সেবন্তী ঘোষ >>আবেরদিন (দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব) >> নভেলা

0
89

দুই পর্বে প্রকাশিত নভেলার দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব

একদিকে আগ্নেয়াস্ত্রে সুসজ্জিত ইংরেজ ও কয়েদিরা, অন্যদিকে ওইসব তীর আর কুঠার নিয়ে লড়তে আসা আদিবাসীরা। একজনও ইংরেজ বা কয়েদির মৃত্যু হলো না। অন্যদিকে আদিবাসীরা পড়লো আর মরলো। সিংহ বিক্রমে লড়াই করে মারা গেলো হেরা। একনুর বুলেটবিদ্ধ দেহ সমুদ্রস্রোতে ভাসতে-ভাসতে দূরে চলে গেলো।

(৬)

তারমুগলি দ্বীপ। সমুদ্রের ধারে সাদা পরিচ্ছন্ন বালি আর সবুজ মেশা নীল জল। নারকেল গাছের সারির পরেই আকাশছোঁয়া দানবাকৃতির মহীরুহের সারি। দ্বীপের ভিতর পাহাড়ি অঞ্চলে গাছের ফাঁকে ফাঁকে বসতি শিমূল বা ভিভু, ও মহুয়া বা মওহার গাছ। বড় জঙ্গলে টক আমের গাছও প্রচুর। বাঁশ ও বেত মেশানো কুটিরে খেজুর বা নারকেল পাতার ছাউনি। এমনই একটা ছায়ান্ধকার ঘরে সর্বাঙ্গে কাদার মত ওষুধ লেপে রাজনাথকে শুইয়ে রাখা হয়েছে। দিন যায়। বছর পনেরো-ষোলো একটি মেয়ে তার পরিচর্যায় থাকে। রাজনাথ প্রথম কদিনের আচ্ছন্ন অবস্থায় কিছু ঠাহর করেনি, এবার খানিক যন্ত্রণার উপশম হওয়ায় আবছাভাবে চারপাশ দেখতে থাকে। সুস্থ হচ্ছিল দ্রুত চারপাশে স্থায়ী একটা পচা আঁশটে গন্ধ। মৃত্যুর পর কি এমন অভিজ্ঞতা হয়! কে জানে! তার তো এখন মরে যাওয়ার কথা।

রাজনাথ অচিরেই বুঝল এটা দ্বিতীয় জন্ম। যে বয়স্ক লোকটি তার প্রাণভিক্ষায় সাড়া দিয়েছিল তার নাম হেরা। ওর মেয়ে জিগা তার দেখাশুনা করে। রাজনাথ দেখে কটিবস্ত্র সম্বল পুরুষের মতো স্বল্প পোশাকে মেয়েরাও এখানে স্বচ্ছন্দ! জিগাও তাই। তার মা-বাবা একই রকম। কেমন ছাইমাখা পোড়া কালো চেহারা। খড়ি ওঠা। শরীরে সমুদ্রের নুন মিশে সাদা প্রলেপ ফেলে রেখেছে সব সময়।

রাজনাথের মাথা সেভাবে কাজ করে না। বেঁচে আছে না মরে গেছে এটা বুঝতেই তার অনেক সময় লাগে। যখন বুঝতে পারে যে সে বেঁচে রয়েছে, প্রাথমিকভাবে স্বভাবতই জীবনের প্রতি কৃতজ্ঞ হয়ে পড়ে। নীতি-নৈতিকতা নিয়ে মাথা ঘামাবার সময় এখন নয়। কখনো জ্ঞান আসে, কখনো অর্ধচেতনে তলিয়ে থাকে সে। নেশাচ্ছন্ন মনে হয় নিজেকে।

দিন যায়। জিগার সাহায্যে উঠে বসতে পারে সে। বৈদ্যর মতো এক বয়স্ক মহিলা আসেন। তাঁর কোলে ঝুলে স্তন্যপান করে শিশু। নির্বিকারভাবে প্রায় নগ্ন মহিলা, নগ্ন রাজনাথের সর্বাঙ্গে সবুজ লাল থকথকে একরকম ওষুধের প্রলেপ লাগান। প্রথমে একটু জ্বালা করে,পরে ঠাণ্ডা বাতাসের মতো আরাম হয়। হঠাৎ একদিন বাচ্চাটার মুখ ফসকে স্তনদুগ্ধ রাজনাথের মুখে এসে পড়ে। রাজনাথের গা শিরশির করে ওঠে। তার মানবিক চেতনা ফিরে এসেছে খেয়াল করে রাজনাথ নিজেই অবাক হয়ে যায়। রাজনাথ দেখে জিগা অপলকে তার দিকে তাকিয়ে আছে। জিগার নবগঠিত ডাবের মত উন্মুক্ত স্তনের দিকে চোখ আটকে যায় তার। আচমকা নিজের উত্থান টের পায় সে। গোপন করার জন্য উল্টো হয়ে শোয়ার চেষ্টা করে। দ্রুত উল্টো হয়ে শোয়ার চেষ্টায় ক্ষতস্থান আচমকা টাঁটিয়ে ওঠে। চেঁচিয়ে ওঠে রাজনাথ। বয়স্ক মহিলা বা জিগা কেউ তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে না, বরঞ্চ তাদের হাসির শব্দ শুনতে পায় রাজনাথ!

কদিনের মধ্যে পোতে নামে গোষ্ঠীপতি তাকে কোন মৃত বন্দির বা নাবিকের ছেঁড়া পোশাক এনে দেয়। রাজনাথ চারপাশের হাবভাব দেখে বোঝে পোতেসহ অন্য অনেকেই তাকে পৃথক রাখতে চায়। হেরার মুখের উপর কিছু না বললেও তারা বিরক্ত। স্বাভাবিক ভাবেই রাজনাথকে বাড়িতে এনে শুশ্রূষা এদের পছন্দ নয়। রাজনাথ সামান্য কটি বস্ত্র রেখে বাদবাকি কাপড় জিগার হাতে ফেরত দেয়।

রাজনাথের স্মৃতি ফিরে এল টুকরো টুকরো হয়ে। শোনা কথা আর তার জীবনে ঘটে যাওয়া কথাগুলি মিলেমিশে যাচ্ছে মনে হলো। জেমস প্যাটিনসন ওয়াকারের অধীনে দুশো বন্দী এসেছিল কলকাতা বন্দর থেকে।‌ ওয়াহাবি আন্দোলনের কর্মী ও নেতারা ছিল এই দলে। ১০ মার্চ ১৮৫৮ আন্দামানে আসে তারা। পোর্টব্লেয়ার থেকে এনে জঙ্গল পরিষ্কারে লাগানো হয়।‌ জঙ্গল সাফ হতেই দ্রুত শুরু হয় রাস্তা তৈরির কাজ।

পায়ে শৃংখল, গলায় নম্বর। তাঁবুতে থাকতে হল দলবেঁধে। এ তাঁবু যেনতেন প্রকারেণ মাথায় শুধু ছাউনি তোলা মাত্র। বাস্তুচ্যুত সাপের দল তাড়ানোর একমাত্র উপায় গরম জল ঢালা আর পালা করে রাত জাগা। নভেম্বর মাস নাগাদ কুটির তৈরি হলো। কয়েদিরা নিজেরাই নিজেদের জন্য তৈরি করল। এক হাজার বন্দী ঠাসাঠাসি যেখানে। অচিরেই এল আরও চার হাজার। এবারে সব সিপাহী বিদ্রোহের বিদ্রোহী। এমন সব ময়দানে জঙ্গ লড়া হাট্টাকাট্টা জওয়ানদের মধ্যে সাড়ে তিন হাজার স্রেফ অসুস্থ হয়ে মরে গেল!
নারিঙ্গুন সিং অসহনীয় অবস্থার আত্মহত্যা করেছিল বোধহয় রসে পা রাখার চারদিনের মাথায়।‌ নারায়ণ বলে এক ব্যক্তি পালাতে গিয়ে গুলি খেয়ে মরে। পালাবেই বা কোথায়? একদিকে সর্বগ্রাসী সীমাহীন সমুদ্রজল, অন্যদিকে গুমোট গরমের শ্বাপদ সরীসৃপ অধ্যুষিত জঙ্গল। এই দলে দলে আসা বন্দিরা চিরকালীন জঙ্গল পরিষ্কার করে আবাদ, বসবাসের জায়গা, রাস্তা তৈরি করছিল। দ্বীপগুলি জুড়ে পেনাল কলোনি তৈরি হচ্ছে। কয়েদিদের ন্যূনতম বাসস্থানের সঙ্গে সঙ্গে শাসকের প্রয়োজনীয় আবাস সরকারি ভবন হাসপাতাল ক্লাব কাছারি গির্জা তৈরি হচ্ছে। জমি তৈরি হচ্ছে চাষাবাদের জন্য। ডাকবুকো বিপ্লবী বন্দীরা এখন শ্রমিক মাত্র, আদিবাসীদের চক্ষুশূল তারা। আদিবাসীদের কয়েক হাজার বছরের অরণ্য জমির অধিকারে হাত পড়ে এবং স্বাভাবিকভাবেই অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে নামে তারা। কয়েদিরা দুই পক্ষের হাতে শহি দ হতে থাকে।আদিবসীদের পক্ষে বোঝা অসম্ভব ছিল যে এই কয়েদিরা বাধ্যতই এসেছে। এইসব প্রতিকূল পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত হয় ডাক্তার জেমস প্যাটিনসন ওয়াকারের মতো নৃশংস শাসক। একাশি জন বন্দী রস থেকে পালিয়ে আদিবাসীদের আক্রমণের মুখে পড়ে এবং ফের পালিয়ে আসে রসের কয়েদখানায়। একসঙ্গে তাদের হত্যা করা হয় প্যাটিনসনের উপস্থিতিতে। কেন তারা পালাতে চায়, তার যুক্তি হিসেবে সর্দার চমন সিং বৈদই বোধহয় এই কথাগুলো বলেছিল রাজনাথকে।

লেখাপড়া জানা মানুষ চমন সিং কিভাবে যেন কাগজ জোগাড় করেছিল। পালাবার আগেই সে পোর্টব্লেয়ারে এইসব তথ্যভরা ডায়েরি পাচার করেছিল। চমন সিং বলেছিল, রাজনাথও যেন সুযোগ পেলে সব লিপিবদ্ধ করে রাখে।

দ্বীপগুলি জুড়ে পেনাল কলোনি তৈরি হচ্ছে। কয়েদিদের ন্যূনতম বাসস্থানের সঙ্গে সঙ্গে শাসকের প্রয়োজনীয় আবাস সরকারি ভবন হাসপাতাল ক্লাব কাছারি গির্জা তৈরি হচ্ছে। জমি তৈরি হচ্ছে চাষাবাদের জন্য। জঙ্গল কাটা পড়ছে দেদার। ডাকবুকো বিপ্লবী বন্দীরা যেহেতু শ্রমিক, আদিবাসীদের চক্ষুশূল তারা।তাদের কয়েক হাজার বছরের অরণ্য জমির অধিকারে হাত পড়ে এবং স্বাভাবিকভাবেই অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে নামে তারা। কয়েদিরা দুই পক্ষের হাতে শহিদ হতে থাকে।

রাজনাথের মাথা কাজ করা শুরু করেছে। মনে পড়ে যাচ্ছে এ সব। সে বুঝেছে কোনোভাবেই বন্দি জীবনে আর ফেরা যাবে না। এই নতুন জীবনে সবটাই নতুন ভাবে শুরু করতে হবে।

রাজনাথ আর কিছুতে প্রতিবাদ করে না। চুপচাপ মেনে নেয় সব।

(৭)

রাজনাথের এখন মাথা কামানো। বাঁশের কঞ্চির সঙ্গে আটকানো ব্লেড জাতীয় বস্তুতে তাকে ক্ষৌরকর্ম সারতে হয়েছে। এই ব্লেড জাতীয় জিনিস আদিবাসীরা ভাঙা বা ডুবে যাওয়া জাহাজ বা সমুদ্রতটে এসে পড়া নানা বস্তু থেকে খুঁজে নেয়। কটিবস্ত্র ছাড়া জামা কাপড় ইচ্ছে করেই সে ত্যাগ করেছে। জিগা তার জন্য কোমরে পাখির পালক ও কড়ির ঝালর বানিয়ে দিয়েছে।

স্থানীয় খাদ্যে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। মূলত খাদ্য সংগ্রহ ও শিকারে এরা প্রাণধারণ করে। আগুন সংরক্ষণ করে। রাজনাথ ফলাহার সারে বেশিটাই। স্বল্পকালীন সিপাহী জীবনে তার খাদ্য সংস্কার ছিল কিন্তু দীর্ঘদিন সেসবের বালাই গেছে।
পোতে এই দলের বর্ষিয়ান শিক্ষক ও প্রভাবশালী সদস্য। সকলেই মান্যগণ্য করে তাকে। রাজনাথ দূর থেকে খেয়াল করেছে, ভাবুক পোতে মাঝে মাঝে নির্জনে একাকী সমুদ্রের দিকে চেয়ে বসে থাকে। পোতে রাজনাথের মুখোমুখি হলে অত্যন্ত বিরক্ত হয়। সে তার গোষ্ঠী বিষয়ে সচেতন। রাজনাথ তার কাছে শত্রু ছাড়া কিছু নয়।

পোতে তাকে তেমন সুনজরে দেখে না বলে একদিন জিগার সঙ্গে পোতের বাড়ি যায় রাজনাথ। খাড়ির পাশ ঘেঁষে খোলামেলা জায়গায় অনেকগুলি ঘর। ঘর না বলে বাঁশ-বেতের কাঠামোর ওপর ছাউনি বলাই ভালো। ইঙ্গিতে জিগা বোঝায় পোতের ছয় বউ ও তার বাচ্চারা সেখানে থাকে। রাজনাথ যখন পোতের কাছে ভাষা শিক্ষার ইচ্ছে জানায় সে অবাক হয়। দু একবার অন্য কিছু চাইছে কিনা জানার চেষ্টা করে বোঝে রাজনাথ শুধু ভাষা শেখার ইচ্ছায় এসেছে। পোতে ইশারায় জানায় তীর-ধনুক বা অন্য অস্ত্র তাকে দেওয়া হবে না, সে সবের ব্যবহার শেখানো হবে না কিন্তু। রাজনাথ সম্মত হয়। পরদিন থেকে বেলাভূমির ধারে গাছের খানিক আড়াল রেখে ভাষাশিক্ষা শুরু হয় তার।

জিগার বাবা হেরা, গোষ্ঠীর এক সম্মানিত ব্যক্তি। সহৃদয় মানুষ সে। তার দয়াতেই রাজনাথ প্রাণ ফিরে পেয়েছিল। জিগাদের ঘরগুলির পাশেই রাজনাথের জন্য ঘর তৈরি হয়েছে। চার মাসে সম্পূর্ণ সুস্থ সে। দেশে থাকলে যতো বড়ো বৈদই দেখুক না কেন, এমন ভয়ঙ্করভাবে আহত হলে রাজনাথ যে জীবিত থাকতো না সে ব্যাপারে নিশ্চিত সে।

আশ্চর্যের ব্যাপার যে গভীর ঘাগুলো অবধি শুকিয়ে গেছে! সর্দার চমন সিং থাকলে ওষুধগুলি বিষয়ে জেনে নিতে পারতো। রাজনাথ তাদের গ্রামে এর চেয়ে অনেক কম আহত সৈনিক বা তস্কর, ডাকাতকে, শত্রুর হাতে আহতদের, চিকিৎসার পরেও মরে যেতে দেখেছে।

রাজনাথের কথামতো জিগা অনিচ্ছা সত্ত্বেও খাঁড়িতে স্নান করে আসে নিয়মিত। ভিন্ন জীবনে জিগাই তার একমাত্র বিনোদন। মাসখানেকের মধ্যে প্রবল অধ্যবসায়ী রাজনাথ যখন কথা আদান-প্রদান করতে শিখেছে, পোতে তার কুড়ি বছরের মেয়ে লিপার সঙ্গে বিয়ে দিল তার। কেউ তার অনুমতি নিলো না। অনাড়ম্বর এক আয়োজনে গলায় মাথায় কড়ির ঝালর দুলিয়ে লিপা চলে এলো তার ঘরে।

লিপা চমৎকার বেতের ঝুড়ি বানায়। খাঁড়িতে তা দিয়ে মাছ ধরে রাজনাথ। সমুদ্র থেকে কুড়িয়ে আনা শাঁখ ঝিনুকে ফুটো করে মালা গাঁথে, পরে। কখনো তাতে ফেনার মতো প্রবালের টুকরো বসায়। সমুদ্র যা উপহার দেয় তাই দিয়েই কাজ চালায় এরা। সাঁতার জানলেও গভীরে গিয়ে প্রবাল তুলে আনা নিষেধ এখানে। লিপার দীর্ঘ কপাল শেষে কুচকানো মাথা ঘেঁষা চুল। কনুইয়ের উপর আর হাঁটুর নীচে লতায়-পাতায় ঝালর। কোটি বছরের মতো কোমরে ঝিনুক কড়ির মালা দোলে। কেবল ভারি গোলাকার স্তন পূর্ব দিগন্তের উজ্জ্বল সূর্যের মত আড়াল হয় না কিছুতেই।

রাজনাথ আস্থা অর্জন করতে থাকে ক্রমশ। অবাক হয়ে দেখে এরা তার কাছে কোনো পরিশ্রম বা গৃহস্থালির কাজ দাবি করছে না। ধীরে ধীরে শিকার বা জিগার ভাইয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানে সব জায়গায় সে স্বাগত হতে থাকে।

এমন অলস জীবন কখনো কাটায়নি রাজনাথ। গ্রামের আর সমাজের রীতি অনুযায়ী রতন দুবের সাত বছরের মেয়ে ভবানীর সঙ্গে তার বিয়ে হয়। রাজনাথের বয়স তখন সতেরো। আঠারোয় সিপাহী হয়ে ঘর ছাড়ে সে। ভবানী তখনও পিত্রালয়ে। রাজনাথের অস্পষ্টভাবে বালিকা ভবানীর কথা মনে আছে। গোলগাল গমরঙা মুখ, ডাগর চোখ। হিন্দু ব্রাহ্মণের বউ! কুলটা হয়ে সংসার না ছাড়লে, আর লুঠ না হলে ঠিকই স্বামীর জন্য অপেক্ষা করে থাকবে।

রাজনাথ তিওয়ারির সঙ্গে পরের মাসে বিয়ে হয় জিগার। রাজনাথ প্রথম থেকে কিশোরী জিগার সঙ্গ পেতে অভ্যস্ত ছিল। পোতের মেয়ে বলে লিপার সঙ্গে বোধহয় আগে বিয়ে হলো। বিয়ের পরও জিগা তার সঙ্গ ছাড়ে নি। লিপা কিছু মনেও করেনি। বিয়ের আয়োজন আগেরবারের মত সামান্যই। রাজনাথ একবাড়িতেই দুই ঘরে দুই বউ নিয়ে থাকে।

শুধু একেক দিন ঘুম থেকে উঠে মাথায় যেন তার আগুন ধরে যায়। পোড়া হাঁড়ির মতো মেয়েছেলেগুলো। হাতের চেটো পায়ের পাতা ফ্যাকাশে রক্তহীন সাদা। লাজ শরম নেই। সবার সামনে উদোম হয়ে ঘুরছে। জোরে জোরে কথা বলে, হাসে! প্রসাধনীর বালাই নেই! রাজনাথের বাড়ির মেয়েরা দুধের সরে হলুদবাটা মেখে মুখ চকচক করতো। শৈশবে দেখা অন্দরমহলের ওই সব দৃশ্য এখন স্বপ্নের মতো মনে হয়।

অসহ্য রাগে মনে হয়, তার শয্যায় কি করছে এরা? রাতের উগ্রতা, মাদকতা, শরীরের বাধ্যতা মুহূর্তের স্খলনে শেষ হয়ে যায়। বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণ বংশের রাজনাথ অন্ধ আক্রোশে আকাশছোঁয়া মহীরুহে মাথা ঠোকে। মূল ভূখণ্ড থেকে এই দ্বীপ পর্যন্ত প্রবাহিত সমুদ্রজল তাকে আরো অশান্ত করে তোলে। ঠাকুমার মুখে শোনা পুরাণের কোন একটা ঋষিমুণির গল্প মনে পড়ে। একচুমুকে তিনি নাকি সমুদ্রের জল পান করে তাকে তার গ্রামে পৌঁছে দিতে পারেন না? লোকচক্ষুর আড়ালে ঘন বনান্তরালে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে রাজনাথ।

লিপা তার খাবার প্রস্তুত করে। এতদিনে রাজনাথ ভাষা শিখেছে খানিক। লিপা, জিগার মত উচ্ছল চঞ্চল নয়। জাম্বু নামে এক নেতার সঙ্গে তার বিয়ের কথা চলছিল। রাজনাথ জানে না কেন, জাম্বুর সঙ্গে বিয়ে না দিয়ে তার সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হলো। জানার ইচ্ছা অবশ্য নেই তার। সে শুধু লিপার তৈরি খাবারের অপেক্ষায় থাকে। দেখে জাঁতার মতো পাথরে একরকম বুনো ধান এনে গুঁড়ো করা হয়। মেয়েরা খাদ্য সংগ্রহ করে, প্রস্তুত করে। শিকার করে পুরুষ। অবাক হয়ে দেখে পুরো দলটার অস্ত্রশস্ত্র আদিম যুগের মতো সেকেলে।

জিগার কাছে শোনে, পোতের মতোই সুর করে গান গায় জাম্বু। আজকাল জাম্বুর গানের তালে সবাই বেশ আকৃষ্ট। রাজনাথ জাম্বুকে দেখবে ভাবে। জিগা জানায় সে নানা কাজে অন্যান্য দিকে ঘুরে বেড়ায়। চাইলেই তাকে দেখতে পাওয়া যাবে না।
রাজনাথ নিজেও খানিক ব্যস্ত হয়ে পড়ে। হেরা ও পোতে এখন তাকে দলের নানা কাজে যুক্ত করেছে। জিগা ও লিপার সময় কমেছে। রাজনাথ অবাক হয়ে দেখে এদের গোষ্ঠীবন্ধন ও আনুগত্য এত বেশি যে এদের দুজনের মধ্যে হিংসা নেই। তার দেশে সতীনদের মধ্যে চুলোচুলি খুনোখুনি দেখে অভ্যস্ত সে। জাহাজেই এমন একটি খুনের আসামি মেয়েকে সে চিনেছিল। বটির এক কোপে সতীনের মুণ্ডুচ্ছেদ করেছিল!

রাজনাথ শান্ত জিগার সঙ্গে সময় কাটাতে চায় বেশি। জিগা ওকে নিয়ে যায় খাঁড়ির শেষে অগভীর সমুদ্র কিনারে। পান্না নীল জলে প্রখর সূর্যের আলো ধানক্ষেতের মতো হাওয়ায় দুলতে থাকে। রাজনাথের গ্রামের কথা মনে পড়ে। মনে মনে প্রতীজ্ঞা করে ইহজন্মে সেখানে সে পৌঁছবেই।

জিগা কটি বস্ত্র খুলে জলে নামে। রাজনাথ গঙ্গায় সাঁতার শিখেছে, এখন সমুদ্রে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। জিগা শেখায় কীভাবে শ্বাস চেপে অগভীর রঙিন প্রবাল প্রাচীরের কাছে যেতে হয়। এমন আশ্চর্য সুন্দর জগৎ যেন স্বর্গেই থাকে! কতো যে রঙ! এক জীবন্ত পাতালপুরী যেন! জিগা পাড়ে এসে বালিশ খুঁড়ে কাছিমের ডিম বার করে। কাছিমের পায়ে হাঁটা আচড়ের দাগ ও ঘ্রাণ, চার হাত-পায়ে এগিয়ে এগিয়ে খুঁজে বার করে সে। সেসব ওরা নিয়ে যায় লিপার কাছে। বাজে পোড়া বিরাট এক গাছের কোটরে, আগুন-জ্বালা অবস্থায় ছাইয়ের প্রলেপে ঢাকা কাঠের টুকরো রাখা থাকে। এই ‘চাড্ডা’ বা সংরক্ষিত আগুনের কেন্দ্রটি ঘুরেফিরে পাহারা দেয় এরা। যত্নে রাখে। ওখান থেকে আগুন নিয়ে ঘাস পাতা দিয়ে আগুন ধরায়। রাজনাথ শিখিয়েছে, পাতা দিয়ে মুড়িয়ে, তার ওপরে কাদামাটি দিয়ে আগুনে পোড়ায় ডিম। কাছিম ঝলসায়। বাঁশে বোনা খলুই দিয়ে ধরা মাছ পোড়ায়।

রাজনাথ হতভম্ব হয়ে গেছিল এরা আগুন ধরাতে জানে না দেখে! রাঁধতেও নয়! শিকার আছে, কৃষি কাজ নেই। শাসন ব্যবস্থা বলে কিছু নেই। দিনক্ষণের হিসেব নেই। সমস্যা হলে আলাপ-আলোচনায় মেটায়। গোষ্ঠীপতির মতো কেউ কেউ থাকে সেখানে। তবে গোষ্ঠীপতিরা নেতা হওয়ার জন্য সম্ভ্রম ছাড়া বিশেষ কিছু সুবিধা পায় না। রাজনাথের একটাই জেদ যে লিপা বা জিগাকে প্রতিদিন রাতে শোয়ার আগে স্নান করে আসতে হবে। অন্য মেয়েরা এতে হাসাহাসি করে। অকারণেই খুশি এরা। রাজা নেই, ভগবান নেই , বিচার ব্যবস্থা নেই, রান্না নেই! যৌনমিলনের সঙ্গে সন্তান ধারণের সম্পর্ক নিয়ে মাথাব্যাথা নেই। আয়ুধ সেই প্রস্তর যুগের মতো, শুধু বিরাট আকার তীরের ফলায় জলে ভেসে আসা লোহার টুকরো ব্যবহারই তাদের বহির্বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যম।

পোতে তাকে টহলে বা শিকারে নিয়ে যায় আজকাল। অস্ত্র তৈরীর জায়গাও দেখেছে রাজনাথ। বেশিরভাগ মানুষগুলি পাঁচ ফিটের উপর নিচ। লম্বাও আছে দু চারজন। মানুষগুলির সমান মাপের ধনুক তৈরি হচ্ছে সেখানে। সে সব বানাতে গাছের বাকল ছাল ব্যবহার করে ওরা। জবা জাতীয় এক বুনো গাছের ছাল শুকিয়ে শক্ত দড়ির মতো হয়, তা ছোটো দড়ির কাজ করে। ওষুধ থেতো বা গুড়ো করার জন্য মসৃণ চ্যাটালো পাথর ও নোড়ার মতো পাথর ব্যবহার করে।

সমুদ্রে ভেসে আসা বা জাহাজডুবিতে পাওয়া অজস্র কাঁচের বোতল ভেঙে ছোট ছোট অস্ত্র বানিয়েছে ওরা। রাজনাথ দেখে, কাঠের তীক্ষ্ণ হারপুন আছে মাছ ধরার জন্য। কখনো কাঁচের টুকরো কাঠের ডগায় লতা দিয়ে বেঁধেছে।

তামা লোহা জাতীয় ভাঙাচোরা ট্যারাবাঁকা ধাতুর স্তূপ দেখিয়ে পোতে বলে, এইগুলির প্রতি আমাদের আগ্রহ সবচেয়ে বেশি। সব যে ডুবে যাওয়া জাহাজে পেয়েছি এমন নয়, যেখানে সাদারা আর বন্দীরা থাকে সেখান থেকে তুলে এনেছি ।

রাজনাথ বলে, একে তো চুরি বলে!
পোতে ভাবলেশহীন ভাবে বলে, সেটা আবার কি? পৃথিবীতে এগুলি আছে। অন্য মানুষের হাতে ছিল। ওরা দেখেছে এবং এনেছে। আমরা আবার ওদের কাছ থেকে নিয়ে এসেছি।

এই ধাতু পাথর দিয়ে বা শক্ত ধাতুর অংশ দিয়ে পিটিয়ে তীরের ডগায়, পাথরের মুখে লাগায়। কাছিমের মাংস ছাড়ায়। খেয়াল করে দেখেছে এরা কাঁচ দিয়ে খাদ্যবস্তু ছেঁচা বা গুঁড়ো করার চেষ্টা করে না। রাজনাথ দু’চারটে কথা বলার পর বুঝতে পারে সামান্য একটা শব্দ ‘চুরি’-র অর্থ বোঝাতে সে ব্যর্থ। সে আর কথা বাড়ায় না।

(৮)

‘আকা বেয়া দা’ দলের সঙ্গে আছে রাজনাথ। জারোয়া জঙ্গি সেন্টিনেলিদের মতো এদের ‘জঙ্গিল’ বলে একটা দলের অন্তর্ভুক্ত বলে মনে করা হয়। ১৮৬০ সালে ব্রিটিশরা এদের চিহ্নিত করে। এদের ভাষা অন্য গ্রেট আন্দামানিদের মতোই, এক গোষ্ঠীভুক্ত। এসব অবশ্য তখন রাজনাথের জানার কথা নয়।

সন্ধ্যার সমুদ্রতীরে লিপা ও জিগাকে নিয়ে বসে থাকে রাজনাথ। উচ্চতা ও খানিক গাত্রবর্ণ ছাড়া অন্য আদিবাসীদের থেকে তাকে আর আলাদা করা যায় না। জিগা তার গায়ে বালি ছেটায়। কুড়ি পেরোনো লিপা তুলনায় শান্ত।
রাজনাথ বলে, তোমাদের পুজোর ঘর নেই? আমাদের দেশে তো আদিবাসীরাও পাহাড় পাথরের পুজো করে শুনেছি।
লিপা বলে, আদিবাসী মানে কি? দেবতা আবার কি?
রাজনাথ এখন আর তেমন বিস্মিত হয় না। বলে, কে তোমাদের দেখাশুনা করে রাখেন? কে রাখেন জানো? ওই ওঁরা সব স্বর্গে থাকেন। আকাশের দিকে তাকিয়ে সে ভক্তি ভরে হাতজোড় করে, হাত কপালে ঠেকায়। বলে, ওই বিষ্ণু, রামজি, সীতা মাঈ, হনুমানজি…
জিগা হেসে বলে ওই নামগুলো যাদের, তারা কি আমাদের মতো, জিগা, লিপা, সেলা, ইকনু?
রাজনাথ বিরক্ত হয়ে বলে, ছি ছি ছি! বিপদে শক্তি দেন তাঁরা। তাদের আজ্ঞা ছাড়া একটা ঘাসও জন্মায় না। মানুষ ক্ষুদ্র। তাঁদের ক্ষমতা অসীম।
লিপা এবারে শান্ত স্বরে বলে, মানুষ তিন রকম। আমরা তোমরা আর সাদাগুলো। মৃত হাড়ের মতো বিশ্রী রঙ ওদের। জাম্বুর অনেক ক্ষমতা। পূর্ব নারী-পুরুষদের ডেকে আনতে পারে মন্ত্রের বলে। এই বনজঙ্গল সমুদ্র ছেড়ে সাদাদের যেতেই হবে। সঙ্গে ‘তোমাদের’ লোকজনদেরও।
‘তোমাদের’ কথাটির উপর তেমন জোর দিতে অস্বস্তিবোধ করে বোধহয় লিপা।
তেত্রিশ কোটি ভূত ভগবানে বিশ্বাসী রাজনাথ একমুহূর্তের জন্য হলেও কেঁপে ওঠে। বলে, সৎকার হলে তারা ওই ভগবানের কাছে চলে যায়।
লিপা তেমনি শান্ত স্বরে বলে, আমরা চাইনা আমাদের পূর্ব মানুষগুলি আমাদের ছেড়ে চলে যাক। ওরা আমাদের আশেপাশেই থাকে। ওদের জন্যই আমরা সুরক্ষিত থাকি। শুধু দেখতে পাওয়া যায় না বলেই কি ওরা নেই?
রাজনাথ সহজ হওয়ার জন্য বলে, যাক! ভগবান না থাকুক, ভূত আছে তোমাদের!
তোমরা এলে কোথা থেকে? কেউ না কেউ তো তোমাদের সৃষ্টি করেছে?
লিপা বলে, পায়রা আগুন চুরি করেছিল কুরোতন সিক্কার কাছ থেকে। সেই আগুন থেকে এলাম আমরা।
রাজনাথ বলে, ভয় পেলে কাকে ডাকো? যুদ্ধে যাওয়ার আগে কাকে স্মরণ করো?
জিগা হাতের পাতা ভরে বালি এনে রাজনাথের মাথায় ঢেলে দেয়। তারপর রাজনাথ যে ভঙ্গিতে প্রণাম করছিল, ভারি একটা মজার খেলা যেনো, সেই ভঙ্গি নকল করে দেখায়। হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে।
মুহূর্তে ক্রুদ্ধ রাজনাথ নগ্নপ্রায় মেয়েটির উদ্দেশ্যে নিজের মাতৃভাষায় গালি দেয়! নোংরা কুক্কুরী, বানরী কোথাকার! কপাল আমার!
জিগা থতমত খেয়ে যায়। তবু তার মুখে হাসি লেগে থাকে।
লিপা কি বোঝে কে জানে, রাজনাথের হাত চেপে ধরে। অস্তগামী সূর্য যেখানে সবুজ নীল সমুদ্রে গলে মিশে রাঙা হয়ে উঠেছে, সেদিকে তাকিয়ে বলে, এই সূর্য আমাদের পূর্ব নারী-পুরুষের সময়ও উঠেছিল। আগামী নারী-পুরুষের সময়ও উঠবে। এই সমুদ্রও তাই। এরাই আমাদের প্রাণ বাঁচায়। খেতে দেয়। ভয় পাবো কেন এদের? কাকেই বা ভয় পাবো?
রাজনাথ উত্তেজনা দমন করে বলে, কাউকে ভয় পাও না? তাই হয় নাকি?
জিগা এখন পা ছড়িয়ে বসে কোলে রাখা কড়ি ঝিনুক থেকে শুকনো মাংস বের করে ফেলতে থাকে।
লিপা সেদিকে তাকিয়ে রাজনাথের দিকে মুখ ফেরায়। বলে, এখন তোমাদের ভয় পাই। পায়ে আঙটাওয়ালা তোমার সঙ্গীদের। সাদা হাড়গুলোকে ভয় পাই। সব বন কেটে দিচ্ছে। জলে মাছ ধরছে, কোথায় যাব আমরা?
রাজনাথের মুখে আসে কিন্তু কথা গিলে ফেলে। মনে মনে বলে, আমরা বন্দীরা যাব কোথায়? সাধ করে কি এই বুনোদের মধ্যে, নরকে এসেছি আমরা?
বাইরে বলে, এই ভয় থেকে কে ঠেকাবে তোমাদের?
লিপা গলায় পরা ঝালরের মধ্যে মালার মধ্যে কয়েকটা সাদা হাড় নির্দেশ করে। বলে, এইগুলি আমার মায়ের দিদার হাড়। এভাবে আমরা পূর্বজদের সঙ্গে রাখি। এরাই খারাপ থেকে বাঁচায়।
শিউরে ওঠে রাজনাথ! মানুষের হাড় গলায়? তাও ঠাকুমা দিদার! কি ভয়ঙ্কর! এইজন্যেই অন্যান্য অলংকার ছেড়ে শয্যায় এলেও লিপা বা জিগা ওই মালা খুলতে চায় না। জোর করলেও না। বমির মতো ভিতর থেকে ঘেন্না ক্রোধ অসহায়তা উঠে আসে। সিপাহী সে। শরীরের জোরে টিকে আছে এতোদিন। কিন্তু মন? থেঁতলে ভেঙেচুরে যা পড়ে আছে তা‌ আর মানুষের নয়। ভাগ্যপীড়িত এক দুঃসহ আত্মার। প্রবলভাবে আত্মসংবরণের চেষ্টা করে সে।
খানিক দূরে উঠে গিয়ে সমুদ্রস্রোতে পা ভিজিয়ে নামে। ঢেউয়ের সঙ্গে লড়তে লড়তে আরো এগিয়ে যায়। বমিটা এদের সামনে কিছুতেই করা যাবে না!

খাঁড়িগুলির ভিতরে চেপে আসা ঝোপালো গাছের তীক্ষ্ণ শিকড় জেগে থাকে। দুপুরের ভ্যাপসা গরম থমথম করে। একেক জায়গায় জলপথ এমন সরু যে মাথার উপর চাঁদোয়ার মতো গাছের ডাল পাতা আকাশ ঢেকে ফেলে। অবশ্যই জোয়ার ভাটার উপর খাঁড়ির চরিত্র নির্ভর করে। লাফ দিয়ে রাজনাথ একনুর সঙ্গে ক্যানোয় চাপে। সিপাহীর চামড়ার জুতো পরা পা আর গ্রামে নাগরা পরা পা এখন মুক্ত। প্রথম দিকে ক্ষতবিক্ষত হয়ে যেতো। পরে জিগার দেওয়া ভেষজ ওষুধের প্রলেপে তা সেরেও যায় দ্রুত।
রাজনাথের কাছে কোন সাহায্য নেয় না আকা-বেয়া-রা। কিন্তু এখন আর দলে নিতে আপত্তি নেই ওদের। রাজনাথ দেখে ‘ওকো-পাই-আড ‘ বা অতিলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী পোতেকে, পোতের উত্তরসূরি জিম্বাকে এরা গোষ্ঠীপতির চেয়েও সম্মান দেয়। জিম্বা ওদের ভবিষ্যতের নেতা। এখন সে দলের ছেলেপুলেদের সঙ্গে পাহারায় যায়। পোতে অতি বৃদ্ধ হলে বা মারা গেলে সে পোতের জায়গাটি পাবে। তখন সে আর যুদ্ধে বা শিকারে যাবে না। হয়তো পোতে এই কারণেই জাম্বুকে তেমন পছন্দ করে না।

‘ওকো-পাই-আড’ শব্দটির অর্থ হতে পারে যে স্বপ্ন দেখে বা দেখায়। পোতে সুর করে কিছু কথা বলে। উপস্থিত অন্যরা চুপ করে শোনে। সুর একঘেয়ে। কথাগুলি প্রকৃতি ও প্রাণী নিয়ে। খুব সহজ কিন্তু মন ছুঁয়ে যায়।
জিজ্ঞেস করলে পোতে বলে, সমুদ্র জঙ্গল বেলাভূমি এসব দেখে তার মনে কথাগুলি জাগেনি। জেগেছে হিংস্র সাদা মানুষগুলির সঙ্গে রাজনাথের মত লোকগুলোকে দেখে। যারা এসে এত বছরের – সেই সূর্য চাঁদ ওঠার সময় থেকে যেখানে তারা আছে, তাদের মেরে ফেলার যে আয়োজন হয়েছে সেই সংঘর্ষ থেকে সে অনুপ্রাণিত।
সে বুঝেছে সংঘর্ষ নাহলে সত্য উপলব্ধি করা যায় না। সমুদ্র- বাতাস- প্রকৃতি তাকে স্বাধীনতার ডাক দেয়।
রাজনাথের গা শিরশির করে ওঠে, ভাবে বলবে, তারাও দেশ স্বাধীন করার জন্য পরিবার পরিজন ছেড়ে এই কালাপানিতে নির্বাসিত। কিন্তু তার অভিজ্ঞতা বলেছে, লিপাকেও সে বোঝাতে পারেনি সমুদ্রের ওপারে তার দেশ আর এই দেশ একই। সে শুধু পোতেকে বলে, ওই সাদাদের আমরাও পছন্দ করি না। ওদের ধ্বংস করতে পারলে আমরা তোমরা সবাই বাঁচবো।
পোতে মাথা নেড়ে বলে, সে আমি বুঝি। সাদারা তোমাদের এখানে এনেছে। কিন্তু তোমরাও আমাদের শত্রু।
রাজনাথ সাহস করে বলে, অযথাই আমাদের দোষী ভাবছো, আমরা স্বেচ্ছায় আসিনি। বহুদূর থেকে জাহাজে করে বন্দী হিসেবে নিয়ে আসা হয়েছে। তোমাদের মতো আমরাও – একটু থেমে বলে, আমাদের ওই দলের মধ্যে অনেক বড়ো বড়ো বীর যোদ্ধা ছিল, গোলামি করতে চায়নি বলে হাতিয়ার ধরেছিল। সব মারা গেলো। ওরা খেয়াল করেনি কখন জাম্বু এসে পাশে দাঁড়িয়েছে।
জাম্বু বলে, তাহলে তোমরা জঙ্গল কাটছো কেন? দলে দলে ঘরবাড়ি বানাচ্ছো কেন? এখানে তো দিব্যি আমাদের কুটিরে থাকতে পারছো! আমাদের মতো বাড়িঘর বানাও না কেন? মাটিতেই মিশে যাবে সহজে। পাথরের মত স্থায়ী বাড়ি ছাড়া থাকতে পারো না কেন? কতো গাছ কাটা পড়ছে। কতো কতো দিন ধরে আমাদের সঙ্গে ছিলো। কতো পাখি মরে গেলো। পাথরের পথের কি দরকার?
রাজনাথ কথা খুঁজে পায় না। তার সতর্ক মন বলে, কথা বাড়ানোর প্রয়োজন নেই এখন।
জাম্বু মাথা নাড়ে। বলে, এই জঙ্গল সমুদ্রে আমাদের থাকার কথা। সাদা আর তোমরা কেউ এখানে থাকতে পারবে না। আগেও এসেছে অনেকে। সমুদ্রে ঘুরে বেড়ায় জাহাজে। আবার অন্য জাহাজের অন্য এক দল তাদের মেরে ফেলে সমুদ্রে ভাসিয়ে দেয়। চকচকে পাথর আর ধাতু জমা করে। আমরা ওদের পছন্দ করি না। ওইসব জাহাজের লোকগুলো আমাদের দিকগুলোয় আসতো, কিছু দিন থেকে আবার চলে যেতো। এই সাদাদের মতো সব দখল করতো না। চিরদিনের মতো আমরা এখানে অন্য কাউকে থাকতে দেবো না। সমুদ্র গাছ নদী পাথর ঝরনা তাহলে আমাদের পছন্দ করবে না। ঝড় আসবে। সব ভাসিয়ে নিয়ে যাবে।
রাজনাথ দেখে পোতে সমুদ্রের দিকে মুখ ফিরিয়ে চুপ করে বসে আছে। এবারে সে উঠে দাঁড়ায়, সমুদ্রের দিকে দু’হাত ছড়িয়ে বলে,

এসো কাছিম, তোমার তাজা উষ্ণ ডিম দাও।
পাখি উড়তে থাকুক, আকাশ থাকুক ওদের।
বৃক্ষময় কীট-পতঙ্গরা দৌড়ে বেড়াক রাতদিন।
আমরা হাসি নাচি আর উৎসবে মাতি।
কাছিমের চর্বি মাখি বিয়ের রাতে।
বন থেকে শুশ্রূষার ওষুধ আনি।
পৃথিবী মাটি আগুন জল।
তোমাদের কাছে আর কি চাইবো?
বেঁচে থাকার জন্য এই, এই অনেক!

রাজনাথ চুপ করে হাঁটুতে মাথা রেখে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থাকে। মায়ের মুখে শোনা হনুমান চালিশা মনে পড়ে। শব্দে, অর্থে কোনো মিল নেই কিন্তু দুলে দুলে বলার সুর যেন এক। বহু কষ্টেও সে আর পোতের সামনে চোখের জল গোপন করতে পারে না। হাউহাউ করে কাঁদতে থাকে।

(৯)

গ্রেট আন্দামানি আদিবাসীদের অনেকগুলি গোষ্ঠীকে একজোট করে গেরিলা আক্রমণ চালাতে শুরু করে। যদিও প্রাথমিক নিশানা ব্রিটিশ অফিসার, সাব ডিভিশন গ্যাঙম্যানদের উপর। পায়ের গোল আঙটার মতো বস্তুটা থেকে অনায়াসে সাজাপ্রাপ্ত বন্দীদের শনাক্ত করতে পারে তারা।

চাথামের উল্টোদিকে হাড্ডোর জঙ্গল সাফ করছিল বন্দীরা। আদিবাসীদের একটা দল নিঃশব্দে ঘিরে ফেলে তাদের। ইংরেজের বিনা পারিশ্রমিকের দাস এরা। কত জন নিরস্ত্র অসহায় অবস্থায় মরে, সে তথ্য অবশ্য পরে শাসকরা গোপন করে যায়। এতদিনে তারা গা করেনি, কিন্তু এবারে টনক নড়ে তাদের। সবল বন্দীর মৃত্যু মানে একটি করে সক্ষম শ্রমিক কমে যাওয়া। ওয়াকারের নেতৃত্বে মরিস ও স্টুয়ার্ট ফন্দি আঁটতে বসে। তাদের এখন চাই খবর। যে-কোনো মূল্যে।

রাজনাথের এখন মাথা কামানো। স্থানীয় খাদ্যে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। মূলত খাদ্য সংগ্রহ ও শিকারে এরা প্রাণ ধারণ ছুরি কুঠার মানুষ প্রমাণ লম্বা ধনুক বিষ মেশানো তীর তৈরি হতে থাকে। জড়ো হতে থাকে বেশি পরিমাণে। রাটল্যান্ডেই আকা-বেয়া-রাদের সবচেয়ে বড় বসতি। তারা দলে দলে জড়ো হতে থাকে। এতো ব্যস্ত যে জাম্বুকে আর দেখতে পাওয়া যায় না। ওদের সঙ্গে ক্যানোয় চেপে টহলদারিতে বেরোয় রাজনাথ। ওঠার সময় তাকে অবশ্য কেউ বলে না যে কোথায় যাওয়া হচ্ছে। বুদ্ধিমান রাজনাথ প্রশ্নও করে না।

এ খাঁড়ি ও খাঁড়ি পেরিয়ে এক দ্বীপ থেকে অন্য দ্বীপের মধ্যবর্তী সবচেয়ে সরু জায়গা দিয়ে অন্য দ্বীপে ঢোকে। এভাবে চাথামে আসে একদিন। বন্দীদের দূর থেকে দেখে রাজনাথ প্রবল উত্তেজিত হয়ে পড়ে। চিনতে পারে সুখবীর শর্মাকে, রূপলাল রজককে। ঝিলম কমিশনে একসঙ্গে আগে-পরে দণ্ডিত হয়েছিল ওরা। তাহলে রস থেকে ওদের এখানে আনা হয়েছে!

রাটল্যান্ডের অস্থায়ী আস্তানায় ফিরেও অস্থিরতা কাটেনি তার। খাড়ির সবুজ জলের সামনে দাঁড়িয়ে, প্রায় মুণ্ডিত-মস্তক নগ্নপ্রায় শরীর আর মুখে মাখা গেরুয়া সাদা মাটির রং মাখা নিজেকে দেখে যায় রাজনাথ। রূপলাল রজকও নিচু জাত বলে রাজনাথের সঙ্গে তফাৎ রেখে খেতো। মনে মনে অপছন্দও করতো। এই অবস্থায় তার সামনে গেলে, পালিয়ে দেশে ফিরলেও চিরতরে তার ধোপা নাপিত বন্ধ হয়ে যাবে। বাড়ির মেয়েদের বিয়ে হবে না। যদিও যুক্তি দিয়ে বোঝে রাজনাথ, দেশে কোন খবরই পৌছবে না তাদের, তবুও যতদিন প্রাণ আছে যুক্তির পরোয়া করে কে?

নতুন বিয়ে হওয়া অন্য তিনটি মেয়েকে শোয়ার ঘরে ঢোকায়নি রাজনাথ। গোষ্ঠীই বিয়ে দিয়েছে। লিপা এতেই সন্তুষ্ট। জিগার কাছে প্রশ্ন করে জেনেছে আপাতত তার আর বিয়ে হওয়ার সম্ভাবনা নেই। নানা সময়ের গোষ্ঠীযুদ্ধে বা সাদাদের আক্রমণ কালে তাদের দলের বহু পুরুষ মারা গেছে বলেই মেয়েদের সংখ্যা বেশি।

লিপা অন্তসত্ত্বা, তাই সে এখন রাজনাথের ঘরে কম আসে। সকালের দিকে মাছ পোড়া টক-মিষ্টি ঘরে রেখে যায়। এখন সে বেশ হাসিখুশি। রাজনাথ স্বচ্ছন্দে মাছের ডিম খায়। রাজনাথ সব কিছুই করে কিন্তু ভেতরে অস্থির। যেদিন থেকে সুখবীর আর রূপলালকে দেখেছে সেদিন থেকেই তার এমন দশা। আজকাল প্রায়ই সমুদ্রের ধারে পায়চারি করে অস্থিরতা কমানোর চেষ্টা করে।

দুপুরের দিকে একটা দল খবর নিয়ে এলো, সমুদ্রে ঘুরে বেড়ানো অন্য একদল সাদাদের একটা জাহাজ পাশের দ্বীপে এসে ঠেকেছে। ওই দ্বীপটি জলদস্যুদের দীর্ঘদিনের পরিচিত। এবারে আকা-বেয়া-রা তাদের স্বস্তিতে থাকতে দেয়নি। তীর চালিয়ে দুজনকে হত্যা করেছে। সবাই আবার দ্বীপ ছেড়ে জাহাজে উঠে গেছে বটে কিন্তু জাহাজ সেখান থেকে হটেনি।
জরুরি তলবে বয়োবৃদ্ধরা হাজির হয়েছে।
হেরা, ইকিজু বলে এক অতি বৃদ্ধকে বলে, তোমার অভিজ্ঞতা এদের বলো।
মাটিতে উবু হয়ে বসা একিজু বলে, আরও পিছনে সাপের দ্বীপে ওই আমার ছোটবেলায় এক জাহাজ এসে ঠেকেছিল। সাদা ছেলেমেয়ে ভরা। ঝড়ে আটকে পড়েছিল। খুব হৈচৈ আমাদের মধ্যে। প্রথম কদিন কেউ আশেপাশে গেলো না। ওদিকে আমাদের কোনো ঘরবাড়ি নেই। লোকগুলো ঝিনুক তুলে খাচ্ছিল। প্রায় চারটে পুরো চাঁদওয়ালা দিন ওরা আটকে ছিল ওখানে। আমাদের মাতব্বররা ছেলে ছোকরাদের আশেপাশে যেতে বারণ করেছিল। শুনলো না।
হেরা বলে, বাবার কাছে শুনেছি, ওদের ঘিরে ফেলে তীর মারলো অকারণে। ওরা তো ইচ্ছে করে এখানে থাকতে আসেনি। বাচ্চা ও মেয়েদেরও মারলো। বাচ্চা পেটেওয়ালা মেয়েকেও মেরেছিল। ‌ব্যস! সমুদ্র সেই রাতে ঝড় হয়ে উড়ে এলো। এই তারমুগলি ভাসিয়ে দিয়ে গেলো।
খানিকক্ষণ চারপাশ নিঃশব্দ।
যে ছেলে ছোকরারা তীর চালিয়েছিল তারা উসখুস করতে লাগলো। ওদের দলের নেতা জিম্বা এবারে নৈঃশব্দ্য ভঙ্গ করে বলে, সেটা ঠিক হয়নি। কিন্ত এবারে তো আমরা কাউকে ছাড়বো না। সেবার এবার আলাদা।
হেরা, পোতে আর জিম্বার মধ্যে কথা কাটাকাটি শুরু হলো। যদিও জিম্বা বেশিক্ষণ তর্ক করলো না।
পোতে বললো, ওই জাহাজের আশেপাশে যাওয়ার দরকার নেই। একনু, সিজো- তোমরা চাথামে গিয়ে খবর নিয়ে এসো।
চাথামের নামে রাজনাথ আবার উত্তেজিত হয়ে উঠলো।‌ হৃৎপিণ্ডের ওঠানামা যেন সবাই বাইরে থেকে দেখে নিতে পারবে, এমনটা বোধ হতে লাগলো তার। শিকার হোক, পাহারা হোক, তাকে এরা একা কোথাও পাঠাবে না। একই জায়গায় দ্বিতীয়বার তাকে ওরা সঙ্গে নেবে না।
জিম্বা তার সঙ্গে একেবারেই ভাব করতে আগ্রহী নয়। সে দলের অন্যদের বিয়ের অনুষ্ঠান বা নাচে-গানে উপস্থিত হয়েছে কিন্তু অন্যরা সেভাবে তাকে আপ্যায়ন করেনি। হেরা আশ্রয় দিয়েছে। পোতে নিজের মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দিয়েছে; তারা মেনে নিয়েছে এইমাত্র।

রাজনাথ শেষ বিকেলে সমুদ্রের ধারে এসে বসে। একবছর হয়ে গেছে সে এই দলের সঙ্গে আছে। পূর্ণিমা দেখে সে সব হিসেব লিখে রাখে। ভাঙা জাহাজের ভেতর থেকে বহু জিনিস পাওয়া যায়। জিগার সাহায্যে সে কাগজপত্র জমিয়ে রেখেছে ঘরে। প্রয়োজনমতো লেখালেখি করে সে। ভারী সুন্দর একটি মোমবাতি জোগাড় করে এনেছে জিগা। রাজনাথ দেখিয়ে দেয় সেটি কিভাবে জ্বালাতে হবে। সমুদ্রের তীরে এখানে আকাশছোঁয়া মহীরুহ। দুটি গাছের মাঝখানে সেই মোমবাতিটি জ্বালায় রাজনাথ। হঠাৎ স্যাডহ্যাম সাহেবের মেয়ের কথা মনে হয়। এই মোমবাতির মতো চকচকে সাদা ছিল তার গায়ের রং।
রাতে একনু এসে জানায়, চাথামে গিয়ে শুনে এসেছে সাদাদের প্রধান, এদিককার সব দ্বীপে জাহাজ নোঙর করতে দিতে বারণ করেছে।
রাজনাথ দম চেপে বলে, তুমি জাম্বুকে রাজি করাও। আমার মতো করে খবর কেউ আনতে পারবে না। তোমরা জানোই না কে ওদের নেতা।
একনু হেসে বলে, জাম্বু শিখিয়েছে, যার মাথায় লাল কাপড় বাঁধা, বুকে তারার মতো ধাতু আটকানো, কোমরে এই আমাদের মত করে চামড়া বাঁধা আর যাদের পায়ে আঙটা, এরাই আমাদের শত্রু। এদের মারতে হবে।
রাজনাথ জাম্বুর বুদ্ধিতে চমৎকৃত হয়। সে একনুকে বলে, আমি এর চেয়ে ভালো খোঁজ এনে দিতে পারবো। তুমি ভালো করে বোঝাও। যুদ্ধ শুরু হলে কোন দিক থেকে আক্রমণ করলে সুবিধা হবে এসব জানা দরকার।
একনু খানিকক্ষণ রাজনাথের সঙ্গে কথা বলে সম্মত হয়ে চলে যায়।
রাজনাথ জিগাকে সেই মোমবাতি জ্বালানো শেখায়। তুমুল আদরের পর সে তার বাবা পোতেকে বোঝাতে বলে।

(১০)

এত নিঃশব্দে অতর্কিত আক্রমণ করেছিল আকা-বিয়া-রা, বিপুল সংখ্যায় তারা ঘিরে ফেলেছিল ইংরেজ অফিসার সুপারিনটেনডেন্ট আর কয়েদিদের যে যুদ্ধেরই কোনো সম্ভাবনা ছিল না।
জাম্বু খুশি হচ্ছিল। রাজনাথ তাদের একেবারে ঠিক ঠিক জায়গা চিনিয়ে দিয়েছিল। অফিসারদের চিহ্নিত করে দিয়েছিল।

৬ এপ্রিল, ২৪৮ জন বন্দী জাম্বুদের তীরে মারা গেলো। তারা তখন জঙ্গল পরিষ্কার করে হাসপাতাল তৈরি করছিলো। জাম্বুদের দলে ছিল দুশো জন। প্রত্যাঘাত করার অবস্থা তাদের ছিল না, কারণ অস্ত্র তাদের কাছে থাকার কথাই নয়। তারমুগলিতে সে রাতে রাজনাথকে নিয়ে সবাই খুশি। জাম্বু অবধি হেসে কথা বলেছে তার সঙ্গে!
১৪ এপ্রিল, প্রায় পনেরো শো আদিবাসীদের দল আক্রমণ করে কর্মরত কয়েদিদের। পালিয়ে তারা সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়ে বাঁচে। রাজনাথ বোঝায় ওদের মেরে কোন লাভ নেই। এমন ভয় দেখালেই যথেষ্ট। ওরা পরদিন থেকে আর কাজে যাবে না।
তাই ঘটে। রাজনাথের হিসেব অনুযায়ী কয়েদিরা জেলারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দেখায়। সশস্ত্র রক্ষী দিতে হবে তাদের। না হলে তারা আর কাজে যাবে না।
১৪ মে ১৮৫৯, লিপা বাপের বাড়িতে বলে জিগা নিজের হাতে সাজিয়ে দিয়েছে রাজনাথকে। লিপা খবর পাঠিয়েছে, রাজনাথ যেন একবার তার সঙ্গে দেখা করে যায়। রাজনাথ পোতের বাড়িতে প্রবেশ করলে, পোতে তাকে আশীর্বাদ করে। লিপার চেহারা খানিক শীর্ণ।
রাজনাথ জানায়, এই লড়াইটা খুব বড় আকারের হতে যাচ্ছে। তারা হয়তো কাছাকাছি কোন দ্বীপে রাতে আশ্রয় নেবে। রাজনাথকে কিছুদিন নাও দেখতে পারে লিপা।
লিপা তার গলার হাড়ের মালা খুলে রাজনাথের গলায় পরিয়ে দেয়। অত্যন্ত অস্বস্তি হয় রাজনাথের। সে পুনর্বার মালাটি খুলে লিপার গলায় পরিয়ে দিয়ে বলে, তোমাকে এখন সুস্থ থাকতে হবে। যুদ্ধে কি হয় কেউ জানে না। আমি তো নাও ফিরতে পারি। তোমার পূর্বপুরুষের আশীর্বাদ তোমার সঙ্গেই থাকুক।
লিপার পেটে একবার হাত বুলিয়ে তার উত্তরের অপেক্ষা না করে দ্রুত বেরিয়ে যায় রাজনাথ।

ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে আদিবাসীদের বিরাট দল দ্বীপের বিভিন্ন অংশে হামলা করে। আদিবাসীদের হাতে ছুরি কুঠার মানুষপ্রমাণ তীর। অবাক হয়ে একনুরা লক্ষ্য করলো, সাদারা আজ একেবারে সচেতন, সশস্ত্র! এমনটা তো হবার কথা নয়। এরপর যে যুদ্ধ হলো তা একতরফা। একদিকে আগ্নেয়াস্ত্রে সুসজ্জিত ইংরেজ ও কয়েদিরা, অন্যদিকে ওইসব তীর আর কুঠার নিয়ে লড়তে আসা আদিবাসীরা। একজনও ইংরেজ বা কয়েদির মৃত্যু হলো না। অন্যদিকে আদিবাসীরা পড়লো আর মরলো। সিংহ বিক্রমে লড়াই করে মারা গেলো হেরা। একনুর বুলেটবিদ্ধ দেহ সমুদ্রস্রোতে ভাসতে-ভাসতে দূরে চলে গেলো। ঠিক সেই সময় নোঙর করা জাহাজ থেকে গোলা আছড়ে পড়লো নর্থ পয়েন্ট তারমুগলি দ্বীপে। ঘরবাড়ি জীবন বিধ্বস্ত হয়ে গেল আকা-বেয়া-দের।

শিরদাঁড়া ভেঙে গেলো আদিবাসীদের। কিভাবে যে ইংরেজরা নিখুঁতভাবে তাদের সংখ্যা, নৌকো লুকোবার জায়গা, অস্ত্রভাণ্ডার, গোপন আশ্রয়স্থান, দ্বীপের আবাস- সব জেনে গেল কেউ বুঝতেই পারল না!

পারলো একজন। মোডো লিপা। পূর্ণ গর্ভাবস্থায় স্বামী পরিত্যক্তা লিপা। রাজনাথের সঙ্গে সে তখন রক্তের বন্ধনে আবদ্ধ। গভীর জঙ্গলে গিয়ে গাছপালার ওষুধ আর দাইয়ের সাহায্যে দাঁতে দাঁত চেপে জীবনের পরোয়া না করে সে সন্তান নষ্ট করে ফেললো।
অন্য কেউ না জানুক, বুঝুক, লিপা জানে, রাজনাথ মোটেই এই যুদ্ধে মরে গিয়ে সমুদ্রে ভেসে যায় নি!

(১১)

১৮৬৬ সাল নাগাদ বহু লড়াইয়ের পর ইংরেজদের সম্পূর্ণ কব্জায় এসেছে এই দ্বীপ। এখান থেকে সরে গেলেও গ্রেট আন্দামানীরা অন্য দ্বীপ থেকে এখনো চোরাগোপ্তা আক্রমণ চালায়। তবে আবেরদিনের যুদ্ধের মতো অতো ভয়াল নয় সেসব আক্রমণ। আদিবাসীদের তরফে এই শেষ বড় ধরনের আক্রমণ। এর পর ব্রিটিশদের মুখোমুখি হতে পারে নি কেউ। জাম্বু ছাড়া পেলো অল্প কিছুদিন পর। ইংরেজরা বোঝে এই সময় আর চাপ দেবার প্রয়োজন নেই। সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলো তারা। কুটির বানাবার কাঁচামাল দিলো। এরাই নিযুক্ত হলো অন্য স্বাধীন আদিবাসীদের পাহারাদার হিসেবে। পালিয়ে যাওয়া কয়েদিদের চৌকিদার হল এরাই। বিনিময়ে রেশন পেলো, চাল ডাল চিনি তামাক! মেলামেশা ও সভ্যতা অচিরেই এনে দিল নিউমোনিয়া আর সিফিলিস। স্বাধীন এক দুর্ধর্ষ জাত চিরকালের মতো ভিখিরি হয়ে গেলো। মিশ্র রক্তে কেউ কেউ বেঁচে থাকলেও অবিমিশ্র শেষ সদস্যটি ১৯৩১ সালে পৃথিবী থেকে মুছে গেল।

জাম্বুকে ঘিরে বিষন্ন এক দল মানুষ সমুদ্রতীরে বসে থাকে। জাম্বু আর আগের মতো উঠে দাঁড়িয়ে উদাত্ত সুরে কবিতা বলে না। তবু সে ‘বিশেষ ক্ষমতা সম্পন্ন’ এক কবি। নিচু গলায় তার কবিতার সুর একটানা ওঠে পড়ে, ক্রমশ সে গলার ধার উচ্চগ্রামে ওঠে।

কাকে বলে পরাজয়?
এই ফাঁকা আকাশ আর সমুদ্র
বাঁশে বোনা ঝুড়ি, বেতের ঘর
আর খাড়ির নৌকাগুলি –
মার বুকে স্তন্যপানরত শিশু
আর স্বচ্ছ সাদা বেলাভূমি,
এই আমাদের পৃথিবী।
এই সমুদ্র আকাশ বন আগুন
একদিন শোধ নেবে সবকিছুর –
পৃথিবী দেখে যাচ্ছে সবকিছু।
একদিন না একদিন তার ঘুম ভাঙবেই –
ঘুম ভাঙবেই, ঘুম ভাঙবেই, ঘুম ভাঙবেই –

অন্যরা তাকে ঘিরে পা তোলে, নামায়, সমবেত তাল ও সুরে গলা মেলানোর শব্দ সমুদ্রের গর্জন ছাপিয়ে ওঠে আবার।

‘নাগো দো কুক লারতা লা দিকা’ –
হৃদয় আজ দুঃখময়।
ওহো হো হো… ওহো হো হো…
বাঁশের কুটিরের স্বপ্ন দেখতাম –
সমুদ্রের স্বপ্ন দেখতাম আমরা।
সমুদ্রের স্বপ্ন দেখে যাবো আমরা।

প্রথম পর্বের লিংক >> আবেরদিন ১ম পর্ব

Share Now শেয়ার করুন