শেরিফ আল সায়ার > ‘জনপ্রিয়-অজনপ্রিয়’ লেখক কালচার >> বইমেলা নিয়ে

0
1354
Rassel Lekha

শেরিফ আল সায়ার > ‘জনপ্রিয়-অজনপ্রিয়’ লেখক কালচার >> বইমেলা নিয়ে

“প্রকাশকদের যাদের এমন জনপ্রিয় বা সেলিব্রিটি লেখক থাকেন তাদের জন্য স্টলের একটা স্পেস করে দিতে হবে। সেই স্পেসে তিনি যেন তার পাঠকদের সঙ্গে কথা বলতে পারেন, সময় দিতে পারেন। ধরা যাক, তিন ইউনিটের স্টল। পুরো একটি ইউনিট একজন লেখকের জন্য বরাদ্দ থাক। যেখানে তিনি অটোগ্রাফ এবং সেলফি তুলবেন। আরেকটি ইউনিটে ওই লেখকের বই বিক্রির লাইন রাখা। তার মানে দুই ইউনিট তাদেরকে ছেড়ে দেওয়া। বাকি একটি ইউনিট সম্পূর্ণ ফ্রি রাখা অজনপ্রিয়দের জন্য।”
বইমেলা দিনকে দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। মেলাজুড়ে মানুষের স্রোত সে প্রমাণই দেয় এই স্রোত দেখে অনেকেই তীর্যক মন্তব্যও করেন এই যেমন অনেকেই বলেন, ‘অধিকাংশ মানুষ মেলায় হাঁটছেন, কিন্তু বই আছে খুব মানুষের হাতে’। এটি অনেক সময় যুক্তিযুক্ত বটে কিন্তু কে বই কিনলো কিংবা কে কিনলো না- এটাকে আমি ব্যক্তিগত স্বাধীনতা মনে করি এই অসহিষ্ণু সময়ে কেউ যে বইমেলায় আসে, তাতেই তো আমার আনন্দের শেষ নেই।
যাই হোক, এবারের বইমেলার একটি নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে চাই তাও সেটা গ্রহণ করবেন কী করবেন না, সে পাঠকদের হাতেই থাকবে। গত কয়েক বছর থেকে মেলায় এক বিস্ময়কর ঘটনা আমি দেখছি সেটি হলো, অনেক স্টলে লাইন ধরে পাঠক দাঁড়িয়ে থাকেন। সেখানে লেখক অটোগ্রাফ দেন এবং পাঠক সেলফিও তুলে নেন প্রিয় লেখকের সঙ্গে। বিস্ময়কর শব্দটা বললাম আনন্দের জন্য। পাঠক-লেখকের এই মিলনমেলাটাই তো আমরা চাই। অনেক লেখকের অনেক পাঠক তৈরি হয়েছে এটা সত্যিই চমৎকার একটা বিষয়।
তবে অটোগ্রাফের বিষয়টি আগে থাকলেও সেলফির চলনটা দশ বছর আগেও খুব একটা দেখা যায়নি। পাঠক অগ্রহ নিয়ে লেখকের অটোগ্রাফ নিয়ে চলে গেছেন। আর লম্বা ভীড় ছিল হাতেগোনা কয়েক জনের জন্য। একদম নাম ধরেই আমরা বলতে পারি- যেমন হুমায়ূন আহমেদের জীবদ্দশায় এই দৃশ্য আমরা দেখেছি। ড. জাফর ইকবালকে ঘিরে এই উৎসাহ আমরা দেখি। সৈয়দ শামসুল হকের জীবদ্দশায়, ইমদাদুল হক মিলন, আনিসুল হককেও আমরা দেখেছি দীর্ঘ সময় তাদের পাঠককূলকে সময় দিতে। এটা নিয়ে অনেকের মুখে সমালোচনাও শুনেছি। কখনও কখনও আমিও সেই সমালোচনায় অংশ নিয়েছি। তবে হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুর পর আমি একটা অদ্ভুত পরিবর্তন আমার চিন্তায় আবিষ্কার করি। সেটি হলো, আমি নিজেকেই প্রশ্ন করলাম– আমার ভেতর পাঠাভ্যাস তৈরিতে সবচাইতে বেশি কার ভূমিকা রয়েছে? অকপটেই উত্তর পেয়েছি হুমায়ূন আহমেদের নাম। এটির একটি যুক্তিও আমি হাজির করি। সেটি হলো, ধরা যাক হুমায়ূন আহমেদের একশ পাঠক তৈরি হয়েছে। তার মধ্যে কজন শুধু হুমায়ূনই পড়ে, আর কিছু পড়ে না। এমনকি আছে? উত্তর হলো না। হুমায়ূন আহমেদের সহজ ভাষায় গল্প বলার ভঙ্গি অসংখ্য পাঠকদের পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলেছে। যখন পড়ার অভ্যাস গড়ে ওঠে তখন ধীরে ধীরে অন্য লেখকের বইও সেই পাঠক পড়তে শুরু করে এবং এদের সংখ্যাই সবচাইতে বেশি বলে আমি মনে করি।
এবার আসি মূল কথায়। এবারের বইমেলায় মোটিভেশনাল স্পিকারদের বই, বিষয় ভিত্তিক বইয়ের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে- মোটামুটি পাঠকদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু তৈরি হয়েছে। এই যেমন ধরা যাক, আয়মান সাদিকের কথা। তার পাঠকদের চাপ সামাল দিতে আমি প্রকাশনী স্টলের কর্মীদের দেখেছি হিমশিম খেতে। এই চাপ সামাল দিতে একসময় পুলিশ পর্যন্ত নিয়ে আসতে হয় স্টলে। বিষয়টা অত্যন্ত ইতিবাচক হিসেবেই আমি দেখছি। যখন আমরা বলছি পাঠক নেই, তখন তাহলে এত পাঠক আসে কোথা থেকে? এর কৃতিত্ব কিন্তু হতাশাবাদীদের নয়- যারা বলেন পাঠক নেই। এই কৃতিত্ব আয়মান সাদিকদেরই। তারা একধরনের কনটেন্ট দিয়ে নিজেদের ফলোয়ার গোষ্ঠী তৈরি করেছেন। তারপর বই এনে তাদের হাতে তুলে দিচ্ছেন। এতে ‘বইয়ের পাঠক নেই’- এই কথা কিন্তু আর বলা যাবে না। বলতে হবে পাঠক আছে- তবে পাঠক এখন কীধরনের কনটেন্ট চায় সে বিষয়ে আমাদের ভাবতে হবে।
মেলার শুরুর দিকে আমি অনেকের সঙ্গে আলোচনায় বলছিলাম, বিষয়ভিত্তিক লেখকদের এত পাঠক দেখে মনে হচ্ছে ফিকশন লেখকরা হুমকির মুখে পড়েছে। কিন্তু পর মুহূর্তেই মনে হয়েছে- বিষয়ভিত্তিক বইয়ের চাহিদা সব-সময়ই বেশি ছিল। ফিকশনকে পাঠক গ্রহণ করে ধীরে ধীরে। এখানে লেখক ব্র্যান্ডিংয়ের একটি বিষয়ও চলে আসে। যাই হোক, সেটা অন্য আলোচনা। এটা নিয়ে অন্য কখনও আলোচনা করা যাবে।
আজকের মূল বিষয়টা হলো এই জনপ্রিয় লেখকদের জোয়ারে কোণঠাসা হয় কারা? অবশ্যই অজনপ্রিয় লেখকরা। যাদের পাঠকসংখ্যা একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ তারা এর ভুক্তভোগী হচ্ছেন। কেউ ভাববেন না আমি জনপ্রিয় লেখক কিংবা সেলিব্রিটি লেখকদের দোষারোপ করছি। তাদের কোনও দোষ নেই। এমনকি প্রকাশকেরও দোষ নেই। তবে এটা একটা দায় কিংবা প্রকাশকের দায়িত্ব তো আছে।
কীভাবে? সেই উত্তরটাই দেব।
ধরা যাক, একজন প্রকাশক গড়ে বই প্রকাশ করছেন ৫০টা। দেখা যাচ্ছে তার হাতে জনপ্রিয় বা সেলিব্রিটি লেখক রয়েছেন ৫ জন। তার আগে বলে নিই, আমি সব প্রকাশকের কথা বলছি না। যারা জনপ্রিয় বা সেলিব্রিটি লেখকদের বই করেন শুধু তাদের জন্য বলছি। এখন এই পাঁচ জনের ভিড় সামাল দিতে স্টল কিন্তু ব্যস্ত হয়ে পড়ে। আগে অটোগ্রাফ নিয়েই পাঠক সরে যেত, কিন্তু এখন এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সেলফি কালচার।
এখন এই ভীড়ের ভেতর কিন্তু বাকি ৪৫টি বইয়ের লেখকরা আড়াল হয়ে পড়লেন। তারা অনেকেই অর্বাচীন হয়ে পড়েন। আমি স্টলে যারা কাজ করেন তাদেরও কোনও দায় দিতে চাচ্ছি না। কারণ স্টলে যার বই বেশি চলবে তাদের কাছে ওই লেখকই সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ। এখন একজন লেখকের বই একশ কপি বিক্রি হওয়ার পর যদি কেউ এসে অন্য লেখকের এককপি বই চায় (যার বই সহজে চলে না) তবে সেই এককপি বের করাটাও তার জন্য ক্লান্তিকর। এটা খেয়াল রাখার কথা প্রকাশকের। তার মানে স্টল ম্যানেজমেন্টের ইস্যুটা এখানে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ যা অনেক প্রকাশকই অবহেলা করেন। দেখা যায়, জনপ্রিয় লেখকের পাঠক যেমন তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ঠিক উল্টো দিকে অজনপ্রিয় লেখকের পাঠক তার কাছে ততটাই অগুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। অথচ মজার বিষয় হলো, ওই অজনপ্রিয় লেখকের ওপরও তিনি লগ্নি করেছেন।
আমার নিজের অভিজ্ঞতাই বলি। আমি একদিন মেলায় গেলাম। সেদিন আমার প্রকাশনীর স্টলে একজন জনপ্রিয় লেখক হাজির ছিলেন। আমি নিজেই সেই স্টলের আশেপাশে ভিড়তে পারছিলাম না মানুষের চাপে। এতে আমি আনন্দিত হয়েছিলাম প্রকাশকের কথা ভেবে। তাকেও আমি জানিয়েছে তার বিক্রি ভালো হচ্ছে এই আনন্দটা আমারও। কিন্তু এই সময়ের মধ্যে আমার খুব কাছের একজন এসে জানালেন, স্টলে সে আমার বই চাইলে বলা হয় এই বইটি নেই। আমি রীতিমত হতবাক হয়ে তাকে বলি- কষ্ট করে আবার একটু যান। হয়তো যাকে বলেছেন সে নতুন।
এরপর গিয়ে তিনি ঠিকই বই নিয়ে আসলেন। সঙ্গে তার অভিজ্ঞতাটি বললেন– বইটি হাতে পাওয়ার জন্য অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়েছে। কারণ তারা সবাই অতিমাত্রায় ব্যস্ত। শেষে একজন ডিসপ্লেতে থাকা বইটি ধরিয়ে দিয়েছে। ফ্রেশ কপি চাইলে বলা হয়- ফ্রেশ কোনও কপি নেই|’
অর্থাৎ আমার পাঠক হিসেবে তিনি কিন্তু অগুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলেন। একে তো তিনি ভীড় ঠেলে কোনও মতে বিক্রয়কর্মীর কাছে গেলেন, কিন্তু গিয়ে তিনি একটি অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতার ভেতর পড়ে গেলেন। এই অস্বস্তি কিন্তু আমারও।
আমি আবারও বলছি, এই দায়টা স্টলে থাকা ওই কর্মীর নয়। এই দায় প্রকাশকের। কারণ প্রকাশক যদি তাদের না বলেন সব লেখকের গুরুত্ব সমান, তবে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত অভিজ্ঞতা হওয়ার কথা না।
বই বিক্রি বেশি হওয়াটা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। একজন লেখকের বই বেশি বিক্রি হচ্ছে এটা আরও গুরুত্বপূর্ণ। শেষ পর্যন্ত তো প্রকাশকের রুটি-রুজির বিষয়। যে লেখকের বই বেশি বিক্রি হবে তার দিকে প্রকাশকের নজরটা বেশি থাকবে এটা অপরাধ নয়। এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু যেহেতু তিনি অন্য লেখকদের ওপরও লগ্নি করেছেন সেহেতু কিছু স্পেস তো তাদেরও দেওয়ার কথা।
একটা বিষয় মনে রাখতে হবে- বাংলাদেশে সব লেখকের বই লাইন ধরে কেনার মতো পাঠক নেই। যেমন, একধরনের পাঠক আছেন আগে থেকেই লিস্ট করে নিয়ে আসবেন। সে অনুযায়ী তিনি বই কিনে বাড়ি ফিরে যাবেন। আরেক ধরনের পাঠক আছেন। আমার অভিজ্ঞতায় তাদের সংখ্যাই বেশি। তারা স্টলগুলোতে ঘোরেন। বইগুলো নেড়ে-চেড়ে দেখেন। সম্ভব হলে দুই তিন পাতায় চোখ বোলান। তারপর পছন্দ হলে বইটি কেনেন।
এই অভিজ্ঞতাও কিন্তু আমার আছে। আমার প্রথম বই প্রকাশ হয় ২০১২ সালে। তখন আমার প্রকাশকের হাতে তেমন জনপ্রিয় কোনও লেখক ছিল না। আমি স্টলে বসতাম মাঝে মাঝে। অনেকেই আমার বইটি নেড়ে চেড়ে দেখে আগ্রহ করে কিনেছিলেন। অনেক সময় স্টল থেকেই আমার বইটি তুলে বলা হতো- ‘এই বইটি নতুন একজন লেখকের। দেখতে পারেন।’ দশজনকে বললে কেউ কেউ কিনতেন। কিন্তু এখন কি তা সম্ভব? এখন, যে পাঠক আমার অপরিচিত কিন্তু বই নেড়ে চেড়ে পাতা উল্টে হয়তো কিনতেও পারতেন তাদের আমি আর পেলাম না। কারণ স্টলে পাশেই তো দাঁড়ানো যাচ্ছে না।
যাই হোক। এই লেখাটাকে সমালোচনা বলবো না। এই ধরনের ঘটনা যে শুধু যে আমার সঙ্গে ঘটেছে তাও নয়। আমার পরিচিত দুই একজন তরুণ লেখককেও দেখলাম এবছর একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা ব্যক্তিগত আলাপে বলেছেন। অর্থাৎ এটাকে আমাদের বাস্তবতা হিসেবে মেনে নিতে হবে। তো, এখান থেকে উত্তরণ করতে হবে। অর্থাৎ একটা সমাধানে তো আসতে হবে।
প্রকাশকদের যাদের এমন জনপ্রিয় বা সেলিব্রিটি লেখক থাকেন তাদের জন্য স্টলের একটা স্পেস করে দিতে হবে। সেই স্পেসে তিনি যেন তার পাঠকদের সঙ্গে কথা বলতে পারেন, সময় দিতে পারেন। ধরা যাক, তিন ইউনিটের স্টল। পুরো একটি ইউনিট একজন লেখকের জন্য বরাদ্দ থাক। যেখানে তিনি অটোগ্রাফ এবং সেলফি তুলবেন। আরেকটি ইউনিটে ওই লেখকের বই বিক্রির লাইন রাখা। তার মানে দুই ইউনিট তাদেরকে ছেড়ে দেওয়া। বাকি একটি ইউনিট সম্পূর্ণ ফ্রি রাখা অজনপ্রিয়দের জন্য। এবং সেখানে কমপক্ষে দু’জন বিক্রয়কর্মী রাখা যাদের কাজই হলো শুধুমাত্র এই অজনপ্রিয় লেখকদের পাঠকদের সহযোগিতা করা। সেখানে কেউ যদি জনপ্রিয় লেখকদের বইয়ের খোঁজে আসে তাহলে বলে দেওয়া- পাশে যেন লাইনে দাঁড়িয়ে যায়। এতে কিছুটা হলেও অজনপ্রিয়দের একটা স্পেস হবে- পাঠক এসে একটু দেখার সুযোগ পাবে। ধীরস্থির হয়ে দাঁড়াতেও পারবে।
এতে কোনও লেখকই নিজেকে অর্বাচীন মনে করবেন না। বই বেশি বিক্রি হোক তা তো আমরাও চাই। আবার বলছি, সব লেখকের বই কেনার জন্য পাঠক তো লাইন ধরবে না। যাদের জন্য লাইন ধরবে না তাদের জন্য প্রকাশকের ভাবনাটাও জরুরি। তার বই পাঠকের সামনে কিভাবে উপস্থাপিত হবে সেটাও প্রকাশকের নিশ্চিত করা জরুরি।
এই লেখাটি একদমই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে লেখা। কারণ আমার মনে হয়েছে এই বাস্তবতা মেনে নিয়ে প্রকাশকদের এই বিষয়টিতে নজর দেওয়ার সময় হয়েছে। প্রয়োজনে লেখকরাও তাদের সহযোগিতা করবেন। লেখক বলতে আমি সবার কথা বুঝিয়েছি। জনপ্রিয়-অজনপ্রিয় সবাই।
বি.দ্র : জনপ্রিয় ও অজনপ্রিয় শব্দ দুটোর ব্যাখ্যা প্রয়োজন। জনপ্রিয় বলতে বুঝিয়েছি- যাদের বই কেনার জন্য পাঠককে লাইন ধরে দাঁড়াতে হয়। অজনপ্রিয় বলতে বুঝিয়েছি- যাদের বই কেনার জন্য লাইন ধরতে হয় না।
Share Now শেয়ার করুন