সুমন মজুমদার | রাইমঙ্গল | ধারাবাহিক উপন্যাস (পর্ব ৯)

0
41

আগে যা ঘটেছিল

বহুকাল ধরে বহমান রায়মঙ্গল নদীর পাড়েই লহুখালি গ্রাম। সেই গ্রামেরই গৌরাঙ্গ বনে-বাদারে মধু খুঁজে বেড়ায়। এলাকার প্রায় সমস্ত হিন্দু ইন্ডিয়া চলে গেলেও গৌরাঙ্গ জন্মভূমি ছেড়ে ইন্ডিয়া চলে যায় নি, যাওয়ার কথা ভাবতে পারেনি। বয়স হয়েছে তার, দ্বিতীয়বার বিয়ে করেছে। বউ রাই সুন্দরী। গর্ভবতী। কিন্তু গৌরাঙ্গ জানে তার জন্যে নয়, অন্য কারো সংস্পর্শে এসে রাই গর্ভবতী হয়েছে। কিন্তু সে সেটা মেনে নেয় কী করে? এবার বিচার বসেছে গ্রামে। বিচারে, শাস্তি হিসেবে রাইকে গৌরাঙ্গের সংসার থেকে বের করে দেয়া হয়। এদিকে লহুখালী গ্রামের একদল মানুষ মধু আহরণে বেরিয়েছে। রাইয়ের বিচার ও মঈনকে নিয়ে তাদের মধ্যে ঝগড়া বেধে যায়। সুবেশ ও আওলাদের মধ্যেকার ঝগড়া সাম্প্রদায়িক তর্ক-বিতর্কে রূপ নেয়। আওলাদ দল ত্যাগ করে অন্য নৌকায় উঠে বসে। রাইমঙ্গলের স্বামীর ঘর ছেড়ে দেয়ার পর ঠাঁই হয় নিঃসঙ্গ বিধবা সোনামনি বেওয়ার ঘরে। রাইমঙ্গল পোয়াতি, তাতে অন্যদের আগ্রহ দেখে রাইমঙ্গলের প্রশ্ন পোয়াতি হয়েছে সে, তাতে কেন মানুষের এত আগ্রহ। তার মনোযোগ মঈনকে নিয়ে। মঈন কোথায়, কবে ফিরবে, তার সমস্ত ভাবনা জুড়ে মঈন। রাইমঙ্গলকে হারিয়ে গৌরাঙ্গের দিনগুলি ভালো যাচ্ছে না। তরুণী স্ত্রীর স্মৃতি তার মনে এসে ভীড় করে। স্ত্রীকে যৌনসুখ দিয়ে বশে রাখার জন্যে কত কিছুই না সে করেছে। এলোপ্যাথি কবিরাজি কিছুই বাদ দেয়নি। এদিকে বিনোদ এসেছে গৌরাঙ্গের কাছে রক্ষিত বাঘের চামড়া, কুমিরের চামড়া, হরিণের চামড়া ইত্যাদি কিনবে বলে। দরদাম করে বিনোদ বিদায় নেয়ার সময় গৌরাঙ্গের বৌ কার সঙ্গে ভেগে ইন্ডিয়া চলে গেছে বলে কটাক্ষ করে যায়। গৌরাঙ্গর কথাটা শুনে ভীষণ রাগ হয়। এই উপন্যাসের অন্য চরিত্রগুলো, যারা মৌয়াল অনেক খোঁজাখুজির পর খুঁজে পায় মধুর চাক। বনের মধ্যেই একটা পোয়াতি বাঘ ক্ষুধার যন্ত্রণায় কাতর হয়ে শিকার খুঁজতে থাকে। স্বামী হারানো সোনামনির ঘরে আশ্রিতা রাইসুন্দরী লক্ষ করে রাতে চুপি চুপি সোনামনি কোনো কোনো রাতে কাছেই কোথায় যেন বেরিয়ে যায়। জিজ্ঞেস করে জানতে পারে কাশেম ডাকাত আসে তার কাছে। কাশেম ডাকাত হলেও সোনামনিকে অনেক ভালোবাসে। সোনামনির কথা শুনে রাইয়ের মনে পড়ে যায় নাগর মঈনের কথা। সোনামনি বলে, মঈন আর বেঁচে নাই। এটা রাইয়ের মেনে নেয়া উচিত। এদিকে আওলাদ সুবেশের সঙ্গে ঝগড়া করে দল ছাড়ার পর এসে দেখা করে সুন্দরবনের ত্রাস কাশেম ডাকাতের সঙ্গে। উদ্দেশ্য কাশেমের কানভারি করে সুবেশকে শিক্ষা দেয়া। কিন্তু সুবেশের সম্পর্ক আনোয়ার শিকারীর সঙ্গে। আওলাগের সঙ্গে যে দ্বন্দ্বে সে জড়িয়ে পড়েছে, তা থেকে আনোয়ার শিকারীই তাকে রক্ষা করবে। বাদায় আবার মঈন বেঘো ভূত হয়ে ঘুরে বেরাচ্ছে।এই ভূতের জন্যই আশানুরূপ মধু তার দল সংগ্রহ করতে পারেনি।

পর্ব ৯

১৪

লহুখালী থেকে নৌকা করে বিনোদপুর। সেখান থেকে ভ্যানে দুই কিলোমিটার দূরে কাকশিয়ালি এসেছে রাই ও সোনামনি। এখানে আঁকাবাঁকা পাড় ধরে এগিয়ে চলা নদীর ওই দূরে দেখা যায় ছায়া-ছায়া বাদাবন। আজ সেখানে বনবিবির পূজা। হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা বলেই পূজা হচ্ছে, অন্যান্য জায়গায় লোকে বনবিবির থানে শিন্নি দিয়েছে। যদিও পূজা হোক বা শিন্নি, বনবিবির কাছে আসতে হিন্দু-মুসলমানকে কে বাধা দেয়। এখানে আসতে আসতে রাই আর সোনামনি দুজনেই ভাবছিল দুই কামনার কথা। বাতাস লাগা মোমের শিখার মতো তাদের কামনা কাঁপে। প্রাণের মানুষটির ভাবনায় কখনও মনে আসে শুভ কামনা, কখনও বা অশুভ। মাঝখানে রয় কেবল তাদের অসহায় দুরুদুরু মন। আজ আরও বহু মানুষের সঙ্গে দুই বয়সের দুই নারী তাদের মনস্কামনা দেবীর কাছে জানাতে এসেছে ককশাল সাহেবের এই নদীতে। অপভ্রংশের কী এক গুণ, নয়তো বিলেতি ইঞ্জিনিয়ার ককশাল কেন একসময় হয়ে উঠবেন কাক আর শিয়ালের সংকর। রাই আর সোনামনি, দু’জনের হাতেই চারটে করে কলা আর দুটি পেঁপে। বনবিবির পূজায় যাবে, খালি হাতে তো যাওয়া যাবে না।

এখানে রাই এসেছে, এক বিশেষ মানত করে। সেদিন রাতে চুলে তেল মাখাতে মাখাতে সোনামনি বলেছিল, যদি এতই বিশ্বাস থাকে যে মঈন একদিন ঠিক ফিরবি, তালি পরে বনবিবির কাছে মানত কর। বেশি না একখান কবুতর বা একখান রাতা মুরগী জানের ছদগা দিলিই হবি। আমার কাছ থাকি টাকা ধার নে, পরে শোধ করি দিস। ধারের কথায় প্রথমে দ্বিধায় ভুগলেও পরে কথাটা মনে ধরে রাইয়ের। এক জানের বদলে যদি আরেকটা জান ফেরত আসে ততে তাই সই। তাছাড়া তার ভেতরেও তো বড় হচ্ছে নতুন এক জান। এই এত গঞ্জনা, বিপদ আপদের মধ্যেও সে জান যেন ভালোভাবে পৃথিবী দেখতে পারে, সে আশীর্বাদ দরকার। লহুখালী গ্রামের লোকজন এখনই তাকে নিয়ে নানা কথা ছড়াতে শুরু করেছে। এর বউ তার বউকে ফিসফিসিয়ে বলেছে, সোনামনির ঘরে থাকে ক্যান বুঝিসনে? ছিনাল হলে যা হয় আরকি। গ্রাম থেকে আলাদা থাকলি পরে ফস্টিনস্টি করতে সুবিধা। গ্রামের বুড়ো চাচা পান খেতে খেতে আরেক কাকাকে বলেছে, কী যুগ এলো ছেইলেপেলে সব নষ্ট হয়ি গেছে। নালি পরে জানিশুনি কেউ ওই ধানক্ষেত, জংলা পার হয়ি সোনামনি বেওয়ার ঘরে উঁকিঝুকি মারে! এক ব্যাটা আরেক মরদকে বলেছে, আমি চেলেঞ্জ করে কচ্ছি, দেখে নিস বাচ্চা খালাস হলেই মাগি বানিয়াশান্তায় ঘর নেবে। তখন কে তার ঘরে যাবে সেই প্রশ্নে বিভ্রান্ত হাসিতে তারা হেসে গড়িয়ে পড়েছে একে অন্যের উপর। সুতরাং একটু শান্তির আশ্রয় চাইতে রাই তো দেবীর কাছে যেতেই পারে। যদি এই উসিলায় তিনি তার মনের মানুষকে ফিরিয়ে দেন।

নদীর পাড়েই ছোট্ট চাল দেওয়া পাতার ঘরে বনবিবির প্রতিমা। হলুদ গাঁদার মালা, তেল আর সিঁদুরে লাল দেবীর সঙ্গে যেন পাহারাদার হিসেবে আছেন ভাই শাহ জংলি, দুঃখে, ধোনাই-মোনাই আর অবশ্যম্ভাবী ডোরাকাটা মোচয়াল দক্ষিণ রায়। পাতার ঘরের পাশেই আছে মাকাল ঠাকুরের ঢিবিও। যদিও এই বিপদের দিনে তার চেয়ে কদর বেশি বনবিবিরই। দেবীর সামনে একটা লাল পেড়ে শাড়ি, আর অন্য পূজিতদের উদ্দেশ্যে একটা লুঙ্গি। নতুন মালসায় তুলশীপাতা সহযোগে দেওয়া হয়েছে ক্ষীর, আমুর পাতায় সাঁজানো খিচুরির নৈবেদ্য, ফল-ফলাদি আর জ্বলছে আগরবাতি। চুরি করে, চামারি করে, হারামিগিরি করে, জেলে-মৌয়ালদের রক্ত চুষে নানাভাবে পয়সা বানানো লোকেরা অবশ্য পূজা করলে এর চেয়েও বেশি দামী ভেট পান বনবিবি। কিন্তু কাকশিয়ালির নদীর পাড়ে আগতরা যে নিতান্তই হতদরিদ্র। তাদের প্রত্যেকের মুখে ফুটে ওঠা ভক্তিই বলে দিচ্ছে, দেবীর উদ্দেশ্যে তাদের ভেট কমদামি বা নিতান্ত মামুলি হতে পারে, কিন্তু বিশ্বাসটুকু একেবারে খাঁটি।

ঘর-লাগোয়া চত্বরে চার-পাঁচ জন মহিলা ফল কাটছিলেন। সঙ্গে আনা কলা-পেঁপে সেখানে জমা দিয়ে দেবী নমস্কার সেরে নেয় রাই। অন্যদিকে সোনামনি পশ্চিম দিকে ফিরে মোনাজাত ধরে ফিসফিস করে কী যেন বলে, যার ভাষার একবিন্দুও বোঝে না রাই। সাধারণত কাকশিয়ালির এই পূজা হয় পৌষ সংক্রান্তির পর। কিন্তু এবার চৈত্রের শেষে আলাদা করে পূজা হওয়ার বিশেষ কারণ আছে। কী সেই জরুরি কারণ সে সম্পর্কে না জানলেও পূজা হচ্ছে এতটুকু শোনাই যথেষ্ট ছিল রাই আর সোনামনির কাছে। এখানে এসে দেখে শুধু ওরাই নয়, লহুখালী গ্রাম থেকে আরও কয়েকজন পূজা দিতে এসেছে। ওদের সঙ্গে রাই সোনামনির চোখাচোখি, নীরব ভাষা বিনিময় হয়। কিন্তু ভয়ে রাই চোখ নামিয়ে রাখে। লহুখালীর মানুষরা তাকে দেখিয়ে একে অপরের সঙ্গে ফিসফাস, গুনগুন করে। রাইয়ের ভয় হয়, এত দূরের গ্রামে এসেও যদি তাকে নিজ গ্রামের নোংরামিতে ভুগতে হয়, তাহলে তো দেবীর সামনেও মুখ দেখানোর জো থাকবে না। তারপর কেউ যদি বলে বসে, তোমার মতো নষ্ট মাইয়ে এখানে আসি দেবীর পূজাটাই দিলে নষ্ট করি।
কাঙালের মাতা তুমি বিপদনাশিনী, আমারও দুঃখেরও মাঝে তরাবে আপনি। বনবিবি গো, ও বনবিবি গো। বনবিবি মাগো তোমার ভরসাতে এলাম, দুধে-ভাতে থাকবো সুখে সেলামও দিলাম। যেন বাঘে ছুঁয়ে না, যেন কুমির ছুঁয়ে না, যেন কাল সাপ ছুঁয়ে না। গোত্রে, পদবীতে, বেশভূষায় তিনি পুরোহিত না হলেও ক্ষতি নেই, ভক্তি ভরে বনবিবি জহুরনামা জপতে পারলেই হবে। অবশ্য তাতে হিন্দু-মুসলমান কারোই সমস্যা হয় না, উল্টো পাঁচালীর মাহাত্যে যেন শ্রদ্ধা উথলে পরে। বনবিবি দূর আরবের মদিনার ইব্রাহিম সুফির কন্যা নাকি বিশালাক্ষী চণ্ডীরূপ তাতে কারো তো কিছু এসে যাচ্ছে না, যতক্ষণ না দেবী তার করুণা সার্বজনীনভাবে বিলিয়ে যাচ্ছেন। ততক্ষণে দূর বাদা থেকে ভেসে আসে কার যেন হুংকারের ক্ষীণ শব্দ। পাঁচালীর পড়ুয়া মাথায় হাত ঠেকিয়ে বলেন, দেবীর স্মরণ নিলি যে দক্ষিণরায় এলাকা ছাড়েন, এটিই তার প্রমাণ। অভাবনীয় এই প্রমাণে ভক্তি আরও বেড়ে যায়, পাঁচালীতে সবার মন লাগে। নানা বিভ্রান্তি আর ভয় নিয়ে রাইও চেষ্টা করছিল মন বসানোর। কিন্তু তাতে ছেদ পড়ে পাশের জনের ফিসফিসানো কথায়। বাচ্চা কোলে এক মহিলা আরেকজনকে বলছে, আরে এমনি এমনি পূজো হচ্ছে নাকি, বাদায় নাকি বেঘো ভূতের অত্যাচার বাড়িছে। মৌ কাটতি যাও বা কাঁকড়া ধরতি, হাউ হাউ করি নাকি সামনে আসি দাঁড়াচ্ছে ভয়ঙ্কর এক ভূত। পূজো-টুজো সারি সন্ধের আগেই ঘরে ফিরতি হবি।

তা এত ভয় পাচ্ছিস, তো চুল খোলা রেখে পূজোয় আসিছিস কেন। জানিস নে এই এমন সময়ে চুল খোলা রাখি বাদা নদীর আশপাশেও থাকতি নাই। পাশের জনের কথা শুনে জিহ্বায় কামড় দিয়ে বাচ্চা কোলে সেই নারী চুলটা বেঁধে নেয়। পাশে রাইকে দেখে বলে, তুমিও চুল বাঁধি নেও গো বইন। এমনিতেই পোয়াতি মানুষ, আলগা বাতাস লাগলি সর্বনাশ হবি।

ওদের কথা শুনে রাই সোনামনি দু’জনই চুল বেঁধে নেয়। পাঁচালীর গুনগুন শব্দের মধ্যেও স্থানীয় ওই নারীদের চোরা-গল্প তখনও চলে। আরে মাঝেরখালীর সোনা মিয়া, ভুজপুরের আরজের মা নিজ চোক্ষে বেঘো ভূতেরে দেখছে বলে শুনিছি। আরও আরও গ্রাম থেকেও শুনিছি মানুষ দেখেছে।

কিন্তু হঠাৎ করি কার বেঘো ভূত এমন হানা দিবি বাদায়? ভীষণ কৌতুহলোদ্দীপক প্রশ্নটা চোরা গল্পের মতোই চোরা ভয়ের স্রোত ছড়িয়ে দেয় ওদের শরীরে। গা ছমছমে প্রশ্ন ছাপিয়ে পাঁচালীর সুর চড়া হয় – এইখানে দক্ষিণ রায় ভাটির ঈশ্বর। নানা শিষ্য কৈল সেই বনের ভিতর। শুনিছি, ওই গতবার বাদায় গিয়ে হারিয়ে যাওয়া এক মৌলের ভূত সওয়ার হয়েছে দক্ষিণ রায়ের পিঠে। ইয়া বড় তাগড়া সেই মামার শরীর। তার পিঠে চড়েই নাকি ভূতটা হা হা করি ছুটে বেড়ায় বাদার এদিক ওদিক। লোকে বলে এই ভূত সেই মেচি বাঘের লগে বাদার মধ্যি সংসার পাতিছে।

নানা গল্পগুজব শুনে রাইয়ের মনে এক অজানা আশঙ্কার ঘণ্টা বাজে। গতবার তো এ অঞ্চলে বাদায় গিয়ে হারিয়ে যাওয়া একমাত্র মানুষ মঈন। তাহলে কি… না না, এর বেশি আর সে ভাবতে চায় না। আর যাই হোক বাঘের হাতে বেঘোরে মারা পরে লোকটা অন্তত ভূত হয়নি। মঈনের কোন বিপদ হলে তার মন জানান দিতো। এর আগেও মঈন যখন এটাওটা নিয়ে নানা বিপদ আপদে পড়েছে তার মন কু ডাক ডেকেছে। গৌরাঙ্গ মৌলি তার চিন্তিত চেহারা দেখে বার বার জিজ্ঞেস করেছে কারণ, কিন্তু রাই কাউকে বুঝতে দেয়নি, ভেতরের আশঙ্কা। আজ মঈনের কিছু হলে তার মন জানতোই। আর এসব ভালো লাগছে না তার। সোনামনিকে বলে, চলো উঠি বুবু, আর ভালো লাগে না।

ক্যান, আরেকটু পাঁচালী শুনি, ব একটু। সোনামনি রাইকে জোর করে বসে থাকতে, কিন্তু তার উসখুস মন তাতে সাড়া দেয় না। রাই উঠে পরে। কিন্তু হঠাৎ করি কি হয়েছে কবি তো?
ক্যান তুমি শুইনলে না, বাদায় বেঘো ভূত আসিছে। গতবার বাদায় গিয়ে হারিয়ে যাওয়া এক মৌলের ভূত সওয়ার হয়েছে একটা মেচি বাঘের কান্ধে। শুল প্যাক জংলায় ওই মেচি বাঘের লগে ভূত সংসার পাতিছে।

বাদায় এরম ভূত-জ্বিন-পেত্নি থাকেই। সেটির কোন একটি লোকে দেখিছে, তাতে তোর সমস্যা কি? সোনামনি তবুও বোঝে না রাইয়ের মনের আশঙ্কা। বিরক্ত হয়ে রাই বলতেও চায় না, শুধু উঠে দাঁড়ায় চলে যাবার জন্যে। কিন্তু নাছোড়বান্দা সোনামনি এমনভাবে লেগে থাকে পেছনে যে, রাই বলতে বাধ্য হয় – গতবার বাদায় যেয়ে কে হারিয়ে গেছে জানো না?

এসব গালগল্প শুনে যে রাইয়ের এই কথা মনে হবে তা বুঝতে পেরে আঁতেকে ওঠে সোনামনি। সত্যিই তো, এই জিনিসটা তো সে ভেবে দেখেনি। গতবার তো এই অঞ্চল থেকে একটা মানুষই হারিয়ে গেছে বাদায়। দুনিয়ার লোক জানে, সে হোগলাগাতির মঈন। তাহলে কি সত্যিই লোকটা বেঘো ভূত হয়েছে! রাইয়ের কথা শুনে সোনামনিরও কপাল কুঁচকায়। কিন্তু রাইয়ের সামনে সে চিন্তা প্রকাশ করা যাবে না। ওরা ফিসফিস করে নিজেদের মধ্যে কথা বলে, কিন্তু তার চেয়ে উঁচু গ্রামে চলতে থাকে পাঁচালী কথা – কহ মা বনবিবি কোথায় রহিলে এই সময়, জলদি করি এসে দেখ তোমার দুখে মারা যায়, করাল দিয়েছ মাগো যদি না পালিবে, ভাটির মধ্যে তোমার কলঙ্ক রয়ে যাবে।

১৫

শ্যামনগরের এই বোর্ডিং আনোয়ার শিকারীর নিয়মিত আড্ডা। রাতের মদ গাঁজা ফেন্সিডিল ইয়াবা মেয়ে মানুষের ঢলাঢলি থেকে শুরু করে গোপনের শিকার, প্রকাশ্যে বিকার ব্যবসা, ধর্মের বিকিকিনি, কর্মের কন্ট্রাকদারি সবই চলে তার এই বোর্ডিংকে ঘিরে। বিনিময়ে বোর্ডিংয়ের মালিক মাস শেষে টাকা পায়, সঙ্গে আনোয়ারের বাণিজ্যিক উচ্ছিষ্টও। একটা রুম ব্যবহার হয় আনোয়ারের তথাকথিত অফিস হিসেবে, আরেকটা রুমে সে থাকে। মোট কথা এদিক-ওদিক সেদিক ঘুরে শ্যামনগর এলেই আনোয়ার শিকারীকে পাওয়া যাবে এখানে। পুলিশ র্যা বের ভয় আছে, কিন্তু তাকে জয় করার মন্ত্রও জানা আনোয়ার আর তার লোকেদের। যে কেউ চাইলেই বোর্ডিংয়ে এসে আনোয়ারের সঙ্গে দেখা করতে পারবে এমন নয়। এছাড়া বোর্ডিংয়ের খাতা-কলমে সে আনোয়ার নয়, বরং সাতক্ষীরার পাইকারী ব্যবসায়ী খোদাবন্দ মৃধা। আর এমন একজন ব্যবসায়ীর সাথে উল্টাপাল্টা লোকজনের তো তেমন কাজ থাকতে পারে না। সুতরাং বোর্ডিং তার এক এমন অভয়াশ্রম যেখানে সব চলে। এবার গত তিন-চারদিন হলো আনোয়ার এখানে এসেছে। কিছু মাল দ্রুত ডেলিভারি করা দরকার। মালাউনের বাচ্চা সুবেশটারে পাঠিয়েছিল লহুখালীর গৌরাঙ্গ মৌলির কাছে। হারামজাদা সেই যে গেছে, আর খবর নাই। এদিকে গৌরাঙ্গও আসছে না। কী যে এক সমস্যা। এই দেশে আসলে ভালোমতো কিছুর ব্যবসা বাণিজ্য করার পরিবেশ উঠে যাচ্ছে। গত রাতে নতুন মেয়ে নিয়ে একটু আমোদ ফুর্তির সময় বেশিই মদ খেয়ে ফেলেছিল। সে জন্যই বোধয় মেজাজ এখনও খারাপ হয়ে আছে। না খেয়েও পারে না, আবার খেলেও এসব গ্যাঞ্জাম। শালা, দুনিয়াটাই এরম ভ্যাজালের। মনে মনে এসব ইতংবিতং ভাবতে ভাবতে যখন একটু চোখ লেগে এসেছিল, ঠিক তখন পোলাপান এসে খবর দিলো গৌরাঙ্গ মৌলি এসেছে। বিরক্তি নিয়েই আনোয়ার শিকারী আড়মোড়া ভাঙে।

সালাম আনোয়ার সাব, আসতি কয়েছিলেন, তয় একটু দেরি হয়ে গেল। আনোয়ার বয়সে গৌরাঙ্গের অর্ধেক হবে, কিন্তু তার মুখে সাব শব্দটি যেন অন্যরকম দ্যোতনা সৃষ্টি করে। এমনিতে আনোয়ারকে সবার কাছে গৌরাঙ্গ তুমি বলে, কিন্তু সামনে এলে তুমি হয়ে যায় সাব। এখানে সাব নিয়োগদাতা ও কর্মচারীর সম্পর্ককে ইঙ্গিত করে না। এই রূঢ় জঙ্গলে সাব শব্দটি স্রেফ প্রভু ও ভৃত্যের। আইসো আইসো মৌলি, তুমি নাকি শ্যামনগর আসতি চাও না। আমারে বলিছো রায়মঙ্গলের দিকি আসতি।

আনোয়ার সরাসরি এই প্রসঙ্গ টেনে বসবে গৌরাঙ্গ আশা করেনি। একটু চমকে গেলেও নিজেকে সামলে নেয়। সে তো বলিছি, কেনও বলিছি তাতো বুঝতিই পারেন। দিনকাল ভালো না, পুলিশ র্যা ব কয়দিন পর পর আসি ঝামেলা করে। টাকা পয়সাও খায়, লগে স্যাটাও ভাঙ্গি দিয়ি যায়। বিনোদরে তো বুঝায়ে বলিছিই।

হ, তোমরা তো এখন ব্যবসায় সেয়ানা হয়ে গেছ, বুঝায়ে তো কবাই। অথচ এই তোমাগের আমিই প্রথম এই ব্যবসায় আনিছিলেম। আর এখন আমার পেটের ছাও, আমারে কও ম্যাও। যাগগে, তা শুনিছি তোমার বউরে নিয়ে নাকি কি ঝামেলা হয়েছে, কোন মোসলমান পোলার লগে নাকি ভাগি গেছে? লজ্জায় অপমানে গৌরাঙ্গের কান ঝা ঝা করে। মনে মনে রাইয়ের মা-বাপ তুলে গাল দেয়, কিন্তু মুখে তো হাসি ধরে রাখতে হবে। বাইরের মানুষকে তো বোঝানো যাবে না, কী ক্ষত তৈরি করে গিয়েছে ওই মেয়ে। যদিও আনোয়ার তার মুখের হাসি দেখে মনে হয় আরও প্রশয় পেয়ে গেল। রসিয়ে রসিয়ে সে বলছে – শুন, তোমরা মালাউনরা এই মোসলমানের দেশে থাকবা খাইবা ব্যবসা করবা আর তার একটু দাম দিবানা! আর ওই মাইয়া হিন্দু হইছে বইলা কি মোসলমানের পোলারে মনে ধরতে পারে না? শুন হিন্দু থেইকা মোসলমান হলি যে সোয়াব এখন ওই মাইয়া সেইটা পাবি, তুমি পাবা না। তুমি যেই মালাউন, সেই মালাউনই থাকবা। তা কোন পোলার লগে ভাগছে?

আরে বাদ দেন এসব কথা। নষ্ট মেয়ে মানুষ নিয়ি আলোচনা করে সময় নষ্ট করি না। গৌরাঙ্গ প্রসঙ্গ এড়াতে চায়, তবু আনোয়ার এড়ায় না। সে গৌরাঙ্গের অসহায় অবস্থার মজা লোটে। শুন, এখনও ভালোয় ভালোয় বলি জাগা জমি ঘর বাড়ি বিক্রি করি ওই পাড়ে চলি যাও। আরে এরপর তো মোসলমান তোমার মাইয়ারে নিয়ি টান দিবি, তখন কি করবা? ওই পাড়ে কলিকাতার বরানগরে আমার পরিচিত আছে। আমি বলি দিবানে, সেখানে গেলে তোমার কাজ কর্মের ব্যবস্থাও হয়ে যাবে। যা বলিছি ভালো করি ভাবি দেখ।

আনোয়ার সাব, এই কথা সেই বহু আগের থাকিই শুনতিছি, কখনো কানে নেইনি। লহুখালীতেই বাপ-দাদার ভিটে, জায়গা সম্পত্তি। মরলি রায়মঙ্গলের পাড়েই মরমু। বাদ দেন এসব কথা, কাজের কথায় আসি।

আনোয়ার কিন্তু কাজের কথায় তবুও আগ্রহ পায় না। তার চেয়ে এটা ভালো প্রসঙ্গ। অনেক আগে থেকেই গৌরাঙ্গসহ লহুখালী, হোগলাগাতিসহ আশপাশের গ্রামের হিন্দুদের সে নানা ছলে ফুসলাচ্ছে। তারা সীমান্ত পার হলে যে তার বেশ লাভ। শ্যামনগরসহ গোটা সাতক্ষীরা যশোর খুলনা নিয়ে তাদের বিশেষ পরিকল্পনা রয়েছে। তাদের বলতে এখানে অনেকের কথাই বলতে হয়। আগড়দাড়ি মাদ্রাসার মাওলানা তারেক তাদের বিস্তারিত বলেছে এই পরিকল্পনার কথা। সরাসরি তার যোগাযোগ পাকিস্তান আফগানিস্তানে। তাবলিগে এসে সেখানকার হুজুর মাওলানারাও বলেছে, এখানে মোসলমানের শাসন গড়তে যা যা সাহায্য লাগে সব করবেন। কিন্তু সেই বিশেষ অভিযান তো চলবে ধীরে সুস্থে। আপাতত আনোয়ারের লক্ষ্য কম দামে হিন্দুগুলার কিছু জমি-জিরাত হাতিয়ে নেওয়া। তা আমার প্রস্তাব মনে রাইখো গৌরাঙ্গ। ভালো দাম দিমু।

যতই খোঁচানো হোক না কেন গৌরাঙ্গ এতে সাড়া দেবে না বুঝতে পেরে আনোয়ার ব্যবসার কথায় আসে। গৌরাঙ্গ এমনই সেয়ানা হারামজাদা যে চারটা হরিণের চামড়া চাচ্ছে ছয় হাজার করে। অথচ তিন মাস আগেই গৌরাঙ্গের কাছ থেকেই চামড়া কিনেছে সাড়ে চার হাজার করে। গৌরাঙ্গ মনে করেছে তার কাছে খবর নেই, কত টাকা করে সে এসব চামড়া কিনেছে। বাদা বনে কে কোথা থেকে কত টাকা দিয়ে হরিণের মাংস, চামড়া, বাঘের হাড়-হাড্ডি সংগ্রহ করে, কে কাকে কয় পয়সা চাঁদা দিলো, কে কেমনে জীব-জন্তু মারলো তার সব খবর আছে আনোয়ারের কাছে।

না আনোয়ার সাব, এর কমে পারমু না। বহু কষ্টে এইবার চামড়া যোগাড় করা লাগছে। একটু তো বেশি টাকা পয়সা দিবেন। আপনেরা যদি না দেন আমরা ব্যবসা চালামু কেমনে? হরিণের চামড়া নিয়ে গৌরাঙ্গের এই দামাদামি আনোয়ার ভালোভাবে নিচ্ছে না। যদিও এ কথা মালাউনটাকে সে বুঝতে দিতে চায় না। অবশেষে চামড়া প্রতি ছয় হাজার টাকাতেই আনোয়ার রাজি হয়। কারণ এগুলো সে অনায়াসেই চিটাগাংয়ে আট থেকে দশ হাজার করে বিক্রি করতে পারবে। এইবার আসো, আসল জিনিস সম্পর্কে। তা তোমার কাছে নাকি বাঘের হাড়-হাড্ডি আছে কিছু? সেইটা কয় টাকা নিবা তা কও।

এটা নিয়ে আগে থেকেই বড় আশা করে আছে গৌরাঙ্গ। বাঘের চামড়া বিক্রি করে যদি পাঁচ লাখ টাকা পাওয়া যায়, তাহলে হাড়-হাড্ডিতেও ভালো দামই পাওয়ার কথা। সে শুনেছে নাক বোচা চাইনিজ আর বার্মিজদের কাছে বাঘের এসব হাড়-হাড্ডির কড়া কদর আছে। এরা নাকি এসব হাড্ডি গুড়া করে খায়। সেকেন্দার ডাক্তার একবার তাকে বলেছিল – বাঘের অণ্ডকোষ যদি খালি একবার যোগাড় করা যায়, তালি পরে সেটি কাইটে খালি বিছনায় ঘোড়ার শক্তি পাবেন। এই যে চাইনিজ জাপানি মালগুলো এতক্ষণ বাছনায় মাইয়া নিয়া থাকে, কেমনে? সব তো ওই বাঘের মাংস আর অণ্ডকোষেরই গুণ। শালাগের টাকা আছে, বিভিন্ন দেশ থাকি কিনি নিতি পারে। কিন্তু দেহ, আমাগের বাড়ির পাশেই বাদায় রাজ্যের বাঘ ঘুরি বেড়ায়, অথচ আমরা এক শালাকে ধরলিই বন অফিস থেকে শুরু করি সাংবাদিকগো হইহই রইরই পরি যায়। শুধু একবার যদি বাঘের একখান অণ্ডকোষ হাতে পেতাম, তালি পরে শুধু গাড়ামারা শ্যামনগর না, কালিগঞ্জ, আশাশুনি, সাতক্ষীরে, খুলনা, ঢাকা সব ব্যাটা ছেলেকে দেখায় দিতেম শক্তিবর্ধক মোদক কাকে বলে। খায়ে ঘরে যেয়ে বাঘের মতো বউয়ের ঘাড়ে ঝাপায়ে পড়তো সব। আর একটু মাংস পালি আহারে বানাতাম হাঁপানি, ভগন্দর, বাতজ্বর, মিরগী রোগের চরম ওষুধ।

বাঘের অণ্ডকোষের ভাবনায় বুদ গৌরাঙ্গের সংবিৎ ফেরে আনোয়ারের ঝাড়ি খেয়ে। এত করে আনোয়ার তাকে বোঝাচ্ছে, বাড়িতে বাঘের হাড়-হাড্ডি রাখা তার ঠিক হচ্ছে না, তবু সে কিসের ভাবনায় যেন হা হয়ে আছে। আনোয়ার গৌরাঙ্গকে বাঘের সব হাড্ডির দাম এক লাখ টাকা সেধেছে। কিন্তু গৌরাঙ্গ আসলে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না এই দাম ঠিক আছে কিনা। না আনোয়ার সাব, আরেকটু বাড়ায়ে দিতি হবি। কী রিক্স নিয়ি যে এই হাড় হাড্ডি জমায়েছি ভগবানেই জানে।
শুন গৌরাঙ্গ, এখন যদি ইতিহাস কই তালি পরে তো কবা তোমাগের দিকি নজর রাখি। কিন্তু এইটাও বুঝ যে, এসব খবর না রাখলি আমি ব্যবসা করি খাতি পারতাম না। তুমি এই বাঘের হাড্ডি কোত্থেকে যোগাড় করিছ সব আমি জানি। তোমার ভগবানের কিড়ে কেটে কও তো, এই বাঘ আউলার চরে মারা যাওয়াটার হাড্ডি নে? বন অফিসের লোকজন দেখে টেখে এরে মাটি দিলো। আর তোমরা রাতের অন্ধারে বাঘের কবর খালি করি দিলা। লোকে জান হাতে নিয়ি বাদায় ঢুকি বাঘ মারি চামড়া ছাড়ায়, আর তোমরা এমন ফাও পায়েও টাকা নিয়ি ধ্যানত্যারাকা করতিছ। এক লাখ দশ হাজারের এক পয়সাও বেশি দিমু না।

এটা ঠিক যে গৌরাঙ্গ বাঘের এই হাড্ডি অনেকটা ফাওয়ের উপরেই পেয়েছে। তিন মাস আগে আউলার চরের উরির বনে মরে পরেছিল বাঘটা। খবর পেয়েই কোন কথা নেই, গৌরাঙ্গ সুবেশকে নিয়ে ছুট মেরেছিল সেদিকে। রাজ্যের মানুষ ততক্ষণে ভিড় করেছে তামশা দেখতে। কোন শালা যেন পুলিশকেও খবর দিয়ে দিয়েছে। বন অফিসের লোকজন এসে মরা বাঘ পরীক্ষা করে। ততক্ষণে লাশ পঁচে ফুলে উঠেছে। সবাই আফসোস করে, আহারে আর ক’দিন আগে যদি লাশটার খোঁজ পাওয়া যেত তাহলে মাংসগুলোর একটা হিল্লে করা যেত। পঁচা লাশ কাটাছেড়া ছাড়াই মাটিচাপা দেওয়া হয়। তখন থেকেই তক্কে তক্কে ছিল গৌরাঙ্গ। তিনদিন পর গভীর রাতে সুবেশ আর মতলবপাড়ার হাওলাদারকে সঙ্গে নিয়ে সে চলে গেছিল আউলার চরের সেই উরির বনে। রায়মঙ্গলের ঢেউ ভাঙতে ভাঙতে তাদের ট্রলার যখন এগোচ্ছে, রাতের আকাশে তখন তারার বাজার বসেছে। পলকা অথচ গা শিরশিরে একটা বাতাস গৌরাঙ্গসহ অন্যদের মেরুদণ্ড বেয়ে ভয়ের শীতল স্রোত বয়িয়ে দেয়। রাতের বেলার বাদা কত ভয়ঙ্কর হতে পারে সে শুধু তার পাড়ের মানুষরাই জানে। তার উপর উরির বনে থাকতে পারে নাম না জানা কত বিপদ। ভূতপ্রেত-বাঘ-ঘোগ সব এসে একচোটে হামলে পড়ে ঘাড়টা মটকে দিলেও কেউ দেখবে না। তবু টাকার লোভের কাছে ভয় হার মানে। হাতে বাঁধা তান্ত্রিকের তাবিজ আর মুখে ভগবানের নাম নিয়ে সত্যিই ওরা গিয়ে মাটি খুঁড়ে বের করেছিল পঁচা-গলা সেই বাঘের মৃতদেহ। তারপর সেখানে বসেই পঁচা মাংস আলাদা করে হাড্ডি ভরেছিল ব্যাগে। এই কষ্টের পরও যদি এখন আনোয়ার বলে, সে এই হাড়-হাড্ডি ফাও পেয়েছে, তাহলে মেজাজটা কার না খারাপ হয়।

অবশেষে নানা তর্ক বিতর্ক শেষে আনোয়ারের বলা দামেই গৌরাঙ্গকে রাজি হতে হয়েছে। বাঘের হাড়-হাড্ডি বাবদ পাবে এক লাখ দশ আর হরিণের চামড়া প্রতি পাবে ছয়। গৌরাঙ্গ এখনই মনে মনে হিসাব করে ফেলে এই এক লাখ চৌত্রিশ হাজার টাকা দিয়ে কী করবে। ছেলেটা বাদা থেকে ভূত-পেত্নির বাধা পেরিয়ে মধু বিক্রি আর বখরার টাকা নিয়ে বাড়ি ফিরেছে এটাই ভগবানের কাছে কৃতজ্ঞতা। এবার ওকে বিয়ে দিতে হবে। রাই যে ক্ষতি তার সংসারের করে গেছে, সেটা ভরতে সুবেশকে বিয়ে দেওয়া জরুরি। তা ছাড়া নবীনাও বড় হচ্ছে। ঠিক হয় আনোয়ারের লোক রায়মঙ্গলের ভাটিতে এসে গৌরাঙ্গের কাছ থেকে মালামাল বুঝে নেবে, তারপর পাবে নগদ টাকা।
গোপন এই বৈঠক শেষে গৌরাঙ্গ ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আনোয়ার তখন ভালো একটা লাভজনক লেনদেনের তৃপ্তিতে সিগারেট ধরিয়েছে। এই এক লাখ চৌত্রিশ হাজার টাকা বিনিয়োগে তার অন্তত দ্বিগুণ লাভ হতে পারে। আর বাধ্যতার সীমা ছাড়িয়ে মালাউন গৌরাঙ্গ তার সঙ্গে যে দর কষাকষিটা করলো এবার, তার উপযুক্ত জবাব ক’দিন পরেই দেওয়া হবে। আপাতত হাতের তাস হাতেই রাখা ভালো। বিদায় নিয়ে গৌরাঙ্গ উঠতে যাচ্ছিল, কিন্তু আনোয়ার পেছন থেকে আবার ডাকে। তোমার পোলা তো সেয়ানা হয়েছে, তারে বিয়া দিবে না? আমার কাছে ভালো একটা মাইয়ে আছে, ইন্ডিয়ার। পোলারে জিজ্ঞেস করি দেখ, ও পাড়ে বিয়ে করবি নাকি? টাকা পয়সা ভালো পাবি। দেখতি শুনতি চাইলে জানিও। পাড় করি দিবানে।

(চলবে)

পূর্ববর্তী পর্বগুলির লিংক

পর্ব ১
পর্ব ২
পর্ব ৩
পর্ব ৪
পর্ব ৫
পর্ব ৬
পর্ব ৭
পর্ব ৮

Share Now শেয়ার করুন