শেখ রেহানার লেখা কবিতা ‘বাবা’ এবং জুলিয়ান ফ্রান্সিসের স্মৃতিচারণ : ‘মননে স্মরণে বঙ্গবন্ধু’ >> বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন

0
382

শেখ রেহানার লেখা কবিতা ‘বাবা’ এবং জুলিয়ান ফ্রান্সিসের স্মৃতিচারণ : ‘মননে স্মরণে বঙ্গবন্ধু’

[সম্পাদকীয় নোট : আজ স্বাধীনতার স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১০২তম জন্মদিন। এ উপলক্ষ্যে তাঁর প্রতি জন্মদিনের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার নিদর্শন স্বরূপ এখানে দুটি লেখা প্রকাশিত হলো। এর একটি কবিতা। কবিতাটি লিখেছেন বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ কন্যা শেখ রেহানা। দ্বিতীয় লেখাটি একটি স্মৃতিচারণ, লিখেছেন জুলিয়ান ফ্রান্সিস।]

শেখ রেহানা >> বাবা

জন্মদিনে প্রতিবার একটি ফুল দিয়ে
শুভেচ্ছা জানানোর ছিল
আমার সবচেয়ে আনন্দ।
আর কখনো পাবো না এই সুখ
আর কখনো বলতে পারব না
শুভ জন্মদিন।
কেন এমন হলো?
কে দেবে আমার প্রশ্নের উত্তর
কোথায় পাবো তোমায়…

যদি সন্ধ্যাতারাদের মাঝে থাকো
আকাশের দিকে তাকিয়ে বলবো
শুভ জন্মদিন।
তুমি কি মিটিমিটি জ্বলবে?

যদি বিশাল সমুদ্রের সামনে
ঢেউয়ের খেলার মাঝে থাকো বলবো
শুভ জন্মদিন।

সমুদ্রের গর্জনে শুনবো কি
তোমার বজ্রকণ্ঠ?
পাহাড়ের চূড়ায় যেখানে মেঘ
নীল আকাশে লুকোচুরি খেলে
তুমি কি ওখানে?
তাকিয়ে বলবো
শুভ জন্মদিন।

এক টুকরো সাদা মেঘ ভেসে যাবে
ওখানে কি তুমি?
আকাশে বাতাসে পাহাড়ের উপত্যকায়
তোমাকে খুঁজবো, ডাকবো
যে প্রতিধ্বনি হবে
ওখানে কি তুমি?
শুভ জন্মদিন।
শুভ জন্মদিন।

লন্ডন, ১৭ই মার্চ ২০১০

[পুনঃমুদ্রিত]

শেখ রেহানা : জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কনিষ্ঠ কন্যা।

++++

জুলিয়ান ফ্রান্সিস >> মননে স্মরণে বঙ্গবন্ধু >> স্মৃতিকথা

১৯৭০-এর নভেম্বরে আমি বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে প্রথম জানতে পারি। তখন আমি ভারতের বিহারে অক্সফামের একটি কৃষি প্রকল্পে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কর্মরত ছিলাম। ১৯৭০-এর ১২ই নভেম্বর তারিখে পূর্ব পাকিস্তানে প্রলয়ংকারী জলোচ্ছ্বাসের পর আমাকে যে-কোনো জরুরি পুনর্বাসন-কাজে যোগ দেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে বলা হয়। আমি তখন বিহারের ‘গয়া’ নামের একটি মফস্বল শহরে থাকতাম। সেখানকার বাঙালিদের থেকেই আমি প্রথম জানতে পারি শেখ মুজিবের কথা। যেমন ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বায়ত্তশাসনের জন্য আন্দোলন ও কারাবাস। ১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচনে শেখ মুজিবের দলের নিরঙ্কুশ বিজয় ও ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের পর আমি বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে শুরু করি। ২৫শে মার্চ থেকে শুরু হয় বাঙালিদের ওপর গণহত্যা। তারপর ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকায় আমি ৬ লক্ষ বাঙালি শরণার্থীদের জন্য অক্সফামের ত্রাণ প্রকল্পে কাজ শুরু করি।
বাংলাদেশের বিজয়ের পর, আমি স্থলপথে কলকাতা থেকে ঢাকা আসি ১৯৭২-এর জানুয়ারি মাসে। কিছুদিন পর ব্রিটিশ দূতাবাস ও অন্যান্য কিছু আন্তর্জাতিক ত্রাণ কর্মকর্তাদের উপদেশ অনুযায়ী আমরা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করি। তাজউদ্দীন আহমেদ সেই সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে দেন। স্মরণীয় সেই সাক্ষী ছিল আজীবন মনে রাখার মতো এক অভিজ্ঞতা। বঙ্গবন্ধুকে আমি জিজ্ঞেস করলাম অক্সফামের মতো একটি প্রতিষ্ঠান কীভাবে বাংলাদেশের পুনর্বাসন কাজে সহায়তা করতে পারে। মুখ থেকে পাইপটি নামিয়ে আমার দিকে ইঙ্গিত করে তাঁর বজ্রকন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি এখানে কীভাবে এসেছো, ইয়াং ম্যান?”
আমি বললাম, “কলকাতা থেকে গাড়ি করে এসেছি।”
তিনি বললেন, “তাহলে তো তুমি আমার থেকে আমার দেশের বর্তমান অবস্থা বেশি দেখেছো। কারণ আমি তো গত ৯ মাস জেলে ছিলাম। তুমিই বলো, তুমি কী কী দেখেছো ও আমার দেশের বর্তমানে কী কী প্রয়োজন।”
আমি বঙ্গবন্ধুকে বললাম শতশত পুড়িয়ে দেওয়া গ্রামের কথা, বিস্ফোরণে বিধ্বস্ত ব্রিজ ও কালভার্টের কথা, নদীতে ডুবন্ত ছোট-বড় ফেরি ও লঞ্চের কথা। আমি তাঁকে জানালাম অক্সফাম ইতিমধ্যে ভারত থেকে আড়াই লক্ষ পাউন্ড মূল্যের টিন আমদানির ব্যবস্থা করেছে যুদ্ধে গৃহহীনদের বাড়ি নির্মাণের জন্য, যা মার্চের মধ্যেই বাংলাদেশ পৌঁছে যাবে। আমি আরো মন্তব্য করলাম যে, সেতু ও ফেরি নির্মাণ বা মেরামত অক্সফামের মতো প্রতিষ্ঠান থেকে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় অনুদানের সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ। বঙ্গবন্ধু বললেন, “না, আমাদের মানুষের জন্য ফেরি বরাবরই রক্ষাকবচ। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে দেখো অক্সফাম এই বিষয়ে কী করতে পারে।”
বিদায় নেওয়ার আগে বঙ্গবন্ধু আমার শরণার্থী শিবিরে কাজের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানতে চাইলেন। সেই অভিজ্ঞতা আমার জন্য এত আবেগময় ছিল যে, বর্ণনা করতে গিয়ে আমি চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি। আমি বললাম, “শরণার্থী শিবিরে অজস্র বাংলাদেশি শিশুর মৃত্যু আমি কখনোই ভুলতে পারবো না, যারা অনেকেই আমার চোখের সামনে মৃত্যুবরণ করে।” বঙ্গবন্ধু আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, “ইয়ং ম্যান, মনোবল শক্ত রাখ। আমাকে দেখতে আসার জন্য বাংলাদেশকে সহায়তা করার জন্য আমি তোমার প্রতি কৃতজ্ঞ।”
বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাতের কারণে অক্সফাম তিনটি ট্রাক-বহনকারী ফেরি কিনতে ও অজস্র ফেরি মেরামত করতে সক্ষম হয়। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপথ কর্তৃপক্ষের ইচ্ছা ছিল মুক্তিযুদ্ধের শহিদদের নামে ফেরিগুলোর নামকরণ করার। কিন্তু বাংলাদেশে আমাদের স্বল্প সময়ের অভিজ্ঞতা বলছিল, এ দেশের উদ্ভিদ ও প্রাণিকুল দেশের সংগীত ও কবিতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। তাই আমরা কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করলাম নৌযানগুলোর নামকরণ যেন দেশীয় ফুলের নামানুসারে করা হয়। সেভাবেই আমরা পেলাম : কামিনী, কস্তুরী ও করবি। আমার জানা মতে, ৪৮ বছর আজও কামিনী, কস্তুরী, করবি নামের এই নৌযানগুলো পদ্মা নদীতে মাওয়া থেকে নিয়মিত চলাচল করে।
ঢাকায় পূর্বাণী হোটেলে আমি অবস্থানরত থাকতেই শেষ সশস্ত্র পাকিস্তানিরা মিরপুরে আত্মসমর্পণ করে। আমার হোটেল রুমের জানালা থেকেই আমি দেখতে পাই কীভাবে ১৯৭২ সালের ৩১শে জানুয়ারি মুক্তিযোদ্ধারা বঙ্গবন্ধুর কাছে মুক্তিযোদ্ধারা তাদের অস্ত্র সমর্পণ করে। বঙ্গবন্ধু ঘোষণা দিলেন, “আজকে থেকে বাংলাদেশে একটি গুলিও চলবে না।” তাঁর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিন, অর্থাৎ ১০ই জানুয়ারি ১৯৭২, উনি যে কথাটি বলেছিলেন তা আবারও সবাইকে স্মরণ করিয়ে দিলেন, “ভাইয়েরা আমার, তোমরা জানো আমাদের সামনে অনেক কাজ। ব্রিজ তোমাদের নিজেদের করতে হবে, ফসল উৎপাদন তোমাদের করতে হবে। একজন সরকারি কর্মকর্তাও ঘুষ নিতে পারবে না। মনে রাখবা, আগে হয়তো সময় অনুকূলে ছিল না। কিন্তু এখন, একজন দুর্নীতিবাজকেও ক্ষমা করা হবে না।
সেই সময় — ১৯৭২ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে বঙ্গবন্ধু বারবার সরকারের সবাইকে স্মরণ করিয়ে দিতেন যে, তাদের উচিত জনগণের সেবায় আত্মনিয়োগ করা। তিনি তাদেরকে মনে করিয়ে দিতেন যে, তারা জনগণের সেবক, প্রভু নন। শীতাতপ যন্ত্র, কার্পেট এবং আসবাবপত্রের ক্ষেত্রে কোনো দ্রব্য ক্রয় না করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
সেই সংক্ষিপ্ত সফরে আমাদের কাছে পরিষ্কার হয়ে যায় বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি বিষয় : খাদ্য ও যুদ্ধবিধ্বস্ত পরিবহন ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। ১৯৭২-এর জানুয়ারিতে আমার সফরের পর পরই অক্সফামের ত্রাণ পরিচালক কেন বেনেট এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, “রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পর্যাপ্ত খাদ্য আমদানি নিষিদ্ধ ও বিধ্বস্ত পরিবহন ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার ওপর নির্ভরশীল, এই কথাটি বললে বাড়িয়ে বলা হবে না।”
১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট আমি অক্সফামের হয়ে দিল্লিতে কাজ করছিলাম। আমার মনে আছে, ওইদিন পরিবার নিয়ে টিভিতে আমরা ভারতের স্বাধীনতা দিবসের উৎসব উপভোগ করছিলাম। হঠাৎই টিভিতে এক জরুরি খবরে বলা হয় শেখ মুজিবকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছে। আমার মনে আছে খবরটি শুনেই আমি শোকে কাতর হয়ে পড়ি, কান্নায় ভেঙে পড়ি। প্রায় ৪৫ বছর পর আজও সেই দিনটি মনে পড়লে আমি অজান্তেই আবেগপ্রবণ হয়ে যাই।

লেখক : ব্রিটিশ এনজিও অক্সফামের সাবেক কর্মকর্তা। ১৯৭১ সালে শরণার্থী শিবিরে কর্মরত ছিলেন।

Share Now শেয়ার করুন