সাদাত হোসাইন >> উপন্যাস ‘অর্ধবৃত্ত’ > বইয়ের আগে পাণ্ডুলিপি পড়ুন

0
2296

অর্ধবৃত্ত [অংশবিশেষ]

“একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলতে গিয়েও সামলে নিলো মুনিয়া। তার কেন যেন মনে হলো এই যে রাতের হাওয়া, এই হাওয়ার পুরোটাই এই শহরের মানুষের দীর্ঘশ্বাসে পরিপূর্ণ। এতো এতো দীর্ঘশ্বাসের ভিড়ে নিজের দীর্ঘশ্বাসটুকু সে আর হারিয়ে ফেলতে চায় না। রাফি ফোন করছে। সে এখন আরাম করে রাস্তার ওপাশে ল্যাম্পপোস্টের নিচে ফুটপাতে বসেছে। বৃষ্টি কমে এসেছে। রাফির সামনে হাঁটুর ওপর কবিতার খাতাটা খোলা। বাঁ হাতে সিগারেট।” 

[সম্পাদকীয় নোট : এই সময়ের উল্লেখযোগ্য জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক সাদাত হোসাইন। শুধু ‘জনপ্রিয়’ বললে তাঁর লেখাকে ভুল বোঝার অবকাশ থেকে যায়। এ কারণেই বলা যায়, তিনি তাঁর যাপিত সময় আর এই সময়ে বিচরণ করা মানুষদের জীবনকে চমৎকারভাবে তুলে ধরতে পারেন। নির্মাণ-কুশলী, দক্ষ এই ঔপন্যাসিক গল্প বলতে জানেন। জানেন মানুষের অন্তর্গূঢ় মনের হদিসও, যা তাঁর উপন্যাসের প্রধান শক্তি। পাঠকপ্রিয়তাও তিনি পেয়েছেন এ-কারণেই। কদিন আগে তিনি তীরন্দাজের অনুরোধে একটি ভিডিও সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। আজ প্রকাশিত হলো আসন্ন বইমেলায় আসা উপন্যাস ‘অর্ধ্ববৃত্ত’-র অংশবিশেষ। একটা গল্পের আমেজ পাবেন পাঠক এই ছোট্ট অংশে। সাদাতকে তাঁর আসন্ন উপন্যাসের জন্য অভিনন্দন।] 

ঝিরিঝিরি বৃষ্টি শুরু হয়েছে। সাথে দমকা হাওয়া। বারান্দায় একটা উহন্ডচাইম দুলছে। উইন্ডচাইমের টুংটাং শব্দে মুনিয়ার ঘুম ভেঙে গেলো। একবার পাশ ফিরে তাকালো সে। জাফর ঘুমাচ্ছে। ঘুমানোর আগে বারান্দার দরজাটাও বন্ধ করতে ভুলে গেছে জাফর।
এখন এই মাঝরাতে উঠে গিয়ে মুনিয়াকেই দরজা বন্ধ করতে হবে।
‘জাফর?’ মুনিয়া ডাকলো।
জাফর সাড়া দিলো না। সামান্য গোঙানির মতো শব্দ করলো কেবল। সাথে মৃদু নাকও ডাকছে সে। মুনিয়া বালিশের পাশ থেকে মোবাইল ফোনটা নিলো। যা আশংকা করেছিলো তা-ই। ঊনিশটা মিসড কল! সে জানালা দিয়ে বাইরে তাকালো। মাঝরাত। সোডিয়াম লাইটের আলোয় নিঃসঙ্গ একা এক শহর। এই সময়ের সোডিয়াম লাইটের আলোটা অদ্ভুত। সবকিছু কেমন অপার্থিব মনে হয়। বিভ্রমাত্মক মনে হয়। মনে হয়, এই যেন হুট করে চোখের সামনে দেখা দৃশ্যটা এখুনি কোথাও মিলিয়ে যাবে। তারপর রয়ে যাবে অনন্ত শূন্যতা। সুতীব্র হাহাকার। মুনিয়া আলগোছে বিছানা ছেড়ে নামলো। খুব সাবধানে, সতর্ক পা ফেলে সে বারান্দার দরজাটার কাছে এসে দাঁড়ালো। একপশলা শীতল বাতাস এসে ঝাপটা মেরে গেলো তার চোখে মুখে। রাস্তার ঠিক উল্টোপাশেই একটা ল্যাম্পপোস্ট। ল্যাম্পপোস্টের নিচে একটা ছায়মূর্তি। ছায়ামূর্তির মুখ দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু মুনিয়া জানে, রাফি দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে কবিতার খাতা। এই মাঝরাতে সে মুনিয়াকে কবিতা না শুনিয়ে যাবে না। মুনিয়া বুঝতে পারছে না, তার কি আনন্দিত হওয়া উচিত? না বিরক্ত? রাফি কম করে হলেও তার চেয়ে আঠারো বছরের ছোট। বেশিও হতে পারে। ঋদ্ধির বান্ধবীর বড় ভাই সে। ইউনিভার্সিটিতে ফাইনাল ইয়ারে পড়ে। আর মুনিয়া ইউনিভার্সিটি শেষ করেছে সতেরো বছরেরও বেশি!
একবার মুখ ফিরিয়ে ঘুমন্ত স্বামীকে দেখে নিলো মুনিয়া। জাফর এখন বাঁ কাত হয়ে ঘুমাচ্ছে। গভীর শ্বাস ফেলছে সে। বাকী রাতে ভূমিকম্প হয়ে গেলেও আর জেগে ওঠার সম্ভাবনা নেই তার। পাশের ঘরেই ঘুমাচ্ছে ঋদ্ধি। তাদের একমাত্র সন্তান। গতকালই ঋদ্ধির তেরোতম জন্মদিন গেলো। আজ চৌদ্দতে পড়েছে সে। সারা দিন হৈ হুল্লা করে তাই সন্ধ্যা নামতেই ঘুমিয়ে পড়েছে। বারান্দার জানালা দিয়ে ঋদ্ধিকে দেখা যাচ্ছে। এলোমেলো ভঙ্গিতে ঘুমিয়ে আছে সে। গায়ের টিশার্ট সরে গেছে। মেয়েটাকে খানিক সতর্ক করার প্রয়োজন অনুভব করলো মুনিয়া। এই সেদিন কাপড়ের পুটলির ভেতর থেকে পিটপিট করে তাকানো মেয়েটা চোখের পলকে বড় হয়ে গেলো। আচ্ছা, সে নিজেও কি বুড়িয়ে যাচ্ছে?
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলতে গিয়েও সামলে নিলো মুনিয়া। তার কেন যেন মনে হলো এই যে রাতের হাওয়া, এই হাওয়ার পুরোটাই এই শহরের মানুষের দীর্ঘশ্বাসে পরিপূর্ণ। এতো এতো দীর্ঘশ্বাসের ভিড়ে নিজের দীর্ঘশ্বাসটুকু সে আর হারিয়ে ফেলতে চায় না। রাফি ফোন করছে। সে এখন আরাম করে রাস্তার ওপাশে ল্যাম্পপোস্টের নিচে ফুটপাতে বসেছে। বৃষ্টি কমে এসেছে। রাফির সামনে হাঁটুর ওপর কবিতার খাতাটা খোলা। বাঁ হাতে সিগারেট। এতোদূর থেকে সোডিয়াম লাইটের আলোয় তার পাঞ্জাবির রঙটা বোঝা যাচ্ছে না। মুনিয়া ফোনটা ধরলো। তবে কোন কথা বললো না। কেবল কানের সাথে আলতো করে চেপে রাখলো। রাফি ভরাট গলায় কবিতা পড়লো, ‘আমি একদিন নিখোঁজ হবো, উধাও হবো রাত প্রহরে, সড়ক বাতির আবছা আলোয়,খুঁজবে না কেউ এই শহরে। ভাববে না কেউ, কাঁপবে না কেউ, কাঁদবে না কেউ একলা একা, এই শহরের দেয়ালগুলোয়, প্রেমহীনতার গল্প লেখা’। রাফি এখন তাকে একের পর এক কবিতা শোনাবে। মুনিয়া একটা শব্দও বলবে না। কবিতা শোনানো শেষে রাফি খানিক চুপচাপ বসে থাকবে। মুনিয়া দীর্ঘ এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ফোনটা রেখে দেবে। ওই দীর্ঘশ্বাসের শব্দটুকুতে কী আছে, কে জানে! তবে ওটুকু বুকে নিয়েই ঘুমুতে যাবে রাফি।
কিন্তু আজ প্রথম কবিতার পরই রাফিকে থামালো মুনিয়া। সে ফিসফিস করে বললো,
‘তুমি ঋদ্ধিকে অতো গিফট দিতে গেলে কেনো?’
‘ওর জন্মদিন তাই।’
‘জন্মদিন বলেই অতো গিফট দিতে হবে? সবাইকেই দাও?’
‘উম্মম, শুধু যে জন্মদিন সে জন্যই নয়।’
‘তাহলে?’
‘ও তো রথির বন্ধুও।’
‘কিন্তু.‘ ..’।
‘কিন্তু ‘ কী?’
‘ঋদ্ধি বড় হচ্ছে। ওরও একটা ভালো লাগা-মন্দ লাগা তৈরি হচ্ছে।’
‘তাতো হবেই। আমাদের সবারই আছে। কেনো? ওর গিফট পছন্দ হয় নি?’
‘উহু, তা না। তুমি বুঝতে পারছো না।’
‘কী বুঝতে পারছিনা?’ কিছু একটা বলতে গিয়েও নিজেকে সামলে নিলো মুনিয়া। চেপে রাখা দীর্ঘশ্বাসটা শেষ অবধি হাওয়ায় ছড়িয়ে দিলো সে। মিশে গেলো আর সকল দীর্ঘশ্বাসের সাথে। শহুরে হাহাকারে পরিপূর্ণ হাওয়ার সাথে। সেই হাওয়ায় নিজের হাহাকারটুকুকে আর আলাদা করতে পারলো না মুনিয়া।

ঋদ্ধির ঘরে ঢুকলো মুনিয়া। তার বুকের কাছে উঠে আসা টিশার্টটা টেনেটুনে ঠিক করে দিলো। বেঘোরে ঘুমুচ্ছে মেয়েটা। একটা পাতলা চাদর টেনে দিলো গায়ে। সবাই বলে ঋদ্ধি দেখতে হুবহু মুনিয়ার মতো হয়েছে। কিন্তু মুনিয়ার কেবল মনে হয়, ঋদ্ধি তাদের কারো মতোই হয়নি। সে হয়েছে তার নিজের মতোই। কী যেন একটা রয়েছে তার। সহসা চোখ ফেরানো যায় না। এমনিতেই কৈশোরে অদ্ভুত এক সৌন্দর্য থাকে মেয়েদের। একটা নরম মায়া। একটা মিষ্টি অনুভব। সবচেয়ে সুন্দর হয় চোখ। দীঘির স্বচ্ছ জলের মতো টলটলে। আর হাসি, পাতার ফাঁক গলে আসা ভোরের আলোর মতো। কী স্নিগ্ধ , কী মায়াময়!
মুনিয়া তাকিয়ে রইলো দীর্ঘ সময়। একটা অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে তার। এই অনুভবের উৎসটুকু সে জানে, কিন্তু ইচ্ছে করেই বুঝতে চায় না। তার কেবল মনে হয় একটা বিভৎস জটিল সমীকরণের মধ্যে পড়ে যাচ্ছে সে। এই সমীকরণ থেকে তার মুক্তি চাই। ঋদ্ধির মাথার কাছে খোলা একটা নোটবুক। নোটবুকের পাতা ওল্টানো। সেই ওল্টানো পাতায় স্পষ্টাক্ষরে লেখা, ‘আমার সত্যি সত্যি একটা কবিতা লাগবে রাফি ভাইয়া। তুমি আমায় অমন একটা কবিতা লিখে দেবে, মা’কে যেমন দাও।’
নোটবুকটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইলো মুনিয়া। তার কেমন লাগছে। শরীরজুড়ে একটা ঝিমঝিম ভাব। একটা অব্যক্ত অস্থিরতা। সবাই বলে, মেয়েরা অনেক কিছুই আগেভাগে টের পেয়ে যায়। তবে সবাই যেটা বলে না তা হলো, মায়েরা তারও আগেই সবকিছু টের পেয়ে যায়। বিশেষ করে সন্তানের ক্ষেত্রে। রাফির প্রতি ঋদ্ধির এই হঠাৎ হঠাৎ অভিমান, এই হঠাৎ হঠাৎ আবদার চোখ এড়ায় নি মুনিয়ার। রাফি অবশ্য ঋদ্ধিকে একটা কবিতা লিখেও দিয়েছিলো, কিন্তু সেই কবিতা ঋদ্ধির পছন্দ হয় নি। এই নিয়ে সে মন খারাপ করে বসেছিলো সেদিন। স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে মুনিয়াকে জিজ্ঞেস করেছিলো, ‘আমাকে কি এখনো ছোট লাগে মা?’
‘তুইতো ছোটই।’
‘আমি ছোট?’
‘নয়তো কী?’
ঋদ্ধি দুম করে বলে বসলো, ‘তুমি কী জানো, আমাদের ক্লাসের বেশিরভাগ মেয়েরই বয়ফ্রেন্ড আছে? আর ছেলেগুলো তাদের চেয়ে কত বড় তোমার ধারণাই নেই!’ মুনিয়া এতোটা আশা করেনি। সে ঋদ্ধির সাথে কখনোই কোনোকিছু আড়াল রাখতে চায় নি। কিন্তু তাই বলে এতোটাও আশা করেনি। মুনিয়া গম্ভীর মুখে বললো, ‘বয়সের আগে কোন কিছু করলেই কেউ বড় হয়ে যায় না’।
ঋদ্ধি ঠোঁট উল্টে বললো, ‘আমি কিছু বললেই কেবল বয়সের কথা ওঠাও। যেন আমারই
কেবল…’
মুনিয়া আরো গম্ভীর হয়ে গেলো। সে ঋদ্ধিকে মাঝ পথে থামিয়ে দিয়ে বললো, ‘সবকিছুরই একটা নিদির্ষ্ট বয়স থাকে, সময় থাকে। আর সব বয়সেরই একটা আলাদা সৌন্দর্যও আছে। তোমার দাদী যদি এখন এই সত্তুর বছর বয়সে এসে ঠোঁটে টকটকে লাল লিপস্টিক দিয়ে, আটোসাটো জিন্স আর টিশার্ট পরে ঘুরতে বের হয়, তোমার তা দেখতে ভালো লাগবে?’
ঋদ্ধি আর কথা বাড়ায় নি। সে জানে মায়ের সাথে সে যুক্তিতে পারবে না। তবে সেদিন
ঋদ্ধি ঘুমিয়ে গেলে লুকিয়ে লুকিয়ে তার স্কুলের ব্যাগটা খুলেছিলো মুনিয়া। ঋদ্ধির
নোটবুকে রাফির হাতে লেখা কবিতা। ‘একদিন ছুঁয়ে দাও, আকাশের সীমানা, ইচ্ছের ডানা মেলে, দেখে নাও কী মানা!
তারপর উড়ে যাও, দূরে যাও সীমাহীন, ঋদ্ধির স্বপ্নই, হোক আগামীর দিন।’ নিচে সুন্দর করে অটোগ্রাফও দিয়ে দিয়েছে রাফি। কিন্তু এই কবিতা ঋদ্ধির পছন্দ হয় নি। সে এমন কবিতা চায়নি। সে চেয়েছিলো অন্যরকম কবিতা। খুব আগ্রহ নিয়েই সে খাতাটা খুলেছিলো। কিন্তু লাইন চারটি পড়ে ভেজা তুলোর মতো মিইয়ে গিয়েছিলো সে। এমন মন খারাপ তার বহুকাল হয়নি। তীব্র মন খারাপ নিয়েই দীর্ঘ সময় আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলো ঋদ্ধি। তাকে নিয়ে রাফি এমন শিশুসূলভ কবিতা লিখতে পারে, এটা সে ভাবতেও পারে নি। নিজেকে এতোটা ছোট হিসেবে মেনেও নিতে পারছিলো না সে।

মুনিয়া ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ফেললো। ঋদ্ধির নোটবুকটা কাছে টেনে নিলো সে। ঋদ্ধির লেখা শেষ লাইনটা যেন আলপিনের মতো বুকে বিঁধছে তার, ‘তুমি আমায় অমন একটা কবিতা লিখে দেবে, মা’কে যেমন দাও।’

সে রাতে মুনিয়ার আর ঘুম হলো না। সারারাত একা একা বারান্দায় বসে রইলো সে। মাঝে মাঝে কেবল উইন্ডচাইমের মৃদু টুংটাং শব্দ তাকে সঙ্গ দিয়ে গেলো। মোহাম্মদপুরের এই পুরনো আমলের তিনতলা বাড়িটা অবশ্য জেগে ওঠে তারও আগে। ফজরের আজানের সাথে সাথেই দোতলা থেকে মুনিয়া শ্বশুর আফজাল আহমেদের গলা খাঁকাড়ির শব্দ পাওয়া যায়। তিনি ঘুম থেকে উঠেই গরম পানিতে বিকট শব্দে গড়গড়া করতে থাকেন। এ কারণে তার স্ত্রী মছিদা বানুকে ঘুম থেকে উঠতে হয় তারও আগে। উঠে তার জন্য ধোয়া পরিস্কার লুঙ্গি আর পাঞ্জাবি প্রস্তুত রাখতে হয়। পানি গরম করতে হয়। এমন পতিব্রতা স্ত্রী আর দেখেনি মুনিয়া। প্রায় পঞ্চাশ বছরের দাম্পত্য জীবন তার শ্বশুর-শাশুরির। এখনো কী অবলীলায় স্বামীর সকল যন্ত্রণা সহ্য করে যাচ্ছেন মছিদা বানু! আর আফজাল আহমেদও অদ্ভুত এক মানুষ। সারাক্ষণ স্ত্রীর সঙ্গে তার খটোমটো লেগেই থাকে। দেখলে মনে হবে জগতে মছিদা বানুর চেয়ে বিরক্তিকর প্রাণী তার কাছে আর দ্বিতীয়টি নেই। কিন্তু এই মছিদা বানুকে ছাড়া একটা মুহূর্তও তিনি থাকতে পারেন না। চোখের সামনে থেকে এক মুহূর্তের জন্যও মছিদা বানু আড়াল হলেই যেন তার দম বন্ধ হয়ে আসে। চিৎকার চেঁচামেচি করে বাড়ি মাথায় তোলেন তখন।

বিষয়টা যে মছিদা বানু বোঝেন না, তা নয়। আর বোঝেন বলেই আফজাল আহমেদ যতই রাগারাগি করুন না কেন, যতই পান থেকে চুন খসলেই মেজাজ দেখান না কেন, বিষয়টাকে খুব একটা পাত্তা দেন না মাছিদা বানু। আফজাল আহমেদ যেন তার কাছে একগুঁয়ে, খামখেয়ালি এক শিশু। যেন তার রাগ, ক্ষোভ, অভিযোগ, চিৎকার চেঁচামেচিকে তেমন একটা গুরুত্ব দেয়ার কিছু নেই!

আফজাল আহমেদ আর মছিদা বানুর এই সম্পর্কটা খুব ভাবায় মুনিয়াকে। মানুষ কতদিন কাউকে ভালোবাসতে পারে? একটানা গভীরভাবে অনুভব করতে পারে? কিংবা ভালোবাসাহীন সম্পর্ক কতদিন টিকিয়ে রাখতে পারে? একটা সময় পরে সম্পর্ক কি কেবলই অভ্যাস হয়ে যায়? নাকি একসাথে থাকতে থাকতে অভ্যস্ততা থেকে একটা মায়াও পড়ে যায় পরস্পরের প্রতি? একটা নির্ভরতা তৈরি হয়?

আচ্ছা, এই যে মায়া, নির্ভরতা, এই যে বছরের পর বছর একসাথে থেকে যাওয়া, এর
কোথাও কি তাহলে ভালোবাসা থাকে না? কিন্তু মানুষ যে বলে, মায়া আর ভালোবাসা এক নয়! আসলেই কি তাই? মছিদা বানু আর আফজাল আহমেদের এই অর্ধশত বছরের দাম্পত্য জীবনের রহস্য এই এতোদিনেও তাই বুঝে উঠতে পারেনি মুনিয়া। কিংবা হয়তো অবচেতনেই বুঝতেও চায় না।

কিন্তু বুঝতে পারলে তাদের সম্পর্কটাও কি এমন হতো? মুনিয়া দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। সে কি কখনো মছিদা বানু হতে পারবে? কিংবা জাফর কখনো আফজাল আহমেদ?

নিচে আফজাল আহমেদের ভরাট গলার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। তিনি তার ছোট ছেলে দিপুকে ডাকছেন। রোজই ডাকেন। আফজাল আহমেদের খুব ইচ্ছে তার চার ছেলে রোজ তারসাথে ফজরের নামাজ পড়তে যাবে মসজিদে। তারপর তারা বাইরে কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করবেন। এই সময়ে তিনি ছেলেদের সাথে গুটুরগুটুর করে গল্প করবেন। সংসার, বাড়ি-ঘর নিয়ে নানান প্ল্যান-পরিকল্পনা করবেন। কিন্তু তা আর হয়ে ওঠে না। এই বিশাল একান্নবর্তী পরিবারে দৃশ্যত তার স্ত্রী মছিদা বানু ছাড়া আর কেউই তার কথায় খুব একটা গুরুত্ব দেয়না।
আফজাল আহমেদের বড় সংসার। চার ছেলে দুই মেয়ে। বড় মেয়ে লাইজু সপরিবারে থাকেন আমেরিকা। তার বয়স প্রায় পঞ্চাশের কাছাকাছি। লাইজুর পিঠাপিঠিই আশফাক। তারপর যথাক্রমে জাফর, রুবেল, সেলিনা আর দিপু। তবে এতো এতো মানুষের মধ্যেও কীভাবে কীভাবে যেন এই পরিবারের কর্ত্রী হয়ে উঠেছেন মুনিয়া। মুনিয়া এ বাড়ির মেজো বউ। সে একটা নামকরা স্কুলের প্রধান শিক্ষক। তার সামাজিক, অথনৈতিক অবস্থান যেমন ভালো, তেমনি সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা আর ব্যক্তিত্বও প্রখর। ফলে না চাইতেও খুব দ্রুতই এ বাড়ির সর্বেসর্বা হয়ে উঠেছে সে।

বড় বউ হাফসার দীর্ঘ দিনের আর্থারাইটিস। তিনি সহসা বিছানা থেকে উঠতে পারেন না। এ সংসারে অনেকটাই উহ্য হয়ে আছেন তিনি। উহ্য হয়ে আছেন বড় ছেলে আশফাক আহমেদও। আশফাক আহমেদ টাঙ্গাইল-গাজীপুরের দিকে নুরুন্নবী চৌধুরী ডিগ্রি কলেজ নামে এক বেসরকারি কলেজের বাংলা সাহিত্যের শিক্ষক। তার সাথে এ বাড়ির কারোই খুব একটা দেখা সাক্ষাৎ ঘটে না। তাদের দুই মেয়ে। বড় মেয়ে নাবিলার বিয়ে হয়েছে। ছোট মেয়ে নাদিয়া এবার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। আর কারো সাথে আশফাকের খুব একটা যোগাযোগ না থাকলেও নাদিয়ার সাথে তার মাঝেমধ্যেই যোগাযোগ হয়। তিনি গভীর রাতে চুপিচুপি বাড়ি ফিরলে নাদিয়াকে আগে ফোন করে বলেন, ‘গেটটা খোলার ব্যবস্থা করতে পারবি মা?’ নাদিয়া বলে, ‘পারবো’।
‘রাতে কিছু খাইনি। একটু খাবারের ব্যবস্থা করতে পারবি?’
‘পারবো’।
‘তরকারি কী আছে? আচ্ছা, এতোরাতে ফ্রিজের ঠান্ডা তরকারি খেতে ভালো লাগবে না।
একটা ডিম ভেজে দিতে পারবি?’
‘পারবো’।
‘সাথে দুটো মরিচ ভেজে দিস’।
‘আচ্ছা’।
বাবা কখনো না বললেও নাদিয়া জানে, আর সবার চেয়ে বাবা তাকে একটু বেশিই ভালোবাসেন। আশফাক অবশ্য মুখচোরা স্বভাবের মানুষ। খুব একটা কথা বলেন না। তবে যতটুকু যা বলেন তা ওই নাদিয়ার সাথেই। বিষয়টা নাদিয়া উপভোগও করে। বাবাকে যখনই কারো দরকার পড়ে, ছুটে আসে নাদিয়ার কাছে। যেন নাদিয়া কোন গোপন জায়গায় বাবাকে লুকিয়ে রেখেছে। বাবার জন্য একধরনের মায়াও হয় নাদিয়ার। আশফাক সেই অর্থে সংসারে খুব একটা পয়সাপাতি দিতে পারেন না। সংসারে মূল উপার্জন মেজো ছেলে জাফরেরই। তার আর মুনিয়ার আয়েই মূলত সংসার চলে। আশফাককে অবশ্য তার দুই মেয়ের পড়াশোনা আর স্ত্রীর চিকিৎসার খরচ চালাতেই হিমশিম খেতে হতো। যদিও বড় মেয়ে নাবিলার বিয়ে হয়ে যাওয়ায় আগের চেয়ে তার চাপ কিছুটা কমেছে। আমেরিকা প্রবাসী বড় বোন লাইজু অবশ্য কখনো সখনো এটা সেটা পাঠিয়ে সাহায্য সহযোগিতা করতেন। তাকে তার ছোট বোন সেলিনাকেও মাঝেমধ্যে দেখতে হয়। মাস ছয়েক হয় সেলিনার ডিভোর্স হয়েছে।

মুনিয়া বারান্দা থেকে উঠলো। এখন ঋদ্ধিকে ঘুম থেকে তুলে নিজেরও তৈরি হতে হবে। তারপর সাড়ে সাতটার মধ্যে পৌঁছে যেতে হবে স্কুলে। মুনিয়া যেই স্কুলে পড়ায়, তার নাম টুমরো’স গ্লোরি। সুবিধার মধ্যে এই যে ঋদ্ধি তার স্কুলেই পড়ে। ফলে তাকে স্কুলে আনা নেয়া নিয়ে আলাদা কোনো ঝামেলা নেই। আজ সপ্তাহের শেষ দিন। সবচেয়ে বেশি কাজ থাকে এই দিনই। মুনিয়া চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালো। ভোরের ঠান্ডা শিরশিরে হাওয়ায় খানিকটা কেঁপে উঠলো সে। তবুও হাওয়াটা বেশ ভালো লাগছে তার।

সে ঋদ্ধিকে ঘুম থেকে তুলে নিজে সময় নিয়ে গোসলটা সেরে নিলো। রাতজাগা ক্লান্তি অনেকটাই জলের একটানা শব্দে ধুয়ে গেলো যেন। তারপর বারান্দায় দাঁড়িয়ে এক কাপ
গরম চা। মুনিয়ার মনে হলো শরীরটা ভোরের হাওয়ার মতোই ফুরফুরে লাগছে। তবে
রেলিংয়ের ওপর থেকে চায়ের কাপটা সরাতে গিয়ে তার চোখ আটকে গেলো রাস্তার ওপাশে ফুটপাতের গা ঘেঁষে দাঁড়ানো দেয়ালটাতে। যেখানে গতরাতে দাঁড়িয়েছিলো রাফি। সাদা চুনকাম করা দেয়ালে এই ভোরের আলোতেও ঝলমল করছে লাল অক্ষরে লেখা চার লাইনের কবিতা। কবিতাটা গতরাতেই তাকে শুনিয়েছিলো রাফি।

‘আমি একদিন নিখোঁজ হবো, উধাও হবো রাত প্রহরে, সড়ক বাতির আবছা আলোয়, খুঁজবে না কেউ এই শহরে। ভাববে না কেউ, কাঁপবে না কেউ, কাঁদবে না কেউ একলা একা, এই শহরের দেয়ালগুলোয়, প্রেমহীনতার গল্প লেখা’।

মুনিয়া ভীষণ চমকে গেলো। হয়তো বিরক্তও হলো। এসব কখন লিখলো রাফি? কেউ দেখলে কী ভাববে! ছেলেটাকে নিয়ে আর পারে না সে। ক্ষ্যাপাটে, বুনো, খামখেয়ালি এক বাউণ্ডুলে। কে জানে, হয়তো এসব কারণেই এমন যুক্তিহীন, সমীকরণহীন অসম বয়সের এই সম্পর্কে অবচেতনেই জড়িয়ে পড়েছে সে। হয়তো রাফির এমন পাগলামি, এমন অনুনমেয় অথচ সর্বগ্রাসী আচরণই তাকে মুগ্ধ করেছে। বিরক্ত কিংবা উদ্বিগ্ন হতে গিয়েও মুনিয়া আবিষ্কার করলো, দেয়ালের ওই লেখাটা তার ভেতরে এক অদ্ভুত, অব্যাখ্যেয় আনন্দ ছড়িয়ে দিচ্ছে। সেই আনন্দ ক্রমশই তার শরীর ও মনকে ঘোরগ্রস্ত করে ফেলছে। অনেক চেষ্টা করেও এই ঘোর থেকে সে বের হতে পারছেনা। আগেও পারেনি। কে জানে, হয়তো কখনোই পারবে না।

[আসছে আরও একটি অংশ]

Share Now শেয়ার করুন