রাজিয়া সুলতানা জেনি >> ‘বিশ্বসুন্দরী’ : শেষটায় চমক ও নতুনত্ব আছে >> চলচ্চিত্র

0
536

‘বিশ্বসুন্দরী’ : শেষটায় চমক ও নতুনত্ব আছে

শেষটা অনবদ্য এবং সেটা সম্পর্কে একটা কথাও বলা উচিত হবে না। ওই অংশটা প্রথমবারের মতো, সিনেমায় দেখার আনন্দ নষ্ট হয়ে যাবে তাহলে। আর দশটা বাংলা সিনেমার মতো শুরু হলেও, শেষটায় সত্যিই নতুনত্ব উপহার দিয়েছেন কাহিনিকার এবং পরিচালক। খুব সংক্ষেপে, সাহসী টপিক আর দারুণ পরিসমাপন।

ছোট পর্দা থেকে একে একে অনেকেই পাড়ি জমিয়েছেন বাংলা সিনেমার জগতে। ব্যাপারটা নিঃসন্দেহে উৎসাহিত হওয়ার মতো একটা ঘটনা। কেউ কেউ হয়তো রাবণ হবেন, বা হতে চান, তারপরও আমার ধারণা, খুব খারাপ রাবণ হবেন না। সিনেমা থেকে চিৎকার চেঁচামেচি আর অপ্রয়োজনীয় ভালগারিটি থেকে মুক্তি পাবো। তাই ছোট পর্দার পরিচিত নির্মাতা চয়নিকা চৌধুরীর সিনেমা বিশ্বসুন্দরী নিয়ে একটা উৎসাহ শুরু থেকেই ছিল। আজ সিনেমাটা দেখতে বসলাম।
সিনেমা শুরুর আগে, পরিচালকের বেশ কিছু ফেসবুক পোস্টের কারণে জানতে পেরেছিলাম, খুব ইমোশানাল এক গল্প এটা। তাই পুরো সিনেমায় গেসওয়ার্ক কাজ করেছে। কোন অংশটায় দেখা পাব সেই ‘খুব ইমোশনাল’ গল্পের। অবশেষে সেটা পেলাম, এবং তিনি যথার্থই বলেছেন। ওই অংশটা রিয়েলি টাচি।
তবে পুরো সিনেমা এমন ছিল না। শুরুটা বেজায় ক্লিশে। সেই বড়লোক বাবা মায়ের খামখেয়ালি সন্তানকে ইন্ট্রোডিউস করা দিয়ে শুরু হয় গল্প। বিভিন্ন সিনেমা বা নাটকে হাজার বার দেখানো সিনগুলো, দেখতে বিরক্ত লাগছিল। সেই সাথে হতাশ হতে শুরু করেছিলাম। এরপরে যখন বাংলা সিনেমায় ধনী অন্টারপ্রেনর নারী মানেই, তিনি অফিসে ঢুকবেন আর সবাই ‘গুড মর্নিং’ ম্যাডাম বলে সম্বোধন করবেন, কিছু ফাইলে সিগনেচার করবেন, এসব সিন শুরু হল, তখন মনে হচ্ছিল, ‘আর কত? হতাশার সাগরে হাবুডুবু খেতে খেতে তারপরও দেখতে থাকলাম।
এর কিছুক্ষণ পরে এন্ট্রি হল নায়িকার। এন্ট্রি খারাপ না। সিনেমা হলে হয়তো বেশ কিছু তালি আর সিটি পড়েছিল। এর কিছুক্ষণ পরে শুরু হয় কাহিনি। আর সেই কাহিনি অনেক বেশি গতানুগতিক। খামখেয়ালী ছেলেকে লাইনে আনতে নায়িকার সাহায্য চায় নায়কের মা। বেশ কিছু পুরনো ঘটনার কারণে রাজি হয় নায়িকা। শুরু হয় প্রেম প্রেম খেলা। আর এরপরে যথারীতি সেই কাজে সফল হওয়া। কাহিনির এই অংশটুকু প্রত্যাশিত ছিল। যা দরকার ছিল, তা হচ্ছে এই প্রত্যাশিত অংশটাকে কিছু নতুনত্ব দিয়ে আকর্ষণীয় করে তোলা। কিছু নতুন ঘটনা, কিছু সুন্দর ডায়ালগ। তেমন কিছুই পেলাম না। যা ছিল তা হচ্ছে, কিছু ড্রোন শট, আর একজোটিক লোকেশানে শ্যুট। এদিয়ে নতুনত্ব আসে না। একঘেয়ে সিন, যেখানেই শ্যুট করেন, একঘেয়েই লাগবে। ডায়ালগ ছিল বেজায় সাধারণ। তারপরেও দাঁতে দাঁত চেপে দেখে যেতে থাকলাম।

মনে হয়েছে, নায়ক আর নায়িকার প্রেম করানোর জন্যই ঘটনাগুলো তৈরি করা হয়েছে। আর দশটা বাংলা সিনেমার জন্য হয়তো এটা সহনীয়, প্রত্যাশিত, কিন্তু ছোট পর্দা থেকে আসা, সুন্দর কাহিনিবহুল সিনেমা উপহার দেয়ার জন্য আসা কোনো পরিচালকের সিনেমায়, এটাই অসহনীয় লেগেছে।

আসলে বিরক্তি লাগছিল অন্য একটা কারণে। কাহিনি একঘেয়ে হওয়ার সাথে সাথে অতি মাত্রায় বানানো মনে হচ্ছিল। কমবেশি সব কাহিনিতেই কিছু না কিছু অবাস্তব ঘটনার মিশেল থাকে, কিছু রূপকথার ইফেক্ট দেয়ার চেষ্টা থাকে, মনে হয় সাধারণ জীবনে এমনটা হয় না, তারপরও দেখতে বা পড়তে ভালো লাগে। কিছুটা সময়ের জন্য মন চলে যায় স্বপ্নের জগতে। কখনো মন মেনে নেয়, সত্যি এমন হতেও পারে। এক্ষেত্রে এমনটা লাগেনি। মনে হয়েছে, নায়ক আর নায়িকার প্রেম করানোর জন্যই ঘটনাগুলো তৈরি করা হয়েছে। আর দশটা বাংলা সিনেমার জন্য হয়তো এটা সহনীয়, প্রত্যাশিত, কিন্তু ছোট পর্দা থেকে আসা, সুন্দর কাহিনিবহুল সিনেমা উপহার দেয়ার জন্য আসা কোনো পরিচালকের সিনেমায়, এটাই অসহনীয় লেগেছে। উনি বা উনার পথ ধরে যারা আসবেন বাংলা সিনেমা পরিচালনায়, সবাই সম্ভবত নিজের অজান্তেই এই ব্যাগেজটা বয়ে নিয়ে আসবেন।
তারপরও দেখতে থাকলাম। একসময় নায়কের মা এবং নায়িকার পরিকল্পনা ফাঁস হয়ে যায়। খুব সাময়িক একটা বিরহও আসে। আসে কিছু ফ্ল্যাশব্যাক। বোঝানো হয়, কেন সেই ধনী পুত্র এতো খামখেয়ালি। কেন সৌন্দর্যের প্রতি এতোটা বিতৃষ্ণা তার। কনভিন্স করার চেষ্টা হলেও, বিশ্বাসযোগ্য লাগেনি। আরোপিত মনে হয়েছে। তারপরও মেনে নিলাম। কাহিনি এগোতে লাগল।
পরের ধাপে ছিল নায়িকার বাবার সাথে দ্বন্দ্ব-সংঘাত। বাবার অপছন্দ নায়ক। ঠিক যখন সিদ্ধান্ত নিচ্ছিলাম, আবার কিছু ক্লিশে কাহিনির মুখোমুখি হতে যাচ্ছি, যখন ভাবছিলাম সময়টা নষ্ট হল; ঠিক তখনই গল্প টুইস্ট করলো। বেশ চমকপ্রদ আকর্ষণীয় বাঁকবদল। ব্যাপারটার জন্য গল্পকার আগে থেকে খুব একটা প্রস্তুত করেননি দর্শকদের। কিছু কিছু ক্লু ছিল, তবে তা মনে দাগ কাটবার মতো করে বলেননি। আর একটু শক্ত ক্লু দিলে বোধহয় ভালো হত। দর্শক এক্সপেক্ট করে থাকত, হয়তো এঞ্জয়ও একটু বেশি করত।

অভিনয় নিয়ে বেশ কিছু নালিশ আছে। চম্পার শুরু দিকের অভিনয় ভালো লাগেনি। চরিত্রের জন্য যতোটা পার্সোনালিটি জরুরি ছিল, সেটা আসেনি। সিয়াম, খুব খারাপ করেনি।

যাই হোক, রিভিউ এখানেই শেষ করতে হচ্ছে। এর চেয়ে বেশি বললে, আপনাদের দেখাটা সাদামাঠা হয়ে যাবে। গল্পের প্রাণ লুকিয়ে আছে আসলে সিনেমার শেষ তিরিশ মিনিটে। সেটা লুকিয়ে রাখার যে চেষ্টা গল্পকার করেছেন, তার সাথে আমি একমত। কিন্তু সেটা করতে গিয়ে তিনি যেটা করেছেন, তা হচ্ছে, সিনেমাটার প্রথম অংশ নিয়ে তেমন কোন ভাবনা ভাবেননি। সিনেমাটা শেষ করে মনে হয়েছে, প্রথম অংশটি আসলেই অপ্রয়োজনীয় ছিল।
যাই হোক, অভিনয় নিয়ে বেশ কিছু নালিশ আছে। চম্পার শুরু দিকের অভিনয় ভালো লাগেনি। চরিত্রের জন্য যতোটা পার্সোনালিটি জরুরি ছিল, সেটা আসেনি। সিয়াম, খুব খারাপ করেনি। মাঝে মাঝে লাউড হয়ে যাওয়াটা সম্ভবত কাহিনিকারের চাওয়া ছিল। পরীমনি পারফেক্ট অনেকটাই। ফজলুর রহমান বাবু, সবসময়ই অসাধারণ। বাকিদের অভিনয়ও খারাপ লাগেনি।
ডায়ালগ ভালো-মন্দে মেশানো। মাঝে মাঝে ক্রিস্প ছিল। মাঝে মাঝে ক্লিশে। বহুবার ব্যবহার হওয়ার সিন। নায়কের হাতে গিটার, কিন্তু জানে না কিভাবে গিটার ধরতে হয়, এগুলো খুবই চোখে লাগে। গানগুলো মেলোডিয়াস। মিউজিক কম্পোজারকে সাধুবাদ।
বাকি থাকে পরিচালনা। চয়নিকা চৌধুরী সম্পর্কে বলা হয়, দারুণ মেধাবী নন, তবে যত্ন নিয়ে নিজের কাজ করেন। সিনেমা দেখে, এই কথার সাথে আমিও একমত। সিনেমায় যত্নের ছাপ আছে। দৃশ্যগুলো বেশ ভালোভাবেই ভেবে রেখেছিলেন মনে হয়েছে। আর এটাকে কিছুটা দুর্বলতাও মনে হয়েছে। ভিজ্যুয়ালের ব্যাপারে অবসেসড্ ছিলেন। কাহিনি যে এগুচ্ছে না, এটা খুব নজরে আনেননি।
সবশেষে বলব, শুরুটা, বা বলা যায় প্রথমার্ধ আরো গতিশীল হলে মূল কাহিনির সাথে পরিপূরক সমান্তরালে মানানসই হয়ে উঠতো, আরও নান্দনিক একটা সিনেমা হতো। এখনও খুব খারাপ হয়েছে, এমন না, আসলে প্রত্যাশা বেশি হলে যা হয়, একটু কমতি হলেই মনে হয়, উনি কেন এমন সিনেমা বানালেন।
শেষটা অনবদ্য এবং সেটা সম্পর্কে একটা কথাও বলা উচিত হবে না। ওই অংশটা প্রথমবারের মতো, সিনেমায় দেখার আনন্দ নষ্ট হয়ে যাবে তাহলে। আর দশটা বাংলা সিনেমার মতো শুরু হলেও, শেষটায় সত্যিই নতুনত্ব উপহার দিয়েছেন কাহিনিকার এবং পরিচালক। খুব সংক্ষেপে, সাহসী টপিক আর দারুণ পরিসমাপন।

Share Now শেয়ার করুন