সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী | জীবনানন্দ দাশের কবিতা | মৃত্যুবার্ষিকী | প্রবন্ধ

0
91

তাঁর কবিতা যেন আমাদের জাতিগত স্মৃতিচারণ, যেন বহু কালের আমরা, এইখানে, তাঁর কবিতার মধ্য দিয়ে নিজেদের জাতিগত কণ্ঠস্বরকে প্রকাশ করতে পারছি একটি বিনম্র স্বরগ্রামে।

বাংলাদেশে যখন মুক্তিযুদ্ধ চলছিল প্রাণপণ সেই সময়টা কাব্যচর্চার পক্ষে উপযোগী সময় ছিল এ রকম বললে বাড়িয়ে বলা হবে, তবু সেই সময়ে কাব্যের চর্চা হয়েছে এবং রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ইসলাম, সুকান্ত তো বটেই, জীবনানন্দ দাশের কবিতাও এমন এক ধরনের জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে, যা তাঁদের কবিতার পূর্বতন জনপ্রিয়তার তুলনায় ভিন্ন প্রকারের। সেই সময়ে অনেক কবিতা গান হয়ে উঠেছে, গান হয়ে বার হয়ে এসেছে মুদ্রিত পুস্তকের সংরক্ষিত এলাকা থেকে; নিষিদ্ধ বেতার ও যুদ্ধের শিবিরের প্রায়-অসম্ভব সূত্র ধরে, নিপীড়নসৃষ্ট বিপন্নতা ও মুক্তির জন্য তুলনাবিরল ব্যাকুলতার সঙ্গে মিশে অনেক পরিচিত কবিতা নিজেদের আবেদন ও তাৎপর্যকে নতুনতর দিগন্ত পর্যন্ত প্রসারিত করে নিয়েছে। কবিতা থেকে অনুপ্রেরণা গ্রহণ অবশ্য এদেশে নতুন কোন ব্যাপার নয়। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল ইসলাম অনেক আগে থেকেই অনুপ্রেরণা সঞ্চার করেছেন আমাদের সমবায়ী প্রচেষ্টাসমূহে। মুক্তিযুদ্ধে সুকান্ত আসবেন এও অত্যন্ত স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু জীবনানন্দ দাশ এলেন কি করে? তিনি তো কবি নন উত্তেজনা ও অনুপ্রেরণার, সংগ্রাম ও সংঘর্ষের? বরং তিনি ভয় করেন উদ্যম ও উৎসাহকে, ভয় করেন রূঢ়ভাবে প্রকাশিত নিজেই নিজের কাছে প্রতিহত সেই অস্থির জগৎকে যেখানে আছে ‘শত শত শুকরের চীৎকার’, আছে শত শত শুকরীর প্রসব বেদনা’। জনতার কবি নন জীবনানন্দ দাশ, বরং কবি তিনি জনান্তিকের, কবি তিনি কবিদের।

কিন্তু তবু না এসে উপায় ছিল কি জীবনানন্দ দাশের? মুক্তিযুদ্ধে ক্রোধ ছিল, ছিল প্রতিহিংসার বাসনা, কিন্তু সেই সঙ্গে ছিল দেশের প্রতি, দেশের মানুষের প্রতি গভীর এক মমতা। জীবনানন্দ দাশ গভীর ভালোবাসার, সলজ্জ মমতার এবং মমতামিশ্রিত বিষণ্ণতার কবি। শুধু মমতা নয়, তাঁর কবিতা যেন আমাদের জাতিগত স্মৃতিচারণ, যেন বহু কালের আমরা, এইখানে, তাঁর কবিতার মধ্য দিয়ে নিজেদের জাতিগত কণ্ঠস্বরকে প্রকাশ করতে পারছি একটি বিনম্র স্বরগ্রামে। তাঁর পক্ষে না এসে উপায় কি? উপায় কি যুদ্ধের সঙ্গে ছায়ার মতো না থেকে?

জীবনানন্দ দাশ অবশ্যই চিত্রের কবি। সেই চিত্রের মধ্যে বাংলাদেশই প্রধান, যে বাংলার নাম দিয়েছেন তিনি রূপসী বাংলা। রূপসী, কিন্তু সোনালি নয়, সোনার নয় আদৌ। এই বাংলা জাতীয়তাবাদী নয়, অর্থাৎ আত্মসন্তুষ্ট, সঙ্কীর্ণ ও আস্ফালনকারী বাংলা নয় কোন মতেই। এ বাংলা বরং এক নম্রতার, কৃষিকার্যের এবং বলা যায় অবক্ষয়েরও যেখানে পচা শসা আছে, আছে হোগলা, আছে আঁশটের ও পেঁচার ঘ্রাণ, অথচ যার মুখ মায়ের মুখের মতো, যার সঙ্গে আমাদের যোগ প্রাণের, যোগ আবহমান কালের। জীবনানন্দ দাশ অনেক দূর দূর দেশে গেছেন, তাঁর আমি হাজার হাজার বছর ধরে হাঁটছেন, কাল পার হয়ে, পার হয়ে স্থান, পার হয়ে মিশর, ব্যাবিলন, নিনেভ, কাবেরী, জাভা, ইন্দোচীন। কিন্তু সেইসব দেশ ও কাল যেন বাংলাদেশেরই সম্প্রসারণ। যেন চিরকালের বাংলাদেশই বিস্তৃত হয়ে, ব্যাপক হয়ে, সম্প্রসারিত হয়ে গেছে নানান বিন্দুতে নানান নাম ধরে।

বলা যায় বাংলাদেশেই অনির্বাণ প্রাণটিকে ধরে এনেছেন জীবনানন্দ দাশ । ধরে এনে প্রতিষ্ঠিত করেছেন তাঁর কবিতায়, প্রতিষ্ঠিত করে প্রবহমান রেখেছেন।

কিন্তু শুধু ছবিই আঁকেননি জীবনানন্দ দাশ, শুধু ছবিই যদি আঁকতেন তবে এত বড় কবি হতেন না তিনি, প্রাণ কেড়ে নিতে পারতেন না আমাদের, আমাদের বিষয়ী ও সন্দিগ্ধ বুদ্ধিকে ফাঁকি দিয়ে। তাঁর কবিতার মধ্যে প্রাণের একটা স্বতঃপ্রবাহ ধারা আছে, অথচ যার উৎসে বা প্রবাহে উত্তেজনা নেই, নেই আস্ফালন। এ কথা মিথ্যা নয় যে, তাঁর কবিতায় যৌবন নেই, যে-যৌবন অতি প্রত্যক্ষরূপে আছে নজরুল ইসলামে, আছে সুকান্ত ভট্টাচার্যে এবং এও সত্য যে, বাইরে থেকে মনে হয় তাঁর কবিতা স্থির ছবিই, কিন্তু তার সব ছবিকে একত্র করে আছে একটা প্রাণ যা নম্র কিন্তু অনমনীয়, আছে একটা নৈয়ায়িক শৃঙ্খলা যা প্রচ্ছন্ন কিন্তু দৃঢ়। ঝড় অথবা বজ্র নির্ঘোষের রূপকার তিনি অবশ্যই নন, কিন্তু ঝড় ও বজ্র নির্ঘোষের পরিপূরক যে শান্ত পাখি, শীতের মাঠ ও বা ধানসিড়ি নদী তাদের মধ্যেও প্রাণ আছে বটে, সেই প্রাণ জীবন্ত করে রেখেছে তার সকল ছবির সমাহারকে।

বলা যায় বাংলাদেশেই অনির্বাণ প্রাণটিকে ধরে এনেছেন জীবনানন্দ দাশ । ধরে এনে প্রতিষ্ঠিত করেছেন তাঁর কবিতায়, প্রতিষ্ঠিত করে প্রবহমান রেখেছেন। একেকটি কবিতার মধ্যে অনেকগুলো কবিতা, ছবির সঙ্গে আছে টুকরো টুকরো অনুভব, আর সকল ছবিকে জড়িয়ে ধরে আছে বড় একটা আবেগ। এই আবেগের শুধু যে ধারণ করবার শক্তি আছে তা নয়, সেই সঙ্গে আছে ছবির সঙ্গে ছবিকে যুক্ত করবার, গ্রন্থিত করে তুলবার শক্তি। আছে গ্রন্থনার পথে ছবিকে ঈষৎ পরিবর্তিত করবার রাসায়নিক শক্তি। এই শক্তির জন্যই প্রত্যেকটি কবিতা জীবন্ত এবং পরস্পর পরস্পরের নিকটবর্তী হয়েও স্বতন্ত্র। আর জীবনের যে বড় গুণ অপ্রত্যাশিত তাও প্রভূত পরিমাণে আছে তাঁর কবিতায়। তাঁর শব্দ বা চিত্র কোনটাই নতুন নয়, অপরিচিত নয়, কিন্তু তাদের সমাবেশ, তাদের পারম্পর্য সম্পূর্ণ নতুন। প্রত্যেকটি কবিতা আপন ভুবনবিহারী, তারা বাইরের ধমক মানে না, মানে না বহিরারোপিত পূর্ব পরিকল্পনা। জীবনানন্দের উপাদান উপকরণকে নতুন বলা যাবে না কিছুতেই। সনাতন নিসর্গ, পুরাতন সাহিত্য, স্থবির লোকশিল্প, মৃত সভ্যতা—এসব বিষয় অনেকে অনেকবার ব্যবহার করেছেন, কিন্তু এদেরকে প্রাণবন্ত করবার, সংযুক্ত করবার এবং প্রত্যেকটি কবিতায় তাদেরকে তাদের পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্য দিয়ে নবীন ও স্বতন্ত্র জীবন দান করবার যে-সৃজনীশক্তি তা জীবনানন্দ দাশের যেমন ছিল অনেকেরই তেমন ছিল না। যেমন, তুলনার কারণে বলা যায়, ছিল না কায়কোবাদের। কায়কোবাদও সংগ্রহ করেছেন নানান জায়গা থেকে, নানান সময় থেকে, তাঁর কবিতাতে আয়োজন ও সমাবেশের অভাব নেই, কিন্তু অভাব আছে সৃষ্টির, সৃষ্টি সেখানে উপাদান-উপকরণের নীচে, আয়োজন-সমাবেশের মধ্যে চাপা পড়ে গেছে। কায়কোবাদ সম্পূর্ণ পূর্বপরিকল্পিত। তাঁর মধ্যে রাসায়নিক শক্তি ছিল না, সংযুক্ত করবার, বিদ্যুপ্রতিম শক্তি ছিল না। পুরাতনকে জীবনস্পৃষ্ট করবার।

জীবনানন্দ দাশ লিখেছেন, মানুষের ভাষা ‘অনুভূতি দেশ থেকে আলো না পেলে নিছক ক্রিয়া, বিশেষণ; এলোমেলো নিরাশ্রয় শব্দের কঙ্কাল।’ সেই আলো, সেই আভাকে প্রতিনিয়ত দেখি তাঁর নিজের লেখায়।

অথবা ধরা যাক, জীবনানন্দ দাশের প্রসিদ্ধ গুরুচণ্ডালির কথা। কায়কোবাদেও গুরুচণ্ডালি আছে, যেমন জীবনানন্দে আছে গ্রাম্য ক্রিয়াপদ, বিয়োবার মতো ‘ইতরজনোচিত’ শব্দ, সেই সঙ্গে আছে এঞ্জিন, হাইড্রান্ট, রিস্ট ওয়াচেরাও, কিন্তু কায়কোবাদে যা পীড়াদায়ক শিথিলতা, জীবনানন্দে তাই শিল্পের বিশিষ্ট সৌন্দর্য। জীবনানন্দ দাশ লিখেছেন, মানুষের ভাষা ‘অনুভূতি দেশ থেকে আলো না পেলে নিছক ক্রিয়া, বিশেষণ; এলোমেলো নিরাশ্রয় শব্দের কঙ্কাল।’ সেই আলো, সেই আভাকে প্রতিনিয়ত দেখি তাঁর নিজের লেখায় (যে-আভা আছে বলেই উপরুধৃত চরণ দু’টি গদ্যের সংগঠন সত্ত্বেও গদ্যাতিরিক্ত হয়ে উঠেছে) এবং সে-আভারই অভাব আছে কায়কোবাদে। কায়কোবাদের মৌলিক ব্যর্থতা জীবনানন্দ দাশের সাফল্যের মানদণ্ড, যদি তেমন কোন মানদণ্ডের প্রয়োজন হয়।

জীবনানন্দ দাশের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটা, বলা বাহুল্য, শুধু বাঙালিত্বের নয়, সেই সম্পর্ক মানবিক, অর্থাৎ দেশোত্তীর্ণও বটে । প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই একটা গোপন ও মানবিক বাসনা থাকে গৃহপ্রত্যাগমনের। আমরা সকলেই স্বর্গ খুঁজি, হারানো স্বর্গ, যে স্বর্গ আছে আমাদের শৈশবে, আদর্শায়িত ও নিরাপদ অতীতে। ঘরে ফেরার এই বাসনা প্রবলতর হয় সামনে যখন দেখি অপেক্ষা করছে বিপদ, উঁকি দিচ্ছে অনিশ্চয়তা, ভ্রূকুটি করছে সঙ্কট। জীবনানন্দ দাশ নিজে চেয়েছেন ফিরে যাবেন ঘরে, এবং তাঁর সেই চাওয়ার কাব্যগত রূপটিকে আমাদের সামনে এনে, তাঁর নিজ হাতে-গড়া ভুবনটিতে আমাদেরকে প্রবেশাধিকার দিয়ে আমাদের তৃপ্ত করেছেন। তার এই জগৎটা গ্রামীণ বটে, কিন্তু গ্রাম্য নয়। এ জগৎ প্যাস্টরাল কবিতার জগৎ, যেখানে সংঘর্ষ নেই, নেই বিরোধ কোন প্রকারের। চিতাবাঘ যেখানে তার হিংস্রতা হারিয়েছে, হারিয়ে একত্র বাস করছে হরিণের সঙ্গে; শুধু একত্রবাস নয়, হরিণ যেখানে ‘খেয়েছে তার আমিষী শিকারীর হৃদয়কে ছিড়ে’। (বাঘে গরুতে একঘাটে পানি খাওয়ানোতে যদি ক্ষমতার প্রকাশ থেকে থাকে, তবে সন্দেহ কি কবির এই ক্ষমতা অনেক বেশি প্রতাপাম্বিত, অনেক বেশি অঘটন ঘটনপটিয়সী।) জীবনানন্দ দাশের এই ভুবনটি আমাদের প্রতিদিনের জীবনের তুলনায় অনেক বেশি সমৃদ্ধ, অনেক বেশি সন্তোষসাধক। এই জগৎ অবকাশের, নিরাপদ জীবনের এবং অজ্ঞাতবাসের।

প্রতিদিনের জীবনকে, তার রূঢ়তাকে, তার বিরূপতাকে জীবনানন্দ দাশ অবশ্যই জানতেন। তিনি সলজ্জ মানুষ ছিলেন, অনেক চিঠি অনেককে লেখেননি, অনেক কথা বলেননি অনেকের কাছে, কিন্তু জীবিকার সমস্যা তাঁর জীবনেও ছিল যে কিছু অসত্য কথা নয়। সেই সঙ্গে নিজের দুর্ভোগের মধ্যে জানেন তিনি এই সর্বজনীন সত্য যে, যন্ত্রসভ্যতার কালে ‘মানুষ ও মেশিনের যৌথ শক্তিবলে নীলিমাকে আটকেছে, ইদুরের কলে’; জানেন ‘কলরব, কাড়াকাড়ি, অপমৃত্যু, ভ্রাতৃবিরোধ,/অন্ধকার, সংস্কার, ব্যজস্তুতি, ভয়’; জানেন কেমন করে ‘নিরাশার জন্ম হয়’। শ্রেয় ও মঙ্গলের যে-বোধ আছে তার মনে বারে বারে তা আহত, পীড়িত, রক্তাক্ত হয়ে ওঠে। সেইজন্য তিনি অন্ধকারকে চান,

হৃদয়ের অবিরল অন্ধকারের ভিতর সূর্যকে ডুবিয়ে ফেলে
আবার ঘুমাতে চেয়েছি আমি,
অন্ধকারের স্তনের ভিতর যোনির ভিতর অনন্ত
মৃত্যুর মতো মিশে থাকতে চেয়েছি

এবং তিনি ডাক দেন আমাদের সকলকে :

মরমের যত তৃষ্ণা আছে,
তারি খোঁজে ছায়া আর স্বপনের কাছে
তোমরা চলিয়া এসো
তোমরা চলিয়া এসো সব।

অন্ধকারকে চান, ভয় করেন সূর্যকে, কেননা

দেখেছি রক্তিম আকাশে সূর্য জেগে উঠে
মানুষিক সৈনিক সেজে পৃথিবীর মুখোমুখি
দাঁড়াবার জন্য
আমাকে নির্দেশ দিয়েছে

এই নির্দেশকে তিনি অমান্য করতে চান, অমান্য করে আত্মরক্ষা করতে চান, সেই জন্য অন্ধকারকে খোঁজেন, খোঁজেন আশ্রয়ের গৃহকে। প্রেম নয়, প্রকৃতিও নয়, জীবনানন্দ দাশের কবিতার প্রধান কথা হচ্ছে তাঁর ঘর খোঁজা। এবং ঘর খুঁজতে যেয়েই তিনি বাংলাদেশকে খুঁজে পেয়েছেন।

তাঁর সমসাময়িক কালের রুষ্ট বিরূপতা আছেই, সেই সঙ্গে আছে ব্যক্তিত্বকে নিয়ে, আছে মনুষ্যত্বের তথাকথিত দায়কে নিয়ে, বিপদগ্রস্ত হওয়া।

আমি অনেক দিন—অনেক অনেক দিন
অন্ধকারের সারাৎসারে অনন্ত মৃত্যুর মত মিশে থেকে
হঠাৎ ভোরের আলোর মূর্খ উচ্ছ্বাসে নিজেকে পৃথিবীর
জীব ব’লে বুঝতে পেরেছি আবার;
ভয় পেয়েছি,
পেয়েছি অসীম দুনির্বার বেদনা;

সেইজন্য তাঁর ‘সমস্ত হৃদয় ঘৃণায়-বেদনায়-আক্রোশে ভরে গিয়েছে। মাথায় চিন্তার ব্যথা/জীবন্ত কৃমির কাজ’কে তিনি অবশ্যই পরিহার করতে চান, যেমন পরিহার করতে চান সেই বিপন্ন-বিস্ময়কে যা ‘আমাদের ক্লান্ত করে/ ক্লান্ত-ক্লান্ত করে’। এই বোধের কথা জীবনানন্দ দাশের সব পাঠকই জানেন :

অর্থ নয়, কীর্তি নয়, সচ্ছলতা নয়—
আরো-এক বিপন্ন বিস্ময়
আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে
খেলা করে,
আমাদের ক্লান্ত করে,
ক্লান্ত-ক্লান্ত করে;

যা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায় লাশকাটা ঘরে, যেখানে ক্লান্তি নাই, নাই কেননা ‘চিৎ হয়ে আছি টেবিলের পরে।’

পলায়নতৎপর বললে তাঁকে আসামী করা হয়, তাঁকে খাড়া করা হয় আসামীর কাঠগড়ায়, তাই সেই নাম না দেওয়াই ভাল। কিন্তু এ সত্যে কোন মিথ্যা নেই, যে আত্মগুপ্তির জন্য তিনি অন্ধকারকে চান। এই অন্ধকার সাধারণ অন্ধকার নয়, এ আছে হৃদয়ের ভেতর, জ্ঞানের সনির্বন্ধ অন্ধকারের মতো দিবাস্বপ্নের জগতের মতো। এ অন্ধকার মৃত নয় স্তব্ধ লোষ্ট্রের মতো; এর জীবন আছে, আর আছে অবিনশ্বরতা :

উজ্জ্বল আলোর দিন নিভে যায়,
মানুষেরো আলো শেষ হয়।
পৃথিবীর পুরানো সে-পথ
মুছে ফেলে রেখা তার,
কিন্তু এই স্বপ্নের জগৎ
চিরদিন রয়!
সময়ের হাত এসে মুছে ফেলে আর সব
নক্ষত্রেরে আয়ু শেষ হয়।

কিন্তু এই অনিঃশেষ গৃহে যাবেন কেমন করে? তিনি চলে যান অনায়াসে, তাকে কষ্ট করতে হয় না, যেমন হয়েছে কীটস্কে, তার নাইটিঙ্গল কবিতায়। কষ্ট করতে হয়েছে বলেই আবেগের প্রবলতা প্রকাশ পেয়েছে নাইটিঙ্গলে। আবেগের কোন অভাব নেই জীবনানন্দে, অন্য কবিতাতে, আমাদের বক্ষমান উদ্ধৃতিসমূহে—সর্বত্র তিনি আবেগসমৃদ্ধ, কিন্তু কীটস্ যেমন করে ধাপে ধাপে অগ্রসর হয়েছেন প্রবল থেকে প্রবলতর অনুভব ও আবেগের পথ ধরে, যেমন করে ইন্দ্রয়বেদিতার এক দুঃসহ ও কেন্দ্রীভূত চাপে বিনষ্ট করেছেন নিজের মানবসত্তাকে, এক হয়ে গেছেন পাখির জগতের অন্ধকারের সঙ্গে, অনুভব ও আবেগের সেই প্রবলতা, ইন্দ্রয়বেদিতার সেই ক্রমান্বয়ে তীব্র হয়ে ওঠা জীবনানন্দ দাশে নেই। যদিও আবেগ ও ইন্দ্রয়বেদিতা পুরোপুরি আছে তাঁর কবিতাতে। এই কারণেই কীটসের মতো গাঢ় বা গভীর নয় তাঁর জগৎ। আবেগের বিচারে তিনি ইয়েটসের মতো, এলিয়টের মতো নন, যে-এলিয়টের বাক্চাতুরিতে জীবনানন্দ দাশের অনুরাগ ছিল না, যেমন অনুরাগ ছিল না ইয়েটসেরও। ইয়েট্সের কবিতার প্রভাব আছে জীবনানন্দ দাশের কবিতাতে—সেই প্রভাব একান্ত স্বাভাবিক, কেননা সাযুজ্য আছে উভয়ের প্রকৃতিতে। কিন্তু জীবনানন্দ দাশ ইয়েট্স নন। ইয়েটসে যে-অন্বেষণ আছে, আছে অতৃপ্তি, বীরত্বের প্রতি আসক্তি, জাতীয়তাবাদ ও দার্শনিকতায় আগ্রহ—জীবনানন্দ দাশে তা নেই। আর নেই আত্মবিবর্তন, যেন তিনি উর্বশীর মতো, জন্মেছেন পূর্ণ হয়ে। (তাঁর প্রথম জীবনের রচনায় অন্যের প্রভাব আছে বটে, কিন্তু সে সকল রচনা জীবনান্দনীয় নয়, জীবনানন্দীয় রচনায় স্বরূপ প্রায় অবিচলভাবে অপরিবর্তিত।) কীটস্‌কে যেমন করে ফিরে আসতে হয়েছিল নাইটিঙ্গলের জগৎ থেকে, জীবনানন্দ দাশকেও তেমনি ফিরে আসতে হয় মাঝে মাঝে, আসতে হয় তুলনায় স্থূলতর কারণে। ‘ভোরের আলোর মূর্খ উচ্ছ্বাস’ হঠাৎ এসে হানা দেয়, আর সেই আলো শুধু বহির্জগতের নয়, শুধু সম-সাময়িক কালের নয়, সেই আলো ব্যক্তিগত বোধ ও বুদ্ধিরও বটে।

জীবনানন্দে ওজস্বিতা নেই। ওজস্বিতা আসে বিরোধ থেকে, জীবনানন্দ দাশে বিরোধ নেই। তাই বলে গাড়লের মতো স্থূল যে বহির্জগৎ তাকে তিনি মেনে নেননি। তাকে জয় করেছেন, যেমন করে বাংলাদেশের প্রকৃতি জয় করে নিয়েছে বহিরাগত মানুষকে, মানুষের কীর্তিকে। ওজস্বিতার অভাব ঋণাত্মক বিষয়; ধনাত্মক দিকে আছে কোমল ও নম্র শব্দের ব্যবহার, আছে তাঁর ক্রিয়াপদসমূহে ক্রিয়াবিমুখতা। আবেশ, আহলাদ, আলস্য, অবসন্ন, নরম, কুড়েমি, ক্লান্ত, ধূসর—এই ধরনের শব্দ তাঁর কবিতায় ঘুরে ঘুরে আসে। এমনকি যখন ক্ষোভ প্রকাশ করতে চান, অথবা ক্রোধ, তখনও তাঁর স্বরগ্রাম উঁচু হয় না, কর্কশ হয়ে ওঠে না কিছুতেই। ‘হলুদ-দু’ ঠ্যাং তুলে নেচে রোগা শালিখের মতো যেন কথা বলে চলে তবু জীবন’, এই কথার মধ্যে জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণা প্রকাশ পেয়েছে নিশ্চয়ই, কিন্তু হলুদ দু’-ঠ্যাং তুলে-নাচা রোগা শালিখের সঙ্গে জীবনের তুলনায় জীবনের মধ্যকার রূঢ় ভাবটা স্পষ্ট হয় না, বরং কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ে, বিশেষ করে এই জন্য যে, শালিখের হলুদ ঠ্যাং ও ঠ্যাং-এর নৃত্য অন্যত্র ব্যবহৃত হয়েছে প্রীতিপ্রদ অনুসঙ্গে।

বস্তুত দূরত্ব সৃষ্টি তাঁর কাব্যসৃষ্টির অন্যতম বৈশিষ্ট্য, সেইজন্য দ্বীপ ও নাবিক তাঁর প্রিয় উপমা, সেইজন্য অতি পরিচিত বস্তু তাঁর হাতে পড়ে দূরবর্তী হয়ে দাঁড়ায়, তাঁর পৃথিবী কখনো দ্বিমাত্রিক থাকে না, তাতে প্রসারতার তৃতীয় মাত্রা সকল সময়েই যুক্ত হয়ে যায়।

শুধু প্রচ্ছন্ন নয়, তুলনা বিষয়কে দূরবর্তীও করে – অনুরাগের ক্ষেত্রে যেমনি বিরাগের ক্ষেত্রেও তেমনি। ‘সৌন্দর্য রাখিবে হাত অন্ধকার ক্ষুধার বিবরে’, এই পঙক্তিতে ক্ষুধা আমাদের অতি নিকটের অভিজ্ঞতা, অন্ধকার এবং হাতও তা-ই, কিন্তু ক্ষুধা যখন বিবর হল, হল অন্ধকার, হয়ে স্পর্শ পেল সৌন্দর্যের, তখন সে আর অতি নিকটের রইল না, দূরে সরে গেল অনেকটা। ‘নীলিমাকে আটকেছে ইদুরের কলে’, এই পঙক্তিতে আকাশ ইঁদুরে পরিণত হয়েছে সত্য, কিন্তু পরিণত হয়ে সে কাছে এগিয়ে আসেনি। নালি ঘায়ে তাজা ন্যাকড়া ঢোকার অভিজ্ঞতা অন্য কেউ যদি বর্ণনা করতেন তবে শিউরে উঠতাম হয়ত, হয়ত দুঃসহ হত শ্রবণের অভিজ্ঞতা, কিন্তু জীবনানন্দের ‘তাজা ন্যাকড়ার ফালি সহসা ঢুকেছিল নালি ঘায়ে’ এই লাইনে শিউরে-ওঠা নেই, এতে নেই দুঃসহতা। দার্শনিক কান্ট যে বলেছেন, দূরের জিনিস ভয়াবহ হলেও সুন্দর, সেই তত্ত্বের সত্য জীবনানন্দ দাশের বিরাগের পঙক্তিতে প্রমাণিত হয়। বস্তুত দূরত্ব সৃষ্টি তাঁর কাব্যসৃষ্টির অন্যতম বৈশিষ্ট্য, সেইজন্য দ্বীপ ও নাবিক তাঁর প্রিয় উপমা, সেইজন্য অতি পরিচিত বস্তু তাঁর হাতে পড়ে দূরবর্তী হয়ে দাঁড়ায়, তাঁর পৃথিবী কখনো দ্বিমাত্রিক থাকে না, তাতে প্রসারতার তৃতীয় মাত্রা সকল সময়েই যুক্ত হয়ে যায়। নগরের কথা তাঁর কবিতায় আছে, কিন্তু সেই নগর সমর সেন-এর স্পষ্ট নগর নয়, সে-নগর নিকটের হয়েও দূরবর্তী।

সামাজিক তথা পাবলিক বিষয়বস্তু নিয়ে তিনি অনেক কবিতা লেখেননি, লেখা স্বাভাবিক ছিল না তাঁর পক্ষে; এবং যখন লিখেছেন তখন সেই কবিতার গান্ধী বা চিত্তরঞ্জন আমাদের পরিচিত মানুষ থাকেন না, তাঁরা ইতিহাসের, বলা যায় ঐতিহাসিক রূপকথার অংশ হয়ে দাঁড়ান। গান্ধী যেন সময়ের অমেয় আঁধারে/জ্যোতির তারণকণা’, যেন ‘অন্তঃশীলা করুণা-প্রসারিত হাতের মতো’, যেন তিনি নচিকেতা বুদ্ধদেব/ঈশা’। পৃথিবীর পতিতকে (শুধু ভারতবর্ষের নিপীড়িত মানুষকে নয়) তিনি ভালোবাসেন ‘গভীর নারীর চেয়ে অধিক গভীরতর ভাবে’। গান্ধী চলেছেন যাত্রী হিসাবে, জীবনানন্দের গভীর ও প্রসারিত পৃথিবীর ভেতর দিয়ে।

 

 

Share Now শেয়ার করুন