শশী থারুর | ছোটগল্প | পাঁচ ডলারের হাসি | তর্জমা : আসিফ সৈকত | উৎসব সংখ্যা ১৪২৯

0
86

তৃতীয় বিশ্বের অনাথ শিশুদের নিয়ে স্বদেশী এনজিও (বেসরকারি সংস্থা) আর আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো মূলত কী ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে যায়, তাদের অন্তঃসারশূন্যতা, লোকদেখানো বিষয়আশয়-নির্ভর ভেতর থেকে দেখার অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা গল্প এটি। এই গল্পের পাঠে নিঃসন্দেহে নতুন একটা জগতকে দেখতে পাবেন পাঠক।

পাঠ করতে সময় লাগবে : ৫ মিনিট

“বাচ্চাটাকে আবার হাসতে দিন”, কালো অক্ষরে লেখা, দোমড়ানো-মোচড়ানো, ঝকঝকে, গ্লসি সাপ্তাহিক খবরের কাগজের একটা পাতায় লেখা। “এর জন্য আপনাকে মাসে শুধু ৫ ডলার খরচ করতে হবে।”

জোসেফ একদৃষ্টিতে দুইটা ক্যাপশনের মধ্যে স্যান্ডউইচ হওয়া ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইলো। হাজারবার দেখেছে সে ছবিটা, ছিন্নভিন্ন কাপড়, কালো, তীব্র, করুণা-ভরা একটা চোখ, নোংরা ছোট আঙুলগুলো দিয়ে অদ্ভুতভাবে বন্ধ করা মুখটা। সারা পৃথিবী জুড়ে আলোড়ন তোলা একটা ছবি, ছবিটা সেরা ছবি হিসাবে সামনে আনা হয়েছে, ‘হেল্প’ সংগঠনটির ইতিহাসে, এই তো চার বছর আগে। তার নিজের ছবি।

অন্য বারের মতোই, সে আবার একটু দূর থেকে অনুসন্ধিৎসু মন নিয়ে ফটোগ্রাফটার দিকে তাকালো। গত চার বছর ধরে সেটা তার কাছে আছে। সে এটাকে শুধু তার নিজের একটা ফটোগ্রাফ হিসাবে দেখে না, তার অতীতের একটা রেকর্ড, তার আরো ছোটকালের একটা স্মারক হিসাবে দেখে। এটা আসলে তার জন্যে একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়; কিন্তু সবার মধ্যে ছড়িয়ে গিয়েছিলো, বিজ্ঞাপনের অংশ হিসাবে, একটা পোস্টার, একটা ক্যাম্পেইন, আর এখন একটা প্রায় ফুরিয়ে যাওয়া ম্যাগাজিনের ক্লিপিংস হয়ে, তার হাতে রয়েছে।

যে ছোট ছেলেটা একদৃষ্টিতে সেই পত্রিকার ফটোর দিকে তাকিয়ে, সে নিজে নয়, সে ‘যোসেফ কুমারন’ নয়; সে শুধুই একটা প্রচারের অংশ, একটা শ্লোগানের দ্বারা সংজ্ঞায়িত, একটা উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করছে, এবং সত্যটা হলো, সে যে যোসেফ কুমারন ছিলো তাতে কিছু যায় আসে না। কখনোই ছিলো না। যোসেফ আবার ছবিটার দিকে তাকালো, বিমানের ফ্লাইটের মধ্যেই আরো পাঁচবার সে এটা দেখেছে, যেন সে নিজেকে বার বার আশ্বস্ত করতে চাচ্ছে যে সে হয়তো জানতো যে সে এতো বড়ো, ঠান্ডা, গমগমে আওয়াজ করা দৈত্যের মতো জিনিসটা তাকে যন্ত্রণা দিতে দিতে একটা অপরিচিত দেশে নিয়ে যাচ্ছে, যেই দেশটাকে সে শুধু স্ট্যাম্পবুকের ডাকটিকিটেই দেখেছে।

এটাই আসলে সেই কথা, যেটা এই ফটোগ্রাফের ছেলেটার কাছ থেকে সে শুনতে চায়। তোমার জায়গাটা ওখানেই, বালক, এটাই তুমি এবং আর যে কারণে তুমি একটা অপরিচিত জিনিসে উঠে বসেছো, যেটাকে উড়োজাহাজ বলে এবং যে-কারণে তোমার পা দুটো মাটিকে স্পর্শ করে না কিন্তু তোমার আঙুল ঠান্ডা করে দেয় এবং তোমার কোমরে একটা বেল্ট পড়তে হয়, যে কারণে তোমার সামনের অদ্ভুত খাবারটা খাওয়ার জন্য তুমি বাধাপ্রাপ্ত হও, তুমি সহজে সামনে শান্তি মতো ঝুকতেও পারো না, যে-খাবারটাকে তারা আশা করে, তুমি প্লাস্টিকের কাটাচামচ আর ছুরি দিয়ে খাবে, যার পুরোটাই শক্ত পলিথিন দিয়ে মোড়ানো, আর যখন তুমি শেষ পর্যন্ত ভয় কাটিয়ে উঠতে পারবে তখন ফিটফাট, দূরের এবং অসম্ভব লম্বাটে মহিলাকে সাহায্যের জন্য অনুরোধ করবে, তোমাকে কম্বল এবং দুইটা বালিশ এবং সাথে কিছু সত্যিকারের খাবার দেবার জন্য বলবে, যে খাবারটা কাটাচামচের কামড় না বসিয়ে খাওয়া যায় না।
++++
সে ছবিটাকে আবার ভাঁজ করে রাখলো এবং তার আটোসাটো ব্লেজারের ছোট্ট পকেটে জোর করে ঢুকালো, যেটা তাকে ‘হেল্প’ সংগঠন থেকে সিস্টার সেলিন এয়ারপোর্টে যাবার জন্য দিয়েছিলেন। একগাদা পুরনো কাপড় দিয়ে তাকে পাঠানো হয়েছিলো, দুর্যোগের সময় রিলিফ সংগ্রহের জন্য, সে বুঝতে পেরেছে, এবং যদিও তার ব্লেজারটা একটু ছোটই ছিলো, আসলে এটা তাকে দেখতে একটু স্মার্টও বটে, আমেরিকা ঘুরতে যাবার জন্য দরকার ছিলো।
“জোসেফ, সবসময় স্মার্টলি থাকবে,” সিস্টার সেলিন বললেন।
“তারা জানুক তুমি গরীব কিন্তু তুমি স্মার্টও, কারণ আমরা জানি, তোমাকে কীভাবে উপরে তুলে আনতে হবে। সব জায়গাতে পরিচয় দিতে হবে।“

যোসেফ সিটে বসে আছে, তার পা দুটো প্লেনের সিট থেকে ঝুলে আছে এবং ট্রেতে তার না-খাওয়া অনেকগুলো খাবারের দিকে তাকালো সে।
যখন সে খাবারগুলো নিয়ে ভাবছিলো, তার ছবিটা তোলার দিনের কথা মনে পড়লো। তার বয়স তখন সাত ছিলো। ওই দিনই প্রথম সে জানতে পারলো তার বয়স সাত।
“বাচ্চাটার বয়স কতো? ওই যে ছেঁড়া সাদা শার্ট পড়া বাচ্চাটা?”
“সাত বছর হবে সম্ভবত, ঠিক কেউ-ই জানে না। অনেক ছোট বাচ্চা থাকতে এসেছিলো এখানে। আসলে সে কখন জন্মেছে, এটাও আমরা ঠিক জানি না।”
“প্রায় সাত, নাহ্, আরো ছোট মনে হচ্ছে।” ক্লিক উরররর। ক্যমেরা চালানোর শব্দে বোঝা যাচ্ছিলো একটার পর একটা ছবি উঠছে যোসেফের, “হয়তো যেমন আমি খুঁজছি।… খাবারের ওখান থেকে ওকে সরান, সিস্টার, দয়া করে সরাবেন কি?… আমাদের দরকার ক্ষুধার্ত বাচ্চা, খাচ্ছে-দাচ্ছে এই রকম না।”
হঠাৎ করে একটা বড়ো, সাদা হাত, টেবিলের উপর প্রসারিত বাদামি ছোট ছোট হাতগুলোর মধ্যে ঢুকে গেলো, জোসেফকে টেনে নিয়ে গেলো।
“এদিকে আসো, জোসেফ, এই ভদ্রলোক তোমার সাথে দেখা করতে চায়।”
“কিন্তু আমি তো খেতে চাই, সিস্টার।” মরিয়াভাবে অনুরোধের গলায় সে বললো। বেশি দেরি করলে কি ঘটনা ঘটবে সে জানে। তার জন্য কোনো খাবারই আর অবশিষ্ট থাকবে না। এইরকম আগেও হয়েছিলো। আর আজকে তো তার সব থেকে প্রিয় দিন, কাঞ্জি জাউয়ের সাথে মচমচে পাপড়। পাকঘরের পেছন দরজা দিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে সে বাবুর্চিকে দেখেছে কাঞ্জি জাউয়ের মধ্যে পাপড় দিয়ে ভাজি করতে, সেই জন্য টেবিলে সবার আগে পৌঁছানোর চেষ্টা করছিলো যোসেফ, যাতে তার ভাগটা সে ঠিকমতো পায়। বড়ো ছেলেদের সাথে মারামারিও করতে হয়েছিলো তাকে, সেখানে থাকতে।
কিন্তু যতই প্রতিরোধ করার পরিকল্পনা আর চেষ্টা গড়ে তুলুক না কেনো, সিস্টার সেলিন সেটাকে আমলে না নিয়ে আরো দুর্বল করে দিচ্ছিলো তাকে।

“প্লিজ, সিস্টার, প্লিজ।”
“পরে, চাইল্ড। দুষ্টামি করো না।” জোসেফ জায়গা থেকে না সরার জন্য, পা দিয়ে তীব্র প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করতে থাকলো আর সিস্টার তার বাম হাত দিয়ে সুন্দর করে তাকে টেনে নিয়ে যেতে থাকলো।
“আর তুমি যদি ঠিকমতো না হাঁটো আমি তোমাকে বেত মারবো।” জোসেফ তাড়াতাড়ি ঠিকঠাক দাঁড়িয়ে গেলো; বেত কি জিনিস তা সে ভালো করেই জানে এবং সেটা সে আর চায় না।

মহিলা স্টুয়ার্ড কি তাকে বেত দিয়ে মারবে, যদি সে কাটাচামচ আর ছুরি চায়? আরে নাহ্, অবশ্যই মহিলাটা তা করবে না, সে জানতো সেটা। সে জানতো, তার এই ভয়গুলো একদমই অর্থহীন, খামোখা। তার হঠাৎ খিদে পেয়ে গেলো, কিন্তু কিভাবে তাদেরকে ডাকবে সে বুঝতে পারছিল না। যোসেফের সিট থেকে কয়েক সারি সামনেই মহিলাটা একজন পুরুষ যাত্রীকে পানীয় দিচ্ছিলো।

“মিস!” সে আস্তে করে ডাকলো। তার গলাটা ফ্যাসফেসে শোনালো, যেন শুকনো কিছুর বাধা পাচ্ছে তার গলা। মহিলা তাকে শুনতে পায় নি; সে মনে মনে দোয়া করতে থাকলো যেন মহিলার সাথে তার চোখাচোখি হয়, তাহলে কথা বলা সহজ হবে আর সেজন্য সে তার চোখ দুটোকে এমন তীব্র ভীতিকরভাবে তার দিকে দিয়ে রেখেছিলো যে মহিলাটা সেসব লক্ষ করছে না, এই ব্যাপারটাই তার একদম বিশ্বাস হচ্ছিল না!
“মিস!” সে আবার ডাকলো, এবার হাত নাড়িয়ে। সে যে লোকটা ড্রিংকস সার্ভ করছিলো একটু আগে, তার মাথা রাখার জায়গাতে একটা পিন দিয়ে কিছু একটা সেট করছিলো, আর হায়, সে তখনো যোসেফের ডাক শোনে নি!

“মিস!” এইবার অনেক জোরে ডাকলো। যোসেফের মনে হলো এখুনি বুঝি প্লেনের সবাই ঘুরে তার দিকে তাকাবে, যেনো সে একটা খুবই বাজে কাজ করে ফেলেছে। অনেকেই হাসিমুখে তার দিকে তাকিয়েছে, কিন্তু বেশিরভাগ যাত্রীই এটা মেনে নেয় নি, ভ্রু কুচকে তার দিকে তাকালো এবং পাশের যাত্রীর কাছে তার ব্যাপারে নালিশ করেই দিয়েছে, এতেও কোনো সন্দেহ নাই। যোসেফের কালো থুতনি বিব্রতবোধে লাল হয়ে উঠলো।

স্টুয়ার্ড সোজা দাঁড়িয়ে গেলো, বিরক্তিতেই; এবং তার বিরক্তিটা চেপে গিয়ে, হাসিমুখে দ্রুত পায়ে যোসেফের দিকে এগিয়ে এলো।
“ইয়েস, ওয়াট ইট ইজ?”
“ক্যান-আই-হ্যাভ-আ-নাইফ-অ্যান্ড-ফর্ক-প্লিজ?” তাড়াহুড়া করে শব্দগুলো যোসেফের মুখ থেকে বের হলো, সিস্টার এঞ্জেলার ইংরেজি উচ্চারণের ক্লাসগুলো টেনশনের চোটে একদমই ভুলে গেলো, সে।

মেয়েটাকে মনেই হলো না সে হাঁটা থামাবে, এগিয়েই চললো।
“ওটা তোমার ট্রেতেই আছে – এখানে, পাশেই, দেখো ভালো করে? এই প্যাকেটেই।”
সে প্যকেটটা বের করলো, যোসেফের ন্যাপকিনের উপরে রেখে তাকে দেখালো এবং যোসেফ কিছু বলতে যাবে, তার আগেই খটখট করে সিটগুলোর মাঝখানের সরু পথ ধরে এগিয়ে গেলো।

“হোল্ড ইট দেয়ার, কিড।”
যোসেফ, সাত বছর বয়স, যে পাপড় (পাপাডাম) খেতে ভালোবাসে, প্রথমবারের মতো তার জীবনে আমেরিকান গালাগালির মুখোমুখি হলো, লম্বা-চওড়া, সাদা চামড়ার লোক, গোঁফও আছে, সাথে একটা ক্যমেরা। ছোট্ট জোসেফের কাছে, সবকিছুই বড়ো বড়ো লাগলো এই লোকটার ব্যাপারে : তার শরীর, গোঁফ, ক্যামেরা।
একটা বড়ো হাত তাকে পেছনের দিকে একটু ঠেলে দিলো এবং একটা গম্ভীর স্বর ভেসে আসলো : “কিন্তু বাচ্চাটাতো তার বয়সের তুলনায় ছোট দেখতে।”
“শৈশবের অপুষ্টি। মা জন্মের সময়ই মরে গেছে। এর বাবা তাকে জঙ্গলের মধ্যেই একা বড়ো করেছে। এই আদিবাসীরা আশ্চর্যজনকভাবেই কঠোর। ঈশ্বরই জানেন, কিভাবে এই ছেলেটা কোনো বড়ো ধরনের স্থায়ী ক্ষতি ছাড়া এতদিন টিকে ছিলো।”
“ঠিক আছে, তাহলে তার আসলে সত্যিকারের কোনো সমস্যা নাই, ঠিক? মানে বুঝাতে চাচ্ছি, তার মাথায় কোনো সমস্যা নাই, ব্রেইন ঠিকঠাক আছে, কিন্তু বাকি সব? আমাকে ঠিকঠাক নিশ্চিত হতে হবে, আমি আমেরিকার মানুষের কাছে এদের গরিবি বিক্রি করছি, প্রতিবন্ধী হলে হবে না, বুঝতে পারছেন তো কি বুঝাচ্ছি? মানসিক দিক দিয়ে তো সে নরমাল, ঠিকঠাক, নাকি?
“হ্যাঁ অবশ্যই ঠিক আছে, এখন একটু মনমরা হয়ে আছে।” সিস্টার সেলিন, শান্তভাবে অল্প করে বললো।
ক্লিক, উরররর। ক্যামেরার শব্দ হলো। ছবি উঠতে লাগলো। আলো যোসেফের চোখ ঝলসিয়ে দিলো। তার চোখ বড়ো বড়ো হয়ে গেলো।
“চলো, তাকে খোলা জায়গায় ন্যাচারাল লাইটে নিয়ে যাই, যদি সে কিছু মনে না করে। আমি সূর্যের আলোটা ব্যবহার করতে চাই – আমার এর ব্যাপারে পুরোপুরি নিশ্চিত নই।“
“হা, অবশ্যই, মিস্টার ক্লিভার। যোসেফ, আসো এদিকে।”,নানের হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে চেষ্টা করলো সে।
“কিন্তু সিস্টার, আমি খেতে যেতে চাই।”
“পরে হবে। এখন যদি তুমি কথা না শোন তাহলে তোমার জন্য দুপুরের কোনো খাবারই শেষ পর্যন্ত থাকবে না।”
ক্ষোভ আর বিরক্তের সাথে, যোসেফ তাদের সাথে উঠানের দিকে গেলো। মনমরা হয়ে সে দাঁড়িয়ে থাকলো, ঘৃণাভরে বিশালদেহী লোকটার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো।
ক্লিক, উইরররর, ক্লিক।
“তাকে একটু এইদিকে সরান, আরে সিস্টার, সরান একটু?”
নিজেকে শান্ত করার জন্য সে তার আঙুগুলো মুখে দিচ্ছিল, যেন নিজের আত্নরক্ষার জন্য, স্বাদের অনুভূতিকে নিয়ন্ত্রণ করছিল যোসেফ।
ফটোগ্রাফার আবার ক্লিক করলো। ছবি তুলতে থাকলো একের পর এক।

যোসেফ গভীর হতাশার সাথে মেয়ে স্টুয়ার্ডকে ফিরে যেতে দেখলো। কেন সে তাকে বুঝিয়ে বলতে পারলো না যে, তার এখানে একটা ছুরি আর কাটাচামচ আছে, সেটা সে জানে, কিন্তু কিভাবে সেগুলো খুলে বের করতে হবে সেটা সে জানে না? কেন সে পরিষ্কারভাবে বলতে পারলো না তার আসলে কোন সাহায্যটা লাগবে? সে কেন সবকিছুতে এতো ভয় পাচ্ছে? এতো মানসিক বাধা বোধ করে কেন?
সে আরো শক্তভাবে তার সিটে বসলো এবং নার্ভাসলি চারিদিকে তাকালো। তার প্রতিবেশী জানালার দিকে তাকিয়ে ছিলো, তার দিকে তাকিয়ে ছোট একটা হাসি দিলো, যান্ত্রিক হাসি। যোসেফ তার কাছে সাহায্য চাইতে পারে না, চাওয়া ঠিক হবে না। নাকি চাইতে পারে?
লোকটা জানালা থেকে চোখ সরিয়ে তার ম্যাগাজিনের উপর চোখ রাখলো, ডিনারের পর থেকে যেটা পড়া শুরু করেছিলো। যোসেফ লোকটাকে নিয়া চিন্তাভাবনা করতে শুরু করে দিলো।

সেই দিন, ফটোগ্রাফির পরে, আর একটাও পাপড় তার জন্য কেউ রাখেনি। শুধু ঠান্ডা কাঞ্জি আর পাপড়গুলো সবাই খেয়ে শেষ করে ফেলেছিলো।
“দেখেছো, আমি তোমাকে বলেছিলাম পরে খাওয়া যাবে,” নান বললো।
“এখন এই যে দেখো, তোমার দুপুরের খাবার।”

কিন্তু আমি পাপড় খেতে চেয়েছিলাম, রাগে আর দুঃখে সে চিৎকার করতে চাইলো। পাপড়ের কাছ থেকে নিয়ে যাওয়ার কি দরকারটা ছিলো তোমার? কি এমন ওই ক্যমেরাওয়ালা লোকটা যে তুমি আমাকে পাপড় খেতে দিলে না, যেটা মজা করে খাওয়ার জন্য আমি একমাস ধরে অপেক্ষা করছিলাম?
কিন্তু সে কিছুই বললো না। বলতে পারেনি, চেয়েছিলো যদিও। গলার মধ্যে যেন কথাগুলো একটা বড় কিছু হয়ে আটকে আছে যা তার শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ করে দিচ্ছে। সে শব্দ করে খাবারের টিনের প্লেটসহ জাউ মাটিতে ফেলে দিলো, তার চোখ থেকে অঝোর ধারায় পানি ঝরতে লাগলো।
“হায় ঈশ্বর, কি হয়েছে তোমার আজকে? ঠিক আছে, আজকে তোমার দুপুরের খাবার বন্ধ, যোসেফ। এই সব ময়লা তুমি পরিষ্কার করবে এবং তারপর আমার অফিসে চলে আসবে যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব, যাতে তোমাকে আমি যথেষ্ট শাস্তি দিতে পারি, তোমার অকৃতজ্ঞতার জন্য। অনেক অনেক ছোট বাচ্চা আছে তোমার মতো, যারা তোমার মতো এতো ভাগ্যবান না, যোসেফ কুমারান। এবং এটা তুমি কখনোই ভুলে যাবে না। “তার হতাশাকে মনে করে, যোসেফ জানতো সে এই ঘটনা কখনো ভুলবে না। এর পরে সেটাকে মনে রাখার জন্য ছয়টা বেতের বাড়ি তাকে খেতে হলো।

পাশের সিটের প্রতিবেশীকে প্যকেটটা খুলে দিতে বলা কি ঠিক হবে? ম্যাগাজিনের মধ্যে একেবারে ডুবে আছে লোকটা। কাজটা করা ভুল হবে হয়তো, খুব অস্বস্তিকরও হবে। যোসেফ কথা বলার চেষ্টা করলো, নাহ্, শব্দগুলো আর বের হলো না মুখ থেকে। মুখেই থেকে গেলো। সেখানেই ঘুরপাক খেতে লাগলো।
সিটগুলোর মাঝখানের সরু পথটার মাথায়, আরেকজন মেয়ে স্টুয়ার্ড চা আর কফি নিয়ে আসতে শুরু করেছে। যাত্রীরা খাওয়া-দাওয়া প্রায় শেষ করে ফেলেছেন। একটু পরেই তার খাবারও তারা নিয়ে চলে যাবে, আর সে এখনো খাওয়া শুরুই করেনি। একধরনের অচেনা আতংক তীব্রভাবে তাকে ঘিরে ধরেছে। অস্থির করে তুলছে তাকে।

পলিথিনের প্যকেটটা নিয়ে রীতিমতো যুদ্ধ শুরু করে দিলো যোসেফ। ছেঁড়ার চেষ্টা করলো, দাঁত দিয়ে কাটলো, টান দিয়ে ছেঁড়ার চেষ্টা করলো। কিন্তু লাভ হলো না। প্যাকেটের ভেতরের সরঞ্জাম এলোমেলো হয়ে গেলো; একসময় ট্রের উপর, তার কাপ দিয়ে বাড়ি মারলো, আরেকটু হলে কাপটা ভেঙেই যেতো। যোসেফ আরো উত্তেজিত হয়ে কাজটা করার চেষ্টা করলো, চেষ্টার ব্যার্থতায়, রাগ তার চোখেমুখে, উত্তেজনায় প্রায় দাঁড়িয়েই গেলো, হতাশার চোটে বিরক্তিসূচক শব্দও করলো।
“এদিকে,” পাশের সিটের প্রতিবেশী মোটা গলায় বললো।
“লেট মি হেল্প ইউ।”
যোসেফ কৃতজ্ঞতার সাথে তার দিকে ঘুরলো। তার হতাশার প্রকাশটা তাহলে শেষ পর্যন্ত কাজে এসেছে, লোকজন খেয়াল করেছে, সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসছে। যাক, কাজে তো লাগলো ব্যাপারটা।
“ধন্যবাদ, তোমাকে,” সে এটাই বলতে পারলো। “কিভাবে খুলতে হবে আমি জানতাম না।”
“এটা খুবই সোজা,” তার প্রতিবেশী বললেন।

হেল্প সেন্টারে ফটোগ্রাফের প্রথম কপিগুলো, ছবি তোলার কয়েক সপ্তাহ পরেই চলে আসলো। যোসেফ ঘটনাটা প্রায় ভুলেই গিয়েছিলো, বেতের মার খাওয়ার কথাও মনে ছিলো না তার, যদিও পাপড় ছাড়া জাউ খাওয়ার কষ্টটা সে ভুলতে পারেনি। নানদের মধ্যে একজন উত্তেজনায় চিৎকার করে সিস্টার ইভাকে ডাকলো।
“যোসেফ, দেখো – এই সেই ছবিগুলো, ওই দিন যে ভালো লোকটা তুলে দিয়েছিলো, খুব দুষ্টামি করছিলে সেদিন তুমি,” সিস্টার সেলিন তাকে ছবিতে দেখিয়ে বললো, “এই যে এটা তুমি।”
প্রচণ্ড অনাগ্রহ নিয়ে সাদাকালো ছবিগুলোর দিকে তাকালো যোসেফ। এই ছবিগুলো দেখতে না পারলেই ভালো হতো, সেদিনের সেই বিকৃত নিষ্ঠুরতার কথা তার মনে করার কোনো ইচ্ছা ছিলো না। নিরাসক্তভাবে সে ছবিটার দিকে তাকালো, কিছু বললো না এবং যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব চোখ সরিয়ে নিলো।
“সারা পৃথিবীতে আলোড়ন তোলার জন্য এই ছবিটা ব্যবহার করা হবে,” সিস্টার বললেন। “সারা পৃথিবীর সব গুরুত্বপূর্ণ ম্যাগাজিনে এই ছবি ছাপানো হবে। আরো বেশি সাহায্যের টাকা তুলতে এই ছবি ব্যবহৃত হবে, যাতে অন্য বাচ্চাদের কাজেও টাকাটা লাগানো যায়। তোমার খুশি লাগছে না এজন্য, যোসেফ?”
কর্তব্যবোধের শিক্ষাটা সে পেয়ে গেছে। “জ্বি, সিস্টার,” সে বললো।

যোসেফের পাশের সিটের লোকটা পলিথিন সুন্দর করে ছিঁড়ে, কাটাচামচ আর ছুরিটা বের করলো এবং হাসিমুখে যোসেফের হাতে দিলো।
“দেখেছো, কতো সোজা।”
“আপনাকে ধন্যবাদ।” যোসেফ, জিনিসগুলো সাদরে গ্রহণ করে কৃতজ্ঞতা জানালো, লজ্জাও পাচ্ছিলো, কানগুলো সেজন্য একটু লাল হয়ে গেলো।
তাহলে বোঝা গেলো চেষ্টা করারও কোনো দরকার ছিলো না, প্যাকেটটা ছেঁড়ারও কোনো প্রয়োজন আসলে ছিলো না।

প্রথমে “মেইক দিস চাইল্ড স্মাইল এগেইন” (যার আক্ষরিক অর্থ হচ্ছে এই বাচ্চাটাকে আবার হাসতে দিন) পোস্টারটা “হেল্প” অফিসে সিস্টার ইভার টেবিলের পেছনে লাগিয়ে দেয়া হলো, যাতে কেউ এলে প্রথমেই এই ছবিটা দেখে একটা ধাক্কা খায় এবং সিস্টারকে খুঁজতে শুরু করে। কোনো ঝামেলা বা আয়োজন ছাড়াই ছবিটা লাগানো হলো আর যোসেফ এটা জানতো, কারণ সিস্টার ইভার দরজাটা খোলা থাকতো, ক্লাসের বারান্দা দিয়ে যাবার সময় তারা দেখতে পেত সেটা। অন্য আরেকটা ছেলে আগে সবাইকে ডেকে এটা দেখায়।
কিছুদিনের মধ্যেই এটা একটা কৌতুকের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়, যোসেফের বন্ধুরা দেখা হলেই তাকে বলে – “হেসে দেখাও, যোসেফ, হাসো তো দেখি।” যোসেফ যদি গোমড়া মুখে বসে থাকে বা রাগ করে, তখন কেউ বলে ওঠে, “কারো কাছে কি ৫ ডলার হবে?” মাঝে মাঝে সে আরো রেগে যায়, কিন্তু আবার কখনো কখনো সবার উস্কানিতে হেসে দিতো। সবাই এটাকে বলতো ৫ ডলারের হাসি।

খাবার খুবই বাজে ছিলো। তার স্বাদের অভিজ্ঞতার সাথে একেবারেই মেলে না। যাই হোক, ভালো লাগেনি তার। যদিও বাটির মধ্যে ফ্রুট সালাদ ছিলো, কাটা আপেলসহ, সেটা খেয়েছিলো, কিছুটা তার সিটে আর মেঝেতে পড়ে গিয়েছিলো। নিজের সিটে বেল্ট বাঁধা অবস্থায় বসে, যোসেফ বুঝতে পারছিলো না যে টুকরাগুলো সে খেয়েছে তার জন্য খুশি হবে নাকি যেগুলো মাটিতে পড়ে গিয়েছিলো তার জন্য দুঃখিত হবে। চারিদিকে দেখে নিলো সে, কেউ তাকে লক্ষ করছে কিনা। নাহ্, কেউ তাকে দেখছে না। সে মাটি থেকে আপেলের টুকরাগুলো নেবার জন্য ঝুকলো, কিন্তু ট্রেটার জন্য পারলো না। আরো বিরক্ত লাগলো। সব মিলিয়ে, তার খুবই হতাশ বোধ হলো।
বিমানবালা তার ট্রে নিতে নিতে যোসেফকে জিজ্ঞাসা করলো যে সে চা খেতে চায় কিনা?
যোসেফ বললো, “হ্যাঁ। আসলে সে খেতে চেয়েছিলো কফি, কিন্ত সে ভয় পাচ্ছিলো যদি তাকে আবার আগের মতো “না” বলে দেয়, তাহলে তার চা খাওয়া তো হবেই না, কফিও হাতছাড়া হয়ে যাবে। কেন তারা তাকে প্রথমেই কফি খাওয়ার কথা বললো না? বাদামি তরলটা যখন তার কাপে পড়তে থাকলো, সেও ভাবতে থাকলো এইকথা একইসাথে। তার সাথে খুব অন্যায় করা হচ্ছে। সবাই তার বিপক্ষে কাজ করছে। গভীর ষড়যন্ত্র হচ্ছে এখানে।

অবশ্যই আশ্চর্য্যজনকভাবে সে-ই পৃথিবীর প্রথম দত্তক নেয়া বাচ্চা নয়। অন্য যারা ক্যম্পেইনটাতে সাড়া দিয়েছিলো, তারাও পাঁচ ডলার করে পাঠিয়েছিলো প্রথম মাসেই, এবং আগামী এক-দুই বছর বা বাকি জীবন ধরে তারা এভাবেই বাচ্চাদের জন্য ‘হেল্প’-এর মাধ্যমে টাকা দিয়ে যাবে, তাদেরকে রক্ষার জন্য। কিন্তু তিনজোড়া দম্পতি শুধু ফটোগ্রাফের বাচ্চাটার জন্য টাকা পাঠাতে চাইলো। তারা তার দুঃখ ভরা, ছোট মুখটাকে দেখেছিলো এবং তারা তার মুখে আবার হাসি ফোটাতে চেয়েছিলো। অন্য কারো জন্য নয়। তাদের পাঁচ ডলার স্রেফ যোসেফ কুমারনের ছোট আঙুলগুলোর জন্য দিল, যে আঙুলগুলো তার ক্ষুধার্ত ছোট মুখ থেকে বের হয়ে আসে। তারা শুধু যোসেফকে দত্তক নেবার জন্য চাপ দিতে থাকে। নানরা সেই চিঠি দেখে সবাই দীর্ঘশ্বাস ফেলতে থাকে।
“ওহ্! কিছু লোকজন কী বিরক্তিকর,” সিস্টার ইভা বলতে থাকেন। “আমি প্রায় সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি তাদের টাকাটা ফেরত দিয়ে দেবো। আমরা টাকাটা দিয়ে কি করবো, কাকে দেবো, তারা এভাবে বলার কে?”
মুখে যাই বলুক, সিস্টার টাকাটা রেখে দিয়েছিলো এবং ওই তিনজোড়া দম্পতিকেই আশ্বাস দিয়েছিলো যোসেফকে দত্তক দেয়ার ব্যপারটা বিবেচনা করে দেখবে বলে। যোসেফ কুমারনের এই পাঁচ ডলারের হাসি আসলে মাসে তাদের থেকে ১৫ ডলার তো নিশ্চিত করছিলো ‘হেল্প’-এর জন্য। সেটাই আসল কথা, তাদের সবার কাছে, তাদের সবার জন্যই।
এ কারণেই তখন থেকে প্রতিমাসে যোসেফকে ধীরস্থির হয়ে বসতে হয় এবং সুন্দর, টানাটানা হাতের লেখাতে, তার সম্ভাব্য দত্তক পিতামাতাদেরকে চিঠি লিখতে হয়, যারা থাকেন হাজার মাইল দূরে আর যাদেরকে বারবার বলতে হয় সে তাদের কাছে কতটা কৃতজ্ঞ আর সে কতো ভালো ছেলে।
“আজকে আমাদের ক্যাটেকিজম হয়েছে (ক্রিশ্চান ধর্মীয় শিক্ষা) এবং আজকে আমি শিখলাম, কিভাবে লটের বউ একটা কলাগাছে রুপান্তরিত হয়ে গেছে।” এক দম্পতিকে লিখলো সে। (উনাদের ওই জায়গাতে লবণ খুব দামি দ্রব্য ছিলো, আর নানরা চাইতো না যে বাচ্চারা বাইবেল থেকে কোনো ভুল শিক্ষা পাক। তাই বাইবেল যে ঠিকঠাক পড়ছে, সেটা চিঠিতে লেখাটা জরুরি ছিলো)। তারপর সে একই চিঠি থেকে আরো দুইটা কপি করতো, যত্ন সহকারে, অন্য আরো দুই দত্তক-আগ্রহী দম্পতির কাছে পাঠাতো। এরপর সে যখন বড় হয়ে গেলো, সিস্টার সেলিন আর তাকে বলে দিতো না যে কি লিখতে হবে, যোসেফ নিজের মতো লিখে দিতো এবং চিঠি পাঠানোর আগে সিস্টার একবার দেখে দিতো।
“সিস্টার এঞ্জেলা আমাকে আমেরিকা সম্পর্কে বলেছেন,” সে একবার লিখলো। “এটা কি সত্যি যে সেখানে সবাই ধনী এবং সারাক্ষণই প্রচুর খাবার চারিদিকে পড়ে থাকে?” সিস্টার সেলিন ব্যাপারটা পছন্দ করলেন না, চিঠিটা পুরা বাতিল করে দিলেন, পরে দেখা গেলো কঠোরভাবে তিনি সিস্টার এঞ্জেলাকে বকা দিলেন।

স্টুয়ার্ড সরু পথ দিয়ে হেডফোন বিক্রি করার জন্য এগিয়ে এলো। ফ্লাইট শুরু হবার পর থেকেই যোসেফ তাদেরকে দেখতে থাকলো, যদিও সে জানতো না যে হেডফোন আসলে কি জিনিস, একটু পরেই আবিষ্কার করলো যে এটা কিনতে টাকা লাগে এবং মানুষ তাদের কানে এটাকে গুঁজে রাখে। তার হেডফোন লাগবে কিনা যখন জানতে চাইলো তখন সে জোরে জোরে মাথা ডানে-বামে নাড়তে থাকলো। তার উদ্বিগ্ন চোখজোড়া তার প্রতিবেশীকে দেখছিলো, সে-ও প্রথমে সেটাকে বাতিল করে দিল, পরে সম্মতিসূচক দৃষ্টি দিয়ে পকেট থেকে কতকগুলো সবুজ কাগজের নোট আর রুপালি মুদ্রা বের করে দিলো, আর তার বিনিময়ে পলিথিনের প্যাকেটটা তাকে দিয়ে দেয়া হলো। দূর থেকে যেরকম লাগছিলো, কাছে এসে আরো অদ্ভূত লাগলো হেডফোন নামের যন্ত্রটা।
প্লেনের জানালার পর্দাটা টেনে দেয়া হলো; সামনে থেকে একটা টিভি স্ক্রিন নামিয়ে সেখানে হেডফোনটা লাগানো হলো; সামনে ছবির ইমেজ ভাস্বর হয়ে উঠলো। যোসেফ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো, হেডফোনটা হঠাৎ বদেলে গেল, মোড়ানো যায় আবার খোলাও যায়। লোকটা হেডসেটটা তার কানে লাগালো, অবশ্যই তিনি কিছু একটা শুনছেন, যেটা যোসেফ শুনতে পাচ্ছে না। সিনেমার টাইটেলগুলো স্ক্রিনে আসতে থাকলো। একের পর এক।
যোসেফও খুব করে চাচ্ছিলো সিনেমাটা দেখতে।

তার পালক বাবা-মায়েদের কাছ থেকে যোসেফ নিয়মিত চিঠির উত্তর পেতো। আগে প্রতি মাসেই একটা করে নিয়মিত চিঠির উত্তর আসতো, কিন্তু পরে মনে হলো আগ্রহটা একটু কমে গেছে; মাঝে মাঝে তারা উত্তর দিতো। এক দম্পতিকে খুব ভালো মনে হয়েছিলো তার, তারা সবসময় বেশি করে ক্ষমা চাইতো, দেরি করে চিঠির উত্তর দেবার জন্য, এবং তারা তার স্কুল সম্পর্কে, তার সম্পর্কে, তার স্কুলের কাজ সম্পর্কে, তার খেলা সম্পর্কে অনেক কিছু জিজ্ঞাসা করতো। বড়োদিনের সময় তারা তাকে ছোট ছোট উপহার পাঠাতো, কিন্তু সিস্টার সেলিন তাকে সেগুলো খুলতে দিলেও অন্য বাচ্চাদের সাথে সেইগুলো শেয়ার করতে হতো। রঙিন নোটপেপার, মহিলার হাতের লেখা, যেটা পড়াও অনেক সহজ ছিল, সাথে লম্বা সময় ধরে তার সুগন্ধি প্রভাবটা নোটপেপারের পাতায় পাতায় থেকে যেতো। ঘন ঘন সে সেটাকে তার নাকের কাছে ধরে রাখতো, নাকের উপর চেপে রাখতো, আমেরিকার গন্ধ নিতে থাকতো।
একদিন অনেকগুলো চিঠির পর, সে একটু কঠোর হয়ে লিখলো, ওই আমেরিকান দম্পতির কাছে,
“খুব গরম এখন এখানে, বছরের এই সময়টা।” সিস্টার সেলিনের অনুমোদিত ভার্সনের চিঠিটা লিখলো সে, “আমার মনে হয় আমেরিকা তুলনামূলকভাবে ঠান্ডাই।”
কিন্তু যখন ফাইনাল ড্রাফটটা আরো পরিষ্কার করে লিখছিল, তখন সে যোগ করলো, “আমার মনে হয় আমি আমেরিকাকে আরো বেশি উপভোগ করতে পারবো।”
এই অতিরিক্ত কথাটা সে কাউকে না জানিয়েই যোগ করে দিয়েছে, তারপর খামে ভরে পাঠিয়ে দিয়েছে, আর উত্তরের অপেক্ষায় উত্তেজনায় দিন কাটিয়েছে।
যখন চিঠির উত্তর এসেছে তখন কোথাও এই রেফারেন্স নেই যে সে কি লিখেছিলো, তার উত্তরে কি বলেছে। কিন্তু যোসেফ হাল ছাড়লো না।
“আমি প্রায়ই ভাবি, আমেরিকাতে কি ওই রকম গাছগুলো আছে, যেগুলোর ছবি আমি আঁকি।” সে এর সমর্থনে একটা ছবি লাগিয়ে দিল, ক্রেয়ন স্কেচ এঁকে। এবং এর পরের চিঠিতে, “যদি আমি আমেরিকাতে আসি, তুমি কি মনে করো যে আমার সেটা ভালো লাগবে?”
সে এই লাইনটা লিখে এতো পছন্দ করলো যে, তিনটা চিঠির প্রত্যেকটাতেই এই লাইনটা জোর দিয়েই লিখলো এবং পাঠিয়ে দিলো।

শেষ পর্যন্ত ব্যপারটা কাজে আসলো। তার প্রিয় “বাবা-মায়েরা”, যারা তার জন্য বড়দিনের উপহার পাঠিয়েছিলো, তারা সিস্টারকে জানালো যে তারা যে ছোট ছেলেকে দত্তক নিতে চায় তাকে তারা দেখতে চায়। কিন্তু তারা ইন্ডিয়াতে আসার জন্য কোনো ফ্লাইট ধরতে পারে নাই, বিভিন্ন কারণে। তার পরিবর্তে কি ছোট যোসেফকে আমেরিকাতে পাঠানো সম্ভব? সিস্টার সেলিন সম্মতি দিলেই তারা যোসেফের জন্য টিকেট পাঠিয়ে দেবে। অবশ্যই, তারা এমন কিছু বলেনি যে সব সময়ের জন্য যোসেফকে তাদের সাথে রাখবে। অবশ্যই তার জায়গা হলো ইন্ডিয়া, তার নিজের মানুষদের মাঝে, এবং “হেল্প”-এর সবার সাথে। তারা তাকে আবার পাঠিয়ে দেবে, কিন্তু তারা তাকে শুধু একবার দেখতে চায়, সামনাসামনি।
সিস্টার সেলিন একটু ধাক্কা খেলো চিঠিটা দেখে। দত্তক বাবা-মায়েরা সাধারণত এরকম বাচ্চাদের জন্য সেরকম আগ্রহ না দেখিয়ে নিজেদের সুরক্ষার স্বার্থেই কিছু দিনের জন্য অন্যদের কাছে রেখে যথেষ্ট বড়ো হওয়ার পর প্রাথমিক কোনো কাজ বা ব্যবসা শিখিয়ে বাক্সপেটরা গুছিয়ে নিজে আয় করো বলে অন্য কোথাও পাঠিয়ে দেয়। এভাবেই যোসেফের বিদেশ ভ্রমণ, তাও আবার অল্প সময়ের জন্য, এই সুযোগ দেয়া। এটা আসলে খুবই অস্বাভাবিক একটা ব্যপার।

সিস্টার সেলিন চিঠিটা যোসেফকে দেখালো, জিজ্ঞাসা করলো, “তুমি কি কিছু করেছো এই নিয়ে, অন্য কিছু, বা এমন কিছু লিখেছো কি, যে ওখানে যেতে চাও?” সে উত্তেজিত হয়ে মাথা নেড়ে না করলো, সিস্টার শুধু শুনলেন, “ঠিক আছে, আমরা দেখছি ব্যপারটা।” এরপর তিনি আরেকটু অনুসন্ধানের জন্য সিস্টার ইভার কাছে গেলেন।

যোসেফ এর আগে শুধু একটা সিনেমা দেখেছিলো। বিহারের জঙ্গলে “হেল্প”-এর বিভিন্ন কার্যক্রমের ওপর সিনেমাটা, এতিম শিশুদের নিয়ে। ডকুমেন্টারি মুভি। মুভিটা একদিন রাতের খাবারের পর দেখানো হয়েছিলো, যিনি তৈরি করেছিলেন তিনি নিজে উপস্থিত ছিলেন সেখানে, যাতে নানরা দেখতে পারেন যে তারা যে-কাজগুলো করছেন সে সম্পর্কে বাইরের পৃথিবীতে আসলে কি বলা হচ্ছে, সবকিছু ঠিকঠাক আছে কিনা।

সিস্টার ইভা, তার উদারতার চেতনা থেকে, বাচ্চাদের স্বার্থে সিদ্ধান্ত নিলো যাতে তারাও মাটিতে বসে সিনেমাটা দেখে। বাচ্চাদের জন্য তারা কতো কি করছে সেটা বাচ্চারাও যাতে বুঝতে পারে, বাকি নানদেরকে উদ্দেশ্য করে সে এই কথাগুলো বললো। এভাবেই হয়তো তাদের মধ্যে কৃতজ্ঞতাবোধটাকে ঢুকে যাবে।
যোসেফ ডকুমেন্টারিটা অর্ধেক না পেরোতেই ঘুমিয়ে পড়েছিলো। ক্ষুধার্ত আদিবাসী শিশুদের এবং আন্তরিক-উষ্ণ হৃদয়ের নানদের দেখার ব্যাপারে তার তেমন কোনো আগ্রহ ছিলো না; সে তাদেরকে এমনিতেই প্রতিদিন দেখে।
সাদা-কালো ছবিগুলো, একঘেয়ে, ধারাবর্ণনাকারীর সুপারইম্পোজেড ভয়েস, তার মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছিলো; নানদের টিপ-টো নৃত্য তার মগজের ছিদ্র দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিলো, ছবিগুলো নেচে নেচে আসছিলো, আর তার চোখের সামনে এসে ঝাপসা হয়ে যাচ্ছিলো। দৃঢ় কিন্তু মৃদু হাতগুলো তাকে উচ্ছ্বসিত করে তুললো,
“ওঠো, ওঠো। ওঠো সবাই – ঘুমানোর সময় হয়েছে।”
পেছন থেকে সিস্টার ইভার তীক্ষ্ণ গলা পরিষ্কার রাতকে ভেদ করে তাদের কানে আসলো, “দেখো অবস্থা! এইরকম একটা ভালো সিনেমা দেখার সুযোগ দিলাম আর অর্ধেক স্রেফ ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিলো! এর পরে কেউ আমাকে আর কখনো সিনেমা দেখার কথা বলবে না। আমি একদম সত্যি সত্যি বলছি কথাটা!”

কিন্তু কি দারুণ একটা সিনেমা ছিলো। উজ্জ্বল, বর্ণিল রঙিন, সুন্দর, সাদা চামড়ার মেয়ে ছোট কাপড়ে, জোরে ছুটে যাওয়া গাড়ি, রেসিংকার, বিদেশী রাস্তাঘাট। আগে কখনোই এরকম কিছু দেখেনি সে। আর তাই সে আরো শুনতে চাইলো; গাড়ির ইঞ্জিনের গর্জন শুনতে চাইলো, নরম, তরুণীর ঝর্ণার মতো হাসি, চিৎকার, চেচামেচি আর বুলেটের শব্দ আর মানুষ আর শো শো শব্দ করে চলা এরোপ্লেনের আওয়াজ।
“স্যার।” যে স্টুয়ার্ড হেডফোনগুলো নিয়ে সরু পথটার একদম শেষ মাথায় ছিলো, যোসেফের পেছনে, যে নিজেও সিনেমা দেখছিলো, যোসেফকে বললো, “জ্বি। বলুন?”
“আমিও কি হেডফোন পেতে পারি?”
“অবশ্যই।”
স্টুয়ার্ড হঠাৎ পেছনে উধাও হয়ে গেলো এবং আবার চলে আসোলো পলিথিনের প্যাকেট নিয়ে। সে সেটা যোসেফকে দিলো। একটা দারুণ অনুভূতি নিয়ে যোসেফ সেটা নিতে গেলো, কোনো কিছু অর্জনের আনন্দ নিয়ে। সে হাত দিয়ে ঠান্ডা প্লাস্টিকটা ধরলো। প্রবল অনুভূতির সাথে, অবর্ণনীয় বোধের সাথে, উত্তেজলায় ঠান্ডা প্লাস্টিকটাকে ধরলো সে, যেন অনেক দিনের কাঙ্ক্ষিত কোনো বস্তু।
“দুই ডলার আর পঞ্চাশ সেন্ট, প্লিজ।”
“কিন্তু… কিন্তু… আমার কাছে ত কোনো টাকা নেই, “হতাশভাবে বললো যোসেফ।
তার চোখ অনুরোধের ভাষায় স্টুয়ার্ডেকে জানালো। “প্লিজ?”

বিমানের স্টুয়ার্ড মহিলাটা ‘কেনো-তুমি-আমার-সময়-নষ্ট-করছো-গাধার-বাচ্চা,’ এইরকম গরম একটা চোখে যোসেফের মুখের দিকে তাকালো।
“আমি দুঃখিত,” সে বললো, যোসেফের হাত থেকে সে প্যকেটটা কেড়ে নিলো। যোসেফের কানে এই শব্দগুলো ঝনঝন করে উঠলো, “আইএটিএ রেগুলেশন্স।”
এরপর সে চলে গেলো, যোসেফের থেকেও বড়ো কারো ডাকে সে চলে গেলো, মানবপ্রীতি থেকেও বেশি কিছু পেতে। যখন সে সেখান থেকে আবার উদয় হলো, সে তখন অন্য দিকের সরু পথটাতে ছিলো, যোসেফের কাছ থেকে অনেক দূরে।

সিস্টার ইভা সিদ্ধান্ত নেবার জন্য কিছুটা সময় নিলেন। এমন নয় যে তিনি নীতিগতভাবে এর বিপক্ষে ছিলেন, তিনি বললেন সিস্টার সেলিনকে, কিন্তু এটা একটা বিপজ্জনক উদাহরণ তৈরি করতে পারে।
অন্য বাচ্চারাও হয়তো যেতে চাইবে, আর কত জনেরই বা ধনী আমেরিকান বাবা-মা ভাগ্যে জোটে, যারা তাদের জন্য, আমেরিকাতে যাওয়ার টিকেট চিঠিতে পাঠিয়ে দেবে?
শেষ পর্যন্ত সে রাজি হলো, যোসেফও হাপ ছেড়ে বাঁচলো।
ইভাও ব্যক্তিগতভাবে ঠিক করলো, আমেরিকান দম্পতিকে একটা চিঠি লিখে জানাবে যাতে যোসেফকে কোনো বদ-অভ্যাসে বা অতি আদরে নষ্ট না করে।
আর যোসেফকে যে একমাসের মধ্যেই আবার ফিরে আসতে হবে, সেটাও বললো। আমেরিকার চালচলন সম্পর্কে আসক্ত আর আক্রান্ত হবার আগেই যোসেফ তার মতো দুর্ভাগা বন্ধুদের কাছে ফিরে আসবে, যদি না তারা তাকে সারাজীবনের জন্য আমেরিকাতে রেখে দিতে চায়। এটা হলে ভিন্নকথা, যদিও সেরকম কোনো আলামত ইভার চোখে পড়েনি এখন পর্যন্ত।

পাগলের মতো সবকিছু ঠিকঠাক করতে পরের কয়েক সপ্তাহ চলে গেলো। আমেরিকার টিকেট চলে এসেছে, একটা ফ্লাইট বুক করতে হবে, যোসেফের পাসপোর্ট করতে দিতে হবে, ভিসা পেতে হবে। তাকে একটা ছোট্ট স্যুটকেস দেয়া হলো জামা-কাপড় রাখার জন্য এবং যোসেফ গর্বে উচ্ছ্বসিত হয়ে গেলো নিজের জিনিসপত্রের মালিকানার আনন্দে। তারও নিজের জিনিসপত্র আছে, সেও আসলে “কেউ একজন” ছিলো। পাসপোর্টের সাথে একটা স্যুটকেস, একটা টিকেট, জাউয়ের গামলার পাশে, ভীড়ের মধ্যে বসে থাকা ছোট বাদামি কোনো মুখ নয় সে আর। সে হলো মাস্টার যোসেফ কুমারান এবং সে কোনো একটা জায়গাতে বেড়াতে যাচ্ছে।

শেষ পর্যন্ত, সিস্টারের দেয়া আটোসাটো ব্লেজার পরে সকালে যোসেফ বের হয়ে গেলো, তার পকেটভর্তি পত্রিকা-ম্যাগাজিনের ক্লিপিংস, চার বছর আগে সিস্টার সেলিন তাকে যখন প্রথম তার ছবির খবর দেখালো, তারপর থেকেই সে এই ছবিগুলো জমাতে শুরু করেছিলো, তার পাসপোর্টটা তার আমন্ত্রণকারী আমেরিকানের ঝকঝকে ছবির পাশেই ধরা ছিলো, যাতে লোকটা তাকে বিমানবন্দরে চিনতে পারে। যোসেফ বিমানে উঠে গেলো। সিস্টার সেলিন তাকে সেখানে বিদায় জানাতে এসেছিলেন; কুয়াশায় আচ্ছন্ন কাচের ভেতর দিয়ে সিস্টার তার দিকে একটা হাসি দিলো। সিস্টার যখন তাকে ডিপারচার গেটে জড়িয়ে ধরেছিলো, যোসেফ তার গালের সিক্ত ভেজা জায়গাটা অনুভব করলো। কিন্তু সে নিজে কাঁদতে পারেনি; সে একটু ভীত ছিলো কিন্তু মনখারাপের থেকেও খুশিতে উত্তেজিত ছিলো, এবং অবশ্যই দুঃখিত হবার তো প্রশ্নই ওঠে না।

যে-লোকটা তার পাশে বসেছিলো, মনে হয় না তার সিনেমা দেখা নিয়ে কোনো মাথাব্যাথা আছে। দ্বিতীয়ত, যোসেফের চোখে লোকটার ঝিমানো ভাবটা ধরা পড়লো, তার চোখ দুটো বন্ধ হয়ে আসছিলো এবং তার চিবুক আস্তে আস্তে তার বুকের দিকে নেমে যাচ্ছিলো; দুইবার মাথা ঝাঁকিয়ে ঝিমানো অবস্থা থেকে একইরকম আকস্মিকতায়, লোকটা জেগে উঠলো, তার হেডফোন থেকে কিছু শব্দ আসছিলো, বিরক্ত হয়ে কান থেকে জোরে টেনে হেডফোন খুলে ফেলে যোসেফের উপর দিয়ে লম্বা লম্বা পা ফেলে মুখ ধুতে চলে গেলো।
যোসেফ এই সুযোগটা হাতছাড়া করতে চাইলো না। এটা দারুণ একটা ভালো সুযোগ ছিলো সত্যি সত্যি : হেডফোন দুটো প্লাগইন করলো মনিটরে, তার পাশেই পড়ে ছিলো সেটা, আপাতত অব্যবহৃত। সে তার সিটবেল্টটা একটু আলগা করে নিলো এবং তার প্রতিবেশীর চেয়ারে গিয়ে বসলো।

তারপর, চারিদিকে তাকিয়ে দেখলো কেউ তাকে দেখছে কিনা, হেডফোনের প্রান্ত দুটো কানে লাগাতেই মুভির শব্দে প্রবলভাবে ধাক্কা খেলো : একটা গাড়ির হার্ড ব্রেক করে ঘষটে থামার তীক্ষ্ণ শব্দ; একটা লোক সিঁড়ি বেয়ে পিস্তল হাতে নিয়ে নামলো; হাপাতে হাপাতে কতোগুলো ডায়ালগ বলে যাচ্ছে লোকগুলো; তারপর চললো গুলি; একজন মহিলা ভয়ে চিৎকার করে উঠলো। এবং তার প্রতিবেশী লোকটা ততোক্ষণে টয়লেট থেকে ফিরে আসলো, তার পাশের সিটে এখন সেই প্রতিবেশী লোকটা।

যোসেফ করুণ চোখে তার দিকে তাকালো। তার আনন্দটা খুববেশি ক্ষণস্থায়ী ছিলো। লোকটা সিটগুলোর মাঝখানের পথে দাঁড়িয়েই হাসিমুখে বললো, “এটা আমার, সোনামনি,” উজ্জ্বল চোখ দুটো তার দেখা যাচ্ছিলো।
যোসেফ ঠিকঠাক, আদব-কায়দা শিখে বড়ো হওয়া একটা ছেলে।
“ক্ষমা করবেন”, সে বললো, ভদ্রভাবে তার হেডফোন খুলে সেটাকে যথাস্থানে রেখে দিলো আর সে তার আগের জায়গাতে ফিরে গেলো। প্রতিবেশী সিটের লোকটা তার জায়গাতে গিয়ে বসলো, আবার কানে হেডফোনটা লাগালো, আর যোসেফ বুঝতে পারলো চোখের পানির কারণে সে টিভি স্ক্রিনের পর্দায় মুভিটা আগের তুলনায় অনেক বেশি ঝাপসা দেখছে।
সে চাচ্ছিলো না যে তার প্রতিবেশী এটা খেয়াল করুক, সে সিস্টার এঞ্জেলার দেয়া রুমাল দিয়ে চোখ দুটো মুছলো, যেটা সকালে ফ্লাইটের জন্য বের হবার আগে সিস্টার তাকে দিয়েছিলো। আজকের দিনের সকালটাই যেনো মনে হচ্ছে অনেক অনেক দিন আগের কোনো ব্যাপার। সে তার রুমালটা পকেটে ঢুকালো, আবার সেই ম্যাগাজিনের ছবিটার দিকে তাকালো, চার বছর আগে যেটা তার ভ্রমণসঙ্গী হয়েছিলো।

অবশ্যই ইচ্ছা করে এই ছবিটা আর সে দেখতে চায় না। এ আসলে সে নয়, অন্য কেউ, তার এখন আলাদা পরিচয়। ফটোগ্রাফের যোসেফ এখন আর আসল যোসেফ নয়।

সে তার পাসপোর্টটা বের করলো, পুরো লেখাগুলো তার চোখ ভালো করে দেখে নিলো, অনুমিত জন্মতারিখ (“তার জন্মতারিখ কবে সেটা খুঁজে বের করে জানার থেকে, বানিয়ে কিছু একটা বসিয়ে দেয়া অনেক সহজ”, সিস্টার ইভা বলেছিলেন) থেকে তার পুরো বর্ণনা (“চুল কালো; চোখ বাদামি বর্ণের) থেকে নতুন, অদ্ভুত ছবি, যোসেফ স্টুডিওর ক্যমেরার দিকে ছলছল চোখে তাকিয়ে আছে। তারপর সে পাসপোর্টটাকে তার ভেতরের পকেটে আগের জায়গাতে পাঠিয়ে দিলো, হাত দির আরেকটা ছবিতে, গ্লসি, ঝকঝকে, রঙ্গিন ছবি, তার নতুন, যদিও অস্থায়ী বাবা-মাদের ছবি। কিছুটা ইতস্তত করতে করতে সে ছবিটা বের করলো, এরা সেই লোকজন যাদের বাসাকে আগামী একমাস সে নিজের বাসা হিসেবে জানবে।

কিন্তু আসলেই কি তা সে পারবে? ফটোগ্রাফের ফর্মটার দিকে তাকিয়ে থাকলো যোসেফ। তার সম্ভাব্য দত্তক বাবা-মা যোসেফকে তাদের ছবি পাঠিয়ে দিয়েছিল, যাতে যোসেফ তাদের চিনতে পারে, কিন্তু যোসেফের ছবি তারা চায় নি।
“আমরা নিশ্চিত যে আমরা তাকে ঠিকই চিনে নিতে পারবো, যখনই সে বিমানে উঠবে,” সেই বিবাহিত স্ত্রীলোকটি সিস্টার সেলিনকে লিখলো। “আমাদের মনে হচ্ছে যেন আমরা সারাজীবনই তাকে জানি।” যোসেফ মিষ্টি কথাগুলোয় একদম বিমোহিত হয়ে গেলো, গভীরভাবে কথাগুলো তাকে স্পর্শ করলো। তারপর একদিন হঠাৎ কি একটা বিষয়ে রেগে, সিস্টার ইভা যোসেফকে এই বলে শাসালো যে, শাসালো মানে রীতিমতো হুমকি দিলো, বেশি বাড়াবাড়ি করলে সে যোসেফের বদলে আরেকজন কালো চামড়ার ছেলেকে আমেরিকাতে পাঠাবে, এই এতিমখানা থেকেই অনেকেই তৈরি আছে, যাওয়ার জন্য।
“তুমি কি মনে করো যে তারা তোমাদের মধ্যেকার পার্থক্যটা ধরতে পারে?” সিস্টার ইভা আত্মপ্রত্যয়ের সাথেই প্রশ্নটা করলো।

নীরবে, এই হতাশা যন্ত্রণার মধ্যে, যোসেফ বুঝতে পারলো না যে সে কি বলবে। ফটোগ্রাফটার দিকে তাকিয়ে, আমেরিকার ম্যজিক মোমেন্টগুলোর কথা ভাবতে থাকলো সে, যার কথা সে সারাজীবন শুনে এসেছে শুধু আর স্বপ্ন দেখেছে সেখানে যাবার – মুভি, পার্টি, মজাদার খাবার – শত রকমের, সাগরের বীচে ঘোরাঘুরি আর ডিজনিল্যান্ডে যাওয়া।

কিন্তু তার চোখ দুটো আরো প্রসারিত হলো এবং ফটোগ্রাফটা ঝাপসা হয়ে এলো। সে বুঝতে পারলো না কেন তীব্র একাকীত্ব তাকে গ্রাস করছে, দুঃখের মধ্যে অনেক বেশি বিস্ময় আর হতবুদ্ধি লাগছে তার, “হেল্প”-এ খাওয়ার জন্য জাউ-ভাতের কাড়াকাড়ির সেই ভীড় আর করুণ অভিজ্ঞতার কথা মনে পড়লো। সে একদম একা, দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া ম্যাগাজিনের পাতা আর ঝকঝকে উজ্জ্বল রঙিন ছবির মাঝখানে কোথাও ঝুলে গেছে সে, হারিয়ে যাচ্ছে সে।

তার পাশের সিটে, তার প্রতিবেশী নিশ্চিন্তে শান্তির সাথে নাক ডাকছে, তার থুতনি তার বুকের উপর বিশ্রাম নিচ্ছে, হেডফোন তার কানে একদম সেঁটে আছে।
সামনের টিভির স্ক্রিনে, জাদুর মতো ছবিগুলো ঝকমক করে উঠছে।
ঝর্ণার মতো নড়ছে আর নেচে চলেছে।

Share Now শেয়ার করুন