সুধা অরোরা >> তৃতীয় মেয়ের নামে – এই ঠান্ডা, হিম, শুকনো, নিষ্প্রাণ >> ছোটগল্প >> তর্জমা : মিতা দাস

0
389

সুধা অরোরা >> তৃতীয় মেয়ের নামে – এই ঠান্ডা, হিম, শুকনো, নিষ্প্রাণ

সুনয়না আজ তুই যদি থাকতিস তো নিজের আঠাশতম বসন্ত দেখতে পারতিস।
সেদিন আমার ঘরের বাইরে ছিল বসন্ত আর ভেতরে… এমন কতগুলি মুখ, যারা এই বসন্তকে ঝরাপাতা করে তুলতে চায়। ভয়, আতঙ্কিত মুখ… সেই মুখগুলিতে মৃত্যুর ছোঁয়া। করুণাভরা চোখ, কুঁকড়ে যাওয়া দেহ… যেন ওরা আমার তৃতীয় মেয়ের জন্মের জন্যে নয়, মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করতে এসেছে ।
সেই নিষ্প্রাণ চেহারাগুলি তোর অজানা, তুই আমার দেহের পাশেই ঘুমিয়ে রয়েছিস শান্তভাবে। তুলোর মতো নরম আর নিজের ফুলের মতো মুখ নিয়ে তুই আস্তে আস্তে বন্ধ চোখ দুটি খুললেই তোর মুখে হাঁসি ফুটে উঠল। কী সুন্দর মুখখানি – ঝলমল করছে। তোর চোখ দুটি নীল। আমি তোর নাম দিলাম… সুনয়না।
তক্ষুনি বুড়ি পিসিটা দৌড়ে ঘরে ঢুকতেই খুশিতে চিৎকার করে বলে উঠল… “কেমন ফর্সা – টুকটুকে সুন্দর শিশু গো ! হায় আমার সোনা, আমার নজর না লেগে যায় আবার।”
যেই বুড়ি পিসি তোর গায়ের চাদরখানি সরালো, তখনি ওনার মুখটা চুপসে গেলো। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তোর চামড়া কোঁচকানো দেহের ঠিক দুই উরুর মাঝে একটি থাপ্পর দিয়ে বললো, “হায় রে কপাল! আবার কন্যা সন্তান? স্রষ্টার কাছে কি মাটি কম ছিলো?” আমি বেশ জ্জায় পড়ে গেলাম, জন্ম নিতে-না নিতেই তোকে নগ্ন করা হচ্ছিলো। আমি আর সহ্য করতে না পেরে তোর গায়ের সরানো চাদরখানা দিয়ে আবার তোর গাটা ঢেকে দিলাম। তোর গা ঢেকে দিয়ে আমি তোর সন্মান ফিরিয়ে দিচ্ছিলাম ।
“পিসি এমন কথা বোলো না! ও আমার মেয়ে আবার ছেলেও! ছেলে হলেও যতটা কষ্ট ভোগ করতে হয়, মেয়ের বেলায়ও ততটাই। কষ্ট ও রক্তপাত সমানই ঘটে।”
“মেয়েরা তো মেয়েই হয়, ছেলের মতো তৈরি করার চেষ্টাও করোনা যেন।” বুড়ি পিসি একটি ব্যাঙ্গাত্মক হাসি দিয়ে ফিরে গেল । আমিও ঠান্ডা, শক্ত মুখটা থেকে চোখ সরিয়ে তোকে নিজের কাছে টেনে নিলাম ।
আমার গায়ের ছোয়াঁয় তুই খিলখিল করে উঠলি, তুই হাত-পা ছুঁড়ে খেলতে শুরু করলি। তারপর তুই মাটিতে হাঁটি-হাঁটি পা-পা করে বেড়ালি, নাচলি, কথা বললি… প্রথম শব্দ তোর মুখ থেকে ফুটলো – ‘মা’। এই শব্দটা শুনে আমিও মেতে উঠলাম খুশিতে। তুই ব্যাগ কাঁধে তোতলা মুখে গানেরও সুর ধরলি, নাচলি। এইসব নিয়ে তুই যে কখন সাত বছরে পা দিলি, বোঝাই গেলো না।
তারপর একদিন তুই যখন স্কুল থেকে ফিরলি, তখন তোর মুখ আতঙ্কে ভরা.. “মা, বাসের কন্ডাক্টারটা আমার এখানে ছুঁয়ে তারপর হেঁসে উঠলো, আমার ওকে দেখে বেশ ভয় হয়।” সেই ছোট্ট বয়সেই আমি তোকে বড় বড় মেয়েদেরকে দেয়া সব জ্ঞান দিয়ে শিক্ষিত করে তুললাম । তারপর সেই দিন থেকেই তুই বেশ চৌকস থাকতে লাগলি। তারপর থেকে নিজের সব ভালোমন্দ বুঝে নিতে পারতিস। প্রত্যেক বয়সের ছেলেদের থেকে কিভাবে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখবি, সেই দিকটাতে তুই বেশ চৌকস হয়ে উঠলি।
তুই দিন-দিন বড় হতে হতে বেশ বুঝদার হয়ে উঠলি । তুই ক্লাসে ফস্ট হয়েছিস, স্কুলের রেস কম্পিটিশনে পুরস্কার পেলি। তোর ঘরটা পুরস্কারের শীল্ড-কাপ আর মেডেলে ভরে উঠল। এখন তুই নিজের খেয়াল আর নিজেকে কীভাবে রক্ষা করতে হয়, বেশ ভালো করেই বুঝে গেছিস। লোকের টিটকিরি আর কৌতুককে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে অগ্রাহ্য করা, ভীড়ের মধ্যে নিজের কনুইয়ের ব্যবহার – এসবও শিখে নিয়েছিলি।
তুই আরো বড় হলি, তুই এখন স্বপ্নে মগ্ন, হাওয়ায় উড়ু উড়ু মন । তোর এক সহপাঠীকে তোর বেশ মনে ধরল। তোদের স্বপ্নও এক, খুশিও এক, কিন্ত ধর্মতো এক্কেবারেই আলাদা। সবাই তোকে বোঝাতে আরম্ভ করলো – কখনো রেগে, কখনো চোখের জল ফেলে, কখনো মমতার ওছিলায়। কিন্ত ধর্মের দেয়াল বেশ উঁচু। সবাই বোঝানোর পর তুই নিজেই বুঝে নিলি। কারণ, তুই যে বেশ বুঝদার! তুই অন্তরে আঘাত পেলি কিন্ত নিজেকে নিজেই বুঝিয়ে নিজের জীবনের পথে এগিয়ে গেলি। সময়ই তোর সব জখমের ওষুধ হয়ে উঠলো। নিজের জীবনের ছেঁড়া টুকরোগুলি জড়ো করে আবার নিজের পায়ে উঠে দাঁড়ালি। বড়-বড় সব ডিগ্রি নিয়ে উপলব্ধি করলি আর এমন সব কাজ করলি যা কোনো ছেলেও কক্ষনো করতে পারতো না । নিজের স্বপ্নের শীর্ষে পৌঁছোবার দরুন তুই পেলি আবার তোর মনের মতো আরেক রাজকুমারকে। সে-ও তোরই মতো স্বপ্নের শীর্ষে পৌঁছতে উদগ্রিব, সে চাঁদ-তারা ও নক্ষত্রের কথা বলত। ওরও স্বপ্ন ছিল বেশ উঁচু, সে-ও তোরই মতো পায়ের গোড়ালি উঁচু করে আকাশ ছোঁয়ার চেষ্টায় থাকতো সর্বক্ষণ।
নিজের ছেলের মতো মেয়ে, মানে তোকে রঙিন সোনার জরি বসানো লাল শাড়িতে মুড়িয়ে বিয়ে দিলাম। চোখ দুটো জলে ভোরে এলো তোকে তোর রাজকুমারের সঙ্গে বিদায় দিতে গিয়ে। সেটাই ছিল কিন্তু তোর জীবনের শেষ দুর্ঘটনা। হ্যাঁ, দুর্ঘটনাই বলবো। সেই রাজকুমার তোর গলায় মঙ্গলসূত্র পরিয়ে তোর স্বামী হয়ে গেলো। সে আর তোর স্বপ্নের রাজকুমার হয়ে রইলো না, স্বামী হয়েই থেকে গেলো।
সে তোকে মইয়ের মতো ব্যবহার করে উঁচু, আরো উঁচুতে চড়ে বসল। তারপর সে সেই শীর্ষে উঠে পেছন ফিরে দেখার কথাও মনে আনাটা পছন্দ করতো না। তুই কেন নিজের হাত ওর দিকে এগিয়ে দিলি? সে তো আকাশে পা দিয়ে এগিয়ে চললো আর তোকে রান্নাঘরে বন্দি করে রাখতে চাইলো। যেন তুই সেই রান্নাঘরের একটামাত্র জানালা দিয়ে একচিলতে আকাশও দেখতে না পাস। সে তোকে বন্দি করে রাখতে চাইলো কিন্তু তুই প্রতিবাদ করলি। কেন প্রতিবাদ করলি? মরণ হলো তোর। সে তোকে তালা দিয়ে আটকে রাখলো। কিন্ত তুই ভয় পাসনি, তুই সেই বন্দিশালা থেকে বেরুবার পথের খোঁজ করতে করতে নিজের গলার আওয়াজ বন্ধ দরজার বাইরে পৌঁছনোর সাহস করে ফেললি। এই অপরাধের শাস্তি তোর তো পাওনা ছিল। নিজের স্বামীর চেয়ে বেশি উঁচুতে ওঠার চেষ্টার শাস্তি! নিজের স্বামীর কাছে বিদ্রোহ করার শাস্তি! নিজের স্বপ্নগুলোকে সত্যি করার ইচ্ছেগুলোর জন্যে শাস্তি তো তোকে ভোগ করতেই হবে, তাই না? নিজের বন্দিশালা হতে বাইরের জগৎ অব্দি সুড়ঙ্গ খোঁড়ার শাস্তি! সে এরপর তোর উপর জুলুম করা শুরু করল। তোর বাইরের জগতের সব যোগাযোগ ছিন্ন করে দিল। তোকে পাহারায় রাখল। নিজের ঘরে বন্দি অবস্থায় তোর দম বন্ধ হয়ে এলো। তুই এক দিন এই সব যন্ত্রণা আর সহ্য করতে না পেরে বিষ পান করলি। কিন্ত তোর মরণ হল না। তোর কপালে আরো আয়ু ছিল তাই বেঁচে গেলি। একেই বলে নিয়তি। কিন্তু এই নতুন জীবন তোর জীবনে নতুন জোয়ার এনে দিলো। এই নতুন জীবনে নতুন করে বেঁচে থাকার আর লড়ে যাওয়ার মনোবল খুঁজে পেলি। তুই নিজের পায়ের তলার মাটিটাকে বেশ ভালো করে চিনতে চেষ্টা করলি। সফলও হলি। সেই মাটিতে পা রেখে তোকে হাঁটতে হবে নিজের ভাগের আকাশটাকে মুঠোবন্দি করতে, তুই সেই আকাশ ধরতে মনস্থ করলি।
এখন এছাড়া আর কোনো পথ খোলা রইলো না। তোর আওয়াজ সেই বন্দিশালা থেকে বাইরে বেরিয়ে আসার আগেই সে তোর ডানা দুটি খামচে ছিঁড়ে ফেললো। নক্ষত্র ছোঁয়ার আশায় তোর বাড়ানো হাত দুটিকে সে কেটে জ্বলন্ত আগুনের চুল্লিতে ফেলে দিল। যত প্রবলভাবে সেই আগুন জ্বলে উঠেছিল, তার চেয়ে দ্বিগুণ বেগে সেই আগুন নিভেও গেলো।
‘হার অ্যাম্বিশন্স লেড টু হার ডেথ!’ তৃতীয় দিন খবরের কাগজের হেডলাইনে ছিল যে তোর স্বামী তোর প্রথম প্রেমিককে বরদাস্ত করতে না পেরে রাগে অন্ধ হয়ে তোকে কুচি কুচি করে ফেলেছে। কত নরমসরম হয় মেয়েদের চরিত্র, সুনয়না! সেই চরিত্রকে পা দিয়ে মাড়াতে কারুর একমিনিটও লাগে না। সমাজও মাড়াতে দ্বিধা বোধ করে না। এই সব কাণ্ড ঘটে যাওয়ার পর তোর জন্য লোকেদের মনে সামান্য সহানুভূতি থাকলেও তা শান্ত হয়ে গেল। সবাই বলে উঠলো, তুই নিজেই নিজের মৃত্যুর কারণ হয়ে উঠেছিলে! তুই কেন নিজের পাখা মেলে আকাশের গভীরতা মাপার চেষ্টা করতে গেলি? ঘরের পাঁচিল ডিঙিয়ে পার হবার তুই বার বার চেষ্টায় মেতে ছিলি, তোর কাছে কোথা থেকে এতো বিকল্প এসে হাজির হতো বোঝা মুশকিল! তুই সর্বক্ষণ স্বামীর ঘেরাটোপে বন্দি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ফন্দি নিয়ে ব্যস্ত থাকতি। তোর মৃত্যুর জন্যে তোর স্বামীর চেয়ে তুই নিজেই বেশি দায়ী। তোর এই শাস্তি তো শতাব্দীর শুরুতেই নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল। এবার বল, এই নিয়তিকে কী আর বদলানো যায়?
বার বার তোর দেহের পোস্টমর্টেম করা হল… আগুনে পুড়ে যাওয়া দেহে লেগে থাকা তোর মাথার সোনালি চুলের সঙ্গে তোর ছবির চুলের কোনো মিল আছে কিনা, সেটাও মিলিয়ে দেখলো। তোর সেই চুলগুলি ওরা কেমিক্যাল দিয়ে পুরো এক মাস সুরক্ষিত রাখা দেহের সঙ্গে সুরক্ষিত রেখেছিল। তোর আধপোড়া অঙ্গগুলি আজ চিতায় তুলতে যাচ্ছি, সোনালি জরির লালপেড়ে শাড়ি দিয়ে মোড়ানো তোর মরদেহ মনে হচ্ছিল যেন কোনো সতীর দেহ। কারণ, তোর স্বামী জীবিত ছিল তাই তোর দেহকে ওরা ঠিক সধবার মতো সাজিয়ে-গুছিয়ে চিতায় তুলছিল, সুনয়না! আমি ভাবছিলাম কী রাখি তোর চিতার উপর? ছিল শুধু ঠান্ডা, মৃত কিছু শব্দ… কিন্তু সেগুলি এখন তোর কোনো কাজেই লাগবে না!
শব্দ , শুধু শব্দ… এ দেশের আইনকে বদলে দিতে পারে না! শব্দ কখনই হতে পারে না ফাঁসির দড়ি। এই দড়ি কোনো হত্যাকারীর গলাতেই পরানো যাবে না ।
সাদা কাগজে কালো কালি দিয়ে লেখা সেই অক্ষরগুলিই রাখছি তোর চিতার উপর! এই অক্ষরগুলি শুকনো পাতার মতো তোর চিতায় বাতাস হয়ে অগ্নিপ্রজ্বলনকে আরো প্রজ্বলিত করবে আর নিভে আসা ছাইয়ের ভেতরে স্ফুলিঙ্গ হয়ে থাকবে। তোর চিতার সঙ্গে বিলীন হয়ে যাবে সেই শব্দগুলিও! হাওয়ার ভেতরে হাওয়া, অগ্নির ভেতরে অগ্নি, জলের ভেতরে জল, আকাশের ভেতরে আকাশ, মাটির ভেতরে মাটি হয়ে মিশে যাবে। সব ধোঁয়া হয়ে যাবে। শুধু থেকে যাবে একমুঠো ছাই।
কিন্তু আদুরে মেয়ে! তুই কক্ষনো নিজে হাত পেতে কিছুই চাইবি না। যে তোকে তৈরি করে এই পৃথিবীতে জন্ম দিয়েছেন, সে তোকে জন্ম দেয়ার পর যা-যা ভুল করেছিলেন, আরেকবার জন্ম দেয়ার সময় যেন শুধরে নেন!
না রে না… তুই তো আবার সেই পুরানো জন্মই চাস। আমি জানি তুই সেই মেয়ে হয়েই জন্মাতে ভালোবাসবি! বার বার মেয়ে হয়েই জন্মাতে চাইবি। একশো বছর ধরে মেয়েই হতে থাকবি, সে আমার জানা। যত দিন অব্দি তুই নিজের ভাগের আকাশটাকে পাবি না, মেয়ে হয়েই জন্ম নিতে থাকবি। তোর নিজের জমি, তোর নিজের ভাগের আকাশ। সব শুধু তোর নামেই হবে।
সুধা অরোরার জন্ম লাহোরে ১৯৪৮ সালে। গল্পকার, কবি, চলচ্চিত্র আর দূরদর্শনের স্ক্রিপ্ট লেখক। উচ্চশিক্ষা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। এরপর একই বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই কলেজে শিক্ষকতা করেছেন। সাহিত্যের ক্ষেত্রে তার অবদান উল্লেখযোগ্য। অর্জন করেছেন মহারাষ্ট্র হিন্দি সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার, মুন্সী প্রেমচন্দ্র সম্মাননা, মীরা স্মৃতি সম্মাননা, ইত্যাদি।

Share Now শেয়ার করুন