সুমন মজুমদার | রাইমঙ্গল | ধারাবাহিক উপন্যাস (পর্ব ২) | উৎসব সংখ্যা ১৪২৯

0
126

এটি এমন এক উপন্যাস যার কাহিনি আমাদের নদীমাতৃক বনাঞ্চলে ঘেরা গ্রামীণ জনজীবন, বিশেষ একধরনের পেশা, হিন্দু-মুসলমানের সম্পর্ক, নারী-পুরুষের মানবিক সম্পর্ক – এরকম অনেক কিছু ছুঁয়ে গেছে। পাঠককে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে জ্বলন্ত কিছু প্রশ্নের মুখোমুখি, প্রোথিত আছে বাংলাদেশের মর্মমূলে।

আগে যা ঘটেছিল

বহুকাল ধরে বহমান রায়মঙ্গল নদীর পাড়েই লহুখালি গ্রাম। সেই গ্রামেরই গৌরাঙ্গ বনে-বাদারে মধু খুঁজে বেড়ায়। এলাকার প্রায় সমস্ত হিন্দু ইন্ডিয়া চলে গেলেও গৌরাঙ্গ জন্মভূমি ছেড়ে ইন্ডিয়া চলে যায় নি, যাওয়ার কথা ভাবতে পারেনি। বয়স হয়েছে তার, দ্বিতীয়বার বিয়ে করেছে। বউ রাই সুন্দরী। গর্ভবতী। কিন্তু গৌরাঙ্গ জানে তার জন্যে নয়, অন্য কারো সংস্পর্শে এসে রাই গর্ভবতী হয়েছে। কিন্তু সে সেটা মেনে নেয় কী করে? এবার বিচার বসেছে গ্রামে।

পর্ব ২

বিচার সভাটা গৌরাঙ্গের বাড়িতেই হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সুবেশ আর নবিনা বলেছে, ঘরের পবিত্র উঠান যেখানে তুলশীতলা আছে, সেখানে এসব অপবিত্র বিষয়ে তারা আলোচনা হতে দেবে না। ফলে বয়জ্যেষ্ঠ আলফাজ মিয়ার বাড়ির উঠানই সই। কিন্তু হিন্দু বাড়ির পারিবারিক কাইজ্জা মুসলমান বাড়িতে হবে এটাই বা কেমন কথা! এ নিয়ে আপাতত কানাঘুষার অন্ত নেই। তবে সব ছাপিয়ে বিচার দেখতে আসা বাচ্চা কোলে মহিলা, চামড়া কুঁচকানো বুড়ো বুড়ি, বিড়ি ফুঁকে চলা চ্যাংড়া, অতিউৎসাহী ভাদাইম্যার দল, হাড় জিরজিরে খালি গায়ের ছেমরা ছেমরি থেকে শুরু করে সবার আগ্রহ একমাত্র আসামি রাই আর ফরিয়াদি গৌরাঙ্গের দিকে। সবার মুখেই ছি ছি, সবার মনে একই কথা – আমার বাড়িতে কোন মাইয়া লোক এমন করলি কাইটে রায়মঙ্গলে ভাসায় দিতাম। তবে যার বেশি উত্তেজিত হওয়ার কথা ছিল সেই গৌরাঙ্গই যেন একটু ম্যাদা মেরে গেছে। আঁচলের কোনাটা ঠোঁটে কামড়ে আসামি রাই সুন্দরী দাঁড়িয়ে আছে ঘরের বেড়া ধরে এক কোণে। পায়ের বুড়ো আঙুলের নখ দিয়ে সে এমনভাবে মাটি খুঁটছে যে, এই ভূমিই তার আজকের অবস্থার জন্য দায়ী। বেশ সকালে বসেছে বিচারসভা, কিন্তু আলাপ আর খোশালাপ করতে করতেই অনেক সময় পার। বুড়ো আলফাজ মিয়ার আর ভালো লাগে না। তিনি বলেন – ওই গৌরাঙ্গ যা করার তাড়াতাড়ি কর, রইদ তো মাথায় চইলা আইলো রে।

গৌরাঙ্গ ফোঁস ফোঁস করে, আমি কী কমু। আমি তো সব কলামই। এখন ওই হারামজাদিরে জিজ্ঞাস করেন পেটের বাচ্চা কার। তয় ওইটা আমার না। গৌরাঙ্গের কথায় সবাই আবার আসন্ন রসালো তামাশার আশায় নড়েচড়ে বসে। প্রথমে মুখ খোলে মেশকাত মন্ডল। সবার উদ্দেশ্যে শুধায়, তা আমরা বোধহয় ধারণা করবার পারি কিছু কিছু। হোগলাগাতির কেউ যে লহুখালীর কোন গেরস্থের এমন সর্বনাশ করবি তা আমরা ভাইবতেও পারি নাই। এই যে সোহাগী, এখন মুখে কাপড় দিয়া শরম দেখায়া লাভ নাই। পেট তো আগেই বাঝায়া থুইছ, তখন শরম আছিল না। এখন ঘটনা কি সবাইরে খুইলে কও। গৌরাঙ্গদা তুমি শরম পাইয়ো না। বেশরম মাইয়া মানুষের জন্যে তুমি শরম পাইবা ক্যান?

গৌরাঙ্গ কথা বলে না কেবল থুতু ফেলে বিরক্তি নিয়ে আড়চোখে কিছু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা রাইয়ের দিকে তাকায়। সে একটু চিন্তিত। কারণ হারামজাদি রাতে তাকে হুমকি দিয়েছে, বেশি তেরিবেরি করলে নাকি তার গোপন ব্যবসার খবর সবাইকে জানিয়ে দেবে। ঘরে যে এখনো পলিথিনে প্যাঁচানো চারটি হরিণের চামড়া আর কিছু বাঘের হাড়গোড় আছে, সেকথা ফাঁস হলে মুশকিল। এমনিতে বাদাবনে চোরা শিকার নিয়ে ফরেস্ট অফিস চাপে আছে। সে মাঝে মাঝে ফরেস্ট বাবুদের কিছু টাকাপয়সা দেয়, তার বিনিময়ে এসব চামড়া বা জীবন্ত কিছু বড় নদীতে দাঁড়িয়ে থাকা জাহাজে তুলে দেওয়ার সুযোগ সে পায়। তবে মরা পশুর চামড়া হাড়গোড় নিয়ে ব্যবসা করলেও বনদুর্গার কিড়া কেটে গৌরাঙ্গ বলতে পারে, বাদায় ঢুকে নিজে সে একটি পাতাও সরায় না। দূরের ভদ্রাখালী গ্রামের আনোয়ার আর বিনোদ এসব কিছু সামলায়। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে সুবেশ। ওরাই এসব চামড়াসহ হাবিজাবি নিয়ে বাসায় দিয়ে যায়। এসব ভাবতে ভাবতেই গৌরাঙ্গের আসল চাওয়া শুরু হলো, সালিশ। সবার প্রশ্ন, সবারই কৌতূহল রাইয়ের পেটের বাচ্চা কার। বলতে তাকে হবেই, সমাজপতিদের এই সভায় কোন ছাড় নেই।

খানকিগিরিতে রাই গ্রামের কার চেয়ে কতটুকু এগিয়ে, সংসার ধ্বংসের মালমশলা কোনটার সঙ্গে কতটুকু মিশালে বিস্ফোরক ইস্যু তৈরি হবে, হিন্দু হয়েও মোসলমান মঈনের সঙ্গে তার ঢলাঢলি সে কতভাবে কোন ফাঁকে দেখেছে তার সবিস্তারিত নবীনা উগড়ে দেয় মানুষের সামনে। ছি ছি ছি, গেরস্থ বাড়ির জন্য এমন লজ্জা আর হয় না। তবু রাই চুপ, চরিত্রহনন চলছে চলুক, তাতে সাড়া দেওয়া যাবে না।

কিন্তু রাই তো জবাব দেয় না। সে কেবল নিচের দিকে তাকিয়ে নখ দিয়ে মাটি খুঁটে। মনে হয় পেটের ভিতর জীবন্ত কিছু একটা মোচড় দেয়। রাইয়ের শরীর শিরশির করে। তার পাশ ঘেঁষেই দাঁড়িয়ে ছিল সোনামনি বেওয়া। এই লহুখালি গ্রামে আর যত শত্রুই এখন থাক না কেন, সোনামনি যে তাদের কেউ নয় এ ব্যাপারে রাইয়ের কোন সন্দেহ নেই। সোনামনি নিজেই এক অভাগী, একে একে দুই স্বামীকে বাঘে নেওয়ায় সে অপয়ার চূড়ান্ত। সুতরাং শত্রুও তাকে সমঝে চলে, কোন শুভ কাজে যাওয়ার আগে কেউ তার মুখ দেখে বের হয় না। শুধু রাই ছাড়া। গ্রামের একেবারে শেষদিক সোনামনির ঘরটি যে হয়ে উঠেছিল রাইয়ের গোপন অভিসারের জায়গা, প্রাত্যহিক দুঃখ গঞ্জনার কথা বলারও স্থান। প্রথমে তাকে দেখে লোকজন গাইগুই করলেও পরে ওই বন্ধুত্বের সূত্রেই সোনামনি এসে এই বিচারে দাঁড়িয়েছে রাইয়ের পাশে। কিন্তু পাশে আর দাঁড়াতে পারছে কই, অপয়াকপালী বাঘবিধবার যে এখানে কথা বলারও অধিকার নেই। তারপরও শুধু পাশে দাঁড়িয়ে যদি অন্তত ভরসার হাতটা কাঁধে রাখা যায় তাহলে রাই হয়তো আশ্বস্ত বোধ করবে এই আশায় সোনামনি এসেছে। সে রাইয়ের কানে কানে বলে, কয়ে দে হতভাগি, কয়ে দে। কিন্তু রাই সুন্দরী কওয়ার আর সুযোগ পায় কই। তার আগেই নবীনা আঁচল কোমড়ে গুঁজে মাঠে নেমে পড়ে। খানকিগিরিতে রাই গ্রামের কার চেয়ে কতটুকু এগিয়ে, সংসার ধ্বংসের মালমশলা কোনটার সঙ্গে কতটুকু মিশালে বিস্ফোরক ইস্যু তৈরি হবে, হিন্দু হয়েও মোসলমান মঈনের সঙ্গে তার ঢলাঢলি সে কতভাবে কোন ফাঁকে দেখেছে তার সবিস্তারিত নবীনা উগড়ে দেয় মানুষের সামনে। ছি ছি ছি, গেরস্থ বাড়ির জন্য এমন লজ্জা আর হয় না। তবু রাই চুপ, চরিত্রহনন চলছে চলুক, তাতে সাড়া দেওয়া যাবে না। যেন মৌনতার ব্রত রেখেছে। কিন্তু চড়তে থাকা এই রোদে কাঁহাতক আর ধৈর্য্য রাখা যায়। সবার সামনেই গৌরাঙ্গ হা হা করে তেড়ে এলো। ক, হারামজাদি, কথা কস না ক্যান। কয়ে দে, কে তোর নাঙ লাগে, কোনহানে যায়ে পেট বাঝায়ে থুয়ে আয়েছিস। এবার যেন হঠাৎ করেই আনত নিমগ্ন চোখজোড়া ধক করে জ্বলে ওঠে নাগিনীর। গৌরাঙ্গের সামনে আঙুল তুলে রাই বলে, চুপ একদম চুপ। নালি পরে তুমার ল্যাঙ্গোটও আমি খুইলে দিবানে সবার সামনে। তুমি কোহানে কী কইরে বেরাও কয়ে দিবানে সব।

সবার সামনে রাইয়ের কাছ থেকে এমন অপ্রত্যাশিত ধমক আশা করেনি গৌরাঙ্গ। সে ভয় পেয়ে যায়, সত্যিই হারামজাদি গোপন সব কথা ফাঁস করে দেয় কিনা। বলা যায় না, দিলেও দিতে পারে। তাই রাইয়ের সামনে থেকে চলে যাওয়াই ভালো মনে করে। বরং উপস্থিত জনতার সাইড নিলে একটা আড়াল পাওয়া যাবে। দেকিছেন, দেকিছেন আপনেরা, চুরি তো চুরি আবার সিনাজুরি। আমি আর কথা কবোনে, যা বলবার আপনেরাই বলেন।

সালিশ বেশ জমে ওঠে। বেশরম রাইয়ের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া যায়, সেটাই এখন ঠিক করার বিষয়। বুড়ো আলফাজ মিয়া বলে, চুল কাটি হারামজাদিক গ্রাম থাকি বাইর করে দেওয়া হোক। মেশকাত মণ্ডল মনে করে, একশ ঘা বেতপেটা করলি মাগীর এমনিতেই পেট খালাশ হয়ে যাবি। কুদ্দুস দেওয়ান বলে, জাউরা বাচ্চাটা হোক, তারপর সেইটে সুদ্ধ কাটি নদীতে ভাসায়ে দিতি হবি। ভবতোষ ঘোষ অবশ্য একটু নরম, সে শুধু চায় রাইকে গ্রাম থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হোক। তবে গোপন কারবার ফাঁস হয়ে যাওয়ার ভয়েই হোক বা মায়া, শেষ পর্যন্ত গৌরাঙ্গের কারণেই বড় ধরনের শাস্তির হাত থেকে বেঁচে গেল রাই। ফরিয়াদিই যদি আসামির কম শাস্তি দাবি করে তাহলে তো বিচারকের কিছু বলার থাকে না।

বাবার কথা শুনে সুবেশ আর নবীনা খেই খেই করে উঠেছিল, কিন্তু গৌরাঙ্গ তাদের থামিয়েছে। ছেলে মেয়েকে কী বলে বুঝ দিয়েছে সেই জানে, তবে সুবেশ ও নবীনা আর কোন কথা বলেনি। গৌরাঙ্গ শুধু সবার সামনে বলেছে, যেহেতু এই বুড়ো বয়সেও সে পছন্দ করেই এমন একটি সুন্দর মেয়ে বিয়ে করে এনেছিল, সে জন্য ওর প্রতি তার মায়া এখনো আছে। তবে যে মেয়ে স্বামীকে ছেড়ে অন্যের সঙ্গে পাপ কাজ করতে পারে, তার সঙ্গে আর সংসার নয়। গৌরাঙ্গ চায়, রাই যেন এই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। তার সঙ্গে এই পরিবারের আর কোন সম্পর্ক নাই। তবে এই পোয়াতি অবস্থায় মারধর, হাবিজাবি করে কেউ যেন নতুন করে পাপের ভাগি না হয়। গৌরাঙ্গের বয়ান শুনে অন্যরাও তখন একমত, কোনভাবেই মারধর করে পাপের ভাগিদার হওয়া যাবে না। তার চেয়ে রাইকে ধরে হাত বেঁধে বাদায় ছেড়ে দিয়ে আসলে কেমন হয়, যা করার বড় মামাই করে দেবে। মেশকাত মন্ডলের রোমাঞ্চকর এই প্রস্তাবে তরুণ যুবাদের কাছ থেকে প্রথমে ক্ষীণ সমর্থন পাওয়া গেলেও, বয়জ্যেষ্ঠরা তা বাতিল করে দিলো। তার চেয়ে বরং ওটাকে ঘাড় ধরে ঘর থেকে বের করে দাও। জাউরা পাপের বোঝা নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ভিক্ষে করে খাক। যে স্বভাব, ভিক্ষাও হয়তো পাবে না, শেষে চলে যাবে বানিয়াশান্তা।

ওইদিকে সমাজপতিদের বক্তব্য শুনে এই প্রথম রাই তার ভরাট চোখ সামনে মেলে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। এই সংসারে তার আর থাকা হচ্ছে না, এই কথা শুনে ও খুশি হবে নাকি কাঁদতে বসবে, বুঝতে পারছে না। নিজের হাতে গড়া পূজার ঘর, পুকুর ঘাট, তুলশীতলা, চেনা বিছানা সবকিছু অপরিচিত হয়ে যাবে। বুকের ভিতর কোথায় যেন একটা মোচড় দিয়ে ওঠে। আবার ভেবেও খুশি লাগছে যে, এখন থেকে সে স্বাধীন। রাই জানে, ছয় মাস আগে বাদায় গিয়ে আর ফিরে না আসা মানুষটা কোথাও না কোথাও বসে তার কথা ভাবছে। তার কিছু হলে মন জানান দিতো। নিশ্চয়ই মানুষটা একদিন ফিরবে, অবশ্যই ফিরবে। হয়তো আর লহুখালী বা হোগলাগাতি নয়, আবার নতুন ঘর হবে তার। নাকি হবে না! রাই নিজের কাছে নিজের ছুঁড়ে দেওয়া প্রশ্নের উত্তর নিজেই খুঁজে পায় না। শুধু মনে হয়, আসুক মানুষটা। তারপর লহুখালী, হোগলাগাতি না হোক, উত্তরে মুন্সিগঞ্জ, টেপাপাড়া, শুলটাকিয়া, গাবুরা কোথাও না কোথাও মাথা গোঁজার ঠাঁই জুটেই যাবে।

বাদারে বাদা হেঁইয়ো। এই বড় মামা হেঁইয়ো। মাপ চাই, হেঁইয়ো। আল্লার কসম, হেঁইয়ো। মা বনবিবি হেঁইয়ো, দক্ষিণরায় হেঁইয়ো, শাহ জংলি হেঁইয়ো। ভাটার জল সরিয়ে হাঁটু সমান কাদার ক্যানভাসের উপর দিয়ে পরিশ্রমের চিত্র আঁকতে আঁকতে ইঞ্জিন নৌকা পাড়ের দিকে ঠেলছে ওরা । মানে সুবেশ, আনোয়ার, নিতাই, আওলাদ, মেশকাত মন্ডলসহ ১০ জন। এর মধ্যে পাঁচজনই লহুখালীর। বাকিরা আশপাশের গ্রামের। এবার মধু ও মোম কাটতে পারমিট পেতে দেরি হয়ে গেল। ইদানীং পারমিট নেওয়া কী যেই সেই কথা! নানা হুজ্জত এসে সামনে দাঁড়ায়। নাই টাকার সংস্থান, ইঞ্জিন নৌকা ভাড়া করোরে, দেড় সপ্তাহের জন্য দশ-বারো জনের খোরাকির ব্যবস্থা, কত যে ঝামেলা। বিট অফিস থেকে পারমিট নিতেই তো দম শেষ। তার উপর আবার আছে বিভিন্ন বিধিনিষেধ, বখরা। বনে ঢুকলে এটা করা যাবে না, ওটাতে হাত দেওয়া যাবে না, এই জিনিস আনা অবৈধ, ওই জিনিস আনতে ট্যাক্স দেওয়া লাগবে, আরো কত কী! তাই এবার টাকা পয়সা যোগাড় করে পারমিট পেতে পেতেই ওদের একটু দেরি হয়ে গেছে। অথচ মৌ কাটার মৌসুম শুরু হয়েছে সেই ফাল্গুনের মাঝামাঝি। কিন্তু ওরা বনে ঢুকতে ঢুকতে চৈত্র চলে এলো। এই সময়ে বসন্তের আবেশে গোটা বাদা ম ম করে। কোথাও ফোটে কালিলতা, কোথাও খলিশা, কোথাও বা গরান কেওরা। এছাড়াও আছে তরার কিরপি, ঢালচাকা, পশুর, ধুন্দল, গুঁড়ে, কাঁকড়া, হারগাজা, গোলজানা, বনলেবু, কেয়া, বাঁকঝাঁকা, হরিণআড়ু, লাটমে, সুন্দরী, ধানি, বাউলে লতাসহ বহু রঙ আর ঢঙের ফুল। যাদের ভিতরের রস চুষে টুপটুপে হয়ে ডালে এসে বাসা বাঁধে মধুপোকারা। মৌসুমের একেবারে শেষে আসে কেওরা আর গেওয়া ফুলের মধু। তবে এই চিংড়ির ভারানি এলাকায় এত কষ্ট করে নৌকা নিয়ে এসে আপাতত সুবেশদের লক্ষ্য তরল সোনা খলিশা ফুলের মধু।

এক ধর্মের মানুষ হয়া অন্য ধর্মের, অন্য গিরস্থের বউ ভাগায়া নেওয়া যার অভ্যাস সে উচিত শিক্ষে পায়েছে। সুবেশের কথায় সবাই থেমে যায়। সত্যিই তো মঈনের ওই ঘটনার কথা তো খেয়াল আসেনি। আনোয়ার খানিকটা মুখ খোলে – এখানে ধর্মের কতা টাইনে আনলি ক্যানরে সুবেশ। মঈন একটা অন্যায় করিছে, সেটা শুধুই অন্যায় হিসেবেই দেক না।

এই আট দশদিন বনে থেকে ওরা আশা করছে এবার অন্তত ৮০-৯০ কেজি মধু তো নিতে হবেই। তাহলে যদি এক একেক জনের সাত আট হাজার টাকা করে লাভ থাকে। নয়তো ঋণ শোধ করতে করতেই সব কষ্ট বৃথা হবে। পারমিট, নৌকা ভাড়া, খোরাকিসহ একেকজন তো কম ধার করেনি। আশার কথা হলো এবার বৃষ্টি বাদলা খারাপ হয়নি। আর কে না জানে খরা না থাকলে বসন্তে বন কেমন সুন্দরী হয়ে হয়ে ওঠে। এসব নানা দিক ভাবতে ভাবতে কাদা ডিঙিয়ে ওরা নৌকা ঠেলে পাড়ে তোলে। ততক্ষণে রোদ বেশ চড়ে এসেছে। সুবেশসহ প্রত্যেকেই ঘামছে দরদর করে, তাই নৌকার মধ্যে বসেই খানিকক্ষণ জিরিয়ে নেওয়া। আজ আর বনে ঢোকা হবে না, কারণ ঢুকলে বের হতে হতে দেরি হয়ে যাবে। আর অন্ধকার হয়ে গেলে তো বিপদের সীমা পরিসীমা থাকবে না। মেশকাত মন্ডল খালের পাড়েই একটু দূরে জমে থাকা জলে হাত পা ধুচ্ছিল। প্রথমে আনোয়ারই ওকে ডাক দেয় – ওই মোন্ডল সাঁজুনি বেশি দূরে যাইয়ো না কইল। বিপদের কিন্তু হাতপাও নাই। কিন্তু বাদায় এসে এসব খুচরা ভয় পাওয়ার কোন অর্থ যে হয় না সে কথা মেশকাত মন্ডল ভালোই জানে। কুমির কামট, সাপের ভয় থাকবেই, আর যদি ভাগ্যে থাকে বড় মামার কামড়, তাহলে কেউ তাকে বাঁচাতে পারবে না। তবে প্রতিবারের মতো এবারও এখানে আসার আগে বনের এক জায়গায় মেশকাতসহ অন্যরা মা বনবিবির থানে সিন্নি চড়িয়েছে। বনবিবির ভাই শাহ জঙ্গলি, দুখে, ধোনাই, মোনাই সবার পায়েই মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করেছে। মেশকাতের একটা রাতা মোরগ মানত ছিল সেটাও দেওয়া হয়েছে। নিতাই বনবিবির পায়ের কাছে রেখেছে নতুন পাটভাঙা রাঙা শাড়ি, সুবেশ পাকা কলার কাঁধি, আনোয়ার বাতাসা। বনের ভেতরেই সিন্নি রেঁধে পূজা সেরে ওরা ‘বনবিবির নামে আল্লা আল্লা বলোরে, দুখের নামে আল্লা আল্লা বলোরে’ স্লোগান দিতে দিতে এসেছে এখানে চিংড়ির খালে। সুতরাং এতকিছুর পরেও যদি বিপদ আসে তাহলে কিছু করার নেই, ধরে নিতে হবে সেটা নিয়তি। তারপরও সবার বাহুতে গাজী পীরের নামে দোয়া পড়া মাদুলি আর তাবিজ আছে, সেটাই ওদের বালা মুছিবত থেকে বাঁচাবে বিশ্বাস। হাত-মুখ ধুয়ে মেশকাত ফিরে আসতে আসতে দেখে আনোয়ার রান্নার জোগাড়ে লেগে গেছে। বনে মধু কাটতে এলে ওদের এই আট দশদিন নৌকাতেই থাকতে হয়। এখানেই রান্নাবান্না, এখানেই খাওয়া, এখানেই ঘুম। আজ দুপুরে খাওয়া খুব সামান্য। ভাত, সেদ্ধ আলু আর পোড়া মরিচ। আনোয়ারকে সবাই ভাত চড়াতে দেখে, কিন্তু ক্ষিদে জানান দিচ্ছে সবার পেটেই। পূজা থেকে আনা একটা মালশায় কিছু সিন্নি আছে। আপাতত ওটাই খেতে লেগে যায়। খেতে খেতে আঙুল চুষে নিতাই প্রথম কথাটা তোলে, আহারে গত মৌসুমেও আমাগো লগে মঈন আছিল। এত সাহসী পোলাটা যে কই হারাইল!

নিতাইর দীর্ঘশ্বাস একমাত্র সুবেশ ছাড়া যেন অন্যদেরও ছুঁয়ে যায়। যেন কিছুই শুনতে পায়নি এমন ভাব করে সুবেশ খেতে থাকে চুপচাপ। মেশকাত মণ্ডল মুখ খোলে – কই আর যাবি, মামার পেটে গেছে। ওইবার কত করি পোলাটারে কয়েছিলাম লগে লগে থাক, অন্তত বাদায় ঢুকি বেশি সাহস দেখাসনে। কে শোনে কার কতা। সেই ফলও পালো। মেশকাতের মুখের কথা কেড়ে নেয় আরেকজন, তারপর আরেকজন। নিস্তব্ধ এই দুপুরে জঙ্গলে এসে হারিয়ে যাওয়া মঈনের স্মৃতি ও সাহসের কথা যেন চক্রাকারে ঘুরতে থাকে সবার সামনে। কিন্তু এতক্ষণ সবার কথা শুনতে থাকা সুবেশের এক পর্যায়ে আর সহ্য হয় না। সে খেঁকিয়ে ওঠে – তোমরা চুপ করবা। কী আমার সোনার টুকরা পিতলা ঘুঘু আছিলরে। এক ধর্মের মানুষ হয়া অন্য ধর্মের, অন্য গিরস্থের বউ ভাগায়া নেওয়া যার অভ্যাস সে উচিত শিক্ষে পায়েছে। সুবেশের কথায় সবাই থেমে যায়। সত্যিই তো মঈনের ওই ঘটনার কথা তো খেয়াল আসেনি। আনোয়ার খানিকটা মুখ খোলে – এখানে ধর্মের কতা টাইনে আনলি ক্যানরে সুবেশ। মঈন একটা অন্যায় করিছে, সেটা শুধুই অন্যায় হিসেবেই দেক না।

ইটাকে খালি অন্যায় কওয়া যায় না মিয়া ভাই। তুমি মুসলমান তুমি বুইজবা না। এটা হলো হিন্দুগের ধর্ম খাওয়ার পেলান। সুবেশের এই কথায় অন্যরা মনে হয় একটু চমকেই গেল। হঠাৎ মঈন আর রাইয়ের রসালো প্রেমের উপর সুবেশরা এভাবে ধর্মের মোড়ক বসিয়ে দেবে তা কেউ কল্পনা করেনি। সবার আগে প্রতিবাদ আসে আওলাদের কাছ থেকেই। কারণ এখানে সবাই জানে আওলাদ কতটা ঘনিষ্ঠ ছিল মঈনের। দেখ সুবেশ, এই এক ঘটনা লয়ে তুই যে সব মোসলমানের উপরে দোষ চাপায়া দিলি, সেইটা ঠিক না। আরে ব্যাটা লহুখালী হোক বা হোগলাগাতি, এই খানের মোসলমানরা যদি এমনই হইতো, তাইলে তোরা এই কয়টা মালাউন শান্তিতে থাকতে পারতি। কত জাগায় কত কিছু হইলো, কই, তোগের কেউ একটা ফুলের টোকাও দিতি পারিছে?

ফুলের টোকা দিতি হবি ক্যান, ধর্ম নাশ কইরে দিলেই তো যথেষ্ট। আমি তোমগেরে কোন দোষ দিচ্ছি না। তয় সবাই তো সমান না। কত জন যে কত দিক থাকি ধান্দা করে চোখ কান খোলা রাখলিই বোঝা যায়। ক্যান, বিচারে ওই মাগীক একঘরে কইরলে না ক্যান তোমরা। কই তখন তো এত নীতিকথা আছিল না কারো মুখে। আমরা খালি হিন্দু বইলাই ওই মাগীক ছাড়ি দিতি পারিছো। সুবেশের মুখে যেন আগুন জ্বলজ্বল করে। যে আগুনের আভা ছুঁয়ে যায় অন্যদেরও। পড়ন্ত বিকেলে বাদাঘেঁষা নৌকায় জোর তর্ক জমে। তর্ক থেকে শুরু হয় দোষাদোষী। যেন হারিয়ে গিয়েও স্বয়ং মঈন উপস্থিত। এক পর্ায়ে তো সুবেশ আর আওলাদের মধ্যে ছোটখাট হাতাহাতিও হয়ে যায়। এমন এক সময়েই সুবেশ সবাইকে স্তম্ভিত করে ঘোষণা করে, এই দল থেকে আওলাদকে বেরিয়ে যেতে হবে। কাগজে কলমে মেশকাত মণ্ডল ওদের বহরদার হলেও যেহেতু নৌকা ভাড়া, ঋণ নেওয়া, পারমিট যোগাড় থেকে শুরু করে সব কিছুতেই সে কষ্ট করেছে, সুতরাং সেই এই দলের আসল নেতা। আর দলের নেতার নীতির বিরুদ্ধে কেউ বলে এভাবে পার পেয়ে যাবে সেটা হবে না। আওলাদও কম যায় না। পাল্টা ঝাপটা মেরে সেও বলে, এই দলে না থাকলে তার বালটাও ছেঁড়া যাবে না। মেশকাত, আনোয়ার, নিতাইসহ অন্যরা দু’জনকেই বোঝাতে চেষ্টা করে। কিন্তু ঘাড়তেড়া দুই জনই কেউ কারো কথা শুনতে রাজি না। আওলাদ বললো, সামনে কোন নৌকা পেলেই সে এটা ছেড়ে যাবে। তবে দেখে নেবে মালাউনের পো সুবেশ কীভাবে বাদা থেকে মধু এনে ব্যবসা করে। আর পরের শিক্ষা তো পরেই দেওয়া হবে। সুবেশও পাল্টা হুমকি দেয়, আওলাদের মতো তাড়ছেঁড়াকে সে চ্যাট দিয়েও পুছে না। সে জানে না, সুবেশের কার কার সঙ্গে যোগাযোগ আছে। মেশকাত মণ্ডল বোঝায়, অন্তত মধু আনা পযর্ন্ত যেন ওরা ঝগড়া না করে, সবাই যেন একসঙ্গে থাকে। কিন্তু সুবেশ ও আওলাদ সিদ্ধান্তে অনড়। বাকিরা ওদের ভয় পায়, কে কার দলে যাবে, কোন কথা বলে ফাঁসবে বুঝতে পারে না। কারণ সুবেশ আর আওলাদ দু’জনের সঙ্গে বিভিন্ন ডাকাত আর চোরা-শিকারী দলের যোগাযোগ আছে। শেষে কার সঙ্গে শত্রুতা করে কে প্রাণ হারায় কোনজনে জানে। কিন্তু মধু কাটা না গেলে তো যেই ঋণ নিয়েছে তা শোধ করতেই পারবে না। শেষে ঠিক হয় ওরা সুবেশের সঙ্গেই থাকবে। আর আওলাদ হুমকি দিয়ে এক জেলে নৌকায় উঠে বসে। চিংড়ির খাল ততক্ষণে ভেসে যাচ্ছে নতুন জলের যৌবনে, ভরা কাটাল।

(চলবে)

রাইমঙ্গল / পর্ব ১

 

Share Now শেয়ার করুন