সুবর্ণ আদিত্য | দ্বিতীয় দশকের কবিদের স্বনির্বাচিত কবিতাগুচ্ছ | পডকাস্ট ও টেক্সট

0
278

দ্বিতীয় দশকের স্বনির্বাচিত কবিতাগুচ্ছের সিরিজে আজ প্রকাশিত হলো সুবর্ণ আদিত্যর কবিতা। এই পোস্টের প্রথমে ‘পডকাস্ট’ (অডিও) থেকে কবিতাগুলির আবৃত্তি শুনতে পাবেন। এরপর রয়েছে কবিতাগুলির টেক্সট।

পডকাস্ট >> নিচের লিংকে ক্লিক করে কবিতাগুলির আবৃত্তি শুনুন। আবৃত্তি করেছেন বিজয়া চৌধুরী

পড়ুন কবিতাগুলি

গন্ধ চুরি ও হাওয়া নিরঙ্গম

০১

ঘুমের ভেতরেও ঘুমিয়ে গেছিলাম…দেখি, একটা স্বচ্ছ সাদা কাঁচঘেরা ঘর। চারপাশে সৈন্য-সামন্ত। বেয়াড়া শতশত ফাইল এনে রাখছে আমার সামনে। কে আমি? সামনের বিশাল মার্বেল পাথরের টেবিলে নেমপ্লেটে আমার নাম। মাথার উপরে ফটো বাঁধাই করা। বিভিন্ন ট্যাগ বলছে আমি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী।

অন্তত কুড়ি বছর এগিয়ে এসেছি জীবন থেকে। প্রধানমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব সম্পর্কে ধারণা না থাকলেও একজন কৃষক হিসেবে সফল ছিলাম। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে কাজ শুরু করে দিলাম। ভাল বীজ বাছাই করে, জমি প্রস্তুত করে—ফসল বুনতে থাকলাম। সব চারারই সমান যত্ন-আদর ও পরিচর্যার পাশাপাশি উপড়ে ফেললাম সব আগাছা।

সারাদেশ আমাকে দেখে হেসে উঠলো—আমি ফসলের হাসি দেখে কেঁদে ফেল্লাম।

০২

দুম করে একটা পানশালায় ঢুকে পড়লো আমার মাথা। হাত বলছে বোতল ছোঁবো না, জিহবা বলছে স্বাদ নাও। মস্তিষ্কের দাবি তার পান করা জরুরি। সরাইখানার শেষপ্রান্তে রবীন্দ্রনাথের সাথে শেখ মুজিব, আইনস্টাইন, জুলিয়াস সিজার, নিউটন, ম্যারাডোনা, পেলে, হোমার, সক্রেটিস আর চে গুয়েভারাকে দেখতে পেলাম। একটেবিল থেকে আরেক টেবিলে ছুটে চলেছে লর্ড মাউন্ট ব্যাটেন। আমাকে দেখেই থমকে গেল, থতমত খেল। ওর কান মলে দিয়ে সামনে এগিয়ে যেতেই সামনে পড়লো মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ- সজোরে থাপ্পড় মেরে দিলাম। নেহেরু, প্যাটেল আর গান্ধী কাচুমাচু করে পায়ে পড়ার অবস্থা। চে হাসতে হাসতে ঠোঁট থেকে চুরুটটা বের করে হাত বাড়িয়ে দিল, কাঁধে হাত রেখে আরেক হাতে মদের গ্লাস নিয়ে উল্লাসে ঝাপিয়ে পড়লাম। ওপাশ থেকে মেরিলিন মনরোকে দেখা যাচ্ছে—তার টিপটা, ফ্রকটা ঠিকঠাক আছে কিনা দেখেই কেন্ট উইন্সলেট নার্গিস ফাকরিকে সাথে নিয়ে আমাদের আড্ডায় এলো…

হঠাৎই কলকল স্বরে মা ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন—আমার চোখে-মুখে হিমশীতল জল।

০৩

ইতিহাসের সাথে সাথে ঘুমিয়ে গেলে বাংলার সাতশ শতক রিপ্লে হচ্ছে চোখে। চোখ মেলে দেখি আমি রাজা শশাঙ্ক। ধুধু, শুধু গাছপালা, বনে-অরণ্যে, নদীতে শিকার করছে মানুষ। একটা হাই তুলে আবার ঘুমিয়ে গেলাম।

১২শ শতকের আমি ইংল্যান্ডের এক মজুর। দরদামে, কমদামে কিনে নিল এক তাতার। রাজার সিংহাসনে বাতাস করি। রাজকন্যার জন্য বাগান থেকে ফুল এনে দেই। রাতে যুবরাজের হেরেমে সুরা পরিবেশন করি। বিজ্ঞান তখনো অন্ধ। আবার ঘুমিয়ে যাই।

১৭শ শতকে ঘুম ভাঙতেই দেখি পৃথিবীতে আলো ফুটতে শুরু করেছে। আমি বড় রাষ্ট্র পত্তন করে ফুটনোট হয়ে উঠছি সংবিধানে। সাগর দাপিয়ে যাচ্ছি জাহাজে, আকাশ কাঁপিয়ে হয়ে উঠছি রাইট ভাতৃদ্বয়। দুই-দুইটা বিশ্বযুদ্ধ শেষে ক্ষতবিক্ষত হয়ে এখন আমি ফেসবুকের চ্যাটিংবক্স।

এখন মসজিদের ইমামের কাছে ছুটতে হবে—পানিপড়া না খেলে পরীক্ষায় নির্ঘাত ফেল করবো।.

০৪

পাথর বিছানো এক পথ দিয়ে হাঁটছিলাম। পথটা সোজা নদীতে মিলিয়ে গেছে। অন্ধকার একটা নদী, স্রোত নেই, আলো নেই। পার হবার নৌকো নেই। মা, ওপাড়ে। ছড়ি নিয়ে দুলে-দুলে ঢেউ পাঠিয়ে দিচ্ছেন আমাকে। কাগজের ফুলে মায়ের নাম লিখে ছেড়ে দেই পানিতে। পানি মা হয়ে ওঠেন।

একদিকে যুদ্ধ চলছে। আমার গায়ে যুদ্ধের পোশাক। কোমরে তলোয়ার। আমি যুদ্ধ করতে পারি না। হেরে যাই। যুদ্ধ নিজে আমার কাছে হেরে যায়। একটা ফুল—বিক্ষিপ্ত স্বর নিয়ে কথা বলতে পারে—কেউই জানতে চাইলো না।

স্বপ্ন থেকে স্বপ্ন হয়ে, মায়ার ভেতর দিয়ে যাই। মা আমার যুদ্ধ বোঝেন না। আমি যুদ্ধ চিনি। নীল চিঠি নিয়ে আসে এক টিয়াবন্ধু। আর কোনো যুদ্ধ যেন না হয়, এমন প্রত্যাশা রেখে ঈশ্বর লিখেছেন আমাকে।

ভোরের আযানের সাথে সাথে সিরিয়ায় সিরিজ বোমা হামলার বিকট শব্দে ঘুম ভেঙে গেলে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সংবাদ সম্মেলন দেখি।

০৫

ঘুমাবো বলে চোখ বন্ধ করতেই মনে হলো পৃথিবীর বাইরে চলে গেলাম। মেঘের একটা ভেলা নরম করে ভাসিয়ে নিচ্ছে আমাকে—চোখ মেলে তাকালাম সাদা আসমানে… ভেসে ভেসে গিয়ে থামলাম সবুজ পাহাড়ে। পাহাড়ের বুকচিতিয়ে বইছে কান্নার ঢেউ, ফুলের গুঞ্জনে মৌপাখিদের সম্ভাষণ… এখানের সব পাখিই সাদা। এমনকি ফুল-পাতা, ঝিড়ি পথের নীল পানিতে নূড়ি পাথরের নিক্বণ—মনে হচ্ছে কেউ মাদল বাজিয়ে যাচ্ছে ধ্যানে। সুর এমনই তীর্যক যেকোনো সময় হাতের ভাষায় জেগে উঠবে নদী। আমি নিজেকে নদী ভেবে মিহি হয়ে গেলাম।

আমাকে ভালোবেসে পাহাড়ের চূড়ায় কান্নার তুফান ছড়িয়ে একের পর এক বাঁধা পেরিয়ে ঝর্নাটা এঁকেবেঁকে নান্দনিক বিস্ময়ে আমার বুকে আছড়ে পড়তে লাগলো। আমরা প্রেমী হয়ে উঠলাম। এক ধ্যানমগ্ন শুকনো পাতা—লিখে চলেছে আমাদের গন্তব্যের ইতিহাস…

কবিতা ভাবনা

কবিতা হলো সেই পরাবাস্তব ধাঁধা—কোনো ক্রেতা না থাকলেও যে দিস্তার পর দিস্তা রুটি ভেজেই চলে আরিচাঘাটে। কোনো কবি’ই কবিতা লেখেন না; কবিতা নিজেই কবিকে দিয়ে লিখে নেন তার যাপন, ভঙ্গি, দৃষ্টির চারপাশ এমন কি দেয়ালের ওপারের ছবিও। কবিতা হলো সেই আফসোস : অসুস্থ সমাজে যে একমাত্র বৃক্ষ—অথচ একটা বৃক্ষ দিয়ে তো আর বাগান হয় না!

সুবর্ণ আদিত্য : জন্ম: ১৫ মার্চ ১৯৮৫, গাইবান্ধা । কবিতার বই: দুধ পুকুরের সিঁড়ি, ফারদুন সিরিজ, গন্ধচুরি ও হাওয়া নিরঙ্গম। ইমেইল: subornoaditya@gmail.com

Share Now শেয়ার করুন