যশোধরা রায়চৌধুরী | বাজার অফুরান | উড়ান অফুরান | ভ্রমণ

0
19

বাজার অফুরান

সুমান মানে জানিস?
সুমন? মানে, সুমনের গান-এর সুমন?
আরে না না, সুমান। অই দেখ। লেখা রয়েছে, এস ইউ এম এ এন… মানে জানিস?
না তো! কী রে? খুব লুব্ধ হয়ে তাকালাম। সার সার খাবারের স্টল, অদ্ভুত দর্শন কিছু প্যাকেটে বিবিধ সুখাদ্য বন্দি। আর ওপরে পত পত করে উড়ছে ফ্লেক্সের ব্যানার। রোমান হরফেই লেখা রয়েছে, সুমান, সুমান মোরিয়েকোস, সুমান পিনিপিগ…
একটা খাবার জিনিসের নাম হচ্ছে সুমান… তাই না? আমার চোখ জ্বলে উঠল।
ধ্যাত, সেটা তো একটা শিশুও বলে দিতে পারে। একটু এগিয়ে গেল রিন্টি। এই যে ভাই, সুমান মানে কি গো?
মানে ঠিক এই ভাষায় না বললেও, টোনটা এমনি। ইংরিজিতে বলল উত্তরটাই এল ইংরিজিতে, কিন্তু সে ভঙ্গিটাও বেশ দিশি…
ভাঙা ইংরিজি, স্প্যানিশ-ইংরিজি-ফিলিপিনো মিশ্রিত উচ্চারণ। রাইস কেক। দিস ওয়ান। একটা প্যাকেট দেখাল টাইট টি-শার্ট পরা, চুলে পনিটেল আঁটা যুবক।
ফিলিপিন্সের মানুষ খুব ভাত খেতে ভালোবাসে। অনেক অনেক বার ভাত খায় ওরা। দিনে মিনিমাম পাঁচবার ত খায়ই। সব অফিসের ক্যান্টিনে, সব রেস্তোরাঁয়, ছোট ছোট খাবারের দোকানেও, কফি বা চা খাবার কাগজের কাপের মতো কাপে ঠাশা ভাত থাকে। একটা করে কাপ টেনে নাও আর সঙ্গে কোন একটা সবজি-মাংসের ঝোল বা তরকারি নিয়ে তাই দিয়ে খাও। মাংসের ভাগটাই বেশি যদিও, কিন্তু সেই মাংসটা আবার মালাইকারির মতো খেতে হতেই পারে (নারকেলের দুধটুধ দিয়ে রান্না করা)… কারণ কে না জানে যে মালাইকারি কথাটা এসেছে মালায়া–কারি থেকে, আর মালায়া মানে মালয় দেশ, মানে বর্তমানের মালয়েশিয়া ফিলিপিনসের থেকে বেশি দূরে নয়।
তা সেই কাপের ভাতকে কী বলে জানি না, শুধু জানি স্ন্যাক্স বলতেই ফিলিপিনোরা সারাক্ষণ ভাতই খায়… তবে এটা ভাতের কেক। এই সুমান। কলাপাতা বা পামগাছের পাতা দিয়ে জড়ানো থাকে।
ফ্রেশমার্কেটে আর কী কী পাওয়া যায়? আস্ত গরু বা মোষের রোস্ট পাওয়া যায়। অসংখ্য ধরনের মাছের চাট বা চাটনি জাতীয় জিনিশ পাওয়া যায়। নুডলসের রকমফের। নানা ধরনের সবজি আর ফল তো থাকবেই কারণ ওটাই আসল আকর্ষণ। বিশেষ করে আনারস বা পেঁপে, ফুটির মতো ট্রপিকাল ফল। রাশি রাশি আতা দেখলাম স্তূপ করে রাখা। রিন্টিকে দেখালাম, অনেক কাঁচা আম। পাকা আম। তবে আমের স্বাদ তত মিষ্টি নয় আমাদের ভারতের মতো। ছড়ায় ছড়ায় কলা… ছোট কমলালেবু জালের ব্যাগে করে বিক্রি হচ্ছে। কিনে খেয়ে দেখি না লেবু না কমলালেবু, মাঝামাঝি। বেশ টক। এদের নাম ট্যাঞ্জারিন। যতই ভিটামিন সি-তে ভরপুর হোক, আমাদের জিভে টকভাব বেশি লাগবেই।
আর হ্যাঁ, দারুণ জিনিশ দেখলাম, যেভাবে আমাদের এখানে পাতলা প্লাস্টিকের ক্লিং র্যা প দিয়ে মাঝে মাঝে এপ্রিকট শুকনো পাওয়া যায় বা খেজুর, যেগুলো সব মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে… সেইরকম ওরা বিক্রি করছেন সদ্য ছাড়ানো বাতাপি লেবুর গোলাপি গোলাপি কোয়া! কী দারুণ।
সেরকমই ট্রের আকারের থার্মোকলের পাত্রে ওপরে স্বচ্ছ ক্লিং র্যা পে মোড়া রাশি রাশি সি-ফুড আছে। চিংড়ি। আছে কাঠি কাবাবের মতো দেখতে কাঠিতে গোঁজা মাংস। চিকেন ইনাসাল নাম দিয়ে বিক্কিরি হচ্ছে। মাছ মাংসের পাড়ায় এসে পড়লে আর রক্ষে নেই। ভাজা ভাজা, সেঁকা, ঝলসানো শূল্যমাংস, ভাজা মাছ, কত রকমের যে মাছ-মাংসের পদ।
কতরকমের যে পাখির ডিম। কোয়েলের ডিমে গোলাপির ওপরে বেগুনি ছিটছিট। আরো ছোট কী এক পাখির ডিম। আবার বিশাল বিশাল ডিমও আছে। অস্ট্রিচের বোধ হয়! মানুষ কী না খায়।
আছে বিশাল অ্যাকোয়ারিয়ামে রাখা স্কুইড, অক্টোপাস ইত্যাদি সি-ফুড। দেখ, বাছ, আর ব্যাগে করে বাড়ি এনে রান্না কর তেলমশলা কষে।
অন্যদিকে আছে বাটার কেক, রাম লোফ, রেড ভেলভেট কেক, বাটার লোফ, চকলেট মুস কেক, ডেট ওয়ালনাট লোফ। বেকারির প্রডাক্ট অনেক রকমের… ফুলকো ফুলকো, বাদামি বাদামি।
মাংস আর মাছের গন্ধে আমোদিত বাজারে বেশিক্ষণ ঘুরলেই ঘ্রাণেন অর্ধভোজনম।


ফিলিপিন্স এর ম্যানিলায় এই ফ্রেশ মার্কেটটা বসে একটা ফাঁকা প্লটে। মাকাটি সিটির ফাটাফাটি মার্কেট, সপ্তাহে একদিন, শনিবার। সারাদিন চলে।
মাকাটি সিটি জায়গাটা কিন্তু আসল ম্যানিলা নয়, নতুন গজিয়ে উঠেছে, ওল্ড ম্যানিলা থেকে একটু সরে। এটাই ম্যানিলার বিজনেস ডিস্ট্রিক্ট। পুরোদস্তুর ব্যাংক ও ব্যাক অফিস পাড়া, গাদা গাদা বহুতলে ঠাশা, হোটেল, কেতাদুরস্ত এক-দুখানা রেস্তোরাঁ ছাড়া দোকান সে অর্থে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। রাস্তাগুলো সোজা সোজা, নির্জন। অফিস থেকে বলে দিয়েছিল, এ পাড়ায় একলা একলা সঙ্গে ক্যামেরা, টাকাকড়ি নিয়ে সন্ধের পর বেশি না হাঁটাই ভাল। ছিনতাই হতে পারে। করলেই বা দেখতে যাচ্ছে কে। সন্ধের পর অফিসে কাজ করা সব ছেলেমেয়েদের ভিড় হাপিশ, তখন তো রাস্তাগুলো গুন্ডাদের স্বর্গরাজ্য।
ছেলেমেয়ে? ব্যাপারটা বুঝলে না? সেক্টর ফাইভে গেছ কখনো? বা কোন দাদা দিদি গুরগাঁও বা বেঙ্গালুরুতে চাকরি করে? জান না, আজকের দিনে বেশির ভাগ ব্যাংক, বেশির ভাগ সেলুলার কোম্পানি, বেশির ভাগ ইনভেস্টমেন্ট আর সফটওয়্যার কোম্পানির কর্মীকুলের বয়স ২৫ থেকে ৩৫-এর মধ্যে? ম্যানিলা হল বৃহত্তর সেক্টর ফাইভ। বিশ্বের যাবতীয় তা-বড় কোম্পানি এখানে অফিস খুলেছে, আর সে অফিস মাত্রেই তো ব্যাক-অফিস। ফিলিপিনসের শিক্ষিত শ্রেণী সারা পৃথিবীর বাজারে সাপ্লাই দিচ্ছে অপেক্ষাকৃত স্বল্প দামের কর্মীকুলকে। মার্কিন বা অন্য দেশের বহুজাতিকের লাভের অংকটা ধরে রাখা হাজার হাজার ছেলেমেয়ে।
বিকেল হলেই রাস্তায় উগরে দেয় এই অসংখ্য অফিসবাড়ির বহুতলেরা, অসংখ্য ফিলিপিনো ছেলেমেয়েকে। বেশির ভাগই মেয়ে, রোগা ছিপছিপে। ওয়েস্টার্ন পোশাক পরা। খোলা সোজা সোজা চুল, লাজুক নরম হাসি। অফিসের পর দল বেঁধে শপিং মলে গিয়ে হাজির। এরা সব্বাই এই মাকাটি এরিয়ায়, পিল পিল করে কাজ করতে আসে, দূর দূর রেসিডেনশিয়াল এলাকা ছেড়ে, ম্যানিলার বিখ্যাত জিপনিতে চড়ে। মেট্রো ম্যানিলাকে পুরো আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধেছে কিছু দশক আগে ফিলিপিন্স যাদের দখলে ছিল, সেই মার্কিন সেনার ফেলে যাওয়া এই বড় সাইজের জিপগুলো। এগুলোই এখন সাতরং-এ রেঙে, চক্রাবক্রা সাজ পরে, জমকালো হয়ে দাঁড়িয়েছে কলকাতার অটোর এক একটি বৃহত্তর সংস্করণ। হপ অন হপ অফ, মানে যেখান থেকে খুশি ওঠ, যেখানে খুশি নাম। পেসোর ওপর দিয়ে যাক।
পুরনো মানিলার মালিন্যের মধ্যে দিয়ে এঁকেবেঁকে তুমি যখন মাকাটির দিকে যাবে, এয়ারপোর্ট থেকে, তখন কিন্তু পুরনো মানিলাকে খুব খুব চেনা মনে হবে তোমার। কারণ সেই কলকাতা বা মুম্বই বা দিল্লির পুরনো অঞ্চলগুলোর মতই সরু সরু রাস্তা। ফুটপাত অপরিচ্ছন্ন, বাড়ির দেওয়ালে চুনকাম নেই, অনেক রকমের ছাপ ছোপ গ্রাফিতি। কলকাতার মত ফ্লেভারের নোংরা নোংরা বাড়ি। ছোট ছোট দোকান। বেশ চমৎকার। তারপর মনে হবে সুসজ্জিত, একেবারে মাপেকাটা মাকাটি সিটি যেন নিউ ইয়র্ক। বহুতল সব অফিস বাড়ি, হোটেল আর ছোট ছোট ৭-১১ ধরনের দোকানে ভরা।
এ দেশের পোশাকআশাক সব খুব পাশ্চাত্যের। কারণ বহু বছর স্পেনীয়দের দ্বারা উপনিবেশ হয়ে ছিল এ দেশ। ফিলিপিন্স নামটিও তাদেরই অবদান। ১৫২১ সালে এখানে আসেন ফার্দিনান্দ মাগেলান মানে স্পেনীয় আবিষ্কর্তা। তারপর ১৫৪৩ সালে ভিলালোবোস নামে আর এক স্পেনীয় অভিযাত্রী এ দ্বীপপুঞ্জের নামকরণ করলেন, স্পেনের রাজা দ্বিতীয় ফিলিপের নামে, লাস ইসলাস ফিলিপিনাস বা ফিলিপিন দ্বীপপুঞ্জ।
১৯০০ সাল নাগাদ স্পেনের কাছ থেকে আমেরিকা দখল করে ফিলিপিনসকে। তারপর বেশ কিছুদিন আমেরিকার বিরুদ্ধে লড়াই করে প্রথম ফিলিপিন রিপাবলিক। কিন্তু তবু বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকটা ফিলিপিন্স ছিল আমেরিকার অধীনেই। কিছুদিন, ১৯৪২ থেকে ১৯৪৫ জাপানের অধিকারেও চলে যায় দেশটি।
তারপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হবার আগে পর্যন্ত আমেরিকার শাসনে ফিলিপিন্স, এবং স্বাধীন দেশ হিসেবে পরিগণিত হয় ১৯৪৫ সালে।
তাই ফিলিপিনসে বেশকিছু মানুষ মুসলমান হলেও, খ্রীস্টধর্মই প্রতিষ্ঠিত ও সবচেয়ে বেশি মানুষের ধর্ম। ইংরিজি ভাষার ওপর সবার দখল থাকলেও, কষ্ট করে হলেও ইংরেজি বললেও, ওরা নিজের দেশের ভাষাকেও মান্য করেন, বলেন।
অনেকগুলি দ্বীপের সমাহার এই দেশ। সঠিক করে বললে ৭৬৪১টা দ্বীপ! ভাবো একবার। জল আর ডাঙা , ডাঙা আর জল। দ্বীপের দেশ বলেই অনেক জঙ্গল এখানে, আর মাঝে মাঝেই ভূমিকম্প আর টাইফুন হয়। চিন সমুদ্র, ফিলিপিন সমুদ্র দিয়ে ঘেরা এই দ্বীপপুঞ্জে মানুষ দূরে দূরে যায় সমুদ্রের মাছ আনতে। আর নানা ধরনের কাঠ, নানা ধরনের বাঁশ ও বেতের জিনিশ তৈরি করে গ্রামের মানুষ। ভারি চমৎকার গড়ন তাদের।
দ্বীপের কথা যখন উঠল, তখন সবচেয়ে মজার অভিজ্ঞতাটি দিয়ে শেষ করি। আমরা টাগাটায়ে দ্বীপে গেছিলাম… বেশ ঘণ্টা দুইয়ের গাড়ির পথ, তারপর এক হ্রদ, হ্রদের নাম তাল। সে তাল লেক পেরোতে হয় অসামান্য একটা রবারে তৈরি ডিঙিনৌকোর ভ্রমণে, গায়ে বেলুনের মতো লাইফ জ্যাকেট পরিধান বাধ্যতামূলক। নৌকো থেকে নেমে দ্বীপে উঠে, কিছুটা হেঁটে, দেখা যাবে সার দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে খচ্চরের দল। বাদামি রঙের ঘোড়া আর গাধার মাঝামাঝি প্রাণীটি। তিনিই নাকি আমাদের উদ্ধার করবেন, পথের সাথী হবেন।
আবার খচ্চরের পিঠে চেপে দ্বীপের ঠিক মাঝামাঝি পাহাড়ের চুড়োয় চাপা… সে পাহাড়ের পথে পথে, উঁচুনিচুর মধ্যে মধ্যে, পাথরের ফাঁক ফোকর দিয়ে বেরোচ্ছে গরম ধোঁয়া। টাগাটায়ে যদি পাহাড়ের নাম তো আগ্নেয়গিরির নাম হ্রদের নামে তাল। মৃত নয় বেশ জীবিত একটি আগ্নেয়গিরি সেটি। পথটা পুরোটাই চড়াই উতরাই, খচ্চরের পিঠে বসে কোমর ভেঙে যাবার দাখিল…
রিন্টি শেষমেশ খচ্চর থেকে নেমেই পড়ল, বলল, তার নিজেকে নাকি সোনার কেল্লার সেই উটের পিঠে চাপা লালমোহনবাবুর মতন লাগছে।
আমারো খুব কোমরে ব্যথা করছিল। পাহাড়ের চুড়োয় উঠে দেখলাম একটা জায়গায় বেড়া করা আছে, তার ওপাশেই আগ্নেয়গিরির মুখ। এখন সে মুখে শুধুই সবুজ টলটলে জল। মাটির ভেতর থেকে সামান্য সামান্য সালফারের ধোয়াঁ উগরে দিচ্ছে বটে আগ্নেয়গিরি, তবু সে অনেকটাই শান্ত লক্ষ্মী ছেলেটি হয়ে রয়েছে। সবুজ জলের শান্ত হ্রদের মতো একটি মুখ দেখলে কে বলবে কোন একদিন এখানে আগুন ঝরত, লাভা বেরিয়ে আসত গলগলিয়ে!
মানুষ যেমন, কখনো শান্ত, কখনো অশান্ত।
ফেরার সময় পাহাড় থেকে নামা, তখন তো আর ওঠার কষ্ট নেই। পায়ের তলায় গড়িয়ে যাচ্ছিল ছোট পাথর, নুড়ি। তবু হেঁটেই নামলাম। সঙ্গের বাচ্চা ছেলেটি অনেক গল্প বলল। একদল কিশোর যুবক যারা খচ্চর চালায়, তাদের সঙ্গেই হেঁটে নামলাম।
তারা টাকা পেল অবশ্য পুরো পথেরই। ওটাই ওদের রুজিরুটি। ট্যুরিস্টদের পাহাড়ের মাথায় চাপানো আর নামিয়ে আনা এটাই ওদের কাজ। ছেড়া শার্ট পরা, সাধারণ সরল মুখের বারো তেরো বছরের ছেলেটির ভাঙা ভাঙা ইংরেজি কথা কানে লেগে রইল শুধু।

ফিলিপিনসের থেকে সোজা চলে আসি ইথিওপিয়ায়। আদ্দিস আবাবার বাজার মেরকাতো। নামটি ইংরেজি মার্কেটের কাছাকাছি। আসলে ইতালিয় শব্দ। কেননা ইতালীয় শাসকেরা একদা এখানে আক্রমণ-উপনিবেশ স্থাপন-যুদ্ধু যুদ্ধু খেলা, সবই প্রচুর করে গেছেন। ইথিওপিয়ার লোক লড়েওছে তাই জান দিয়ে।

তবু , বিদেশিদের প্রতি ইথিওপিয়ার মানুষের বিনয় আর ভদ্রতার তুলনা নেই। রোগা রোগা মানুষগুলোর সুষমাও দেখার। ছিপছিপে কৃষ্ণবর্ণ সুদর্শন পুলিশ গাড়ি ভুল রাস্তায় ঘুরলে “সালাম” বলে গাড়ি থামিয়ে স্যালুট মেরে পর্চি কাটে, ২০০ বার (ভারতীয় টাকায় ৫০০) নিয়ে নেয় ফাইন হিসেবে, তারপর মিষ্টি হেসে আবার স্যালুট করে। শরীরী ভাষায় বিনীত ভঙ্গিমা।

এখানে প্রত্যেকে টাকা দেবার সময়ে ডান হাতে দেয় বাঁহাতের ডান কনুই ছুঁইয়ে। ভারতীয়দের ভঙ্গিমা। ভিড়ের মধ্যে পাশ কাটাবার সময়ে শরীর কুঁকড়ে আলতো করে সরে যাওয়াটাও সেই একই সলজ্জ বিনয়ী ভঙ্গিমা।

আফিসে, রেস্তোরাঁয় মিষ্টি হাসি, মিষ্টি ব্যবহার, পথের ভিখিরির হেসে নমস্তে বলা, রাস্তার “পালিশ” হাঁকা ছেলের হেসে হেসে তাকানো।

ভারতের চিত্রতারকাদের প্রতি আবার ইথিওপিয়ানদের তুমুল ভালবাসা। আজ আমাদের গাইড বলল সে অক্ষয় কুমারের ফ্যান। তাছাড়া শাহরুখের কথা ত জনে জনেই বলে। আজ আমাদের দলের লোকের প্রহ্লাদ সিংকে শাহরুখের ভাই বলে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে গাইড অন্য এক ইথিওপিয়ানের সঙ্গে। এখানে লোকাল ভাষায় হিন্দি ছবিগুলো ডাব করা হয়, বড়সড় এক ইন্ডাস্ট্রি।

যদিও ইথিওপিয়াতে আছে খ্রীস্টানের অতি প্রাচীন এক পাথর থেকে কুঁদে কেটে বানানো ক্রসসমৃদ্ধ লালিবেলার ভূমি, যা সারা পৃথিবীর খ্রীস্টানদের গন্তব্য এক তীর্থ, য়াবার এই ইথিওপিয়াই মুসলমান ধর্মের নানা চিহ্নে সমৃদ্ধ। ৩৩% মুসলমান জনগোষ্ঠী। সেসব কারণেও হয়ত, সালমান শাহরুখ আমিরের গ্রহণযোগ্যতাও বেশি। শাহরুখ নামে ইথিওপিয়ায় কোন এক মধ্য এশিয়ার বিখ্যাত সুলতান ত ছিল। সেটাও বলল কে যেন। স্ত্রীকে খুব ভালবাসতেন। ইত্যাদি ইত্যাদি।

মেরকাতোর বাজার গিয়ে পথ হারিয়ে ফেলা আশ্চর্য নয়। বিশাল এলাকা জুড়ে হোলসেল বাজার। সেখানে কী নেই, রাশি রাশি গাজর বাঁধাকপি লেবু বিট নানা আকারের নানা রঙের লঙ্কা, এই সব স্তূপীকৃত নানারঙা সবজির সামনে, রঙচঙে পোশাক পরা আফ্রো মহিলারা আমাদের মা মাসিদের মতই ভঙ্গিতে বসে আছেন, অসংখ্য খুচরো এবং পাইকারি পোশাকের বাজার, বাসনপত্রের ঢল, প্লাস্টিকে বোনা রঙিন ব্যাগের স্তূপ, জুতোর দোকান… চার পাঁচটা হাতিবাগান বাজার বা বড় বাজার জুড়ে দিলেই একটা মেরকাতো। আদ্দিসের শুধু না, পূর্ব আফ্রিকার বিখ্যাত বাজার। গরিবের বাজার, সাধারণ্যের বাজার। ১৩ হাজার লোক এখানে বিক্রয়ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। ৭১০০টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এখানে। অবশ্যই রাস্তার হকারদের বাদ দিয়ে। মূলত পাইকারি হারে ইথিওপিয়ার কফি বিনের কেনাবেচার জন্যই প্রসিদ্ধ এই মেরকাতো।

বাজারে আমাদের দেখে দোকানিরা ভারতীয় বলে চিনে ফেলছিল। কিনতে ডাকছিল। গাদা গাদা লোক নমস্তে নমস্তে বলছিল, অনেকে বাবুজি বলে হাঁক দিচ্ছিল। আর ইন্ডিয়া ইন্ডিয়া বলে আওয়াজ দিতেও শুনলাম অনেককে। আমরা ছজনে ভারতের চার দিক থেকে এসেছি। আমি কলকাতা, মানে পুবের। দুজনে দক্ষিণী, দুজন লক্ষ্ণৌ আর একজন বিহারী।

তাও আমরা যে ভারতীয় সেটা বাইরের দেশে এলে লোকে কেমন সহজেই বুঝে ফেলে, আজও।
মেরকাতোতে এক বিশাল বড় বোচকা নিয়ে একটা লোক আসছিল, আমি শামসেরকে বললাম হট যাও, অমনি সেই মজুরটি ‘হজ্জাও’ ‘হজ্জাও’ বলে চেঁচিয়ে উঠল।

আমরা ভারতীয়রা মশলার বাজারে গিয়ে মশলার গন্ধে পাগল হই। আবারো সেই নানা-রঙ মশলার স্তূপ। লাল লংকাগুড়ো আর বাদামি রং (জিরে নয় অন্য কিছু) তাছাড়া রু নামের পাতার শুকনো ভার্শান, কত সব শুকনো মশলা (পার্সলে, রোজমেরি ওসব বিদিশি নামে চিনি, লোকাল নাম আলাদা)… বাদাম… আহা।

ভারতীয় ছেলেরা একগাদা কাপডিশ কিনে হয়রান। এখানে এসবই নতুন লাগে। আমি হাতলছাড়া কফির ছোট্ট ছোট্ট কাপ কিনেছি। কফি কালচার বড় আশ্চর্য সুন্দর ইথিওপিয়াতে।

ইথিওপিয়াকে ধরা হয় কফিবিন নামক আশ্চর্য যাদু বীজটির জন্মস্থান। কফির উদ্ভিদটি আর কফি পানের সংস্কৃতি দুইই ইথিওপিয়ার মাটিতে জন্মেছে বলে ধরা হয়, যেমন নাকি আদি মানবী লুসি-র হাড় গোড় পাওয়া গেছে বলে এখানকার জীবাশ্ম-বন্ধু মৃত্তিকাস্তরগুলিকে “ক্রেডল অফ সিভিলাইজেশন” বলা হয়।

ভাবা হয় নবম শতাব্দী নাগাদ ইথিওপিয়াতে কফির বাদামগুলো থেকে কালো ওই তরল পানীয়টি আবিষ্কৃত হয়। আজ দেড় কোটি ইথিওপিয়াবাসী কফি চাষ, কফি তোলায় ব্যাপৃত।
কফি কালচার এতটায় মূলে সম্পৃক্ত ইথিওপিয়ায়, যে ভাষাব্যবহারে, প্রবাদে, বাগধারায়, বার বার এসে পড়ে কফি। সংস্কৃতির ভেতরে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা এই কফি কালচার। জীবনযাপন এমনকি প্রেম ভালবাসার কথাতেও কফি এসে যায় বার বার। যেমন “বুনা দাবো নাও” শব্দবন্ধের মানে “কফি আমাদের রুটি”।
আরেকটা এমন বাগধারা, বুনা তেতু। এই আমহারিক বাক্যাংশের মানে, “কফিপান” হলেও, এর অর্থ সামাজিক মেলামেশা, কফিপানের সূত্রে দেখা-সাক্ষাৎ। উত্তর ভারতীয়দের চায়পানি, বা বাঙালির চা খাবেন ত, বা আরো বেশি করে ‘চায়ের আড্ডা’ মনে পড়ছে, তাইনা? ‘আমার কফি পানের সঙ্গী নেই’ আমহারিক ভাষায় এটা বলা মানে আমি নিঃসঙ্গ।

কলকাতার রাস্তায় রাস্তায় যেমন হঠাৎ গজানোর কাল্টুদার চায়ের ঠেক বা বৌদির চা, অথবা গজাদার লেবু চায়ের বেঞ্চিপাতা ছোট্ট দোকান চোখে পড়ে, গাঁও-গেরামে যেমন লক্ষ করা যায় বাঁশের নড়বড়ে বেঞ্চি অথবা কাঠের পাটাতনে বসা গপ্পুড়ে একদল চা-খোর, হাতে ধূমায়িত কাচের গেলাস বা মাটিরভাঁড়, আদ্দিসে এসেই চোখে পড়েছিল সেরকম সব ঠেক। বুঝিনি ওগুলো কফির ঠেক। শেষমেশ লাঞ্চের পর সরকারি ছাপ্পামারা গাইড নিয়ে গেল কফি খেতে ওরকমই এক ঠেকে। প্লাস্টিকের টুল পেতে বসতে দিল মিষ্টিমত মেয়েরা। সামনে ধূপ ধুনো জ্বেলে, গোল থালায় কফি বিন রেখে, কালো সরুগলা কফি-পাত্রটি ঈষৎ হেলিয়ে উনুনের ওপর রেখে সে এক মহাযজ্ঞ।

কফি এল হাতলহীন ছোট বাটিতে। কুচকুচে কালো কফি। চিনি চলবে কিন্তু দুধ মেশানো চলবে না। তিক্ততায় মার্কিন কফিকে পুরো চার গোলে হারিয়ে দেবে। ভীষণ মিষ্টি দেখতে সবুজ পাতা দেবে সঙ্গে, হার্বটির নাম “রু”, সেটায় আশ্চর্য সুন্দর গন্ধ। কফিতে ফেলে দিলে কফিও সুগন্ধিত, আমোদিত।

রাশি রাশি লোক গোল হয়ে টুলে বসে কফি খাচ্ছে, রাস্তাঘাটে এইটে দেখার পর মনে হয় কত চেনা এই দেশ, এই সংস্কৃতি।

Share Now শেয়ার করুন