সুরঞ্জন দত্ত চৌধুরী >> উত্তর আধুনিকতা, উত্তর ঔপনিবেশিকতা এবং ইত্যাদি >> গদ্য

0
169

উপনিবেশের প্রভুর প্রভাব থেকে বেরিয়ে আসতে অবশ্যই চাই সকলে। স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে বিকশিত হতে চাই। তাতে অসুবিধা কোথায়? কিন্তু প্রভুত্ব তো নানা প্রকারের। রাজনৈতিক, ধর্মবিশ্বাস, আর জ্ঞানের প্রভুত্ব। ঈশ্বরকণা শব্দটি জ্ঞানের হাত ধরে এসেছে। ইংরেজি, ফার্সি শব্দ এসেছে শাসকের হাত ধরে, সংস্কৃত আরবি এসেছে ধর্মবিশ্বাসের হাত ধরে, ইত্যাদি। তবে ঔপনিবেশিকতা শুধু শাসন ব্যবস্থা নয়, ধর্মবিশ্বাসের উপনিবেশ বিশ্বজুড়ে। এই প্রবক্তারা কোথা থেকে বেরোতে চাইছেন। মুক্তির পরে কি গোষ্ঠীর ভোকাবুলারিতে আবদ্ধ থাকতে হবে?

ঙ্গাল ভাষা, বাঙ্গালা ভাষা, বাঙলা ভাষা এবং বাংলা ভাষা নিয়ে ইদানীং উভয় বাংলায় কিছু কবি লেখক শিক্ষক-চাকুরিজীবী খুবই উদ্যোগী হয়েছেন বাংলা ভাষার জন্মান্তর , রূপান্তর এবং সময়ান্তর উপযোগী করে গড়ে তোলার। এই বিষয়টি বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। আমি অতি সাধারণ একজন সাময়িক পাঠক হিসাবে খবর পেলে বিদ্বান চিন্তাপ্রবণ উদ্যোগী মানুষজনের লেখা কিছু কিছু পড়া এবং আলোচনা শোনার চেষ্টা করি। এসব শুনে আমি আজকাল চিঠি লেখা তো দূর-অস্ত, বাজারের ফর্দ লিখতে গিয়েও মাঝে মাঝে থমকে যাই। থেকে থেকেই মনে হয়, বাংলাটা ঠিক লিখছি তো, বানানগুলি আচমকাই কেমন ভেংচি কেটে ওঠে। নয় নয় করে অনেক ক’টা শীত পার করেছি। বিদ্যারম্ভে একরকম শব্দ বানান, একটু বড় হয়ে লেখায় গুরুচণ্ডালীর জন্য নম্বরকাটা, বাড়িতে এসে শুদ্ধ বাংলা না লিখতে পারার জন্য ভর্ৎসনা-গঞ্জনা তৎসহ উপোসী রাখার ভয় দেখানো এসবই সহ্য করতে করতে উচ্চশিক্ষায় কসরৎ করার কাল কেটেছে। এসব নানা কারণেই অবচেতনে বাংলাকে এড়িয়ে চলার একটা প্রবণতা তৈরি হয়েছিল। আমার ধারণা প্রায় সকলেরই হয়। তুলনায়, কয়েকটি বানানের উদ্ভট জটিলতা বাদ দিলে , ইংরেরি আমার কাছে সহজপাচ্য ছিল। উপরন্তু, এই ভাষাতে স্থিতিস্থাপকতা অনেকটা উদার থাকায় সঙ্গী পাঠ্যবিষয়গুলি ইংরেজিতে পড়ে ভুল্ভাল ইংরেজিতে লিখে পরীক্ষকদের উদার দৃষ্টিভঙ্গীর সুযোগে পরীক্ষাগুলি মোটামুটি ভালোভাবেই উৎরে এসেছি। কারণ ভাসা-ভাসা একটা ধারণা ছিল ইংরেজি ভাষার চরিত্র নিয়ে।

স্বাধীন বাংলার অনেকেই ভাষায় কোলকাতার প্রভাবে দুষ্ট বাংলাকে উদ্ধারের জন্য উঠেপড়ে লেগেছেন । সে তারা করুন, এতে ভীত বা সন্ত্রস্ত হবার কিছু নেই। অধিক ডাক্তারের উপস্থিতিতে সহমত না হতে পারলে যেমন চিকিৎসা বিভ্রাটে রোগীর প্রাণসংশয় হতে পারে, তেমনি ভাষার ক্ষেত্রে তেমনটি হলে বিপর্যয়ের সম্ভাবনাই প্রবল।

ভিক্টোরিয়ান, এলিজাবেথান যুগে ঔপনিবেশিক আমলে ইংরেজিকে বিশ্বময় গ্রহণযোগ্য করে তোলার জন্য অনেক সরল করে দেওয়া। মূলত অতিসাধারণ ভাবের আদানপ্রদান এবং বাণিজ্যিক আলাপের বাহন হিসেবে যুগোপযোগী করে তোলাই তাদের উদ্দেশ্য। আর এ ছিল তাদের সভ্যতা আর শাসন ব্যবস্থাকে মানিয়ে নেবার সহায়ক। আমরা সহজেই যে-ভাষা আয়ত্ত্ব করতে পারি, আর দৈনন্দিন জীবনযাপনে অনায়াস প্রয়োগ করা যায়, এমন দৃষ্টিভঙ্গীই সহজগ্রাহ্য করে তুলেছে এবং তারা সফলও হয়েছে। বিশ্বে লিংক ল্যাঙ্গুয়েজ হিসাবে এর তুল্য কেউ নেই। এখনো তাই। বাণিজ্য বলুন, বিজ্ঞান বলুন, প্রেমে-অপ্রেমে এর জগৎজোড়া দাপট। আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, আহা আমার মাতৃভাষাটি যদি এমন সর্বস্পর্শধন্য হত, গরিমায় সারা বিশ্বে বুক ফুলিয়ে চলতে পারতাম। কিন্তু তা তো হবার নয়। আমার ভাষার নির্দেশে তো আর সুপার কম্পিউটার চলবে না, মঙ্গলযান ছুটবে না, চাঁদে গিয়ে মাটি খোঁড়াখুঁড়ি করবে না রোবো! কিন্তু এটাওতো ঠিক বাঙালি জাতির চৌহদ্দিতে আমার প্রাণের আবেগ, হৃদয়ের তৃষ্ণা আর মনের আরাম সবকিছুর জন্যই চাই আমার মাতৃভাষা। কিন্তু কোভিড উনিশের মতো ক্রমাগত ধরেবেঁধে এই ভাষার রূপান্তর ঘটালে, আমার মতো অনেকেই হয়ত ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়বে। এক-একটি বিশ্ববিদ্যালয় বানান নবায়নের জন্য নিজের নিজের মতো করে তার পদ্ধতি নির্ধারণ করে চলেছেন স্বাতন্ত্র্য রক্ষার জন্য। তা তারা করুন, ওসব পণ্ডিত মানুষদের স্থান, তাঁরা এসব করার হকদার। নানাদিক চিন্তা করে ভাষার উন্নতি সাধনে তাঁরা সতত সচেষ্ট। আমি এ নিয়ে এত চিন্তিত নই, শুধু বেচারা ছাত্রছাত্রীদের কথা চিন্তা করেই মাঝে মাঝে বিষাদগ্রস্ত হই। কোলকাতায় এক শব্দ এক বানান লিখলে নম্বর পাওয়া যায়, ঢাকার অন্য শব্দ অন্য বানান।

স্বাধীন বাংলার অনেকেই ভাষায় কোলকাতার প্রভাবে দুষ্ট বাংলাকে উদ্ধারের জন্য উঠেপড়ে লেগেছেন । সে তারা করুন, এতে ভীত বা সন্ত্রস্ত হবার কিছু নেই। অধিক ডাক্তারের উপস্থিতিতে সহমত না হতে পারলে যেমন চিকিৎসা বিভ্রাটে রোগীর প্রাণসংশয় হতে পারে, তেমনি ভাষার ক্ষেত্রে তেমনটি হলে বিপর্যয়ের সম্ভাবনাই প্রবল। অনুগ্রহ করে সে-দিকটা যদি পণ্ডিত ব্যক্তিরা বিবেচনায় রাখেন, অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গের মানুষ বাংলাদেশে গিয়ে কবিতা পড়ার ইচ্ছে হলে আগেই একটি বাংলাদেশের বঙ্গ অভিধান কিনে সঙ্গে রাখতে হয়, কিংবা অনুরূপভাবে বাঙ্গলাদেশ থেকে কেউ এসে শঙ্খ ঘোষের কবিতা পড়তে কলেজ স্ট্রিট থেকে সংসদের সরল বাঙলা অভিধান কিনে সঙ্গে রাখতে হয়, তবে সেটা হবে ইংলিশ আর আমেরিকান ল্যাঙ্গুয়েজের মতো দশা। বরঞ্চ তার থেকেও কঠিন বিষয়।

ভাষার যে স্বাভাবক চলন, তাকে অন্যখাতে বইয়ে দেবার কোনো কৃত্রিম প্রয়াস ভাষার দেহ প্রত্যাখ্যান করে। প্রাকৃত, সংস্কৃত, ফার্সি ইত্যাদির স্রোত বেয়ে স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে যে বাংলা ক্রমাগত বিবর্তিত হয়ে চলেছে, কালোপযোগী চলনে – তাতে ক্ষতির থেকে লাভই হয়েছে বেশি। বাঙালিরা তো লেখ্য আর কথ্য যুগপৎ উভয় ভাষাতেই দক্ষ হয়ে চলেছে অনেক কাল। তৎসম শব্দের আর্য-রক্তের কথা মনে করে যদি আমরা লিবারাল হবার জন্য মাইকেলের রচনাকে তৎসম-দোষে দুষ্ট ভাবতে শিখি, তবে বাংলার নিজস্ব বঙ্গভাষায় রচিত একমাত্র মহাকাব্য রচনার অহঙ্কার থেকেও নিজেকে সরিয়ে রাখতে হয়।

কল্লোল-কালিকলমের যুগেও বিদ্রোহ হয়েছিল রবীন্দ্রনাথকে উপেক্ষা করার। তাঁরাও শক্তিশালী কবিসাহিত্যিক ছিলেন। আসলে পরে তাঁরা বুঝেছিলেন, উপেক্ষা না করেও স্বকীয়তা থাকলে শক্তিশালী সৃষ্টি জনমানসে আদৃত হয়। আর যতদূর শুনেছি, ভাষাবিদেরা বলেন, বাংলা সংস্কৃতের গর্ভে জন্ম একথা একটি মিথ মাত্র। সংস্কৃতকে কল্পিত ঔপনিবেশিক ভাষা-শাসক প্রচার করাও একপ্রকার বিভ্রান্তি ছাড়া আর কিছুই নয় ।

সম্প্রতি দু-তিনজন কবি, ভাষা-পণ্ডিতের একটি আলোচনা পরম উৎসাহ নিয়ে শুনলাম। এতসব জ্ঞানগর্ভ কথা শুনে আমার তো আরো বেশি করে ভীতি জন্মালো। আজকাল ভয়ে দূরদর্শনে খবর দেখা বন্ধ করেছি, কেবল ভয় দেখায়। ঠিক সেইরকম ভাষা-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে উত্তর-আধুনিকতা বনাম উত্তর-ঔপনিবেশিকতার দুই উত্তাল তরঙ্গমালায় আন্দোলিত হচ্ছে কাব্যসাহিত্যের জগত। এই জিনিসটি কিঞ্চিত বোঝার আশায় ইদানীং দুঃসাহস দেখাচ্ছিলাম। সে-সম্পর্কে আমার মতো অতি সাধারণ বাঙালির একটু প্রতিক্রিয়া রেখে এই আলোচনার বিরতি টানবো, সাময়িকভাবে। সেটি নিম্নরূপ।

‘আধুনিক’ বিশেষণটির এমনই দ্যোতনা যে, যা এই মুহূর্ত পর্যন্ত বিবর্বিত। আমার মগজে প্রবেশ করে না, আধুনিকের আবার উত্তর হয় কী করে। আমার মনে হয়েছে, এই উত্তর-আধুনিকতার জোয়ারের সময় সকল প্রকার বিমূর্ত সৃষ্টির ক্ষেত্রে রেনেসাঁ বা নবজাগরণের যে-লক্ষণগুলি সর্বব্যাপ্ত ছিল, এবং এখনো ন্যায়, নীতি, যুক্তি, সিদ্ধান্ত, সত্যের রূপ, বিশ্বাস-অবিশ্বাস ইত্যাদির যে নিরিখগুলি না-মানার ডাক। নতুন ধারণার আবাহন। মূল্যবোধগুলিকে প্রশ্ন করা। উত্তর-আধুনিকতার প্রবক্তারা বলেন, এই সংশয়বাদিতাই হল উত্তরণের চাবিকাঠি।

“Post Modernism is an intellectual stance or mode of discourse defined by an attitude of “Skepticism” towards what it describes as “grand narrative” and “Ideologies of Modernism”, as well as opposition to “epistemic“ certainty and the stability of meaning. It questions and criticizes viewpoints associated with “Enlightenment Rationality” dating back to the 17th century, and is characterized by Irony, Eclecticism, and its rejection of the “Universal Validity“ of binary opposition stable identity, hierarchy, and Categorization. Post Modernism is associated with Relativism and a focus on Ideology in the maintenance of Economic and Political Power.
Post Modernists are “skeptical of explanation which claim to be valid for all groups, cultures, traditions or races”, and describe Truth as Relative.
It can be described as a reason against attempts to explain reality in an Objective manner by claiming that Reality is a mental construct.”

“বুঝিলাম কিছু নাহি বুঝিলাম জয় তব জয়” (রবীন্দ্রনাথ)। এই হল উত্তর আধুনিকতার বীজসূত্র। ১৯৭৯ সালে জাঁ ফ্র্যাঁসোয়া লিয়োতার্দ তাঁর The Post Modern Condition নামক একটি প্রবন্ধে এই ব্যাখ্যা তুলে ধরার পর অনেক বুদ্ধিজীবী তাতে আকৃষ্ট হন। পাঁচজন ফরাসি, দুইজন ইতালীয় এ বিষয়ে আলোচনা তোলেন। যদিও তাঁরা সকল বিষয়ে সহমত ছিলেন না তবু তাঁরা মার্কস, ফ্রয়েড ইত্যাদি দার্শনিকের স্ট্রাকচারাল অ্যাপ্রোচের প্রশ্ন তুলে “পোস্ট স্ট্রাকচার্যাজলিস্ট’ হিসাবে চিহ্নিত হতে থাকেন। এসব পণ্ডিত মানুষেরা আমার থেকে অনেক বেশি ভালো করেই জানেন। বিংশ শতাব্দীময় এসব ডিসকোর্স প্রচুর হয়েছে।

আমি অতশত বুঝি না, শুধু সিদ্ধান্তবিহীন সংশয় এক মাৎস্যন্যায়ের আবাহনী নয়ত? গবেষণার ক্ষেত্রেও সিদ্ধান্তের আগেও একটা প্রাক্-সিদ্ধান্তের ধারণার লক্ষ্য রাখতে হয়। এই উত্তর-আধুনিকতার লক্ষ্যের কোন ছবি থাকলেও তা আমার মতো সাধারণ মানুষের কাছে এক অজানা ধোঁয়াশা। আর যুক্তি জ্ঞান প্রজ্ঞার সোপান বেয়ে সত্যে পৌঁছানোর যে-সন্ধান তাতে মানুষের বোধের জগতে একটা বড় লাফ, এ আমরা সমাজে প্রতিফলিত দেখছি। অচলায়তন থেকে স্থবিরত্ব পরাজিত করে নবজাগরণ মানব সমাজকে সভ্যতার উচ্চতর ধাপে চলমান করেছে। এটা প্রমাণিত। কিন্তু উত্তর-আধুনিকতা তেমন কোনো কন্সেপ্ট হাজির করেছে বলে জানা নেই। আমরা সাধারণ মানুষেরা চমকিত হই এই সকল শব্দবন্ধে। এখন পর্যন্ত আমার ধারণা, জীবনের পরে আরেকটা জীবন অপ্রমাণিত বিধায়, জীবনের পরে মরণই চরম সত্য। তেমনি আধুনিকের পরেও আরেক আধুনিক অবস্থান বা অস্তিত্ব এখনো অধরা, কারণ আধুনিকতা সীমাহীন অনন্তের পরের অবস্থানেও আধুনিক।

লক্ষ্য করার বিষয় আধুনিক ভাবুকদের মধ্যে উত্তর-আধুনিকতা এক মানসিকতা তৈরি করেছে। মূলত নতুন কিছু ভাবতে হবে। আধুনিকতার যদি উত্তর হয়, তবে সভ্যতা সংস্কৃতি শিল্প সাহিত্যে উপনিবেশ পরবর্তী অবস্থা নিশ্চয়ই ব্যতিক্রম হওয়া বাঞ্ছনীয়, তাই উত্তর-ঔপনিবেশিকতার চিন্তা।

উত্তর-ঔপনিবেশিকের সংজ্ঞা কি ধরে নেবো। বিদেশী শাসন? উন্নততর সংস্কৃতির পত্তন সংস্কৃতিতে সাংস্কৃতিক স্রষ্টার হাত ধরে যদি হয় , তাতে ক্ষতির চেয়ে লাভই তো বেশি। প্রশ্নটা হল আমি শামুক হবো না ফুল হয়ে ফুটে উঠবো। বাংলায় আর্যশাসন কবে ছিল? ভাষার চলন ঠিক হয় ভাবের চলন অনুযায়ী। শব্দ আসে শাসক বা প্রভুর হাত ধরে।

১৯৮০ সালের সময়কালীন এই বিষয়টি বুদ্ধিজীবী মহলে আলোচনার বৃত্তে উঠে আসে। লেখালেখি শুরু হয়। মনে রাখা ভালো ইউরোপীয় কলোনিয়ালিজমকে মাথায় রেখে প্রধানত ইওরোপীয় সর্বগ্রাসী রাজনৈতিক প্রভুত্বের প্রভাবে অর্থনোইতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে যে ধারাটি প্রবাহিত হয়েছে , তা থেকে বেরিয়ে এসে স্বাতন্ত্র্যের বৈশিষ্ট্যে বিকশিত হবার বাসনাই এর পিছনে কাজ করেছে। আফজল খান, ফওজিয়া, কল্পনা শেষাদ্রি, লীলা গান্ধী, হার্লো, বারবারা হুক ডেরেকসহ শত শত লেখক ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন এই ডিসকোর্সে যোগদান করে নিজেদের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টিকে নিয়ে অনেক ভলিউম লিখেছেন, প্রকাশিত হয়েছে ইউরোপ থেকেই। যে-ইউরোপের প্রভাববমুক্ত হয়ে নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের স্রোতপ্রবাহ সৃষ্টি করতে চাই আমরা, ভৌগোলিক বিচারে তাও তো উপনিবেশ স্থাপনকারী দেশ। আমরা কি জ্ঞান, প্রজ্ঞা, শিল্পসাহিত্য জীবনযাপনের সংকীর্ণ ধারণায় কাঠামো গড়ে দিতে চাই? এগুলিকেও কি ভূগোল জাত-পাত-ধর্মবিশ্বাসের নাগপাশে বেঁধেছেদে একদেশীয় সত্তায় সীমিত রাখতে চাই?

উপনিবেশের প্রভুর প্রভাব থেকে বেরিয়ে আসতে অবশ্যই চাই সকলে। স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে বিকশিত হতে চাই। তাতে অসুবিধা কোথায়? কিন্তু প্রভুত্ব তো নানা প্রকারের। রাজনৈতিক, ধর্মবিশ্বাস, আর জ্ঞানের প্রভুত্ব। ঈশ্বরকণা শব্দটি জ্ঞানের হাত ধরে এসেছে। ইংরেজি, ফার্সি শব্দ এসেছে শাসকের হাত ধরে, সংস্কৃত আরবি এসেছে ধর্মবিশ্বাসের হাত ধরে, ইত্যাদি। তবে ঔপনিবেশিকতা শুধু শাসন ব্যবস্থা নয়, ধর্মবিশ্বাসের উপনিবেশ বিশ্বজুড়ে। এই প্রবক্তারা কোথা থেকে বেরোতে চাইছেন। মুক্তির পরে কি গোষ্ঠীর ভোকাবুলারিতে আবদ্ধ থাকতে হবে? চট্টগ্রামের ভাষায় কবিতা পাবনার মানুষ বুঝবেন তো? সিলেটের ভাষায় গান সব অর্থ বরিশালের আপামর জনগণ বুঝবেন তো? এ প্রসঙ্গে একটু লঘু সত্য ঘটনার কথা উল্লেখ করি।

পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড়ের মাথায় প্রধানত আদিবাসীদের জন্য একটি নিঃশুল্ক বিদ্যালয় ও ছাত্রাবাস আছে। সেটি পরিদর্শনে গিয়ে আমি শিখে এলাম অনেক কিছু, এই ভাষা ব্যবহারের বিষয়ে। আমি স্বভাবছাত্র, সমস্ত জায়গাতেই অজানা কিছু রয়েছে, এটাই আমার বিশ্বাস। অষ্টম শ্রেণীতে শিক্ষক পড়াচ্ছেন মালভূমি ও পাহাড়ি অঞ্চলে কি কি ফসল উৎপন্ন হয়। তিনি বহুবার পড়ালেন। অনেক নামের মধ্যে মিষ্টি কুমড়োর নাম বললেন। পুরুলিয়া বাঁকুড়া অঞ্চলে কুমড়ো আর পোস্ত খুব প্রিয় খাবার। শিক্ষক পড়ানোর পর প্রশ্নোত্তরের পালা। কেউ আর কুমড়োর নাম করে না, ভুট্টা জোয়ার আখ গম সব বলে কিন্তু কুমড়ো বলে না। আমিও ধন্দে পড়ে গেলাম। এই নামটি কেউ কেন মনে রাখতে পারল না। অথচ শ্রেণিকক্ষের জানালার বাইরে প্রচুর কুমড়ো দেখা যাচ্ছে। শিক্ষক মশাইয়ের অনুমতি নিয়ে আমিই একটু পড়ালাম, কুমড়ো শব্দটির বদলে ‘ডিঙ্লা’ স্থানীয় শব্দ ব্যবহার করলাম। এবার সকলেই উত্তরে প্রথমেই ডিংলার কথা বললো। কুমড়োকে স্থানীয় ভাষায় ডিংলা বলে। আমি শব্দ দুটিকে এবার কোরিলেট করে দিলাম। ছাত্রছাত্রীরা এরপর উত্তর দিতে গিয়ে কুমড়ো বলতে শুরু করল। নদীয়ার মানুষ ডিংলা চেনে না। কোলকাতার মানুষ চ্যাপা চেনে না, ময়মনসিংহের মানুষ এয়েচিলুম বোঝে না, আবার শ্যামবাজারের মানুষ আইবাম বোঝেনা। হ্যাঁ, এখানে উত্তর-ঔপনিবেশিক প্রবক্তারা বলছেন বাংলাদেশীয় ‘মান্য’ ভাষা সৃষ্টির তাগিদ অনুভব করছেন। প্রমিত শব্দটি কেতাবি, নবজাগরণের সংস্কৃতির ভাষা উচ্চবর্ণের ভাষা, সাধারণ মানুষের ভাষা না। ফজর, জোহর বাংলাদেশে সবাই বোঝে, সুতরাং কবিতায় চলবে, ভোর চলবে না। কেতাব আবার পশ্চিমবঙ্গের আপামর জনসাধারণ বুঝবে না। তাহলে উত্তর-ঔপনিবেশিক মান্যভাষাকে কি এমন করতে হবে যা বাংলাদেশের বাইরে অজস্র বাঙালির না বুঝলেও চলবে?

লেখ্যভাষাটি এখন প্রায় বাতিলের মুখে। প্রমিত যে কথ্যভাষায় এ যাবৎ লেখাজোখা চলছে, তাও তো মান্য বা স্ট্যান্ডার্ড ভাষা। নদীয়ার একটি অঞ্চলের সুমিষ্ট ভাষার চলনকেই তো গ্রহণ করা হয়েছে, যেমন ব্রিটিশ ইংলিশের স্ট্যান্ডার্ড ভাষার চলন অক্সফোর্ড নামক একটি এলাকার প্রাচীন ভাণ্ডার।

যেটিকে তারা কিতাব থেকে কেতাবি বলছেন, এই শব্দটিও একটা সময়ের আগে কোন বঙ্গভাষী বুঝত না। সহজ মানে হল, প্রচলিত কথ্যভাষাটি বাংলাদেশের পক্ষে অগ্রহণযোগ্য। আমার ছোট মাথায় যা মনে হয়, ভাষাকেও ভাগ করতে হবে। তা হোক, কাল ঠিক করবে কোনটা গ্রাহ্য, কোনটা অগ্রাহ্য হবে। লেখ্যভাষাটি এখন প্রায় বাতিলের মুখে। প্রমিত যে কথ্যভাষায় এ যাবৎ লেখাজোখা চলছে, তাও তো মান্য বা স্ট্যান্ডার্ড ভাষা। নদীয়ার একটি অঞ্চলের সুমিষ্ট ভাষার চলনকেই তো গ্রহণ করা হয়েছে, যেমন ব্রিটিশ ইংলিশের স্ট্যান্ডার্ড ভাষার চলন অক্সফোর্ড নামক একটি এলাকার প্রাচীন ভাণ্ডার।

আমার কাছে এই শব্দবন্ধগুলি চমক সৃষ্টি করে। লোকসাহিত্য শব্দের বিরুদ্ধে আমি, কিন্তু আমি মানি কাব্য-সাহিত্য বা সংস্কৃতির জরায়ু হল সৃষ্টিকারক ও উৎপাদকদের মস্তিষ্কে। শহুরে মানুষ এলিটিজম আরোপ করে তা কৃত্রিম করে।

আসলে বিশ্বমানব শৃঙ্খলে আবদ্ধ। মানুষের মাধ্যমেই পারস্পরিক সৌহার্দ্যে যে নান্দনিকতার সৃষ্টি , তা সামগ্রিক। বিভক্তি বৈশিষ্ট্য নয়। সমগ্রতাই মানববৈশিষ্ট্য। তার উদার আহ্বানেই সৃষ্টি সমৃদ্ধ হয়।

 

Share Now শেয়ার করুন