সুমন মজুমদার | রাইমঙ্গল | ধারাবাহিক উপন্যাস (পর্ব ৪)

0
97

আগে যা ঘটেছিল

বহুকাল ধরে বহমান রায়মঙ্গল নদীর পাড়েই লহুখালি গ্রাম। সেই গ্রামেরই গৌরাঙ্গ বনে-বাদারে মধু খুঁজে বেড়ায়। এলাকার প্রায় সমস্ত হিন্দু ইন্ডিয়া চলে গেলেও গৌরাঙ্গ জন্মভূমি ছেড়ে ইন্ডিয়া চলে যায় নি, যাওয়ার কথা ভাবতে পারেনি। বয়স হয়েছে তার, দ্বিতীয়বার বিয়ে করেছে। বউ রাই সুন্দরী। গর্ভবতী। কিন্তু গৌরাঙ্গ জানে তার জন্যে নয়, অন্য কারো সংস্পর্শে এসে রাই গর্ভবতী হয়েছে। কিন্তু সে সেটা মেনে নেয় কী করে? এবার বিচার বসেছে গ্রামে। বিচারে, শাস্তি হিসেবে রাইকে গৌরাঙ্গের সংসার থেকে বের করে দেয়া হয়। এদিকে লহুখালী গ্রামের একদল মানুষ মধু আহরণে বেরিয়েছে। রাইয়ের বিচার ও মঈনকে নিয়ে তাদের মধ্যে ঝগড়া বেধে যায়। সুবেশ ও আওলাদের মধ্যেকার ঝগড়া সাম্প্রদায়িক তর্ক-বিতর্কে রূপ নেয়। আওলাদ দল ত্যাগ করে অন্য নৌকায় উঠে বসে। রাইমঙ্গলের স্বামীর ঘর ছেড়ে দেয়ার পর ঠাঁই হয় নিঃসঙ্গ বিধবা সোনামনি বেওয়ার ঘরে। রাইমঙ্গল পোয়াতি, তাতে অন্যদের আগ্রহ দেখে রাইমঙ্গলের প্রশ্ন পোয়াতি হয়েছে সে, তাতে কেন মানুষের এত আগ্রহ। তার মনোযোগ মঈনকে নিয়ে। মঈন কোথায়, কবে ফিরবে, তার সমস্ত ভাবনা জুড়ে মঈন।

পর্ব ৪

জ বৃষ্টি হয়ে মনটা আরও খারাপ করে দিলো গৌরাঙ্গের। বৃষ্টির ঝাঁজ কমে এলেও আকাশের গুরুম গুরুম শব্দ যায়নি। এমন একটা দিনে বউ ছাড়া একা বিছানায় থাকতে খারাপই লাগছে। তিন কুড়ির পড়ন্ত যৌবন হলেও তারও তো একটা মন আছে। সে তো সাধ করেই এই বয়সে ছুঁড়ি বিয়ে করেছিল। গৌরাঙ্গ উপলগ্ধি করে আর যাই হোক, রাই মাগীটার জন্য তার মায়া পড়ে গেছে। যদিও পরক্ষণেই নিজেকে সে সান্ত্বনা দেয়, এইটে ব্যাপার না, আপদ বিদেয় হয়েছে। এতদিন একটা কুত্তাও ঘরে পুষলে তার প্রতি মায়া পড়ে যায়। ঠিক হয়ে যাবেখন। সালিশের পর রাই বিদায় হয়েছে দুই দিন হলো। এর মধ্যে ওইদিনই দুপুরে ভাত খেতে গিয়ে নবীনার সাথে গৌরাঙ্গের তুমুল ঝগড়া হয়ে গেল। বৃষ্টিমুখর রাতে একা বিছানায় গড়াতে গড়াতে গৌরাঙ্গ মৌলি এখন সেসব কথাই ভাবে। যেভাবেই হোক, রাইয়ের কথা ভুলতে হবে। নবীনা হয়েছে ওর মায়ের মতো চোপাওয়ালি। বাপকে যে ভাত একটু আদর যত্ন করে খাওয়াতে হয়, তরকারিটা যে একটু দরদ দিয়ে রানতে হয় সেটা এই মেয়ে জানে না। খালি আছে, এ এইটা করেছে, ও সেইটা করেছে এসব নিয়ে। ছেলেটাও বা কেমন জন্ম দিলো। হোক সৎ মা, হোক কোন একটা দোষ করেছে, তারে বাড়ি থেকে তাড়ানোর পরদিনই তুই বাদায় রওনা দিবি! টাকা পয়সা বন্ধু বান্ধবই সব, বাপের মনের কথা একটু চিন্তাও করবি না!

বুকের পাক ধরা পশমে হাত চালাতে চালাতে গৌরাঙ্গ দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। যাক, বুড়ো বয়সে একটা বিয়ে করে ভুল হয়েছিল, সেটা শুধরানো গেছে। এখন ঠাকুর যতদিন বাঁচায় জীবনটা একভাবে না একভাবে যাবেই। পোলা-মাইয়া ভালো থাকলেই হলো। একপাশে কাঁত হয়ে শুয়ে গৌরাঙ্গ চোখ বোজে। কিন্তু না, তবুও চোখ লাগে না। কেমন যেন একটা অদম্য জেদ টের পায় নিজের ভেতর। আরে হারামজাদির বেটি, আরে খানকি, তোরে কি ভাত কাপড়ে কম সুখে রাখছিলেম? খালি বিছনার সুখটাই দেখলি, সংসারের সুখটা দেখলি না? এই যে মৌলির কাম ছাইড়ে, প্রশাসন-পুলিশের চোখ এড়িয়ে বাঘ-হরিণের ছাল বেইচে, জাহাজে ছাওয়া তুলে দিয়ে টাকা জমাচ্ছি, সেগুলো কার হতো? মরার সময় সব তো আর সুবেশ-নবীনাকে দিয়ে যেতাম না। মাইয়াটাকে তো বিছানায়ও সুখ দিতি কম চেষ্টা করি নাই। এই তো একমাস আগেই গাড়ামারা বাজারে সেকেন্দার ডাক্তারের কাছে গেলাম। আশপাশের দশ অঞ্চলে বিখ্যাত সেকেন্দার ডাক্তার। মাসে মাসে বাক্স ভরে খুলনার হাসপাতাল থেকে কত রকমের ওষুধ যে ব্যাটা নিয়ে আসে তার ইয়ত্তা নাই। অ্যালোপ্যাথি বলো আর হোমিওপ্যাথি, কবিরাজি বলো আর হেকিমি, যেটাই লাগবে সব কিছুতেই তার যশ। তাই তো বিশ্বাস করে সেকেন্দার ডাক্তারকেই খুলি বলিছিলাম গোপন কথাটা। কিন্তু ডাক্তার সাব বিষয়টাকে পাত্তাই দিলো না। তার কথা হলো – স্ত্রীমিলনে ঘোড়ার শক্তি আনার ওষুধও তার কাছে আছে। জোয়ান মর্দ ছেলেপেলে খাবে, আর নতুন বউ নিয়ে টানা তিন-চারদিন দরজা বন্ধ করে থাকবে। ব্যাস এরপর বউ যেদিন ব্যাথায় কাঁতড়াতে কাঁতড়াতে বাইরে বের হয়ে এসে কাপড়, পেটিকোট সাবান দিয়ে কাচবে, সেদিনই সবাই বুঝতে পারবে সেকেন্দারের ওষুধ কী জিনিস।

অ্যালোপ্যাথির ওষুধ না চাও, তাতেও সমস্যা নাই। শাহী হালুয়া, কবিরাজি মোদকও আছে তার কাছে। কত মানুষ এসব নিয়ে খেয়ে পরের দিন নাচতে নাচতে তাকে এসে ধন্যবাদ দিয়ে গেছে। কিন্তু গৌরাঙ্গের সমস্যা হলো তার বয়স। এই হালের শরীরে এত কড়া ওষুধ গৌরাঙ্গ যে নিতে পারবে না। আর গৌরাঙ্গের নিজেরও ভয় লেগেছিল। বানিয়াশান্তার মানুষদের কাছে সে শুনেছে, এসব ওষুধে নাকি অনেক ক্ষতি হয়। তার চেয়ে বনাজি ভালো। সেকেন্দার ডাক্তারের তাতেও সমস্যা নাই, বনাজিও জানা আছে। নিজের পোটলা খুলতে খুলতে সেকেন্দার বলেছিলেন, শুনেন আমার বাড়ি বর্ডারের ওপাড়ে হুগলি নদীর কাছে জয়নগর। নেহাৎ মোসলমান বইলে এই দেশে চইলে আসিছি। নালি পরে বাদা আপনেগের এহানে কত গভীর, ওহানে আমার বাপ-দাদারা এর ভিতরে ঢুকতি গেলেও গাছ কাটি কাটি ঢুকতি হতো। এমন বনেই আমি বনাজি ওষুধ নিয়ি কাম কিরিছি। আরে আমাগের চারপাশেই নারী বশের কতকিছু ছড়ায় ছিটায় আছে। বাংলাদেশের মানুষ তো এসব জানে না, জানিলি পরে ছুটি আসতো। এই যে দেখেন কেতুকী। বাড়ির কাছ দিয়া এত কেতুকী গাছ দেখছেন, কোনদিন কল্পনা করছেন কবিরাজ এগুলান দিয়া কী ওষুধ বানায়? বুঝবেন না, তাই বুঝায়াও লাভ নাই। ওষুধ দিতিছি, নিশ্চিন্তে বাসায় নিয়া এক গ্লাস গরম দুধের লগে গোলায়া খায়া ফালান। কাইল সকালে যদি বৌদি সুস্থ থাকে তাইলে আমারে আইসে কইয়েন। কিন্তু বড় ভাই, দাম লাগবো একবারে পাঁচশ।

সেকেন্দার ডাক্তারের ফার্মেসি কাম দাওয়াখানা একেবারেই বাজারের মধ্যে। গৌরাঙ্গ আবারও আশপাশে দেখে নিয়েছিল, পরিচিত কাউকে দেখা যায় কিনা। পাঁচ-ছয়শ টাকা ঘটনা না ডাক্তার, ঘটনা হলো কাম হবি তো? আত্মবিশ্বাসে সেকেন্দার ডাক্তারও কম যায় না। চশমাটা চোখ থেকে উপরে তুলে মুখ নামিয়ে আনে গৌরাঙ্গের মুখের কাছে। কাম হবি না মানে, হতিই হবি। এটা হলো কেতকীর পরাগ কাণ্ড দণ্ড আর বীজের ওষুধ। কবিরাজি শাস্ত্রে বলা আছে – ‘মৈথুনকালে যে পুরুষের শীঘ্র্র পতন, সে হলো বেঁচে থেকেও অধমের মতন। কেতকী পরাগ তারে দেও দুধে গুলে, স্ত্রী তার থাকবে বশ একবার শুলে।’ বুঝলেন কিছু?

গৌরাঙ্গ হাবার মতো মাথা নাড়ে। এসব জ্ঞানের কথা তার বোঝার ক্ষমতা আছে নাকি। যাই হোক, বাসায় এসে ডাক্তারের কথা মতোই সেই মহাওষুধ খেয়ে রাতে রাইয়ের কাছে গিয়েছিল। বেশ ভালোই গরম হয়ে উঠেছিল শরীর। অথচ গায়ে হাত রাখতেই মুখ ঝামটা মেরে উঠে বেটি। শেষে যখন ঠেসে ধরে চুমা দিতে যাবে, ততক্ষণে গৌরাঙ্গের পাঁচশ টাকার ক্ষমতা ফুস। পুরনো এসব কথা ভেবে একা খাটে গৌরাঙ্গের আরও একা লাগে। অনেকদিন পর শরীরটা গরম হয়ে ওঠে, কিন্তু হায় কপাল, ঠাণ্ডা করার যে উপায় নাই। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে গৌরাঙ্গ বিছানা থেকে উঠে জানলা দিয়ে বাইরে দেখে। ছাই-রঙা আকাশে হঠাৎ হঠাৎ বিজলি আলোর খেলা। বৃষ্টির জমা জলে একটানা ব্যাঙ ডেকে চলেছে। গৌরাঙ্গ খাটের নিচ থেকে ট্রাংটা টেনে বের করে, সেখানেই থাকে তার রাজা কনডমের দুটি খালি প্যাকেট, অর্ধেক পাতা শেষ হওয়া মায়া বড়ি, শয়তানি লজ্জাতুন্নেছা কিতাব, সচিত্র যৌন আসন বইসহ দৃষ্টির আড়ালে রাখা যাবতীয় দাম্পত্য কলকব্জাগুলা। ট্রাংকের ভেতরে একপাশে রাখা সেকেন্দার ডাক্তারের সেই ওষুধের পুরিয়া। ওটার উপর হঠাৎ এত খেদ হয় যে, জানলা দিয়ে দূরে ছুঁড়ে দেয়। যেন পুরিয়াটা হারিয়ে গেলেই তার আজ রাতের রাগটাকে বশ বানানো যাবে। এসব ভাবতে ভাবতে ঠিক কত সময় গেছে খেয়াল নেই। টিনের দরজায় হালকা টোকার শব্দ শুনে গৌরাঙ্গের সংবিৎ ফেরে। এত রাতে কে এসেছে! জিজ্ঞেস করতেই দরজার ওপাশ থেকে সাড়া আসে – কাকা আমি বিনোদ, দরজাখান একটু খুলেন।

দরজা খুলতেই চাদর মুড়ি দিয়ে মাথা মুখ ঢেকে রাখা যুবক এসে ঢোকে ঘরে। হঠাৎ এই রাতে আগন্তুকের এত সমাদরের কারণ অবশ্য গৌরাঙ্গের সাইড ব্যবসা। ট্রাংক ছাড়াও যে খাটের নিচে নানা জিনিসপত্রের আড়ালে আরও কিছু গোপন জিনিস রয়েছে, যা গৌরাঙ্গ আর সুবেশ ছাড়া এখন কেউ জানে না। আরেকজন জানতো বোধহয়, ওই রাই। সে জন্যই তো গৌরাঙ্গ ভয়ে আছে, হারামজাদি যদি বলে দেয়। অবশ্য বলে দিলেও বা এখন লাভ কী, এমন নষ্ট মেয়ে মানুষের কথায় কে বিশ্বাস করবে। তবুও মনের মধ্যে খচখচ করে, ভয় যায় না।

গৌরাঙ্গ অন্যমনস্ক হলেও অতি সাবধান বিনোদের ইন্দ্রিয় এখন টনটনে। আশপাশে সামান্য ব্যতিক্রমী শব্দ হলেও সে চমকে উঠছে। আর চমকানোই স্বাভাবিক, তাদের কাজে সাবধান থাকতে হয়। অযথা পুলিশের ঝামেলায় পরলে জেল হয়রানি হতে হবে। বিনোদ বুঝে পায় না, পুলিশগুলো মাঝেমাঝে কেন এমন বাড়াবাড়ি করে। আরে বাবা, টাকা নিবে নে, সেটা নিয়ে একটু শান্তিতে কাজ করতে দে। না, এরা এত শয়তান যে, চোরকে কয় চুরি করো, গেরস্থেরে কয় ধরো ধরো। বিনোদ গলার স্বর খাদে নামিয়ে আনে। কাকা, ডাক তো পরিছে। বিদেশি লোক আছে। মালামাল কিরম রাখছো?

গৌরাঙ্গ খাকাড়ি দিয়ে গলা পরিষ্কার করে নেয়। আছে কিছু মাল, তয় যে অবস্থা দাম তো একটু বেশি পরবো। আনোয়াররে কও আগে দাম ঠিক করুক, পরে মাল যাইব।

তুমিও যা কও না কাকা! বিদেশিরা মাল না দেইখা দাম ঠিক করবো। এরা এক নম্বার জিনিস ছাড়া নিবি না। এর লেইগাই তো এমন রাইতে আমি কষ্ট কইরা আইছি। আনোয়ার ভাই কইছে, পার্টি ভালো, মাল পছন্দ হইলে টাকা একশ একশ। বিনোদ এমনভাবে পরিস্থিতি বর্ণনা করে যেন, টাকার ম ম গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে সবখানে। গৌরাঙ্গ মৌলিকে সে টাকার ওই গন্ধ অনুভব করাতে চায়। সুবেশ হলে এতক্ষণে টাকার গন্ধ পেয়ে হয়তো পটে যেত। কিন্তু গৌরাঙ্গের বয়স ও অভিজ্ঞতা তাকে সাবধান হতে শিখিয়েছে। আনোয়াররে বলবা, হরিণের চামড়া আছে চাইরখান, আর বড় মামার কিছু হাড্ডি। এ ছাড়া আমি খালি। এক একটা চামড়ার দাম ৬ হাজারের এক পয়সা কম হবি না।

আইচ্ছা, সেইটা না হয় কমুনে, কিন্তু তুমি এগুলান নিয়া যাবা কবে? বিনোদের প্রশ্ন গৌরাঙ্গকে চিন্তায় ফেলে দেয়। চামড়া আর অন্য মালসামান নিয়ি শ্যামনগর যাওয়া যাবি না। পার্টিরে রায়মঙ্গলের ভাটার দিকে থাকতি বলতে হবে। এদিকে পরিস্থিতি সুবিধার না, ফরেস্টের লোকেরা মাঝে মইধ্যে চেকিংয়ে আসে। বোট নিয়ি টহল দেয়। ধরা খাইলে ইদানীং এত ঝামেলা করে, টাকাও যায়, মাইরও খাওন লাগে।
বিনোদ আবার চাদরটা দিয়ে মাথা মুখ ঢেকে নিয়ে বের হতে উদ্যত হয়। পোলা আর তুমি মিইলা এত টাকা কামাও, একটা মুবাইল কিনতি পারো না কাকা। মুবাইল থাকলি এই কথাগুলা তো সরাসরি আনোয়ার ভাইরেই কতি পারতা। আমার আর এই রাইত বিরেতে কষ্ট করি আসতি হতো না। আইচ্ছা আমি গেলাম। বিনোদ চলে যেতে নিয়েও আবার ফিরে তাকায়। আইচ্ছা কাকা, এডা আনোয়ার ভাইর কাম না, আমার লাগবো। গুইসাপের চামড়া হবি, ম্যানেজ করি দিতি পারবা?

টাকা দিলি পারবো না ক্যান। গুইসাপ তো বাঘ হরিণ নয় যে এত চেকিং। টাকা দিলি এই শ্যামনগরে পাহাড়ের ভাল্লুকের পিত্ত, জিহ্বা, বান্দর, হনুমান, এমনকি অজগরও আনি দিতি পারুম। তয় গুইসাপের চামড়ার দাম পরবি এক একটার সাত হাজার। এর মধ্যে হলি জানিও। গৌরাঙ্গের কথায় বিনোদের মুখে শয়তানের হাসি ফোটে। টাকা ছাড়া তোমরা বাপ-পোলা যে একবিন্দুও নড়ো না সেকথা আমি জানি। দেখি বর্ডারের ওই পাড়ে আরেকটু কম পাই কিনা, নালি পরে তোমার কাছ থাকিই নিমু। সুবেশরে কলেই তো হবি?

হমম। তয় সুবেশ বাদায় ঢুকছে মৌ কাটতি। কবে আসে ঠিক নাই। বেশি জরুরি হলি, আমারেই জানাওনে। এখন যাও, রাইত অনেক। বিনোদ কথা না বাড়িয়ে হাঁটতে গিয়ে আবার ফিরে আসে। এবারও তার মুখে শয়তানি হাসি। কাকা, আমগো কাকি নাকি কার লগে ভাইগে ইন্ডিয়া চলি গেছে? ক্যান যে এই বয়সে বিয়া করতে গেলা।
বিনোদের কথা শুনে গৌরাঙ্গের ব্রহ্মতালু যেন জ্বলে উঠলো। সেদিনের ছেলে তারে নিয়ে মশকরা করে! কিছু একটা বলতে যাবে, কিন্তু সে সুযোগ না দিয়ে বিনোদ হাঁটা ধরে। গৌরাঙ্গ একদলা থুতু ফেলে দরজা লাগিয়ে আবার খাটের নিচ থেকে ট্রাংক টেনে বাইরে রাখে। ট্রাংকের পেছনে ছিল মোটা নাইলনের দড়ি দিয়ে বাঁধা একটা তোষক। সেটা টেনে বের করে বাঁধন খুললেই বেরিয়ে আসে নীল পলিথিনে মোড়ানো হলুদের উপর কালো ফুটকির চামড়া। গৌরাঙ্গ সেই চামড়ার নরম পশমে হাত বুলাতে বুলাতে মুচকি হাসে। মনে মনে হিসাব করে ফেলে, চারটে চামড়া কিনেছে তিন হাজার করে বারো হাজারে। বিক্রি করবে ছয় হাজার করে চব্বিশে। অর্থাৎ ডবল লাভ। আগত এই টাকার স্বপ্নে রাইয়ের জন্য যে মন খারাপ ছিল সেটি নিমিষে ভালো হয়ে গেল গৌরাঙ্গের। খালি যাবার সময় বিনোদ ফাজলামি না করলেই পারতো। এখন চামড়া ছাড়া বাঘের হাড় হাড্ডিগুলোর দাম ঠিক করতে হবে। এমনিতে তিন বছর আগে বাঘের চামড়া সে বিক্রি করেছে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত। একবার আমেরিকান এক লোকের কাছে কুমিরের চামড়া বিক্রি করে পেয়েছিল দুই লক্ষ। কিন্তু বাঘের হাড়-হাড্ডি কখনো গৌরাঙ্গ বিক্রি করেনি। শুনেছে বাঘের চর্বি, দাঁত, মাথা, নখ ২৫-৩০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। হাড্ডিগুলোর জন্যও নিশ্চই ভালো দাম পাওয়া যাবে। গৌরাঙ্গের চোখ চকচক করে আসন্ন লাভের খেয়াবে।

(চলবে)

পূর্ববর্তী পর্ব

রাইমঙ্গল পর্ব ১

রাইমঙ্গল পর্ব ২

রাইমঙ্গল পর্ব ৩

Share Now শেয়ার করুন