সুমন মজুমদার | রাইমঙ্গল | ধারাবাহিক উপন্যাস (পর্ব ৩)

0
100

পর্ব ৩

আগে যা ঘটেছিল

বহুকাল ধরে বহমান রায়মঙ্গল নদীর পাড়েই লহুখালি গ্রাম। সেই গ্রামেরই গৌরাঙ্গ বনে-বাদারে মধু খুঁজে বেড়ায়। এলাকার প্রায় সমস্ত হিন্দু ইন্ডিয়া চলে গেলেও গৌরাঙ্গ জন্মভূমি ছেড়ে ইন্ডিয়া চলে যায় নি, যাওয়ার কথা ভাবতে পারেনি। বয়স হয়েছে তার, দ্বিতীয়বার বিয়ে করেছে। বউ রাই সুন্দরী। গর্ভবতী। কিন্তু গৌরাঙ্গ জানে তার জন্যে নয়, অন্য কারো সংস্পর্শে এসে রাই গর্ভবতী হয়েছে। কিন্তু সে সেটা মেনে নেয় কী করে? এবার বিচার বসেছে গ্রামে। বিচারে, শাস্তি হিসেবে রাইকে গৌরাঙ্গের সংসার থেকে বের করে দেয়া হয়। এদিকে লহুখালী গ্রামের একদল মানুষ মধু আহরণে বেরিয়েছে। রাইয়ের বিচার ও মঈনকে নিয়ে তাদের মধ্যে ঝগড়া বেধে যায়। সুবেশ ও আওলাদের মধ্যেকার ঝগড়া সাম্প্রদায়িক তর্ক-বিতর্কে রূপ নেয়। আওলাদ দল ত্যাগ করে অন্য নৌকায় উঠে বসে।

পর্ব ৩

কপাশে যদি বাদাবন থাকে আর অন্য পাশে ভরা নদী তাহলে আকাশের মেঘ কৃষ্ণকালো সেজে হুংকার করে আনন্দ পায়। মাঝেমাঝে গুম গুম শব্দের সঙ্গে জলের ছলাৎছলের দেদার দোস্তি। মাটি ফুঁড়ে আকাশের দিকে মুখ করে থাকা শ্বাসমূলগুলোও থেমে থেমে নিশ্বাস ছাড়ে। আসন্ন বৃষ্টির চিঠি ব্যাগে ভরে বনঘেঁষা পাড়ে উরি আর ডেমি ঘাসের কাছে নিয়ে আসে হাওয়ার ডাকপিওন। মাতালের মতো ওরা দোলে, একে অন্যের সঙ্গে বারি খায়। বৃষ্টির বার্তা আর ঘাসের আনন্দ ছুঁয়ে যায় ফড়িংদেরও। বৃষ্টি এখনো নামেনি, তবে অচিরেই হয়তো নামবে। পাড়ের নরম কাদায় পা টানতে টানতে উঠে এলো একটা গুইসাপ। চেরা জিহ্বাটা দিয়ে বাতাসে বোলাল সরীসৃপটা। নাহ্, যে গন্ধটা ছড়িয়ে পড়েছে, তাতে বিপদ আসতে পারে যে কোন সময়। তার চেয়ে মানে মানে কেটে পরাই ভালো মনে হল গুইসাপটার। কিন্তু কী এমন বিপদ থাকতে পারে এখানে! উরির বন পেরিয়ে ঘন হারগাজার ঝোপটার কিছু পাতা হয়ে আছে হলদেটে। খানিকটা যেন নড়ে উঠলো ঝোপটা। হ্যাঁ, গারগাজার হলদে কালো ছায়ায় গা লুকিয়ে ওখানে যে বসে আছে কেউ। একটা বাঘ, ডোরাকাটা শরীরে তার যৌবনের উচ্ছ্বাস, তাকত। আপাতত পেট ভরা প্রাণীটার। একটা বানরের মরি বেশ চেটেপুটে খাওয়া গেছে একটু আগে। এখন এই হালকা আরামদায়ক ঠাণ্ডায় ওর চাই বিশ্রাম। মৃদু গরগর শব্দে ঘুমের মন্ত্র জপছে প্রাণীটা। এর মধ্যেই আকাশটা আবার ডেকে উঠলো। শব্দে জব্দ বাঘটার ঘাড়ের কাছের লোমগুলো যেন খাড়া হয়ে উঠলো একটু। অদৃশ্য কেউ যেন ওকে জানান দিয়েছে, ওঠো এখন ঘুমের সময় নেই, সে যে আসছে।

কে আসছে, কার জন্যে এই অপেক্ষা ডোরাকাটার! একটা হালকা বৃষ্টির ছাট কেমন যেন আনন্দ নিয়ে আসে। উরি আর ডেমি ঘাসের চিকন মাথাগুলোতে সুখের নৃত্য। উড়াউড়ি করতে থাকা ফড়িংগুলোকে এলোমেলো করে যেন বাতাসের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে কিছু। সেকি ছায়া নাকি কায়া, বাঘ তা বোঝে না। শুধু জানে, এ হলো তার পরম আপনজন। যে দোপেয়েগুলোর মতো আগুনের লাঠি বা ফাঁদের মৃত্যু নিয়ে ওর জন্য ওঁৎ পেতে থাকে না। বরং সময় পেলেই কানেকানে এসে অজানা ভাষায় বলে, কিরে উঠবি না, চল আমরা স্বপ্নে সওয়ার হই। তারপর সেই ছায়া বা কায়াকে সঙ্গে নিয়ে বাঘটা ঢুকে যায় গভীর বনে।

ধানী জমিটার একপাশে গোলপাতায় ছাওয়া জীর্ণ ঘর সোনামনি বেওয়ার। ঝিমঝিমে বৃষ্টির জল চুয়ে চুয়ে পড়ছে চাল দিয়ে। এখানে এই ঘরে তখন দুই নারী ব্যস্ত এক দুঃখের ফিরিস্তিতে। একজন বাড়িওয়ালি আর অন্যজন সদ্য সমাজ বিতাড়িত পোয়াতি রাই। আকাশের সঙ্গে তারাও দু’জন কাঁদছে নিজ নিজ দুঃখে।

বাঘটার মনে হয় কায়া বা ছায়াটা যেন ওর কতদিনের পরিচিত। ওর স্পর্শ বাঘটার ইন্দ্রিয়ে ইন্দ্রিয়ে এনে দেয় অসীম সুখের আবেশ। যে আবেশ একটা মাদি বন ছেনে ছেনে খুঁজে বেয়ায় কোন মদ্দা বাঘের কাছে। যে সুখের ঘোর তার পেটে বুনে দেবে শাবকের বীজ। কিংবা হারিয়ে যেতে দেবে ভয়হীন কোন ভূবনে। ছায়া কিংবা কায়ার সঙ্গে ঘাসের বনে দৌড়ায় বিরাট বাঘ। ছায়াটার যেন সিঁথিকাটা সুগন্ধি তেল দেওয়া চুল। লম্বা লম্বা পেশীবহুল হাত, শ্যামলা কালো গায়ের রঙ, গভীর চোখ। মাঝে মাঝেই ছায়াটা এসে যেন ভর করে বাঘটার কাঁধে। ওরা খেলে বেড়ায়, ওরা একে অপরের গায়ের গন্ধ মাখে। ভাগ্যিস ছায়াটাকে অন্য কেউ দেখে না, নইলে আলবৎ বলতো- আহা কী সুন্দর বুনো সংসার!

লহুখালী গ্রামের এই পেছন দিকটাতে ঘর-বাড়ি নেই। যেখানে বসতি শেষ, তার ঠিক পরে খানিকটা ধানী জমি। তারপর সবুজ ঘাস পেরিয়ে, হেতাল হারগাজা ঝোঁপ ছাড়িয়ে বয়ে গেছে একটা খাল। ঘোলা জলে তার লাগাতার দোয়ানি-ভারানির আশীর্বাদ। পাড়ে মাখনের মতো কাদায় বেরিয়ে আছে শুল। বিকেল এখনও ফুরায়নি, কিন্তু এরইমধ্যে আকাশের ফুঁপিয়ে কাঁদার ফরমান জারি হয়েছে প্রকৃতিতে। বাদার দিক থেকে আসা নোনা বাতাসকে চমকে দিয়ে মেঘ ডেকে উঠলো গুরুগুরু। বৃষ্টির প্রথম ফোঁটাটা যখন নেমে এলো, তখন দিনের গরমে তেঁতে থাকা মাটি যেন শ্বাস ছাড়লো ভুস করে। সেই সোঁদা গন্ধ পেয়ে হেসে উঠলো সবকিছু। তারপর কেবলই ঝিমঝিম রিমঝিম।

এখানে ক্লিক করে এই উপন্যাসটির শুরু থেকে পড়ুন >> পর্ব ১

ধানী জমিটার একপাশে গোলপাতায় ছাওয়া জীর্ণ ঘর সোনামনি বেওয়ার। ঝিমঝিমে বৃষ্টির জল চুয়ে চুয়ে পড়ছে চাল দিয়ে। এখানে এই ঘরে তখন দুই নারী ব্যস্ত এক দুঃখের ফিরিস্তিতে। একজন বাড়িওয়ালি আর অন্যজন সদ্য সমাজ বিতাড়িত পোয়াতি রাই। আকাশের সঙ্গে তারাও দু’জন কাঁদছে নিজ নিজ দুঃখে। সোনামনির দুই স্বামীকে একে একে বাঘে নিলো। একজন ছিল মন্নত মিয়া। মৌয়ালদের সঙ্গে বাদায় ঢুকে একদিন সে আর ফিরে এলো না। শেষে জোয়ান স্বমর্থ মন্নতের আধ খাওয়া মড়ি ভেসে উঠলো পাবদার ভারানিতে। এর দুই বছর পর বাপ মা আবার চেয়ে-চিন্তে বিয়ে দিয়েছিল গেরস্থ গরিব আলির সাথে। নামের মতো অবস্থাতেও গরিব ওই ব্যাটা অন্যের জমিতে বর্গা দিয়ে কোন মতে চালাত সংসার। তবুও সব চলছিল সুখে-দুঃখে। কিন্তু কে জানতো, ভাগ্য সেখানেও মুচকি হাসবে। সেবার খাল পেরিয়ে নাকি একটা বিরাট ল্যাংড়া বাঘ বাদা থেকে এসে ঢুকেছিল গ্রামে। হুজ্জত মিয়া সবার কাছে গল্প করতো, দুপুরে মদ্দা বাঘটাকে দেখেছে খাল পাড়ের ঝোঁপে। ওটার পায়ে বিশাল এক ক্ষত। মনে হয় শিকারীর ফাঁদে পড়েছিল। হেলেদুলে হাঁটতে থাকা পশুটা কেবল নিরীহভাবে ওর দিকে তাকিয়েছিল, তাতেই হুজ্জত মিয়ার কলজের পানি শুকিয়ে গেছে। লুঙ্গি তুলে পরিমরি করে দৌড়ে গ্রামে ফিরেই অজ্ঞান। পরে সবাই জানতে পারলো গ্রামে বাঘ ঢুকেছে। এরপর টিন বাজিয়ে, আগুনের মশাল, বল্লম, দা নিয়ে দল বেঁধে কত মানুষ কতভাবে বাঘ খুঁজলো, কিন্তু পেল না। তিন চারদিনে লহুখালীর লোকে ভাবলো, বাঘ-টাঘ আসলে কিছুই না। অযথা হুজ্জত বাঝানোই উদ্দেশ্য হুজ্জত মিয়ার। কিন্তু সবার ধারণা ভুল প্রমাণ করে, পরদিনই মাঠ থেকে মোছলেম শেখ গরু হারায়। এরপর গেল গ্রামে বেওয়ারিশ ঘুরে বেড়ানো ভুলু নামের কুকুরটা। পশ্চিমের পাগাড়ে দেখা যায় চার নখের ছাপ। খালের পাড়ে হিজলের গায়ে গভীর আঁচড়। আতঙ্কিত মানুষ খবর দেয় বনবিভাগে। কিন্তু তারা এসেও গরুর, কুকুরের মরি উদ্ধার ছাড়া বাঘের টিকির দেখা পেলো না। অবশ্য চোরের যদি দশদিন হয়, গৃহস্থের নাকি একদিন অবশ্যই আসে। সেই সূত্র মেনে ল্যাংড়া বাঘেরও দেখা পেল মানুষ।

আমারে দেহ, বাপ-মায় সাধ কইরে বিয়ে দিছিল গৌরাঙ্গ মৌলির কাছে। খালি বিয়াই হইলো, বিয়ার সুখ পাইলাম না। ক্যান কতি পারো বুজান? একজনরে মনে ধরলো, ভাবছিলেম পলায়ে যামু। কই তাক তো আর খুঁজি পাইলাম না। লোকলজ্জার ভয়ে লুকোয় লুকোয় সোহাগ করে আদর করে মানুষটা আমারে থুয়ে চলে গেল। 

এক রাতে গোলা ঘরের কাছে রাতা মোরগটার প্রাণ সংহারী কক কক শব্দ শোনে দুলু মিয়ার বউ। ঘটনা কি দেখতে গিয়ে ঘরে উঁকি দিয়েই নাকে লাগে বিকট গন্ধ। হঠাৎ চালের মাচা থেকে দেখা যায় হলুদ লেজের কোনা। আল্লার নাম নিয়ে সাহস করে দরজা লাগিয়ে বাইরে এসে ডাকে দুলু মিয়াকে। তারপর ওই রাতে বাঘ মারা নিয়ে কত যে কাণ্ড ঘটে গেল। হিংস্র বাঘ তার চেয়ে তুমুল হিংস্র মানুষের ধাওয়া খেয়ে এদিক যায়, ওদিক যায়। হঠাৎ গর্জনে পিলে চমকে যাওয়া মানুষের দল দ্বিগুণ শব্দে চিৎকার করে – আল্লা আল্লা বলোরে, মা বনবিবির দোহাই। সোনামনির জামাই গরিবও ছিল সেই বাঘমারা দলে। অবশেষে এক ফেরে বল্লমের খোঁচা আর দায়ের কোপে ঝাঁঝরা হওয়ার আগে বাঘটা থাবা চালিয়েছিল গরিব আলীর দিকে। এক ঘায়ে গরিবের মুখের এক পাশ ঝুলে যায়। বাঘের রক্ত মানুষের রক্ত যখন একখানে মাখামাখি, তখন সবার খেয়াল হলো গরিবকে হাসপাতালে নিতে হবে। টানা চারদিন সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে যমে-মানুষে টানাটানির পর সোনামনির কপাল খেয়ে চিরতরে বিদায় নেয় গরিব। সমাজ থেকে সংসার থেকে বিতাড়িত হয়ে আজ এই ঘরে আশ্রয় পাওয়া রাইয়ের কাছে কাঁদতে কাঁদতে সেসব স্মৃতিই ঘাটছিল সোনামনি। সাত-আট বছর আগের সেই বাঘ মারার ঘটনা আজও মনে রেখেছে লহুখালীর মানুষ। দুলু মিয়ার ঘরের আশপাশটার নাম সবাই আজও ডাকে হুলো-মারা-পাড়া। অথচ সেই হুলোর শিকার গরিবকে কেউ মনে রাখেনি। সোনামনি দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে – আহারে গরিব, মরণের পরেও তোর গরিবালি গেল না। খুন খুন করে কাঁদতে থাকা সোনামনি চোখ মুছে নেয়। সে বুঝতে পেরেছে সময়টা তার কাঁদার জন্য নয়, এখন চোখের জল ফেলবে শুধুই রাই।

রাইমঙ্গল উপন্যাসের দ্বিতীয় পর্ব এখানে ক্লিক করে পড়ুন

বুজান, কপালে যদি দুঃখ লেখা থাকে, কে তারে খণ্ডায়। আমারে দেহ, বাপ-মায় সাধ কইরে বিয়ে দিছিল গৌরাঙ্গ মৌলির কাছে। খালি বিয়াই হইলো, বিয়ার সুখ পাইলাম না। ক্যান কতি পারো বুজান? একজনরে মনে ধরলো, ভাবছিলেম পলায়ে যামু। কই তাক তো আর খুঁজি পাইলাম না। লোকলজ্জার ভয়ে লুকোয় লুকোয় সোহাগ করে আদর করে মানুষটা আমারে থুয়ে চলে গেল। লোকে কয় বাদায় ঢুকি সে আর ফিরি আসেনি। কিন্তু আমার বিশ্বাস হয় না। জানো, আমি স্বপন দেখেছি, মানুষটা বাদা বনের ভিতর থাকি গুপ্তধন ছানি ছানি, আমার জন্যে কালিলতা ফুলের মালা বানায়েছে। আমারে কয়, রাই সুন্দরী তোমার গলায় এই মালা দিয়ে আপন করি নেবনে। আমি আসতিছি, চিন্তা কইরো না।

পেট যখন বেঝেছে, বাচ্চা তখন আমার। আমার শরীরের রস খাইয়েই তো ও পেটের মইধ্যে বড় হচ্ছে। তালি পরে তোমাগের এত প্রশ্ন ক্যান?

সোনামনি বেওয়া রাইয়ের চোখের দিকে তাকায়। কী সব উল্টাপাল্টা কথা কস, মঈন মিয়ার খোঁজ নাই কতদিন হইলো। এতদিন বাদার ওই দোজখের মেইধ্যে কেউ বাঁচে নাকি। আমি কই কি রাই, মঈন মিয়ার আশা তুই ছাইড়ে দে। তারে ওই গহীন বনের মইধ্যে হয় বাঘে নিছে, নয় জ্বিন-ভূত নিয়ে কোথাও গাইড়ে থুইছে। অথবা ডাকাইত ধইরে নিয়ে কাইটে ফেলি দিছে রায়মঙ্গলে। নালি পরে একটা মানুষ এমনি করে উধাও হয়ে যায়! থাউক দুঃখ করিস নারে বইন, দুঃখ করিস না। কথাগুলো বলতে বলতে সোনামনি বেওয়া হাত বুলায় রাইয়ের মাথায়। অন্যদিকে রাই যেন কোন মূল্যবান ধন হারানোর ব্যাথায় আরও কাঁদতে থাকে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে। চালের গোলপাতা থেকে টপ টপ করে জল ঝরে, তার শব্দ হয়। অথচ রাই সুন্দরীর চোখের পুকুর যে উপচে পড়ে, সে ভেসে যাওয়ার শব্দ হয় না। সোনামনির মনে অবশ্য এমন এক প্রশ্ন ঘনিয়ে আসে, যার সম্ভাব্যতা নিয়ে বহু আগেই প্রস্তুত ছিল রাই। আর প্রস্তুত থাকবেই বা না কেন, রাই তো জানতো গৌরাঙ্গ মৌলি, সুবেশ, নবীনা এটা নিয়ে রাষ্ট্র করবে। ফুলে-ওঠা পেটও জানান দেবে প্রশ্নের অস্তিত্ব। তারপর এক কান দুই কান করে ছড়াবে গোটা লহুখালী। সুতরাং রাই প্রস্তুতই ছিল। প্রশ্নটা সোনামনির মুখে এসে যায় – আচ্ছা, এখন তো তুই আর আমি ছাড়া কেউ নাই। সত্য কইরে ক তো ভইন তোর পেটের বাচ্চা কার? পীরিত কইরে কি শেষ পর্যন্ত নিজের এমনই সর্বনাশ করলি!

একটা ভোঁদর মানুষের আভাস টের পেয়েই টুপ করে জলে নেমে যায়। কতক্ষণ পর কালচে সবুজ গহীন বাদার ফাঁক গলে একটা চিকন ভারানিতে এসে থামে নৌকা। নদীতে তখন ভাটা হলেও দুই মানব মানবীর শরীরে বিপুল জোয়ার।

পেট যখন বেঝেছে, বাচ্চা তখন আমার। আমার শরীরের রস খাইয়েই তো ও পেটের মইধ্যে বড় হচ্ছে। তালি পরে তোমাগের এত প্রশ্ন ক্যান? সোনামনি খেদটা বুঝতে পারে রাইয়ের, তাই আর পাল্টা প্রশ্ন করে না। উল্টো বলে – থাক, আর কতি হবে না, আমি বুঝিছি। তবে রাই থামে না, কোন অতীত ভাবনায় যেন সে ডুব দেয়। সেদিন চুলে টেরিকাটা মঈন মিয়া পুকুর পাড়ের ছনের আড়ালে এসে বলেছিল, চলো তোমারে খোয়াজ খিজিরের পট দেখায়ে নিয়ি আসি। আমাগের হোগলাগাতিতে কী সুন্দর যে গাজী পীর, খোয়াজ খিজির, বনবিবি, কারবালার পট হয়। তুমি দেখলি পরে কবা। কিন্তু গৌরাঙ্গের সংসার ফেলে রাই যায় কিভাবে। তার উপর নবীনা যে ছোঁকছোঁক করে, একবার দেখে ফেললে সাড়ে সব্বনাশ। কিন্তু মঈন মিয়া কথাই শোনে না। ছোট মানুষের মতো লোকটা যেন নাছোড়বান্দা। রাই সুন্দরীরও যে ইচ্ছা নেই তা নয়, কিন্তু পরিস্থিতি তৈরি হয় না। হাবড়া গৌরাঙ্গকে রাইয়ের মনে হয় আয়ান ঘোষ আর নবীনাকে জটিলা কুটিলাদের কেউ। কানুর বাঁশি যেন তাকে ডাকছে, আর রাই ঘর থেকে বের হতে পারছে না। অবশেষে একটা বুদ্ধি বের হলো। গৌরাঙ্গকে গিয়ে বললো, পাশের বাড়ির মহিমের বউ তাকে তার বাপের বাড়ি ঘুরতে নিয়ে যেতে চায়। বিয়ের পর থেকে ঘরে থাকতে থাকতে হাঁপায়ে উঠেসে সে। একটু তো ঘুরে আসতেই পারে। নবীনা মুখ ভ্যাংচালেও মহিমের কথা বলায় গৌরাঙ্গ আর রাগ করেনি। দুপুরে গৌরাঙ্গ বিছানায় একটু শরীর রাখলেই সবচেয়ে সুন্দর পাটভাঙা শাড়িটা পড়ে রাই হাওয়া। মঈন একটা ডিঙি নিয়ে অপেক্ষা করছিল খাল পাড়ে। কোন মতে রাইকে ডিঙ্গিতে তুলেই বৈঠায় লাগালো বাড়ি। কিন্তু মঈনের না রাইকে হোগলাগাতি নিয়ে যাওয়ার কথা, অথচ নৌকা তো অন্য দিকে বয়। ভয় নিয়ে রাই শুধায় – কই যাও বাওলি? ডিঙি তখন খাল থেকে বেরিয়ে রায়মঙ্গলে পড়েছে। মঈন উত্তর দেয়, মৌ তুলতে। আমি বাওয়াল না গো সুন্দরী। বাপ বাওয়াল আছিল বলি কি পোলাও বাওয়াল হবি? আমি তো মৌয়াল হবো বলেই গৌরাঙ্গ মৌলির লগ ধরিছি। নালি পরে তোমারে কই পেতাম। চলো, আইজ তোমায় বাদার এমন এক রূপ দেখাব, যা জন্মেও স্বপন দেখোনি। তোমার গতর ছানি ছানি আমি তুলি আইনবো দুনিয়ার সবচেয়ে স্বাদের মধু। মঈনের কথায় রাই ভয় পেয়ে যায়, অথচ পালানোরও তো পথ নেই। লজ্জায় ঝাঁপ দিয়ে নদীতে পড়তে পারে, কিন্তু তাও যে ইচ্ছা হয় না। শিরায় শিরায় খেলে যাওয়া রক্ত কথা কয় রাইয়ের সাথে। বিয়ের এত বছরেও গেরস্থ বিছানাতে যে আগুন গৌরাঙ্গ নামের শরীরের মানুষ নেভাতে পারেনি, সেটি না হয় এই মনের মানুষই নেভাক। রাই লজ্জায় লাল হয়ে অপেক্ষা করে, মঈন হয়তো আর কিছু বলবে। কিন্তু ডিঙির হালধরা সেই সেয়ানা কিছু বলে না, কেবল ইঙ্গিতে ইঙ্গিতে হাসে। উথালপাথাল রায়মঙ্গলের কিনার ঘেঁষে ঘেঁষে চলে নৌকা। মৃদু ঢেউ ঢলাঢলি করে পাড়ের উড়ি ঘাসের সঙ্গে। ফড়িং এক ঘাস থেকে উড়ে গিয়ে বসে অন্য শীষে। একটা ভোঁদর মানুষের আভাস টের পেয়েই টুপ করে জলে নেমে যায়। কতক্ষণ পর কালচে সবুজ গহীন বাদার ফাঁক গলে একটা চিকন ভারানিতে এসে থামে নৌকা। নদীতে তখন ভাটা হলেও দুই মানব মানবীর শরীরে বিপুল জোয়ার।

(চলবে)

পূর্ববর্তী পর্ব

রাইমঙ্গল / পর্ব ১

রাইমঙ্গল / পর্ব ২

Share Now শেয়ার করুন