সাজেদুল আউয়াল >> সাহিত্যের চলচ্চিত্রায়ন : প্রসঙ্গ বাংলাদেশ >> চলচ্চিত্র

0
331

সাজেদুল আউয়াল >> সাহিত্যের চলচ্চিত্রায়ন : প্রসঙ্গ বাংলাদেশ

[সম্পাদকীয় নোট >> চলচ্চিত্র নির্মাতা ও চলচ্চিত্রের শিক্ষক সাজেদুল আউয়াল। গত ১৫ এপ্রিল করোনা সংক্রান্ত শারীরিক জটিলতার শিকার হয়ে তিনি মৃতুবরণ করেন। সাজেদুল ছিলেন একাধারে নিষ্ঠাবান লেখক, নাট্যকার, নাট্য-বিশ্লেষখ, চলচ্চিত্র নির্মাতা, চলচ্চিত্র বিশ্লেষক ও চলচ্চিত্রের শিক্ষক। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সামগ্রিক ইতিহাস নিয়ে তিনি যে গবেষণা করে গিয়েছেন, তা নিঃসন্দেহে তাঁর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কাজ। ঋত্বিক ঘটককে নিয়েও সম্পাদিত গ্রন্থ আছে তাঁর। এখানে যে লেখাটি প্রকাশিত হচ্ছে সেটি তিনি তীরন্দাজের সম্পাদকের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের সূত্রে তীরন্দাজ-এ প্রকাশের জন্যে দিয়েছিলেন। কিন্তু প্রকাশটা দেখে যেতে পারলেন না। তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধার নিদর্শনস্বরূপ লেখাটি প্রকাশ করা হলো।]

পৃথিবীর সবদেশেই কমবেশি সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে, হচ্ছে। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। সাহিত্যকর্ম নানাধরনের হয়ে থাকে। গল্প-ছড়া-উপন্যাস-নাটক-কবিতা-প্রবন্ধ-পুঁথি-পালাগান-মিথকথা-যাত্রা-পুরাণকথা-কিচ্ছা যেমন সাহিত্যকর্ম তেমনি স্মৃতিকথা-ডায়েরি-জনশ্রুতি-রূপকথা-লোকগাথা-বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি, চিঠিপত্রও তাই। সাহিত্যকর্ম পাঠকনির্ভর আর চলচ্চিত্র দর্শকনির্ভর মাধ্যম। দুয়ের গঠনশৈলীর মধ্যে পদ্ধতিগত পার্থক্য থাকলেও দুয়ের বিষয়বস্তুই মানুষ ও তার প্রতিবেশ; দুটোই মানুষের জীবনের সীমাহীন ব্যাপ্তিকে তুলে ধরতে সক্ষম। দুয়ের উপকরণ ও কলারূপ আলাদা। সাহিত্য কথাধর্মী, চলচ্চিত্র চিত্র ও শব্দধর্মী। উভয়ের প্রকাশশৈলী-ভাষা, ধাতুরূপ-কলাবৃত্তি ও সাংগঠনিক বৈশিষ্ট্য ভিন্ন। তাই সাহিত্যকর্ম থেকে বিষয়বস্তু চলচ্চিত্রমাধ্যমে পরিবহনের সময় কিছু অংশ গ্রহণ করতে হয়, কিছু অংশ বর্জন করতে হয় এবং কিছু সংযোজন করতে হয়। এই পথ ধরেই বিশ্বের সকল চলচ্চিত্র স্রষ্টা কালজয়ী সব ধ্রুপদি চলচ্চিত্র তৈরি করেছেন।

চলচ্চিত্রকে সাধারণভাবে দুটি শ্রেণিতে বিভক্ত করা হয়েছে : ফিকশন ও নন-ফিকশন। ফিকশনাল চলচ্চিত্র পূর্ণদৈর্ঘ্য ও স্বল্পদৈর্ঘ্য – দুই ধরনেই হয়ে থাকে এবং এদের বিষয়বস্তু কোনো সাহিত্যকর্ম থেকে নেওয়া হতে পারে, আবার বিষয়বস্তুটি চলচ্চিত্রকারের স্বপকল্পিতও হতে পারে। তিনি তাঁর দেখা বা শোনা কোনো বাস্তব ঘটনা বা পত্রিকা-টেলিভিশনে পরিবেশিত কোনো ঘটনা থেকেও বিষয়বস্তু পেয়ে যেতে পারেন। নিজের দেখা এক বা একাধিক স্বপ্ন জোড়া দিয়েও তিনি তাঁর চলচ্চিত্রের গল্পটি দাঁড় করাতে পারেন। আর নন-ফিকশনাল চলচ্চিত্রের মধ্যে পড়ে সংবাদচিত্র, প্রামাণ্যচিত্র, ক্লাসরুম ফিল্ম (সাধারণত চিকিৎসাবিদ্যা বা বিজ্ঞানের ক্লাসে ব্যবহৃত ইন্সট্রাকশনাল ফিল্ম), ভ্রমণচিত্র, সাক্ষাৎকার ইত্যাদি।

চলচ্চিত্রমাধ্যমের আবির্ভাবের সময় একমিনিটের চলচ্চিত্র নির্মিত হতো, কারণ রিলের দৈর্ঘ্য ছিল এরকম। ফিল্ম জোড়া দেওয়ার পদ্ধতি তখনও আবিস্কৃত হয়নি। শট জোড়া দেওয়ার জন্য ফিল্ম-সিমেন্ট আসার পরই চলচ্চিত্রের দৈর্ঘ্য বাড়তে থাকে। তখনই প্রয়োজন পড়ে কাহিনির। কাহিনির জন্য গল্প-উপন্যাস-নাটকের সরণাপন্ন হন চলচ্চিত্র নির্মাতারা, দেশে-দেশে, কালে-কালে। চলচ্চিত্রের শুরু থেকেই বিষয়বস্তুর বিচারে দুটি প্রবণতা ক্রিয়াশীল ছিল – এক শ্রেণির চলচ্চিত্রকার সমাজের বাস্তব ঘটনাকে প্রাধান্য দেন, অন্যদল দেন কল্পিত বিষয়কে। ল্যুমিয়ের ভাতৃদ্বয় প্রথম দলের এবং জর্জ মেলিয়েঁ দ্বিতীয় দলভুক্ত। দ্বিতীয় দলের মাধ্যমেই চলচ্চিত্রে কল্পনাত্মক বিষয়ের প্রবেশ ঘটে এবং সেইসূত্রে চলচ্চিত্রের বিষয় হিসেবে সাহিত্যের অনুপ্রবেশ ঘটে। কারণ সাহিত্যকর্মেই লেখকের কল্পনাশক্তি, তাঁর জীবনদর্শন-বিশ্ববীক্ষা, স্ব-সমাজ ও সংস্কৃতি সম্পর্কে তাঁর বুদ্ধিদীপ্ত ভাবনার প্রকাশ ঘটে বেশি। চলচ্চিত্রকার সেই সাহিত্যকর্ম থেকে বিষয় সংগ্রহ করলে বিষয়ের সাথে সাথে লেখকের ভাবনাগুলোকেও নেন, আবার তার সঙ্গে নিজের ভাবনারও সংমিশ্রণ ঘটান। এমনটাই ঘটেছে পৃথিবীর সকল দেশের সকল চলচ্চিত্রকারের ক্ষেত্রে, যাঁরা সাহিত্যকর্ম থেকে বিষয় বেছে নিয়েছেন।

সাহিত্য তথা গল্প-উপন্যাসে অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ এই তিনটি কালকেই ধরা যায়। কিন্তু চলচ্চিত্রের কেবল বর্তমানকে নিয়েই কারবার। নানা দেশের চলচ্চিত্র স্রষ্টারা চলচ্চিত্রকলার নিজস্ব ভাষা ও অভ্যন্তরীণ উপকরণ ব্যবহার করে বর্তমানে থেকেও অতীত ও ভবিষ্যৎ কালের প্রতিভাস তাঁদের চলচ্চিত্রে সৃষ্টি করে গেছেন। তাঁদের কাজকে বলা যায় ‘চলচ্চৈত্রিক উপন্যাস’। এ পর্যায়ে এসে বিশ্বের নানাদেশে নানাকালে সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্রের ফিরিস্তি দেওয়া যায়। তাতে রচনার পরিধি বেড়ে যাবে বিধায় শুধু প্রতিবেশি শহর কলকাতার চলচ্চিত্রের সাহিত্যনির্ভরতার প্রসঙ্গটি সংক্ষেপে আলোচনা করে আমাদের মূল প্রসঙ্গ বাংলাদেশের সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্রের একটি রূপরেখা দাঁড় করানোর চেষ্টা করবো।

বস্তুত চলচ্চিত্র মাধ্যমের জন্মলগ্ন থেকেই সাহিত্য তার সঙ্গী হয়েছে এবং সাহিত্যের বিষয়বস্তু পরিবেশনের ক্ষেত্রে বিশ্ব-চলচ্চিত্রকারগণ নানামুখী পরীক্ষা-নিরীক্ষাও করেছেন। কেউ-কেউ সাহিত্যের দাসত্ব করেছেন, ফলে নির্মিত চলচ্চিত্রটি যতটা না পরিচালকের, তার চেয়ে বেশি লেখকের হয়ে থেকে গেছে। কলকাতার প্রথম দিকের উপন্যাসনির্ভর চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে বিবেচনাটি বিশেষভাবে প্রযুক্ত হতে পারে। কেউ-কেউ আবার চলচ্চিত্রকলার সাংগঠনিক উপাদানের (দৃশ্য, শব্দ ও সম্পাদনাকর্ম) নান্দনিক ও সৌকর্যমণ্ডিত ব্যবহারের মাধ্যমে উপন্যাস থেকে বিষয়বস্তু নিলেও চলচ্চিত্রটি লেখকের চেয়ে তাঁর নিজেরই সৃষ্টি বলে বিবেচিত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, ঋত্বিক ঘটক প্রমুখের কথা বলা যায়। কলকাতায় শুরুর দিকে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রমুখের উপন্যাস অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মিত হতে দেখা যায়।

দুই

১৯৩১ সালে কলকাতায় নির্মিত প্রথম সশব্দ চলচ্চিত্রটিই ছিল সাহিত্যনির্ভর। শরৎচন্দ্রের ‘দেনা-পাওনা’ অবলম্বনে এটি একই নামে নির্মিত হয় নিউ থিয়েটার্স থেকে। সেই যে সাহিত্যকেন্দ্রিক চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু হলো তা আজো চলছে।  এই বিস্তৃত সময়ের মধ্যে কলকাতায় যত বাংলা চলচ্চিত্র তৈরি হয়েছে তার প্রায় অর্ধেকই সাহিত্যনির্ভর। নামকরা সব সাহিত্যিকের গল্প-উপন্যাস থেকে বিষয়বস্তু নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে, হচ্ছে। এঁদের মধ্যে ছিলেন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, সুবোধ ঘোষ, আশুতোষ মুখোপাধ্যায় শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, প্রেমেন্দ্র মিত্র, জ্যোতির্ময় রায়, তুলসী লাহিড়ি, প্রেমাঙ্কুর আতর্থী, জলধর চট্টোপাধ্যায়, দীনেশ দাস, নিতাই ভট্টাচার্য, মন্মথ রায়, বিধায়ক ভট্টাচার্য, নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়, প্রবোধ সান্যাল, ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়, বনফুল, বিমল মিত্র প্রমুখ। উপন্যাসের মতো নাটকও সাহিত্যকর্মই – আমরা দেখি যে, শচীন সেনগুপ্ত, দীনবন্ধু মিত্র রচিত নাটকেরও চলচ্চিত্রায়ণ হয়েছে।

অনেক সাহিত্যিক আবার নিজেরাই কহিনি-চিত্রনাট্য রচনা করে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন – যেমন শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, প্রেমেন্দ্র মিত্র, জ্যোতির্ময় রায়, তুলসী লাহিড়ি, প্রেমাঙ্কুর আতর্থী প্রমুখ। ধারণা করি, সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্র নির্মাণের পেছনে অন্যতম কারণ ছিল দর্শকপ্রিয়তা। দর্শক গল্প-উপন্যাসের চলচ্চিত্ররূপ সপরিবারে দেখতে চাইতো বলেই প্রযোজকরা সাহিত্য থেকে কাহিনি বেছে নিতেন। দর্শক দেখতো বলে চলচ্চিত্রখাত থেকে আয়ও হতো। অধিকসংখ্যায় চলচ্চিত্রও নির্মিত হতো। দর্শক না দেখলে তো চলচ্চিত্রশিল্পই বেঁচে থাকে না। এ সত্য প্রযোজক-নির্মাতারা অনুধাবন করেছিলেন বলেই সপরিবারে দেখার মতো সাহিত্যধর্মী চলচ্চিত্র ওখানে এত সংখ্যায় নির্মিত হয়েছিল বলে প্রতীয়মান হয়।

কলকাতার চলচ্চিত্রের স্বর্ণযুগের অধিকাংশ চলচ্চিত্রই সাহিত্যনির্ভর। এইসব চলচ্চিত্রের নায়ক-নায়িকা ছিলেন সুচিত্রা সেন ও উত্তম কুমারসহ আরো অনেকে তারকা। তারকানির্ভরতা যেমন ওই যুগের একটা বিশেষ দিক ছিলো তেমনি সাহিত্য নির্ভরতার প্রমাণও দেখতে পাই। সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্রের আরেকটা সুবিধা থাকে যে, এর একটা দর্শকশ্রেণি পূর্ব থেকেই তৈরি হয়ে থাকে। প্রতিষ্ঠিত ও জনপ্রিয় গল্পকার-ঔপন্যাসিকের যে পাঠককুল থাকে তাঁরাই সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্র সিনেমা হলে মুক্তি পেলে তা দেখার জন্য ভিড় করবে, এটা ভেবে নেওয়া অস্বাভাবিক নিশ্চয়ই নয়।

তিন

ঢাকার চলচ্চিত্রক্ষেত্রেও এর যাত্রাকাল থেকেই সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রবণতা দেখা যায়। ঢাকায় ১৯৫৬ সালে  ‘মুখ ও মুখোশ’ বলে যে চলচ্চিত্রটি আবদুল জব্বার খান নির্মাণ করেন, তার মধ্য দিয়েই এখানে চলচ্চিত্রশিল্পের যাত্রা শুরু হয়। সেই থেকে এখন পর্যন্ত সাহিত্যকর্মনির্ভর চলচ্চিত্র নির্মাণের ধারা অব্যাহত আছে। এখন অব্দি প্রায় একশত চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে সাহিত্য থেকে বিষয়বস্তু নিয়ে। দশকওয়ারি একটি বিবরণ দিতে গেলে বিবরণটি দাঁড়ায় নিম্নরূপ :

[১৯৫৬-১৯৫৯]

এই দশকে দুটি সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্র তৈরি হয়েছে : ‘মুখ ও মুখোশ’ (১৯৫৬) ও ‘জাগো হুয়া সাভেরা’ (১৯৫৯)। প্রথমটি আবদুল জব্বার খান রচিত ‘ডাকাত’ নাটক  ও দ্বিতীয়টি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত উপন্যাস ‘পদ্মানদীর মাঝি’ অবলম্বনে এ. জে. কারদার নির্মিত, যদিও কাহিনিকার হিসেবে ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের নাম দেওয়া হয়েছে। এই দশকে সমাজ বাস্তবতাভিত্তিক কাহিনি নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রবণতা দেখা যায়। উল্লেখ্য যে, ১৯২৭-২৮ সালে অম্বুজ প্রসন্ন গুপ্তের পরিচলনায় স্বল্পদৈর্ঘ্যের  ‘সুকুমারী’ ও ১৯৩১ সালে পূর্ণদৈর্ঘ্যৈর   ‘দি লাস্ট কিস’ বা ‘শেষ চুম্বন’ নামে যে দুটি নিঃশব্দ চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছিল তাদের বিষয়বস্তুও ছিল সমকালীন সমাজবাস্তবতা থেকে নেওয়া ঘটনা-উপাদান। শেষেরটিতে শিশুতোষ উপাদানও ছিল।

[১৯৬২-১৯৬৯]

এই দশকে ১৭টি সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্র নির্মিত হতে দেখা যায় : ‘সূর্যস্নান’ (১৯৬২), এটি আলাউদ্দীন আল আজাদের গল্প অবলম্বনে সালাউদ্দিন কর্তৃক নির্মিত; ‘রূপবান’ (১৯৬৫), লোকযাত্রানির্ভর ও সালাউদ্দিন কর্তৃক নির্মিত; ‘নদী ও নারী’ (১৯৬৫), হুমায়ুন কবীর রচিত উপন্যাস অবলম্বনে সাদেক খান কর্তৃক নির্মিত; ‘ফির মিলেঙ্গে হাম দোনো’ (১৯৬৬), শেক্সপিয়ারের নাটক ‘রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েট’-কে কেন্দ্রে রেখে সৈয়দ শামসুল হক এটি নির্মাণ করেন; দস্তয়ভস্কির উপন্যাস নিয়ে ‘বেগানা’ (১৯৬৬) তৈরি করেন এস. এম. পারভেজ; রোমেনা আফাজের উপন্যাস ‘কাগজের নৌকা’-র (১৯৬৬) চলচ্চিত্ররূপ দেন সুভাষ দত্ত; লোকসাহিত্যভিত্তিক উপাখ্যান ‘বেহুলা’ নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন জহির রায়হান; নজিবর রহমান সাহিত্যরত্নের উপন্যাস ‘আনোয়ারা’ (১৯৬৭) নিয়েও একই নামে চলচ্চিত্র তৈরি করেন জহির রায়হান; সৈয়দ শামসুল হকের গল্প নিয়ে ‘আয়না ও অবশিষ্ট’ (১৯৬৭) নির্মাণ করেন সুভাষ দত্ত; মুনীর চৌধুরীর গল্প নিয়ে কাজী জহির বানান ‘নয়নতারা’ (১৯৬৭); শচীন্দ্রনাথ সেনের নাটক অবলম্বনে ‘নবাব সিরাজদ্দৌলা’ (১৯৬৭) তৈরি করেন খান আতাউর রহমান; আমজাদ হোসেন ও নুরুল হক ‘আগুন নিয়ে খেলা’ (১৯৬৭) নির্মাণ করেন শৈলেশ দে-র উপন্যাস অবলম্বনে; রোমেনা আফাজের গল্প নিয়ে ‘মোমের আলো’ (১৯৬৮) নির্মাণ করেন মুস্তাফিজ; আকবর হোসেনের উপন্যাস থেকে ‘অবাঞ্ছিত’ (১৯৬৯) বানান কামাল আহমেদ; কবি জসীমউদদিনের কাব্যগাথা কেন্দ্র করে ‘বেদের মেয়ে’ (১৯৬৯) তৈরি করেন নুরুল হক; শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের উপন্যাস নিয়ে ‘জোয়ার ভাটা’ (১৯৬৯) তৈরি করেন খান আতাউর রহমান; রোমেনা আফাজের উপন্যাস থেকে ‘মায়ার সংসার’ (১৯৬৯) বানান মোস্তফা মেহমুদ।

এই দশকে নির্মিত সাহিত্যধর্মী চলচ্চিত্রগুলোর বিষয়বস্তু বিশ্লেষণ করলে একটি মিশ্র প্রবণতা লক্ষ করা যায়। সমাজবাস্তবতাধর্মী, লোকগাথাভিত্তিক বিষয় যেমন পাওয়া যায়, তেমনি ঐতিহাসিক ঘটনানির্ভর সত্য কাহিনি এবং বিদেশীভাষায় রচিত নাটক-উপন্যাসের চলচ্চিত্ররূপ দিতেও দেখা যায়।

[১৯৭২-১৯৭৯]

মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পরও সাহিত্যনির্ভর বাংলা চলচ্চিত্র নির্মিত হতে থাকে। প্রাপ্ত তথ্য থেকে দেখা যায় এই দশকে মোট ১৯টি সাহিত্যধর্মী চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাস ‘বৈকুণ্ঠের উইল’ অবলম্বনে ‘আপনপর’ (১৯৭২) তৈরি করেন রুহুল আমিন; সৈয়দ শামসুল হকের গল্প নিয়ে কাজী জহির নির্মাণ করেন ‘অবুঝমন’ (১৯৭২); সুবোধ ঘোষের ‘কান্তিধারা’ উপন্যাস অবলম্বনে রুহুল আমিন তৈরি করেন ‘নিজেরে হারায়ে খুঁজি’ (১৯৭২); নীহাররঞ্জন রায়ের ‘বধু’ উপন্যাস অবলম্বনে ‘ঝড়ের পাখি’ (১৯৭৩) নির্মাণ করেন কিউ. এম. জামান; আমজাদ হোসেনের কাহিনি নিয়ে ‘আবার তোরা মানুষ হ’ (১৯৭৩) তৈরি করেন খান আতাউর রহমান; দিলারা হাশেমের উপন্যাস ‘ঘর মন জানালা’ অবলম্বনে ‘বলাকা মন’ (১৯৭৩) বানিয়েছেন সুভাষ দত্ত; অদ্বৈত মল্লবর্মণের উপন্যাস নিয়ে ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ (১৯৭৩) নির্মাণ করেন ঋত্বিক ঘটক; কাজী আনোয়ার হোসেনের গল্প নিয়ে ‘মাসুদ রানা’ (১৯৭৪) তৈরি করেছেন মাসুদ পারভেজ; ওবায়দুল হকের ‘আজান’ উপন্যাস নিয়ে ‘উত্তরণ’ (১৯৭৫) বানান ফজলুল হক; আমজাদ হোসেন তাঁর নিজের উপন্যাস ‘নিরক্ষর স্বর্গ’ অবলম্বনে ‘নয়নমণি’ (১৯৭৬) তৈরি করেন; রাজেন তরফদার ‘পালঙ্ক’ (১৯৭৬) নির্মাণ করেন নরেন্দ্রনাথ মিত্রের গল্প অবলম্বনে; রোমেনা আফাজের উপন্যাস অবলম্বনে ‘দস্যু বনহুর’ (১৯৭৬) তৈরি করেন মাসুদ পারভেজ; আলাউদ্দীন আল আজাদের গল্প ‘তেইশ নম্বর তৈলচিত্র’ নিয়ে ‘বসুন্ধরা’ (১৯৭৭) বানান সুভাষ দত্ত; আশরাফ সিদ্দিকী রচিত গল্প ‘গলির ধারের ছেলেটি’ থেকে ‘ডুমুরের ফুল’ (১৯৭৮) নির্মাণ করেন সুভাষ দত্ত; আমজাদ হোসেন তাঁর নিজের উপন্যাস অবলম্বনে ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’ (১৯৭৮) তৈরি করেন; শহীদুল্লাহ কায়সারের উপন্যাস থেকে ‘সারেং বৌ’ (১৯৭৮) তৈরি করেন আবদুল্লাহ আল-মামুন; রোমেনা আফাজের উপন্যাস থেকে ‘মধুমিতা’ (১৯৭৮) নির্মাণ করেন মোস্তফা মেহমুদ; জরাসন্ধের ‘লৌহকপাট’ সাহিত্যকর্ম অবলম্বনে ‘দিন যায় কথা থাকে’ (১৯৭৯) বানান প্রমোদকার; শেখ নিয়ামত আলী ও মসিহউদ্দিন শাকের সরকারি অনুদানে নির্মাণ করেন আবু ইসহাকের উপন্যাস থেকে ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’ (১৯৭৯)।

এই দশকে নির্মিত সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্রের বিষয়বস্তু ও বৈশিষ্ট্য লক্ষ করলে দেখা যায় যে, এ-সময় কলকাতা ও ঢাকার সাহিত্যিকদের রচনা প্রাধান্য পেয়েছে বেশি। স্বরচিত সাহিত্যকর্ম থেকেও কেউ-কেউ, যেমন আমজাদ হোসেন চলচ্চিত্র তৈরি করেছেন। থ্রিলারধর্মী বিষয় চলচ্চিত্রের উপাদান হয়েছে। ধ্রুপদি উপন্যাস-গল্প চলচ্চিত্রের বিষয় হিসেবে গৃহীত হয়েছে। আবার এই সময়ই ঢাকার চলচ্চিত্রে নকল প্রবণতা দেখা দিতে শুরু করে। পরের দশকে তা ব্যাপক আকার ধারণ করে। সঙ্গে যুক্ত হয় অশ্লীল উপাদান।

[১৯৮০-১৯৮৯]

এই দশকে সাহিত্যনির্ভর ২৬টি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। আবদুর রাজ্জাকের ‘কন্যাকুমারী’ নিয়ে দিলীপ সোম তৈরি করেন ‘স্মৃতি তুমি বেদনা’ (১৯৮০); আবদুল্লাহ আল-মামুন তাঁর উপন্যাস ‘সেনাপতি’ অবলম্বনে নির্মাণ করেন ‘এখনই সময়’ (১৯৮০); সমরেশ বসুর কাহিনি নিয়ে চাষী নজরুল ইসলাম বানান ‘ভালো মানুষ’ (১৯৮০); জ্যাক লন্ডনের কাহিনি নিয়ে রুহুল আমিন তৈরি করেন ‘গাংচিল’ (১৯৮০); আমজাদ হোসেন তাঁর নিজের গল্প নিয়ে তৈরি করেন ‘কসাই’ (১৯৮০); বাদল রহমান সরকারি অনুদানে জার্মান লেখক এরিখ কাস্টনারের রচনা ‘এমিল অ্যান্ড দি ডিটেকটিভ’ অবলম্বনে নির্মাণ করেন ‘এমিলের গোয়েন্দা বাহিনি’ (১৯৮০); নুরুল আলম নির্মাণ করেন শরৎচন্দ্রের উপন্যাস থেকে ‘স্বামী’ (১৯৮১); কিষণচন্দের ‘এক লায়লা হাজার দেওয়ানা’ অবলম্বনে আলমগীর কুমকুম বানান ‘ঝুমকা’ (১৯৮১);  শরৎচন্দ্রের উপন্যাস থেকে চাষী নজরুল ইসলাম বানান ‘দেবদাস’ (১৯৮২); কাজী হায়াৎ তৈরি করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গল্প নিয়ে ‘রাজবাড়ী’ (১৯৮৪); শরৎচন্দ্রের উপন্যাস থেকে চাষী নজরুল ইসলাম বানান ‘চন্দ্রনাথ’ (১৯৮৪); শহিদুল আমিন বানান শরৎচন্দ্রের উপন্যাস থেকে ‘রামের সুমতি’ (১৯৮৪); আবদুর রাজ্জাক তৈরি করেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাস অবলম্বনে ‘বৈকুণ্ঠের উইল’ (১৯৮৫); মতিন রহমান নির্মাণ করেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘রাধাকুষ্ণ’ (১৯৮৫); মো. হান্নান বানান লোকসাহিত্যভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘রাই বিনোদিনী’ (১৯৮৫); আবদুর রাজ্জাক নির্মাণ করেন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস নিয়ে ‘চাপাডাঙ্গার বৌ’ (১৯৮৬); চাষী নজরুল ইসলাম বানান বঙ্কিমচন্দ্রের ‘দেবী চৌধুরানী’ নিয়ে ‘মানসম্মান’ (১৯৮৬) ও শরৎচন্দ্রের ‘শুভদা’ (১৯৮৬); আলমগীর কবির তৈরি করেন শরৎচন্দ্রের উপন্যাস থেকে ‘পরিণীতা’ (১৯৮৬); বুলবুল আহমেদ নির্মাণ করেন শরৎচন্দ্রের উপন্যাস নিয়ে ‘রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্ত’ (১৯৮৭); লোকসাহিত্য থেকে ‘চণ্ডীদাস রজোকিনী’ ‘(১৯৮৭) বানিছেন রফিকুল বারী চৌধুরী; চাষী নজরুল ইসলাম বানান লোকসাহিত্যভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘বেহুলা লক্ষিন্দর’ (১৯৮৮); সাদাত হাসান মান্টোর ‘লাইসেন্স’ অবলম্বনে আজিজুর রহমান বানান ‘মহানগর’ (১৯৮৯); মহিউদ্দিন ফারুক তৈরি করেন শরৎচন্দ্রের উপন্যাস নিয়ে ‘বিরাজ বৌ’ (১৯৮৯); কামাল আহমেদ শরৎচন্দ্রের উপন্যাস থেকে বানান ‘ব্যথার দান’ (১৯৮৯) এবং চাষী নজরুল ইসলাম নির্মাণ করেন ‘বিরহব্যথা’ (১৯৮৯)।

পরিসংখ্যানদৃষ্টে বলা যায় যে, এই দশকে পশ্চিমবাংলার সাহিত্য, বিদেশী ও দেশীয় সাহিত্যের বিষয়বস্তু গুরুত্ব পেয়েছে। লোকসাহিত্য থেকেও উপাদান গৃহীত হয়েছে। এই দশকে নানা কারণে ঢাকার চলচ্চিত্রে দর্শকঘাটতি দেখা দিতে থাকে। ভিসিআর এসে গেছে, নীলছবি দর্শক বিকল্প হলে দেখছে, চলচ্চিত্রে কাটপিছের ব্যবহার শুরু হয়ে গেছে। ফর্মূলা ফিল্মের বিস্তার ঘটে চলেছে। নকল করে যেনতেনভাবে চলচ্চিত্র বানিয়ে মুনাফা করার প্রবণতা বেড়ে চলে। এই অবস্থাতেও সুরুচির পরিচয় দিয়েছেন চলচ্চিত্রনির্মাতারা। তাঁরা মূলধারার চলচ্চিত্রযাত্রা জিইয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। পরের দশকেও এই যাত্রা অব্যাহত ছিল কিন্তু সাহিত্যধর্মী চলচ্চিত্রের অনেক কমে গিয়েছিল। এই দশক থেকেই বাংলাদেশে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ আন্দোলন শুরু হয় এবং এর কিছু কিছু সাহিত্য তথা কবিতা-গল্প অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক কবিতা-গল্প প্রাধান্য পায়। এখনও স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র সাহিত্যকর্ম নিয়ে নির্মিত হচ্ছে। বিষয়টি আলাদা মনোযোগ দাবি করে বলে বর্তমান রচনায় সে-প্রসঙ্গ আনা হয়নি।

[১৯৯০-১৯৯৭]

এই দশকে মাত্র ৮টি সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। সমরেশ বসুর গল্প অবলম্বনে শহিদুল হক খান তৈরি করেন ‘ছুটির ফাঁদে’ (১৯৯০);  সৈয়দ শামসুল হকের উপন্যাস নিয়ে সৈয়দ সালাউদ্দীন জাকী নির্মাণ করেন ‘আয়নাবিবির পালা’ (১৯৯১); শরৎচন্দ্রের উপন্যাস থেকে চাষী নজরুল ইসলাম বানান ‘স্ত্রীর পাওনা’ (১৯৯১); মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মানদীর মাঝি’ উপন্যাসের চলচ্চিত্ররূপ দেন গৌতম ঘোষ (১৯৯৩); হুমায়ুন আহমেদ নিজের উপন্যাস থেকে বানান ‘আগুনের পরশমণি’ (১৯৯৪); সরকারি অনুদানে সেলিনা হোসেনের উপন্যাস অবলম্বনে ‘পোকা মাকরের ঘরবসতি’ (১৯৯৬) বানান আখতারুজ্জামান; সেলিনা হোসেনের উপন্যাস থেকে ‘হাঙ্গর নদী গ্রেনেড’ (১৯৯৭) তৈরি করেন চাষী নজরুল ইসলাম; আবদুর রাজ্জাক বানান নীহাররঞ্জন গুপ্তের উপন্যাস অবলম্বনে ‘উত্তর ফাল্গুনী’ (১৯৯৭)।

এই দশকে শুধু দুই বাংলার বাংলাভাষি সাহিত্যিকদের রচনা প্রাধান্য পায়। অন্যভাষার সাহিত্যকর্ম নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়নি। সাহিত্যধর্মী চলচ্চিত্রের নির্মাণসংখ্যা কমে যাওয়ার প্রবণতা থেকে বোঝা যায় দর্শকসংখ্যা কমছে, হলগুলোও লোকশান গুনছে, কিছু কিছু বন্ধও হয়েছে। প্রযোজকশ্রেণিও চলচ্চিত্রব্যবসা থেকে ধীরে ধীরে  মুখ ফিরিয়ে নিতে শুরু করে। স্টুডিওভিত্তিক বাণিজ্যিক ধারার চলচ্চিত্রে কাটপিছের ব্যবহার ও অশ্লীলতা প্রবেশ করায় নারীদর্শক কমতে থাকে। সবচেয়ে বড় কথা পুরো পরিবার নিয়ে চলচ্চিত্র দেখার এতদিনকার রেওয়াজ উঠে যায়। কিন্তু তারপরও পরের দশকে দেখা যায় যে, সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্র নির্মাণের সংখ্যা বেড়ে গেছে।

[২০০১-২০০৯]

এই দশকে মোট ২০টি সাহিত্যধর্মী চলচ্চিত্র নির্মিত হয়। তানভীর মোকাম্মেল তৈরি করেন সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ’র উপন্যাস অবলম্বনে ‘লালসালু’ (২০০১); হুমায়ুন আহমেদ নিজের উপন্যাস থেকে নির্মাণ করেন ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ (২০০৩), ‘চন্দ্রকথা’ (২০০৩), ‘শ্যামলছায়া’ (২০০৪) ও ‘দুই দুয়ারী’ (২০০৬); মৌসুমী বানান রাবেয়া খাতুনের উপন্যাস নিয়ে ‘কখনো মেঘ কখনো বৃষ্টি’ (২০০৩); চাষী নজরুল ইসলাম নির্মাণ করেন রাবেয়া খাতুনের উপন্যাস থেকে ‘মেঘের পরে মেঘ’ (২০০৪); শওকত আলীর উপন্যাস অবলম্বনে শাহজাহান চৌধুরী তৈরি করেন “উত্তরের খেপ’ (২০০৪); চাষী নজরুল ইসলাম নির্মাণ করেন রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস থেকে ‘শুভা’ (২০০৫) ও ‘শাস্তি’ (২০০৫); আমজাদ হোসেন তৈরি করেন ‘কাল সকালে’ (২০০৫); সুচন্দা বানান সরকারি অনুদানে জহির রায়হানের উপন্যাস অবলম্বনে ‘হাজার বছর ধরে’ (২০০৫); বেলাল আহমেদ বানান হুমায়ুন আহমেদের উপন্যাস থেকে ‘নন্দিত নরকে’ (২০০৬); রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস থেকে কাজী হায়াৎ তৈরি করেন ‘কাবুলিওয়ালা’ (২০০৬); কাজী নজরুল ইসলামের উপন্যাস নিয়ে মতিন রহমান বানান ‘রাক্ষুসী’ (২০০৬); নুরুল আলম তৈরি করেন ‘পরমপ্রিয়া’ (২০০৬); মুশফিকুর রহমান গুলজার নির্মাণ করেন শরৎচন্দ্রের উপন্যাস থেকে ‘বিন্দুর ছেলে’ (২০০৬); হুমায়ুন আহমেদের উপন্যাস থেকে মোরশেদুল ইসলাম নির্মাণ করেন ‘প্রিয়তমেষু’ (২০০৯); মোস্তফা সরোয়ার ফারুকী নির্মাণ করেন সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের উপন্যাস থেকে ‘থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার’ (২০০৯) এবং এ. কিউ. খোকন তৈরি করেন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের উপন্যাস নিয়ে ‘গুরুভাই’ (২০০৯)।

এই দশকে চলচ্চিত্র প্রযোজনায় স্বাধীন পুঁজির প্রবেশ ঘটে। টেলিভিশন চ্যানেলও চলচ্চিত্র প্রযোজনায় এগিয়ে আসে। সরকারি অনুদান তো ছিলই। যৌথ প্রযোজনায়ও চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। এসব কারণে এ-দশকে সাহিত্যধর্মী বিষয়বস্তু নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের একটা প্রবণতা দেখা গেছে। সংখ্যাটাও বিগত দশকের চেয়ে বেড়েছে। টেলিভিশনে বিশ্বপ্রিমিয়ার করে পুঁজি লগ্নীকারক প্রতিষ্ঠান ব্যয়কৃত অর্থ ফেরৎ পাওয়ার পাশাপাশি কিছু মুনাফাও করতে পেরেছে প্রচারিত বিজ্ঞাপনের সুবাদে। এসব চলচ্চিত্র, কিছু ব্যতিক্রম বাদে, সিনেমা হলে চলেনি। পরের দশকেও সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্র নির্মাণের ধারা অব্যাহত থাকে। সম্ভবত লগ্নীকৃত পুঁজি ফেরৎ আসার সম্ভাবনার ধারণাই সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্র নির্মানের পিছনে ক্রিয়াশীল ছিল।

[২০১০-২০১৬]

এই দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত সাহিত্যকেন্দ্রিক চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে ১৯টি। রবীন্দ্রনাথের ‘সমাপ্তি’ গল্প নিয়ে ‘অবুঝ বৌ’ (২০১০) নির্মাণ করেন নার্গিস আক্তার; গৌতম ঘোষ তৈরি করেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাস থেকে ‘মনের মানুষ’ (২০১০); মোরশেদুল ইসলাম নির্মাণ করেন মুহম্মদ জাফর ইকবাল রচিত ‘আমার বন্ধু রাশেদ’ (২০১১); সৈয়দ শামসুল হকের উপন্যাস ‘নিষিদ্ধ লোবান’ অবলম্বনে নাসির উদ্দীন ইউসুফ নির্মাণ করেন ‘গেরিলা’ (২০১১); রাবেয়া খাতুনের উপন্যাস নিয়ে শাহজাহান চৌধুরী বানান ‘মধুমতি’ (২০১১); হুমায়ুন আহমেদ নিজের রচনা থেকে তৈরি করেন ‘ঘেটুপুত্র কমলা’ (২০১২); ইমদাদুল হক মিলনের উপন্যাস থেকে শাহজাহান চৌধুরী নির্মাণ করেন ‘আত্মদান’ (২০১২); সাইফুল ইসলাম বানান রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস অবলম্বনে ‘চারুলতা’ (২০১২); শরৎচন্দ্রের উপন্যাস থেকে চাষী নজরুল ইসলাম তৈরি করেন ‘দেবদাস’ (২০১৩); আবদুর রাজ্জাক নির্মাণ করেন ইমদাদুল হক মিলনের উপন্যাস থেকে ‘আয়নাকাহিনি’ (২০১৩); মাসুদ পথিক নির্মলেন্দু গুণের কবিতা থেকে তৈরি করেন ‘নেকাব্বরের মহাপ্রয়াণ’ (২০১৪); কাজী নজরুল ইসলামের উপন্যাস থেকে গীতালী হাসান নির্মাণ করেন ‘প্রিয়া তুমি সুখী হও’ (২০১৪); সৈয়দ মুজতবা সিরাজের উপন্যাস অবলম্বনে সরকারি অনুদানে মুরাদ পারভেজ তৈরি করেন ‘বৃহন্নলা’ (২০১৪); আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘রেইনকোট’ উপন্যাস থেকে জাহিদুর রহিম অঞ্জন নির্মাণ করেন ‘মেঘমল্লার’ (২০১৪); আনিসুল হকের উপন্যাস ‘সাহসিনী জননী’ অবলম্বনে সরকারি অনুদানে শাহ আলম কিরণ নির্মাণ করেন ‘একাত্তরের মা জননী’ (২০১৪); নাদের চৌধুরী নির্মাণ করেন ইমদাদুল হক মিলনের উপন্যাস থেকে ‘লালচর’ (২০১৫); মোরশেদুল ইসলাম নির্মাণ করেন হুমায়ুন আহমেদের উপন্যাস অবলম্বনে ‘অনিল বাগচীর একদিন’ (২০১৫); হুমায়ুন আহমেদের উপন্যাস অবলম্বনে মেহের আফরোজ শাওন তৈরি করেন ‘কৃষ্ণপক্ষ’ (২০১৬) ও ফরিদুর রেজা সাগরের গল্প নিয়ে মুশফিকুর রহমান গুলজার নির্মাণ করেন ‘লাল সবুজের সুর’ (২০১৬)।

এ-দশকে ঢাকার স্টুডিওভিত্তিক বাণিজ্যিকধারায় ফর্মুলাভিত্তিক চলচ্চিত্র কিছুটা সংখ্যায় কম নির্মিত হতে দেখা যায় এবং ব্যবসাও তেমন করতে পারেনি। এর জন্য অনেকটা স্টুডিওভিত্তিক বাণিজ্যিক ধারার কিছু নির্মাতাই দায়ী। তারপরও মূলধারা তথা স্টুডিওভিত্তিক বাণিজ্যিকধারার ভিতরই সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্র নির্মাণ করার উদ্যোগ নেন সচেতন কিছু নির্মাতা। তাঁরা দশর্কের কথা ভেবেছেন, সিনেমা হল টিকিয়ে রাখার কথা ভেবেছেন। ইতোমধ্যে নিউ মিডিয়ার প্রসার ঘটেছে। মানুষ এখন ভিজ্যুয়াল প্লেজার সিনেমাহল ছাড়াও নিউ মিডিয়ার কল্যাণে হাতের মুঠোর মধ্যেই পেয়ে যাচ্ছে। তাই বাংলাদেশের চলচ্চিত্র করিয়েদের রুচিসম্মত চলচ্চিত্র নির্মাণ করা দরকার বলে মনে করি। আর এ-ক্ষেত্রে বারবার সাহিত্যের কাছেই ফিরে আসতে হবে। এ-কথার প্রমাণ আমরা প্রতি দশকের চলচ্চিত্র বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখতে পেয়েছি।

[দশকওয়ারী সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্রের তালিকা প্রণয়নে রজত রায়, অনুপম হায়াৎ, মো. জাহিদ হাসান, শহিদুল হাসান, আশরাফী বিনতে আকরাম ও মো. ফখরুল আলমের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।]

++++

নিজের পরিচয় সাজেদুল আউয়াল দিয়েছেন এইভাবে

সাজেদুল আউয়াল : চলচ্চিত্রকার ও চলচ্চিত্রবিদ্যার শিক্ষক

Share Now শেয়ার করুন