সিলভিয়া স্বর্ণা >> আফগান শিল্পী শামসিয়া হাসানি : সবার দৃষ্টি এখন তাঁর গ্রাফিত্তির দিকে >> শিল্পকলা

0
376

আমি আফগানিস্তানের মানুষজনের কাছে শিল্পকে তুলে ধরতে চাই, কারণ আমাদের এখানে শিল্পসংগ্রহশালা নেই, প্রদর্শনীও হয় না, কিন্তু এটাই উত্তম পন্থা, আমি তাদেরকে ছবি দেখাতে পারছি। আমার শিল্পকর্ম দিয়েই আমি মানুষের মনকে বদলে ফেলতে পারবো।

মগ্র বিশ্ববাসীর দৃষ্টি এখন আফগানিস্তানের দিকে। সেই সঙ্গে নেটিজেন আর শিল্পী-লেখকরা লক্ষ্য করছেন, সে-দেশে কি শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার স্বাভাবিক সুযোগ থাকবে নাকি রুদ্ধ হয়ে যাবে এইসব কর্মকাণ্ড? সংস্কৃতিকে কি নিয়ন্ত্রণ করবে রাষ্ট্র ও ধর্মীয় অনুশাসন, নাকি উন্মুক্ত থাকবে এর চর্চা ও বিকাশ?

এরকম ভাবনার মধ্যেই ইতিমধ্যে আফগানিস্তানের একজন শিল্পী – যাকে বলা হয় গ্রাফিত্তি শিল্পী – শামসিয়া হাসানি – বিশ্বমিডিয়া ও নেটিজেনদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তাঁর গ্রাফিত্তির ছবি এখন ভাইরাল হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে।

হাসানির জন্ম ১৯৮৮ সালে। তিনিই আফগানিস্তানের প্রথম নারী গ্রাফিত্তি শিল্পী। তাঁর ছবির মূল বিষয়বস্তু বা ফোকাসটা হচ্ছে আফগান নারী। আফগান নারীদেরকে তিনি দিচ্ছেন সেই সাহস আর শক্তি যার সঙ্গে তাঁদের সক্ষমতা, উচ্চাকাঙ্ক্ষা, লক্ষ্য অর্জনের বিষয়গুলি যুক্ত। তাঁর গ্রাফিত্তির নারীরা এমন মানুষ, যে নারী হিসেবে গৌরব বোধ করে, উচ্চকণ্ঠ, আর পরিবর্তন আনতে সক্ষম। সাম্প্রতিক তালেবান-পূর্ব আফগানিস্তানে তাঁর কাজ আফগানিস্তানের নারীদের মধ্যে বিপুল সাড়া জাগিয়েছে – সেই সাড়া রঙে-রেখায় সমাদৃত। দেশটির নারীরা তাঁর কাজে ভীষণ উদ্দীপ্ত বোধ করে। শুধু আফগানিস্তান নয়, সারা পৃথিবীর নারীদের মধ্যে জাগিয়ে তুলেছে নতুন আশা। তাঁর আয়োজিত গ্রাফিত্তি প্রদর্শনী, চিত্রকলার ক্লাস, নানান উৎসবে অংশগ্রহণ – শত শত আফগান শিল্পীকে দিয়েছে সৃষ্টিশীলতার নতুন প্রেরণা। বিশ্বের কাছে পৌঁছে গেছে আফগান শিল্পীদের কাজ। একটি অনুশাসিত সমাজেও যে শিল্পের বিকাশ হতে পারে, হাসানি সেটা দেখিয়ে দিয়েছেন।

এখানে তাঁর কাজ সম্পর্কে বিশ্বের প্রথম শ্রেণির কয়েকটি পত্রিকার মন্তব্য তুলে ধরছি :

লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমস্
ঝুকি থাকা সত্ত্বেও শিল্পী শামসিয়া হাসানি আফগান নারীদের দিচ্ছেন ভিন্ন স্বর

শামসিয়া একজন চিত্রশিল্পী। তিনি কাবুল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। আফগানিস্তানের রাস্তাগুলোকে নতুনভাবে আবিষ্কার করেছেন। বোমার আঘাতে বিধ্বস্ত পরিত্যক্ত দেয়ালে দেয়ালচিত্র আঁকেন তিনি। এই চিত্রগুলির বিষয়বস্তু হচ্ছে প্রাণবন্ত উচ্ছ্বল নারী, সনাতন পোশাকেই যেন সে মুক্তির আনন্দে উড়ছে, পটভূমিতে আছে সংগীতের প্রতীকচিহ্ন।

হ্যামার মিউজিয়াম
`সিক্রেট’ নামের সিরিজ চিত্রকর্মে বোরখা পরা নারীকে প্রাধান্য না দিয়ে ওই পোশাকের আড়ালে থাকা নারীদের শক্তি আর মানবতার প্রতিমূর্তিটি তুলে ধরেছেন শামসিয়া।

হাফিংটন পোস্ট
তাঁর কাজের মধ্য দিয়ে শামসিয়া আফগানিস্তানকে ভিন্নভাবে দেখার সূচনা করেছেন। এই দৃষ্টি শুধু যুদ্ধ আর সন্ত্রাসই দেখায় না, সৌন্দর্য আর শিল্পকেও দেখায়। শামসিয়া বলেছেন, “আমি মানুষের বিরূপ যুদ্ধস্মৃতিকে রঙ দিয়ে ঢেকে দিতে চাই।”

দি গার্ডিয়ান
২০০৫ সালে তিনি যখন আফগানিস্তানে ফিরে আসেন, মানুষের মনে যে নেতিবাচক যুদ্ধকালের শারীরিক উপস্থিতির স্মৃতি আছে তাঁকে মুছে দেয়ার সংকল্প গ্রহণ করেন। তিনি বলেছেন, “আমি আফগানিস্তানের মানুষ, যে-দেশটি যুদ্ধ-সংঘাতের জন্যে খ্যাত। আসুন, এই বিষয়টি বদলে ফেলি, আসুন শিল্পের মাধ্যমে শান্তি স্থাপন করি।”

ফ্লরেন্স বিয়েনিয়াল
এই শিল্পী সিভিল সোসাইটিতে নারীর গুরুত্ব ও ভূমিকা সম্পর্কে যেমন সচেতন, তেমনি সচেতন শান্তির মূল্যবোধ, সংহতি আর সৃজনশীলতার বিশ্বজনীন মুক্ত প্রকাশে।

ভাইস
“অনেকে মনে করেন, ইসলাম চিত্রশিল্পকে অনুমোদন দেয় না। তারা মনে করেন আমার এই ধরনের কাজ করাটা বন্ধ করা উচিত। কেউ কেউ তো আমাকে লক্ষ করে আজেবাজে কথা বলে, কটুক্তি করে।” কিন্তু এতকিছুর পরও শামসিয়ার দৃষ্টি পর্যবেক্ষকের দৃষ্টি, চারপাশের সব কিছুই তিনি গভীরভাবে লক্ষ করেন।

ভয়েস অব আমেরিকা
“আমি আফগানিস্তানের মানুষজনের কাছে শিল্পকে তুলে ধরতে চাই, কারণ আমাদের এখানে শিল্পসংগ্রহশালা নেই, প্রদর্শনীও হয় না, কিন্তু এটাই উত্তম পন্থা, আমি তাদেরকে ছবি দেখাতে পারছি। আমার শিল্পকর্ম দিয়েই আমি মানুষের মনকে বদলে ফেলতে পারবো।”

উপসংহার
এই মুহূর্তে শামসিয়া কোথায়? কেমন আছেন তিনি? আগের মতো কি তিনি এই গ্রাফিত্তি করতে পারবেন? এসব এখন বেশ গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। উত্তরগুলি হয়তো আমরা ধারণা করতে পারি, কিন্তু ঠিক ঠিক বলাটা সহজ নয় হয়তো।

শামসিয়া হাসানির গ্রাফিত্তি

দেখুন হাসানির বেশ কিছু গ্রাফিত্তি। এগুলি ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে গেছে। এখানে বলে রাখা প্রয়োজন এর সবই আঁকা হয়েছে আফগানিস্তানের সাম্প্রতিক পটপরিবর্তনের আগে।

এই লেখাটা সম্পর্কে মন্তব্য করতে চাইলে আমাদের ফেসবুক ক্লিক করে মন্তব্য করুন >> Teerandaz Antorjal তীরন্দাজ Teerandaz

Share Now শেয়ার করুন