রেজা ঘটক > শরণার্থী জীবনের দৃশ্যমান প্রতিচ্ছবি ‘পাঁজরে চন্দ্রবাণ’ >> মঞ্চ

0
970
Labonno Prova

রেজা ঘটক > শরণার্থী জীবনের দৃশ্যমান প্রতিচ্ছবি পাঁজরে চন্দ্রবাণ >> মঞ্চ

 

দীর্ঘদিন পর শিল্পকলা একাডেমি’র এক্সপারিমেন্টাল থিয়েটার হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স ডিপার্টমেন্ট’-এর প্রযোজনা ‘পাঁজরে চন্দ্রবান’ দেখে মুগ্ধ হয়েছি। ‘পাঁজরে চন্দ্রবাণ’ নাটকটি রচনা করেছেন শাহমান মৈশান এবং নির্দেশনা দিয়েছেন ইসরাফিল শাহীন।
মাত্র এক ঘণ্টা তেরো মিনিটের নাটকে সাম্প্রতিককালের শরণার্থী সমস্যাকে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। বিশেষ করে গত বছরের অক্টোবর, নভেম্বর, ডিসেম্বর এবং চলতি বছরের জানুয়ারিতে রোহিঙ্গা শরণার্থী জীবনের দুঃখ-কষ্ট-বঞ্চনা, লড়াই ও বাঁচার সংগ্রাম, ইতিহাস ও চলমান বাস্তবতা, ক্ষোভ ও হতাশাগুলোকে উপজীব্য করেই নাটক ‘পাঁজরে চন্দ্রবাণ’।
বাংলাদেশের কক্সবাজারের উখিয়ায় অবস্থানরত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের উপর মাঠ পর্যায়ে গবেষণা, প্রশিক্ষণ, সংলাপ ও পরিবেশনায় রোহিঙ্গা জনসাধারণকে সাথে নিয়ে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরে থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থীরা ‘পাঁজরে চন্দ্রবাণ’ নাটকটি যেভাবে মাঠ থেকে তুলে এনে পরীক্ষণ থিয়েটার হলে সফল মঞ্চায়ন করলো, সেটি সত্যি সত্যিই এক বিশাল যজ্ঞ। এই যজ্ঞের নির্দেশনায় ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স ডিপার্টমেন্ট’-এর অধ্যাপক ডক্টর ইসরাফিল শাহীন। নাটকটি রচনা ও তত্ত্বাবধানে অনুঘটক হিসেবে ছিলেন একই বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শাহমান মৈশান।
আরব বসন্তের পর থেকে সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় শরণার্থী সমস্যা। আটলান্টিক থেকে ভূমধ্যসাগর, মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইউরোপ, কিংবা সাম্প্রতিক কালের বঙ্গোপসাগরের বুকে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া মায়ানমারের রোহিঙ্গাদের শরণার্থী জীবনের সমস্যাকেই মূলত ‘পাঁজরে চন্দ্রবাণ’ নাটকে তুলে ধরা হয়েছে। মায়ানমারের সামরিক জান্তা কর্তৃক জাতিগত নিপীড়নের শিকার হয়ে রোহিঙ্গারা দলে দলে দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছে। সাগরপথে বা স্থলপথে তারা আশ্রয় খুঁজেছে প্রতিবেশি বাংলাদেশে। প্রায় দশ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর আশ্রয়স্থল এখন বাংলাদেশ।
এই আশাহীন-স্বপ্নহীন-ঘরহীন-রাষ্ট্রহীন মানুষের মধ্যে যে ভীতি, যে শূন্যতা, যে আতংক, যে অসহয়াত্ব, যে একাকীত্ব, যে বাঁচার আকাঙ্ক্ষা, যে আশ্রয় পাবার প্রচেষ্টা, যে আকুতিসমুহ, তাদের সমগ্র জীবনকে যেভাবে গ্রাস করছে, যেভাবে তাদের উদ্বাস্তু করেছে, সেই সব উদ্বাস্তু মানুষের আবেগকে থিয়েটারের মাধ্যমে অত্যন্ত নান্দনিকতায়, সবল শক্তিতে ও দৃষ্টিনন্দন কম্পোজিশানের মাধ্যমে ‘পাঁজরে চন্দ্রবাণ’ নাটকে যেভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, তা সত্যি সত্যিই বাংলাদেশের নাটকের নতুন সম্ভাবনা ও স্যোশাল ডাইম্যানশনকে এক নয়া স্বকীয়তায় রূপ দিয়েছে। নাটকটির রচয়িতা ও নির্দেশক ‘পাঁজরে চন্দ্রবাণ’ নাটকটি দিয়ে দর্শকদের যে তথ্যটি প্রদান করেছেন, সেটি মানুষের সেই চিরায়ত সামাজিক জীবের সত্যতাকে মুখ্য করেছে। মানুষ মৃত্যুর আগেও যে একজন পছন্দের সঙ্গী খোঁজে, মানুষ যে একাকীত্বের অসহাত্বকে জয় করতেই সারাজীবন সংগ্রাম করে, সেটিকে প্রস্ফুটিত করেছে। মানুষ একা জন্মলাভ করলেও সে আসলে সঙ্গী ছাড়া বাঁচতে পারে না।
নাটকের থিমের সাথে চমৎকার মিউজিক কম্পোজিশান, আবহসঙ্গীত, আলোক প্রক্ষেপণ এবং কুশীলবদের নান্দনিক ও সাবলীল সফল প্রয়োগ নিশ্চয়ই দর্শকদের হৃদয়ে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকবে। নাটকের সাটামাটা সেট ও তার থিয়েটারিক্যাল অ্যাপ্রোচ চমৎকার। মাত্র নয় জন পারফরমার দিয়ে এমন একটি সাম্প্রতিক ঘটনাকে এভাবে মঞ্চে তুলে আনার জন্য নির্দেশক ইসরাফিল শাহীনকে আমার প্রাণঢালা শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।
নাটকের থিম, সংলাপ ও ডাইম্যানশনে তরুণ মেধাবী নাট্যকার ও নির্দেশক শাহমান মৈশান যে মুন্সীয়ানার পরিচয় দিয়েছেন, তা সত্যি সত্যিই প্রশংসা করার মতো। শাহমান মৈশান শব্দ দিয়ে, বাক্য দিয়ে যেমন শরণার্থী জীবনের প্রবল কঠিন আবেগকে দারুণভাবে তুলে এনেছেন, তেমনি তিনি বাক্যের পিঠে বাক্যের নাটকীয় ব্যবহারে আবেগ ও জীবনমুখী শব্দের অপ্রতুল ব্যবহারে অত্যন্ত দক্ষতা দেখিয়েছেন। এ যেন অসীমের সাথে সসীম শব্দের এক নিবিড় মেলবন্ধন।
নাটকে ব্যবহৃত গানগুলো নাটকটির যেন সত্যিকারের নিউক্লিয়াস। দর্শক প্রাণভরে পিনপতন নিরবতায় সেই সুরের মূর্ছনাকে হৃদয় দিয়ে হজম করেছেন। হল থেকে বের হবার পরেও সেই সুরের ভেলায় এখনো আমার সাঁতার কাটতে ইচ্ছা করছে। এ যেন এক ভিন্নধারার সুর, এ যেন এক নতুন মাত্রার ভালোলাগা। সেই ঘোর অনেকক্ষণ সাথী হলে ভালো না লেগে উপায় নাই।
‘পাঁজরে চন্দ্রবাণ’ নাটকটির মঞ্চ, আলোক ও দ্রব্যসম্ভার পরিকল্পনায় ছিলেন আশিক রহমান লিয়ন। আলোক প্রক্ষেপণে ছিলেন রুদ্র সাঁওজাল ও আমিনুর রহমান আকিব। পোশাক পরিকল্পনা ও রূপসজ্জায় ছিলেন কাজী তামান্না হক সিগমা। সংগীত পরিকল্পনা ও প্রয়োগে ছিলেন কাজী তামান্না হক সিগমা ও সাইদুর রহমান লিপন।
নাটকটির বিভিন্ন চরিত্রে চমৎকার ও সাবলীল অভিনয় করেছেন উম্মে হানী, তন্ময় পাল, সাখাওয়াত ইসলাম ফাহাদ, উম্মে সুমাইয়া, মো. আব্দুর রাজ্জাক, শংকর কুমার বিশ্বাস, রনি দাস, সানোয়ারুল হক ও ইসরাত জাহান মৌটুসী।
‘পাঁজরে চন্দ্রবাণ’ নাটকটি গত ৫ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটমণ্ডল মিলনায়তনে এবং ৬ থেকে ৯ মার্চ বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি’র এক্সপারিমেন্টাল থিয়েটার হল-এ একটানা পাঁচটি মঞ্চায়ন হয়। আগামী ১৩ মার্চ ভারতের পাটনায় অনুষ্ঠিত থিয়েটার অলিম্পিকে ও ১৫ মার্চ ভারতের দিল্লিতে পরপর দুটি মঞ্চায়ন হবে। বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত এই পাঁচটি মঞ্চায়নের অভিজ্ঞালব্ধ ‘থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স ডিপার্টমেন্ট’ দলটি নিশ্চয়ই ভারতের মাটিতেও দর্শকের অন্তর জয় করবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস।
‘পাঁজরে চন্দ্রবাণ’ নাটকের রচয়িতা শাহমান মৈশান ও নির্দেশক ইসরাফিল শাহীনকে আমার অগ্রিম অভিনন্দন। আশা করি ‘পাঁজরে চন্দ্রবাণ’ নাটকটি নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স ডিপার্টমেন্ট’ টিম এবার ভারত জয় করবে। ‘পাঁজরে চন্দ্রবাণ’ নাটকের সাথে জড়িত সবাইকে আমার শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। জয়তু ‘পাঁজরে চন্দ্রবাণ’। জয়তু বাংলাদেশের থিয়েটার।

৯ মার্চ ২০১৮

রেজা ঘটক : কথাসাহিত্যিক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন
Share Now শেয়ার করুন