সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও রফিক আজাদের কবিতা >> ইংরেজি অনুবাদ : হাসনাত আবদুল হাই

0
65

কেউ কথা রাখেনি
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
(১৯৩৪-২০১২)

কেউ কথা রাখেনি, তেত্রিশ বছর কাটলো, কেউ কথা রাখেনি
ছোটবেলায় এক বোষ্টুমি তার আগমনী গান হঠাৎ থামিয়ে বলেছিল
শুক্লা দ্বাদশীর দিন অন্তরাটুকু শুনিয়ে যাবে
তারপর কত চন্দ্রভুক অমাবশ্যা চলে গেল কিন্তু সেই বোষ্টুমি
আর এলো না
পঁচিশ বছর প্রতীক্ষায় আছি।

মামাবাড়ির মাঝি নাদের আলি বলেছিল, বড় হও দাদাঠাকুর
তোমাকে আমি তিনপ্রহরের বিল দেখাতে নিয়ে যাবো
সেখানে পদ্মফুলের মাথায় সাপ আর ভ্রমর খেলা করে।
নাদের আলি, আমি আর কত বড় হবো? আমার মাথা এই ঘরের ছাদ
ফুঁড়ে আকাশ স্পর্শ করলে তুমি আমায়
তিনপ্রহরের বিল দেখাবে?

একটাও রয়্যাল গুলি কিনতে পারিনি কখনো
লাঠি- লজেন্স দেখিয়ে চুষেছে লস্করবাড়ির ছেলেরা
ভিখারীর মতন চৌধুরীদের গেটে দাঁড়িয়ে দেখেছি
ভিতরে রাস-উৎসব
অবিরল রঙের ধারার মধ্যে সুবর্ণ কঙ্কণ পরা ফর্সা রমণীরা
কতরকম আমোদে হেসেছে
আমার দিকে তারা ফিরেও চায়নি!
বাবা আমার কাঁধ ছুঁয়ে বলেছিলেন, দেখিস, একদিন, আমরাও…
বাবা এখন অন্ধ, আমাদের দেখা হয়নি কিছুই
সেই রয়্যাল গুলি, সেই লাঠি-লজেন্স, সেই রাস-উৎসব
আমায় কেউ ফিরিয়ে দেবে না!

বুকের মধ্যে সুগন্ধি রুমাল রেখে বরুণা বলেছিল,
যেদিন আমায় সত্যিকারের ভালবাসবে
সেদিন আমার বুকেও এরকম আতরের গন্ধ হবে!
ভালোবাসার জন্য আমি হাতের মুঠেয়ে প্রাণ নিয়েছি
দূরন্ত ষাঁড়ের চোখে বেঁধেছি লাল কাপড়
বিশ্বসংসার তন্ন তন্ন করে খুঁজে এনেছি ১০৮টা নীলপদ্ম
তবু কথা রাখেনি বরুণা, এখন তার বুকে শুধুই মাংসের গন্ধ
এখনো সে যে কোনো নারী।
কেউ কথা রাখোনি, তেত্রিশ বছর কাটলো, কেউ কথা রাখে না!

No one kept words
Sunil Gangopadhyay
(1934-2012)

No one kept words, thirty years have gone without keeping words
When I was a child a Bostumi stopped singing and told me she will come back to sing the antara of the song during shukla dadoshi.
Since then countless moon-eclipsing dark for night has passed
She did not come even once
I have been waiting for twenty five years.
Nader Ali, the boatman who worked at my maternal uncle’s house, told me,
‘Elder brother, sir, when you grow up
I will take you to see the Beel in the afternoon
Snakes play with bumble bee at that hour on lotus!

Nader Ali, how more grown up will I have to be?
Are you planning to show me the Beel at tin prohor

After my head touches the sky, going through the roof?

I could not afford to buy a single royal cartridge, ever
The boys of Loskor family have sucked stick–lozence showing me their pleasure
I have seen the Rasleela at the Choudhury House, standing at the gate like a beggar
Fair-coloured women wearing golden bangles had laughter
In so many moments of joy
Under incessant shower of colours
They did not look at me even once!
My father told me, touching my shoulder with affection,
‘Wait my son, one day we will also – ‘
He is now blind, we could not see anything.
No one will bring back those royal cartridge, stick-lozence and that Ras Festival for me!
Boruna told me once, keeping the scented handkerchief inside her breast,
‘There will be scent of perfume like this when you truly love me!’
For love I have risked my life with clenched fist
I have tied red cloth in the eyes of wild bull
Scouring every nook and cranny of this mundane world,
I have gathered 108 blue lotus
Still, Boruna did not keep her words,
Now her breasts only smell of flesh –
Even now she is just like any other woman!
No one has kept words, thirty three years have gone by, no one has kept words!

NOTE
Bostumi is a female member of Hindu religious sect who lives like mendicants.
Tin prohor refers to afternoon, from 12 to 3 pm. According to popular measurement of time 24 hours of a day is divided by 8, giving 3 hours for each prohor. The first prohor begins at 6 in the morning. So tin prohor in Sunil’s poem is anytime between 12 and 3pm. Based on this I have used ‘afternoon’ for Tin prohor.
Rasleela is a Hindu relgious festival celebrating Lord Krishna’s dance with Gopis, the companions Radha, Lord Krishna’s beloved.

ভাত দে হারামজাদা
রফিক আজাদ
(১৯৪১-২০১৬)

ভীষণ ক্ষুধার্ত আছি : উদরে, শরীরবৃত্ত ব্যেপে
অনুভুত হ’তে থাকে – প্রতিপলে – সর্বগ্রাসী ক্ষুধা!
অনাবৃষ্টি – যেমন চৈত্রের শস্যক্ষেত্রে – জ্বেলে দেয়
প্রভূত দাহন – তেমনি ক্ষুধার জ্বালা, জ্বলে দেহ।

দু’বেলা দু’মুঠো পেলে মোটে নেই অন্য কোনো দাবি,
অনেকে অনেক-কিছু চেয়ে নিচ্ছে, সকলেই চায় :
বাড়ি, গাড়ি, টাকাকড়ি – কারো বা খ্যাতির লোভ আছে;
আমার সামান্য দাবি : পুড়ে যাচ্ছে পেটের প্রান্তর –
ভাত চাই – এই চাওয়া সরাসরি – ঠান্ডা বা গরম,
সরু বা দারুণ মোটা রেশনের লাল চালে হ’লে
কোনো ক্ষতি নেই – মাটির শানকি-ভর্তি ভাত চাই;
দু’বেলা দু’মুঠো পেলে ছেড়ে দেবো অন্য-সব দাবি।

অযোক্তিক লোভ নেই, এমন-কি, নেই যৌনক্ষুধা
চাই নি তো : নাভিনিম্নে – পরা শাড়ি, শাড়ির মালিক;
যে চায় সে নিয়ে যাক – যাকে ইচ্ছা তাকে দিয়ে দাও –
জেনে রাখো : আমার ও-সবে কোনো প্রয়োজন নেই।

যদি না মেটাতে পারো আমার সামান্য এই দাবি,
তোমার সমস্ত রাজ্যে দক্ষযজ্ঞ কাণ্ড ঘটে যাবে;
ক্ষুধার্তের কাছে নেই ইষ্টানিষ্ট, আইন কানুন –
সম্মুখে যা-কিছু পাবো খেয়ে যাবো অবলীলাক্রমে :
থাকবে না কিছু বাকি – চলে যাবে হা-ভাতের গ্রাসে।
যদি বা দৈবাৎ সম্মুখে তোমাকে, ধরো, পেয়ে যাই –
রাক্ষুসে ক্ষুধার কাছে উপাদেয় উপাচার হবে।
সর্বপরিবেশগ্রাসী হ’লে সামান্য ভাতের ক্ষুধা
ভয়াবহ পরিণতি নিয়ে আসে নিমন্ত্রণ ক’রে।
দৃশ্য থেকে দ্রষ্টা অব্দি ধারাবাহিকতা খেয়ে ফেলে
অবশেষে যথাক্রমে খাবো : গাছপালা, নদী-নালা,
গ্রাম-গঞ্জ, ফুটপাত, নর্দমার জলের প্রপাত,
চলাচলকারী পথচারী, নিতম্ব-প্রধান নারী –
উড্ডীন পতাকাসহ খাদ্যমন্ত্রী ও মন্ত্রীর গাড়ি –
আমার ক্ষুধার কাছে কিছুই ফ্যালনা নয় আজ।

ভাত দে হারামজাদা, তা-না হ’লে মানচিত্র খাবো।

Give me food, rascal
Rafiq Azad
(1941-2016)

I am very hungry: in my stomach, all over the body
All-consuming hunger is burning every moment!
Like a drought ignites great conflagration in the
Cropland in Choitra, similar is the hunger’s pain –
It burns the body, from head to foot.

I will have no other demand at all if two morsels of food
Is given twice a day; many others are asking for various things,
Everyone wants a house to live, a car to ride and money
Some hanker after awards for fame; my demand is little –
The Prairie in my stomach is on fire, it badly needs food,
Clear and simple – does not matter if served hot or cold,
Fine, even coarse rice given in ration will do, no fuss
About that, all I want is shanki full of rice; I will give up
All other demand if two morsels are given twice a day.

I have no unreasonable greed, not even craving for sex
Saree worn below navel, its owner are not my target,
These can be given to anyone who wants, let him have,
You only keep in mind: I have no need for those things.
If my simple demand is not met, terrible things will happen
In your realm; the hungry does not bother about good or bad,
Law and rules – whatever comes in view will be devoured
At ease: nothing will be left, every item will be grabbed
By the hungry; if, let us say, you appear all on a sudden,
A fine food you will be for the monster of hunger.

When hunger is all consuming, simple need of food
Invites terrible consequences. The subject and object
Are all obliterated; next to be consumed are, in order
Of sequence: trees, rivers and canals, village and markets,
Footpath, the overflowing sludge of gutters, passersby on roads, women with prominent buttocks – the food minister
With his vehicle flying flag – before my hunger nothing is trifling.

Rascal, give me food, else I will devour your map.

NOTE
Chitra is a month in Bengali calendar
Saree (also spelt sari) is the long cotton cloth used by Bengali women for daily wear.
Sanki is the earthen pot used by villagers, particularly, the poor, to take daily meals.

 

Share Now শেয়ার করুন