সুস্মিতা মিশ্র >> ঠগী, নৃশংস সম্মিলিত খুনের সংস্কৃতি >> প্রবন্ধ

0
646

ঠগী, নৃশংস সম্মিলিত খুনের সংস্কৃতি

ঠগীরা পৃথক কোন জাতিগোষ্ঠী ছিল না, বরঞ্চ দলগুলি ছিল বহু বিচিত্র, একাধিক বর্ণ, ধর্ম এবং নৃগোষ্ঠীর সাথে জড়িত। এককথায় এদের মধ্যে এক ধর্মীয় ভ্রাতৃত্ববোধ কাজ করেছিল। কারণ, মধ্যভারতে প্রায় অর্ধেক ঠগী ছিল মুসলমান। সেই মুসলিমরা সমস্ত মূর্তি পূজোর বিরোধী হওয়া সত্ত্বেও মা-কালীর পৌরাণিক গল্পটির প্রভাব প্রত্যাখ্যান করে নি।

সতেরো-আঠারো শতকে ভারতের বিভিন্ন স্থানে সাধারণ তীর্থযাত্রী বা পথযাত্রী মানুষদের কাছে এক ভয়ঙ্কর আতংকের নাম ছিল ঠগী। দক্ষিণ এশিয়ার সাথে জড়িত থাকার সময় ব্রিটেনের ঐতিহাসিক স্মৃতিতে ঠগী ছিল এক জনপ্রিয় চরিত্র। ১৮৩৯ সালের ফিলিপ মিডোস টেলরের উপন্যাস ‘কনফেশনস অফ দ ঠগ’কে দায়ী করা যেতে পারে এর জন্য। টেলর জানত না যে, তিনি এমন একটি প্রাচ্যচিত্রের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন, যা দীর্ঘস্থায়ীভাবে থেকে যাবে ইউরোপীয় ইতিহাসের পাতায়। এই কাহিনীর উপরে নির্ভর করে ১৯৮৪ সালে নির্মিত হয় হলিউডের বিখ্যাত ছবি ‘ইন্ডিয়ানা জোন্স এন্ড দি টেম্পল অফ ডুম’।
ঠগ, এই সংস্কৃত শব্দের থেকে ‘ঠগী’ শব্দটি উদ্ভুত। ভিন্ন বানান ও উচ্চারণে বাংলাসহ দক্ষিণ এশীয় সব ভাষায় প্রচলিত একটি শব্দ ঠগী। এর শাব্দিক অর্থ ধোঁকাবাজ, প্রতারক। মূলত এরা ছিল ভারতের একটি পেশাদার খুনী সম্প্রদায়। সারা পৃথিবীতে এমনকি ইতিহাসে এত নিপুণ এবং নৃশংস খুনীর দল বিশেষ দেখা যায় না। আঠারো শতকের গোড়ার দিকে এই শব্দটি হিন্দি থেকে ভারতে ইংরেজি ভাষায় প্রবেশ করে। শেরউডের লেখাতে ইংরেজি ‘ঠগ’ শব্দটি ইঙ্গিত দেয় ‘ভারতে পেশাদার ডাকাত এবং হত্যাকারীদের একটি সংগঠন, যারা সিল্কের স্কার্ফ দিয়ে তাদের শিকারকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে, এককথায় বলা হতো ‘ফাঁসিগর’। এটি এমন একটি রোমহর্ষক গল্প যা এখনো অব্দি সমালোচক পণ্ডিতদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে চলেছে।
কবে থেকে এদের আবির্ভাব, তা সঠিক জানা না গেলেও কিছু ঐতিহাসিকের তথ্য অনুযায়ী মনে করা হয় সপ্তম শতাব্দীরও আগে থেকে ছিল এই ঠগীরা। ফরাসি চীনাতত্ত্ববিদ স্তানিস্লাস জুলিয়েন তাঁর হিউয়েন সাং-এর জীবন-বিবরণীতে লিখেছেন, বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা ঠগীদের খপ্পরে পড়েছিলেন এবং ৬২৯-৬৪৫ সালে ভারত ভ্রমণের সময় হিউয়েন সাং দুই বার বেঁচে গিয়েছিলেন এদের হাত থেকে।
ঠগীদের সমস্ত কাজকর্ম অরঙ্গাবাদের নিকটে ইলোরার গুহার ভাস্কর্যে চিত্রিত আছে। ইতিহাস জানায়, ১৩৫৬ সালে ঐতিহাসিক জিয়াউদ্দীন বারানি লিখিত ‘ফিরোজ শাহর ইতিহাস’ গ্রন্থে প্রথম ঠগীদের কাহিনীর কথা পাওয়া যায়। সেখানে লেখা আছে, ফিরোজ শাহ একহাজার ঠগীকে গ্রেপ্তার করে গৌড়ে নির্বাসনে পাঠিয়েছিলেন। এর সাথেই ঘটে বাংলায় ঠগীদের আগমন। এই কাহিনী উনিশ শতকের ইতিহাসের বিবরণীতে স্যার হেনরি এলিয়ট পুনরাবৃত্তি করেন। আবার, ১৬৮৭ সালে ফরাসি পর্যটক জ্যাঁ দে থেভনোটের ভ্রমণসংক্রান্ত গ্রন্থটিতে ঠগীদের বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লিখিত আছে। তাই সম্ভবত ইউরোপীয় ঐতিহাসিকদের কাছে এটাই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য সময়কাল। ব্রিটিশ শাসনকালে ঠগীদের নিয়ে প্রকাশিত তিনটি গ্রন্থ বিশেষ উল্লেখযোগ্য। এর মধ্যে ১৮৩৯ সালে উইলিয়াম হেনরি স্লিম্যানের লেখা ‘দি ঠগস অর ফাঁসিগর অফ ইন্ডিয়া’, ১৮৩৬ সালে রামসিয়ানা লিখিত ঠগীদের ব্যবহৃত অদ্ভুত ভাষার একটি শব্দভাণ্ডার এবং ব্রিটিশদের কাছে বন্দী কিছু ঠগী দলনেতার মুখোমুখি কথোপকথন। যদিও, ১৮১৬ সালে ডা. রিচার্ড শেরউড ঠগীদের বংশবৃত্তির বিবরণ নিয়ে প্রথম একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন এবং তাঁর সেই রচনাই ঠগী-সংরক্ষণাগারের তালিকায় প্রথমস্থানে নথিভুক্ত রয়েছে।
কেন ফাঁস দিয়ে হত্যা? কারণ, ঠগীরা নিজেদের দেবী কালীর সন্তান বলে পরিচয় দিত। পৌরাণিক তত্ত্ব অনুযায়ী বলা হয় একবার দেবী কালী অসুরদের সঙ্গে যুদ্ধ করছিলেন, কিন্তু অসুরদের প্রতি ফোঁটা রক্ত থেকে জন্ম নিচ্ছিল আরও সহস্র অসুর। কালী তার কৌশল বদলেছিলেন এবং দু’জন পুরুষকে তৈরি করেছিলেন, তাদের হাত থেকে এক ফোঁটা রক্ত যাতে মাটিতে না পরে তার জন্য রুমাল দিয়েছিলেন। তাই মনে করা হয়, দেবী কালীর আদেশে রুমাল দিয়ে শ্বাসরোধ করে এই রক্তপাতহীন হত্যালীলা তারা চালাত। আর প্রাপ্ত লুটের সম্পত্তি মা কালীর আশীর্বাদ বলে মনে করতো। অন্য তত্ত্ব অনুসারে, এই পৃথিবীর শুরুতে সৃজনশীল এবং ধ্বংসাত্মক শক্তিগুলির অস্তিত্ব ছিল। দুজনেই সবসময় একে অপরের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত থাকতো। খারাপ শক্তি ধ্বংস করবার জন্য দেবী কালী তাঁর ভক্তদের আদেশ দিয়েছিলেন এবং তাদের সামনে ধ্বংসের একটি পদ্ধতির নির্দেশ দেন। ঠগীদের আদিপিতা নাকি কালীর কাছে শিখেছিল ফাঁস দিয়ে হত্যার রক্তপাতহীন পদ্ধতি। এই উভয় তত্ত্বই ঠগীদের বিশ্বাসকে দৃঢ় করে যে তারা ঐশ্বরিক আদেশের ভিত্তিতেই সংশয়হীনভাবে এই হত্যালীলা চালাত। ঠগীর এই ঐশ্বরিক উৎসের গল্পটি কার্যত স্লিমানের পরবর্তী সমস্ত ঔপনিবেশিক লেখায় পুনরাবৃত্ত হয়েছে। তিনি গল্পটি ঠগীদের জন্য নিযুক্ত তাঁর নিজস্ব গুপ্তচরদের জবানবন্দী থেকে গ্রহণ করেছিলেন।
কিন্তু ঠগীরা পৃথক কোন জাতিগোষ্ঠী ছিল না, বরঞ্চ দলগুলি ছিল বহু বিচিত্র, একাধিক বর্ণ, ধর্ম এবং নৃগোষ্ঠীর সাথে জড়িত। এককথায় এদের মধ্যে এক ধর্মীয় ভ্রাতৃত্ববোধ কাজ করেছিল। কারণ, মধ্যভারতে প্রায় অর্ধেক ঠগী ছিল মুসলমান। সেই মুসলিমরা সমস্ত মূর্তি পুজোর বিরোধী হওয়া সত্ত্বেও মা-কালীর পৌরাণিক গল্পটির প্রভাব প্রত্যাখ্যান করে নি। এই দ্বন্দ্বের ব্যাখ্যা হিসেবে গবেষকরা জানায় যে, উত্তর ভারতে মুসলিম বিজয়ের সময় হিন্দুদের ইসলামে ধর্মান্তরিত করার পরেও তাদের মনে হিন্দু ধর্মের মূলধারা ও রীতিগুলির প্রভাব বজায় ছিল। তাই, হিন্দুদের এই কুসংস্কারগুলি মুসলিম ঠগীরা পুরো নিষ্ঠার সাথে গ্রহণ করেছিল। তারা দেবী কালিকে নবী মহম্মদের (স.) কন্যা ফতিমা হিসাবে বিবেচনা করত। মুসলিম ঠগীরা প্রধানত তাদের সাতটি জাতি থেকে এসেছিল। সেগুলি হলো বাহলিম, ভিন, ভুজসোত, কাচুনি, হুত্তার, গানু ও তুন্দিল। হিন্দু ঠগীদের মধ্যে কামার, তাঁতী (তাঁতি), গোয়ালা, কঞ্জার, বেরিয়াস, কনৌজ (ব্রাহ্মণ) ইত্যাদি দেখা যেত। এরা মূলত দরিদ্র কৃষক বা ব্যবসায়ী বা কারিগর ছিল। বেশীরভাগ ঠগী ছিল জিপসি উপজাতি বানজারা এবং কঞ্জারের। এদের একটি বড় অংশ উত্তরের কানজারের উপজাতি এবং কিছু বুন্দেলখণ্ডের ব্রাহ্মণদের একটি দরিদ্র উপজাতি (মূলত ভিক্ষুক)।
ঠগীদের কার্যপ্রণালী অঞ্চলভিত্তিক ভিন্ন ভিন্ন ছিল। সাধারণত তারা দূরের যাত্রী ও তীর্থযাত্রীর সঙ্গে ছদ্মবেশে দল বেঁধে চলাচল করত। ভ্রমণকারীদের দলে ঢুকে তাদের প্রতি সহৃদয়তা ও সহযোগিতার মনোভাব প্রদর্শন করে বিশ্বাস অর্জন করত। সময়-সুযোগ বুঝে অসতর্ক মুহূর্তে পিছন থেকে রুমাল পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করত। এমন নিপুণভাবে কাজটি করত যে মৃতদেহে কোনরকম ধ্বস্তাধস্তির চিহ্ন পাওয়া যেত না। প্রতিটি হত্যাকাণ্ডে সাধারণত দুজন ঠগী থাকতো, একজন পা বা হাত ধরে রাখতো, অন্যজন হত্যালীলা চালাত। সর্বস্ব লুট করে ঠগী প্রথানুসারে সমাধীস্থ করার পরে তারা ঘটনাস্থলে আগুন জ্বালিয়ে দিত, যাতে সব চিহ্ন মুছে যায়। পথযাত্রীদের সাথে কুকুর বা ঘোড়া থাকলে সনাক্তকরণের ঝুঁকি হ্রাস করার জন্য তাদেরও মেরে ফেলতো। ব্রিটিশ যাদুঘরের নৃতাত্ত্বিক কক্ষে ঠগীদের মিলিতভাবে হত্যার একটি মডেল রাখা আছে, কিভাবে তারা কাজ করতো সেখানে বিষয়টি স্পষ্ট প্রকাশ পেয়েছে।
এ প্রসঙ্গে শ্রীপান্থ ‘ঠগী’ গ্রন্থে যা বলেছেন তার কিছু বিবরণ এখানে তুলে ধরছি। তিনি লিখেছেন, ‘ওরা হৃদয়হীন মানুষ, ইতিহাসের হিংস্রতম, নিপুণতম খুনী- ওরা ঠগি।’ তিনি তাদের খুনের উপকরণ নিয়ে লিখছেন : ‘উপকরণ অতি সামান্য। ঢাল নয়, তলোয়ার নয়, বোমা-পিস্তল-কামান-বন্দুক কোনো আগ্নেয়াস্ত্র নয়, একমাত্র হাতিয়ার সেই হলুদ রঙের রুমাল। রুমাল নয়, ওরা বলত ‘পেলহু’। কিংবা সিকা। খুলে রাখলে মনে হবে যেন পাগড়ী খুলে রাখা হয়েছে, অথবা ‘সাস’- কোমরবন্ধনী হিসিবে ব্যবহৃত কোনো কাপড়। দু’ভাঁজে ভাঁজ করার পর সেটির দৈর্ঘ্য মাত্র তিরিশ ইঞ্চি। আঠারো ইঞ্চি দূরে একটি গিঁট। গিঁটের প্রান্তে একটি রুপোর টাকা বাঁধা। নয়তো তামার একটি ডবল পয়সা। হাঁটু মুড়ে মাটিতে বসে মেপে মেপে অতি যত্নসহকারে ওরা যখন সেটি তৈরি করে, তখন দেখলে কিছুই বোঝা যাবে না। রুমালটা আসলে একটা ফাঁস। প্রান্তে বাঁধা সিঁদুর মাখানো টাকা ফাঁস আরও নির্ভুল, আরও নিটোল করার জন্য।’
বাংলাতে ঠগিরা কাজকর্ম সম্পাদন করতো বেশীরভাগ জলপথে নৌকোর মধ্যে। তারা পথযাত্রীদের মাথা জলে চুবিয়ে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করত। সাধারণত প্রতি বছর শীতকালে বাংলার জেলাগুলিতে এসে জড়ো হত এবং স্থানীয় অপরাধীদের সাহায্যে বর্ষা আসার আগ পর্যন্ত কাজ চালিয়ে যেত। ঠগীরা তাদের দেবীকে বাংলায় ‘ভবানী’ নামে ডাকত এবং দলের সর্দারকে ‘জমাদার’। ঠগীদের প্রধান তীর্থক্ষেত্র ছিল পশ্চিম বাংলার কালীঘাট ও বিন্ধ্যাচলের ভবানী মন্দির।
দশ বছর বয়স থেকেই ঠগী শিশুদের শিক্ষাদান শুরু হতো। তারা প্রথমে লুকিয়ে হত্যাকাণ্ড দেখত। তারপর বিশেষ কায়দাটি রপ্ত করানো হত। এভাবেই বংশপরম্পরায় চলতো তাদের খুন ও দস্যুবৃত্তি। লোকজনের মধ্যে সাঙ্কেতিক ভাষায় নিজেদের মধ্যে কথা-বার্তা চলাত। যেমন ‘বাসন মেজে আনার কথা’ বলার মধ্য দিয়ে সর্দার কবর তৈরি করার নির্দেশ দিতো। ‘ঝিরনী’ শব্দের মাধ্যমে হত্যার জন্য তৈরি হওয়া আর ‘তামাকু লাও’-এর মাধ্যমে হত্যার আদেশ দেওয়া। সর্দারের নির্দেশ পাওয়ামাত্র মুহূর্তের মধ্যে কাজ শুরু হয়ে যেত। গোষ্ঠীভুক্ত না হলে বাইরের কারও পক্ষে সংকেতের তাৎপর্য বোঝা ছিল অসম্ভব। বিভিন্ন কাজ আর দক্ষতার ভিত্তিতে এক পেশাদারি শ্রমবিভাজনের কাঠামো তৈরি করেছিল। যেমন সবার আগে থাকতো ‘সোথা’রা। সম্ভাব্য শিকার চিহ্নিত করা, ভাব জমানো এবং শিকার সম্পর্কে নানান তথ্য সংগ্রহ করতো তারা। পুলিশের গতিবিধির উপরে নজর রাখতো ‘তিলহাই’, কবর তৈরি করতো ‘বিয়াল’। শিকার ধরে রাখার দায়িত্বে ‘চামোচি’। শিকারের হাত ও পা আটকে রাখার দায়িত্ব ‘চুমোসিয়া’র। মৃতদেহ পাহারা দেয়া ও বিপদের খবর দেবার দায়িত্বে ‘ফুরকদেনা’ আর হত্যাকাণ্ডের জায়গাটা সাফসুতরো করে ফেলার কাজ করতো ‘ফুরজানা’। সব কাজ শেষে ঠগীরা সবাই মিলে মিষ্টি মুখ করতো গুড় খেয়ে।
প্রথমদিকে কোনো তীর্থযাত্রী নিখোঁজের খবরে ব্রিটিশ শাসকরা বিচ্ছিন্ন ঘটনা ভেবে পাত্তা দেয় নি। কিন্তু যখন ব্রিটিশরাও নিখোঁজ হওয়া শুরু করল তখন গর্ভনর জেনারেল লর্ড বেন্টিঙ্ক জানতে পারেন, এই কাজে একটি ধর্মীয় উগ্রপন্থীদের হাত রয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী প্রথম ঠগ গ্রেপ্তারের তারিখটি ১৭৯৯ সাল, ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে টিপু সুলতানের সেরিংপত্তমে যুদ্ধের পরাজয়ের পরে। ব্রিটিশরা তখনো নিশ্চিত ছিল না যে, অপরিচিত ব্যক্তিরা ঠগী নাকি বংশ পরম্পরাভিত্তিক খুনী সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষ। তারপর ১৮১২ সালে গঙ্গার ধারে একটি গণকবরের হদিশ পাওয়া যায়। সেখানে ৫০টি মৃতদেহ মেলে। সেই সময়ে ব্রিটিশ সরকার বিভিন্নস্থানে এই ধরনের আরও কয়েকটি গণকবরের সন্ধান পায়। চারিদিকে চলতে থাকা ঠগীদের এই দৌরাত্ম বাগে আনার কাজ। ব্রিটিশ প্রশাসন বেঙ্গল আর্মির অফিসার উইলিয়াম স্লীমানকে ঠগী দমনের দায়িত্বভার দেয়। স্লীমান ছিলেন অত্যন্ত বিচক্ষণ অফিসার, চারটি ভারতীয় ভাষা জানতেন। স্লীমান প্রথমে ঠগীদের কার্যকলাপ অনুসন্ধান করার জন্যে গুপ্তচর নিয়োগ করেন, তৈরি করেন এক বিশেষ পুলিশ বাহিনী ও পৃথক বিচারিক আদালত। পাশাপাশি তিনি ঠগীদের আক্রমণের জায়গাগুলি বিশ্লেষণ করে একটি মানচিত্র বানান, এবং একইসঙ্গে সম্ভাব্য পরবর্তী অপরাধের পরিকল্পনা আঁচ করে সময়কালের ও অঞ্চলের একটি তালিকা প্রস্তুত করেন। নিজের লোকদের ব্যবসায়ীর ছদ্মবেশে অস্ত্রসহ পাঠান বিভিন্ন তীর্থযাত্রীদের দলে। অবশেষে অনেক চেষ্টার ফলে ১৮৩০ সালে একে একে ঠগীরা ধরা পড়তে থাকে। তাদের অনেকের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, প্রাণদণ্ড, এমনকি দ্বীপান্তরে জেলে পাঠানো হয়। আস্তে আস্তে সারা ভারত তথা বাংলায় ঠগীদের দৌরাত্ম কমে আসে। তাই বলা যেতে পারে, ঊনবিংশ শতাব্দীতে ব্রিটিশ ভারতে বেন্টিঙ্ক, তাঁর সংক্ষিপ্ত প্রশাসনের সময়কালে (১৮২৩-৩৫) যে সমস্ত সামাজিক সংস্কার করেছিলেন, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল সতীদাহ প্রথা বাতিল এবং ঠগী দমন। ঠগীদের বিচারপর্বে উঠে আসে তাদের খুনের বিচিত্র মর্মস্পর্শী কাহিনী। ১৯৩৩ সালে স্লীমানের নাতি জেমস স্লীমানের লেখায় জানা যায়, একজন ঠগী মাসে গড়ে ৮-১০ জনকে খুন করতো। গবেষকদের মতে এই হিসেব অনুসারে গণনায় উঠে আসে, উনিশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত প্রায় ২০ লক্ষেরও অধিক মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল। বাহরাম বলে এক নিষ্ঠুর ঠগী সর্দার জানায়, ১৭৯০ থেকে ১৮৩০ সালের মধ্যে একাই প্রায় ৯৩১ জনকে হত্যা করেছে, যার নাম পরবর্তী কালে গিনিস বুক অফ রেকর্ডে ওঠে। তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল অনুশোচনা হয় কিনা? উত্তরে বাহরাম নির্বিকার কণ্ঠে বলেছিল, ‘ব্যবসার জন্য কারা আক্ষেপ করে!’
আজও গ্রামবাংলার মানুষের মুখে মুখে ফেরে ঠগীদের লোমহর্ষক কাহিনী। ঠগীদের কাহিনী ইতিহাসে প্রাচীনত্ব দাবি করে। যদিও, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকদের দৃষ্টিভঙ্গিতে সনাতন হিন্দু ধর্মের নামে এবং তান্ত্রিক ভাবধারাকে অনুসরণ করে চলা এক ভয়ানক খুনী সম্প্রদায় ছিল এই ঠগীরা। ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক ই. এম. ফস্টার ১৯২৪ সালে বলেছেন : ‘গড ইজ লাভ। ইজ দিস দ্য ফাইনাল মেসেজ অফ ইন্ডিয়া?’ বর্তমানে গবেষকরা এই মতের বিরোধিতা করে বলছেন, ভারতের সংস্কৃতিকে ভালভাবে উপলব্ধি না করার জন্যই ব্রিটিশরা ঠগীদের এমন হিংস্র করে দেখিয়েছে। তাই, বিংশ শতাব্দীর কিছু পণ্ডিত ঠগীদের উদ্ভবের পেছনে শুধুমাত্র ধর্মীয় ভাবাবেগের প্রভাবকে গুরুত্ব দিতে নারাজ। বরং তাঁরা এর পেছনে বস্তুবাদী ইতিহাসের সন্ধান করেছেন। ১৯৫৯ সালে হীরালাল গুপ্ত উনিশ শতকের গোড়ার দিকে ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির সম্প্রসারণবাদী নীতির মধ্যে ঠগীদের বিকাশের চিহ্ন খুঁজে পেয়েছিলেন। তাঁর অনুমান যে, ১৮৩০ এবং ১৮৪০ সালে ‘ঠগ এবং ডাকাত বিভাগ’ দ্বারা ধরা পড়া উল্লেখযোগ্য সংখ্যক লোক, পূর্ববর্তী সেনাবিভাগে কর্মরত ছিল। অর্থাৎ, এমন শাসকদের অধীনে কর্মরত ছিল, যাদের রাজ্যগুলি সেই সময় ব্রিটিশরা দখল করে। ঐ সব ব্যক্তি আসলে ছিল ভারতীয় রাজপরিবারের কর্মচারী। ব্রিটিশদের কাছে হেরে যাবার ফলে তারা কর্মসংস্থান হারায়। অন্যদিকে, সান্দ্রিয়া ফ্রেইট্যাগ ১৯৮৫ সালে লেখা একটি প্রবন্ধে স্থানীয় শাসকদের রাজত্বের অবসানের ফলে ভবঘুরে গোষ্ঠীগুলির স্থানচ্যুত হওয়ার বিষয়টিকে দায়ী করেছেন। ঐতিহ্যগতভাবে দেশীয় শাসকরা ভবঘুরেদের রক্ষণাবেক্ষণ করতো। আবার, অনেক গবেষক যৌথ-হিংস্রতার ঘটনাগুলির ব্যাখ্যা হিসাবে রাষ্ট্রের ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থাকে ইঙ্গিত করেছেন। স্টুয়ার্ট গর্ডন ১৯৬৯ সালে যুক্তি দিয়েছেন যে, আঠার শতকের শেষের দিকে মালওয়াতে (যেখানে বেশি সংখ্যায় স্থানীয় লোক যুক্ত ছিল) বিপুল সংখ্যক লুণ্ঠনগোষ্ঠীর উদ্ভবের পেছনে ছিল স্থানীয় জোতদার বা ভূমিধারকদের মদত, যাদের হয়ে ঐ লুটেরাগোষ্ঠী রাজস্ব আদায় করে দিত। বিনিময়ে পেত জোতদারদের কাছ থেকে সুরক্ষা, বিপুল পরিমান অর্থ বা জমি। এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন, ঠগীদের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল, তারা স্থানীয় অঞ্চলে কখনো লুঠতরাজ চালাত না। সাধারণত বেশ কয়েক মাস স্থায়ী অভিযানের পরে, প্রতিটি ঠগী দল যে অঞ্চল থেকে কাজ শুরু হয়েছিল সেখানে ফিরে এসে লুটপাটের দ্রব্য ভাগ বাঁটোয়ারা করে নিজেদের গ্রামগুলিতে অদৃশ্য হয়ে যেত। তারপর, প্রতিবেশীদের সাথে মিলে মিশে সন্দেহহীন অবস্থায় সাধারণ জীবন-যাপন করতো।
গবেষকদের মতে, সে সময়ে ভারতে একদিকে প্রচলিত ছিল হিন্দুবর্ণভিত্তিক প্রাচীন প্রথা (যেখানে ব্রাহ্মণ ও ঠাকুর শ্রেণি সমাজে উপরের স্থানে ছিল), অন্যদিকে মধ্যযুগীয় সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থা। এই ধরনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবেশই ঠগীদের উদ্ভবের জন্য দায়ী। দীর্ঘদিন ধরে ভারতে বিভিন্ন সুলতান বা নবাবের আমলে, এমনকি ব্রিটিশদের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের জেরে জমি-বিভাজন নীতির কারণে জমির মালিকানা ছিল খুব অল্প সংখ্যক মানুষের অধীনে। দেশের বাদ বাকি মানুষেরা জীবন নির্ধারণ করতো কেবল কৃষি বা কৃষিভিত্তিক কাজকর্ম করে। ভারতের কিছু কিছু অঞ্চলে আবার অনুর্বর মাটি ও অনাবৃষ্টির জন্য ফসলের উৎপাদনও কম হতো, এমনকি সেই সকল স্থানে অন্য কোন বাণিজ্য বা শিল্পের পরিবেশও উল্লেখযোগ্যভাবে অধরা ছিল, বিশেষত মধ্যভারতে। ফলস্বরূপ, জমির উপরে মানুষের প্রত্যাশার চাপ ছিল বেশি। এর সাথে আবার যোগ হত বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, তার ফলে দেখা দিত দুর্ভিক্ষ, যেমন ১৭৪৫, ১৮০৩, ১৮৩৭-৩৮, অর্থাৎ আঠারো শতকের শেষভাগ এবং উনিশ শতকের গোড়ার দিকে খরার কারণে সাধারণ গরীব মানুষ বারংবার চরম দুরাবস্থায় পড়ে। তখন তারা হতাশায় ও অনাহারে জীবিকা নির্বাহের অনৈতিক উপায়গুলি অবলম্বন করতে বাধ্য হয়েছিল। এ প্রসঙ্গে গর্ডন মন্তব্য করেছেন, ঠগীরা কেবল সাধারণ পথযাত্রীদের সন্ধানে রাস্তায় নামতো না, তাদের নজর থাকতো তেজারতি কারবারি দালালদের, ধনী ব্যবসায়ীর সম্পদ, ধনী বিদেশী সৈনিক এবং তীর্থযাত্রীদের উপরে। একবার ধনী ব্যক্তিকে পথে পেলে বাড়ি ফিরে যেতে সক্ষম হবে, এই আশায় দীর্ঘ দিন ধরে রাস্তায় পড়ে থাকতো, এবং একের পর এক হত্যালীলা চালাত। তাই বলা যেতে পারে, ধর্মীয় উন্মাদনা নয়, ঠগীর উদ্ভব এবং বিকাশের প্রকৃত বাস্তব কারণ রয়ে গেছে দারিদ্র্য এবং সামাজিক বঞ্চনার মধ্যে। ঔনিবেশিক শাসন ও শোষণের মধ্যে।

Share Now শেয়ার করুন