যশোধরা রায়চৌধুরী | উড়ান অফুরান | রেশম পথের স্বপ্ন | ভ্রমণগদ্য

0
151

উজবেকিস্তানের সমরখন্দ তাশখন্দ ভ্রমণসহ সিল্ক রুটের কথা নিয়ে এই লেখা।

আকাশের যেরকম বেড়া দেওয়া নেই, সুরের যেরকম বেড়া দেওয়া নেই, তেমনই, এই দেশের বেড়া পেরোলে মহাদেশ। এশিয়া মহাদেশ, মধ্যপ্রাচ্য, আমাদের ঐতিহ্যের শিকড়, আমাদের ইতিহাসের ভেতরে ঢুকে থাকা সাংস্কৃতিক দেওয়া-নেওয়ার দীর্ঘ, দীর্ঘতম ইতিহাস।

উড়ান অফুরান | দ্বিতীয় পর্ব

রেশম পথের স্বপ্ন

Being born a woman is my awful tragedy… Yes, my consuming desire to mingle with road crews, sailors and soldiers, bar room regulars – to be a part of scene, anonymous, listening, recording – all is spoiled by the fact that I am a girl, a female always in danger of assault and battery. …I want to be able to sleep in an open field, to travel west, to walk freely at night.
Sylvia Plath, The Unabridged Journals

পৃথিবীর পথে পথে পথিকের মত ঘুরতে কজন আর পারে। সে সৌভাগ্য কতজনের হয়। সিলভিয়া প্লাথ তাঁর ডায়েরিতে লিখেছিলেন, মেয়ে হয়ে কতকিছুই ত করতে পারেন নি।
সারারাত ট্রাকের মাথায় চেপে ঘোরার স্বপ্ন আমার মত এক বাঙালি মেয়ের জীবনে স্বপ্নই থেকে যাবে যেমন। আদিগন্ত বিস্তৃত মাঠে শুয়ে আকাশভরা তারা দেখার জন্যই ত কত মেয়েকে একজন প্রেমিক জোগাড় করতে হয়।

নেই নেই করেও তবু আমার জীবন আমাকে নানা জায়গায় নিয়ে গেছে। সেসব জায়গা আলাদা আলাদা ভাবে বেড়ানোর জায়গা ছিল, সুখের, স্বস্তির, জিজ্ঞাসা মেটানোর, জায়গা ছিল কিনা, সেখানে ভাল কফি, সুন্দর দোকান অথবা তুলতুলে কেক খাওয়া গিয়েছিল কিনা, সেটা আমার কাছে বড় প্রশ্ন থাকেনি আর, বরং, আমার কাছে এই দীন দুনিয়ার আশ্চর্য যোগাযোগে একটা ত্রিভুজ রচিত হয়েছে, তার একটা বিন্দু যদি রাজস্থানে অন্যটা উজবেকিস্তানে ত তৃতীয়টা আমেরিকায়। সেই ত্রিভুজের ক্ষেত্রফলে জ্বলজ্বল করছে রেশম পথের গল্প। সেই রেশম পথ, যা আমার জন্মের হাজার দুই বছর আগে চীন থেকে ইরান ছড়িয়ে ছিল। পুব পশ্চিমের এই বিশাল এশিয়া মহাদেশের গোটা মানচিত্রকে চিন রাশিয়া তিব্বত ভারত পাকিস্তান আফগানিস্তান নামে চিহ্নিত যুদ্ধদীর্ণ, ভয়াবহ কাহিনিতে বুনে দেওয়ার বহুদিন আগে সেই মানচিত্র ছিল ভেড়া, ঘোড়া, খচ্চর, গাধায় চাপানো ভারতের মশলাপাতি, সুতিদ্রব্য, পুব-পশ্চিমের নানান নীলাভ টারকোয়েজ ও অন্যান্য দামি পাথর, চর্মদ্রব্য, পারস্য গালিচা, চৈনিক সূক্ষ্ম রেশমদ্রব্যের রাশিকৃত পণ্য নিয়ে হেথা থেকে হোথা যাবার এক পথ। বেদুইন থেকে শ্রমণ, পথচারী থেকে শ্রেষ্ঠী, নানা জাতি নানা বর্ণের চলার পথ… বালি ওড়া, মরুভূমি আকীর্ণ সেই পথ দিয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্মের যাতায়াত হয়েছে। কোমরে গোঁজা কাপড়ের সরু থলিতে রাখা স্বর্ণ রৌপ্য বা তাম্রমুদ্রা, লুকনো খঞ্জর-কৃপাণের কত না গল্প গাঁথা হয়েছে সেই পথে। গোটা দিন হেঁটে গিয়ে রাতের সরাইখানায় জুয়ো খেলা অথবা মদ্যপানের গল্প, দলবলের মধ্যে থেকে ছুটে যাবার বা বেঘোরে ডাকাতের হাতে প্রাণ হারাবার নতুন সব রহস্যকাহিনি রচিত হয়েছে। বহু শতাব্দী পরে, কোন এক জীবনানন্দের কবিতায় ভেসে উঠবে বলে, কোন এক শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঐতিহাসিক কাহিনিতে ঠাঁই পাবে বলে। কোন এক ঘরকুনো বাঙালির মনে স্বপ্নকল্পনার ঢেউ উঠবে বলে।

শেষ পর্যন্ত ২০০২ সালে দেখা হল রেশম পথের সঙ্গে। ওয়াশিংটন ডিসি-তে সে বছর গ্রীষ্মে, স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে সাত-দশদিন ব্যাপী রেশম পথ উৎসব হয়েছিল। আর ভাগ্যক্রমে আমিও সেখানে ছিলাম। সে উৎসবের অংশ ছিল এক মেলা, কেনাবেচা ছাড়াও অসংখ্য অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানের ভেনিউ ছিল ওয়াশিংটন মনুমেন্টের ওই চত্বর, এক প্রান্তে লিংকনের বিশাল মূর্তি আর চারধারে নানা যাদুঘর। মধ্যিখানে সরু জলধারা আর পার্কের মত সবুজ সাজানো অংশটাতে তাঁবু পড়েছিল সাদা ধবধবে মসৃণ সিন্থেটিক কাপড়ের। আর এসেছিল নানা দেশের নামে এক একটি স্টল। চিনের, রাশিয়ার, উজবেকিস্থান, ভারত, ইরান ইরাক পারস্য, মধ্যপ্রাচ্যের এক একটি দেশের এক একটি তাঁবুতে, বা তার বাইরে আশেপাশে আমেরিকার গ্রীষ্মের রোদ্দুরে স্নাত হয়ে (খুব একটা কম গরম নয় কিন্তু সেটা, ৩৪-৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস অনায়াসে) আপনি ঢুকে পড়তে পারেন বা ঘুরে বেড়াতে পারেন, খেতে পারেন পাকা তরমুজের টুকরো মাত্র দুই ডলারে (উল্টে পড়ার মত বেশি দাম !), কিনতে পারেন চিনেমাটির বাসন বা পারস্য গালিচার ছোট্ট ফালি, বসে শুনতে পারেন আশ্চর্য গান বাজনা।

তখন তিন মাস গৃহছাড়া, পরিবারছাড়া আমি। আমি ও বাংলাদেশের অডিটর জেনেরাল আপিসের উচ্চপদস্থ কর্তা বাসেত খান রবিবার ঘুরতে গিয়েছিলাম সিল্ক রুট ফেস্টিভালে। বাসেত খানের সঙ্গে প্রথম আলাপেই বাংলা বলার লোক পাওয়া গেল। মা বরিশালের শুনেই বাসেত বলেন, ও তাহলে ত আপনেও বাংলাদেশি। যতই তা বড় অফিসার হোন, নাড়ী ত ভাষায় বাঁধা। একদিন দেখি চারিদিকে নানা ভাষা নানা মতের হুল্লোড় আর কাফেটেরিয়া থেকে আনা স্যান্ডউইচ ও কফির বিস্বাদ বিজাতীয়তায় ক্লান্ত বাসেত কম্পিউটারে “আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি” শুনছেন আর দরদর করে চোখ দিয়ে জল পড়ছে। তা, দুজনেরই বাড়ির জন্য মনকেমনের সঙ্গে মিলেমিশে আছে প্রবাসের গ্লানি।

সিল্ক রুটের অছিলায় এভাবেই আমরা মেলার মাঠে হাঁটি। ওঁর ঢাকা মনে পড়ে, আমার কলকাতা। ছোট শর্ট পরা পুরুষ মহিলার ভিড়ে আমি জিন্স, কালো টি শার্টের ওপর রাজস্থানি বাঁধনির চুন্নিটি স্কার্ফের মত ঝুলিয়ে ঘুরছি। যথেষ্ট ওভারড্রেসড সামারের পক্ষে। তবু ত স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউট আমাকে, আমাদের, এই সুযোগে আমেরিকার বুকেই, সারা বিশ্বের বহুত্ববাদী সংস্কৃতির দিকে তাকানোর সুযোগ দিল। যেন একসূত্রে বাঁধা এক বিশাল জনগোষ্ঠী, যাদের ধর্ম বা ভাষায়, খাদ্যাভ্যাসে মিল নেই, তবু মিল আছে ভেতরে কোথাও।

হ্যাঁ আছেই ত। আমাদের বাজনায় মিল আছে। তারের বাজনাগুলিতে মিল। স্ট্রিং ইনস্ট্রুমেন্টের নানা ধরনের মধ্যে আশ্চর্য স্বাজাত্য। কাশ্মীরের সন্তুরের (শিব কুমার শর্মা খ্যাত, সদ্য প্রয়াত তিনি, তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা) মূলে আছে ইরানের সন্তুর। আখরোট বা মেপলকাঠের ট্রাপিজোয়েড আকারের সন্তুরে তারগুলির ওপর ছোট কাঠের ম্যালেট দিয়ে বাজানো হয়। বাদক বসেন অর্ধ পদ্মাসনে।
রাজস্থানের লোকসংগীতের সঙ্গে যে তারযন্ত্র রাবনহাত্তা বাজানো হয় তা শ্রী লংকাতেও আছে। আধুনিক বেহালার আদি রূপ এটি। আবার রাজস্থানী লোকসংগীতের সঙ্গে একতারা ও গুবগুবি বা গুপি যন্ত্র বাজানো হয়। চিমটার ছ্যানাছ্যানা আওয়াজ ত আছেই। যে আওয়াজ আবার মিলবে অন্য সংস্কৃতির গানের মহলেও।

সেইদিনের ভ্রমণে নানা তাঁবুতে থেমে গান শুনি। বুঝতে পারি, মধ্যপ্রাচ্যের আজানের সুরের সঙ্গে মিলে গেছে ভারতীয় লোকসংগীতের সুর, আবার আমাদের উত্তর পূর্বাঞ্চলের গানে কীভাবে মিশে গেছে বৌদ্ধ চান্টিংয়ের গম্ভীর গং, মন্ত্রোচ্চারণের ছোঁয়াচে সুর।

সেইদিন দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ রাজস্থানের লোকসংগীতের যাদুতে মুগ্ধ হয়েছিলাম। কালো কোট আর রঙিন পাগড়ি পরা সেলিম খান ও পার্টির সেই দীর্ঘায়িত আনন্দসংগীতে মনে পড়েছিল সত্যজিৎ রায়ের ছবি সোনার কেল্লার সেই জয়সলমিরের আশ্চর্য লোকগানকে। সত্যজিৎ বাঙালির মনে বুনে দিয়ে গিয়েছিলেন রাজস্থানের এই বিশিষ্ট সুরের জাদু। চিনতে শিখিয়েছিলেন আমাদের এ গানের মাদকতাকে।

আমার কাছে এই দীন-দুনিয়ার আশ্চর্য যোগাযোগে একটা ত্রিভুজ রচিত হয়েছে, তার একটা বিন্দু যদি রাজস্থানে অন্যটা উজবেকিস্তানে ত তৃতীয়টা তিব্বতে। না, হযবরল-র সেই ছিল বেড়াল হয়ে গেল রুমালের গল্প না। সত্যিই আছে আমাদের অতীতের সেই ত্রিভুজ।

নিজের খেয়াল নেই, এই মুহূর্তে আমিও পরে আছি বাঁধনির চুন্নিটি। আমার বাদামি চামড়া অন্য সাদাচামড়াদের মাঝে আমাকে বিশেষভাবেই চিনিয়ে দিচ্ছে ভারতীয় বলেই। গান শেষ হতেই একদল শ্রোতা বাহবা দিলেন, তালি দিলেন, কেউ কেউ ডলার নিয়ে গায়কবাদকদের সামনে দিয়ে এলেন সশ্রদ্ধভাবে।

আমি সেলাম করলাম মূল গায়ককে। আর প্রত্যুত্তরে দূর থেকে তিনিও একগাল হেসে কেমন এক চির আত্মীয়ের হাসি হেসে আমাকে প্রতি নমস্কার করলেন। কোনদিন ভুলব না সেই আদানপ্রদান। বিদেশের মাটিতে নিজের দেশের মানুষের প্রতি যে টান, যে নাড়ির বন্ধনটুকু আমরা অনুভব করি সেটাই ছিল সেদিনের মূল সুর।

আমার কাছে এই দীন-দুনিয়ার আশ্চর্য যোগাযোগে একটা ত্রিভুজ রচিত হয়েছে, তার একটা বিন্দু যদি রাজস্থানে অন্যটা উজবেকিস্তানে ত তৃতীয়টা তিব্বতে। না, হযবরল-র সেই ছিল বেড়াল হয়ে গেল রুমালের গল্প না। সত্যিই আছে আমাদের অতীতের সেই ত্রিভুজ। সেই ত্রিভুজের ক্ষেত্রফলে জ্বলজ্বল করছে রেশম পথের গল্প। সেই রেশম পথ, যা আমার জন্মের হাজার দুই বছর আগে চীন থেকে ইরান ছড়িয়ে ছিল। পুব পশ্চিমের এই বিশাল এশিয়া মহাদেশের গোটা মানচিত্রকে জুড়ে এক পায়ে চলার পথ। সে পথে তারের বাজনা বাজিয়ে মুসাফিররা গান গেয়ে ফেরে। চিন রাশিয়া তিব্বত ভারত পাকিস্তান মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে সেই পথ। এমনকি আফগানিস্তান নামে চিহ্নিত যুদ্ধদীর্ণ, ভয়াবহ অঞ্চল সেই কাহিনিতে বুনে দেওয়া ছিল মরুপথ আর গিরিপথের বহুলতায়। বহুদিন আগে সেই মানচিত্র ছিল ভেড়া, ঘোড়া, খচ্চর, গাধায় চাপানো ভারতের মশলাপাতি, সুতিদ্রব্য, পুব পশ্চিমের নানান নীলাভ টারকোয়েজ ও অন্যান্য দামি পাথর, চর্মদ্রব্য, পারস্য গালিচা, চৈনিক সূক্ষ্ম রেশমদ্রব্যের রাশিকৃত পণ্য নিয়ে হেথা থেকে হোথা যাবার এক পথ। বেদুইন থেকে শ্রমণ, পথচারী থেকে শ্রেষ্ঠী, নানা জাতি নানা বর্ণের চলার পথ… বালি ওড়া, মরুভূমি আকীর্ণ সেই পথ দিয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্মের যাতায়াত হয়েছে। কোমরে গোঁজা কাপড়ের সরু থলিতে রাখা স্বর্ণ রৌপ্য বা তাম্রমুদ্রা, লুকনো খঞ্জর-কৃপাণের কত না গল্প গাঁথা হয়েছে সেই পথে। গোটা দিন হেঁটে গিয়ে রাতের সরাইখানায় জুয়ো খেলা অথবা মদ্যপানের গল্প , দলবলের মধ্যে থেকে ছুটে যাবার বা বেঘোরে ডাকাতের হাতে প্রাণ হারাবার নতুন সব রহস্যকাহিনি রচিত হয়েছে। বহু শতাব্দী পরে, কোন এক জীবনানন্দের কবিতায় ভেসে উঠবে বলে, কোন এক শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঐতিহাসিক কাহিনিতে ঠাঁই পাবে বলে। কোন এক ঘরকুনো বাঙালির মনে স্বপ্ন কল্পনার ঢেউ উঠবে বলে।

উজবেকিস্তানে যাওয়া হল ২০১৩ সালে। কিশোরী মেয়েকে নিয়ে দাঁড়ালাম গিয়ে তৈমুর লং-এর সমাধিতে। তাশখন্দ উজবেকিস্তানের রাজধানী। সোভিয়েট যুগে তৈরি বিশাল বিশাল চৌকো চেহারার প্রাসাদ আছে সেখানে, পার্কের পর পার্ক। সবুজে সাজানো অপরূপ এক ছিমছাম শহর… সোভিয়েট ছেড়ে দেবার পর অর্থনৈতিক সমস্যায় জর্জরিত হলেও তা থেকে লড়াই করে উঠে দাঁড়ানো উজবেকিস্তান। যে দেশের ভিসা অফিসার মিঠুন চক্রবর্তীর ফ্যান। আমার মেয়ের নাম চিরায়তা চক্রবর্তী, তাই কোথাও তিনিও আত্মীয়তা পেয়ে যান যেন প্রিয় নায়কের সঙ্গে। প্রশ্ন করেন, চক্রবর্তী? মিঠুনের আত্মীয়?

উজবেকিস্তানের তাশখন্দ শহর। প্রাক্তন সোভিয়েত শহর। এই তাশখন্দেই আছে ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর আবক্ষ মূর্তি। কেননা তাশখন্দেই তিনি দেহরক্ষা করেছিলেন। ভারতের সঙ্গে উজবেকদের সম্পর্ক তাই বহুদিনের। ভারতীয় দূতাবাসও তাই সেখানে অতি সক্রিয়।

সোভিয়েতের ঐতিহ্য বহন করা এই শহরে গা ছম ছম করেছিল জনমানবহীন ফাঁকা রাস্তা দিয়ে হাঁটতে। সন্ধে ছটা থেকে সাতটার মধ্যে গোধূলি নামছিল সে শহরে। শহরটা পার্ক, গাছপালা, বাগানে সাজানো। এত বেশি সবুজের মধ্যে মানুষ হারিয়ে যায়। বড় বড় চওড়া রাস্তা। গাড়িগুলো যাচ্ছে খুব দ্রুত। এবং সংখ্যায় অতি অল্প। তাই নিরিবিলি নির্জন বলতে যা বোঝায়, ফুটপাতগুলো তাই। সবুজ অন্ধকার ছাওয়া রাস্তায় আমি আমার মেয়েকে নিয়ে বেরিয়েছি। মেয়ের বয়স সাড়ে তেরো। আমার বয়স সাড়ে ছেচল্লিশ। আমরা এখানকার পথঘাট চিনি না, ভাষা বুঝি না। যে কোন বিপদ এখানে ওঁত পেতে থাকতে পারে।

বিস্মিত অভিভূত আমরা তাই দাঁড়াই তুঁতে নীল ও গাঢ় নীলের অদ্ভুত সমাহারে জ্যামিতিক ডিজাইনে সাজানো বিশাল বিশাল তোরণ, মিনার আর গম্বুজের সামনে। যেন আরব্য উপন্যাসের পাতা থেকে নেমে আসা প্রাচীন স্থাপত্যের এক রূপকথারাজ্য এটা।

অচেনা শহরের আঁধার রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে ভয়ে আমার পা জড়িয়ে আসছিল। একটি বেশ ষণ্ডা চেহারার লোক উল্টোদিক থেকে আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে। পরনে ধূসর ওভার অল। আমাদের পাশ দিয়ে নির্বিকার মুখে লোকটা রাস্তার পাশের ভ্যাটে ময়লার ব্যাগ ছুঁড়ে দিয়ে আবার ফিরে গেল। তারপর দেখা হল একদঙ্গল ছেলের সঙ্গে। নিজেদের মধ্যে গল্প করছে তারা। তার কিছু পরে, একটা ছোট্ট দোকান। তার সামনে জটলা করে আছে কয়েকটি মা, প্র্যামে বাচ্চাদের নিয়ে। মায়েরা একলা পাঁউরুটি আনতে রাত এগারোটার সময়েও সারারাত খোলা দু চারটে সুপারমার্কেটে যায় এখানে। “খুব সেফ এই শহরটা, মেয়েদের জন্য।” আমরা, ভারতীয় মেয়েরা, আজকের দিনে দাঁড়িয়ে, কথাটা শুনে কেমন কেঁপে যাই। দিল্লি কলকাতা মুম্বই সর্বত্র যে সব ঘটনা ঘটে চলেছে ইদানীং, তার পরিপ্রেক্ষিতে, আবার ভাবি, এখনো এমন স্বর্গ আছে পৃথিবীতে? মেয়েদের জন্য সুরক্ষিত শহর, নির্জন রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়ায় কোন ভয় যেখানে নেই। স্থানীয়রা, আর এখানে পোস্টিং পাওয়া ভারতীয় দূতাবাসের ভারতীয়রা, বলছেন, আরে বাবা, এক্স সোভিয়েট দেশ না, এখনো সেই পুরনো ডিসিপ্লিন আছে অনেকটাই। তাছাড়া নারী আর শিশুদের শ্রদ্ধার ব্যাপারটা এদের মর্মে মর্মে। সমগ্রতাবাদী সোভিয়েট শাসনে, এবং এখনকার তথাকথিত গণতন্ত্র, কিন্তু প্রায়শই একনায়কতন্ত্রী এই স্বাধীন দেশগুলি তার নাগরিকদের যা দিতে পেরেছে, আমাদের দেশ কি তা পেরেছে? এই দেশই আমাকে দেখাল, একেবারে ন্যূনতম নাগরিক প্রয়োজনগুলো মেটাতে এখনো সরকার দায়বদ্ধ।

মেট্রো আছে সেই সোভিয়েত সময় থেকেই। এবং এখনো তার ভাড়া অসম্ভব কম, নামমাত্র। আছে সুন্দর পথঘাট, পরিচ্ছন্নতা। আছে পথে পথে ওয়াটার ফাউন্টেন, জল খাবার জন্য। স্বাধীনতার ফলে কিছু আনন্দ বেদনার পরিচয় তো পেলামই। নতুন প্রজন্মের চাহিদা আর পুরনো প্রজন্মের হা হুতাশ দেখলাম। নস্টালজিয়া দেখলাম, সেই যুগের জন্য, যখন “সবকিছু ফ্রি” ছিল। যখন গ্রীষ্মের ছুটিতে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে বাচ্চারা আরটেক সামার ক্যাম্পে যেত। সরকার মানুষের সব প্রয়োজনের দেখভাল করত।

আবার মেমোরিয়ালও দেখলাম স্তালিনের শাসনের সময়ে মৃত উজবেগ ইন্টেলেকচুয়ালদের নাম করে। স্বাধীন চেতনা ও বুদ্ধিকে জেগে উঠতে দেখলেই নেমে আসত একাধিপত্যের খাঁড়া, সেই দুঃসহ স্মৃতি আর ক্ষোভ এখনো তাজা। রুশ আধিপত্যের প্রতি ঘৃণাও। নিজেদের আইডেন্টিটি নিয়ে গর্ব আর তাকে নানাভাবে তুলে ধরার প্রয়াস।

উজবেকিস্তান মুসলিম প্রধান দেশ। ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে সীমানা পেরুলে আফগানিস্তান। তালিবানি হাওয়ার চিহ্নমাত্র ঢুকতে দেওয়া হয়নি উজবেকিস্তানে। ধর্মাচরণে বাধা নেই সোভিয়েত ভেঙে যাবার সময় থেকেই, গত শতকের নয়ের দশক থেকে। তাই, মুসলিমরা ইচ্ছা মতই নিজেদের প্রার্থনায় মাতেন। শুক্রবার আধবেলা অফিস প্রায় হয়না। যদিও, দেশের প্রেসিডেন্ট দু-তিনটে বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছেন উজবেকিস্তানের ব্যাপারে। এক, আঠারো বছরের নিচে ছেলেদের মসজিদে যাওয়াকে খুব একটা উৎসাহ দেওয়া হয়না। মৌলবাদ থেকে দূরে রাখা হয় মসজিদগুলোকে। বেশ নিয়ন্ত্রিত এখানে ধর্মের পালন। দেশের সুরক্ষা নিয়ে ঠিক যতটা সচেতন উজবেকিস্তান সরকার, ধর্মে মৌলবাদকে প্রবেশ করতে না দেওয়া নিয়েও ততটা।

কিন্তু আমরা ত শুধু তাশখন্দ নিয়েই তৃপ্ত নই। আমরা যেতে চাই ইতিহাসের গভীরে। মরু দেশটির বুকে আছে বুখারা সমরখন্দ… যেসব স্থানের নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে রেশম পথের গল্প। তাই আমার রেশম পথ দেখার অভিলাষের এটি মোক্ষম এক বিন্দু হয়ে দাঁড়ায়। মধ্য এশিয়ার মুকুটের মত শহর সমরখন্দ। অতি অতীত থেকে আজ অব্দি শহরটি কোনদিন পরিত্যক্ত হয়নি, তাই তার মাথায় জুটেছে প্রাচীনতম “ক্রমাগত বসবাসে”র শহরের তাজ। তাছাড়া চিন আর মধ্যপ্রাচ্যের মাঝখানে এই শহর ছিল অন্যতম প্রধান ও সমৃদ্ধ শহর, পুব থেকে পশ্চিম বরাবর রেশম পথের মালায় অন্যতম হিরের দ্যুতি এ শহরের।

তাশখন্দ থেকে, আফ্রিসিয়া ট্রেনে চেপে পড়ি। ট্রেনটা একটা সাদা পরীর মত দাঁড়িয়েছিল। কী সুন্দর আর কী মসৃণ চলে। পিচ, আঙুর, তরমুজের খেত পেরিয়ে, সবুজের মধ্যে দিয়ে পথ কেটে শাঁ শাঁ করে চলতেই থাকে। দামি ট্রেন। বিলাসিতার ব্যবস্থা করা হয়েছে বিদেশি ট্যুরিস্টদের আকর্ষণ করতে।

সমরখন্দ পৌঁছে অবশ্য রোদ্দুরে আমাদের চোখ ঝলসে গেল। আর ঝলসে গেল নীল পাথরের কারুকাজে। মরুভূমির বালি হলুদ। একেবারে চড়া হলুদ রঙ। প্রচুর হাওয়ায় সেই বালি উড়ে যায়, সরে যায়, ঢেউয়ের মত দুলে দুলে এক বালিয়াড়ি থেকে আরেক বালিয়াড়ি অব্দি নেচে নেচে যায়, যেন সমুদ্রের জল। আর, কান পাতলে, সেই হলুদ বালির গান শোনা যায়। শোঁ শোঁ শন শন করে বালি গান গায়। রোদ্দুরের রঙ ও তো হলুদ। রোদ্দুরের সঙ্গে বালির খুব ভাব। রোদ্দুর বালির ওপর পড়ে সকাল থেকে দুপুর দুপুর থেকে বিকেল, বালিকে তাতিয়ে তোলে, একেবারে আগুনের মত গরম করে তোলে। সেই বালির ভেতর মনে হয় মাংস রাখলে কাবাব হয়ে যাবে, মাখা ময়দা রাখলে রুটি হয়ে যাবে।

বিস্মিত অভিভূত আমরা তাই দাঁড়াই তুঁতে নীল ও গাঢ় নীলের অদ্ভুত সমাহারে জ্যামিতিক ডিজাইনে সাজানো বিশাল বিশাল তোরণ, মিনার আর গম্বুজের সামনে। যেন আরব্য উপন্যাসের পাতা থেকে নেমে আসা প্রাচীন স্থাপত্যের এক রূপকথারাজ্য এটা। যে টারকোয়েজ পাথরের গয়না কাশ্মীরে রাজস্থানে কিনেছি, সেই একই টারকোয়েজে সাজানো স্থাপত্য এখানে… আর ইরাক ইরানের দিকেও। বোগদাদের সুলতান হারুন অল রশিদের কাহিনিতে ছোটবেলাটা আমার ডুবে থাকত… সেই বোগদাদের যেটুকু চিহ্ন তাও ত এই একই টারকোয়েজ বা তুঁতে নীল পাথরের টুকরোর মুরাল বা দেওয়ালচিত্রে, ছোট ছোট পাথরে সাজানো মোজেইকে ভরে দেওয়া। সমরখন্দে তুঁতে নীল মোজেইকের সেই অসামান্য খেলাই দেখলাম।

বাবরের মামাবাড়ির লোকেরা মোঙ্গল ছিল। বাবর ছিল উজবেক। অথচ ভারতে যখন গেল বাবর, আর রাজপুত আর পাঞ্জাবি বীরদের হারিয়ে সোজা গিয়ে বসল দিল্লি নামে সুন্দর শহরটার মসনদে, তখন ওর পরিবারের নাম হয়ে গেল মোঘল। কী অদ্ভুত কাণ্ড।

৩২৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দে আলেক্সান্দার এই শহর দখল করেছিলেন, আর ১২২০ খ্রিস্টাব্দতে চেঙ্গিস খান জিতে নেন শহরটিকে। চতুর্দশ শতকে আমির তিমুর, যাকে আমরা তৈমুর লং বলে জানি, তাঁর দীর্ঘ সুশাসনে সমরখন্দে রচিত হয় অসংখ্য বড় স্থাপত্য। বিবি খান্যম মসজিদ, রেগিস্তান চক, তৈরি হয় এইসময়েই। ১৩৩৩-এ ইবন বতুতা ঘুরতে এসেছিলেন সমরখন্দেই। তাঁর ভাষায় সমরখন্দ ছিল শ্রেষ্ঠ নগরী, মহৎ নগরী, সৌন্দর্যে অনন্য।
একদিকে সমরখন্দ, অন্যদিকে বাবরের জন্মভিটে বুখারা। আর এইদিকে তাশখন্দ। সমরখন্দে আমির তিমুর, যাকে ইতিহাস জানে তৈমুর লং বলে, সেই তৈমুর লং বানিয়েছিল অনেক অনেক সুন্দর মসজিদ আর এবাদতখানা। নীল পাথরের কারুকাজ করা সেইসব এবাদতখানা আর প্রার্থনার স্থলগুলোর প্রতিটায় যে ঝকঝকে ফিরোজা রঙ আর গাঢ় নীল রঙের মিশেল আছে, ছোট্ট ছোট্ট পাথরের যে সব অদ্ভুত জ্যামিতিক কাজ আছে, সেগুলো সব বানানো হয়েছিল ইরানি-তুরানি ইস্পাহানি কারিগরদের দিয়ে। ইরান ইরাক সব জায়গায় ঐ কাজ আছে। সূক্ষ্ম কাজ যেন কাগজ ভাঁজ করে সাজানো, আসলে পাথরের কিংখাব সব। বহু বছরের জন্য রেখে দেওয়া। সমরখন্দের হলুদ বালিতে এই যে অদ্ভুত নীল নীল জলাশয়ের মত মসজিদ, মাদ্রাসা আর এবাদতখানা জেগে আছে, এ জায়গাটাকে বলে তৈমুর লংয়ের স্বপ্ন।

স্বপ্নই তো বটে। মরিচীকাও বটে। হলুদ মরুভূমির বালি তেতে গিয়ে বাতাস হালকা হয়ে গেলে চোখের সামনে ভোজবাজির মত নড়ে চড়ে ওঠে, কেঁপে ওঠে যে সব আকার, ভূতুড়ে সব ছায়া, মনে হয় দূরে জল চিকচিক করছে, ঘোড়ায় চেপে দিগ্দিগন্ত দাপিয়ে বেড়ানো উজবেকদের মনে হঠাৎ বিভ্রম হয়, কী যেন কী হুরিপরির যাদুতে মরুভূমির মাঝে হঠাৎ এসে গেছে জল… তেমনি, ঐ নীল কাজ করা অদ্ভুত ইমারতগুলোকে দেখলেও মানুষ হকচকিয়ে যাবে, যাবেই। মনে হবে এই হলুদ মরুভূমির মধ্যে কোথা থেকে এল জল! কোথা থেকে এল এত চোখ জুড়নো নীল নীল নীল। এ কী স্বপ্ন, এ কী মায়া! এ কী মরীচিকা!

নাহ্, কাছে গেলে দেখা যাবে সব বড় বড় ইমারত, বিরাট বিরাট গম্বুজ আর থাম আর তোরণদ্বার, তার ভেতরের জালের মত বিছিয়ে থাকা দারুণ সব নীল পাথরের ঝিকিমিকি কাজ, এগুলো একটাও স্বপ্ন নয়, সত্যি। একেবারে হাতে ধরে দেখার মত সত্যি। তৈমুর লংয়ের স্বপ্ন থেকে ধীরে ধীরে তার বংশধরেরাও বানিয়ে চলল কত না অমন মসজিদ, কত না তোরণ। আর ঘোড়ায় চেপে দিগ্‌বিদিক জয় করতে করতে, চিন দেশ থেকে আসা মোঙ্গলদের সঙ্গে লড়াই করতে করতে একসময়ে তো ওদেরও নাম হয়ে গেল মোঘল। বাবরের মামাবাড়ির লোকেরা মোঙ্গল ছিল। বাবর ছিল উজবেক। অথচ ভারতে যখন গেল বাবর, আর রাজপুত আর পাঞ্জাবি বীরদের হারিয়ে সোজা গিয়ে বসল দিল্লি নামে সুন্দর শহরটার মসনদে, তখন ওর পরিবারের নাম হয়ে গেল মোঘল। কী অদ্ভুত কাণ্ড।

কিন্তু তাতে কীই বা যায় আসে। এদিকে তো তৈমুরের বংশধর উলুগবেগ সুলতান হয়ে বসেছেন। এমন বড় দার্শনিক, এমন বড় চিন্তাবিদ, এমন বড় বৈজ্ঞানিক আর আসেনি এই দুনিয়ায়। উলুগবেগের নাম দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়েছে জ্ঞানী রাজা হিসেবে। তিনি সারাদিন সূর্য-গ্রহ-তারার গতিপথ দেখেন, অংক কষেন, জ্যোতির্বিদ্যার ওপর পাতার পর পাতা লেখেন। দোয়াতদানি শুকিয়ে যায় অহরহ, কলম ডুবিয়ে ডুবিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যে খটখটে শুকনো। পরিচারক তখন ভরে দিয়ে যায় নতুন করে পেশাই করা ভুশোকালির মসী। সেই কালিতে ডুবিয়ে আবার লেখেন। মোটা মোটা কাগজের বাঁধাই করা বই ভর্তি কুটিকুটি অক্ষরের অংকে হিসেবে লেখা হয়ে যায় তারাদের গতিপথ। নিজের তৈরি অবজার্ভেটরিতে বসে বসে রাতের পর রাত তিনি সে সব হিসেব লিখে রেখেছিলেন।

১৪০৪ সালে মারা গেলেন তৈমুর লং। প্রিয় আমির তিমুর বলে যাকে ডাকে আজও উজবেকরা। ইতিহাসে পড়া ছবি, মনের মধ্যে নাচে উলুগবেগের। তার নাম যাঁর নামে, সেই উলুগবেগ, বিখ্যাত সম্রাট, তার চেয়েও বেশি পণ্ডিত উলুগবেগের আসল নাম, মির্জা মোহম্মদ তারাঘায়ে বিন শাহরুখ। আমির তিমুরের নাতি। আমির তিমুরের ছেলে শাহরুখের ছেলে, আদরের নাতিকে সঙ্গে করেই একবার ভারতের দিকে আক্রমণ করতে গেছিলেন তিমুর। কিন্তু দিল্লি আর পৌঁছননি, কাবুল হয়েই ফেরত। তখন উলুগবেগের বয়স চার। পরের অভিযান হল, তুর্কিস্তানের অটোমান সম্রাট বায়েজিদ-কে শায়েস্তা করতে। আঙ্কারায়, ১৪০২ সালে সে কাজ সম্পন্ন করার পরই তৈমুর লং মারা যান। তাই চিন অভিযান আর হল না। তখন উলুগবেগের বয়স মাত্র দশ।

তেমনই, এই উলুগবেগ, আর তাঁর নিজের সভায় লালিত পালিত, অনেক জ্যোতির্বিদ পণ্ডিত একসঙ্গে মিলে, তারাদের তালিকা বানিয়েছিলেন সূক্ষ্ম অংক কষে। সেই তালিকাই কয়েক শো বছর পরে ইউরোপের পণ্ডিতরা নিয়ে কত কাড়াকাড়ি করে ছেপেছিল রোমান লাতিন জার্মান ভাষায়।

বাবা শাহরুখ তখন হিরাট থেকে সাম্রাজ্য চালান। উলুগবেগ শুধুই এক অংশের দেখভালের দায়িত্বে। বাবার অধীনেই, ত্রানজোকসিয়ানার অঙ্গরাজ্যের রাজা। পরে সফলভাবে দখল করবেন কাশগর, যা মোঘুলিস্তানের একটা অংশ। কিন্তু সেজন্য তো উলুগবেগকে মনে রাখে না উজবেগবাসী? ক্লাসের পড়ায় যে উলুগবেগের কথা পড়া যায় তা তো অন্য এক উলুগবেগ। পণ্ডিত উলুগবেগ। উলুগবেগ ছিলেন তাঁর সময়ের সবচেয়ে বড় জ্যোতির্বিদ। মানে, গ্রহতারাদের পর্যবেক্ষণ করতেন। কীভাবে করতেন, সে প্রমাণও আছে সমরখন্দেই।

একটা মস্ত বড় দূরবীক্ষণ যন্ত্র বানিয়েছিলেন তিনি শহরের সবচেয়ে উঁচু টিলাটির ওপরে। বৃত্তের এক চতুর্থাংশ, মানে সিকিভাগ। এই আকারের একটা নাম কোয়াড্রান্ট। সেক্সট্যান্ট নামে একটা যন্ত্র আছে, যা দিয়ে দিগন্তরেখা আর যে কোন তারার উচ্চতার ভেতরের কোণ মেপে জাহাজের নাবিকেরা নিজেদের অবস্থান বুঝতেন। সেইরকমই, সিকিবৃত্তের আকারে একটা ঢালু কোয়াড্রান্ট পাথর কেটে বানিয়েছিলেন উলুগবেগ। তার ওপর খাঁজ কেটেছিলেন প্রতি মিনিট ঘণ্টার। একটা সরু ফুটো দিয়ে সূর্যের আলো এসে পড়ে সেই ঢালু পথে। সূর্যের আলোর গতিবিধি নিরীক্ষণ করে প্রতি ঘণ্টা মিনিটের খাঁজ কাটা দাগে দাগে মিলিয়ে কোয়াড্রান্টকে দারুণ উন্নত করে ফেলেছিলেন উলুগবেগ।

তেমনই, এই উলুগবেগ, আর তাঁর নিজের সভায় লালিত পালিত, অনেক জ্যোতির্বিদ পণ্ডিত একসঙ্গে মিলে, তারাদের তালিকা বানিয়েছিলেন সূক্ষ্ম অংক কষে। সেই তালিকাই কয়েক শো বছর পরে ইউরোপের পণ্ডিতরা নিয়ে কত কাড়াকাড়ি করে ছেপেছিল রোমান লাতিন জার্মান ভাষায়।

১৪১১ থেকে ১৪৪৯ বেঁচেছিলেন উলুগবেগ। সেই সময়ের সমরখন্দকে দেখলে মনে হবে সারাদিন যেন সেখানে উৎসব।

হাঁ করে সে নগরীকে দেখে, সে নগরীর মধ্যে বসানো ছোটছোট দোকান বাজারে গিয়ে, মনে হয়েছিল ইতিহাসে ফিরে গেছি। কোথাও কোন ছেদ নেই। হাজার বছর থমকে আছে এখানে। তেমনি তাশখন্দের আদিমতম চোরসু বাজারে, মাথায় তেরপলের ছাউনি পরানো সার সার দোকান থেকে আখরোট বাদাম কিসমিস আর রং রেজিনীর ছোপানো কাপড় কিনে, বড় বড় গোল রুটি কিনে আমরা হৃষ্টচিত্তে ফিরেছিলাম। সে রুটির নাম “নোন” । আমরা যে মুঘলাই খাবারে তন্দুরি রুটিকে “নান” রুটি বলে ডাকি, তারই জাতভাই এই নোন। যেমন উজবেকিস্তানেই খেয়েছিলাম সোমসা, মাংসের কিমার পুর দেওয়া। এই সোমসা আমাদের উত্তর ভারতীয় সামোসার আদি আত্মীয়। পোলাওয়ের আত্মীয় পিলাফ খেয়েছিলাম, যা আসলে গোমাংসের বিরিয়ানি। সব খাবারেই ভুর ভুর করে গোমাংসের গন্ধ অথবা সপ সপ করে ভেড়ার মাংসের থকথকে চর্বির তেল।

খাওয়াটাও এখানে একেবারে আলাদা। গল্পের মত। খেতে হয় মস্ত বড় চৌকির ওপর হাঁটু মুড়ে বসে। বেদুইনদের খাটে বসে একথালা থেকে ভাত খাবার গল্প শোনা ছিল আশৈশব, খেয়ে দেখেছিলাম সেভাবেই, খাটিয়ার চারধারে নক্শাকাটা বেড়া দেওয়া, রঙিন কুশন পাতা। খাটিয়ার একটা নাম আছে। তাপচান। হতেম যদি আরব বেদুইন, কবিতায় পড়েছিলাম। আর ছোট্ট বেলায় শুনেছলাম বেদুইনরা সবাই একটা বিশাল থালা থেকে খায়। এইবার সচক্ষে দেখা হল। তাপচানের ওপরে কুশন সাজানো। মস্ত পালঙ্কের মত তাপচান, কিন্তু মাঠের মধ্যে পাতা সেটা। মধ্যে রংচঙা বড় এনামেলের থালায় খাবারের বাটি সাজিয়ে দেওয়া হয়। ধোঁয়াওঠা পিলাফ আর শূল্যমাংস খাবলা করে তুলে নাও একই পাত্র থেকে। এ এক অসামান্য অভিজ্ঞতা বইকি।

বাবরের দেশ উজবেকিস্তানে কেমন যেন চেনা চেনা নাম খাবারের। প্লফ। পিলাফ যা ইংরেজিতে। আর আমাদের হিন্দির পুলাও যার ভাইবেরাদর। স্বাদে আছে বেশ কিছু তফাত। আছে মিষ্টত্ব, প্রচুর বাদাম কিসমিস অঞ্জীর খেজুর। অথচ সে ভাত রান্না হয়েছে ছাগমাংস বা গরুর মাংসের রসে। গোটা উজবেকিস্তানেই মাংসের ভয়াবহ বাড়াবাড়ি দেখলাম। রাস্তার ধারে ধারে গোশত লেখা দোকানে গোমাংস বিক্রি হচ্ছে। সমসা (সামোসা-র পূর্বসূরী) নামের পুর দেওয়া সিঙ্গাড়ায় ব্যবহার হচ্ছে, দুম্বা, অর্থাৎ ছাগমাংস। আমাদের আলুর পুরের সামোসা কয়েক গোলে হেরে ভূত।

পথে পথে অসংখ্য দোকানে ফল ঢালাও বিক্রি হচ্ছে উজবেকিস্তানে। মূলত খরমুজা আর তরমুজ। মরুভূমির দেশে ভেতরে প্রচুর রস নিয়ে এই ফলগুলো অপেক্ষা করছে পথচলতি মুসাফিরের তৃষ্ণা নিবারণ করতে।

ত্রিভুজের তৃতীয় বিন্দুটা খুঁজে পেলাম এই সেদিন। রাজস্থানে আবার গেলাম। জয়সলমিরে, সোনার কেল্লায় ২০১৫-তে গিয়ে উটে চড়ার অভিজ্ঞতা লালমোহনীয়। যা জানতাম না, তা হল, ওই কেল্লাটিও সমরখন্দের চেয়ে কম কিছু না, সেই রকমই অতীত যুগ থেকে মানুষের বাস এইখানে। গলিঘুঁচি মত সরু সরু পথ, ওপরে নিচে উঠে নেমে যায়, হলুদ বেলেপাথরের অপরূপ এই দুর্গে এখনো সকালে উনুনে আঁচ পড়ে, তৈরি হয় গোল গোল রুটি। রাতে মরুভূমির মধ্যেখানে আগুন জ্বেলে গান হয়। সেলিম খান অ্যান্ড কোম্পানি। বেজে ওঠে চিমটা, রাবনহাত্তা, রনখাম্বা, আলগোজা, মঞ্জিরা। হাত নেড়ে আকাশে আকাশে ঢেউ তোলে যে গান, সে গান হয়ত রাম সীতার, কৃষ্ণ রাধার প্রেমের কাহিনি। তবু আমাদের সব গানই কি শুধু একটা ধর্মের, একটা অঞ্চলের, একটা দেশের? আকাশের যেরকম বেড়া দেওয়া নেই, সুরের যেরকম বেড়া দেওয়া নেই, তেমনই, এই দেশের বেড়া পেরোলে মহাদেশ। এশিয়া মহাদেশ, মধ্যপ্রাচ্য, আমাদের ঐতিহ্যের শিকড়, আমাদের ইতিহাসের ভেতরে ঢুকে থাকা সাংস্কৃতিক দেওয়া-নেওয়ার দীর্ঘ, দীর্ঘতম ইতিহাস।

সবিতা, মানুষজন্ম আমরা পেয়েছি
মনে হয় কোনো এক বসন্তের রাতে :
ভূমধ্যসাগর ঘিরে যেই সব জাতি,
তাহাদের সাথে
সিন্ধুর আঁধার পথে করেছি গুঞ্জন;
মনে পড়ে নিবিড় মেরুন আলো, মুক্তার শিকারী
রেশম, মদের সার্থবাহ,
দুধের মতন শাদা নারী।

অনন্ত রৌদের থেকে তারা
শাশ্বত রাত্রির দিকে তবে
সহসা বিকেলবেলা শেষ হ’য়ে গেলে
চ’লে যেত কেমন নীরবে।…

তোমার নিবিড় কালো চুলের ভিতরে
কবেকার সমুদ্রের নুন;
তোমার মুখের রেখা আজো
মৃত কতো পৌত্তলিক খ্ৰীষ্টান সিন্ধুর
অন্ধকার থেকে এসে নব সূর্যে জাগার মতন;
কতো কাছে—তবু কতো দূর।
(সবিতা, জীবনানন্দ দাশ)

Share Now শেয়ার করুন