব্রেরির ওপারে সূর্যটা দেখতে পায়। বড় শিশু গাছটার আড়ালে সূর্যের আলো যেন প্রাণ ছড়াচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ে। ছেলেমেয়েরা হৈ চৈ করছে। আজ তার প্রথম ক্লাস। স্কুলের বন্ধু শিউলি আর ও রিকশা করে এসেছে মৈত্রি হল থেকে। শিউলি ওকে সোজা দোতলায় নিয়ে যাবে। ওখানে বাংলা বিভাগ। তার স্বপ্নের বিভাগ। স্কুল থেকেই সে মনে মনে ঠিক করে রেখেছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে আর সেটা বাংলা বিভাগে। একদিন কলেজের বাংলার হাসান স্যার হঠাৎ কবি জীবনানন্দ প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন। স্যার কিছুক্ষণ বিরতি নিয়ে বলেছিলেন, তোমরা জীবনানন্দকে বুঝতে পারবে না যদি না উঁচু ক্লাসে তাকে পড়ার সুযোগ পাও। পরে তিনি তারও এক প্রিয় শিক্ষকের জীবনানন্দের কবিতার ব্যাখ্যা দেবার কথা বলেন। রোমেলার বেশ মনে আছে, স্যার ‘আকাশলীনা’ নামের একটি কবিতায় সুরঞ্জনা নামের এক মেয়ের কথা উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছিলেন তার স্যারের ব্যাখ্যা দেবার বিশেষ ভঙ্গির কথা। হাসান স্যার যেন তখন তার প্রিয় শিক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন। বলেছিলেন, এই কবিতার যে সৌন্দর্য আর চিত্রকল্প, বিষয়বস্তুর নতুনত্ব – এসবের জন্যই জীবনানন্দ বিখ্যাত হয়ে আছেন। মুখের অভিব্যক্তিতে যেন অন্য রাজ্যের রঙ লেগে থাকত হাসান স্যারের।
দোতলায় উঠতে গিয়ে রোমেলার একবার মনে হয়েছিল, এখনও কী হাসান স্যারের সেই শিক্ষক, কী যেন নাম বলেছিলেন – হাবীব স্যার – জীবনানন্দ পড়ান! শিউলিকে জিজ্ঞেস করে লাভ নেই। কারণ ও তো পড়ে দর্শন বিভাগে। ওর জানার কথা নয়। বাংলা বিভাগের অফিসে গিয়ে রোমেলা প্রথমে নোটিস বোর্ডে রুটিনটা দেখে। তার আগে এক ছেলে তাকে মনে হয় ইচ্ছে করেই কনুই দিয়ে মৃদু ধাক্কা দিয়ে চলে গেল। ব্যাপারটা সে তেমন খেয়াল করেনি। কারণ মাথার ভেতরে কাজ করছিল অদ্ভুত এক উত্তেজনা। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম দিন। কত বাধা পেরিয়ে সে আজকে এখানে আসতে পেরেছে। বাবা খুব রাগ করেছে। সম্পর্ক রাখবে না বলেছে। মা চুপ ছিল। মা বাবাকে বোঝাতে পারবে কিনা সে জানে না। সেই উত্তেজনা মাথায় নিয়ে রোমেলা দেখছে রুটিন আর ছেলেটা ওকে ধাক্কা দিল! অন্য সময় হলে সে ছেলেটাকে ছাড়ত না। তবে এখন কিছুই বলতে পারল না। শিউলিকে বলল ঘটনার কথা এবং পিছন ফিরে দেখল ছেলেটাকে কিছুক্ষণ। দেখল লম্বা মতো, ব্রাউন রঙের প্যান্ট আর শাদা হাফ শার্ট পরে আছে ছেলেটি। তবে মুখটা ভালোভাবে দেখা গেল না। তবে ধাক্কা দেয়ার দৃশ্যটা মনে করে দেখল একবার, চেষ্টা করল ছেলেটার মুখটা মনে করার। কিন্তু মুখটা তো তেমন মনে করতে পারছে না। যখন সে ধাক্কা দেয়, তখন তো তাকায়নি ছেলেটার মুখের দিকে।

শিক্ষকদের নামের আদ্যাক্ষরের পাশেই পুরা নামগুলি দেয়া আছে। কিন্তু আদ্যাক্ষরের নামগুলি অদ্ভুত। যেমন, ধর ঝুমচৌ। বলতো পুরা নামটা কি?
রোমেলা বলে, ঝুমঝুম মতলুব চেীধুরি।
দুজনেই হো হো করে হেসে ওঠে। শিউলিও হাসে।

শিউলি বলে, দেখ, ভালো করে দেখ, কখন ক্লাস। রোমেলা দেখে, সব মিলিয়ে তিনটা ক্লাস। একটু পরে অর্থাৎ ১০টা ৪৫ মিনিটে প্রথম ক্লাস। রুম নম্বর লেখা আছে। অনেক বড় সংখ্যায়। হাজারের ঘরে। সে শিউলিকে বলে। বলে, নো প্রবলেম, আমি তোকে নিয়ে যাব। তারা পাঁচতলার দিকে যেতে থাকে। খুব দেরি নেই ক্লাসের। সিঁড়ি ভেঙে পাঁচতলায় উঠতেই দেখতে পায় আরো কয়েকজন মেয়ে ওদের আগে আগে যাচ্ছে। রোমেলা অনুমান করে, ওরা নিশ্চয় একই ক্লাসের দিকে যাচ্ছে। কেন এরকম অনুমান, বলা মুশকিল। না, এর তেমন যুৎসই ব্যাখ্যা নেই ওর কাছে। তবে তার মনে হয়েছিল এরা নতুন। পোশাক-আশাক এবং হাঁটাচলা দেখে তো তাই মনে হয়। একজনকে থামিয়ে রোমেলা বলে, তোমরা কি নিউ ফাস্টর্ ইয়ার? বাংলা? মেয়েটা হাসতে হাসতে বলে, বুঝলে কি করে?
রোমেলা বলে, দেখে মনে হলো। আমরা তো এখনো এই করিডোর ধরে হাঁটাচলাতেও সহজ হয়ে উঠিনি।
রোমেলা এবার ওর পরিচয় দেয়। আমি রোমেলা, বাড়ি রাজশাহী। তোমার কী নাম ভাই?
মেয়েটা বলল, বেলা।
বেলা, কোথাকার বেলা?
সাতক্ষীরা।
কোন স্যারের ক্লাস জানো?
জানি, হূমায়ুন স্যারের ক্লাস। কেন, তুমি রুটিন দেখনি?
দেখেছি, তবে সংক্ষেপে লেখা বলে শিক্ষকদের নাম বুঝতে পারিনি।
আমিও প্রথমে পারিনি, কিন্তু রুটিনের নিচেই দেখলাম পুরা নামগুলি দেয়া আছে। তুমি বোধহয় সেটা খেয়াল করনি। সেখানে শিক্ষকদের নামের আদ্যাক্ষরের পাশেই পুরা নামগুলি দেয়া আছে। কিন্তু আদ্যাক্ষরের নামগুলি অদ্ভুত। যেমন, ধর ঝুমচৌ। বলতো পুরা নামটা কি?
রোমেলা বলে, ঝুমঝুম মতলুব চেীধুরি।
দুজনেই হো হো করে হেসে ওঠে। শিউলিও হাসে। সে বলে, আমাদের এক শিক্ষকের নাম সৈয়দ আলা গজনফর, সংক্ষেপে সৈয়াগ। এখন ওই স্যারের নাম হয়ে গেছে সৈয়াগ স্যার। কী অদ্ভুত আর নতুন না? পুরা নামটাই এই নামের আড়ালে হারিয়ে গেছে। স্যার নিজেও জানেন না যে তাকে আমরা ওই নামেই চিনি বা বলাবলি করি। শিউলি বলে, ঠিক আছে, এখন তোমরা ক্লাসে যাও। আমার কাজ আছে। রোমেলাকে বলে, ক্লাস শেষে সোজা রিকশা করে হলে চলে আসবি। তুই এলে একসাথে খাবো। দুজন একসাথে হাত উঁচু করে পরস্পরকে বিদায় জানায়। রোমেলা বেলাকে বলে, তুমি কোথায় থাকছো?
বেলা বলে, আমি থাকছি আমার ভাইয়ার এক বন্ধুর সাথে। রোকেয়া হলে। আপাতত থাকতে দিয়েছে আর কি। জানি না আর কতদিন দেবে।
কেন, ভাইয়ার বন্ধু, তোমাকে তো আদর করে রাখার কথা। ভাগাবে কেন?
ভাগাবে, কারণ, কদিন পরপর ওরা মহাঝগড়া শুরু করে। আর ঘোষণা দেয়, সম্পর্ক কাট। তখন কথাবার্তা বন্ধ থাকে। আবার চালু হলে বেশ কদিন খুব মহব্বতের সাথে চলে। আমি আসার পরে এখন অব্দি ঝগড়া করে নি। আমার জন্যেই হয়তো সাবধানে চলছে। কারণ, ওরা দুজনই জানে আমি ওদের সব খবর রাখি। বাবা-মাকে ম্যানেজ করতে গেলে তো আমাকেই লাগবে।
তা বেশ, এই সুযোগে তুমি ডাবলিং করে যাও। আর খুব কাছেই তো রোকেয়া হল। আমার হলটা অবশ্য বেশ দূরে। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে জায়গা পেয়েছি, সেটাই ভাগ্য বলতে হবে। তবে আমাকে আমার বন্ধু শিউলি তাড়াবে না। ও তো আমার বাল্যবন্ধু, একক্লাস ওপরে পড়ত। আমাদের বাড়ি তো পাশাপাশি। আচ্ছা চলো, এখন ক্লাসে যাই।
চলো, বলে ওরা একজহাজার চুরাশি নম্বর রুমে ঢুকে পড়ল।
রুমে ঢুকতেই রোমেলা দেখে সেই ছেলেটা ফার্স্ট বেঞ্চে বসে আছে। রোমেলা কীভাবে যেন চিনতে পারে। একটা নতুন খাতায় কী যেন লিখছে ছেলেটা। কালো রঙের একটা ঝর্ণা কলম দিয়ে সে ডায়েরির মতো কিছু একটা লিখছে।

বেলার টিস্যু এগিয়ে দেয়া আর চোখ মোছার পর বুঝতে পারে। রোমেলা বেলার দিকে গভীর কৃতজ্ঞতার দৃষ্টি নিয়ে তাকায়। আজকেই বেলার সঙ্গে প্রথম পরিচয়, অথচ মেয়েটা তাকে কত গভীরভাবে কাছে টানতে পেরেছে!

বেলাকে নিয়ে রোমেলা পরের বেঞ্চের ফাঁকা জায়গায় বসে পড়ে। টিচার এখনো ক্লাসে আসেননি, দু-তিন মিনিট সময় আছে। রোমেরা চোখ ঘুরিয়ে ক্লাশটা ভালো করে দেখলো একবার। একশো তিরিশ জনের মতো ভর্তি হয়েছে। প্রায় সবাই উপস্থিত। খুব হল্লা হচ্ছে। সবাই কথা বলছে। কিন্তু কেউ কারো কথা শুনছে বলে মনে হচ্ছে না। নতুন ক্লাসে আসার উত্তেজনা নিয়ে সবাই মুখর। রোমেলা একবার পিছন ফিরে দেখে। দ্বিতীয় বেঞ্চে সিট পাওয়ায় মনে মনে নিজেকে সৌভাগ্যবতী মনে করে। আবার এটা ভেবে ভয় পায়, যদি শিক্ষক কোনো প্রশ্ন করে বসেন, আর সে যদি উত্তর দিতে না পারে। রোমেলা বেলাকে বলে সেই ছেলেটার কথা এবং তাকে দেখায়। বেলা বলে, এ নিয়ে পরে কথা বলিস।
ক্লাসে স্যার ঢুকলে সবাই উঠে দাঁড়ায়। স্যার সবাইকে বসতে বলেন। নিজের পরিচয় দেন। তাঁর পড়ানোর বিষয় বলেন। ছেলেমেয়েরা দাঁড়িয়ে প্রত্যেকে যার যার নাম বলে যায়। স্যার গম্ভীরভাবে দাঁড়িয়ে থাকেন আর সবার নাম পরিচয় শোনেন মনোযোগ দিয়ে। তেমন কোনো কথা তিনি বললেন না। দু-একবার ছোট্ট করে কিছু মন্তব্য করলেন। রোমেলা ভাবে, এত গুরুগম্ভীর ক্লাস সে কীভাবে করবে। স্যার অনেকটা রোবটের মতো দাঁড়িয়ে আছেন। কখনো কারো কারো দিকে তাকাচ্ছেন, তবে মুখের অভিব্যক্তিতে খুব একটা পরিবর্তন নেই। প্রথম দিনের প্রথম ক্লাসের সময় এভাবেই প্রায় শেষ হতে চললো। বেলাকে নীচু গলায় বললো, এভাবেই গোটা ক্লাস চলবে নাকি? স্যার ওর দিকে তাকিয়ে বললেন, ইউ স্ট্যান্ড আপ। রোমেলা জড়সড় হয়ে দাঁড়ায়। ক্লাসে বিনা প্রয়োজনে কথা বলা আমার অপছন্দ। ভবিষ্যতে এরকম হলে ক্লাস থেকে বের করে দেব। মনে থাকে যেন। রোমেলা কী করবে, বুঝে উঠতে পারে না। শুধু বলতে পারল, সরি স্যার, আর কখনো হবে না। কিন্তু রোমেলা লক্ষ করল, গোটা ক্লাসের ছেলেমেয়েরা তার দিকে তাকিয়ে আছে। সে সবার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। স্যার বললেন, বসো। রোমেলা যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। বেলা ওর দিকে তাকিয়ে ব্যাগ থেকে টিস্যু বের করে রোমেলাকে দিল। রোমেলা টিস্যু নিয়ে চোখ মুছতে থাকলো। এইটুকুতে তার চোখে যে জল এসে গেছে, বুঝতে পারেনি। বেলার টিস্যু এগিয়ে দেয়া আর চোখ মোছার পর বুঝতে পারে। রোমেলা বেলার দিকে গভীর কৃতজ্ঞতার দৃষ্টি নিয়ে তাকায়। আজকেই বেলার সঙ্গে প্রথম পরিচয়, অথচ মেয়েটা তাকে কত গভীরভাবে কাছে টানতে পেরেছে! রোমেলা শুধু অস্ফুটে ঠোঁট নাড়িয়ে বলে, ধন্যবাদ তোমাকে। বেলা কোনো উত্তর না দিয়ে ওর চোখের দিকে তাকায়।

রোমেলা লক্ষ করে, ছেলেটা ঘামছে বেলার কথা শুনে। সহজ সরল বলেই হয়ত ওর এই অবস্থা। রোমেলা বেলাকে বলে, বাদ দাও, অনেক হয়েছে। বেলা খুব দ্রুত উত্তর দেয়। যেন উত্তরটা তার রেডি করাই ছিল। ও এই কথা, আমি তোমার জন্য ঝগড়া করে মরি, আর তুমি মর তার প্রতি সহানুভূতিতে।

স্যার ততক্ষণে তার কথা শুরু করে দিয়েছেন। তিনি ভাষার পরিচয়, শক্তি, সামাজিক সংযোগ ও সাহিত্যের সাথে ভাষাতত্ত্বের সম্পর্ক নিয়ে সামান্য কিছু কথা বললেন। এটাও বললেন যে, আমরা ভাষা নিয়ে কোনো সময় ভাবি না। অথচ ভাষা আমাদের জীবনের, আমাদের সমাজের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। আমাদের চিন্তা বুদ্ধি বিবেচনা ব্যক্তিত্বের সাথে ভাষার গভীর যোগ রয়েছে। কিছু উদাহরণ দিলেন তিনি। রোমেলা লক্ষ করল পড়ানোর সময় তিনি আর ততটা গম্ভীর নন। মুখে স্মিত হাসি, মাথা ঝুকিয়ে কথা বলেন। পড়ানোটা বেশ উপভোগও করেন বলে মনে হলো রোমেলার। তাঁর চোখে তখন আলোর দ্যুতি। তিনি এত দৃঢ়তার সাথে পড়াচ্ছেন যে তা সত্যিই বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠছে। পড়ানোর সময় তিনি যেন অন্য মানুষ। রোমেলা গভীরভাবে স্যারের কথা শুনতে শুনতে তন্ময় হয়ে গিয়েছিল। বেলা হঠাৎ তাকে বলে, ক্লাস শেষ, চলো বের হই। রোমেলা বুঝতে পারে তার মুগ্ধতার গভীরতা। বেলার সাথে সে বের হয়ে আসে। পরের ক্লাস অনেক পরে। বেলা বলে, চলো, আমরা নিচে গিয়ে কোথাও বসি। এককাপ চা খেতে পারলে হতো। রুম থেকে বের হয়ে করিডোর দিয়ে যাবার পথে সে আবার সেই ছেলেটার মুখোমুখি হয়। ছেলেটা আবার ক্লাসরুমের দিকে ফিরে যাচ্ছিল। কী যেন বলতে যাবে, এমন সময় বেলা বলে, সেই ছেলেটা না? ছেলেটার মুখটা মুহূর্তের মধ্যে লাল হয়ে যায়, রক্তিম-আভা। সে বুঝতে পারে তার ধাক্কা লাগার বিষয়টা এরা ভালোভাবে নেয়নি। সেও নেয়নি। তবে সে যে ভুল স্বীকার করবে, উত্তেজনার বশে সে সুযোগও তখন পায়নি। হঠাৎ ছেলেটা বলে, আমি দুঃখিত, তখন বুঝতে পারিনি। তাড়াহুড়ো করে যাচ্ছিলাম। যখন বুঝতে পারলাম তখন দেরি হয়ে গেছে। বেলা ও রোমেলা দুজনেই ওর মুখের দিকে তাকায়। বোঝা যায় ছেলেটা অনুতপ্ত আর বেশ নিরীহ টাইপের ছেলে। বেলা ওর দিকে তাকিয়ে বলে, ধাক্কা দেবার পরেও বুঝতে পারনি কিসে ধাক্কা দিচ্ছ, মানুষ না দেয়াল? বেলা প্রশ্ন করে মিটিমিটি হাসে। কিন্তু এত সহজে তো মাফ করা যাবে না। মহা অপরাধ, রীতিমত শাস্তি হবে। বুঝেছ?
ছেলেটা খানিকটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়। কী বলবে ভেবে পায় না। কথা বলতে গিয়ে তোতলায়। বলতে থাকে, ‘আ আ স লে, আ মি ঠি ঠ ক বুঝতে পারিনি। হয়ে ছি ল কী আমি দ্রু ত যাচ্ছিলাম।’ রোমেলা এই প্রথম ছেলেটাকে গভীরভাবে দেখে। দেখতে বেশ স্মার্ট, তবে ভীষণ ভীতু। গ্রামের ছেলে হতে পারে। তবে পোশাক-আশাক দেখে তো মনে হয় শহরের। আজকালকার শহুরে, শহুরে কেন গ্রামের ছেলেরাও এভাবে কথা বলে না। তারা অপরাধ করলে স্বীকার করে না, কথা বলে ডিফেন্স নিয়ে। মার-মার কাট-কাট কথা বলে। রাতকে দিন করে ফেলে। কিন্তু একে তো ঠিক তেমন মনে হচ্ছে না। মনে হচ্ছে, সেকেলে ধরনের। রোমেলা লক্ষ করে, ছেলেটা ঘামছে বেলার কথা শুনে। সহজ সরল বলেই হয়ত ওর এই অবস্থা। রোমেলা বেলাকে বলে, বাদ দাও, অনেক হয়েছে। বেলা খুব দ্রুত উত্তর দেয়। যেন উত্তরটা তার রেডি করাই ছিল। ও এই কথা, আমি তোমার জন্য ঝগড়া করে মরি, আর তুমি মর তার প্রতি সহানুভূতিতে।
রুমে ফিরে রোমেলা দেখে শিউলি জামাকাপড় ছেড়ে মাত্র বসেছে চৌকিতে পা ঝুলিয়ে। চার সিটের রুম। চারটে টেবিল আছে ছোট ছোট, তবে সব সিটে ডাবলিং বলে চৌকির ওপরে বসে পড়ে অনেকে। রোমেলাকে দেখে বলে, শেষ হলো তোর ক্লাস? আর ক্লাস হলো না, ওই একটাই? রোমেলা বলে, হ্যাঁ, একটাই। তবে প্রথম ক্লাসের পরে অনেক গল্প হলো এক নতুন বন্ধুর সাথে, তারপর লাইব্রেরিতে গেলাম। কত্ত বই রে বাবা! আমি তো পাগল হয়ে যাব।
শিউলি জানে রোমেলা বইয়ের পোকা। ওর ছোটমামা গ্রামে একটি লাইব্রেরি করেছিল। মামা বামপন্থী নেতা ছিলেন। মস্কোপন্থী না চীনাপন্থী জানে না। তবে এ-অঞ্চলের সবচেয়ে বড়ো মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন তিনি। শিউলি নিজেও অনেক বই পড়েছে ওই লাইব্রেরি থেকে। তবে রোমেলা প্রায় সব বই পড়ে ফেলেছে বলে ওর ধারণা। মামা তখন গ্রামে ছিলেন। শিউলি আর ও যেত বই নিতে। বড় ভাই তো তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। বাড়ি এলে সেও যেত ওদের সাথে। ভাইয়া বাড়িতে আসত খুব কম। পড়াশোনা করার পাশাপাশি রাজনীতি করত। সেও খুব মেধাবী। মামা একটা ম্যাগাজিন বের করত আর তাতে লিখত দুই ভাইবোন। শিউলি কখনো লেখেনি। তবে ওদের লেখা দেখে ওর মনে হতো মাঝে মাঝে লিখলে মন্দ হয় না। কেন যেন মনে হতো লেখাটা খুব কঠিন কাজ। শিউলি বলে, হ্যাঁ, প্রচুর বই, তুই তো বই পড়তে পড়তে কানা হয়ে যাবি মনে হয়। আমার দর্শনের বইও অনেক। তবে বেশিরভাগ বই-ই ইংরেজিতে। আমি তো আবার ইংরেজিতে বেশ পাকা, তাই বুক কাঁপে। বলে হাসে শিউলি। রোমেলা বোঝে ওর কথা। শিউলি ওর স্বভাবচরিত্র সম্পর্কেও ভালো জানে। বলে, কেন তুই তো ইংরজিতে ভালো মার্কস পেতিস। তাহলে ভয় কিসের? শিউলি বলে, বোকা কোথাকার, ওই ইংরেজি আর এই ইংরেজি? আকাশপাতাল তফাৎ। ইংরেজরা যে ইংরেজি লেখে তার মানে বুঝতে শরীরের ঘাম ছুটে যায়। ব্যাটারা কোনো কথা সোজা করে বলে না, বাক্যে জটিলতা তো আছেই, তার ওপর ভাষার নতুন নতুন ডিকশন তৈরি করে আর সব লেখা অ্যালিগোরিক্যাল। কী আর করা, চেষ্টা করছি। শিক্ষকেরা প্রতিদিন নতুন নতুন অ্যাসাইনমেন্ট দিচ্ছেন। বইয়ের নাম লিখে দিচ্ছেন, পৃষ্ঠার নাম্বার বলে দিচ্ছেন, কী আর করা। খুব কষ্ট করে হজম করছি। এবার দিয়েছে শোপেনহাওয়ার। দেখা যাক কী করি। শিউলির কথা শুনে রোমেলা কোথায় যেন হারিয়ে যায়। রাহেল ভাইয়া যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ত তখন এরকম গল্প করত। রোমেলা তখন স্কুলে। নাইনে না টেনে। ভাইয়া বাড়ি আসত যখন, এসব প্রসঙ্গে অনেক কথা বলত। রাসেল সাহেলি তখন বেশ ছোট। ভাইয়া তাই রোমেলার সাথে বেশি গল্প করত। ভাইয়া চাকরি খুঁজতে খুঁজতে যে কোথায় গেছে, রোমেলা জানে না। রোমেলা যে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে, সেটাও ভাইয়া জানে না। ঠিকানা থাকলে চিঠি দিতে পারত। ওই ভাইয়ার স্বভাব। হঠাৎ করে উধাও হয়ে যায়। এবার অবশ্য বাবা ওকে বকা দিয়েছিল। বাবা সব সময় নিজের উদাহরণ টেনে কথা বলে। সেদিন বলেছিল, আমি একদিনও বেকার ছিলাম না, বুঝলে। পাশ করলাম পরীক্ষা দিলাম আর চাকরি পেয়ে গেলাম। ঠিকঠাক লেখাপড়া করলে চাকরি পাওয়া কোনো সমস্যা না। রাহেল বলেছিল, বাবা তোমাদের সময়ে বছরে সারা দেশের কতজন মাস্টার্স পাশ করত, জানো? আর এখন কতজন করে? কিন্তু চাকরির সুযোগ তো তেমন একটা বাড়েনি।
রোমেলা ভাবতে ভাবতে শিউলির কথা ভুলে গিয়েছিল। সে শিউলিকে লক্ষ করে এবার বলে, যাক বাবা, আমাকে তো আর ইংরেজদের ইংরেজি পড়তে হবে না।
তা হবে না। কিন্তু তোকেও পড়তে হবে। আমি জানি, আমার বন্ধুদের সিলেবাস দেখেছি। তোদেরও ইংরেজি পড়তে হবে। বিশ্বসাহিত্যের অনেক বই, শেক্সপীয়রের নাটক তো ওদের আমি পড়তে দেখেছি। আরো আছে লিট্যারারি থিওরি। যাবে কোথা বাছাধন। ইংরেজ গেলেও তাদের ভাষা যায়নি, ভাবনা যায়নি, যাবেও না।
রোমেলা বলে, আমি বুঝতে পারি না আমাদের এত চমৎকার সমৃদ্ধ মাতৃভাষা থাকতে কেন বিদেশি একটা ভাষা ইংরেজির প্রতি ঝুঁকে আছি।
শিউলি বলে, রাখ তো ওসব। চল, খেয়ে আসি। ইউনিভার্সিটি লাইফের প্রথম ক্লাস করলি, এবার শুরু কর প্রথম বিখ্যাত ডাইনিংখানা।

[চলবে]