শ্যাম বেনেগাল >> সত্যজিৎ রায় এক যুগ-প্রবর্তক >> সত্যজিৎ রায় জন্মশতবর্ষ সংখ্যা

0
457

শ্যাম বেনেগাল >> সত্যজিৎ রায় এক যুগ-প্রবর্তক

ভারতীয় চলচ্চিত্রের জগতে সত্যজিৎ রায় এক যুগ-প্রবর্তক। তাঁর তুল্য স্রষ্টা শিল্পী তাঁর আগেও আসেননি, তার পরেও কাউকে পাইনি আমরা। তিনিই প্রথম পরিচালক যিনি এদেশের চলচ্চিত্রের প্রচলিত ধারাকে আমূল বদলে দিয়ে একে এক সুদূরপ্রসারী দিগন্তের সামনে এনে দাঁড় করালেন। সত্যজিতের আগে বেশ কিছু প্রতিভাধর চিত্রনির্মাতাকে আমরা পেয়েছি। কিন্তু তাঁরা কেউই প্রচলিত প্রথাবদ্ধতার আওতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেননি। আমাদের চমকে দিয়ে চলচ্চিত্রকে সেই গতানুগতিকতা থেকে মুক্তি দিলেন সত্যজিৎ। আমাদের বিস্মিত চোখের সামনে তিনি সিনেমার এক আর্টফর্ম, একটা নতুন সম্ভাবনার দিক, তুলে ধরলেন। চলচ্চিত্র সম্পর্কে আমাদের লালিত ধারণাগুলিকে পুরোপুরি বদলে দিলেন তিনি। ‘পথের পাঁচালী’ দেখার সেই অসাধারণ অভিজ্ঞতা আজও ভুলিনি আমি। ছবিটা মুক্তি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কলকাতায় ছুটে গেলাম দেখতে। তখনও আমি কলেজের ছাত্র। কিন্তু সেই সময় থেকেই আমার স্বপ্ন, চলচ্চিত্র পরিচালক হব। ফিল্ম সম্পর্কে ততোদিনে আমার নিজস্ব কিছু ধারণাও তৈরি হয়ে গিয়েছে। কিন্তু ‘পথের পাঁচালী’ দেখেই আমার ধারণাগুলি বরবাদ হয়ে গেল। বুঝলাম, ওসব এতদিনের ভাবনা ঝেড়ে ফেলতে হবে। আগে যেসব দিক কল্পনায়ও আসেনি, আমাকে সেই নতুন দৃষ্টি নিয়ে ভাবতে হবে। আমাদের সামনে এক নতুন দিগন্ত মেলে ধরলেন সত্যজিৎ, একটা খাঁটি মানবিক দিক। তাঁর নায়করা প্রচলিত ধারার নায়ক নন। ‘হিরো’ হলেই সর্বগুণান্বিত আর ‘ভিলেন’ হলেই সর্বপাপাধার, এমনি প্রথাবদ্ধ চরিত্রায়ণ নয় সত্যজিতের। দোষগুণ মিলিয়েই তাঁরা সব স্বাভাবিক মানুষ, রক্তমাংসের জীব। চলচ্চিত্রে এ-এক বলিষ্ঠ অবদান সত্যজিতের। চলচ্চিত্রের জন্য তিনি যেসব বিষয়বস্তু, কাহিনি নির্বাচন করেন, সেসবের মধ্যে তাঁর অভিনবত্ব সুস্পষ্ট, ভারতীয় সিনেমায় ওই ধরনের সাহসী পদক্ষেপ আগে দেখা যায়নি। আমরা যাদের ‘হিরো’ বা ‘ভিলেন’ বলি, তেমন চরিত্রের দর্শন মিলবে না সত্যজিৎ রায়ের ছবিতে। তাঁর চরিত্রগুলি সবাই স্বাভাবিক মানুষ। আমাদের পুরনো দিনের ছবিগুলিতে এর নজির মিলবে না।
সত্যজিৎ রায় যখন ধ্রুপদী গ্রন্থ বা সাহিত্যগুণে মহৎ কোনও কাহিনি তাঁর ছবির জন্য নির্বাচন করেন তখনও তাঁর সৃষ্টি তার হুবহু অনুকৃতি বা অনুবাদ হয়ে ওঠে না, তাঁর প্রতিভার স্পর্শে সে হয়ে ওঠে নতুন সৃষ্টি। তাঁর আগে এই কৃতিত্বের নিদর্শন মেলে না। কাহিনিকে তিনি নতুন মাত্রা দেন, নিজের বোধ এবং প্রতিভার সংযোগে এক নতুন এবং মহৎ শিল্পকৃতি হয়ে ওঠে তাঁর ছবি। হয়ে ওঠে ‘সত্যজিতের ছবি। বহমান ধারা থেকে এ-এক বিরাট ব্যতিক্রম। তাঁর দ্বারা যেমন এটা সম্ভব হয়েছে, তেমনি আমাদেরও তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, সিনেমাও একটা আর্ট ফর্ম, একটা মহৎ শিল্প হয়ে উঠতে পারে। ভারতীয় চলচ্চিত্রে এইটেই তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ অবদান। আমাদের দেশে চলচ্চিত্র নির্মাণে প্রচলিত যতরকম কারিগরি কলা-কৌশল প্রযুক্ত হয়ে থাকে, তাতেও নতুন পথের দিশারী সত্যজিৎ রায়। আলো এবং ধ্বনির ব্যবহার, অন্যান্য খুঁটিনটির প্রয়োগ ইত্যাদিতেও তিনি যে ধরনের প্রকরণ গ্রহণ করেন, তাও চিত্রনির্মাতাদের কল্পনার বাইরে। ছিল এযাবৎ। দিনের আলো কিংবা রাতের দৃশ্যে যে স্বাভাবিক আলোর প্রয়োগ তাঁর ছবিতে দেখা যায়, তা আমাদের এক বাস্তবানুগ এবং বিশ্বাস্য পরিবেশে নিয়ে যায়। তাঁর আগে ভারতীয় সিনেমা ছিল বিচিত্র এক ‘স্টেজ লাইটিং’-এর স্তরে। সত্যজিতের পাত্র-পাত্রীরা চলাফেরা করে চারদিকের স্বাভাবিক পরিবেশের সঙ্গে মিলেমিশে। পরিবেশ এবং প্রকৃতির সঙ্গে চরিত্রগুলির এই যে স্বাভাবিক সম্পর্ক, এইটে মনে রাখতেন না আগেকার পরিচালকরা, আগেকার পাত্রপাত্রী চলাফেরা করত পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন একটা ভ্যাকুয়ামের মধ্যে। ব্যক্তিচরিত্রকে ফুটিয়ে তুলতে পরিবেশের যে কী অবদান থাকতে পারে, তা সত্যজিৎই দেখিয়ে দিলেন। সত্যজিতের ছবিতে আর এক আকর্ষণীয় দিক সাউন্ড বা ধ্বনির ব্যবহার। গান বা ডায়ালগ এবং এমন নিপুণভাবে ধ্বনি বা সাউন্ড প্রযুক্ত হয় তাঁর ছবিতে, যা উপস্থিত চিত্রকর্মের পরিবেশের সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ। আগে কখনও ছবিতে ধ্বনির এই বিশেষ চরিত্র অনুভূত হয়নি। চরিত্রগুলির প্রকাশ্য ক্রিয়াকলাপ ছাড়াও মনের গভীরে ক্রিয়াশীল অনুভূতিগুলি, সূক্ষ্ম সংবেদন বা সংক্ষোভ অসাধারণভাবে ফুটে ওঠে তাঁর দারুণ স্বর ধ্বনি প্রয়োগে বা সাউন্ড এফেক্টে। সিনেমায় ধ্বনির এমন অসাধারণ ব্যবহার আমাদের এক নতুন অভিজ্ঞতা। ধ্বনিপ্রয়োগে বা সাউন্ড এফেক্টের এই অসাধারণ দক্ষতার অন্যতম দৃষ্টান্ত সত্যজিতের ‘অপরাজিত’ চলচ্চিত্রে আমরা পেয়েছি। ধ্বনির কোথাও মাত্রাতিরিক্ত প্রয়োগ নেই তাঁর ছবিতে। এমন সংযত, সুনির্বাচিত ধ্বনির ব্যবহার আর কোনও চিত্রপরিচালক আজ পর্যন্ত করতে পারেননি। আমি তাঁকে এক মহান ‘আর্কিটেক্ট অব সাউন্ড’ বলে মনে করি। ফিল্ম টেকনিকের অন্যান্য ক্ষেত্রেও নতুন নতুন এমন অনেক কিছু তিনি এনেছেন যার তুলনা নেই। অসাধারণ চিত্রনাট্য করেন তিনি। সাধারণত ফিল্ম স্ক্রিপ্ট সুখপাঠ্য হয় না। কিন্তু সত্যজিৎ-কৃত স্ক্রিপ্ট পাঠেও এক পৃথক মজা আছে। আসলে মানুষটি সবদিকেই অনন্য। তাঁর বহুমুখী প্রতিভার অসাধারণ স্বাক্ষরসমূহ ছড়িয়ে থাকে তাঁর তৈরি ছবির শরীরে। চলচ্চিত্র জগতে তাঁর উচ্চাসনের পাশাপাশি তাঁকে দেখি সাহিত্যের জগতেও এক শক্তিশালী লেখকরূপে। আবার তাঁকে দেখি তুলি হাতে যশস্বী চিত্রকরের ভূমিকায়। ছাপাইশিল্পী এবং লিপিশিল্পী হিসাবেও তাঁর উজ্জ্বল প্রতিষ্ঠা। তাঁর নামে পরিচিত তাঁর উদ্ভাবিত ‘রে-রোমান’ লিপিও প্রশংসিত। আবার এই একটি ব্যক্তি গীতিকার, সফল সঙ্গীত পরিচালকও। এ এক বিরলপ্রতিভা।।
যুদ্ধোত্তর ইতালির ‘নিও-রিয়ালিজম’ এবং পরে আন্তজাতিক চলচ্চিত্রজগতে সম্পূর্ণ এক নতুন সিনেমাধারা নিয়ে এসেছেন সত্যজিৎ রায়। এই ‘নিও-রিয়ালিজম’-এ এক গভীর তাৎপর্য এবং নতুন মাত্রা দিয়েছেন সত্যজিৎ। এটা এখন আর কেবল একটা রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নয়। আরও গভীর এক দার্শনিক বিশ্বমানবিক তাৎপর্যমণ্ডিত বিষয় হয়ে উঠেছে, হয়ে উঠেছে জীবনের প্রকাশ, হয়তো জীবনের মহৎ বাণীও বলা যায় একে।
হাজার পরিচালক আছেন চলচ্চিত্রের জগতে। কিন্তু ক’জন আছেন সত্যজিতের সমকক্ষ? কড়ে গোনা যায়। জাপানের ওজু কুরাশোয়া, চ্যাপলিন, ভিস্কোন্তি, বাগমান-এর ন্যায় অল্প কয়েকটি নামই কেবল সত্যজিতের পাশে উচ্চারণ করা যায়।

সূত্র : একটি ইংরেজি লেখা থেকে অনূদিত

Share Now শেয়ার করুন